- সরস্বতী পুজো না হয় বুঝলাম, কিন্তু হঠাৎ না বলে কয়ে...
- যা বাবা! সরস্বতী পুজোয় বাড়িতে থাকতে ইচ্ছে হয় না বুঝি?
জবাবটা যথেষ্ট অস্বস্তির সাথেই দেয় অনিকেত। অস্বস্তি হবে নাই বা কেন? নিজের বাড়ি হলেও, এই অসময়ে সস্ত্রীক আগমন বাড়ির সকলের কাছে একেবারে অপ্রত্যাশিত।
অনিকেত সামন্ত মিচিগানে থাকে। মাস্টার ডিগ্রী কমপ্লিট করে বিদেশে পাড়ি দেয়। এখন মিচিগান ইউনিভার্সিটিতে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ করে - সেও চার বছর হয়ে গেল। স্কুলের কয়েকটা বছর ছাড়া জীবনের বেশিরভাগ সময়টা ঘরছাড়া। শিক্ষিত বাঙালি সমাজ যদিও এটাকে ট্রাডিশান করে নিয়েছে, তবুও অনিকেত এখনও পর্যন্ত পাকাপাকি প্রবাসী হয়ে উঠতে পারেনি। তাই বছরে অন্তত একবার বাড়িমুখো হয় সে। এর জন্য দুর্গা পুজোটাই উপযুক্ত সময়। যদিও গত বছর পুজোর বেশ কিছু দিন আগেই অনিকেতকে ছুটি নিয়ে আসতে হয়। বিয়ে যে করেছে। বেশ ধূমধাম করেই বিয়েটা সেরেছে সে। শিপ্রা। কুলুতে হানিমুনটা সেরে ফিরে গিয়েছে আমেরিকায়। বলে গিয়েছিল ফের পুজোয় আসবে। তবে হঠাৎ ছয়মাস না ফুরোতেই ফের হাজির! কেন?
মায়ের কাছে কারণটা আর গোপন করল না অনিকেত। প্রতিবছর বাড়ি তো আসা হয়, কিন্তু স্কুলে যাওয়াটা হয়ে ওঠে না। স্কুলে তো আর রিইউনিয়ন ধরণের বিশেষ কিছু অনুষ্ঠান হয় না, তাই স্কুলের ফেলে আসা দিনগুলি চাগাড় দিতে সরস্বতী পুজোটাই বেস্ট।যদিও আরেকটি কথা চেপে যায় সে। যখন ছোট ছিল, দেখত সরস্বতী পুজোর দিনটিতে দাদা-দিদিরা জোড়ায়-জোড়ায় স্কুলে আসছে। অনেক বড়ো দাদারা, যাদেরকে কাকুও বলা যেতে পারে, তারা গার্ল-ফ্রেন্ড অথবা বৌকে নিয়ে চারিদিক আলো করে স্কুলে ঢুকছে। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতো অনিকেত আর তার বন্ধুরা। সেও দিন গুনত। বড় হোক, তারপর নিজেও ওরকম করবে। সবাইকে দেখাবে। ওরকম ঠিক কিরকম - সেটি বন্ধুদের বোঝাতে পারতো না।
কিন্তু পরে সে সুযোগ আসেনি। আসবে কি করে - ব্যক্তিগত সাফল্যের সাথে 'ওসবের' নো কমপ্রোমাইজ! বরাবরই পড়াশুনোয় ভালো ছেলে ছিল অনিকেত। এক-দুই কি তিনে রোল নম্বর বাঁধা থাকতো। স্যরদেরও প্রিয় ছিল। কদর ছিল সিনিয়র-জুনিয়র সব ধরণের ছাত্রদের কাছেই। স্কুলের পড়া শেষ করে আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে। তড়তড় করে এগিয়ে গিয়েছে অনিকেতের সাফল্য। রাজ্য ও জাতীয় স্তরে নানা ধরণের অ্যাকাডেমিক সাফল্যের চুড়া ছুঁয়েছে। অনিবার্য ফসল আমেরিকা পাড়ি। জীবন গড়ে তুলেছে। সমস্ত প্রতিদ্বন্দ্বীকে পিছনে ফেলে মানুষের মতো মানুষ হতে পেরেছে সে। কিন্তু 'ওসব' জোটেনি। তাই এইবার সেই সখও মিটিয়ে দিয়ে যাবে সে।
শিপ্রা সুন্দরী। ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে চাকরীও করতো। সব ছেড়েছুড়ে ঘরের লক্ষ্মী হয়েছে। রোগা ছিমছাম চেহারা। সঙ্গে নিয়ে যখন স্কুলের গেট পেরিয়ে ঢুকবে না - আহা! কল্পনা করতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল অনিকেতের। বাচ্চা ধাড়ি সব ঘুরে ঘুরে দেখবে। আলোচনা করবে তাকে নিয়ে। পুরনো বন্ধুরা সমীহ করবে। করবে নাই বা কেন? এই ছোট্ট শহরের কজনই বা এতদূর পর্যন্ত যেতে পারে। কজনই বা সুদূর আমেরিকা পর্যন্ত পারেখপুরের নামটা নিয়ে যেতে পেরেছে। অর্থাৎ যথাযোগ্য খাতিরের অধিকারী সে।
***
চন্দন মণ্ডলের আজ দোকান খোলা হল না। চপের দোকানে এই কটা মাত্র রোজগার হয়, তার ওপর একবেলা দোকান বন্ধ রাখলে চলবে কি করে! কিন্তু কি করা যায়? মেয়ে বায়না ধরেছে - শাড়ি পড়ে সরস্বতী ঠাকুর দেখে বেরোবে। স্কুলে স্কুলে ঘুরবে। মেয়ে সবে ক্লাস থ্রিতে উঠল। একা ছেড়ে দেওয়ার মতো সেরকম বন্ধু এখনও হয়নি রানির। তাই বাবাই একমাত্র ভরসা। সকাল সকাল চান করে রেডি। মা সুন্দর করে শাড়ি পড়িয়ে দিয়েছে। পুষ্পাঞ্জলি দিয়েই বেরিয়ে যাবে।
- তার আগে কিছু খেয়ে তো নে।
- না বাবা, কুরকুরে কিনে দিবা।
***
দশটার মধ্যেই বৌকে নিয়ে রেডি হয়ে যায় অনিকেত। এবার বেরোবে। কাওকে ফোন করেনি। সে স্কুলে গেলে না হয় দেখা হবে। স্কুলটা কাছেই। হাঁটাপথে সাত মিনিট। যেতে যেতে বৌকে এটা সেটা দেখাতে দেখাতে আড়চোখে দেখে কজন তাদের দেখছে।আচ্ছা আগে গার্লস স্কুলটা ঘুরে এলে হতো না। না থাক!
***
পারেখপুর এন. বি. চৌধুরী বিদ্যালয়ের গেটের সামনে এসে কেমন যেন একটা 'ফিলিং টাইপের' হল চন্দনের। কতদিন পর স্কুলে আসছে - এরকম কিছু না। রোজ মেয়েকে তার স্কুলে দিতে গিয়ে এই স্কুলের পাশ দিয়েই তো যায়। সন্ধ্যের পর স্কুলের দারোয়ান বিলাস সাপুইয়ের সাথে খোশগল্প করতে আসতো। কেও কিছু বলার নেই। তাকে চেনেই বা কজন? এইট পর্যন্ত টেনেটুনে পড়েছে। বাবা মরে যাওয়ার পর বাবারই দোকানে বসতে শুরু করে। প্রথম প্রথম চপ গোল করতে পারতো না। মা করে দিত, চন্দন ভাঁজত। আঠারো পেরোতে না পেরোতেই বিয়ে করে নেয়। একুশেই বাবা। সেও আজ অনেকদিন হয়ে গেল।
- বাবা চলো না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি দেখছ?
- হ্যাঁ চল।
***
স্কুলের গেটের সামনে এসেই অনিকেত দেখে চনা দাঁড়িয়ে। হ্যাঁ চনাই বটে। সঙ্গে মেয়েটা কে? নিজের মেয়ে নাকি? বাপরে, পারেও এরা। রুজি রোজগারের ঠিক নেই, বৌ-বাচ্চা করে দিব্যি ঘুরে বেরোচ্ছে। বন্ধুত্বও হয়েছিল তাদের একসময়। একসঙ্গে তাড়িপাড়ায় গিয়ে আমলকী কিনে খেত। যাই হোক, ওর সাথে এখন কে কথা বলতে যায়। আগে দেখি স্যরেরা আছে নাকি। ঋতব্রত, অর্ণব, সৌরদীপরা আসতে পারে হয়তো। সেই ভেবে তড়িঘড়ি শিপ্রার হাত ধরে স্কুলে ঢুকল অনিকেত।
***
অত সাতপাঁচ ভাববার কি আছে! কার সাথে দেখা হল না হল, কে কথা বলল না বলল তাতে বয়েই গেছে চন্দনের। একজন চপওয়ালাকে কোন স্যরই বা মনে রাখবে। আর স্কুলের বন্ধু? ছিলই বা কজন।
***
যেন মনে হল মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে আছে অনিকেত। একটিও চেনা মুখ নজরে এল না। অন্তত পুরনো স্কুলের বন্ধু বা প্রাক্তন স্যর - কেও কোথাও নেই। শহরের চেনা পরিচিত দুই একজন হাসি বিনিময় করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। না কেওই এগিয়ে এল না। পাশে শিপ্রা নির্বিকার।
***
অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে অনিকেত। সঙ্গে বৌ হবে। কাওকে খুঁজছে কি! এদিকওদিক দেখছে সমানে। খানিক বিচলিত। চন্দন ভাবছে, গিয়ে কথা বলবে কি না। চিনতে না হয় পারবে। কিন্তু কিই বা কথা থাকতে পারে তাদের। ঘনিষ্ঠ বন্ধু তো কখনই ছিল না। তারপর ক্লাস এইটেই ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। মাঝে হাতে গুনে হয়তো দু-একবার দেখা হয়েছে - এই কি রে কেমন আছিস। তবে শেষ দেখা কতদিন আগে ঠিক মনেও নেই। লজ্জা তো করবেই। দেখা সাক্ষাৎ না পেলেও অনিকেতের খবর পায় চন্দন। তাদের পাশের বাড়ির মালার মা অনিকেতদের বাড়ির ঝি। ওই এসেই গল্প করে। আমরিকাতে থাকছে। কিন্তু অনিকেতকে অনেকক্ষণ একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবশেষে এগিয়েই গেল চন্দন। পিঠে একটা টোকা দিয়ে মুখে হাসি ফুটিয়ে দাঁড়ালো...
***
- কি রে ঘুরে এলি স্কুল থেকে? দেখা হল বন্ধুদের সাথে?
- আচ্ছা মা, তোমার চনাকে মনে আছে?
- থাকবে না মনে, তোরা একসঙ্গে ঘুরে বেরাতি, আমসত্ত্ব কিনে খেতি...
- আঃ আমসত্ত্ব নয়, আমলকী। তা জানো, আজ ওর সাথে দেখা...
- চিনতে পারলি...
-
-