Monday, 19 November 2018

ঝুলনের জন্য ৬

মধ্যযুগে সামন্ততান্ত্রিক জাপানের সামরিক বর্গের লোকেদের বুশি বলা হতো । তাদের মাথায় থাকতো চোঙমাগে ঝুঁটি । গায়ে ছিল কিমোনো পোশাক, সাথে হাউরি, হাকামা, তাবি, পায়ে গীতা (একধরনের খড়ম জাতীয় জাপানি চপ্পল)। কাতানা, ওয়াকিজাসি, তাচি, তান্তো ইত্যাদি হাতিয়ার ছিল তাদের সবসময়ের সঙ্গী । এই বুশিরা গোটা বিশ্বের কাছে সামুরাই নামেই বেশি পরিচিত । আত্মসম্মানে ভরপুর লড়াকু সামুরাইরা শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণের চেয়ে স্বেচ্ছায় মৃত্যুগ্রহণকে অধিক সম্মানের মনে করতো । তাই শত্রুর হাতে পড়ার আগে তান্তো ছুরি দিয়ে নিজের পেট কেটে আত্মহত্যা করাটাই ছিল তাদের অন্তিম প্রবিধান । একে বলা হয় হারাকিরি । হারাকিরি জাপানি প্রথা হলেও এই ধরনের 'অনার সুইসাইড' নানা যুগে নানা দেশে নানা ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে । ১৯৩১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এলাহাবাদের আলফ্রেড পার্কে ব্রিটিশ পুলিশের সাথে লড়াইয়ে চন্দ্রশেখর আজাদ যখন জখম হয়ে পড়েন এবং বুঝতে পারেন পুলিশের ঘেরাও থেকে পালানোর আর কোনো উপায় নেই তখন নিজের কোল্ট পিস্তল দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন । ৬৭ খ্রিষ্টাব্দে মধ্য এশিয়ার কোনো এক শহরের সীমানায় অবস্থিত একটি গুহায় ৪১ জন ইহুদি মিলে ঠিক একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় । কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুজন বেঁচে যায় । কিভাবে ? কারণ তাদের মধ্যে একজন গুনতে জানতো । আর তাদের মধ্যে একজন জোচ্চোর কাপুরুষও ছিল ।

যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ে রোমান সাম্রাজ্য পশ্চিমে ব্রিটেন থেকে পূর্বে ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । তারই অন্তর্গত পূর্ব এশিয়ার ইহুদি অধ্যুষিত একটি রাজ্যের নাম জুডিয়া (যেখানে ৩০ থেকে ৩৩ খ্রিষ্টাব্দের মাঝে কোনো এক সময়ে সেখানকার শাসক পন্টিয়াস পিলাটের আদেশে এক জনপ্রিয় ইহুদি ধর্মপ্রচারককে ক্রুশকাঠে বিদ্ধ করে হত্যা করা হয়) । বিখ্যাত রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের (জুলিয়াস সিজারের দত্তকপুত্র অগাস্টাস সিজারের সৎছেলে) দত্তকপুত্র নিরো ছিলেন তখনকার রোমান সম্রাট । তার কাছে খবর আসে জুডিয়ার ইহুদিরা রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে । বিদ্রোহ দমন করতে সৈন্য পাঠানো হয় । সৈন্যদলের নেতৃত্বে ছিলেন রোমান সেনাপতি ভেস্‌পেসিয়ান, যিনি পরবর্তীকালে রোমের সম্রাটও হন । শুরু হয় ইহুদি-রোমান যুদ্ধ । ৭০ বছর ধরে যুদ্ধ চললেও, যুদ্ধশেষে জুডিয়াতে রোমান সাম্রাজ্যের শাসন পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয় । ভেস্‌পেসিয়ানের অভিযানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি হল ইয়োদফাট অবরোধ । জুডিয়ার উত্তরে অবস্থিত গ্যালিলি অঞ্চলে মাত্র ১২ একর জমির ওপর তিনদিকে পাহাড় আর একদিকে পাঁচিল ঘেরা ছোট্ট শহর ইয়োদফাট । ছোট্ট হলেও ইয়োদফাটের বাসিন্দারা ভেস্‌পাসিয়ানের আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে । উভয়পক্ষের প্রচুর সৈন্য হতাহতের পর (ভেস্‌পাসিয়ানও একবার আহত হন) অদম্য এবং অফুরন্ত রোমানবাহিনী ইয়োদফাটের প্রতিরক্ষা পাঁচিল ধ্বংস করে শহরে প্রবেশ করে । অপরাজেয় রোমান সৈন্যদলের ৪৭ দিন সময় লেগেছিল ইয়োদফাট অবরোধ করতে । যার পরিচালনায় ইয়োদফাটের ইহুদিরা ৪৭ দিন ধরে রোমান সৈন্যদের দোরগোড়ায় ঠেকিয়ে রেখেছিল তার নাম হল ইয়োসেফ বেন মাতিতেয়াহু । 

জেরুসালেমে জন্মগ্রহণকারী মাতিতেয়াহু পারতপক্ষে ছিলেন পণ্ডিত, ঐতিহাসিক এবং হ্যাগিওগ্রাফার (মুনিঋষিদের জীবনবৃত্তান্ত লেখে যারা) । প্রশাসনিক এবং কূটনৈতিক ব্যাপারেও তার আগ্রহের অভাব ছিল না (কুড়ি কি বাইশ বছর বয়সে স্বয়ং সম্রাট নিরোর সাথে দেখা করে আসেন) । ইহুদি-রোমান যুদ্ধের প্রাক্কালে তাকে গ্যালিলির গভর্নর পদে নিযুক্ত করা হয় । সে কাজে বিশেষ সাফল্য না পেলেও, ভেস্‌পেসিয়ানের সেনাকে ছয় সপ্তাহ ধরে ইয়োদফাটের দোরে ঠেকিয়ে রেখে যথেষ্ট বীরত্ব এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন ।

যদিও শেষ রক্ষা হল না । ভেস্‌পেসিয়ানের সেনার হাতে ৪০,০০০ জন ইহুদির প্রাণ গেল । হাজারের ওপর স্ত্রী ও শিশুকে দাসত্ব গ্রহণ করতে হল । আর মাতিতেয়াহুর কি হল ?

রোমান সৈন্য যখন পাঁচিল ভেঙ্গে শহরে ঢুকে পড়ে তখন ৪০ জন সঙ্গী নিয়ে মাতিতেয়াহু কাছের কোন এক পাহাড়ের গুহায় পালিয়ে গা ঢাকা দেয় । কিন্তু রোমান সৈন্যর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া অসম্ভব । তার ওপর মাতিতেয়াহুর মতো দুঁদে লোককে কোনোমতেই ছেড়ে দেবে না তারা । তাহলে উপায় ? হারাকিরি ! কিন্তু প্রকৃত হারাকিরির উপায় তো তাদের জানা ছিল না । তাই একে অপরকে হত্যা করার পরিকল্পনা করলো তারা । বাধ সাধলেন মাতিতেয়াহু । ৪০ জন একে অপরকে কাটাকাটি শুরু করলে বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড হবে । আবার, তাছাড়া উপায়ও নেই । সুষ্ঠুভাবে ও শান্তিতে যাতে কার্যসিদ্ধি হয় তার জন্য মাতিতেয়াহু নিজেই বুদ্ধিখাটিয়ে এক অভিনব উপায় বের করলেন । উপায়টি হল, তিনি সকলকে একটি বৃত্তাকার সজ্জায় পাশাপাশি দাঁড়াতে নির্দেশ দিলেন । তাদের মধ্যে নিজেও দাঁড়ালেন । এবার একজনকে বললেন, তার ঠিক পাশের জনকে (বাম দিকের জনকে) তরোয়াল দিয়ে হত্যা করতে । যে নিহত হল, তার পাশের জনের এবার পালা - নিজের পাশের জনকে হত্যা করার । এভাবে একে একে পাশের জনকে হত্যা করতে করতে ফের প্রথম জনে (বা তৃতীয় জনে) ফিরে এলে, সে তার জীবিত পাশের জনকে হত্যা করবে । অবশেষে এই মৃত্যুচক্রে মাত্র একজন অবশিষ্ট থাকবে । সেই প্রকৃতপক্ষে আত্মহত্যা করে কার্যসিদ্ধি করবে । 

এই ৪১ জনের হানাহানিতে সেই শেষজনটি ছিলেন ইয়োসেফ বেন মাতিতেয়াহু । মাতিতেয়াহু একাই বাঁচেননি, এমনকি শেষ যাকে হত্যা করার কথা, তাকেও তিনি নিস্তার দিলেন । অনন্যোপায় দুজনে অবশেষে ভেস্‌পেসিয়ানের কাছে আত্মসমর্পণ করলো ।

মাতিতেয়াহু আর তার এক সঙ্গীর বেঁচে যাওয়া নিছক ভাগ্যের ব্যাপার মনে হলেও, তা নয় । নির্বোধদের ভাগ্যের প্রয়োজন হয়, বুদ্ধিমানদের নয় । মাতিতেয়াহু কেবল বুদ্ধিমানই ছিলেন না, অঙ্কটাও বুঝতেন (ঠিকভাবে বলতে গেলে কম্বিনেটোরিকস্‌) । তিনি আগে থেকেই হিসেব কষে বের করে নিয়েছিলেন ৪১ জনের সজ্জায় ঠিক কোথায় দাঁড়ালে শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকা যাবে । উত্তরটি হল ১৬ । প্রথম যে পাশের জনকে হত্যা করতে শুরু করে, তার সাপেক্ষে ১৬-তম স্থানে দাঁড়ালে শেষ পর্যন্ত অক্ষত থাকা যাবে । মাতিতেয়াহু ১৬-তম স্থানটিকেই বেছে নিয়েছিলেন ।  বাকি আরেকজন ভাগ্যের জোরে বেঁচে গিয়েছিল বলা যেতে পারে । 

আন্দাজ করাই যায়, মাতিতেয়াহু মোটেই নিরুপায় হয়ে আত্মসমর্পণ করেননি । আত্মসমর্পণের ইচ্ছে না থাকলে কেউ কেন শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার সুযোগটি বেছে নেবে ? আসলে সবই ছিল তার পরিকল্পনা । অন্তত গুহায় প্রবেশের পর থেকে । নইলে বন্দি হওয়ার দুবছরের মধ্যেই কেউ কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে যায় কি করে ? শুধু তাই নয়, তারও কিছুদিনের মধ্যে রোমের নাগরিকত্ব লাভ করেন মাতিতেয়াহু । সাথে জুডিয়ায় আবাসন এবং মাসোহারা । পরবর্তী রোমান সম্রাটের দরবারে বিশিষ্ট পদও দখল করেছিলেন । সেই সম্রাটের বংশের নামে নিজের নাম পর্যন্ত পরিবর্তন করে দেন । নতুন নাম টিটাস ফ্লাভিয়াস জোসেফাস । এই নামেই ইতিহাসচর্চা চালিয়ে যান । জোসেফাসের পৃষ্ঠপোষক রোমান সম্রাটটি আর কেউ নন, তার এককালীন প্রতিদ্বন্দ্বী এবং প্রাক্তন রোমান সেনাপতি ভেস্‌পেসিয়ান ।

শুরুতেই একজন জোচ্চোর কাপুরুষের উল্লেখ করেছি ; বলে দিতে হবে না সে কে ।

তবে জোসেফাসকে ইতিহাস মনে রেখেছে তার জোচ্চুরি বুদ্ধি ব্যবহার করে মৃত্যুচক্রে সুরক্ষিত ব্যক্তির অবস্থান বের করার জন্য । বর্তমানে যা 'জোসেফাস প্রবলেম' (বা জোসেফাস বিন্যাস) নামে পরিচিত । বিভিন্ন সময় ধরে আলাদা আলাদা সংখ্যক লোকের জন্য জোসেফাস প্রবলেম সমাধান করার চেষ্টা করা হয়েছে । যেকোনো সংখ্যক (n) লোকের ক্ষেত্রে সমাধান বের করার চেষ্টাও চালানো হয়েছে । জার্মানির জুরিখ শহরে অবস্থিত সুইস ফেডেরাল ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির (সংক্ষেপে ইটিএইচ জুরিখ) গবেষক লরেঞ্জ হালবেজেন এবং জার্মানিরই ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নরবার্ট হাঙ্গেরভুহ্‌লের তাদের এক গবেষণাপত্রে যেকোনো সংখ্যার (n) জন্য জোসেফাস নম্বর বের করার সূত্র বের করেন । জোসেফাসের নাম থাকলেও এতে তার বিন্দুমাত্র অবদান নেই ।

রোমান নাগরিকত্ব পাওয়ার পর জোসেফাস বই লিখতে শুরু করেন । তার বিখ্যাত বইগুলির মধ্যে 'অ্যান্টিকুইটি অফ দি জিউস', 'দ্য জিউইস ওয়ার', 'এগেন্সট এপিওন' ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য । 'দ্য লাইফ অফ ফ্লাভিয়াস জোসেফাস' নামে তার একটি আত্মজীবনীও আছে । তবে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হল, ইয়োদফাট অবরোধ, জোসেফাসের নেতৃত্বে ইহুদিদের বিক্রম, গুহায় মৃত্যুচক্রের খেলা আর শেষে আত্মসমর্পণ - এই সমস্ত বৃত্তান্তের একমাত্র ঐতিহাসিক দলিল আর কিছু না খোদ জোসেফাসেরই লেখা বই 'দ্য জিউইস ওয়ার' । 

***************

পুনশ্চ: ইহুদি-রোমান যুদ্ধের পর জুডিয়ায় ফের রোমের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে গ্যালিলি অঞ্চলের কিছু স্থানীয় অধিবাসী ঘরবাড়ি ছেড়ে রোমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে এবং বর্তমান ইতালির টাস্কানি প্রদেশে এসে পৌছায় । এই বংশের একজন উত্তরপুরুষ ছিলেন গ্যালিলিও বোনাইউটি । আদি বাসস্থান গ্যালিলির নাম অনুসারে তার গ্যালিলিও নাম রাখা হয় । তিনি টাস্কানির রাজধানি ফ্লোরেন্সের একজন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক ছিলেন । চিকিৎসার সাথে সাথে তিনি শিক্ষকতা এবং রাজনীতিতে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেন । তার সম্মান ও স্মৃতিতে পরবর্তী বংশধরেরা নিজেদের বোনাইউটি পদবি পাল্টিয়ে, তার নামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে গ্যালিলেই পদবি ধারণ করেন । গ্যালিলিও বোনাইউটির এক বংশধর ভিনসেনজো গ্যালিলেই তার জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম তাদের এই বিখ্যাত পূর্বপুরুষের নামে রাখেন । ভিনসেনজো গ্যালিলেইয়ের জ্যেষ্ঠপুত্রের নাম হয় গ্যালিলিও গ্যালিলেই । সেও পরবর্তীকালে কিছুটা বিখ্যাত হয়েছিল, আর কি !

Friday, 16 November 2018

ঝুলনের জন্য ৫

১ কেজি বলতে কতটা বোঝায় ? গনেশ আটা বা ঢেঁকি ছাঁটা সত্যেন্দ্র ছাতুর প্যাকেটটা দেখিয়ে দিলে মোটামুটি আন্দাজ করা যায় ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন উঠবে এই পরিমাণটা এল কোথা থেকে ? তাছাড়া দুনিয়া জুড়ে যারা ১ কেজি = ১০০০ গ্রাম = ২.২০৪৬২ পাউন্ড = ০.০৬৮৫ স্লাগ (নেহাতই সখে, সেই প্রাচীন ইম্পিরিয়াল পদ্ধতিতে) ব্যবহার করে আসছেন, তারাই বা সিওর হবেন কি করে যে ঠিকঠাক পরিমাণটাই দাঁড়িপাল্লায় চাপাচ্ছেন ?

১৮৮৯ সালে প্যারিসের কাছে সেভ্রেস (যদিও ফরাসিরা বলে সেভ্‌) শহরে অনুষ্ঠিত জেনারেল কনফারেন্স অন ওয়েটস্‌ অ্যান্ড মেজারস্‌-এ বিশ খানেক বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা জমায়েত হন এবং বোঝাপড়ার মাধ্যমে ঠিক করেন, যে আজ থেকে বিশেষভাবে তৈরি নস্যির ডিবের মতো দেখতে একটা নিরেট চোঙাকৃতি ধাতব টুকরোর ভরকে এক কেজি ধরা হবে এবং সেই হিসেবে যাবতীয় মাপজোখ ও খরিদ্দারি চলবে । ৩৯ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের সমান উচ্চতা ও ব্যাসের লম্ব-বৃত্তাকার চোঙাকৃতি, ৯০% প্লাটিনাম ও ১০% ইরিডিয়াম ধাতুর সংকরে তৈরি টুকরোটি প্যারিসের কাছে সেন্ট ক্লাউড নামক এলাকায় অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ব্যুরো অফ ওয়েটস্‌ অ্যান্ড মেজারস্‌-এর (সংক্ষেপে বিআইপিএম - কি করে ? আসলে, ফরাসি নাম ব্যুরো ইন্টারন্যাশনাল দেস পুয়া এট্‌ মেজারস্‌-এর সংক্ষেপটা ব্যবহার করা হয়) সংগ্রহশালা প্যাভিলিও দি ব্রেটুইয়ে কাঁচের কৌটোর মধ্যে রাখা আছে । যত্ন-আত্তির কোনোপ্রকার খামতি না থাকা সত্বেও, ধুলোবালি লাগার কারণে চোঙটির যেমন ওজন (মানে ভর - ভাষাটা বাংলা, কি আর করা যাবে !) বাড়ার সম্ভাবনা আছে, তেমনই নাড়াঘাঁটার কারণে ক্ষয়ে-টয়ে ওজনে কমতিরও চান্স থেকে যাচ্ছে । এই ঝামেলা দূর করতে গোটা বিশ্বের বৈজ্ঞানিকরা দু'দশক ধরে উঠেপড়ে লেগেছিল । কেজিকে কিভাবে অক্ষয় (দুনিয়া চুলোয় যাক, সেটি যেন যা-কার-তাই থাকে) কিছু একটা দিয়ে ধরেবেঁধে রাখা যায়, সে ভাবনার এতদিনে ইতি হয়েছে । সাধু !

বিনিময় প্রথার যখন চল ছিল তখন লেনদেনে না দরকার পড়তো ওজনের, না অর্থের । প্রথম প্রথম ওজনের ধারণাটাই এসেছিল বস্তাবন্দী শস্য থেকে । ফরাসি বিপ্লব এবং সাথে সাথে নবজাগরণের সময়টাতে মানুষ প্রথম (বললে, সায়েন্টিফিক্যালি) কিলোগ্রাম মার্কেটে আনলো (যদিও কিলোগ্রামের অরিজিনাল নাম ছিল 'গ্রেভ') । পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে লম্বা রেসের শাসকদের লিস্টে প্রথম (৭২ বছর ১১০ দিন ধরে গদিতে বসেছিলেন) ফরাসি সম্রাট মহান লুই (চতুর্দশ) প্রতিষ্ঠিত ফ্রেঞ্চ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস ১৭৯৩ সালে একটা কমিশন বসান । সেই কমিশন ঠিক করে যে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতায় (এই উষ্ণতায় জলের ঘনত্ব সর্বাধিক হয়) এক ঘনডেসিমি পরিষ্কার পাতিত জলের ওজনকে এক কিলোগ্রাম হিসেবে ধরা হবে । যেকোনো ল্যাবরেটরিতে ঠিকঠাক সাজ-সরঞ্জাম থাকলে এই স্ট্যান্ডার্ডে এক কেজি ওজন মেপে নিয়ে কাজকর্ম করা যায় । সেটুকু ঝামেলাও বাদ দিতে চাইলে সমপরিমাণ জলের ওজনের একটা পিতলের বাটখারা বানিয়ে নিলেই হল (এবং তাইই করা হয়েছিল) ।

কিন্তু তাতে একটি সমস্যা থেকে যাচ্ছে । এক রাশির পরিমাপ করতে গিয়ে আরেক রাশির দরকার পড়ে যাচ্ছে - (ডেসি) মিটারের । সে সময়ে মিটারের মাপজোখ আজকের মতো নিখুঁত ছিল না । উত্তরমেরু থেকে নিরক্ষরেখার ভৌগলিক দূরত্বের মোটামুটি এক কোটি ভাগের এক ভাগকে মিটার হিসেবে চালানো হতো । শুধু মিটার কেন, উষ্ণতাও আছে । তাদের মানে ভুলভ্রান্তি হলে ওজনের মানেও হবে । তো যেদিন জলের উষ্ণতা আর মিটার ঠিকঠাক পরিমাপ করা সম্ভব হল, সেদিন বিজ্ঞানীরা প্লাটিনামের তৈরি (যত কেমিক্যালি ইনঅ্যাকটিভ ও অবশ্যই শক্তপোক্ত হবে তত ভালো, তাই না ?) একটা বাটখারা বানিয়ে নিলেন ।

ইরিডিয়াম আবিষ্কারের পর ৯০ ভাগ প্লাটিনামে ১০ ভাগ ভেজাল দিয়ে শেষ যে বাটখারাটি বানানো হল সেটাই সেন্ট-ক্লাউডে রাখা আছে - একটা না, ছ'ছটা (পাছে যদি চুরি যায়) । বাটখারাটির একটা নাম দেওয়া হয়েছে - ইন্টারন্যাশানাল প্রোটোটাইপ কিলোগ্রাম (সংক্ষেপে আইপিকে) । প্লাটিনাম-ইরিডিয়াম সংকর নেওয়া হল কেন ? কারণ আর কিছুই না, সেই শক্তপোক্ত হবে, ক্ষয় হবে না আর অবশ্যই রাসায়নিকভাবে নিস্ক্রিয়, বিশেষ করে অক্সিজেনের সাথে ভুলেও বিক্রিয়া করবে না । এই আইপিকে কেবল সেন্ট-ক্লাউডেই রাখা হয়নি, বিভিন্ন দেশেও একটা করে পাঠানো হয়েছে, নইলে কি নানা দেশের বিজ্ঞানীরা বার বার ফ্রান্স ছুটে আসবে ওজন মাপতে !

আবার বলছি, হাজার সুরক্ষা সত্বেও, দেখা যাচ্ছে আইপিকের ওজন পাল্টাচ্ছে । তাই বিআইপিএম মার্কেটে ব্র্যান্ড নিউ কিলোগ্রাম ছাড়তে চলেছে । শুধু তাই নয়, তার সাথে অন্যান্য মৌলিক এককগুলোর মাপজোখও, যেগুলোকে আমরা এসআই একক নামে চিনি ।

আইডিয়াটা হচ্ছে ক্ষয়িষ্ণু জিনিস দিয়ে বাটখারা বানালে ওজনের হেরফের তো হবেই, তাই কৌটোতে রাখা বাটখারার বদলে প্রাকৃতিক কোনো ধ্রুবকের (অভাব নেই, আলোর বেগ, প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক, আভোগাদ্রোরও ইত্যাদি ইত্যাদি) সাপেক্ষে কেজির পরিমাপ ঠিক করলে কেমন হয় ? বাম্পার হয় । হলও তাই । কিন্তু এটুকু ভাবতে বিশ বছর লেগে গেল ? তা না । আসলে সময়টা লাগলো ধ্রুবকটার নিখুঁত মানটা পেতে । এতটাই নিখুঁত যে, পরিমাণে প্রতি ১০০০০০০০০০ ভাগে মাত্র ৩০ ভাগ ভুল থাকার সম্ভাবনা থাকবে (অর্থাৎ উল্টো দিক থেকে বললে প্রতি একক পরিমাপে ০.০০০০০০০৩ অংশ পর্যন্ত নিখুঁত মান পাওয়া যাবে) ।

ভেবে দেখলে, ব্যাপারটা নতুন কিছু না । আগেও বিজ্ঞানীরা সময় আর দৈর্ঘ্যের ক্ষেত্রে এই ধরনের কেরামতি দেখিয়ে এসেছে । নিজের অক্ষের চারিদিকে একটা সম্পূর্ণ পাক লাগাতে পৃথিবী যত সময় নেয়, তার ৮৬১৬৪ ভাগের এক ভাগ সময়কে এক সেকেন্ড বলা হতো । কিন্তু পৃথিবীর ঘূর্ণনের হেরফের বা সেই ধরনের কিছু হলে, সময়ের কোটাতেও গণ্ডগোল দেখা দিতে পারে (যেমন ২০০৪ সালের সুনামির ফলে পৃথিবীতে দিন ২.৬৮ মাইক্রোসেকেন্ড কম হয়ে যায়) । তাই সেকেন্ডের নতুন সংজ্ঞা দেওয়া হয় - " ০ কেলভিন উষ্ণতায় সিজিয়াম-১৩৩ মৌলের একটি পরমাণুর গ্রাউন্ড স্টেটের দুটি হাইপারফাইন স্তরে ট্রানজিশনের সময় যে শক্তি বিকিরণ হয় তার ৯১৯২৬৩১৭৭০টি কম্পন সম্পূর্ণ হতে যে সময় লাগে তাকে ১ সেকেন্ড বলে ।" এটা কখনই পাল্টাবে না, যেখানে খুশি,যখন খুশি মাপা হোক না কেন । 

একই ভাবে আরেকটি প্রাকৃতিক ধ্রুবককে কাজে লাগিয়ে মিটারটাও ফিক্সড্‌ করা হয়েছে ।  শুন্য মাধ্যমে আলোর বেগ প্রতি সেকেন্ডে ২৯৯৭৯২৪৫৮ মিটার - এটা বিজ্ঞানীরা হিসেবনিকেশ করে বের করেছেন । অতএব, ১/২৯৯৭৯২৪৫৮ সেকেন্ডে আলো যতটা পথ যায় ততটাই হল এক মিটার ।

এবার আসা যাক, ফাইনালি, কিলোগ্রামের মাপে । এখানে যে প্রাকৃতিক ধ্রুবকটি ব্যবহার করা হয়েছে সেটি হল প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক । মান ০.০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০৬৬২৬০৭০১৫ জুল-সেকেন্ড । আলোর কণা বা ফোটনের মোট শক্তি আর তার কম্পাঙ্কের অনুপাত নিয়ে প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবকের মান বের করা হয় ।

প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবকের জুল-সেকেন্ড (অনেক ক্ষেত্রে আর্গ-সেকেন্ড) এককটি বেশি প্রচলিত হলেও, এর আরেকটি একক আছে - কিলোগ্রাম-বর্গমিটার/সেকেন্ড । সেকেন্ড আর (বর্গ)মিটারের নিখুঁত হিসেব তো আগেই পেয়ে বসে আছি, এবার শুধু তাদের সাথে প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক ঠিকঠাক গুণ-ভাগ করে নিলেই কিলোগ্রামের ব্র্যান্ড নিউ নিখুঁত 'বাটখারা'টি পেয়ে যাব ।

আগেই বলা হয়েছে, প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক অ্যাকিউরেটলি মাপতে গিয়েই বিজ্ঞানীদের এতটা দেরি হয়েছে । তার জন্য তাদের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম যন্ত্রপাতিও তৈরি করতে হয়েছে । খেটেছে ভালোই । এত পরিশ্রম করেও বিতর্ক এড়াতে পারেননি । আঙুল উঠেছে, এভাবে কিলোগ্রাম ঠিক করার ফলে, কিলোগ্রামের সাথে অন্যান্য এসআই এককগুলির লিঙ্ক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে । যেমন - মোল, যা পদার্থে উপস্থিত মোট কণার সাপেক্ষে পদার্থের পরিমাণ বোঝাতে ব্যবহার করা হয় । ফলে কিছু কিছু বিজ্ঞানী আবার অন্য নতুন ধরনের ফলাফল পেশ করেছেন । 

সে যাই হোক, বিআইপিএম সহ পৃথিবীর অন্যান্য মাপজোখের সংস্থাগুলি ভোটাভুটির মাধ্যমে কিলোগ্রামের নতুন সংজ্ঞাটি মেনে নিয়েছেন । তার সাথে মোল, কেলভিন, অ্যাম্পিয়ার, ক্যান্ডেলা ইত্যাদি এসআই এককগুলোর সংজ্ঞাও শুধরে নেওয়া হয়েছে । 

এতকিছু তোলপাড় সত্বেও সাধারণ মানুষের রোজকার জীবনে স্পেশাল কিছু পাল্টাপাল্টি হবে বলে মনে হয় না । রেড লেবেলের এক কেজির প্যাকেট আগে যতটা ভারি লাগতো, পরেও ততটাই লাগবে । কিন্তু বিজ্ঞানীরা পরিবর্তনটা হাতেনাতে টের পাবেন । তাদের মাপামাপি সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হবে । আর সবচেয়ে বড়ো কথা '১ কিলোগ্রাম কতটা'-র উত্তর দিতে আর প্লাটিনাম-ইরিডিয়ামের চোঙের ওজন নিয়ে আর মাথা ঘামাতে হবে না । 



অনুবাদ : কেভিন পিম্বব্লেটের লেখা আর্টিকেল The Kilogram Is Being Redefined – a Physicist Explains (The Conversation-এ প্রকাশিত)

Thursday, 27 September 2018

২০১৮, ২৭শে সেপ্টেম্বর


শ্রীশ্রী সম্বিত পাত্র মহাশয়,


আপনাকে চিঠি লেখার সুযোগ পেয়ে আমি যারপরনাই আনন্দ পেয়েছি । তবে আপনি আদৌ আমার চিঠিটি খুলে পড়বেন কি না জানি না । কারণ, হয় আপনি মোল্লা খেদাতে ব্যস্ত থাকবেন অথবা বাংলা বর্বরের ভাষা ভেবে চিঠিটা চুলোয় দেবেন । প্রথমটা আপনার ব্যক্তিগত রুচি, দ্বিতীয়টি, মাফ করবেন বাংলা আপনার ভাষা নয় । কথা উদ্ধার করতে রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ মহাশয়ের সাহায্য নিলেও নিতে পারেন । তবে উনি এখন বোধহয় উর্দু হরফে সংস্কৃত লেখা প্র্যাকটিস করছেন । ‘পা ভেঙে হাতে ক্র্যাচ ধরিয়ে’ যেন না দেন, সেই ভয়ে বাবুল সুপ্রিয় মহাশয়ের নাম নিচ্ছি না । যাই হোক ব্যবস্থা চাইলে আপনি ঠিকই করে নেবেন । ওএনজিসির ডিরেক্টরের পদটা যেভাবে ‘ব্যবস্থা’ করে নিয়েছেন ।

ওএনজিসি বলতে খেয়াল হলো, আপনাকে ডঃ সম্বিত পাত্র বলে সম্বোধন করিনি বলে অসন্তুষ্ট হননি তো ? আসলে আজকাল ওসব চলে না বুঝলেন । এই যেমন ‘কাঠ্পুতলী’ মনমোহন সিংকে কজনই বা ‘ডঃ’ সম্বোধন করেন ! আপনি করেন ? আরেকটি কথা, আপনি ছাড়া আরও আটজন ওএনজিসির ইন্ডিপেনডেন্ট ডিরেক্টর আছেন, জানেন নিশ্চয়ই । তাদের শংসাপত্রগুলির সাথে আপনার শংসাপত্রটি তুলনা করছিলাম । রাত নটার রিয়্যালিটি শো’গুলোতে (যেগুলোকে অনেকে প্রাইমটাইম ডিবেটও বলে) আপনার সামনে রাখা প্রশ্নগুলির সাথে আপনার উত্তরগুলির তুলনা করলে যেমনটি মনে হয় তেমনটি মনে হল ।

আচ্ছা আপনি কতদিন থেকে মোল্লা খেদাচ্ছেন ? হালে ‘বঙাল খেদাও’ চলছে (সেটিও আপনার কাছে একপ্রকার মোল্লা খেদাওই) – সে বিষয়ে আপনার কি মত ? ও মাফ করবেন, আপনার আবার মতামত আছে নাকি কিছু ! গুহ্যদ্বারে অব্জ গুঁজে মুখ দিয়ে বাতকর্মকারী নাচারদের ন্যায়সঙ্গত মতামত দেওয়ার অক্ষমতা, ডিমানিটাইজেশনের মতো হাজারো প্রকল্পের ব্যর্থতা স্বীকার করে জনসাধারণের কাছে ক্ষমা না চাওয়ার অনৈতিকতারই সমান । কিন্তু আপনি তো সেরকম নন । আপনাকে বললাম থোড়াই । আপনি তো মতামত দেন, তা সে যতই অপ্রাসঙ্গিক, অবান্তর, অসংলগ্ন হোক না কেন ! ব্যাখ্যা করে বোঝান, তা সে যতই একঘেয়ে, ভিত্তিহীন, অন্তঃসারশূন্য হোক না কেন ! তথ্যপূর্ণ কথা ছাড়া কথাই বলেন না – তা সে যতই ‘পোস্ট কার্ড বা অপ ইন্ডিয়ার ‘তৈরি খবর’ হোক না কেন ! নিন্দুকেরা এও বলে ‘হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ফরোয়ার্ড’ ছাপিয়ে আপনি মোল্লা খেদাতে নামেন । আপনিই বলুন অমিত মালভ্যের মতো লোক থাকতে আপনার, শুধু আপনার কেন, বিজেপির সমস্ত মুখপাত্রমণ্ডলীর তথ্যের জন্য চিন্তার কিছু কারণ আছে । হ্যাঁ, মাঝেসাঝে অখিলেশ যাদব খোদ নিজের বাপকেই চড়থাপ্পড় মেরে বসেন ঠিকই তবে বত্রিশ লক্ষ্য (খালি উত্তরপ্রদেশেই) হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড কারখানার মধ্যে আর কয়টিকেই বা আপনি সামলে সামলে রাখবেন ! প্রধান সেবক তো টিকিট বুক করতেই ব্যস্ত । রাষ্ট্রপতি অমিত শাহ মহোদয় দেশশাসনে (ও, আরেকটা রাষ্ট্রপতি আছে তাই না ?) ব্যস্ত । নির্মলা সীতারামন দেবী বাকি মন্ত্রীদের প্রতিরক্ষা দিতে ব্যস্ত । অনিল জেটলি বাবু বই লিখছেন শুনছি ? দ্য ওয়েলথ অফ নেশনস পার্ট টু । বিজয় মাল্য ইতিমধ্যে ফরোয়ার্ড লিখে পাঠিয়ে দিয়েছেন । 

দেখুন তো । আপনার ব্যাপারে লিখবো ভাবলাম, বাপঠাকুরদায় গিয়ে ঠেকলাম । দোষ ধরবেন না, হালের ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’ নরেন্দ্র মোদী মহাশয় তো আপনার ‘বাপ’ই ! আপনিই বলেছেন, খেয়াল নেই ? কানহাইয়া কুমারকে (যদিও, পুরো দেশেরই ‘বাপ’ বানিয়ে দিয়েছিলেন । যাই হোক আপনিও তো এই দেশেরই সদস্য) । তবে আর নয় । আপনাতে আসা যাক ।

আচ্ছা আপনি আসেন ? রিপাবলিক টিভির স্টুডিওতে ? নাকি সেখানেই মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে রাতটা কাটিয়ে নেন ? আচ্ছা রিহার্সাল চলে কখন ? থাক, সে না হয় নাই বললেন । 

কিন্তু মোল্লা খেদানোর অনুপ্রেরণা কোথা থেকে, কার বা কাদের কাছ থেকে পেলেন বলতেই হবে ? আচ্ছা ১৯৯২-এর ৬ই ডিসেম্বর আপনি কোথায় ছিলেন ? কি করছিলেন ? সেদিনকি ভেবেছিলেন আপনিও একদিন বানরসেনা হবেন ? ‘মন্দির ওহি বনেগা মৌলানা’র শ্লোক সকালসন্ধ্যে জপ করবেন ? ‘বুক ঠুকে’ বলবেন, ‘মন্দির ভি বনেগা, স্মারক ভি বনেগা, মূর্তি ভি বনেগা, চবুতরা ভি বনেগা, রাম কথা গ্যালরি ভি বনেগা, অডিটোরিয়াম ভি বনেগা’ ? তবে আমার একটা অভিযোগ আছে । আপনি আপনার ‘আসল চেহারা’ বেশিরভাগ সময় চেপে রাখেন কেন ? পারতপক্ষে সেটি প্রশংসারই যোগ্য । প্রথমে ভদ্রলোক সেজে কড়াই পাতো, ফের তেল গরম হতেই পকোড়া ছাড়ো (প্রধান সেবকের ফেভারিট) । মানছি, রবীশ কুমারের সামনে ‘আসল চেহারা’ দেখালে আপনার পদ্মছাপ দোদমা ‘ফাইট্যা হাতে চইলা আমু’ । কিন্তু বাকিরা ? সুধীর, অজয়, অর্ণব, অঞ্জনাদের শোতেও আপনি মাঝে মাঝে এত ভদ্র হয়ে যান, যা দেখে, একমাত্র তখনই অটলবিহারী বাজপেয়ীর খেয়াল আসে । তবে ‘মৌলানা’র একবার আঁচ পেয়ে গেলে ভদ্রতার ভাঁওতাটি ছেড়ে আপনি কাদা ছেটাতে যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন, সাফাইকর্মীরাও নর্দমায় সেভাবে ঝাঁপ দিতে পারবে না (প্রধান সেবক পারবেন বোধ হয় । আইটি সেলের ফটোশপ ডিপার্টমেন্টের কাছে তো সে দু’মিনিটের খেল) । আচ্ছা, আপনি এযাবৎ কতজনকে ‘মৌলানা’ বানিয়েছেন (পীর দরবেশের দরের লোক হে আপনি) ? আর আপনার ট্র্যাভেল এজেন্সি কতজনের এযাবৎ পাকিস্তানের টিকিট কনফার্ম করেছে ? আর মৌখিক ধর্মান্তরের কারবারই বা কতদূর ? সত্যিই, ফিরোজ গান্ধীকে পার্সি থেকে যেভাবে মুসলিম বানিয়েছিলেন, তার স্বীকৃতিতে একটা হাততালি তো অবশ্যই পাওয়া উচিৎ আপনার (মোহন ভাগবত বা যোগী আদিত্যনাথ খানিক রুষ্ট হলেও হতে পারেন) । 

আর ২০০২-এ কোথায় ছিলেন বলুন ? শুনছি নাকি ২০০২-এর গুজরাট শান্তি সম্মেলনের জন্য আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবছর শান্তিতে নোবেল পাচ্ছেন ? শুধু শান্তিতেই নয় অর্থনীতিতেও পাচ্ছেন ? একই বছরে জোড়া নোবেলের বিশ্ব রেকর্ড ! কি বলেন ? আমি তো আশা করেছিলাম ‘বাল নরেন্দ্র’-এর জন্য সাহিত্যেও না হয় দাওটা মারবেন... দেখছেন তো, আবার সেই প্রধানমন্ত্রীতে চলে এলাম । অবসেশন বুঝলেন, অবসেশন । আপনার যেমন, অমূলক উটকো তর্ক করতে অবসেশন । পেরে উঠতে না পারলে, ‘চুপ হো যা মৌলানা, চুপ হো যা’ বলে চেঁচাতে অবসেশন । যাকে খুশি তাকে দেশদ্রোহী, পাকিস্তানের চর, মোল্লা তকমা দিতে অবসেশন । চাটতে অবসেশন । চোখ পিটপিট করতে করতে ভিতরে ভিতরে ‘মোদীজি খুশ হোনগে, মোদীজি খুশ হোনগে’ ভাবতে ভাবতে ভারত মাতার সেবায় নিজেকে উজার করে দেওয়ার যে রোমাঞ্চ এবং গর্ব আপনি দিনরাত অনুভব করে আসছেন, সে নিয়ে একটা বই লিখে ফেলুন না মশাই । আরও একটি মা আছে, তাই না ? তাঁর বিষ্ঠা নাকি কোহিনূরের চেয়েও দামি ? তাঁর প্রস্রাব কি তবে পেট্রোলিয়ামের চেয়েও মূল্যবান ? দেখছি আপনাকে ঘুঁটের মুকুট পড়াতে হবে মশাই । রাগ করবেন না । বদনাম করছি কই ? আপনাকে ঘুঁটের মুকুটে (আর আরএসএসের চাড্ডিতে) দেখে ইংল্যান্ডের রানীও সমীহ করবে, দেখবেন ।

আর কি বলি ? আপনার নামের মানে জানেন ? বাংলা অভিধানে সম্বিৎ বলে একটি শব্দ আছে, যার অর্থ যেটি আপনি আপনার নামকরনের সময়েই হারিয়েছিলেন, আর ফিরে পাননি । আদৌ কোনোদিন পাবেন কি না জানি না । সরকার পাল্টালে যদি... 

আর কিছু মনে পড়ছে না । তবে একটা ছড়া শোনাতে খুব ইচ্ছে করছে । ছড়াটা হচ্ছে আবু মুহাম্মদ মুসলিহ আল দীন বিন আবদাল্লাহ শিরাজি বলে একজন কবির লেখা । না না, নাম দেখেই পাকিস্তান বা বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবেন না, যেমনটি দানিশ আলিকে পাঠিয়েছিলেন । আপনার দেশেও অনেক মুহাম্মদ আছে, সরকারে বা পার্টিতে থাকলো না তো কি হল (আরএসএসে পর্যন্ত আছে) । যদিও ইনি পারস্যের লোক ছিলেন । আর বাংলায় যিনি ছড়াটিকে বিখ্যাত করেছিলেন তিনি হলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত । আর বলে রাখি, ছড়াটি কিন্তু আপনার জন্য মোটেই নয় । আপনাকে দেওয়া হচ্ছে, এবার থেকে যাদের সাথে প্রাইমটাইমে ডিবেটে নামবেন তাদেরকে ছড়াটা ধরিয়ে দেবেন আর অনুরোধ করবেন, আপনি আপনার ‘আসলি চেহারা’য় চলে এলে তারা যেন ছড়াটা জোরে জোরে আওড়ায় । দেখবেন আপনার জনম শুধরে যাবে । ছড়াটি হল – 
কুকুর আসিয়া এমন কামড়
দিল পথিকের পায়
কামড়ের চোটে বিষদাঁত ফুটে
বিষ লেগে গেল তাই।
ঘরে ফিরে এসে রাত্রে বেচারা
বিষম ব্যথায় জাগে,
মেয়েটি তাহার তারি সাথে হায়
জাগে শিয়রের আগে।
বাপেরে সে বলে র্ভৎসনা ছলে
কপালে রাখিয়া হাত,
তুমি কেন বাবা, ছেড়ে দিলে তারে
তোমার কি নাই দাতঁ?
কষ্টে হাসিয়া আর্ত কহিল
“তুই রে হাসালি মোরে,
দাঁত আছে বলে কুকুরের পায়ে
দংশি কেমন করে?”
কুকুরের কাজ কুকুর করেছে
কামড় দিয়েছে পায়,
তা বলে কুকুরে কামড়ানো কিরে
মানুষের শোভা পায় ?

জয় শ্রী রাম

পুনশ্চ : ভুত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি গান রাম লক্ষ্মণ সাথে আছে করবে বল কি ?

Friday, 24 August 2018

ঝুলনের জন্য ৪

অঙ্ক বললেই...

Amusement is one of the fields of applied mathematics.
- উইলিয়াম হোয়াইট*
রিক্রিয়েশনাল ম্যাথ (Recreational Math) বা বিনোদনমূলক গণিত সম্পর্কে কি কোনো ধারণা আছে ? অবশ্যই থাকা উচিৎ । বলতে গেলে সকলেরই আছে । এমনকি যারা অঙ্কের ধারেকাছে ঘেঁষতে ভয় পায়, তারাও হয়তো কখনো কখনো অজান্তেই এই জিনিসটি উপভোগ করেছে । আনন্দও পেয়েছে । ব্যাপারটা হল, চাঁদে রকেট ছোড়া কিংবা অলিম্পিয়াড কম্পিটিশনের জন্য কঠিন কঠিন প্রবলেম তৈরি করাই কেবল অঙ্কের কাজ নয় । সাহিত্যের মতো নিপাট আনন্দ দিতেও অঙ্ক রীতিমতো বদ্ধপরিকর । সাধারণের কাছে রিক্রিয়েশনাল ম্যাথ বলতে মূলত অঙ্কের ম্যাজিক, মজার খেলা বা চটজলদি যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ এইসবই বোঝায় । কিন্তু রিক্রিয়েশনাল ম্যাথের পরিধি আরও বড় । এই যেমন, কাটা-কম্পাস-স্কেল ব্যবহার না করে এক টুকরো কাগজকে ভাঁজ করে সামন্তরিক বা রম্বস বানানো, রুবিক্স কিউবের কত ধরণের কম্বিনেশন হতে পারে খুঁজে বের করা, দাবা বা ওথেলোর কয়টি আলাদা আলাদা সম্ভাব্য ফলাফল হতে পারে দেখা, ক্যালেন্ডার না দেখে বার বের করা, আর তার সাথে তো আছেই - অসংখ্য অসংখ্য সংখ্যার অসংখ্য অসংখ্য মজার মজার বৈশিষ্ট্য - কোন সংখ্যাকে 123456789 দিয়ে গুণ করলে সংখ্যাটি উল্টে যায়, কোন সংখ্যার অঙ্কগুলির সমষ্টি সেই সংখ্যাটা নিজেই, কোন সংখ্যাগুলি দিয়ে ত্রিভুজ তৈরি করা যাবে তো কোনগুলি দিয়ে 100-ভুজ ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছুই রিক্রিয়েশনাল ম্যাথের অঙ্গ । বোঝাই যাচ্ছে এর বেশিরভাগ বিষয়বস্তুই সংখ্যাতত্ত্ব (Number theory) থেকে ধার করা এবং কিছু কিছু জিনিস সাধারণস্তরের বীজগণিত, পাটিগণিত আর ইউক্লিডের জ্যামিতির দৌলতে প্রাপ্ত, তবুও মজাতে একটুকুও একঘেয়েমি নেই এখানে । বলতে গেলে, এটাই একমাত্র অঙ্কের জায়গা যেখানে, অঙ্ক 'করতে' হয় কম, দেখতে বুঝতে এবং আনন্দ পেতে হয় বেশি । এছাড়াও এর এক্তিয়ারের মধ্যে আছে ম্যাথামেটিক্যাল পাজল বা ধাঁধা । ধাঁধা বলতে আবার – দাদা দেয় একবার, বৌদি দেয় বারবার – এই ধরণের দাদাগিরিসুলভ গুগলি ভেবে বসার কোনো কারণ নেই । সিরিয়াস কিছু ম্যাথামেটিক্যাল পাজল আছে যেগুলো এখনও কেও সলভ্‌ড করে উঠতে পারেননি । তবে ভবিষ্যতে কেও না কেও অবশ্যই পারবে । বলা যায় না, যে এই লেখাটি পড়ছে সেই হয়তো কোনো একদিন ম্যাজিক স্কোয়ার সলভ বা গোল্ডবাচ কনজেকচার প্রমাণ করে দেবে । একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে রাখি, রিক্রিয়েশনাল ম্যাথকে - স্কুল-কলেজের সিলেবাসের বিরক্তিকর কঠিন এবং বোরিং অঙ্কের থেকে একেবারেই আলাদা - এরকম বলে প্রচার করা হয় ঠিকই ; এমনকি 'সিরিয়াস' ম্যাথ করেন বলে যারা গর্ব করেন, তারা রিক্রিয়েশনাল ম্যাথকে বিশেষ পাত্তা দিতে না চাইলেও, অঙ্কের যেখানেই মজা লোটার জায়গা পাওয়া যাবে রিক্রিয়েশনাল ম্যাথ ঝাঁপিয়ে পড়বে । ইলিপ্টিক কার্ভ বোঝা যাক বা না যাক, ফার্মার শেষ উপপাদ্য উপভোগ করতে দোষ কোথায় ? পল এর্ডশের মতো বড়ো ম্যাথামেটিশিয়ান বলে রেখেছেন, কোলাজ কনজেকচার প্রমাণ করার জন্য অঙ্ক এখনও পর্যন্ত রেডি হয়ে ওঠেনি । কিন্তু কোলাজ কনজেকচার কেবলমাত্র যোগ-ভাগ জানা লোকও সহজেই বুঝে যাবে । রিক্রিয়েশনাল ম্যাথের চর্চা যত এগিয়ে গেছে, সিরিয়াস ম্যাথের অনেক বিষয়বস্তুই রিক্রিয়েশনের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে । তাই কোনটা বিনোদন আর কোনটা সিরিয়াস অঙ্কের সমস্যা তার পার্থক্য খুঁজে বের করা সত্যিই কঠিন, এবং অবশ্যই বোকামো । মার্টিন গার্ডনার, স্যাম লয়েড, হেনরি ডুডনি এবং আজকালকার অ্যালেক্স বেলো, ম্যাট পার্কারদের সৌজন্যে রিক্রিয়েশনাল ম্যাথ কেবলমাত্র অঙ্কপ্রিয় পাগলদের কাছেই নয়, অঙ্কভীতু বেচারাদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে - সিরিয়াস অঙ্কের মাঠে খেলতে নামার আগে নেট প্র্যাকটিস হিসেবে যা খুবই কার্যকরী ।

ভালোই ভূমিকা হল । এবার আসল বক্তব্যে আসি । এই রিক্রিয়েশনাল ম্যাথের খেলোয়াড় খালি স্বাভাবিক সংখ্যা বা ধনাত্মক পূর্ণ সংখ্যা । শূন্যকেও দলে নেওয়া হয়েছে । এর বাইরে অন্য ধরণের সংখ্যারা এখানে বিশেষ পাত্তা করতে পারে না । জটিল সংখ্যা, মূলদ-অমূলদ, অন্য কোথাও যতই দাদাগিরি দেখাক, এখানে সবাই চুপটি করে বসে থাকে (মাঝেসাঝে ডাক পড়লে হাজির হয় বইকি) – এমনকি স্বাভাবিক সংখ্যার ভাইরাভাই, হাতে একটা করে ‘-’ ধরে থাকা ঋণাত্মক সংখ্যাও এখানে দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক ।

এবার কিছু একটা বিষয় নিয়ে শুরু করা যেতেই পারে । সব বিষয় এক ঝোলায় ভরা সম্ভব নয় (যদি সম্ভবও হতো, তবে অসীম একটা ঝোলার দরকার পড়তো এবং অবশ্যই অসীম সময়েরও) । সব থেকে ভালো হবে নিধিরাম সর্দার দিয়ে শুরু করা যাক - 
সংখ্যাটি হল 3435 । তিন হাজার তিনশো পঁয়ত্রিশ । কি আছে এমন সংখ্যাটিতে ? সংখ্যাটির শেষে 5 আছে, মানে 5 দিয়ে ভাগ যাবে । মানে মৌলিক সংখ্যা নয় । সংখ্যাটির আরও হাজার ধরণের ‘স্পেশালিটি’ উল্লেখ করাই যায়, কিন্তু তাতে আগ্রহ কমবে বই বাড়বে না । যেমন, যদি বলি – একটিমাত্র আইডেমপোটেন্ট এলিমেন্ট আছে এরকম ছয় অর্ডারের কমিউটেটিভ সেমি-গ্রুপের সংখ্যা হচ্ছে 3435, বা ষড়ভুজাকার স্পাইরালের 34-তম সংখ্যাটি হচ্ছে 3435 ! প্রথম উদাহরণের সমস্ত কথাই মাথার উপর দিয়ে গেল, দ্বিতীয়টির শব্দগুলোর আলাদা আলাদা মানে জানা থাকলেও মোটের ওপর কিছুই বোঝা গেল না । আর সেটাই এতক্ষণ ধরে বোঝাতে চাইছি – রিক্রিয়েশনাল ম্যাথ, না হায়ার ম্যাথামেটিক্স, না জ্যামিতি, না বীজগণিত কিছুরই ধার ধরে না । যে জিনিসটি বোঝা যাবে না সে জিনিসটি রিক্রিয়েশনাল ম্যাথের বিষয়ও হবে না । তাই চিন্তা নেই, এরকম অঙ্কভূতের গল্প শুনিয়ে মোটেই ভয় দেখাবো না । তাহলে মজাদার কিছু আছে কি 3435 কে নিয়ে ? অবশ্যই আছে । তবে তার আগে অন্য কিছু হোক ।

মৌলিক সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা আছে নিশ্চয়ই ? এবার একটা স্পেশাল মৌলিক সংখ্যার কথা বলি । থুড়ি, একটা না – জোড়া বা যমজ । হ্যাঁ, যমজ মৌলিক সংখ্যা বলেই ডাকা হয় তাদের – twin primes । যেমন – 5 ও 7 কিংবা 11 ও 13 । দুটো পরপর মৌলিক সংখ্যা । তাই যমজ মৌলিক । আচ্ছা, পরপর কই, দুইয়ের পার্থক্য আছে তো । 1 পার্থক্য হলে, তবে না হয় পরপর বলতাম । ঠিকই । কিন্তু দুর্ভাগ্য ! হবে কি করে । যে কোনো মৌলিক সংখ্যার (2 একমাত্র ব্যতিক্রম) এপাশে-ওপাশে দুপাশেই জোড় সংখ্যা । যেমন, 19 এর আগে 18, পরে 20 । তার কারণও আছে । 2 বাদে সমস্ত মৌলিক সংখ্যাই বিজোড় । আর আমরা জানি বিজোড়ের আগে জোড় আবার পরেও জোড় (ভাইস-ভার্সা) । আর জোড় সংখ্যা তো মৌলিক হতে পারে না (কারণ তারা সবসমই 2 দিয়ে ভাগ যাবে), তাই পরপর না ধরে মৌলিক সংখ্যাগুলোর ক্ষেত্রে দুইয়ের পার্থক্যকে 'পরপর' বলে ধরে নেওয়া হয় । তবে একটিমাত্র ক্ষেত্রেই আসল 'পরপর' মৌলিক সংখ্যা পাওয়া যায় । হ্যাঁ ঠিক, 2 ও 3 । এরাই একমাত্র জোড়া মৌলিক সংখ্যা, যাদের পার্থক্য 1 । যাই হোক, এখন এটা ভেবে বসা ভুল হবে যে সব মৌলিক সংখ্যারই একটা করে যমজ ভাই বা বোন থাকবে । মাথা খারাপ । ভাই বা বোন থাকলেই অনেকের নাভিশ্বাস উঠে যায়, তার ওপর যমজ ! যেমন – দুই অঙ্কের সবচেয়ে বড় মৌলিক সংখ্যা 97 কে ধরা যাক, এর পরের মৌলিক সংখ্যা 101 – 4 ঘর দূরে । আর আগেরটা, 89 সে আরও দূরে, 8 ঘর । তো 97-এর কোনো যমজ ভাইবোন নেই ।

এই যমজ মৌলিক সংখ্যা সম্পর্কে দুটো কথা বলি । সংখ্যা যত বাড়তে বাড়তে গেছে যমজ মৌলিক সংখ্যাজোড়ার ঘনত্ব তত কমতে কমতে গেছে । শুরুতে কতই না জোড়ায়-জোড়ায় ভাই বোন । 3 ও 5, 5 ও 7, 11 ও 13, 17 ও 19 । কিন্তু সংখ্যা যত বড়ো হতে থেকেছে তত যমজ মৌলিকের সংখ্যা কমতে থেকেছে । 1 থেকে 1000-এর মধ্যে 35 জোড়া যমজ মৌলিক সংখ্যা থাকলেও, সেই তুলনায় 1 থেকে 10000-এর মধ্যে বেশ কম যমজই আছে - 205 টি । একটু আলাদা ধরণের উদাহরণ দেওয়া যাক । একটু সামলে, কেমন !

2006 সালে মাইকেল কক নামে একজন ম্যাথামেটিশিয়ান Twin Prime Search নামে (সংক্ষেপে TPS) একটি কম্পিউটার নির্ভর প্রোজেক্ট চালু করেন । ভদ্রলোকেদের ভাষায় সেটিকে ডিস্ট্রিবিউটেড কম্পিউটিং প্রোজেক্ট বলা হয়ে থাকে । বড়ো বড়ো যমজ মৌলিক সংখ্যা খুঁজে বের করাই এই প্রোজেক্টের একমাত্র কাজ । TPS-এর প্রথম সাফল্য আসে 2007 সালের 15ই জানুয়ারি । এরিক ভচিয়ের নামে কেও একজন কম্পিউটার এক্সপার্ট 58711 অঙ্ক লম্বা দুটি যমজ মৌলিক সংখ্যা খুঁজে বের করেন । গোটা সংখ্যাটি লেখা অসম্ভব । সূচকের সৌজন্যে সংখ্যাদুটির ভদ্র-সভ্য রূপটি হচ্ছে  । দুই বছর পর TPS-এর দল তার চেয়েও বড়ো দুটি যমজ জোড়া খুঁজে পায় । সেটি হল  এবং এটির অঙ্কের সংখ্যা দাঁড়ায় 100355 । আগেরটি থেকে এটি কত বড়, তা সহজেই আন্দাজ করা যায় । (পরবর্তীকালে এই দুই জোড়া যমজের মাঝে আরও 4 জোড়া যমজের খোঁজ পাওয়া গেছে । দেখতে গেলে, তবুও এরা যথেষ্ট দূরে দূরে ছড়িয়ে আছে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই) । এই আজকের তারিখ পর্যন্ত সবচেয়ে বড়ো আবিষ্কৃত যমজ জোড়াটি হচ্ছে  । এটির অঙ্কের সংখ্যা মাত্র 388342 । বিশ্রাম না নিয়ে প্রতি সেকেন্ডে যদি একটি করে অঙ্ক টানা লিখতে লিখতে যায় তবে পুরো সংখ্যাটি লিখতে কম করে 4 দিন 11 ঘন্টা 52 মিনিট 22 সেকেন্ড সময় লাগবে । ভুলে গেলে চলবে না, এখানে যমজ মৌলিকের আলোচনা হচ্ছে । তাই আরও 4 দিন 11 ঘন্টা 52 মিনিট 22 সেকেন্ড লাগবে দ্বিতীয় মৌলিক সংখ্যাটি লিখতে ।

যমজ মৌলিকের ঘনত্বের ঘাটা দেখে অনেকের ধারণা হল যে, একসময় এই যমজ জোড়া শেষ হয়ে যাবে । মৌলিক সংখ্যার কমতি দেখেও হয়তো অনেকের একই জিনিস মনে হয়েছিল । কিন্তু সন্দেহ দানা বাধার আগেই ইউক্লিড প্রমাণ করে দিয়েছিলেন - মৌলিক সংখ্যা অসংখ্য । ইউক্লিড মহাশয় যমজ মৌলিক সংখ্যার ব্যাপারেও ওয়াকিবহাল ছিলেন এবং স্বাভাবিকভাবে তাঁর মনেও প্রশ্ন জেগেছিল - যমজ মৌলিক জোড়ার সংখ্যাও কি অসংখ্য ? দুর্ভাগ্যক্রমে এর কিন্তু তিনি কোনো প্রমাণ দিয়ে যেতে পারেননি । অথচ চাইলেই নতুন নতুন যমজ জোড়া খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, তাই ভেবেচিন্তে ঘোষণা করে দিলেন - হ্যাঁ, যমজ মৌলিক সংখ্যা জোড়াও অসংখ্য । অঙ্কের কোনো বিশেষ পর্যবেক্ষণের যদি প্রমাণ না পাওয়া যায় (তার সাথে সাথে ভুলও প্রমাণ না করা যায়) তবে সেগুলোকে কনজেকচার (conjecture) ঘোষণা করে দেওয়া হয় (বাংলায় বলা হয় অনুমান, কিন্তু এখানে আমরা কনজেকচারই বলবো) ।  বিজ্ঞানে যেটিকে আমরা প্রকল্প (hypothesis) বলে থাকি, অঙ্কে সেটিই হচ্ছে কনজেকচার । এই যেমন ইউক্লিড ঘোষণা করে দিলেন Twin Prime Conjecture । যতদিন না প্রমাণিত হচ্ছে ততদিন সেটিকে কনজেকচারই বলা হবে । প্রমাণিত হয়ে গেলে হয়ে যাবে সূত্র বা উপপাদ্য । আর ভুল প্রমাণ হয়ে গেলে মিলবে লবডঙ্কা ! এইসমস্ত কাণ্ডকারখানা খ্রিস্টের জন্মের 200-300 বছর আগের ঘটনা । দু'হাজারের বেশি বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো ম্যাথামেটিশিয়ানই এখনও পর্যন্ত টোয়াইন প্রাইম কনজেকচারের প্রমাণ দিতে পারেননি, ভুল প্রমাণ করতেও পারেননি ।

তাহলে রিক্রিয়েশনাল ম্যাথ সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট হচ্ছে ? এবার তাহলে 3435-এর গল্পে আসা যাক । আচ্ছা, কোনো সংখ্যার প্রত্যেকটি অঙ্কের ঘাতে (বা পাওয়ারে) সেই অঙ্কগুলি চাপিয়েই তাদের যোগফল বের করলে কি পাব ? উদাহরণ দেওয়া যাক । 123 সংখ্যাটি নেওয়া হল । 1 এর ঘাতে 1 চাপালে হয় , একইভাবে 2 এর ঘাতে 2 এবং 3 এর ঘাতে 3 চাপালে হয় যথাক্রমে  এবং  । এখন তাদের যোগফল নিলে পাব -  = । মজার তো কিছু হল না ! মজার জিনিস হবে যখন 123 এর বদলে 3435 সংখ্যাটি নেওয়া হবে । তখন একইভাবে 3 এর ঘাতে 3, 4 এর ঘাতে 4, ফের 3 এর ঘাতে 3, শেষে 5 এর ঘাতে 5 চাপিয়ে তাদের যোগ নিলে পাব  = , অর্থাৎ সেই সংখ্যাটা নিজেই ! আজব না ? এই ধরণের সংখ্যার একটা নাম দেওয়া হয়েছে – পারফেক্ট ডিজিট টু ডিজিট ইনভ্যারিয়েন্ট (Perfect Digit to Digit Invariant) বা শর্টে পিডিডিই বা PDDE । যদিও এটা একটা টেকনিক্যাল নাম । 2009 সালে নেদারল্যান্ডের একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ডান ভান বার্কেল, প্রথম এটি লক্ষ্য করেন । তিনি কিন্তু 3435 এর নাম রাখলেন মুঞ্চাওজেন নম্বর । ভেঙে ভেঙে বললে হয় মুন-চাও-জেন (Munchausen Numbers) । এই ‘মুনচাওজেন’ জিনিসটা কি, খায় না মাথায় দেয় ? কোনোটিই নয় । মুনচাওজেন একজন লোকের নাম । তিনি একজন আধা কাল্পনিক আধা বাস্তব আধা মধ্যযুগীয় চরিত্র । নাম ব্যারন মুনচাওজেনের । ‘ব্যারন’ – ইউরোপের এক সম্মানীয় পদ বা উপাধি, আমাদের দেশে যেমন রায়বাহাদুর ইত্যাদি । কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীর সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের সাথে মধ্যযুগীয় ব্যারনের কি সম্পর্ক যে তার নামে নাম রাখতে যাবেন ! তার কারণ জানার আগে একটি সিনেমার কথা বলি ।

সিনেমাটির নাম হচ্ছে দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ ব্যারন মুনচাওজেন ।  1988 সালের সিনেমা । ফ্যান্টাসি । ওই ডন কুইক্‌জোট (অনেকে বলে কিহোতে) বা আমাদের নিধিরাম সর্দার টাইপ ক্যারেকটার । মুখে বড় বড় কথা – এই করেছি সেই করেছি । কিন্তু কারোরই পাত্তা পান না । সকলের কাছে তিনি একজন মামুলি পাগল কিংবা মাতাল । কিন্তু কেও যদি মনোযোগ দিয়ে একবার তার আষাঢ়ে গল্প শুনতে শুরু করে তাহলে বাচ্চারা তো দূরে থাক বুড়োধারিরাও সম্মোহিতের মতো তার কথা বিশ্বাস না করে পারে না । যাই হোক সিনেমার গল্প বলতে বসবো না । তবে এই দৃশ্যটির কথা না বললেই নয় । মোদ্দা কথা ব্যারন মুনচাওজেন অ্যাডভেঞ্চার করে বেরান । এরকমই কোনো এক সময় শত্রুপক্ষের আক্রমণ থেকে বাঁচতে পুরো ঘোড়া সমেত সমুদ্রে ঝাঁপ দেন তিনি । কিন্তু ডুবে যাওয়া তো দূরের কথা, দেখতে পাই আস্ত ঘোড়া সমেত ব্যারন মুনচাওজেন সমুদ্রের ওপর ভেসে উঠেছেন । কি করে ? ব্যারনের একটা লম্বা ঝুঁটি আছে । ব্যারন নিজের ঝুঁটি নিজেই খামচে ধরে নিজেকে জলের নিচ থেকে তুলে আনেন এবং ঝুঁটি ধরে নিজেকে জলের ওপর ভাসিয়েও রাখেন । আষাঢ়ে গল্প বলছিলাম না ! ব্যারন মুনচাওজেনের এই ব্যাপারটা ওই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের মনে ধরে । 3435 এর ক্ষেত্রে প্রত্যেকটা অঙ্ক যেন নিজেদের ঝুঁটি ধরে নিজেদেরকেই তুলে দিয়েছে নিজেদের উপর । এবং তা সত্বেও অপরিবর্তিত রয়েছে – সুরক্ষিত রয়েছে । সে থেকেই মুনচাওজেন নম্বর । বলে রাখি ব্যারন মুনচাওজেনের আসল স্রষ্টা হলেন একজন জার্মান লেখক (বৈজ্ঞানিকও) রুডলফ এরিক রাস্‌প্‌ । অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি তুরস্ক-রাশিয়ার যুদ্ধে এরোনিমাস কার্ল ফ্রেডরিক ফ্রেইহর ভন মুনচাওজেন নামে একজন সত্যিকারের জার্মান ব্যারন রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে যোগ দেন । যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরে লোকজনদের যুদ্ধক্ষেত্রের আষাঢ়ে গল্প বানিয়ে বানিয়ে শোনাতে থাকেন এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন । আর কি, তাকে নিয়েই এরিক রাস্‌প্‌ বই লিখে ফেলেন 'Baron Munchausen's Narrative of his Marvellous Travels and Campaigns in Russia' । সেই থেকেই সিনেমা । সেই থেকেই নম্বর ।

আরেকটি মুনচাওজেন নম্বর আছে । সেটা হল 1 । কারণ 1 এর ওপর 1 চাপলে 1 ই থাকে । আরও কি আছে ? খুঁজতে যাস না । আর একটিও নেই । অবশ্য মুনচাওজেন নম্বর যে হাতে গোনা সীমিত সংখ্যকই আছে, তা ম্যাথামেটিক্যালি প্রমাণিত । তাই বলে মাত্র দুটি ?

অস্ট্রেলিয়ান স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান (লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এবং প্রাক্তন অঙ্কের শিক্ষক) ম্যাথিউ পার্কার এক অস্বস্তিকর কাজ করে বসলেন । তিনি 438579088 সংখ্যাটিকেও মুনচাওজেন নম্বর ঘোষণা করে দিলেন । প্রশ্ন উঠবে, তিনি ঘোষণা করার কে ? মুনচাওজেনের কেরামতি দেখালে মুনচাওজেন নম্বর হবে, নইলে নয় । তবুও এখানে একটি ছোট্ট সমস্যা থাকছে । লক্ষ্য করলে দেখতে পাব, সংখ্যাটির শতকের ঘরে 0 বসে আছে । 0 এর ঘাতে 0 চাপলে কি হয় আমাদের জানা নেই । অসংজ্ঞাত । 0 বাদে যেকোনো সংখ্যার ঘাতে 0 চাপলে 1 হয় জানি কিন্তু  কখনই হয় না । ম্যাথিউ পার্কার  ধরে নিয়ে দেখিয়ে দিলেন  ।

এবার  হবে, কি হবে না, সে নিয়ে তর্ক চলতে পারে । যদি ধরে নিই সত্যি, তাহলে শেষপর্যন্ত কটি মুনচাওজেন সংখ্যা পাচ্ছি ? তিনটি ? ভুল । আসল কথা তো বলতেই ভুলে গেছি, সিরিয়াস ম্যাথ হোক কিংবা রিক্রিয়েশনাল, উভয়ক্ষেত্রেই চোখ-কান খুলে রাখাটা খুবই জরুরি । 438579088 কিন্তু এখানে একা আসেনি সঙ্গে তার যমজ বোনকেও নিয়ে এসেছে । শূন্য ।  হলে 0 নিজেই একটি মুনচাওজেন নম্বর হয়ে যাচ্ছে । তাই না ?

*A Scrap-Book of Elementary Mathematics বইয়ের লেখক 

Wednesday, 22 August 2018

ঝুলনের জন্য ৩

১৭২৯

Wherever there is number, there is beauty.’

- গ্রীক দার্শনিক প্রোক্লুস*

সালটা 1918 । এক মাস হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে । ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজের অধ্যাপক গডফ্রে হার্ডি ট্যাক্সির অপেক্ষায় আছেন । তাঁর গন্তব্য লন্ডন । ঠিক লন্ডন নয়, লন্ডনের দক্ষিণ-পশ্চিমের ছোট্ট একটি শহর পুটনি । ইন্ট্রোভার্ট, অসামাজিক এবং অকৃতদার হার্ডি কেবলমাত্র দুটো জিনিসেই জীবনকে উৎসর্গ করেছেন - এক ক্রিকেট, দুই অঙ্ক । এর বাইরে অন্য কিছুতে মনোযোগ দেওয়ার সময় এবং ইচ্ছে কোনোটিই তাঁর নেই । তাঁর বন্ধুর সংখ্যাও হাতে গোনা তিন থেকে চারজন । তাদেরই একজন বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ হয়ে পুটনির এক বেসরকারি নার্সিং হোমে ভর্তি আছেন । তাকে দেখতে যাওয়ার জন্যই ট্যাক্সির অপেক্ষা । যদিও হার্ডি এই ধরণের লৌকিকতা থেকে সচরাচর নিজেকে বিরতই রাখেন, কিন্তু এই বন্ধুটির ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অন্যরকম ।

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একটা ট্যাক্সি পাওয়া গেল । ট্যাক্সিতে চাপার আগে হার্ডি চট করে ট্যাক্সির নম্বরটা দেখে নিলেন । 1729 । নম্বরটা তাঁর বিশেষ পছন্দ হল না । সংখ্যার প্রতি অঙ্কের লোকেদের একটা স্বাভাবিক টান বা সংস্কার থাকে (ইংরেজিতে যাকে বলে অবসেশন) । হার্ডিরও ছিল । তাই যেকোনো ধরণের নম্বর দেখা মাত্র তার বিশেষত্ব খোঁজার চেষ্টা করতেন । এখন এই 1729 নম্বরটির কি বিশেষত্ব থাকতে পারে ভাবতে লাগলেন । না, মৌলিক সংখ্যা নয় । এর ঠিক আগের সংখ্যাটি, অর্থাৎ 1728 হচ্ছে 12 এর কিউব । 1729 এর তিনটিমাত্র মৌলিক উৎপাদক আছে - 7, 13 এবং 19 । তাদের সমষ্টি 39...ধ্যাত ! বাজে একটি সংখ্যা । অকারণে, হার্ডি বিরক্ত হয়ে গেলেন । পথে আর 1729 কে নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন মনে করলেন না ।

পুটনির নার্সিং হোমে যে বন্ধুটি ভর্তি আছেন তিনিও অঙ্কের লোক । বাড়ি ভারতবর্ষে । সেখানে অঙ্ক নিয়ে পড়াশোনা কমপ্লিট করার পর টিউশন পড়িয়ে পেট চালাতেন । অবশেষে হার্ডির পৃষ্ঠপোষকতায় কেমব্রিজে আসার সুযোগ পান । ব্যাচেলার ডিগ্রি কমপ্লিট করার পর এখানে থেকেই অঙ্ক নিয়ে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন । কয়েকমাস আগে প্রথম ভারতীয় হিসেবে ট্রিনিটি কলেজের ফেলোশিপ পেয়েছেন । কিন্তু গত একবছর ধরে নানা ধরণের শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন । এই এখন যেমন যক্ষ্মা বাঁধিয়ে বসে আছেন ।

স্বাস্থ্যের খবরাখবর নেওয়ার পর হার্ডি তাঁর বন্ধুকে ট্যাক্সির নম্বরটি জানালেন । বললেন 1729, 'নীরস একটা নম্বর । আশা করি এতে যেন কোনো অশুভ ইঙ্গিত না থাকে ।' সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল, 'না । বরঞ্চ এটি খুবই ইন্টারেস্টিং একটা নম্বর ।' বলতে পারবো না অন্য কেও থাকলে এরকম স্বতঃস্ফূর্ত এবং সাততাড়াতাড়ি উত্তর দিতেন কি না । এমনকি বিরক্ত হয়ে বলতেও পারতেন - আমি এখানে যক্ষ্মায় মরতে চলেছি, আর তুমি বাপু সংখ্যার রস খুঁজে বেরচ্ছো ! কিন্তু অসুস্থ লোকটি আর পাঁচ জন সাধারণ 'অঙ্কের লোক' ছিলেন না । আমেরিকার বিখ্যাত পদার্থবিদ মিচিও কাকু তাঁকে অঙ্ক সহ গোটা বিজ্ঞান জগতের ইতিহাসে সবচেয়ে অদ্ভুত প্রতিভা বলে মনে করেন । হার্ডিরই আরেক বন্ধু এবং সহকর্মী জন লিটিলউডের মতে, 'প্রত্যেক স্বাভাবিক সংখ্যাই তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু' ।  জীবনীকার রবার্ট কানিগেল যাকে একজন 'আর্টিস্ট' এবং সংখ্যাকে যার 'শিল্পের মাধ্যম' বলে পরিচয় দিয়েছেন ('The Man Who Knew Infinity' বইতে) তিনি আর কেও নন, ভারতীয় গণিতের 'পোস্টার বয়' শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার রামানুজন ।

রামানুজন দেখালেন 1729 কে দুটো ভিন্ন উপায়ে দুটি স্বাভাবিক সংখ্যার ঘনফলের (অর্থাৎ কিউবের) সমষ্টি আকারে লেখা যায় । 1 এবং 12 এর কিউবের সমষ্টি (অর্থাৎ 1 + 1728) হল 1729, আবার 9 এবং 10-এর কিউবের সমষ্টিও (অর্থাৎ 729 এবং 1000) 1729 । শুধু তাই নয়, এরকমভাবে লেখা যায় সংখ্যাগুলোর মধ্যে 1729-ই হচ্ছে ক্ষুদ্রতম । 1729-এর চেয়ে ছোটো কোনো সংখ্যাকে দুটো কিউবের সমষ্টি আকারে লেখা তো যাবে, কিন্তু মাত্র একটি উপায়েই - দ্বিতীয় কোনো উপায় খুঁজে পাওয়া যাবে না । সেই দিন থেকে এই 1729 নম্বরটি বিখ্যাত হয়ে রয়েছে রামানুজনের নম্বর হিসেবে । অনেকে আবার হার্ডি-রামানুজনের নম্বরও বলে থাকেন । কোন কোন ক্ষেত্রে ট্যাক্সিক্যাব নম্বরও বলা হয় । যাই হোক, 1729 সংখ্যাটির একটি সরস বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেল ।

হার্ডির দুর্ভাগ্য, তিনি যে সংখ্যাটিকে নিতান্ত 'নীরস', এমনকি 'অশুভ' বলে মনে করলেন, পরবর্তীকালে তারই আরও ডজনখানেক নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য ম্যাথামেটিশিয়ানরা বের করে দিল । পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে নানান অঙ্কের লোকজন - 1729-এর আর কি কি নতুন বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করা যায় - তার কম্পিটিশন শুরু করে দিলেন । অনেকে সফল হলেন । অনেকে আবার আগেই খুঁজে বের করে রেখেছিলেন, জাস্ট দেখিয়ে দিলেন - এই দেখ, এই ধরণের সংখ্যার কথা আমি 300 বছর আগে বলে রেখেছিলাম, 1729 হচ্ছে সেই ধরণের সংখ্যা । কয়েকটির কথা বলা যাক ।

ফরাসি আইনজীবী এবং ম্যাথামেটিশিয়ান পিয়ের দি ফার্মা (অনেকে বলে ফার্মাট্‌) তাঁর এক বন্ধু বার্নার্ড ব্রেসিকে চিঠি মারফৎ একটি নতুন উপপাদ্য উপহার দিলেন । যদি একটি মৌলিক সংখ্যা হয় এবং যেকোনো এর সাথে পরস্পর মৌলিক সংখ্যা হয় তাহলে , দ্বারা বিভাজ্য হবে । যেমন, মৌলিক সংখ্যা 7 এবং 7-এর সাথে মৌলিক একটি সংখ্যা 10 নিলে স্পষ্টই দেখা যাবে অর্থাৎ = 999999 সংখ্যাটি 7 দ্বারা বিভাজ্য হচ্ছে । এই উপপাদ্যটি ফার্মার ছোট্ট উপপাদ্য নামে বিখ্যাত । আচ্ছা, উল্টোটাও কি সত্যি ? যদি দ্বারা বিভাজ্য হয়, তবে কি একটি মৌলিক সংখ্যা হবে ? উত্তর হচ্ছে, না । উদাহরণ হিসেবে হলে, অনেকগুলি সংখ্যা পাওয়া যায় যেক্ষেত্রে , দ্বারা বিভাজ্য হচ্ছে কিন্তু  আদৌ মৌলিক নয় । বেলজিয়ান ম্যাথামেটিশিয়ান পল পুলে 50000000 পর্যন্ত এইধরনের যতগুলি সংখ্যা আছে সবকটি খুঁজে বের করেছিলেন । তাদের মধ্যে ক্ষুদ্রতম সংখ্যাটি হল 341 । কারণ, অর্থাৎ , 341 দ্বারা বিভাজ্য কিন্তু 341 মৌলিক সংখ্যা নয় () । এই ধরণের সংখ্যার নাম দেওয়া হল ছদ্মমৌলিক সংখ্যা (ইংরেজিতে pseudoprime) । কার নামে ? অবশ্যই ফার্মার নামে । যদিও এইসব 1600 শতকের ঘটনা, কিন্তু পরে দেখা গেল 1729 সংখ্যাটিও একটি ফার্মার ছদ্মমৌলিক সংখ্যা হচ্ছে ।

অঙ্কের জগতের আইজ্যাক নিউটন লিওনার্ড অয়লারের নামেও একপ্রকারের ছদ্মমৌলিক সংখ্যা আছে । যে সমস্ত বিজোড় পূর্ণসংখ্যা, (ধরি)  দ্বারা  বিভাজ্য, যেখানে  এবং  পরস্পর মৌলিক, সে সমস্ত বিজোড় পূর্ণসংখ্যাকে অয়লারের ছদ্মমৌলিক সংখ্যা বলে । যেমন 65 একটি ছদ্মমৌলিক সংখ্যা যখন  = 12 । কারণ,  অর্থাৎ , 65 দ্বারা বিভাজ্য । এখানে একটি ব্যাপার লক্ষ্য করার আছে ।  এর একটি বিশেষ মানের জন্য যে সংখ্যাটি ছদ্মমৌলিক হচ্ছে,  এর অন্য মানের জন্য সেটি ছদ্মমৌলিক নাও হতে পারে । যেমন  = 2 এর জন্য 65 ছদ্মমৌলিক নয়, কারণ, -1 বা +1 কোনটিই 65 দিয়ে ভাগ যায় না । ফার্মার ছদ্মমৌলিকের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি প্রযোজ্য । তা স্বত্বেও কিছু কিছু সংখ্যা আছে যারা এই বাঁধা বিপত্তি গ্রাহ্য করে না ।  এর মান যাই হোক না কেন,  দ্বারা,  অবিলম্বে ভাগ চলে যায় । এই বিশেষ ধরণের  গুলির মধ্যে সবচেয়ে ছোটোটি হল 1729 ।

এরপর আমেরিকান ম্যাথামেটিশিয়ান রবার্ট কারমাইকেল মৌলিক সংখ্যা ছেড়ে যৌগিক সংখ্যার ওপর বেশি করে মনোযোগ দিলেন । তিনিও এক ধরণের সংখ্যা খুঁজে বের করলেন । নিজের নামে সংখ্যাগুলির নাম রাখলেন কারমাইকেল সংখ্যা । যে সমস্ত যৌগিক সংখ্যা, (সেই, ধরি)  দ্বারা  বিভাজ্য, যেখানে এবং  পরস্পর মৌলিক সে সমস্ত সংখ্যা হচ্ছে কারমাইকেল সংখ্যা । এখানেও দেখি 1729 ঢুকে বসে আছে । তিন নম্বর কারমাইকেল সংখ্যাটি হচ্ছে 1729 । কারণ, 1729 এর সাথে পরস্পর মৌলিক এরকম সংখ্যাগুলো, অর্থাৎ যেমন 2, 3, 4, 5 ইত্যাদির ঘাতে 1729 চাপিয়ে সেগুলি থেকে যথাক্রমে 2, 3, 4, 5 ইত্যাদি বিয়োগ করে যে সংখ্যাটি পাওয়া যাবে সেটি খোদ 1729 দ্বারা বিভাজ্য ।

খাট বা সোফা জাতীয় কোনো আসবারপত্র ব্যালেন্স করতে আমরা কাঠের কীলক ব্যবহার করে থাকি (কেকের টুকরোর মতো দেখতে, ত্রিভুজাকৃতি ঘনবস্তু) । ইংরেজিতে সেগুলোকে বলে wedge । প্রাচীন গ্রীকে ভাষায় স্পিনিক বলে একটি শব্দ আছে যার মানে এই wedge । এই স্পিনিক কথাটি ব্যবহার করে একধরণের যৌগিক সংখ্যার নামকরন করা হয়েছে । যেসব যৌগিক সংখ্যা তিনটি আলাদা আলাদা মৌলিক সংখ্যার গুণফল তাদের স্পিনিক সংখ্যা বলে । যেমন - 30 (2, 3 ও 5-র গুণফল), 715 (5, 11 ও 13-র গুণফল) ইত্যাদি । আগেই দেখিয়ে দিয়েছি  l তাই 1729-ও একটি স্পিনিক সংখ্যা ।

আরও আছে । জিসল বা জেসল সংখ্যা, হর্ষদ সংখ্যা, 12-ভুজ, 24-ভুজ, 84-ভুজ সংখ্যা ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি সবকটিরই সাধারণ উদাহরণ হচ্ছে 1729 । বোঝাই যাচ্ছে হার্ডির আত্মা এখনও শান্তি পায়নি ! কবে পাবেন ঠিক নেই । কারণ, আরও কত আজব আজব সংখ্যার লিস্টে 1729 জায়গা করে নেবে, তা আগে থেকে কে বলতে পারে (এমনকি অঙ্কের জগত ছাড়িয়ে টিভি সিনেমার জগতেও 1729 পপুলার হয়ে রয়েছে । যেমন জনপ্রিয় আমেরিকার কার্টুন টিভি শো 'ফিউচারামা'র অনেক জায়গাতেই আড়ালে আবডালে 1729-এর উল্লেখ পাওয়া গেছে) ? বলার প্রয়োজনও নেই । কারণ, বিজ্ঞানের রানি অঙ্কের অনিশ্চয়তাই অঙ্কের বিশেষত্ব । 'As far as the laws of mathematics refer to reality, they are not certain; and as far as they are certain, they do not refer to reality.' (আলবার্ট আইনস্টাইন) ।


*প্রোক্লুস না থাকলে বিখ্যাত ‘এলিমেন্টস’ বইটির লেখক যে ইউক্লিড তার ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র পাওয়াই যেত না । প্রোক্লুস তাঁর বই ‘কমেন্টারি অন দ্যা এলিমেন্টস’-এ ইউক্লিডকে ‘এলিমেন্টস’-এর লেখক বলে চিহ্নিত করেছেন ।