Monday, 7 November 2016

ভগবান, তুমি যুগে যুগে দুধ, পাঠায়েছ বারে বারে
পাঠায়েছ জোড়া পাতিলেবু সাথে, ছানা কাটবার তরে
যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো - 
দণ্ড মারিয়া তাদের কি পিছু করিয়া দিয়াছ কালো?

Saturday, 29 October 2016

উত্তর কলকাতার নারুলা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মেয়েদের হোস্টেলের ঘটনা। হোস্টেল মানে বেলা বারোটায় ভোর। তার ওপর আজ আবার রবিবার। তাই কাকভোরে হোস্টেল চত্বর বেশ শুনশান। ঘরে ঘরে ঘুম কামড়ে পড়ে আছে জোড়া-জোড়া মেয়ের দল। দোতলায় কোনোও এক কোনে সুপারিটেন্ডেন্টের রুম। তিনিও ঘুমে আচ্ছন্ন। খালি একটি বাথরুমফেরত মেয়ে ঢুলুঢুলু চোখে ঝিমোতে ঝিমোতে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে চলেছে। হঠাৎ থমথমে পরিবেশটির বারোটা বাজিয়ে লোকাল থানার জিপ এসে দাঁড়াল হোস্টেলের সামনে। ঢুলুঢুলু মেয়েটি অপ্রত্যাশিত চমক পেয়ে এক ব্যাঙলাফে নিজের রুমে ঘাপটি মারল। জিপ থেকে নেমে দাঁড়ালেন কামারহাটি থানার সাব-ইন্সপেক্টর এবং দুই তাগড়াই কনস্টেবল। সাব-ইন্সপেক্টর সাহেব ‘যাস্‌ শালা’ বলে রীতিমতো অবাক হয়ে কিছুক্ষণ
এদিক ওদিক মুণ্ডু হিলিয়ে যখন বুঝলেন, আওয়াজ না দিলে কেও রা করবে না, তখন এক কনস্টেবলকে হুকুম দিলেন – ‘হর্ন মারো।’

হর্নের আওয়াজে ফুটপাতের দুএকটি চিৎপটাং কুত্তা চমকে মাথা তুলে পিটপিট করে চাইতে থাকল। প্রায় সবকটি রুম থেকে একা-আধ এলোকেশী উঁকি দিতে থাকে। সবার চোখে কৌতূহল – পুলিশ কেন? কিছুক্ষনে হোস্টেল সুপারও ব্যাজারমার্কা মুখ নিয়ে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসেন। নিচে পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজেকে যথারীতি সামলে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে নিচে নেমে আসেন।

‘কি কোনও সমস্যা...’, কথা শেষ হতে না হতেই, সাব-ইন্সপেক্টর সাহেব গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি এই হোস্টেলের  সুপারিন্টেনডেন্ট?’ 
- আজ্ঞে হ্যাঁ।
- ম্যাডাম, আপনার হোস্টেলে কি ইন্দিরা মাইতি বলে কোনও মেয়ে থাকে?
- আজ্ঞে হ্যাঁ।
- আমাদের থানায় খবর এসেছে, কাল সন্ধ্যে থেকে মেয়েটি নিখোঁজ। সে ব্যাপারেই আমরা তদন্ত করতে এসেছি।

কিছুক্ষণের জন্য থ মেরে সুপার ম্যাডাম মাথার মধ্যে চটজলদি কয়েকটি জিনিস সাজিয়ে গুছিয়ে নিলেন – ‘মাগী লা-পতা। কোথায় মরল কে জানে! যাই হোক, কাল সন্ধ্যেয় মাসীর বাড়ি যাওয়ার ফিকিরে লিভ রেজিস্টারে সই করেছিল, সে পুলিশ চাইলে দেখতে পারে। মাগীর বাড়ি থেকে বা মাসীর বাড়ি থেকে হোস্টেলে কোনও ফোন আসেনি। এমনকি হোস্টেলের কোন মেয়েও তার লা-পতার ব্যাপারে কোনপ্রকার কাইকুই করেনি, অর্থাৎ পুলিশ জানতে চাইলে নির্দ্বিধায় বলা যায়, ‘না, আমরা এ ব্যাপারে কিছু জানি না।’’ 

‘...তা ম্যাডাম’, সাব-ইন্সপেক্টর সাহেবের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে সুপার ম্যাম মুখ ফস্কে আগেভাগেই বলে ফেললেন

- আমরা এব্যাপারে কিছু জানি না তো
- যা বাব্বা। আমি কিছু জিজ্ঞেস করলাম কই!
- (নিজেকে সামলে নিয়ে) না মানে, ওই মানে, ইন্দিরা তো গতকাল মাসীর বাড়ি যাবে বলে ছুটি নিয়ে বেরিয়ে গেছে  তারপর আমার কাছে সেরকম তো কিছু খবর আসেনি।
- মাসীর বাড়ি কি কলকাতাতেই?
- হ্যাঁ মাসীই তার লোকাল গার্জেন। বাড়ি তো সেই বীরভূম। তা ইনস্পেক্টরবাবু, আপনাকে কে খবর দিল ইন্দিরাকে  খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না?
- একটা পাবলিক বুথ থেকে আজ ছটার সময় ফোন আসে। একজন গম্ভীর গলায় ইন্দিরা মাইতির পরিচয় দিয়ে তার  নিখোঁজের খবরটি দেন। তিনি নিজস্ব পরিচয় কিছু দেননি, কেবল বললেন এই হোস্টেলের পাশেই থাকেন। ভোর  বেলায় দেখলেন নাকি, হোস্টেলে ইন্দিরা মাইতিকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে হুলুস্থুলু পড়ে গেছে, তাই আর কি ফোন করে  দায়িত্ব পালন করলেন।
- আর আপনারা সেই শুনে ছুটে চলে এলেন!
- দেখুন ম্যাডাম, মেয়েটি যদি মাসীর বাড়িতেই থাকে, তাহলে ভালো। হেনস্থা হজম করে চুপচাপ কেটে পড়ব। কিন্তু  যদি সত্যিই নিখোঁজ হয়, এবং পুলিশ তা জেনেও কোনও গাফিলতি না করে, তবে পরে তো সেই আপনারাই বদনাম  রটাবেন। তাই সময় নষ্ট না করে এক্ষুনি ইন্দিরা মাইতির মাসীর বাড়িতে যোগাযোগ করুন।

‘করছি’ বলে সুপার ম্যাম সোজা নিজের রুমে চলে গেলেন। এদিকে এলোকেশীর দল সুলক্ষণা সেজে ছাদের বারান্দায় ভিড় করে দাঁড়িয়েছে। যথারীতি গুনগুন শুরু হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর বিধ্বস্ত বদনে গুটিগুটি পায়ে নেমে এলেন সুপার। এতক্ষন ধরে সমস্ত তামাশাই গোগ্রাসে গিলছিল মেয়ের দল। সুপারের খিচড়ে যাওয়া মুখ দেখে সবাই নড়ে চড়ে বসল – ফষ্টিনষ্টির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে মনে হচ্ছে। ভিতরে উৎফুল্ল, বাইরে বিরস মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একদল মেয়ের নজর এখন খালি চত্বরে খাঁড়া দুটি প্রাণীর দিকে। পারলে দু’একজন হাততালি দিয়ে ওঠে! কিন্তু কেন?

সুপারের থোবড়া দেখেই সাব-ইন্সপেক্টর সাহেবের আর কিছু বুঝতে বাকি থাকল না। তিনি বললেন

- দেখলেন মিসেস...
- মিসেস করন। রীতা করন। 
- ইয়েস, মিসেস করন, আমার কাছে তাহলে পাকা খবরই এসেছে।
- ইন্দিরা মাসীর বাড়ি যায়ই নি। এমনকি যাবে এরকম খবরও দেয়নি। ইন্দিরার মেসোর সাথে আমার কথা হয়।    উনাকে পুরো ব্যাপারটা জানালাম। এবং ইন্দিরার বাড়িতে জানাতে আপাতত মানা করলাম। আচ্ছা, ইনস্পেক্টর,  ইন্দিরা ওর বাড়িতেও তো চলে যেতে পারে?
 - তাহলে তো মিথ্যে কথা বলার দরকার ছিল না। আর এ তো আপনার বেলুড়ের রামকৃষ্ণ মিশন না, যে যখন খুশি       বাড়ি যাওয়ার নিয়ম নেই বলে, সুপারকে টুপি পরিয়ে পালাতে হবে!
- সেটিও ঠিক কথা। তবুও একবার খোঁজ নিয়ে দেখলে হতো না...
- অবশ্যই হতো। কিন্তু এখনই আমি বা আপনি খোঁজ নিলে বাড়ির লোক ফিট হয়ে যেতে পারে। তার চেয়ে ভালো হয়,  আপনি ইন্দিরার মাসী বা মেসো কে বলে চালাকি করে খোঁজ নিতে বলুন। ততক্ষনে আমি চারপাশে কুইক  ইনভেস্টিগেশানটা সেরে নিই। 

‘সেই ভালো, সেই ভালো’ বলে সুপার ফের উপরে উঠে নিজের রুমমুখো হলেন। বাকি কোনও মেয়ের প্রতি আপাতত তার কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। 

‘আচ্ছা স্যর, মেয়েটির ফোনে একবার...’ বলে রতন কনস্টেবল কিছু বলতে যেতেই, সাব-ইন্সপেক্টর তাকে থামিয়ে দিয়ে বিরক্তির সাথে বলেন, ‘উফঃ রতন। ওসব আদ্যিকালের ব্যাপারগুলো নিয়ে কেন যে মাথা ঘামাও, বুঝে পাই না! তোমার কি মনে হয়,মিসেস করন মেয়েটির মাসীর বাড়ি ফোন করার আগে একবার খোদ মেয়েটির নম্বরে ফোন করে দেখবেন না? আর ফোন সুইচ অফ থাকবে, সে তো সস্তা গল্পের প্লট। হ্যাঁ, মিসেস করন আসুক, দরকার পড়ে তো ট্র্যাক করার জন্য নম্বরটি নিয়ে রাখব। তা সে সব পড়ে হবে, আগে চল রাস্তার দুএকজনকে কিছু পুছতাছ করি।’ এই বলে পুলিশ তিনজন তাদের জিপ রেখে হোস্টেলের কাছেপিঠে এলাকায় তদন্ত করতে চলে গেলেন।

এদিকে মেয়েদের মহলে যথেষ্ট উত্তেজনা। কিডন্যাপ থেকে শুরু করে রেপ, খুন সমস্ত সম্ভাবনাগুলোই পাতে পাতে আলোচনা হয়ে গেছে। কেবল কয়েকজন একটু সন্দেহজনক কথাবার্তা বলছে। যেমন রেবা বলে এক নেত্রীটাইপ মেয়ে বলল – ‘কাল বিকেলে সেজেগুজে গটগটকরতে করতে বেরচ্ছিলেন মহারাণী। আমি সামনে পড়ে জিজ্ঞেস করায় বিরক্তি দেখিয়ে বলল ঠিকই মাসীর বাড়ি যাচ্ছি, কিন্তু আমি বলি কি, অত সাজগোজ করে মাসীর বাড়ি যাওয়ার কি আছে?’ ব্রতী বলে আরেকটি মেয়ে, যার কি না নিজেরও ঘন ঘন মাসিপিসির বাড়ি যাওয়ার স্বভাব আছে, সেও দেখি সাঁয় দিয়ে বলল – ‘আমি তো দেখি কাকে ফোনে চাপা গলায় কোথায় যেন অপেক্ষা করার কথা বলছিল।’ সোমা সূত্রধর বলে একজন সেই সূত্র ধরে বলল, ‘তাহলে মনে হয় সেখানেই কিছু গোলমাল হয়েছে...’ বেশ কিছুক্ষণ ধরে এই বিচার বিশ্লেষণ চলতে থাকল। হঠাৎ একজনের খেয়াল হল, ‘আরে বৈশাখী কোথায়?’ বৈশাখী, ইন্দিরার পরম মিত্র এবং রুমমেট, গলাগলি বন্ধুত্ব, মাখামাখি বোন-বোন সম্পর্ক। বৈশাখীকে এক কোনে ঘাপটি মেরে বসে থাকতে দেখা গেল। মুখে যেন কে পেদে দিয়েছে। কোনোপ্রকার আলোচনাতেই তার বিকার নেই। ‘হ্যাঁরে বিশা, তোর বোনটা গেল কোথায়?’ বলে একজন প্রশ্ন ছুড়ল। বৈশাখীর কোনোপ্রকার নাটক শুরুর আগেই চত্বরে যেন বোমা পড়ল। উত্তেজিত গলায়, ‘...আমার কি কোনও প্রাইভেসী নেই?’ বলতে বলতে সাব-ইন্সপেক্টর সাহেবের সাথে ইন্দিরার প্রবেশ। ওদিকে দেখা যাচ্ছে তামাসা দেখতে রাস্তাঘাটের কিছু হাবাগোবাও এসে জড়ো হয়েছে। কেচ্ছা-তামাসার গন্ধ এদের নাকে নাকে বাজে। ‘এই তো...এই তো...এই তো...’ বলতে বলতে সুপার নেমে এলেন নিচে। মেয়েমহল ফের নিজেদের পজিশন নিয়ে নিল। ইনস্পেক্টর সাহেব প্রশ্ন ছুড়লেন, ‘তবে তুমি বলবে না যে কাল রাত্রে কোথায় ছিলে?’ ইন্দিরার নাটুকে বিরক্তিমার্কা উত্তর,

- সে কৈফিয়ত আমি আপনাকে কেন দেব?
- একে কৈফিয়ত নয়, পাতি জবাবই বলে। কৈফিয়ত তো তুমি এবার দেবে তোমার সুপারকে, যে মাসীর বাড়ির নাম  করে অন্য কোথায় গিয়েছিলে?

সুপার এবার গলা ছাড়লেন। একনিষ্ঠ দায়িত্ববান হোস্টেল তত্ত্বাবধায়কের ভঙ্গিতে ইন্দিরাকে শো-কজ করলেন, ‘ইন্দিরা তুমি আমার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েছ। তোমাকে বলতেই হবে, তুমি কোথায় ছিলে সারারাত? এটা হোস্টেলের রেপুটেশনের ব্যাপার।’ শেষ কথাটা হয়তো বলতেন না, কিন্তু রাস্তার লোকজন যে হারে ভিড় জমাচ্ছে, সে দিক বিচার করেই গা বাঁচালেন। 

ব্যাপারটা আপাতত পরিষ্কার হয়ে গেল, যে হোস্টেলের প্রতিবেশী মহাশয়টি যথারীতি রসিকতা করেছে। হ্যাঁ, এটা সত্যি, ইন্দিরা মাইতি মাসীর বাড়িতে পা ও রাখেনি। সারারাত ধরে অন্য কোথাও ঘাপটি মেরে ছিল। তাতে পুলিশের নাক গলানোর কিছু নেই। কিন্তু প্রতিবেশী মহাশয় সেটি কোনওভাবে জানতে পেরে হাটে হাড়ি ভাঙার পরিকল্পনা করেন। কাঠিকরা বাঙালীর অভাব আছে থোরাই। কিন্তু কেনই বা তিনি এমন করতে গেলেন? কিসের স্বার্থ? 

ইন্দিরার মুখচোখ শুকিয়ে যেন চৈত্র মাসের নালা হয়ে গেছে। ‘না মানে...না মানে’র ফিট ধরেছে বোধহয়। প্রায় খান সাতেক ‘না মানে’ আওড়ে ককিয়ে ককিয়ে উত্তর দেয়, ‘না মানে এক বন্ধুর কাছে গিয়েছিলাম।’ ছেলে বন্ধু না মেয়ে বন্ধু, হঠাৎ তো আর জিজ্ঞেস করা যায় না, তাই সুপার প্রশ্ন ছাড়লেন – ‘নাম কি?’

ইন্দিরা কি ঢপ ঝাড়ছে? বৈশাখী ছাড়া যে মেয়ে এক পাও নড়ে না, সে মেয়ে বন্ধুর বাড়িতে গোটা রাত আমোদ করে চলে এল। তাও আবার মাসীর বাড়ি যাওয়ার মিথ্যে বলে! না চাঁদু, কেও মানবে না এ কথা। 
কিন্তু সবাইকে অবাক করে নাটকের হিরোইনের মতো মাঝ মাঠে এসে দাঁড়াল মিতা। ইন্দিরারই সহপাঠী। কোনোপ্রকার ভূমিকা ছাড়াই এক নিঃশ্বাসে সপাট জানিয়ে দিল, ‘আমার কাছেই সারারাত ছিল ইন্দিরা। ও মাসীর বাড়িই যাচ্ছিল। আমার সাথে রাস্তায় দেখা। আমার মেসের সবাই বাড়ি চলে গিয়েছিল বলে আমিও ওকে জোর করে নিয়ে যায়। এই, এই ওকে আবার পৌঁছে দিয়ে গেলাম...’ ইত্যাদি। ইত্যাদি। 

‘ও দেখ কাণ্ড!’ পরিস্থিতি বুঝে আর কিছু ধানাইফানাই করলেন না সুপার ম্যাডাম। সাব-ইন্সপেক্টর সাহেবেরও নেয়ে খেয়ে কাজ নাই, যে হতচ্ছাড়া মেয়েগুলোকে নিয়ে অতিরিক্ত নাচোনকোদন করবেন। তাই তিনিও ক্ষান্ত দিলেন। ‘যান...যান আপনারা। কেটে পড়ুন। কেটে পড়ুন।’ বলে লোক ভাগিয়ে তিনিও সদলবলে বিদায় নিলেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন, ‘আমি খোঁজ লাগাচ্ছি...কে এই তামাশাটি করেছে।’

আসল তামাশাটি কি ভেতর ভেতর সবই টের পেল ইন্দিরা। মনে মনে বলল, ‘কোন হারামির পোঁদ জ্বলছিল যে আমাকে ফাঁসাতে গেল...’

সুপার ম্যাডাম কিছু টুঁশব্দ না করে গটগট করে উপরে উঠে গেলেন। ‘হচ্ছে আজকে’, এই টাইপের ভাব। মেয়েরাও যে যার রুমে। আজ বাকিটা দিন কানাঘুষোই চলবে। কয়েকজন তাদের নিয়মিত মাসীপিসির বাড়ি যাওয়ার জন্য তৈরি হতে থাকে। বৈশাখী মেয়েটিও একটু ধাতস্থ হয়। ভেতরে ভেতরে কার মনে কি চলে, সে ভগবানই জানে!

ফ্যালফ্যাল করে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর, ইন্দিরা টের পায়, মিতা এখনও তার পিছনে ঠাই দাঁড়িয়ে আছে, যেন মিচকি মিচকি হাসছে। মিতা এই তামাশার খবর পেল কি করে? ও বুঝেছি! 

‘তো মিতা মাগীরই যতসব ফন্দি...’,ইন্দিরা কথাটা মনে মনে বলল ঠিকই, কিন্তু মিতা যেন শুনতে পেয়ে শান্ত গলায় উত্তর দিল – 
- সে এতক্ষণে টের পেলি?
- তবে তুইই ফোন করে...
- আমি ঠিক না। ফোনটি করেছিল অভিষেক। গলা ভারী করে।
- আমার ব্যাপারে ইন্টারফেয়ার...
- কিসের ইন্টারফেয়ার শুনি। তুই সাধাসিধে ছেলেগুলোকে এভাবে নাচাবি, আর আমরা বসে বসে দেখব? আর  রাতবিরেতে ফষ্টিনষ্টি করে বেরবি, দিয়ে কলেজ আর হোস্টেলের নাম খারাপ করবি...এ চলবে না খুকুমণি। এসব  করতে ইচ্ছে হয় তো বাবার হোটেলে গিয়ে কর...
- পুলিশকে বলব, তোরাই ফোন করে ইয়ার্কি মারছিলি...
- চল! চল! আমিও গিয়ে বলি যে আমি মিথ্যে বলছিলাম। তুই আমার কাছে ছিলিসই না। ভাঙুক হাটে হাড়ি।
- কি চাস কি তোরা?
- তোর ব্যবসা বন্ধ করতে চাই। 
- যদি না করি...
- এই তো সবে শুরু। আরও কত কেরামতি দেখাব। পুলিশ বাপবাপ করে পেছনে লাগবে। ভাবিস কি, চোদনামো কি তুই খালি একাই পারিস?

কথাগুলো বলে এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না মিতা। মুখ ঘুরিয়ে হন হন করে বেরিয়ে গেল। এদিকে ইন্দিরার মাসী-মেসোও এসে জুটেছে। রে রে করে উঠলেন তারা। তারপর যেটুকু হওয়ার, 'কি রে কোথায় ছিলি? কি সব...'

ফেড আউট!


জামাইবাবু ! জামাইবাবু ! কোথায় তোমার কান...
দিদি কাকে করলি বিয়ে ? ডুবলো যে মোর মান ।
জামাইবাবু ! জামাইবাবু ! তুমিও কি সেই পাঁঠা?
যাদের দিদি ধরতো দিয়ে প্রেম কাঁঠালের আঁঠা...
'B.Tech' দেখে একটা হনু নিজের কথা ভাবে !
লজ্জা কি গো জামাইবাবু, পাবলিকে'তে খাবে ।
আস্ত হনু দেখতে তুমি, লেজটা তোমার কোথায় ?
জামাইবাবু, B.Tech তোমার দাঁড়িয়ে আছে 'চোথায়' !
কুকুর পোষার ইচ্ছে ছিলো দিদি, মা আর বাবার...
বলবো কি আর জামাইবাবু, বুঝেই ফেলো এবার ।
এখন নতুন জামাইবাবু, খুঁজছে দিদি পাড়ায়।
আগ্রহী কেও থাকলে যেন গলির মুখে দাঁড়ায়।।
সাবুকলামাখা, আজ সার্ফের জল।
তবু রোজ বার দুই খোলা চাই কল।।
কৃমির জ্বালায় রাখরে নখ
আরাম পেলে গন্ধ শোঁক
ছবি ছেড়ে কবি পড়ছে কমেন্ট, গুনছে লাইক কত
যশের পাল্লা তারই ভারী যার বেশি ফলোয়ার যত
আমি স্বতন্ত্র নারী
খালি মালদার মরদ দেখলে, সখে লেজখানা নাড়ি
আমি স্বতন্ত্র নারী
বাপ ঘষে পাছা সাইকেলে, তবু শ্বশুরের চাই গাড়ি
কর্জের ভারে কুপোকাত পিতা, মাথা চুলকিয়ে হাসে
মেয়ে যে দেখছি করছে শপিং, টাকা কোত্থেকে আসে।
জয় করে এসো ফিরে, 
মুখ চেয়ে দেশ রইবে তোমার কোটি প্রবাসীর ভিড়ে।
মস্তানে বাপান্ত করে -
জ্ঞানবানে তাই কি ধরে?
(উৎপল দত্ত: পুরুষোত্তম)
মস্তানে বাপান্ত করে -
জ্ঞানবানে তাই কি ধরে?
হাঁকে আঁতেলে মিছিল
রেগে পুলিশে বাম্বু মারে।
মার্কিন কাক উড়ে এসে দেশে বামুনের চালে জোটে
বোকা ময়নার পাত মেরে খাওয়া শকুনের এঁটো খোঁটে।
এসপার চেঁচাচ্ছে 'কবাডি, কবাডি', 
ওসপার হাঁকে, 'কই বডি?'
এসপার নাকি দেয় চ্যাংদোলা, 
ওসপার বলে, 'দাদা চেন খোলা!'
থিমের চক্করে বাড়ে ব্লাউজের হাতা,
শহুরে মা কাঁধে ধরে পঁচিশেক মাথা।
মা'রে যে তোর এতই প্রীতি!
চল তাজিয়ায়, কিসের ভীতি?
কারবালা আজ দেশের মাথায়,
খুন ধর তুই চোখের পাতায়।
সামনের সীটে কপোত-কপোতী পিরিতি চালায় সুখে
দেখে আমি গবা, কি যে করি হায়, নাক খুঁটে যায় দুখে
মেরে গেছে পোঙা ইংরেজে, তাই বুলসিট বলি মুখে
কাঠি খেলে ঠিক, রেগেমেগে চার অক্ষর ছাড়ি সুখে।

Friday, 2 September 2016

কেমন কেমন করলে

বৌকে এই অবস্থায় দেখতে পাবেন, মোটেই আশা করেননি বিপদবাবু। রাত ঠিক সাড়ে নটার সময় দোকান বন্ধ করে বাড়িমুখো হন। ফেরার পথে হামেশাই এর-ওর সাথে দেখা হয়। সারাদিনের ধকল হালকা করতে মিনিট পনেরোর সংযমী আড্ডায় যোগ দেন - দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সেই দশটা, সোয়া দশটা বেজে যায়। এই তার রোজকার রুটিন। কিন্তু আজ শরীরটা কেমন কেমন করায়, একটু জলদিই দোকান বন্ধ করে দিলেন। ফেরার পথে এর-ওরদের সামনে না পড়তে হয়, তাই ফাঁকা গলি ধরলেন। তবে গিন্নির খোশামোদে রতনের দোকান থেকে খান দশেক রসগোল্লা কিনে নিয়ে যেতে ভুললেন না। গেঁজেপাড়ার সাঁকো পেরিয়ে বেনেতলার বাড়িমুখো সোজা গলিটি বেশ সুনসান থাকে। তবে আজ নেই। দুজন বেহায়া দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফষ্টিনষ্টি করছে। ছোকরা-ছুরি হলে না হয় এক ধমক বসাতেন, কিন্তু এরা তো রীতিমতো প্রাপ্তবয়স্ক। কি আর করা যাবে, 'ঘোর কলি' আওড়ে এগিয়ে যেতে হল বিপদবাবুকে। কিন্তু খানিক এগিয়েই ভূত দেখলেন তিনি। পিলে চমকে উঠল মহিলাটি কে বুঝতে পেরে। এ মহিলাকেই তো তিনি শ্বশুরের দশভরী সোনা মেরে ঘরের বৌ করে এনেছিলেন। আহা, বুঝলেন, সন্ধ্যেয় গিন্নি কেন ফোন করে বলল, 'তরিতরকারি নেই। আজ মিষ্টি দিয়েই রুটি খেতে হবে।' মন ভেঙে গেল বিপদবাবুর। দু'চোখে অন্ধকার দেখলেন। একের পর এক, মেয়ের কথা, ছেলের কথা, পাড়াপড়শির কথা, আত্মীয়স্বজনদের কথা, বন্ধুবান্ধবদের কথা, এমনকি দোকানের কর্মচারীদের কথা খেয়াল করে বাচ্চা ছেলেদের মতো হাত-পা ছুড়ে কাঁদতে ইচ্ছে হল তার। এই খেল খেলাচ্ছে আমার বৌ। ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেলে তারা কি ভাববে, কি বলবে। বা হয়তো জেনেই বসে আছে অনেকে - লজ্জায় চুপ করে আছে। এই ছোট্ট মফঃস্বলে এসব কেচ্ছায় ওয়াকিবহাল থাকা এমন কিছু না। এতদিনে বুঝলেন নিজেদের ধাড়ি মেয়েটা বেলেল্লাপনার গুনগুলো কার কাছ থেকে পেয়েছে। ছেলেটাও কার জন্য দিনদিন ফাজিল হচ্ছে। মাথা ভার হয়ে এল। না আর না। জীবনটাকে শেষ করে দেবেন তিনি। এটাই একমাত্র চরম শাস্তি দেওয়া হবে স্ত্রীকে। মাথা হেঁট করে সাইকেল ঘোরালেন। গেঁজেপাড়ার সাঁকো থেকে ঝাঁপ দেওয়াই ঠিক হবে। সাঁকোটি বেশ উঁচু। নিচে কাদার গাদ। ওখানে ঝাঁপ দিলে আর দেখতে হবে না। এই রাতে লোক আসতে আসতে পগার পার। কিন্তু একটা সুইসাইড নোট লিখে গেলে ভালো হতো না! আসল জনকে দায়ী না করে গেলে যে সুইসাইড করাটাই ভেস্তে যাবে। কিন্তু লিখবেন কোথায়? মেয়েকে ফোন করে বলে দিলেই হয়। তাই ফোন লাগালেন মেয়েকে - বিজি! সারাদিনই বিজি! থাক, তাহলে মেসেজ করে রাখাটাই ভালো। সাঁকো যাওয়ার আগে গলির মুখেই সাইকেল দাঁড় করালনে। তালা দিলেন। এখানেই সাইকেল, মোবাইল, মানি-ব্যাগ আর রসগোল্লার ভাঁড়টি রেখে যাবেন। তার আগে এই ওই বলে, দু'চার কথা মেসেজ করে দিলেন মেয়েকে। দায়ী করে গেলেন তস্য গুনধারী মা'কে। ঠিক করলেন, আর বেশি কিছু ভাববেন না, মত পাল্টে লাভ নেই। শেষবারের মতো মুখ ঘুরিয়ে দেখে নিলেন। যাঃ! দুই শালিক তো হাওয়া। মাগি যাবে এবার বাড়ি গিয়ে মরাকান্না জুড়তে। দেরি করলে চলবে না। চটপট পা চালালেন বিপদবাবু। ফোনটা যেন বেজে উঠল। মেয়ে মেসেজ দেখে হয়তো ফোন করছে। চুলোয় যাক। সাঁকোটা কাছেই। মানুষজনও নেই। কাম সারতে ঝামেলা হবে না। ন্যাংটো হয়ে ঝাঁপ দেবেন কি না একবার ভাবলেন। না থাক, লোককে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আধো আলোতে সাঁকোর উপর থেকে একবার তলানিতে উঁকি দিলেন। অন্ধকার হলেও ভালোই বোঝা যাচ্ছে একটি লাল পেড়ে হলুদ শাড়ি জড়ানো আস্ত দেহ ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে কালশিটে কাদার গাদে। গেল বছর পুজোতেই তো এই শাড়িটি কিনে এনে দিয়েছিলেন।  

Thursday, 1 September 2016

ডাইরি থেকে, সেপ্টেম্বর ২০২৩

প্রায় সাত বছর পর প্লাবনীদের বাড়ি এলাম। তবে এবার একেবারে অন্য ভূমিকায়। সজলদা মাঝরাতে ফোন করে বলছে, আর্জেন্ট কেস। প্রেগন্যান্ট একজনকে নিয়ে ইমিডিয়েট নার্সিংহোমে অ্যাডমিট করতে হবে। অগত্যা রাজি হতে হল। কারণ এখন এই আমার পেট চালানোর উপায়। চার বছর ধরে গাড়ি ভাড়া খাটিয়েই দিন গুজরান হচ্ছে।

ঠিকানাটা যখন শুনলাম
- আরে টিউলিপ প্রেস। চন্দ্রানীর সামনে জয় বাংলা দোকানটা আছে না, তারই মেয়ে। আমেরিকায় থাকে...
- থাক থাক আমি চিনি।
- বেশ ভালো কথা, দেরি করিস না। চল, চটপট বেরিয়ে পর।

আমার বাড়ি থেকে প্লাবনীদের বাড়ি ঢিল ছোড়া দূরে। তাই পৌছতে বেশি সময় লাগবে না। মা এখন 
জানতে চায় না, কোথায় যাচ্ছি। জানে ছেলে রোজগার করতেই যাচ্ছে।

প্লাবনীদের বাড়ির সামনের গলির মুখে গাড়ি দাঁড় করালাম। ওর ভাই বাপ্পা ছুটতে ছুটতে এসে বলল, চলো দিদিকে ধরে নিয়ে আসতে হবে। কি স্বাভাবিক ব্যবহার। ততক্ষণে দেখি প্লাবনীর বাবা-মা তাকে কাঁধে করে দরজার সামনে নিয়ে এসেছে। আমি এগিয়ে যেতে খপ করে আমার হাতখানা চেপে ধরল প্লাবনী। এই চরম যন্ত্রণাদায়ক মুহূর্তেও কত সূক্ষ্ম অভিনয় দেখাল সে। বুঝিয়ে দিল, আর পাঁচটা গাড়ির ড্রাইভারের সাথে একজন প্রেগন্যান্ট মহিলা যেমন ব্যবহার করে, সেও সেই স্বাভাবিক ব্যবহারই করল। চরম কষ্ট পাচ্ছে সে। আমরা কোনওমতে তাকে গাড়ির পিছনের সীটে নিয়ে এসে বসালাম। তার দুই পাশে বসলো তার বাবা-মা। বাপ্পাকে সঙ্গে নিয়ে আমি সামনে। পিছনে স্বামী-স্ত্রীর কথা কানে এল
- তন্ময় ফোন করে জানালো আর আধ ঘন্টার মধ্যেই ওর ফ্লাইট।
- ওকে বললে তো টেনশনের কোনও কারণ নেই?
- টেনশন তো করবেই, আমেরিকায় অত বড় বড় নার্সিংহোম থাকতে...
- থাক ওসব কথা। কই ড্রাইভার, জলদি! জলদি! জলদি!

আমার চার বছরের ড্রাইভার জীবনে কোনও পার্টিই আমাকে আজ পর্যন্ত ড্রাইভার বলে ডাকেনি। ডাকেও না কাওকে। যদিও বা ডাকে, কিন্তু ইনি কেন? ইনি কি আমাকে চেনেন না? ভুলে গিয়েছেন আমার মুখ? আমার পরিচয়? এই গাড়ির ভেতর চারজনের কেওই কি আমাকে চেনে না? মনে নেই আমাকে? মনে নেই এদের সাথেই আমি কত সময় কাটিয়ে এসেছি। প্লাবনীর গর্ভে যে সত্তাটি ঠাই করে নিয়েছে, সে বরঞ্চ আমার কাছে অচেনা, অপরিচিত। তার খাতিরেই কি সবাই অপরিচিত হয়ে গেল!

আকাশপাতাল ভাবা বন্ধ করে গাড়ি স্টার্ট দিলাম। পনেরো মিনিটের তো রাস্তা।

মানুষ আশা-আকাঙ্ক্ষাকে আঁকরে ধরে কাঙালের জীবনযাপন করছে। তা সে যে গোত্রের মানুষ হোক না কেন। অতীতে দেখে আসা, আর বর্তমানে দেখতে থাকা আশা-আকাঙ্ক্ষার স্বপ্নগুলো সত্যি করতে মানুষ ছুটে চলেছে। এই স্বপ্নগুলো এক একটা স্থির ছবি হয়ে মনের কোনে জমা হয়ে থাকে। সেগুলোকেই জীবন্ত করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে মানুষ। বেঁচে ওঠা স্বপ্নগুলোর ভাগীদার হয়ে যদি মুহূর্তের সুখ পাওয়া যায়, সেও অনেক।

আমিও স্বপ্ন দেখেছিলাম প্লাবনীকে কাছে পাওয়ার। স্ত্রী রূপে পাওয়ার। ওর গর্ভে আমারই সন্তান বেড়ে উঠবে - এই ছবিই নিজের মনে মনে কল্পনা করেছিলাম। তার সেই কল্পনাসুত্রে আমারই তো স্টেয়ারিং ধরে থাকার কথা - গাড়ির ড্রাইভার হিসেবে নয়, একজন স্বামী হিসেবে। যখন ওকে ধরে ওর মা-বাবা পিছনের সীটে বসে থাকবে আর ভাই থাকবে সামনের সীটে আমার পাশে, তখন আমারই তো গড়ি চালিয়ে নার্সিংহোম নিয়ে গিয়ে অ্যাডমিট করানোর কথা। সেই স্বপ্নে দেখা মুহূর্ত ঠিক বেঁচে উঠেছে আমার কাছে। এক হাতে, কবে কোন কালে করা কল্পনার ছবি আর অপর হাতে এই মুহূর্তসুখের ছবিখানা নিয়ে মিলিয়ে মিলিয়ে দেখছি। ছবির কোনও পটভুমি থাকে না, থাকে না কোনও ভূত ভবিষ্যৎ, না কোনও সম্পর্কের মারপ্যাঁচ। চরিত্রগুলো খালি অভিনয় করে - আর তাতেই ক্ষণিকের সুখ ভোগ করে। যা আমি আজ করলাম - গর্ভস্থ সন্তানের পিতার অভিনয়। আসল পিতা এখন ইকোনমি ক্লাসে বসে বুর‍্যিটো ঠুসছে।




Sunday, 31 July 2016

গল্প - সন্নিপাত

রিচার্ড স্টোকস নামে একজন প্রতিষ্ঠিত ইংরেজ ব্যবসায়ী কর্মসূত্রে একসময় ভারতবর্ষে আসেন। ব্যবসার কাজকর্ম সব মেটানোর পর দেখেন হাতে আরও একটা দিন অতিরিক্ত থাকছে। আবার সেই দিনই পড়েছে ওনার জন্মদিন। সঙ্গে স্ত্রীও এসেছেন। তাই ঠিক করলেন আগামী দিনটি নয়াদিল্লীতে কাটিয়েই দেশে ফিরবেন। বয়স তো আর কম হল না। এবার না হয় পূর্বপুরুষদের প্রিয় উপনিবেশেই জন্মদিনটা কাটুক। কিন্তু এই জন্মদিনই তাকে এক ঐতিহাসিক ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী করে রাখবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি।
দিনটি রবিবার। ফেব্রুয়ারী মাস। ক্যালেন্ডারে শীত গেলেও, দিল্লীতে শীত ঋতুটি আরও কিছুদিন থাকবে। তার ওপর আজ ছুটি। ঘোরবার জন্য আদর্শ দিন হলেও স্থানীয় বন্ধুবান্ধবরা জোর করছে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে যাওয়ার জন্য। 
খেলাটি যে তার বিশেষ অপছন্দ, তা নয়, তবে বিশেষ পছন্দও নয়। টিকিট কেটে সারাদিন মাঠে বসে থাকার রুচি স্টোকস সাহেবের নেই।  ছেলেবেলায় খেলাটি প্রচুর খেলেছেন। এমনকি বাবার সাথে একবার ম্যাচও দেখতে গিয়েছিলেন। ওনার বাবা ছিলেন ক্রিকেটের আসল ভক্ত। কিন্তু ব্যবসাকে জীবিকা করার পর ক্রিকেট মাঠে পা রাখার ফুরসৎ আর কখনও জোটেনি। গিন্নীর তরফ থেকে কোনো প্রতিরোধ না থাকায় শেষমেশ তাকে রাজি হতে হয়।
সাম্প্রতিক ক্রিকেট খেলাটি এদেশে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। স্টোকস সাহেবের ধারনা ছিল, এদেশের লোকেদের কাছে দুটি হুজুগই জনপ্রিয়  – এক, রাজনীতি আর দুই, সিনেমা। কিন্তু ১৯৮৩ –এর বিশ্বকাপ জয় আর তেন্ডুলকার নামে এক নাটা ছোকরার কেরামতির দৌলতে ক্রিকেটেরও বাজার এখন রমরমা।  
খেলা চলছে ফিরোজ শাহ্‌ কোটলা মাঠে। টেস্ট ম্যাচের চতুর্থ দিন। ভারত বনাম পাকিস্তান। পাঁচ দিন ধরে খেলা চলেও অনেক ম্যাচ অমীমাংসিত থেকে যায়। কিন্ত এই ম্যাচের ফলাফল অনুমানযোগ্য। 
চতুর্থ দিনে চতুর্থ ইনিংস শুরু হয়ে গিয়েছে। পাকিস্তানের সামনে ৪২০ রানের লক্ষ্য। কিন্তু পিচের যা অবস্থা শোনা যাচ্ছে, তাতে মনে হয় না খেলা পাঁচ দিন পর্যন্ত গড়াবে। স্টোকস সাহেব ওই তেন্ডুলকার ছোকরার ব্যাটিং দেখতে পাবেন না বলে একটু হতাশই হলেন। একবার অন্তত দেখতেন, সে কেমন খেলে। শুনলেন নাকি, প্রথম ইনিংসে ৬ আর দ্বিতীয় ইনিংসে ২৯ –এর বেশি রান করতে পারেনি তেন্ডুলকার।  
লাঞ্চ পর্যন্ত কোনো উইকেট পড়ল না পাকিস্তানের। খারপ উইকেটেও বেশ ভালোই সংগ্রাম চালিয়ে গেল পাকিস্তানের ওপেনার দুজন। একটা অসম্ভব তথ্য পেয়ে স্টোকস সাহেবের তো চক্ষু চড়ক গাছ। পাকিস্তানের ওই ডানহাতি ওপেনারটি নাকি তিন বছর আগে মাত্র ৩৭ বল খেলে শত রানের গণ্ডি পেরিয়ে ছিল – যদিও ম্যাচটি ছিল সীমিত ওভারের একদিনের খেলা। একবার অ্যাসেজ চলাকালীন লীডস –এ ব্র্যাডম্যান লাঞ্চের আগে শতরান করে হুলুস্থুলু কাণ্ড করে, বাবার মুখে একথা অনেকবার শুনেছেন। কিন্তু এ যে একেবারে লাগামছাড়া কাণ্ড– আধা ঘন্টাতেই কেল্লাফতে।  
ভারতীয় বোলারদের দেখে বিশেষ ভক্তি এল না স্টোকস সাহেবের। খাস করে ওই লম্বা স্পিনারটিকে কেমন অস্বস্তিকর লাগলো। স্পিনার কম, ‘স্লো’ ফাস্ট বোলার বেশি। কেমন লাফাতে লাফাতে ছুটে এসে বল করে,ছোড়েও বল বেশ দ্রুত, কিন্তু ঘোরে কই। হ্যাঁ, তবে ছেলেটির একটা জিনিসে অস্বাভাবিক পটুতা আছে –সেটি হল সোজা বল ছাড়ার, যাকে বলে স্ট্যাম্প – টু – স্ট্যাম্প ডেলেভারি। যদিও তাতে কোনো লাভ হয়নি। ছয় ওভার বল করেই ইতিমধ্যে ২৭ রান দিয়ে বসেছে। দেখা যাক ভোজন সম্পন্ন করে কি খেল দেখান মহাশয়।  
লাঞ্চের পর সত্যিই মহাশয় খেল দেখাতে শুরু করলেন। বোলারটির পিতৃদত্ত পদবিটা উচ্চারণ করার ইচ্ছে স্টোকস সাহেবের নেই, কিন্তু পরপর দু’দুটো উইকেট পতনের পর স্বতঃস্ফূর্তভাবেই গোটা গ্যালারি থেকেই ভেসে আসছিল – কুম্বলে – কুম্বলে –।  হ্যাট্রিক যদিও করতে পারল না, তবুও মাত্র পনেরখানা বল করেই চার-চারটে উইকেট পেয়ে গেল অনিল কুম্বলে। স্টোকস সাহেব বুঝলেন, কেবল বোঁবোঁ করে বল ঘোরানোতে কোনো কৃতিত্ব নেই, তার সাথে চাই লাইন – লেংথ – পিচিং – আরও কত কি। তাছাড়া ওনারই বা অভিজ্ঞতা কতটুকু! কুম্বলের আরও দ্রুত দুটো উইকেট নেওয়ার পরও কি ঘুনাক্ষরে ভেবেছিলেন তিনি নিজে এক বিরল অভিজ্ঞতার অংশীদার হতে চলেছেন। 
অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন স্টোকস সাহেব, চটকা ভাঙল ‘জিম’ কথাটা কানে এসে... “কেও কি ‘জিম’ বলে চিৎকার করল”। “জিম’ না, ‘জাম্বো’...”, ভুল সংশোধন করে দিলেন পাশের এক দর্শক। ওই অনিল কুম্বলেরই ডাকনাম ‘জাম্বো’। এই জাম্বোর জন্যই আজ হৈহৈ রব উঠছে স্টেডিয়ামের এখানে সেখানে। কুম্বলে কি দশটা উইকেটই নেবে! এও কি কখনও সম্ভব হয়েছে! ইতিমধ্যে তার সাতটি উইকেট নেওয়া হয়ে গেছে। 
সমস্ত স্টেডিয়াম উত্তেজিত। তার মধ্যে কুম্বলে আবার অন – এ – হ্যাট্রিক। হ্যাট্রিক করলেই দশে দশ।
 সমস্ত দর্শকের চোখ বাইশ গজে, কিন্তু স্টোকস সাহেবের দৃষ্টি ঘোলাটে। মাথার মধ্যে একের পর এক স্মৃতি ওই কুম্বলের বলের মতো বনবন করে ঘুরছে আর দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে। এ কোন অবিশ্বাস্য ঘটনার সাক্ষী হতে চলেছেন তিনি! প্রায় তিন দশকের ব্যবসায়িক জীবনে কখনও সখ করে মাঠে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে আসেননি। বাবা নিয়ে গিয়েছিল সেই কোন ছেলেবেলায়। তারপর দীর্ঘসময় পর এই-ই স্টেডিয়াম আসা। ঘরের বন্ধুরা কি এই কাকতলীয় ঘটনা বিশ্বাস করবে? পাশের দর্শকটাই কি বিশ্বাস করবে? একাদশ ব্যাটসম্যানটা কি কুম্বলে থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবে? আটকাতে পারবে কুম্বলেকে ইতিহাস গড়ার হাত থেকে? হঠাৎ যেন বাবার মুখে শোনা একটা কথা মনে পড়ল স্টোকস সাহেবের, “জেমস ওয়ালেস বার্ক’ও শেষরক্ষা করতে পারেনি...”। কয়জনই বা পারে? ক্রিকেট ম্যাচে এরকম প্রায়শই হয়ে থাকে যে একজন ব্যাটসম্যান ব্যাপক প্রতিরোধ করেও শেষরক্ষা করতে পারেনা, জয় ছিনিয়ে নেয় প্রতিপক্ষ দল। এই ম্যাচেও না হয় তাই ঘটল।  পিচের হাল দেখে এই ম্যাচের ফলাফল তো টসের সময়ই প্রায় নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল – টস জেতো ম্যাচ জেতো। তাই একাদশ ব্যাটসম্যান ওয়াকার ইউনিসের কাছে বিশেষ কিছু আশা করা চলে না। কিন্তু তাকেও কি বাকি নয়জনের মত নিজের উইকেটটা অনিল কুম্বলেকে দিয়ে আসতে হবে? ম্যাচ বাঁচিয়ে শেষরক্ষা করার খেয়াল আকাশকুসুম, কিন্তু উইকেটটা তো অন্য কেও নিতে পারে।
অবশেষে ওয়াকার ইউনিস ধর্মসংকট থেকে রক্ষা পেলেন। কিন্তু বলি হতে হল অপরজনকে। পাকিস্তান ম্যাচ হারলই, তার সাথে অনিল কুম্বলেকে দিয়ে গেল এক ইনিংসেরই দশ দশটা উইকেট। বিশ্বরেকর্ড। স্টোকস সাহেব আবেগে আপ্লুত। জন্মদিনের ভালই উপহার পেলেন। পাশে বসে থাকা স্ত্রীও তার এই উত্তেজনা টের পেয়েছেন। স্ত্রীও উপভোগ করেছে ম্যাচটি। স্টোকস সাহেব উত্তেজনায় পাশের দর্শকটির সাথে গল্প শুরু করে দিলেন, “জানেন, সেই দশ বছর বয়সে বাবার সাথে একবার মাত্র ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলাম, আর এতোদিন পর...”। 
ম্যাচ শেষ। দর্শকরা সন্তুষ্ট মনে এবার যে যার বাড়ি ফিরছে...
***

প্রতীকের বাড়ি পুরুলিয়া। সে এসেছে মাসীর বাড়ি দিল্লীর শালিমার বাগে। মাসীর ছেলের সাথে আজ সে প্রথম স্টেডিয়ামে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে যাবে। কোনোওদিন সে স্টেডিয়ামে ক্রিকেট ম্যাচ দেখেনি। কিন্তু আজ মেসোর বদান্যতায় ভি আই পি ব্লকের  দুটো টিকিট ওদের জুটেছে। ম্যাচ আবার ভারত-পাকিস্তানের। এই সুযোগ হাতছাড়া করা বোকামো। বলা বাহুল্য প্রতীক ক্রিকেটের পোকা। 
এও কি সম্ভব! জীবনে প্রথম স্টেডিয়ামে ম্যাচ দেখা, আর সেই দিনই এক ঐতিহাসিক রেকর্ডের সাক্ষী হয়ে যাওয়া! নিজের ভাগ্যে এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না প্রতীকের। ম্যাচে যে ভারত জয়লাভ করবে, সে জানাই ছিল, কিন্তু তার সাথে এরকম উপহার। অনিল কুম্বলের এক ইনিংসেই দশে দশটা উইকেট। তবে প্রতীকের চেয়েও বড় সৌভাগ্যের উপহারটি পেলেন অন্য আরেক জন – প্রতীকের পাশে বসে থাকা একজন ইংরেজ ভদ্রলোক। সত্যিই, তার সৌভাগ্যের জুড়ি মেলা ভার। লোকটি ‘জিম’ বলে ওঠাতেই প্রতীকের কেমন যেন সন্দেহ হয়েছিল। কুম্বলেকে ভুল ডাকনামে ডাকছেন তাই, “জিম’ না, ‘জাম্বো’...” এই বলে সংশোধনও করে দেয়। কিন্তু ভুল তারই, লোকটি জিম লেকার’ই বলতে চেয়েছিলেন। জিম লেকারের নাম প্রতীক জানে। ইনিই বিশ্বে একমাত্র বোলার যিনি অনিল কুম্বলের অনেক আগেই একই নজির গড়ে গেছেন, এমনকি তার চেয়েও চমকপ্রদ নজির – একটা গোটা টেস্টে ১৯ খানা উইকেট। সময়কাল যদিও তার অজানা। সেই ম্যাচেরও অনেক ভাগ্যবান সাক্ষী ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যেরই একজন যে প্রতীকের সাথে এই ম্যাচেরও সাক্ষী হবে – তা সে কল্পনাও করেনি। রিচার্ড স্টোকস নামে এই ভদ্রলোকটি নাকি জিম লেকারেরও দশটা উইকেটের সাক্ষী। তখন ১৯৫৬ সাল, তিনি নাকি বাবার সাথে ওল্ড ট্রাফোর্ডে ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন। সেইটিই ছিল তার জীবনের প্রথম ম্যাচ দেখা, আর এই নাকি ৪৩ বছর পর কোটলাতে তার দ্বিতীয় ম্যাচ দেখা। যদিও তিনি প্রতীকের কাছে স্বীকার করেছেন, জিম লেকারের বেশিরভাগ স্মৃতিই এখন আবছা...তবে একটা জিনিস তার বেশ মনে পড়ে গেছে – সেই ম্যাচে কুড়িটির মধ্যে একমাত্র যে ব্যাটসম্যানটি লেকারের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন, তার নাম জেমস ওয়ালেস বার্ক। 

গল্প - গল্পদাদু

এবার যে গল্পদাদু এলো না –
গত পনের বছরে একবারও এই নিয়মের হেরফের হয়নি। নববর্ষের প্রথম দিনটিতে সকালবেলা ধূতি-পাঞ্জাবি পড়ে বাঁহাতে মিষ্টির ভাঁড় আর ডানহাতে লাঠি দোলাতে দোলাতে বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে হাঁক দিতো গল্পদাদু – ‘কিরে সৌমেন, আছিস তো বাছা!’ হ্যাঁ, আমার জন্যই গল্পদাদুর আসা।
গল্পদাদু ছিল আমার দাদুর বন্ধু – ‘এক গাঁয়েরই ফসল’। শেষে দাদু জমিভিটে বিক্রি করে স্থায়ীভাবে শহরে চলে এলে দুই বন্ধুর মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। দাদু যতদিন বেঁচে ছিল, ততদিন বন্ধুর টানে মাঝে মধ্যেই গল্পদাদু আমাদের বাড়িতে আসতো। সত্যনারায়ণ না কি যেন ছিল নাম তাঁর। আর যখনই আমাদের বাড়ি আসতো তখনই আমাকে কোলে বসিয়ে একটি করে গল্প বলতো। তার জন্যই তো তাঁর ওই নাম। আমার দাদু বলতো গল্পগুলো নাকি তাঁর নিজেরই বানানো। খাঁটি গ্রামের লোক হলেও দেশবিদেশের অনেক খবরাখবরই গল্পদাদু রাখতো। প্রচুর বইপত্রও নাকি ওঁর পড়া। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে সব অভ্যেস কমে যেতে থাকে, কিন্তু নতুন নতুন গল্প বানিয়ে সেগুলি বলার সখ – একটুও কমেনি। গ্রামে গল্পদাদুর নাকি অনেক নাতিনাতনি আছে – তারাও নাকি আমার মতো ভাগ্যবান শ্রোতা। তবে বড়দের মজলিশে গল্পদাদু ঘেঁষতো না। দাদু বাদে বাড়ির সকলের সাথে কেবল সৌজন্যমূলক সম্পর্ক ছিল। তাই দাদু মরে যাওয়ার পর থেকে (আর হয়তো আমি বড় হচ্ছি এই কথা মাথায় রেখে) তাঁর সময়-অসময়ে আমাদের বাড়িতে যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। তবে বাংলা বছরের প্রথম দিনটিতে গল্পদাদুর দর্শন মিলতো। মা-কাকিমারা এসে প্রণামসহ সৌজন্য দেখিয়ে চলে যেত। বাবা-কাকারাও দুচারটে গ্রামের কথা জিজ্ঞেস করে সরে পড়তো। আর আমার কাকার একমাত্র মেয়ে সৌমি – বোর্ডিং স্কুলে কাটিয়ে গল্পদাদুর স্বাদটাই পেল না। আমার সাথে কিন্তু গল্পদাদুর সখ্যতা একটুও কমেনি। প্রতিবছরই আমার একটা নতুন গল্প পাওনা থাকে।
নাকি, থাকতো বলা উচিত! এবার তো কই এলোই না। গতবছরই তো খাসা একটা গল্প বলে গিয়েছিলো -  সাধারন আপেক্ষিকতাবাদের ওপর ভিত্তি করে বানানো গল্প, যেখানে মেয়ের বয়স বাবার বয়সকে ছাপিয়ে যাবে। আর বলে গিয়েছিলো পরের গল্পটা বলবে ল্যাব্রটরি নিয়ে – কিন্তু হল কই?
মনটা খারাপ না হওয়ার কোন কারণ নেই। দাদু মরে যাওয়ার পর থেকে ওই একটা মাত্র দিনই তাঁর দেখা মিলতো। ছোট থাকতে কোনও দিনই গল্পদাদুর গ্রামে যাইনি, এমনকি সে তো আমাদেরও গ্রাম। দাদুও কোনোদিন নিয়ে যায়নি। তারপর তো স্কুল-কলেজের ঠেলায় এতদিনে একবার সুযোগও হয়ে ওঠেনি। মনকে ফাঁকি দেব না – সেরকম ইচ্ছে হয়নি বরং। কিন্তু এবার ইচ্ছেটা একেবারে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বাড়ির কারোর ভ্রুক্ষেপ না থাকতে পারে, কিন্তু গল্পদাদুর সাথে আমার যে সেই কবেকার সম্পর্ক! লোকটার কি হল বা না হল, একবার খোঁজ নিয়ে দেখব না – এত নিষ্ঠুর তো আমি নই!
তাই মা-বাবার আপত্তির তোয়াক্কা না করেই স্থানীয় দাদা গোপালদাকে সঙ্গে করে সকাল সকাল বেরিয়ে পরলাম। গল্পদাদুর গ্রামের নাম কানুর। আমাদের শহর থেকে সরাসরি বাসেই যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। তবে বাস থেকে নেমে বেশ কিছুটা হাঁটাপথ পার করতে হবে। গল্পদাদুই পথের বর্ণনা দিয়ে রেখেছিল একসময়।
বাস থেকে যখন কানুর নামলাম তখন সবে ন’টা। ঘন্টা খানেকের পথ মাত্র। এবার পাকা রাস্তা ছাড়িয়ে ডানদিকে লালমাটির কাঁচা রাস্তা ধরার পালা। খুব একটা বড় গ্রাম না, তা দেখে বোঝাই যায়। পথের দুদিকে ছড়ানো জমি আর এখানে-ওখানে একটা দুটো করে মাটির বাড়ি – যা হয় আর কি!
বেলা না হলেও রোদের তেজ যথেষ্ট। আরও কতটা হাঁটতে হবে কে জানে। গল্পদাদু বলেছিল, এই রাস্তা সোজা এক বাঁধানো বটতলায় মোড় নেবে, দিয়ে ডানদিকে কিছুদূর গেলেই বেলতলা। বেলতলার কাছেই একটা মুদীর দোকান, তার পিছনেই তাদের ভিটেবাড়ি। মুদির দোকানটা হল তাঁর বড় ছেলের দোকান।
ইতিমধ্যে মিনিট পনেরো পথ হাঁটা হয়ে গেছে। গোপালদা এতেই ক্লান্ত। একপ্রকার হাঁপাতে হাঁপাতে আমায় জিজ্ঞেস করল – ‘হ্যাঁরে সমু, তোর গল্পদাদুর বয়স কত?’
আমার দাদু ঊনসত্তর বছর বয়সে মারা যায়। আমার বয়স তখন সবে দশ। গল্পদাদু নাকি দাদুর চেয়ে তিন বছরের ছোট। তাই হিসেব করে উত্তর দিলাম – ‘ওই প্রায় আশি হবে।’
গোপালদা অবাক হয়ে বলল, ‘এই বয়সে এই গরমে এতটা রাস্তা হেঁটে, তার ওপর আবার এক ঘন্টা বাস জার্নি করে তোদের বাড়ি যাওয়া বলিহারি ব্যাপার।’
আমি যুক্তি দিলাম, ‘গ্রামের লোকের কাছে আশিটা শহরের লোকের সত্তর। তাছাড়া আমার দাদুরা এককালে চাষ-আবাদ করেছে। নিজের হাতে লাঙলও টেনেছে শুনেছি...’
কথাগুলো বলতে বলতেই হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতো একটা অপ্রীতিকর আশঙ্কা আমার মাথায় খেলে গেল। গল্পদাদু বেঁচে আছে তো? এ বছর না আসার এই থেকে জুতসই কারণ আর কি হতে পারে! গল্পদাদুর যে বয়স হয়েছে, সে কথা তো বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ মনটা দমে গেল।
না, গল্পদাদুর আয়ু মাত্র আশি বছর হতে পারে না। গল্পদাদু আরও একশ বছর বাঁচবে। বাঁচবে নাই বা কেন? কারণ সামনে যে বৃদ্ধ লোকটি মুখে কৌতূহলী হাসি মেখে লাঠি হাতে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসছে, সে আর কেও না, আমার গল্পদাদু!
‘একি দেখছি, নাকি বুড়ো বয়সে চোখে ছানি পড়ল!’ গল্পদাদুর সরস অভিব্যক্তি।
কখনও করিনি যদিও, তবে আজ জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হল। ধরলামও বটে।
‘অন্ধ হয়ে গেলেও কি আমায় চিনতে পারবে না গল্পদাদু?’ অভিমানের সুরে বললাম, ‘এবার যে এলে না বরং?’
স্পষ্ট লক্ষ্য করলাম গল্পদাদুর মুখ থেকে স্মিত হাসিটা সপাট উধাও হয়ে গেল।
উত্তর করল, ‘সে আছে এক কারণ। তবে তুমি যে এসেছ তাতে আমার সাধ পূর্ণ হয়েছে।’
আমি বললাম, ‘তোমার থেকে আমার বেশি আনন্দ লাগছে। প্রথমবার আমি এই গ্রামে এলাম। ছোট থাকতে কেওই তো একবারের জন্য নিয়ে আসেনি। আর এর মাঝে নিজে থেকেও আর আসা হয়ে উঠেনি...’
আমার কথাগুলো দাদু শুনছে কি না সন্দেহ হল। কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে হঠাৎ। আমার ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তাড়াহুড়ো করে বলল, ‘ছিঃ ছিঃ, দেখ কাণ্ড। সব গল্প কি এই রোদে দাড়িয়েই হবে নাকি। সৌমেন, তোমাকে তো ভিটের ঠিকানা বলাই আছে? বন্ধুকে নিয়ে এগোও, আমি গিয়ে একটা ছোট্ট কাজ সেরে আসছি।’
ছোট্ট কাজটা যে আমাদের জন্য জলখাবারের ব্যবস্থা করা, তা বোঝাই গেল। কিন্তু ব্যাপারটা হল, আমি যে বাড়ির কাওকেই চিনি না। গিয়ে কিই বা বলে পরিচয় দেব?
গল্পদাদু আমার মনের কথা বুঝতে পেরে বলল, ‘তোমাকে কেও থোরাই না দেখে থাকুক, কিন্তু আমার বাড়ি কেন গ্রামের আরও অনেকেই তোমাকে ভালোমতই চিনবে। আর যাই হোক তুমি হলে গিয়ে আমাদের প্রভাতের নাতি। যাও গিয়ে, নিজের পরিচয় দাও, দেখবে...’
কথাটা সম্পূর্ণ না করে গল্পদাদু মুখ ঘুরিয়ে উলটোপথে হাঁটতে শুরু করল।
আমরাও অগত্যা হাঁটা দিলাম।
হ্যাঁ ঠিক তাই। কিছুদূর হেঁটেই সামনের মোরের বটতলাটা চোখে পড়লো। সেখানে কয়েকটি বুড়ো বসে আড্ডা দিচ্ছে। গল্পদাদুর বন্ধুবান্ধব হবে হয়তো। পথেঘাটেও এক-আধটা লোক আছে বটে, তবে কেও আমাদের বিশেষ পাত্তা দিল না। গ্রামের লোকেরা আর হয়তো আগেকার মতো অচেনা লোক দেখলে আগ্রহ দেখায় না।
ডানদিকে ঘুরে বেলতলার পাশে মুদিখানাটার সামনে গিয়ে উপস্থিত হলাম। ছোট্ট দোকান। কোনও খদ্দের নেই আপাতত। একজন লোক খালি গায়ে বসে গামছা দিয়ে হাওয়া খাচ্ছে। গল্পদাদুর বড়ছেলে হবে হয়তো।
কিছুক্ষণ চোখাচোখির পর উনিই সকৌতুক প্রশ্ন করলেন, ‘কাওকে খুঁজছেন বুঝি?’
পিছনের ভিটেবাড়িটার দিকে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটি কি গল্পদাদুদের বাড়ি?’
তিনি আরও কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থেকে হতাশ গলায় উত্তর দিলেন, ‘অবশেষে এলে তাহলে? তুমি প্রভাত জেঠার নাতি সোমেন, তাই তো?’
নামের ভুলটা আর ঠিক করিয়ে দিলাম না, বললাম ‘হ্যাঁ।’ কিন্তু অবশেষে এলাম, মানে?
কিছু জিজ্ঞেস করতে যাব, তার আগেই তিনি দোকান থেকে বেরিয়ে, ‘এসো’ বলে ভিটের দিকে এগোতে লাগলেন। আমরাও তার পিছু পিছু ভিটেবাড়ির ভিতরে গিয়ে প্রবেশ করলাম। গল্পদাদুর স্ত্রী অল্প বয়সেই নাকি মারা যান। তাদের তিন ছেলে। বড়ভাই মুদিখানা আর বাকি দুই ভাই চাষ-আবাদ সামলায়।
‘শুনছ, দেখ কে এসেছে।’ – বড়ছেলের ডাকে (বোধহয়) বড়গিন্নি কোনের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। অন্যান্য দুএকটা ঘর থেকে কয়েকটি মাথা উঁকিঝুঁকি মারল। সম্ভবত বাড়ির বাচ্চাকাচ্চারা হবে।
বড়গিন্নি বসার জন্য দুটো মোড়া এগিয়ে সাদরে বললেন, ‘বোসো বাছারা। তা বাবা সোমেন এত দিনে তোমার দাদুর গ্রামকে মনে পড়ল?’
এনার কাছেও দেখছি ‘সোমেন’ই পরিচিতি। যাইহোক উপযুক্ত উত্তর দিলাম।
তা তোমার সঙ্গীটি কে?
আমার পাড়ারই এক দাদা।
গোপালদা সৌজন্য বিনিময় করল।
ব্যাস! এতদূরই! এরপরই অস্বাভাবিক কাণ্ডটা ঘটে বসল।
আমি বলতেই যাচ্ছিলাম, ‘গল্পদাদুর সাথে তো রাস্তাতেই দেখা হয়ে গেছে...’ কিন্তু সে কথা আমার মুখ থেকে বেরনোর আগেই বড়গিন্নি বলে উঠলেন, ‘তবে যে লোকটি তোমাদের দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হতো, সেই লোকটিই অকালে চলে গেলো।’
বিকৃত মুখ করে ‘মানে?’ বলার কোনও প্রয়োজনই নেই। কথাটা পরিষ্কার – গল্পদাদু বেঁচে নেই। এতদিন ধরে যার সাথে এতো সখ্যতা, সে না বলে-কয়ে হঠাৎ চিরকালের মতো বিদায় নিয়ে নিল! কিন্তু এইসব ভাববার কি কোনও প্রয়োজন আছে? রাস্তায় কার সাথে দেখা হল আমাদের? মাথার ব্যামো তো আমার নেই! আমার থাকলেও গোপালদা তো ছিল। মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম, মুখ হাঁ করে কেমন ফ্যালফেলে দৃষ্টিতে গোপালদা আমার দিকে চেয়ে আছে। দুজনেরই কি কিছু বলার আছে?
কবে, কিভাবে, কখন দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল, সবই চোখ মুছতে মুছতে বড়গিন্নি একেরপর এক বলে চলেছেন বোধহয়। কিন্তু কোন কথাই আর কানে ধুকছে না।
ঘরে বসে খবরটা পেলেও যথেষ্ট মর্মদায়ক ঘটনা হতো। গল্পদাদুকে আর কোনোদিনই চোখের দেখা দেখতে পাব না। তিনি বুড়ো বয়সেও দেখা করে যেতেন, কিন্তু আমি একটি বারের জন্যও গেলাম না ইত্যাদি ইত্যাদি।
তবে এ যে রীতিমতো অলৌকিক ব্যাপার। শেষমেশ আমাকে এই দিনদুপুরের ভৌতিক গল্প উপহার দিয়ে গেল গল্পদাদু? ল্যাব্রটরির গল্প বলব বলে, শেষে ভূতের গল্প! গল্প কই এ তো সাক্ষাৎ সত্য ঘটনা। নানা চিন্তায় মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। গোপালদারও অবস্থা শোচনীয়।
আমার মুখ থেকে আর কথা ফুটছে না। লক্ষ্য করলাম বড়গিন্নির পাশে কখন যেন তার যা এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনিই কথা শুরু করলেন, ‘বাবা তোমার অনেক নাম করতেন। এবারও তো তোমার সাথে দেখা করতে যাবেন বলে কত লাফালেন, কিন্তু সে সব হল কই?’
কি ভাববেন না ভাববেন, তার পরোয়া না করে বলে ফেললাম, ‘গল্পদাদুর সাথে আমার দেখা হয়ে গেছে।’
বড়ছেলে উত্তর দিল, ‘কই না তো, গেল বারের পর তো আর বাবা শহরে যাননি।’
না, না, আমাদের বাড়িতে না, এখানেই।
তুমি এর মাঝে এসেছিলে বুঝি?
এর মাঝে না, আজই! আজই গল্পদাদুর সাথে দেখা হল।
সাক্ষীকে আর পেশ করলাম না। তারপর যা ঘটার তাই ঘটল। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ঘাত-প্রতিঘাতে অবশেষে শুনতে হল, ‘সত্যি বা মিথ্যে যাই হোক, তোমার এখানে আসা বেকার গেল না। তোমাকে দেখার সাধ নিয়ে মারা গেলেন, উনার আত্মা আর সে লোভ সামলাতে পারলো না...’
আর একদণ্ডও এখানে বসে থাকার ইচ্ছে থাকল না। বাড়ি ফেরার তাড়া অনুভব করলাম। আর হয়তো কখনই এই গ্রামে পা রাখব না। ভালোমন্দ দুটি কথা বলে বিদায় চাইলাম। এগারোটাও বাজেনি। দুপুরের আগেই বাড়ি পৌঁছে যাব। ‘আমরা চলি তাহলে।’
দরজার কাছে মুখ ঘুরিয়ে শেষবারের মতো ‘আসছি’ বলার সাথে সাথেই একটা কথা কানে এল – ‘গরম গরম পুরি, না খেয়েই চলে যাবে?’
***
শহরে ফেরার শেষ পাঁচটার বাসে বাড়ি ফিরছি। সীটে বসামাত্রই গোপালদা ঝিমোতে শুরু করেছে, কিন্তু আমরা মন চনমনে। হবে নাই বা কেন? কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে, ল্যাব্রটরিতে হরদম আনাগোনা সত্ত্বেও প্র্যাকটিকাল ব্যাপারটা এতদিনেও বুঝে উঠতে পারিনি। গল্পদাদুর এ বছরের গল্পটা যে নিখাদ প্র্যাকটিকাল গল্প, তার সঙ্কেত গোটা এক বছরেও ধরতে পারলাম কই? বুড়োদেরও অভিমান হয়। আমার এই গ্রামে না আসার অভিমান নাকি গল্পদাদু অনেকদিন ধরেই পুষে রেখেছিলো। অনেকদিন ধরেই ইচ্ছে ছিল আমাকে এই গ্রামে নিয়ে আসার – তবে বলে কয়ে মোটেই না। তার ওপর আমাকে নিয়ে একটু রগড় করলে তো আর কথাই নেই! সে কারণেই গোটা পরিবারকে নিয়ে আমাকে ভূত দেখানোর ফন্দি পাতা হয়েছিল। কিন্তু যদি আমি নাই বা আসতাম। তাহলে? গল্পদাদুর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ‘এবছর আমার দেখা না পেলে, তুমি ঠিকই এখানে হানা দেবে।’ তবে কবে দেব, সে তো জানা ছিল না। তাই অনেক আগে থেকেই বাড়ির সবাইকে শিখিয়ে-বুঝিয়ে প্রস্তুত করে রেখেছিল। গ্রামের লোকের এরকম স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় দেখে তো আমি অবাক। তার সরল উত্তর, ‘বাঃ! গ্রামের লোকেরা বুঝি সিনেমা-নাটক দ্যাখে না?’ এমন কঠিন কি আর? কেবল প্রতিদিনের কর্তব্য ছিল, বটতলায় আমার আসার অপেক্ষায় বসে থাকা। এলেই মজা  শুরু –
না, গল্পদাদু সত্যিই আর কোনোদিনও আমাদের বাড়ি আসবে না। আমিই সেই দায়িত্ব থেকে ক্ষান্ত দিয়ে এসেছি। এবার থেকে পয়লা বৈশাখে মিষ্টির ভাঁড় নিয়ে আমিই হাজির হব গল্পদাদুর কাছে। ভুলে গেলে চলবে না, অনেক আগেই একশটা গল্প পাওনা হয়ে গেছে।

----------------------------------------------------------- 

Saturday, 23 July 2016

মানি

নমি আমি কবিগুরু তব পদাম্বুজে
হে মধুসূদন আমি সুকুমার বুঝি
প্রতিটি অক্ষর আর সুর মেপে চলি
প্রতি নিঃশ্বাসে সুকুমার রায় বলি
দাঁড়াও পথিকবর শোন এ শোলক
নিজের হাতেই লেখা সমাধি ফলক
আমার সময়াধি হবে অমোঘ চিতায়
তখন আগুন হয়ো সুকুমার রায়।