Sunday, 31 July 2016

গল্প - গল্পদাদু

এবার যে গল্পদাদু এলো না –
গত পনের বছরে একবারও এই নিয়মের হেরফের হয়নি। নববর্ষের প্রথম দিনটিতে সকালবেলা ধূতি-পাঞ্জাবি পড়ে বাঁহাতে মিষ্টির ভাঁড় আর ডানহাতে লাঠি দোলাতে দোলাতে বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে হাঁক দিতো গল্পদাদু – ‘কিরে সৌমেন, আছিস তো বাছা!’ হ্যাঁ, আমার জন্যই গল্পদাদুর আসা।
গল্পদাদু ছিল আমার দাদুর বন্ধু – ‘এক গাঁয়েরই ফসল’। শেষে দাদু জমিভিটে বিক্রি করে স্থায়ীভাবে শহরে চলে এলে দুই বন্ধুর মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। দাদু যতদিন বেঁচে ছিল, ততদিন বন্ধুর টানে মাঝে মধ্যেই গল্পদাদু আমাদের বাড়িতে আসতো। সত্যনারায়ণ না কি যেন ছিল নাম তাঁর। আর যখনই আমাদের বাড়ি আসতো তখনই আমাকে কোলে বসিয়ে একটি করে গল্প বলতো। তার জন্যই তো তাঁর ওই নাম। আমার দাদু বলতো গল্পগুলো নাকি তাঁর নিজেরই বানানো। খাঁটি গ্রামের লোক হলেও দেশবিদেশের অনেক খবরাখবরই গল্পদাদু রাখতো। প্রচুর বইপত্রও নাকি ওঁর পড়া। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে সব অভ্যেস কমে যেতে থাকে, কিন্তু নতুন নতুন গল্প বানিয়ে সেগুলি বলার সখ – একটুও কমেনি। গ্রামে গল্পদাদুর নাকি অনেক নাতিনাতনি আছে – তারাও নাকি আমার মতো ভাগ্যবান শ্রোতা। তবে বড়দের মজলিশে গল্পদাদু ঘেঁষতো না। দাদু বাদে বাড়ির সকলের সাথে কেবল সৌজন্যমূলক সম্পর্ক ছিল। তাই দাদু মরে যাওয়ার পর থেকে (আর হয়তো আমি বড় হচ্ছি এই কথা মাথায় রেখে) তাঁর সময়-অসময়ে আমাদের বাড়িতে যাতায়াত বন্ধ হয়ে যায়। তবে বাংলা বছরের প্রথম দিনটিতে গল্পদাদুর দর্শন মিলতো। মা-কাকিমারা এসে প্রণামসহ সৌজন্য দেখিয়ে চলে যেত। বাবা-কাকারাও দুচারটে গ্রামের কথা জিজ্ঞেস করে সরে পড়তো। আর আমার কাকার একমাত্র মেয়ে সৌমি – বোর্ডিং স্কুলে কাটিয়ে গল্পদাদুর স্বাদটাই পেল না। আমার সাথে কিন্তু গল্পদাদুর সখ্যতা একটুও কমেনি। প্রতিবছরই আমার একটা নতুন গল্প পাওনা থাকে।
নাকি, থাকতো বলা উচিত! এবার তো কই এলোই না। গতবছরই তো খাসা একটা গল্প বলে গিয়েছিলো -  সাধারন আপেক্ষিকতাবাদের ওপর ভিত্তি করে বানানো গল্প, যেখানে মেয়ের বয়স বাবার বয়সকে ছাপিয়ে যাবে। আর বলে গিয়েছিলো পরের গল্পটা বলবে ল্যাব্রটরি নিয়ে – কিন্তু হল কই?
মনটা খারাপ না হওয়ার কোন কারণ নেই। দাদু মরে যাওয়ার পর থেকে ওই একটা মাত্র দিনই তাঁর দেখা মিলতো। ছোট থাকতে কোনও দিনই গল্পদাদুর গ্রামে যাইনি, এমনকি সে তো আমাদেরও গ্রাম। দাদুও কোনোদিন নিয়ে যায়নি। তারপর তো স্কুল-কলেজের ঠেলায় এতদিনে একবার সুযোগও হয়ে ওঠেনি। মনকে ফাঁকি দেব না – সেরকম ইচ্ছে হয়নি বরং। কিন্তু এবার ইচ্ছেটা একেবারে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বাড়ির কারোর ভ্রুক্ষেপ না থাকতে পারে, কিন্তু গল্পদাদুর সাথে আমার যে সেই কবেকার সম্পর্ক! লোকটার কি হল বা না হল, একবার খোঁজ নিয়ে দেখব না – এত নিষ্ঠুর তো আমি নই!
তাই মা-বাবার আপত্তির তোয়াক্কা না করেই স্থানীয় দাদা গোপালদাকে সঙ্গে করে সকাল সকাল বেরিয়ে পরলাম। গল্পদাদুর গ্রামের নাম কানুর। আমাদের শহর থেকে সরাসরি বাসেই যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। তবে বাস থেকে নেমে বেশ কিছুটা হাঁটাপথ পার করতে হবে। গল্পদাদুই পথের বর্ণনা দিয়ে রেখেছিল একসময়।
বাস থেকে যখন কানুর নামলাম তখন সবে ন’টা। ঘন্টা খানেকের পথ মাত্র। এবার পাকা রাস্তা ছাড়িয়ে ডানদিকে লালমাটির কাঁচা রাস্তা ধরার পালা। খুব একটা বড় গ্রাম না, তা দেখে বোঝাই যায়। পথের দুদিকে ছড়ানো জমি আর এখানে-ওখানে একটা দুটো করে মাটির বাড়ি – যা হয় আর কি!
বেলা না হলেও রোদের তেজ যথেষ্ট। আরও কতটা হাঁটতে হবে কে জানে। গল্পদাদু বলেছিল, এই রাস্তা সোজা এক বাঁধানো বটতলায় মোড় নেবে, দিয়ে ডানদিকে কিছুদূর গেলেই বেলতলা। বেলতলার কাছেই একটা মুদীর দোকান, তার পিছনেই তাদের ভিটেবাড়ি। মুদির দোকানটা হল তাঁর বড় ছেলের দোকান।
ইতিমধ্যে মিনিট পনেরো পথ হাঁটা হয়ে গেছে। গোপালদা এতেই ক্লান্ত। একপ্রকার হাঁপাতে হাঁপাতে আমায় জিজ্ঞেস করল – ‘হ্যাঁরে সমু, তোর গল্পদাদুর বয়স কত?’
আমার দাদু ঊনসত্তর বছর বয়সে মারা যায়। আমার বয়স তখন সবে দশ। গল্পদাদু নাকি দাদুর চেয়ে তিন বছরের ছোট। তাই হিসেব করে উত্তর দিলাম – ‘ওই প্রায় আশি হবে।’
গোপালদা অবাক হয়ে বলল, ‘এই বয়সে এই গরমে এতটা রাস্তা হেঁটে, তার ওপর আবার এক ঘন্টা বাস জার্নি করে তোদের বাড়ি যাওয়া বলিহারি ব্যাপার।’
আমি যুক্তি দিলাম, ‘গ্রামের লোকের কাছে আশিটা শহরের লোকের সত্তর। তাছাড়া আমার দাদুরা এককালে চাষ-আবাদ করেছে। নিজের হাতে লাঙলও টেনেছে শুনেছি...’
কথাগুলো বলতে বলতেই হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতো একটা অপ্রীতিকর আশঙ্কা আমার মাথায় খেলে গেল। গল্পদাদু বেঁচে আছে তো? এ বছর না আসার এই থেকে জুতসই কারণ আর কি হতে পারে! গল্পদাদুর যে বয়স হয়েছে, সে কথা তো বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ মনটা দমে গেল।
না, গল্পদাদুর আয়ু মাত্র আশি বছর হতে পারে না। গল্পদাদু আরও একশ বছর বাঁচবে। বাঁচবে নাই বা কেন? কারণ সামনে যে বৃদ্ধ লোকটি মুখে কৌতূহলী হাসি মেখে লাঠি হাতে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসছে, সে আর কেও না, আমার গল্পদাদু!
‘একি দেখছি, নাকি বুড়ো বয়সে চোখে ছানি পড়ল!’ গল্পদাদুর সরস অভিব্যক্তি।
কখনও করিনি যদিও, তবে আজ জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হল। ধরলামও বটে।
‘অন্ধ হয়ে গেলেও কি আমায় চিনতে পারবে না গল্পদাদু?’ অভিমানের সুরে বললাম, ‘এবার যে এলে না বরং?’
স্পষ্ট লক্ষ্য করলাম গল্পদাদুর মুখ থেকে স্মিত হাসিটা সপাট উধাও হয়ে গেল।
উত্তর করল, ‘সে আছে এক কারণ। তবে তুমি যে এসেছ তাতে আমার সাধ পূর্ণ হয়েছে।’
আমি বললাম, ‘তোমার থেকে আমার বেশি আনন্দ লাগছে। প্রথমবার আমি এই গ্রামে এলাম। ছোট থাকতে কেওই তো একবারের জন্য নিয়ে আসেনি। আর এর মাঝে নিজে থেকেও আর আসা হয়ে উঠেনি...’
আমার কথাগুলো দাদু শুনছে কি না সন্দেহ হল। কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে হঠাৎ। আমার ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তাড়াহুড়ো করে বলল, ‘ছিঃ ছিঃ, দেখ কাণ্ড। সব গল্প কি এই রোদে দাড়িয়েই হবে নাকি। সৌমেন, তোমাকে তো ভিটের ঠিকানা বলাই আছে? বন্ধুকে নিয়ে এগোও, আমি গিয়ে একটা ছোট্ট কাজ সেরে আসছি।’
ছোট্ট কাজটা যে আমাদের জন্য জলখাবারের ব্যবস্থা করা, তা বোঝাই গেল। কিন্তু ব্যাপারটা হল, আমি যে বাড়ির কাওকেই চিনি না। গিয়ে কিই বা বলে পরিচয় দেব?
গল্পদাদু আমার মনের কথা বুঝতে পেরে বলল, ‘তোমাকে কেও থোরাই না দেখে থাকুক, কিন্তু আমার বাড়ি কেন গ্রামের আরও অনেকেই তোমাকে ভালোমতই চিনবে। আর যাই হোক তুমি হলে গিয়ে আমাদের প্রভাতের নাতি। যাও গিয়ে, নিজের পরিচয় দাও, দেখবে...’
কথাটা সম্পূর্ণ না করে গল্পদাদু মুখ ঘুরিয়ে উলটোপথে হাঁটতে শুরু করল।
আমরাও অগত্যা হাঁটা দিলাম।
হ্যাঁ ঠিক তাই। কিছুদূর হেঁটেই সামনের মোরের বটতলাটা চোখে পড়লো। সেখানে কয়েকটি বুড়ো বসে আড্ডা দিচ্ছে। গল্পদাদুর বন্ধুবান্ধব হবে হয়তো। পথেঘাটেও এক-আধটা লোক আছে বটে, তবে কেও আমাদের বিশেষ পাত্তা দিল না। গ্রামের লোকেরা আর হয়তো আগেকার মতো অচেনা লোক দেখলে আগ্রহ দেখায় না।
ডানদিকে ঘুরে বেলতলার পাশে মুদিখানাটার সামনে গিয়ে উপস্থিত হলাম। ছোট্ট দোকান। কোনও খদ্দের নেই আপাতত। একজন লোক খালি গায়ে বসে গামছা দিয়ে হাওয়া খাচ্ছে। গল্পদাদুর বড়ছেলে হবে হয়তো।
কিছুক্ষণ চোখাচোখির পর উনিই সকৌতুক প্রশ্ন করলেন, ‘কাওকে খুঁজছেন বুঝি?’
পিছনের ভিটেবাড়িটার দিকে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটি কি গল্পদাদুদের বাড়ি?’
তিনি আরও কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থেকে হতাশ গলায় উত্তর দিলেন, ‘অবশেষে এলে তাহলে? তুমি প্রভাত জেঠার নাতি সোমেন, তাই তো?’
নামের ভুলটা আর ঠিক করিয়ে দিলাম না, বললাম ‘হ্যাঁ।’ কিন্তু অবশেষে এলাম, মানে?
কিছু জিজ্ঞেস করতে যাব, তার আগেই তিনি দোকান থেকে বেরিয়ে, ‘এসো’ বলে ভিটের দিকে এগোতে লাগলেন। আমরাও তার পিছু পিছু ভিটেবাড়ির ভিতরে গিয়ে প্রবেশ করলাম। গল্পদাদুর স্ত্রী অল্প বয়সেই নাকি মারা যান। তাদের তিন ছেলে। বড়ভাই মুদিখানা আর বাকি দুই ভাই চাষ-আবাদ সামলায়।
‘শুনছ, দেখ কে এসেছে।’ – বড়ছেলের ডাকে (বোধহয়) বড়গিন্নি কোনের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। অন্যান্য দুএকটা ঘর থেকে কয়েকটি মাথা উঁকিঝুঁকি মারল। সম্ভবত বাড়ির বাচ্চাকাচ্চারা হবে।
বড়গিন্নি বসার জন্য দুটো মোড়া এগিয়ে সাদরে বললেন, ‘বোসো বাছারা। তা বাবা সোমেন এত দিনে তোমার দাদুর গ্রামকে মনে পড়ল?’
এনার কাছেও দেখছি ‘সোমেন’ই পরিচিতি। যাইহোক উপযুক্ত উত্তর দিলাম।
তা তোমার সঙ্গীটি কে?
আমার পাড়ারই এক দাদা।
গোপালদা সৌজন্য বিনিময় করল।
ব্যাস! এতদূরই! এরপরই অস্বাভাবিক কাণ্ডটা ঘটে বসল।
আমি বলতেই যাচ্ছিলাম, ‘গল্পদাদুর সাথে তো রাস্তাতেই দেখা হয়ে গেছে...’ কিন্তু সে কথা আমার মুখ থেকে বেরনোর আগেই বড়গিন্নি বলে উঠলেন, ‘তবে যে লোকটি তোমাদের দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হতো, সেই লোকটিই অকালে চলে গেলো।’
বিকৃত মুখ করে ‘মানে?’ বলার কোনও প্রয়োজনই নেই। কথাটা পরিষ্কার – গল্পদাদু বেঁচে নেই। এতদিন ধরে যার সাথে এতো সখ্যতা, সে না বলে-কয়ে হঠাৎ চিরকালের মতো বিদায় নিয়ে নিল! কিন্তু এইসব ভাববার কি কোনও প্রয়োজন আছে? রাস্তায় কার সাথে দেখা হল আমাদের? মাথার ব্যামো তো আমার নেই! আমার থাকলেও গোপালদা তো ছিল। মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম, মুখ হাঁ করে কেমন ফ্যালফেলে দৃষ্টিতে গোপালদা আমার দিকে চেয়ে আছে। দুজনেরই কি কিছু বলার আছে?
কবে, কিভাবে, কখন দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল, সবই চোখ মুছতে মুছতে বড়গিন্নি একেরপর এক বলে চলেছেন বোধহয়। কিন্তু কোন কথাই আর কানে ধুকছে না।
ঘরে বসে খবরটা পেলেও যথেষ্ট মর্মদায়ক ঘটনা হতো। গল্পদাদুকে আর কোনোদিনই চোখের দেখা দেখতে পাব না। তিনি বুড়ো বয়সেও দেখা করে যেতেন, কিন্তু আমি একটি বারের জন্যও গেলাম না ইত্যাদি ইত্যাদি।
তবে এ যে রীতিমতো অলৌকিক ব্যাপার। শেষমেশ আমাকে এই দিনদুপুরের ভৌতিক গল্প উপহার দিয়ে গেল গল্পদাদু? ল্যাব্রটরির গল্প বলব বলে, শেষে ভূতের গল্প! গল্প কই এ তো সাক্ষাৎ সত্য ঘটনা। নানা চিন্তায় মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। গোপালদারও অবস্থা শোচনীয়।
আমার মুখ থেকে আর কথা ফুটছে না। লক্ষ্য করলাম বড়গিন্নির পাশে কখন যেন তার যা এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনিই কথা শুরু করলেন, ‘বাবা তোমার অনেক নাম করতেন। এবারও তো তোমার সাথে দেখা করতে যাবেন বলে কত লাফালেন, কিন্তু সে সব হল কই?’
কি ভাববেন না ভাববেন, তার পরোয়া না করে বলে ফেললাম, ‘গল্পদাদুর সাথে আমার দেখা হয়ে গেছে।’
বড়ছেলে উত্তর দিল, ‘কই না তো, গেল বারের পর তো আর বাবা শহরে যাননি।’
না, না, আমাদের বাড়িতে না, এখানেই।
তুমি এর মাঝে এসেছিলে বুঝি?
এর মাঝে না, আজই! আজই গল্পদাদুর সাথে দেখা হল।
সাক্ষীকে আর পেশ করলাম না। তারপর যা ঘটার তাই ঘটল। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ঘাত-প্রতিঘাতে অবশেষে শুনতে হল, ‘সত্যি বা মিথ্যে যাই হোক, তোমার এখানে আসা বেকার গেল না। তোমাকে দেখার সাধ নিয়ে মারা গেলেন, উনার আত্মা আর সে লোভ সামলাতে পারলো না...’
আর একদণ্ডও এখানে বসে থাকার ইচ্ছে থাকল না। বাড়ি ফেরার তাড়া অনুভব করলাম। আর হয়তো কখনই এই গ্রামে পা রাখব না। ভালোমন্দ দুটি কথা বলে বিদায় চাইলাম। এগারোটাও বাজেনি। দুপুরের আগেই বাড়ি পৌঁছে যাব। ‘আমরা চলি তাহলে।’
দরজার কাছে মুখ ঘুরিয়ে শেষবারের মতো ‘আসছি’ বলার সাথে সাথেই একটা কথা কানে এল – ‘গরম গরম পুরি, না খেয়েই চলে যাবে?’
***
শহরে ফেরার শেষ পাঁচটার বাসে বাড়ি ফিরছি। সীটে বসামাত্রই গোপালদা ঝিমোতে শুরু করেছে, কিন্তু আমরা মন চনমনে। হবে নাই বা কেন? কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে, ল্যাব্রটরিতে হরদম আনাগোনা সত্ত্বেও প্র্যাকটিকাল ব্যাপারটা এতদিনেও বুঝে উঠতে পারিনি। গল্পদাদুর এ বছরের গল্পটা যে নিখাদ প্র্যাকটিকাল গল্প, তার সঙ্কেত গোটা এক বছরেও ধরতে পারলাম কই? বুড়োদেরও অভিমান হয়। আমার এই গ্রামে না আসার অভিমান নাকি গল্পদাদু অনেকদিন ধরেই পুষে রেখেছিলো। অনেকদিন ধরেই ইচ্ছে ছিল আমাকে এই গ্রামে নিয়ে আসার – তবে বলে কয়ে মোটেই না। তার ওপর আমাকে নিয়ে একটু রগড় করলে তো আর কথাই নেই! সে কারণেই গোটা পরিবারকে নিয়ে আমাকে ভূত দেখানোর ফন্দি পাতা হয়েছিল। কিন্তু যদি আমি নাই বা আসতাম। তাহলে? গল্পদাদুর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ‘এবছর আমার দেখা না পেলে, তুমি ঠিকই এখানে হানা দেবে।’ তবে কবে দেব, সে তো জানা ছিল না। তাই অনেক আগে থেকেই বাড়ির সবাইকে শিখিয়ে-বুঝিয়ে প্রস্তুত করে রেখেছিল। গ্রামের লোকের এরকম স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয় দেখে তো আমি অবাক। তার সরল উত্তর, ‘বাঃ! গ্রামের লোকেরা বুঝি সিনেমা-নাটক দ্যাখে না?’ এমন কঠিন কি আর? কেবল প্রতিদিনের কর্তব্য ছিল, বটতলায় আমার আসার অপেক্ষায় বসে থাকা। এলেই মজা  শুরু –
না, গল্পদাদু সত্যিই আর কোনোদিনও আমাদের বাড়ি আসবে না। আমিই সেই দায়িত্ব থেকে ক্ষান্ত দিয়ে এসেছি। এবার থেকে পয়লা বৈশাখে মিষ্টির ভাঁড় নিয়ে আমিই হাজির হব গল্পদাদুর কাছে। ভুলে গেলে চলবে না, অনেক আগেই একশটা গল্প পাওনা হয়ে গেছে।

----------------------------------------------------------- 

No comments:

Post a Comment