Tuesday, 12 January 2021

রামায়ণের গল্প ২

বিশ্বাস করুন নারানের বাই না চাপলে রামায়ণ হতোই না। কাম-ধান্দা নেই একদিন দুম করে শ্রীরামচন্দ্র সেজে বৈকুণ্ঠে বসে আছে। লক্ষ্মীকে বসিয়েছে সীতা সাজিয়ে। একজনকে সোনার ছাতা ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে - সে নিশ্চয়ই লক্ষ্মণ। দুজন ফ্যান ঘুরাচ্ছে - ভরত-শত্রুঘ্ন হবে আর কি। আর একটা হনুমুখো হাত জোড় করে পায়ের কাছে বসে আছে...হনুমানই হবে। এদিকে নারদ শো দেখেই কাৎ। কেঁদে কেটে একাকার। গুরু কি সিন দেখালে মাইরি! নারদের আবার সবকিছু পাঁচকান না করলে পেটে ব্যথা শুরু হয়ে যায়। প্রথমে খবরটা পাড়ে বাপ ব্রহ্মার[১] কাছে। তারপর বাপ-বেটা মিলে পৌছায় শিবের কাছে। প্ল্যান হয় এর ওপর ইহলোকে ফিলিম হোক। কিন্তু তার আগে তো স্ক্রিপ্ট চাই। লিখবে কে? কম খরচে ছোট্টর মধ্যে নামাতে পারবে এরকম লোক চাই। বেদো আর গণশাকে দিয়ে লেখালে বিশাল হ্যাপা হবে, তাই তারা বাদ।

সুপারিশটা আসে শিবের কাছ থেকে। নারদের ভাই মহর্ষি ভৃগুর নাতিটা আজকাল দস্যুবৃত্তি করে বেড়ায়। করবে নাই বা কেন! তার বুড়ো বাপটা যে অশ্বিনীকুমারদের চ্যবন প্রাশ খেয়ে হারানো যৌবন ফিরে পেয়েছে। সারাদিন বৌয়ের সাথে প্রেমপিরীতেই ব্যস্ত। আর এদিকে ছেলে বিগড়ে হুলো বেড়াল। যতই হোক, বংশেরই ছেলে। তাই নারদ আর ব্রহ্মা মিলে ঠিক করে এই চোরকেই ঘষেমেজে সাধু বানাতে হবে। দুর্বৃত্ত রত্নাকরকে মহর্ষি বাল্মীকি বানাতে হবে।


____________________

[১]পৌরাণিক মতে ব্রহ্মা দশটি মানসপুত্রের জন্ম দেয়, যাদেরকে বলা হতো প্রজাপতি। মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত, পুলহ, ক্রতুজ, বশিষ্ঠ, দক্ষ, ভৃগু ও নারদ - এই  প্রজাপতিরাই মানবজাতির আদিপিতা। নারদ এদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়। ভৃগু নাতির দৌলতে খ্যাত, দক্ষ খ্যাত নিজের যজ্ঞের জন্য (যেখানে শিব আর সতী নেমন্তন্ন পাননি)। আর এই শেষ তিন প্রজাপতিকে বাদ দিয়ে বাকি সাতজন একসাথে সপ্তর্ষি নামে পরিচিত।

Saturday, 9 January 2021

রামায়ণের গল্প ১

জানিনা ঠিক কোন মালটা - সেকালের বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ, নাকি তাকে ল্যাং মেরে রাজা হওয়া তারই সভাসদ দনুজমর্দ্দন (দত্যিদানো টাইট করেছে, নামেই) গৌড়েশ্বর গণেশ, নাকি পরবর্তী শাসক রুকনউদ্দিন বারবাক শাহ - তবে এদেরই একজনের রাজসভায় ছন্দের কেরামতি দেখিয়ে নাম কামিয়েছিল জনৈক সভাসদ ভৈরব ওঝার ভাইপো, নদীয়ার ফুলিয়াগ্রামের কবি কৃত্তিবাস ওঝা[১]। কিন্তু রাজা তাকে রাজপণ্ডিতের সম্মান দিতে চাইলে, চার মেয়ের বাপ মিনসে কৃত্তিবাস ঢং দেখিয়ে বলে - "কারো কিছু নাহি লই করি পরিহার।/ যথা যাই তথায় গৌরব মাত্র সার।।" তোর ব্যাপার! এদিকে রগড় করতে রাজাও কম যায় না - হাতে ধরিয়ে দিল হাতি পোষার কাজ। "সন্তুষ্ট হইয়া রাজা দিলেন সন্তোক।/ রামায়ণ রচিতে করিলা অনুরোধ।।" আর যায় কুথি, "বাপ মায়ের আশির্বাদ গুরুর কল্যাণ" নিয়ে কৃত্তিবাস ওঝা "রাজাজ্ঞায় রচে গীত সপ্তকাণ্ড গান।"[২]


____________________

[১]বাঙালি ব্রাহ্মণদের আদি নিবাস পূর্বের রাঢ়ভূমি এবং উত্তরের (মালদার) বারিন্দ অঞ্চল। রাঢ়ি এবং বারেন্দ্রি ব্রাহ্মণদের পদবী ঠিক হতো তাদের গ্রাম বা পরগণার নামে। তাই ভাদর গ্রামের ব্রাহ্মণরা পরিচিত হল ভাদুরি নামে (অর্থাৎ পদবীতে), কুশ গ্রামের ব্রাহ্মণরা কুশারি (যা ভবিষ্যতে হবে পিরালী, পরে ঠাকুর), গাঙ্গুল গ্রামের ব্রাহ্মণরা (উপাধ্যায় যোগ করে) পদবী রাখলো গঙ্গোপাধ্যায়। বর্ধমানের চাটুতি পরগণার ব্রাহ্মণদের এক দল যেমন পদবী ঠিক করলো চট্টোপাধ্যায়, তেমনই আরেক দল ঠিক করলো চট্টরাজ। এরকমভাবেই বাঁকুড়ার অম্বিকা পরগণার মুখুটি গ্রামের ব্রাহ্মণদের পদবি মুখুটি - তাতে উপাধ্যায় জুড়ে হয় মুখোপাধ্যায়। এই মুখোপাধ্যায়ের এক দল নদীয়াবাসী হলে পদবী থেকে ভিটা গ্রামের মুখুটি ঝেড়ে ফেলে কেবল উপাধ্যায়টা ধরে রাখে। উপাধ্যায় পরবর্তীকালে লোকমুখে বিকৃত হয়ে হয় ওঝা।

[২]নানা মুনির নানা মত। অনেকের মতে কৃত্তিবাস ওঝা তার গুরু আচার্য দিবাকরের পরামর্শে সাধারণ পাবলিকের কথা ভেবে রামায়ণের পাঁচালী লিখতে শুরু করে; গৌড়েশ্বর করেছিল কেবল পৃষ্ঠপোষণ।

Wednesday, 6 January 2021

রামায়ণের গল্প ০

দশ বছর হতে চললো। কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছি। হাওড়া ষ্টেশনে হঠাৎ বাই চাপায় - গীতাপ্রেসের গুমটি থেকে ১১০ টাকা খসিয়ে (নো ছাড়) কৃত্তিবাসের রামায়ণটা কিনেছিলাম। কিনে অর্ধেকটা পড়েছিলাম - আদিকাণ্ডের অর্ধেকটা, পুরোটার না। তারপর এতদিন অব্দি সেটি আলমারিতে ঢোকানোই ছিল। নতুন বছরে নতুন কিছু করার (রেজুলুশান) জেরেই ঠিক করলাম প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে, দাঁত মেজে, মুখ ধুয়ে, চা খেয়ে...হাগা পেলে হেগে এসে...একটু একটু করে রামায়ণটা পড়বো। পড়ে রাখি - এ'বছর ভোট শেষে রাজ্যে বিজেপি সরকার এলে কাজে দেবে...প্রাণ বাঁচাতে।

তো, পড়া শুরু করে দিয়েছি। বলার অপেক্ষা রাখে না, রামায়ণ শুধু সৎমায়ের মামদোবাজির ফলে বুড়ো বাপের ভীমরতি কিংবা দেওরের দাবড়ানির পরিণতিতে বৌদির বারোটা বাজার গল্পেই সীমাবদ্ধ নেই (হলে, মহাকাব্য বলতো থোড়াই)। রামায়ণের খাঁজে খাঁজে, প্রতি পাতার ভাঁজে ভাঁজে আছে বাম্পার সব গল্প, মনকাড়া ঘটনা আর হাজার হাজার জানা-অজানা খুঁটিনাটি তথ্য। কিছু কিছু বহুকথিত, কিছু কিছু অনেকেই জানেন না। এই যেমন, বাপেরও বাপ নিরঞ্জন, তাঁর তিন বেটা ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। তাদের আবার এক বোনও আছে - কন্দিনী। কন্দিনীর মেয়ে ভানু, ভানুর বেটা মরীচ, মরীচের বেটা কশ্যপ, কশ্যপের বেটা সূর্য - আর এই সূর্যের নামেই সূর্যবংশ - যার ঘরে জন্মাবে শ্রীরামচন্দ্র।

তাই ঠিক করেছি, এক-দুই পাতা করে রোজ রামায়ণ পড়বো আর এরকমই গল্প-ঘটনা-তথ্য...যা বলবেন, আলাদা করে এখানে লিখে রাখবো। ভাষা কেমন হবে আশা করি টের পেয়ে গেছেন। আঘাত পেলে নিজগুণে মাফ করে দেবেন (অথবা ভোটটা বিজেপিকে দেবেন)। 

দেখি, এভাবে এবার কতদিন টানতে পারি!

জয় শ্রী রাম!