সত্তরের দশক। পরিচালক নাতি তার দাদুর তৈরি চরিত্রগুলো নিয়ে নিজের মতো কাহিনি লিখে সিনেমা বানাবে বলে উঠেপড়ে লেগেছে। ছায়াছবির এক দৃশ্যে ভবঘুরে চরণদাস বাউল রাজাকে গান গেয়ে শোনাচ্ছে। বাউলের অভিনয় করবেন গায়ক রবীন মজুমদার। সুরকার কমল দাশগুপ্তের জুটি রবীন মজুমদার বহুদিন আগেই পেশাদারি গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। ইদানীং মনোযোগ দিয়েছেন অভিনয়ে। পাছে অভিমান করে বসেন, তাই বাউল চরিত্রে অভিনয়ের সাথে সাথে বাউলের গানটি গাওয়ারও প্রস্তাব তাকে দেওয়া হয়। তিনি প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।
সিনেমার ডজনখানেক গানের সবকটিই অনুপ ঘোষালের গাওয়া। কিন্তু বাউল গান তাঁর কণ্ঠে বেমানান। শেষমেশ গানটি গাইলেন অমর পাল - 'দেখ ভাল জনে রইলো ভাঙ্গা ঘরে / মন্দ যে সে সিংহাসনে চড়ে'।
সেখান থেকেই অমর পালের সাথে আমার পরিচয়। জানলাম তিনি লোকসংগীত শিল্পী। 'কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়'-এর পর খুঁজে খুঁজে তাঁর আরেকটি গান শুনলাম - 'পরের জায়গা পরের জমিন ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো এই ঘরের মালিক নই।' পড়ে গেলাম প্রেমে। আর ঠিক তার পরের গানেই জুটলো যাতনা। এক আগন্তুক কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসলো। 'উঠ উঠ গৌর চাঁদ নিশি পোহাইল...' গানটির শেষ লাইন - 'করজোড় করি কহে বাসুদেব রায়...'। কে এই বাসুদেব রায়?
'সনার বরণ গৌর চাঁদ - এলো নদিয়ায় রে।' ভাবলাম নদিয়ায় একবার ঢুঁ মেরে দেখি। আর যখন পদবীটি হল 'রায়', তখন নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের বংশপঞ্জিটায় চোখ বোলালে ক্ষতি কি! কিন্তু সে গুড়ে বালি। রাজবংশের আদি পুরুষ ভবানন্দ (যদিও মজুমদার) থেকে কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের মাঝে কোনো বাসুদেবকেই খুঁজে পেলাম না। পরে বুঝলাম বৃথাই সন্ধান। কারণ, গৌর শ্রীচৈতন্যকে 'করজোড় করি' কিছু বলার সুযোগ নদিয়ার কোনো রাজারই ছিল না - মহাপ্রভুর মহাপ্রস্থানকাল ষোলো শতকে, যেখানে ভবানন্দ বাংলার নবাব ইসমাইল খাঁর কৃপায় সবে রাজা হচ্ছেন ঠিক তার পরের শতকে।
অবশেষে সাহায্য মিললো এক ভাইয়ের কাছ থেকে। বিষয়টি হল ভণিতা। বারো ক্লাসে পড়েছিলাম, বেমালুম ভুলেও গিয়েছিলাম - কবিতা বা গানের শেষ অংশে রচয়িতার ইচ্ছে হলে স্বয়ং নিজের নামটি জুড়ে দিয়ে কবিতা বা গানটি শেষ করে। এই রেওয়াজকে ভণিতা বলা হয়ে থাকে। কৃত্তিবাস ওঝার রামায়ন ('সীতা সীতা বলি রাম ছাড়িলা নিশ্বাস / গাইল উত্তরাকাণ্ডে কবি কৃত্তিবাস') কিংবা রামপ্রসাদী গান ('গুরুদত্ত বীজ রোপন করে , ভক্তিবারি সেঁচে দেনা । / একা যদি না পারিস মন রামপ্রসাদ কে সঙ্গে নে না ।।') ছাড়াও আরো গাদা গাদা উদাহরণ আছে। তাহলে দাঁড়াচ্ছে, বাসুদেব রায় মহাশয় আর কেউ নন স্বয়ং গানটির গীতিকার। সমস্যা সমাধান!
কিন্তু অমর পাল সেখানেই মুক্তি দিলেন না। আগ্রহকে খামচে ধরলেন আরেকটি গানে। তার আগে 'রাই জাগো রাই জাগো', 'বৃন্দাবন বিলাসিনী', 'হরি দিন তো গেল' গানগুলি শুনিয়ে দিলেন। শেষে পেশ করলেন 'জাগো হে এ নগরবাসী'।
কোনোদিন আশা করিনি গান বুঝতে ভূগোল ভোগাবে। এই গানে হল ঠিক তাই। ব্যাপারটি কি, খুলে বলা দরকার। গানের শুরুতে 'মুখে জয় রাধা শ্রী রাধা' থাকলেও গানের মাঝে এসে হাজির হয়েছেন আরও অনেক দেব, দেবী এমনকি পুণ্যস্থান। গায়ক একে একে চার দিকের নাম নিয়ে বন্দনা করে চলেছেন সেই দিকের বিশেষ বিশেষ অধিষ্ঠাত্রী দেব, দেবী বা পুণ্যস্থানের। যেমন, 'উত্তরে বন্দনা করি কৈলাস শিখর', সাথে 'তার পাছে' আছেন 'শিব আর পার্বতী' - গায়ক সকলকে বন্দনা করছেন। পূর্বদিকে আছেন শাশ্বত সূর্যদেব। তাই গায়ক গাইছেন - 'পূবেতে বন্দনা করি পূবের দিবাকর'।
উত্তর আর পূর্বদিক নিয়ে কোনো সমস্যা হল না। সমস্যা শুরু হল বাকি দুটি দিক নিয়ে - পশ্চিম আর দক্ষিণ। পশ্চিমের ধাঁধা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে হল না। একটু বুদ্ধি খাটিয়েই বুঝতে পারলাম গায়ক কেন - 'পশ্চিমে বন্দনা করি ঠাকুর জগন্নাথ'। পুরীর জগন্নাথ দেবের জগন্নাথ মন্দির ওড়িশা রাজ্যে অর্থাৎ পূর্ব ভারতে। সেটি পশ্চিমে গেল কি করে? উত্তরটি সহজ। শ্রী জগন্নাথ দেব ভারতবর্ষের পূর্বভাগে বিরাজ করলেও বাংলার সাপেক্ষে তিনি পশ্চিমে। গীতিকার যদি পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডিতে বসেও গানটি লেখেন, জগন্নাথ দেব তার পশ্চিমেই থাকবেন।
ভুল দূরে থাক, ভ্রান্তি ষোলোআনা। এবার পালা দক্ষিণের। এবং এই দক্ষিণের রহস্য উদঘাটনেই খেতে হল বারোআনা নাকানিচোবানি। এমনকি যুক্তিতর্ক খুঁজে পাওয়ার পরেও যে সেটি সম্পূর্ণ ঠিক, এমন দাবি করার আত্মবিশ্বাসেও রীতিমতো ফাঁকি রয়ে গেছে। তবু জানাতে ক্ষতি কি!
আছে 'দক্ষিণে বন্দনা করি কালিদয় সাগর'। কালিদয় সাগরটি কোথায়? আমার জানা নেই। গীতিকার যখন নিজের অবস্থান - বাংলা - ঠিক করে দিয়েছেন তখন স্বাভাবিক ইঙ্গিতটি যাবে বঙ্গোপসাগরের দিকে। যেমন আছে গঙ্গাসাগর। জানিয়ে রাখি, কালিদয় সাগর যে আস্ত একখানি সাগর কখনই হবে না, এ ধারণা শুরু থেকেই ছিল (যেমন না গঙ্গাসাগর সাগর, না বঙ্গোপসাগর)। যাই হোক, এবার প্রশ্ন হল কালিদয় সাগর কি বঙ্গোপসাগরেরই কোনো প্রতিশব্দ - যেটি হওয়ার সম্ভাবনা কালিদাসের সাথে আদি শঙ্করের সাক্ষাতের সম্ভাবনার কাছাকাছি, না কি উপসাগরের বিশেষ একটি অংশ? মুহূর্তে মনে পড়ে গেল কালাপানির কথা। এই কালাপানি পেরিয়েই, সকলে জানে, আছে আন্দামানের সেলুলার জেল। যেখান থেকে সসম্মানে ফিরে এসেছিলেন বীরপুরুষ সাভারকর।
এখন 'কালি' আর 'কালা'-র মধ্যে কোনো ফারাক নেই। আর পানি সাগর হতে আপত্তি কোথায়? কিন্তু না! সহজেই দেখিয়ে দেওয়া যায় কালিদয় সাগর আর কালাপানি এক নয়। উপায় অনেক। প্রথমত, কালাপানি কেবল একটিমাত্র ভৌগলিক স্থান নয় - ভারত-নেপাল সীমান্তে উত্তরাখণ্ড রাজ্যে আরেকটি কালাপানি আছে। প্রশ্ন জাগতে পারে সমুদ্র সীমা ছাড়িয়ে এতদূরে এরকম মহাদেশীয় অবস্থানে 'পানি' এল কোথা থেকে! উত্তর - হিমালয়। এই কালাপানির পানি মিঠাপানি। নদীর জল। পানি যে সাগরের পানিই হবে সেরকম কোনো শর্ত নেই। স্থানীয় কালী (নেপালে মহাকালী) নদী যে দুটি প্রধান জলধারা মিলে সৃষ্টি হয়েছে তার একটি হল শার্দা, যার আরেক নাম কালাপানি। এমনকি এই কালাপানি নদীর উপত্যকায় অবস্থিত বিশেষ একটি অঞ্চলের নামও কালাপানি।
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমে গাইবান্ধা জেলায় মাত্র ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ছোট্ট একটি নদী আছে যেটির নামও কালাপানি। কোনটিকে ছেড়ে কোনটিকে তাহলে কালিদয় বলবো?
আছে 'দক্ষিণে বন্দনা করি কালিদয় সাগর'। কালিদয় সাগরটি কোথায়? আমার জানা নেই। গীতিকার যখন নিজের অবস্থান - বাংলা - ঠিক করে দিয়েছেন তখন স্বাভাবিক ইঙ্গিতটি যাবে বঙ্গোপসাগরের দিকে। যেমন আছে গঙ্গাসাগর। জানিয়ে রাখি, কালিদয় সাগর যে আস্ত একখানি সাগর কখনই হবে না, এ ধারণা শুরু থেকেই ছিল (যেমন না গঙ্গাসাগর সাগর, না বঙ্গোপসাগর)। যাই হোক, এবার প্রশ্ন হল কালিদয় সাগর কি বঙ্গোপসাগরেরই কোনো প্রতিশব্দ - যেটি হওয়ার সম্ভাবনা কালিদাসের সাথে আদি শঙ্করের সাক্ষাতের সম্ভাবনার কাছাকাছি, না কি উপসাগরের বিশেষ একটি অংশ? মুহূর্তে মনে পড়ে গেল কালাপানির কথা। এই কালাপানি পেরিয়েই, সকলে জানে, আছে আন্দামানের সেলুলার জেল। যেখান থেকে সসম্মানে ফিরে এসেছিলেন বীরপুরুষ সাভারকর।
এখন 'কালি' আর 'কালা'-র মধ্যে কোনো ফারাক নেই। আর পানি সাগর হতে আপত্তি কোথায়? কিন্তু না! সহজেই দেখিয়ে দেওয়া যায় কালিদয় সাগর আর কালাপানি এক নয়। উপায় অনেক। প্রথমত, কালাপানি কেবল একটিমাত্র ভৌগলিক স্থান নয় - ভারত-নেপাল সীমান্তে উত্তরাখণ্ড রাজ্যে আরেকটি কালাপানি আছে। প্রশ্ন জাগতে পারে সমুদ্র সীমা ছাড়িয়ে এতদূরে এরকম মহাদেশীয় অবস্থানে 'পানি' এল কোথা থেকে! উত্তর - হিমালয়। এই কালাপানির পানি মিঠাপানি। নদীর জল। পানি যে সাগরের পানিই হবে সেরকম কোনো শর্ত নেই। স্থানীয় কালী (নেপালে মহাকালী) নদী যে দুটি প্রধান জলধারা মিলে সৃষ্টি হয়েছে তার একটি হল শার্দা, যার আরেক নাম কালাপানি। এমনকি এই কালাপানি নদীর উপত্যকায় অবস্থিত বিশেষ একটি অঞ্চলের নামও কালাপানি।
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমে গাইবান্ধা জেলায় মাত্র ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ছোট্ট একটি নদী আছে যেটির নামও কালাপানি। কোনটিকে ছেড়ে কোনটিকে তাহলে কালিদয় বলবো?
দ্বিতীয়ত, বিখ্যাত যে কালাপানির কথা আমরা ছোটোবেলা থেকে (ইতিহাস বই মারফৎ) শুনে আসছি তার কোনো নিদিষ্ট ভৌগলিক অবস্থান নেই। পৌরাণিক মতে কালাপানি হল ভূখণ্ড পারের সমুদ্র। সে যেকোনো সমুদ্র হতে পারে। আর সে 'সমুদ্র উল্লঙ্ঘন' মানেই জাত খোয়ানো। হিন্দু ধর্মের এই প্রাচীন কুসংস্কার মধ্যযুগ পেরিয়ে আধুনিক যুগেও জায়গা করে নিয়েছে। তাই ভারতবর্ষে কোনোদিন ফার্ডিনান্ড ম্যাগেলান বা আমেরিগো ভেসপুচি জন্মাতে পারেনি।
সিপাহি বিদ্রোহের পর থেকে রাজনৈতিক কয়েদিদের দ্বীপান্তরের ব্যবস্থা শুরু করে ব্রিটিশ সরকার। উনিশ শতকের শেষে আন্দামানে গড়ে ওঠে কুখ্যাত সেলুলার জেল। কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু কয়েদিদের সৌজন্যে সেলুলার জেলের নাম হয়ে দাঁড়ালো কালাপানি। কারাবাসে কোনো অসম্মান নেই, জাতের বালাই যত কালাপানি। এমনকি কয়েদি নির্বাসনের অনেক আগে থেকেই ধর্মান্ধ ভারতীয় বেগার শ্রমিকদের দেশান্তরের সময়েও কালাপানি পেরনোর ভয় ভর করে উঠতো।
সিপাহি বিদ্রোহের পর থেকে রাজনৈতিক কয়েদিদের দ্বীপান্তরের ব্যবস্থা শুরু করে ব্রিটিশ সরকার। উনিশ শতকের শেষে আন্দামানে গড়ে ওঠে কুখ্যাত সেলুলার জেল। কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু কয়েদিদের সৌজন্যে সেলুলার জেলের নাম হয়ে দাঁড়ালো কালাপানি। কারাবাসে কোনো অসম্মান নেই, জাতের বালাই যত কালাপানি। এমনকি কয়েদি নির্বাসনের অনেক আগে থেকেই ধর্মান্ধ ভারতীয় বেগার শ্রমিকদের দেশান্তরের সময়েও কালাপানি পেরনোর ভয় ভর করে উঠতো।
পুরনো ধারণা হলেও, কালাপানি শব্দের ব্যবহার তুলনায় আধুনিক। শাস্ত্র বা সে ধরণের পুঁথিপত্রে 'কালাপানি' শব্দের সরাসরি কোনো ব্যবহার নেই। সবার উপরে, কালিদয় সাগরের সাথে কালাপানির ঐতিহাসিক যোগসূত্রের তথ্য অন্তত আমার চোখে পড়েনি।
এত পরিশ্রম নিতান্তই কৌতূহলের খাতিরে। কারণ, কালিদয় সাগর যে আর কিছুই না, আজকের বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক পুরাকীর্তি মহাস্থানগড়ের অন্যান্য বিশখানেক দর্শনীয় স্থানের একটি, সেটি মুহূর্তেই খুঁজে বের করে নেওয়া যায়। প্রাচীন বঙ্গের পুণ্ড্রবর্ধন নগর আজকের মহাস্থানগড়। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বগুড়া জেলার অন্তর্গত এই গড়ে আছে মানকালীর ঢিবি থেকে বৈরাগীর ভিটা, বেহুলার বাসর ঘর থেকে পরশুরামের প্রাসাদ। তেমনই একটি দর্শনীয় স্থান হল কালীদহ সাগর। আদতে একটি বিল কালীদয় সাগর ঐতিহাসিক গড় জরিপা দুর্গের উত্তরদিকের পরিখার কাজ করতো।
মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে শতভিষা নক্ষত্র (আরেক নাম বরুণ) যোগ কালে গঙ্গাস্নান করলে শত সূর্যগ্রহণকালে গঙ্গাস্নান অপেক্ষাও বেশি পুণ্য হয়। লোকমুখে প্রচলিত নাম বারুণী স্নান। তবে কাছে গঙ্গা না পেলে মানুষ কি করবে? উপায় সহজ, কাছেপিঠের কোনো খাল-বিলের পাড়ে প্রথমে গঙ্গাপুজ সেরে নিয়ে জলে ডুব দিলেই হল - 'যা দেবী সর্বভুতেষূ...'। এই কারণে এককালের পরিখা কালীদয় সাগর আজ হয়ে উঠেছে স্থানীয় হিন্দুদের তীর্থ। গঙ্গাপুজা, সংকীর্তনের সাথে সাথে পাপমোচন পিণ্ডদান কিছুই বাকি থাকে না এখানে। সাথে দিন পনেরো ধরে আয়োজন চলে মেলার।
এই তাহলে 'দক্ষিণে বন্দনা করি কালিদয় সাগর'। কিন্তু দক্ষিণ হল কোথায়। অখণ্ড বাংলার সোজা উত্তরভাগে অবস্থান করছে কালীদয় সাগর। হে মহাপ্রভু, উত্তরের স্থান দক্ষিণে আসে কি করে। তা কি অসম্ভব! মোটেই না। ভূগোল বলে, উত্তরের উত্তের গেলে আগের উত্তরটি দক্ষিণ হয়ে যায়। অর্থাৎ যিনি গানটি লিখছেন, তিনি অবশ্যই নদিয়ায় বসে লিখছেন না তাহলে। তিনি আছেন বাংলার বাইরে - উত্তরে অসমের কোথাও। কিন্তু অসমের কোথায়? এবার সেটি খোঁজার পালা।
সাহায্য এল গানের সুত্রেই। 'মুখে জয় রাধা শ্রী রাধা বইলা পোহাইল নিশি'। 'বইলা' রাঢ়ী উপভাষার কথা না সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। কিন্তু সেটি রাজবংশী না বঙ্গালী, তা বলা কঠিন - অন্তত আমার পক্ষে। তাহলে উপায়? উত্তরবঙ্গ এবং অসম সংলগ্ন এলাকায় চলতি উপভাষাগুলির স্থানীয় সাহিত্য বা গানগুলির ওপর একবার করে চোখ বুলিয়ে দেখার বুদ্ধিটা মাথায় এল। যদি কিছু মেলে।
ইউরেকা! মিলেও গেল! একটি বই পেলাম। বলা উচিৎ তার একটি মাত্র অধ্যায় পেলাম। বইটির নাম জানা গেল না তবে তার এই বিচ্ছিন্ন অধ্যায়টি - 'বরাক উপত্যকায় লোকশিল্পে লোকসাহিত্যের স্বরূপ সন্ধান' - থেকে সোনার ডিমটি পেয়ে গেলাম। তার আগে বলে রাখি বরাক উপত্যকাটি কোথায়? বর্তমান আসামের (পূর্বভাগে) কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি - এই তিন জেলা নিয়ে বরাক নদীর অববাহিকায় বরাক উপত্যকা অবস্থান করছে। স্বাধীনতার আগে করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি (বর্তমানে পূর্ববঙ্গ বাংলাদেশের) সিলেট জেলার অন্তর্গত ছিল। সেখান থেকেই স্থানীয় লোকেদের মুখের ভাষার নাম হয়েছে সিলেটি।
সিলেটি ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বরাক অঞ্চলের লোকসাহিত্য স্থানীয় লোকশিল্প এবং সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। 'আইমঙ্গল, বিচার গান, থাকগান, ধামাইল, মারিফতি গান, শিতালংসার গান, গাজীর গান, ফকিরি গান, পটের গান, জারি গান, মুর্শিদি গান, হিন্দু-মুসলিম বিবাহগীতি, পই বা ভাঙ্গানি, প্রবাদ, ছড়া, লোকসংগীত, নাজিম গীতি, ওঝা নাচ ও গান, বারমাস্যা, মেয়েলী গীত ও ব্রতকথা, কিচ্ছা বা লোককথা, হাছনরাজার গান ইত্যাদি' এই লোকসাহিত্যের ফসল এবং প্রত্যেকটির সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে অনন্য সব লোকসংস্কৃতি।
এরকমই একটি লোকসংস্কৃতির নিদর্শন হল বাঙালি হিন্দু-মহিলাদের সূর্যব্রত পালন। উপোস থাকা, মানত করা ইত্যাদির সাথে সাথে সূর্য বন্দনার রীতি আছে এই ব্রতে। ঊষাকালে সূর্য উদয় হওয়ার আগে থেকেই গান গেয়ে সূর্য বন্দনা শুরু করতে হয়। সূর্য বন্দনাকালে প্রচলিত গানগুলির মধ্যে একটি গান শুরু হচ্ছে এইভাবে -
বন্দনা রে হরি দেব নারায়ন।
প্রথমে বন্দনা করি শ্রী গুরু চরণ।।
অবাক কাণ্ড! দেখি, এই গানের মাঝেই একেবারে অক্ষত অবস্থায় 'জাগো হে নগরাবাসী'র চার দিকের চার দেবদেবীর উল্লেখ আছে। 'পূর্বে বন্দনা করি পূর্বে উদয় ভানু'...'পশ্চিমে বন্দনা করি পশ্চিমে সিংহাসন' (তার পাছে বন্দনা করি ক্ষেত্র জগন্নাথ)...'উত্তরে বন্দনা করি দেবতার আসন' এবং অবশ্যই, দক্ষিণে বন্দনা করি কালিদয় সাগর'।
শান্তি! শান্তি! শান্তি!
শান্তি! শান্তি! শান্তি!
বলার অপেক্ষা রাখে না, এই লোকগীতিই শতশত মানুষের মুখে মুখে এসে পৌঁছেছে বাংলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে; অবশেষে অমর পালের কণ্ঠে। এরপর কোথায় যাবে জানা নেই, তবে এটুকু জানা আছে, গানখানি যেখানেই যাক, বরাবরের মতো উত্তরে বন্দনা পাবে কৈলাস শিখর, পূর্বে দিবাকর, পশ্চিমে ঠাকুর জগন্নাথ আর দক্ষিণে কালিদয় সাগর।
*****
পুনশ্চ: ভৌগলিক বিচারে কালীদহ সাগর বরাক উপত্যকার এমন কিছু দক্ষিণে অবস্থান করে না (আসলে অবস্থান করছে পশ্চিমে)। এমনকি উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত বরাক উপত্যকার কিছু কিছু অঞ্চল কালীদয় সাগরেরই দক্ষিণে অবস্থান করছে। সংশয়ের গোদ, তার উপরে বিষফোঁড়া হয়ে হাজির হল দক্ষিণে চট্টগ্রামের ফেনী সদরের কালীদহ ইউনিয়ন। আরেকটি কালিদয় সাগরের শরিক।
তাতে কি হল? দক্ষিণে অবস্থান হলেও, না এই জায়গা তীর্থক্ষেত্র, না এর নামের শেষে সাগর আছে। তবে তার সাথে এই তথ্যটিও জানিয়ে রাখা দরকার - আদিকবি কানাহরি দত্তের মনসামঙ্গল কাব্য পূর্ববঙ্গে পদ্মপুরাণ নামে বেশি জনপ্রিয় এবং তার লেখকও আলাদা - বাইশকবি। পদ্মপুরাণে 'পদ্মার জন্ম বিবরন' পর্বে উল্লেখ আছে - 'উপনীত হয়ে শিব কালীদহ তীরে। / বিল্ববৃক্ষ তলে বসে প্রফুল্ল অন্তরে' লাইন দুটির সূত্র ধরে সিলেট, সুনামগঞ্জ (সিলেটের পশ্চিমে) সহ স্থানীয় হাওরাঞ্চলের (সাগরসদৃশ বিস্তৃত জলাভূমিকে বলে হাওর) বাসিন্দারা পদ্মপুরাণে নিজেদের অধিকার জাহির করতে দাবি করে যে তাদের আজকের বাসস্থান এককালে এই কালীদহ সাগরের নীচে ছিল। ঠিক এই একই অধিকার ফলাতে একই রকমের দাবি অন্য আরেকটি যে অঞ্চলের লোকেরা করে আসছে তাদের বাসস্থান হল চট্টগ্রাম।