Tuesday, 13 December 2022

১২ই ডিসেম্বর ২০২২, সোমবার

বোম্বাই থেকে প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানবিরোধী সংবাদপত্র 'দ্য বোম্বাই ক্রনিক্যালের' সম্পাদক বেঞ্জামিন গাই হরনিম্যানকে ১৯১৯ সালের জুলাই মাসে সরকারি নির্দেশে এবং বোম্বাইয়ের গভর্নরের বিশেষ উদ্যোগে ভারতবর্ষ থেকে নির্বাসিত করা হয়। অভিযোগের তালিকা ছিল দীর্ঘ - সরকারবিরোধী কার্যকলাপ, সরকারের অবমাননা ও বিদ্বেষ প্রচার, নিষিদ্ধ ইস্তেহার প্রচারে সমর্থন, জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপে যোগদান ইত্যাদি। 'ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট ১৯১৫'-য়ের ভিত্তিতে তাঁর নির্বাসনের ব্যবস্থা হয়। প্রকৃতপক্ষে, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের (১৩ই এপ্রিল, ১৯১৯) প্রতিবাদ আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং কুখ্যাত 'রাওলাট অ্যাক্ট'কে 'ব্ল্যাক বিল' বলে প্রচারের কারণে আগাগোড়া থেকেই সরকারের বিরাগভাজন হরনিম্যানের প্রতি সরকারের ধৈর্যের শেষ বাঁধটি ভেঙে যায়। তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে প্রায় জোর করে তাঁকে ইংল্যান্ডগামী জাহাজে তুলে দেওয়া হয়।

দীর্ঘ ছয় বছরেরও বেশি সময় ইংল্যান্ডে কাটানোর পর ১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাস নাগাদ তিনি পুনরায় ভারতে ফিরে আসেন। কিন্তু মাঝের এই নির্বাসনকাল তাঁর কাছে নিছক বৈচিত্র্যহীন ছিল না। হেন কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি দপ্তর নেই যেখানে তিনি ভারতে ফেরার নিবেদন পেশ করেননি। ইন্ডিয়া অফিসে বারংবার গিয়েছেন পাসপোর্টের দরখাস্ত নিয়ে। রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক যাবতীয় সভা-সমিতি থেকে শুরু করে বন্ধুস্থানীয় লেবার এম পিদের মধ্যস্থতায় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট পর্যন্ত তাঁর নির্বাসন রদের ব্যাপারে চর্চা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থতা ও হতাশার সম্মুখীন হতে হয়েছে হরনিম্যানকে। এদিকে ভারতবর্ষেও জাতীয়তাবাদী নেতারা তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট উঠেপড়ে লাগেন। উদ্যোগের পুরোভাগে ছিলেন স্বয়ং গান্ধীজি। ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে হরনিম্যানের অবদানের কথা স্মরণ করে এবং তাঁর বেআইনি নির্বাসনের প্রতিবাদ জানিয়ে ইয়ং ইন্ডিয়াতে গান্ধীজি নিয়মিত নিবন্ধ লিখতেন। (যদিও জনৈক বন্ধুকে লেখা এক ব্যক্তিগত চিঠিতে গান্ধীজির বিরুদ্ধে তাঁকে ভারতে ফিরিয়ে আনার জন্য 'যথেষ্ট চেষ্টা না করার' অভিযোগ আনেন তিনি; পরে চিঠিটি প্রকাশ্য হলে গান্ধীজির কাছে ক্ষমাও চেয়ে নেন) এমনকি হরনিম্যানকে দেশে ফিরিয়ে আনার আবেদনে বোম্বাই বিধানপরিষদে আর্জি পেশ করেন কংগ্রেস নেতা ও বিখ্যাত আইনজীবী কে এফ নরিম্যান। আবেদনের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটপ্রদানের আয়োজনও করা হয়। বলাই বাহুল্য, সেটিও ব্যর্থ হয়।

ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট বাতিল হয়ে যাওয়া সত্বেও যখন তাঁকে ইংল্যান্ডে আটক করে রাখা হয় তখনই হরনিম্যান বুঝে যান যে সোজা পথে তিনি কোনো দিনই ভারতে ফিরে যেতে পারবেন না। আইনের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলে নাছোড়বান্দা ভারত সরকারকে ন্যুব্জ করা অসম্ভব হবে। তাই তিনি আইনের ফাঁকফোকর খুঁজতে সচেষ্ট হলেন। মোক্ষম পেয়েও গেলেন।

ভারতে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট তিনি পাবেন না, কিন্তু অন্য দেশে (খাস করে ইউরোপীয় দেশগুলিতে) যাওয়ার জন্য তো পেতে পারেন। তাই অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ফ্রান্স কিংবা ইতালিতে ছুটি কাটানোর উদ্দেশ্যে ইন্ডিয়া অফিসে পাসপোর্টের আবেদনপত্র জমা করলেন ভারতে ফিরতে মরিয়া হরনিম্যান। সৌভাগ্যক্রমে এই একটিবার ব্রিটিশ সরকার তাঁর প্রতি সদয় হন এবং দুর্ভাগ্যক্রমে (ব্রিটিশ সরকারের) এই একটিবারের সুযোগটির ষোলোআনা সদ্ব্যবহার করে ফেলেন তিনি। আগে থেকেই পরিকল্পনার ছক কষে ফেলেছিলেন হরনিম্যান। প্রথমে তিনি পৌঁছন ফ্রান্স। সেখান থেকে জাহাজে করে সোজা পাড়ি দেন ব্রিটিশ সিলনের (সিংহল) উদ্দেশ্যে। তাঁর ফন্দিটি ছিল ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট অ্যাক্টকে ফাঁকি দেওয়ার। ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট অ্যাক্ট অনুসারে সমুদ্রপথে কিংবা আফগানিস্তান হয়ে স্থলপথে ভারতে প্রবেশকারী যেকোনো ব্যক্তিকে ভারত সরকার অবিলম্বে ভারত থেকে নিষ্কাশিত করতে পারে। কিন্তু খোদ অন্য ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে কি প্রকার পদক্ষেপ নেওয়া হবে তার কোনো উল্লেখ আইনটিতে ছিল না। হরনিম্যান তারই সুযোগ নিলেন। সিলনে পৌঁছনর অব্যবহিত পর পক প্রণালী অতিক্রম করে ভারতের মূল ভূখণ্ডস্থিত ছোট বন্দর শহর রামেশ্বরমে আসেন। সেখান থেকে যান মাদ্রাজ এবং মাদ্রাজ থেকে ট্রেন মারফৎ বোম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

____________________

হরনিম্যান ফ্রান্সে পৌঁছলে ইন্ডিয়া অফিসের আধিকারিকদের আশঙ্কা হয় যে তিনি সেখান থেকে ফরাসি পাসপোর্ট ব্যবহার করে উপমহাদেশের ফরাসি উপনিবেশ পন্ডিচেরিতে (কিংবা চন্দননগরে) চলে যেতে পারেন। যদিও সেটি তিনি করেননি।

হরনিম্যানের ভারত প্রত্যাবর্তনের খবর তৎকালীন ভাইসরয়ের কাছে আসামাত্রই তিনি যারপরনাই ক্ষুব্ধ হন এবং ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট অ্যাক্টকে অবিলম্বে সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও এটি উপলব্ধি করতে তিনি বেশি সময় নেননি, যে সংশোধিত কোনো আইনই অতীতের নিষ্পন্ন কোনো ঘটনাকে বর্তমানে কার্যকর আইনের পরিসরে কল্পনা করে ভূতাপেক্ষভাবে কাউকেই অভিযুক্ত করতে পারে না।

Thursday, 8 December 2022

৯ই ডিসেম্বর ২০২২, শুক্রবার

ব্রিটিশ সত্যাগ্রহী

১৯১৭ সালের জুন মাস। ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। হোম রুল আন্দোলনের প্রণেতা অ্যানি বেসান্তকে ভারতবর্ষের টালমাটাল রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে মাদ্রাজ গভর্নর তাকে গ্রেফতার করার সিদ্ধান্ত নেন এবং মাদ্রাজ প্রদেশের পাহাড়ি শহর উটাকামুন্ডের (বর্তমানে উটি) একটি পাহাড়ি কুটিরে গৃহবন্দি করে রাখেন। ফলস্বরূপ প্রতিবাদ অনিবার্য। শুধু মাদ্রাজ প্রদেশেই নয়, বাংলা ও বোম্বাই সহ যুক্ত প্রদেশের নানা স্থানে সভা-আলোচনার মাধ্যমে এই বেআইনি গ্রেফতারের কড়া নিন্দা করা হয়। এই কাজে দেশের নানা প্রান্তের জাতীয়তাবাদী সংবাদমাধ্যমগুলোও যোগ দেয়। বোম্বাই থেকে প্রকাশিত 'দ্য বোম্বাই ক্রনিক্যালে'র সম্পাদক ছিলেন বেঞ্জামিন গাই হরনিম্যান। ভারতবাসীর মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে স্বসমর্পিত বি জি হরনিম্যান এই অন্যায়ের প্রতিবাদে নিজেকে কেবল সম্পাদকীয়তেই সীমাবদ্ধ রাখেননি; প্রত্যক্ষ আন্দোলনে যোগদানের সিদ্ধান্তও নিয়ে বসেন। সেই উদ্দেশ্যে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারস্থ হতে শুরু করেন তিনি। সেরকমই দুইজন নেতা - মদন মোহল মালব্য ও মহম্মদ আলি জিন্নার সহযোগিতা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে ব্যর্থমনোরথ হরনিম্যান অবশেষে কংগ্রেসের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ মোতিলাল নেহরুর জ্যেষ্ঠ সন্তান সদ্য ব্যারিস্টারি প্রাপ্ত উদীয়মান নেতা জওহরলাল নেহরুকে চিঠি লেখেন। চিঠিতে অ্যানি বেসান্তকে কারামুক্ত করার পরিকল্পনাস্বরূপ এক আকর্ষণীয় পন্থার অবতারণা করেন তিনি। পন্থাটির বুনিয়াদ হল নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ। সমসাময়িক ভারতের রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের ধারণা অশ্রুতপূর্ব ছিল না। সদ্য দক্ষিণ-আফ্রিকা ফেরত আরেক ব্যারিস্টার মাস দুয়েক আগে বিহারের চম্পারণে কৃষক আন্দোলনের পটভূমিতে উল্লিখিত পন্থাটি পারদর্শিতার সাথে প্রয়োগ করেন এবং দ্রুত সাফল্যও অর্জন করেন। যদিও হরনিম্যান তার পন্থার জন্য কোন আধ্যাত্মিক নাম পছন্দ করেননি (যেমনটি করেছিলেন দক্ষিণ-আফ্রিকা ফেরত ব্যারিস্টারটি), তবুও নিঃসন্দেহে বলা যায় সেটি একপ্রকার সত্যাগ্রহই।

হরনিম্যানকে তাঁর সত্যাগ্রহ বাস্তবায়নের প্রয়োজন পড়েনি। আলোচনা সভা ও সংবাদমাধ্যমগুলির ক্রমবর্ধমান সমালোচনার চাপে অবশেষে অ্যানি বেসান্তকে মুক্তি দেওয়া হয়। অ্যানি বেসান্ত সহজে মুক্তি না পেলে, সম্ভবত, বি জি হরনিম্যানের নেতৃত্বে পরিচালিত সত্যাগ্রহ আন্দোলনের এক অনন্য নিদর্শন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে পরবর্তী গান্ধী-সত্যাগ্রহের সাথে একাসনে স্থান লাভ করতো।

____________________

বি জি হরনিম্যান দক্ষিণ-আফ্রিকা তথা ভারতবর্ষে (চম্পারণে) গান্ধীজির সত্যাগ্রহ আন্দোলন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাঁদের বন্ধুস্থানীয় বলা না গেলেও, পত্রমারফৎ তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তাই হরনিম্যানের নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ অবতারণার মননে গান্ধীজির ভূমিকা থাকা মোটেই বিস্ময়কর নয়।

Sunday, 4 December 2022

৪ই ডিসেম্বর ২০২২, রবিবার

ইতিহাস বইয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদ ননীগোপাল মজুমদারের কোনরকম উল্লেখ পেয়েছি বলে মনে পড়ে না। সিন্ধু সভ্যতা আলোচনা প্রসঙ্গে যে কয়েকজন ঐতিহাসিক, প্রত্নতত্ত্ববিদ কিংবা নৃবিজ্ঞানীর কথা জেনেছিলাম তাদের মধ্যে দয়ারাম সাহনি (হরপ্পার আবিষ্কর্তা, ১৯২১), রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (মহেঞ্জোদারোর আবিষ্কর্তা, ১৯২২), স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম, স্যার জন মার্শাল এবং স্যার মর্টিমার হুইলারের নাম মনে রয়েছে। পরবর্তীকালে মেহেরগড় (সভ্যতা) পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হলে ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক জাঁ ফ্রাঁসোয়া জারিজের নামও জানতে পারি। অথচ সিন্ধু সভ্যতার ৬২টি বিভিন্ন ভগ্নাবশেষস্থলের আবিষ্কর্তা ননীগোপাল মজুমদারের কিংবদন্তি তৎকালীন তথা বর্তমান জনসাধারণের কাছে বিশেষ (যদি না কিছুই) প্রচার-প্রসার পায়নি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র ননীগোপালের বিষয় ছিল সংস্কৃত এবং প্রাচীন ভারতের ইতিহাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই দিকপাল আচার্য - হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকরের তত্ত্বাবধানে সংস্কৃত সাহিত্য ও লিপি পাঠে সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেন মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজের এই প্রাক্তন ছাত্রটি। অন্যদিকে প্রত্নবিদ্যায় তাঁর আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে প্রাথমিক ভূমিকাটি পালন করেন স্বয়ং রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (এবং আর-এক প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ রমাপ্রসাদ চন্দ)। প্রত্নবিদ্যায় হাতেখড়ির পর তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। একাধারে গবেষণায় নামযশ-বৃত্তির পাশাপাশি, কর্মক্ষেত্রে ক্রমোন্নতির জেরে অবশেষে স্যার জন মার্শাল এবং দয়ারাম সাহনির সংস্পর্শে আসেন। যোগ দেন ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ সংস্থায় (আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া)। ননীগোপালের কাজের দক্ষতা, পাণ্ডিত্য ও নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে মার্শাল সরাসরি তাকে খনন কার্যের অ্যাসিন্ট্যান্ট সুপারিন্টেন্ডেন্ট পদে নিযুক্ত করেন। প্রত্নবিদ্যার প্রায় সকল ক্ষেত্রেই (শিলালিপি পাঠ, মুদ্রা বিষয়ক বিদ্যা, মূর্তিচর্চা, শিল্পের ইতিহাস ও প্রদর্শনশালা সংক্রান্ত বিদ্যা) তাঁর গভীর অভিজ্ঞতা থাকলেও, প্রধানত প্রাক-খনন সমীক্ষা ও খননকার্য পদ্ধতি বিষয়ে তিনি কালজয়ী দক্ষতার পরিচয় দেন। মার্কিন প্রত্নতাত্ত্বিক গ্রেগরি পসেলের কথায় - "মজুমদারের ক্ষেত্রপরীক্ষা পদ্ধতি ছিল স্বকীয় এবং সময়ের থেকে অনেকটা এগিয়ে। তাঁর যুক্তিসঙ্গত নিয়মানুগ অনুসন্ধান ও পরবর্তী ধাপে রিপোর্ট বা বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকাশনা এমন উঁচু দরের ছিল যে এখনও সেই পদ্ধতি আমরা অনুসরণ করে থাকি।" ননীগোপাল মজুমদারের প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যগুলির মধ্যে স্মরণীয় উজ্জ্বল দৃষ্টান্তটি হল ঝুকর প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কার (১৯২৭-২৮)। মহেঞ্জোদারো আবিষ্কারের পর ১৯১৮-১৯ সাল নাগাদ অনতিদূরে অবস্থিত এই প্রত্নক্ষেত্রটি রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় পরিদর্শন করে যান। তিনি স্থানটিকে কুষান যুগের একটি বৌদ্ধস্তূপের ভগ্নাবশেষ বলে অনুমান করেন। প্রাথমিক খননকার্যের পর কুষান যুগের কিছু প্রত্নবস্তু মিললে ধারণাটি বদ্ধপরিকর হয় তাঁর। কিন্তু ননীগোপালের মনে সন্দেহ থেকে যায়। টানা প্রায় ছয় সপ্তাহ অক্লান্ত পরিশ্রমের পর একটি তামার বর্শাফলক আবিষ্কার করেন তিনি, যেটির সাথে সিন্ধু সভ্যতার প্রত্ননিদর্শনের মিল পাওয়া যায়। ফলাটির সৌজন্যে তিনি নিশ্চিত হন যে, ঝুকরের সাথে সিন্ধু সভ্যতার যোগসূত্র আছে। তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তিগুলির মধ্যে আরেকটি হল আমরি আবিষ্কার। আমরি প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কার শুধু হরপ্পা আর মহেঞ্জোদারোর মধ্যে যোগসূত্রই স্থাপন করে না; এটি ইঙ্গিত দেয় যে, সিন্ধু সভ্যতা আরও একাধিক স্তরে বিকশিত হয়েছিল। সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন প্রাণকেন্দ্র চানহুদারোরও আবিষ্কর্তা ছিলেন এই ননীগোপাল মজুমদার। "তাঁর লেখা 'Inscriptions of Bengal' আজও প্রত্নতত্ত্বে ধ্রুপদী রচনা হিসেবে গণ্য হয়।" তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল তাঁর স্মৃতিকথা 'Explorations in Sindh', সাঁচী স্তূপ নিয়ে লেখা 'The Monuments of Sanchi' ইত্যাদি। তিন সন্তানের পিতা স্বনামধন্য এই প্রত্নতত্ত্ববিদকে অকালে উপজাতীয় পার্বত্য দস্যুদের গুলিতে প্রাণ খোয়াতে হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৯। অনেকের অনুমান, প্রাচীন শিলালিপি পাঠে দক্ষ (ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপি বিশেষজ্ঞ) ননীগোপাল মজুমদার আরও কিছু দিন বেঁচে থাকলে সিন্ধু লিপির (ব্রাহ্মী লিপির সাথে সদৃশ্য) পাঠোদ্ধার করে ফেলতেন যা আজও অধরাই রয়ে গেছে।





তথ্যসূত্র: একটি হত্যারহস্য ও প্রত্নজিজ্ঞাসা, প্রসূন চৌধুরী (দেশ ১৭ নভেম্বর, ২০২২)

Monday, 28 November 2022

২৮শে নভেম্বর ২০২২, সোমবার

স্কুলে, স্মৃতি যতখানি মদত দেয়, পড়েছিলাম অ্যানি বেসান্ত এবং বাল গঙ্গাধর তিলকের উদ্যোগে ভারতবর্ষে হোমরুল আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। তদানীন্তন রাজনৈতিক মঞ্চে গান্ধীজির আবির্ভাবের পূর্বেকার ঘটনা। ধারণা জন্মায় এবং সেটি এতদিন অবধি বহালও থাকে, যে তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় 'হোম রুল লীগ' প্রতিষ্ঠা হয় এবং আন্দোলনের পুরোভাগে তাঁরা একত্রে নেতৃত্ব দেন। ধারণাটি ভুল। প্রথমত তিলক ছিলেন চরমপন্থী নেতা, অন্যদিকে বেসান্ত প্রতিনিধিত্ব করতেন নরমপন্থীদের। তিলক যেখানে চরমপন্থার ক্ষিপ্রতায় লাগাম টানতে ব্রিটিশ শাসন পরিবর্জনের পরিকল্পনা ত্যাগ করে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সম্মেলনের ডাক দেন, বেসান্ত সেখানে নরমপন্থার আবেদন-নিবেদন নীতিতে বিরতি এনে স্বশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে সম্মেলন শুরু করেন (তাঁর অনুপ্রেরণার উৎস ছিল নিজস্ব জন্মভুমি আয়ারল্যান্ডের স্থানীয় হোম রুল আন্দোলন)। ঘটনাক্রমে দুই সম্মেলনই ঘটে একই বছরের (১৯১৫) একই মাসে (ডিসেম্বর) - কেবলমাত্র সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে। স্থানের ব্যবধানও সামান্য - তিলকের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় পুনায়, বেসান্তের বোম্বাইয়ে। আন্দাজ করা যায়, তিলক এবং বেসান্ত একে অপরের কর্মকাণ্ডে যথেষ্ট রূপে ওয়াকিবহাল ছিলেন (এমনকি একদা গোপালকৃষ্ণ গোখলের সাথে পরামর্শ করে বেসান্ত তিলককে নরমপন্থায় নিয়ে আসার ব্যর্থ প্রচেষ্টাও চালিয়েছিলেন)। হোম রুল লীগের নামকরনের ক্ষেত্রে দুই প্রতিনিধির প্রতিযোগিতা (যদিও গঠনমূলক) জনসমক্ষে স্পষ্ট হয়ে ওঠে - তিলক লীগের নামের আগে 'ভারতীয়' শব্দটি জুড়ে দেন; মাস কয়েক পর বেসান্ত নিজের লীগের নামের আগে যোগ করে দেন 'সর্বভারতীয়' শব্দটি। বলাই বাহুল্য, দুই লীগকেই ব্রিটিশ সরকারের সমান অসন্তোষ এবং তজ্জনিত সমান প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়।

Sunday, 27 November 2022

২৭শে নভেম্বর ২০২২, রবিবার

আজ কবি কুসুমকুমারী দাশ মারা গেলেন। মাসউদ আহমাদের 'কাঞ্চনফুলের কবি'র ২০তম সংখ্যায়। শোকস্তব্ধ জ্যেষ্ঠ পুত্র জীবনানন্দ দাশের কাছে ক্ষতিটি অপূরণীয়। কেবল কবিতা চর্চার অনুপ্রেরণা হিসেবেই নয়, 'জীবনের প্রতিটি বাঁকে, সুখে ও বিরহে' কুসুমকুমারী ছিলেন 'তাঁর শ্রেষ্ঠ অবলম্বন'। 'বন্ধু-মনোভাবাপন্ন ও স্নেহময়ী মা' সন্তানকে 'জীবন ও পরিপার্শ্ব কী ভাবে দেখতে হয়, সংসারে মানুষকে কেমন করে অনুভব ও আয়ত্ত করতে হয়' সবই শিখিয়েছিলেন। প্রাপ্তবয়স্ক জীবনানন্দের সংসারে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সকলেই আছে, ভাই-বোনেরাও আছে সাথে পাশে, তবুও মায়ের চলে যাওয়ার যন্ত্রণাটা কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। বৃষ্টিস্নাত শীতের রাতে (কেওড়াতলা) শ্মশানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ছেন। চোখে জল নিয়ে ঠাঁই দাড়িয়ে থাকছেন। ভাবছেন মায়ের কথা। বাবার কথা?

ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়ের পাণ্ডব গোয়েন্দার কোনো গল্পই পূর্বে আমি পড়িনি। ভবিষ্যতে আর পড়তেও চাই না। আনন্দমেলায় এগারো মাস ধরে চলা শিরোনামহীন এক পাণ্ডব গোয়েন্দা কাহিনি আজই পড়ে শেষ করলাম। এক কথায় বললে, তৃতীয় শ্রেণীর (পড়ুন থার্ড ক্লাস) লেখা। অশীতিপর বৃদ্ধ হরিদ্বার তীর্থ সেরে ভ্রমণকাহিনী লিখতে চেয়েছিলেন, হয়তো। 'দেশ' পাত্তা দেয়নি। তাই 'পাণ্ডব গোয়েন্দা'কে অবলম্বন করে আনন্দমেলার পাঠকদের বারোটা বাজান। এনিড ব্ল্যাইটনের ভূত দেখা দেবে মিনসেকে। কারণ, সাহিত্যের বিচারে কদর্য তো অবশ্যই, আদর্শগত দিক থেকেও পশ্চাদগামী - সংরক্ষণশীল, পুরুষতান্ত্রিক, মধ্যযুগীয় চিন্তাধারায় ভর্তি। সঙ্গমে স্নানের প্রস্তাবের উত্তরে পাণ্ডবপ্রধান বাবলুর আড়ালে লেখক তাঁর মানসিকতা স্পষ্ট করে দেন - "বিলু ভোম্বলকে নিয়ে সঙ্গমেই যাব। মেয়েরা বরং ঘরেই থাকুক।' বাচ্চু, বিচ্ছু ছাড়াও একাধিক নারীচরিত্রকে কাহিনিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা দিয়েছেন ঠিকই - তাদের অনেকে আবার চারিত্রিক দৃঢতা এবং অসম সাহসিকতার সফল ও ব্যর্থ দুই'ই দৃষ্টান্ত রেখেছে - কিন্তু সকলকেই (এমনকি দুর্ভাগ্যজনকভাবে খুদে বালিকা পাঠকাদেরও) পদে পদে লেখক (বাবলু মারফৎ) বুঝিয়ে দিয়েছেন তারা দ্বিতীয় লিঙ্গের বেশি কিছু নয়। মুখাপেক্ষী, আজ্ঞানুবর্তী, অধীন। কাহিনির ধারাবাহিকতাও নিম্ন মানের। এমন কোনো সংখ্যা (মোট ২২ টি) যায়নি যেখানে চা খাওয়ার উল্লেখ নেই। সুযোগ পেলেই চায়ের ব্যবস্থা। নিরর্থক অনাবশ্যক খুঁটিনাটিতে ভরে দায়সারাভাবে তাড়াহুড়োতে শেষ করা হয়েছে কাহিনি - যদিও তাতে পাঠককুলের মঙ্গলই হয়েছে।

এর চেয়ে ঢের ভালো মাত্র ১২টা সংখ্যাতেই শেষ রুপম চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসিকা 'অশ্বারোহী ঈশ্বর'। রহস্য-রোমাঞ্চ-ইতিহাস-কৌতুক মিশিয়ে আদিবাসী গোষ্ঠীর কিংবদন্তি দেবতা খারমুনকে প্রেক্ষাপটে রেখে লেখা এই কাহিনি যথেষ্ট উপভোগ্য। যদিও এটিও অনেকটা তাড়াহুড়ো করে শেষ করা হল বলে আমার মনে হয়। দেখা যাক পরবর্তী আনন্দমেলা সংখ্যায় নতুন কি বা কি কি ধারাবাহিক শুরু হয়।

Sunday, 25 September 2022

২৫শে সেপ্টেম্বর ২০২২, রবিবার

চারে তিন

শ্রুতি, স্বাধ্যায়, ছন্দস, আগম, নিগম, অপৌরুষেয় 'অনন্ত বৈ বেদা' বেদের আর এক নাম ত্রয়ী - ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ - এই তিন একত্রে। কিন্তু অথর্ববেদ বাদ পড়লো কেন? আদৌ কি তাই?

বৈদিক পণ্ডিত কাত্যায়ন বেদকে দুটি অংশে ভাগ করেন - মন্ত্র ও ব্রাহ্মণ। মন্ত্রভাগের নাম সংহিতা (আরণ্যক ও উপনিষদ নিয়ে ব্রাহ্মণ) - যা সংখ্যায় চারটি (ঋগ্বেদ সংহিতা, সামবেদ সংহিতা, যজুর্বেদ সংহিতা এবং অথর্ববেদ সংহিতা)। মন্ত্রের তিনটি রূপ - পদ্যাত্মক, গীতিময় এবং গদ্যাত্মক। ছন্দোবদ্ধ পদ্যাত্মক মন্ত্রসকল নিয়ে ঋগ্বেদ রচিত; সুরবদ্ধ গীতিময় গানসমূহে রচিত সামবেদ এবং অবশিষ্ট গদ্যাংশ বিরচিত যজুর্বেদে। এই তিন মন্ত্রভাগ এবং তদসংশ্লিষ্ট বেদের প্রকরণ তিনটি একত্রে ত্রয়ী পরিচয় পেয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, অথর্ববেদ (সংহিতা) মন্ত্রের ভিন্ন চতুর্থ কোনও রূপ নেই, এটি পূর্বোক্ত তিন রূপেরই সমাহার। তাই ঋক, সাম, যজু সহ পদ্যগীতগদ্যাত্মক মন্ত্রসমন্বিত অথর্ববেদকেও ত্রয়ীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

Thursday, 15 September 2022

১৫ই সেপ্টেম্বর ২০২২, বৃহস্পতিবার

ব্রিটিশ গণিতবিদ স্যর এরিক ক্রিস্টোফার জিম্যানের মনে হল চতুর্মাত্রিক অধিগোলকের অন্তর্গত কোনো প্রকার গিঁটকে খুলে মুক্ত করা অসম্ভব। এখন তার প্রমাণ চাই। তাই স্বীয় সংকল্প (কনজেকচার) প্রমাণে উঠেপড়ে লাগলেন তিনি। কিন্তু সাত-সাতটা বছর ব্যয় করেও কোনো কূলকিনারা করতে পারলেন না। অবশেষে একদিন ঠিক করলেন উল্টোটি প্রমাণের চেষ্টা করে দেখবেন! এবার শুরু হল গিঁট খোলার প্রয়াস।
সাত বছরের প্রচেষ্টা পণ্ডশ্রমে পর্যবসিত হল। জিম্যান নিজেই প্রমাণ করে দেখালেন তাঁর অনুমানটি সঠিক ছিল না। যা অসম্ভব ভেবেছিলেন, তা রীতিমতো সম্ভব।

চতুর্মাত্রিক অধিগোলকের অন্তর্গত কোনো প্রকার গিঁটকে খুলে মুক্ত করা সম্ভব - এটি প্রমাণ করতে স্যর এরিক ক্রিস্টোফার জিম্যান সময় নিয়েছিলেন স্রেফ কয়েক ঘণ্টা।

Saturday, 13 August 2022

১৪ই আগস্ট ২০২২, রবিবার

"হাও কুড আই একসেপ্ট এ নাইটহুড..."

৩১ মে, ১৯১৯। জালিয়ানওয়ালাবাগের বীভৎস হত্যালীলায় বিধ্বস্ত 'স্যার' রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৪৮ দিনের মাথায় ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জের পুরস্কৃত ৪ বছর পুরনো নাইট উপাধি ব্রিটিশ সরকারকে ফিরিয়ে দেন। "দ্য টাইম হ্যাজ কাম হোয়েন ব্যাজেস অফ অনার মেক আওয়ার শেম গ্লেয়ারিং ইন দেয়ার ইনকনগ্রুয়াস কনটেক্সট অফ হিউমিলিয়েশন..." - বড়লাট চেমস্‌ফোর্ডকে লিখে পাঠান তিনি।

একইভাবে দেশভাগের ভয়াবহ এবং সুদূরপ্রসারী পরিণতির কথা অনুমান করেই দেশভাগের সনদ মাউন্টব্যাটেন প্ল্যানের নেপথ্যকার বড়লাট মাউন্টব্যাটেনের উপদেষ্টা ভপ্পালা পাঙ্গুনি মেনন নাইট উপাধি গ্রহণ করতেই যথারীতি অস্বীকার করেন। পরবর্তীকালে পুত্রবধূর কৌতূহলের জবাবে তিনি জানান - "হাও কুড আই একসেপ্ট এ নাইটহুড বিয়িং দ্য ম্যান হু ডিভাইসড দ্য পার্টিশন অফ মাই কান্ট্রি।"

Monday, 7 February 2022

৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২২, মঙ্গলবার

১৯৮০ সাল। স্পেনের শহর ভিগোতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক দাবা প্রতিযোগিতার পঞ্চম রাউন্ডের খেলা চলছে। পর্তুগীজ ইন্টারন্যাশানাল মাষ্টার (আইএম) লুইস স্যান্টোসের বিপক্ষে খেলতে বসে  ব্রাজিলিয়ান ইন্টারন্যাশানাল মাষ্টার ফ্রান্সিস্কো ত্রয়েস তার সাত নম্বর চাল দিতে সময় নেন ২ ঘন্টা ২০ মিনিট। দাবা খেলায় সময় নিয়ন্ত্রণ চালু হওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ চাল দিতে খেলোয়াড়রা প্রায়শই ঘণ্টাখানেক সময় ব্যয় করতো। দিগুণ সময় ব্যয় করার দৃষ্টান্তও বিরল ছিল না। একাধিক লাইন এবং প্রত্যেক লাইনের বিভিন্ন ভ্যারিয়েশন ভাবতে সময় লাগবে বইকি। আপাতদৃষ্টিতে ফ্রান্সিস্কো ত্রয়েসের সাত নম্বর চালের জন্য একাধিক বৈধ চাল থাকলেও, পরিস্থিতির বিচারে সেই মুহূর্তে তার কাছে কার্যকর চালের বিকল্প ছিল মাত্র দুটি।

____________________

"যেখানে মাত্র দুটো সম্ভাব্য চাল আছে, সেখানে আপনি কিভাবে দু'ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চিন্তা করতে পারেন?", খেলা শেষে হতবাক লুইস স্যান্টোসের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায়, "নো লো এন্তিয়েন্দো" (আমি বুঝতে পারলাম না)। ফ্রান্সিস্কো ত্রয়েসের উত্তর আসে, "ইয়ো ট্যামপোকো" (আমিও না)।

Thursday, 20 January 2022

২০ই জানুয়ারি ২০২২, বৃহস্পতিবার

একাদশ শতাব্দী। নরম্যান্ডির ডিউক প্রথম উইলিয়ামের নেতৃত্বে নরম্যান সেনা ইংল্যান্ড দখল করে। স্থানীয় অধিবাসীদের প্রাচীন ইংরেজি ভাষাকে (অ্যাংলো-স্যাক্সন) সরিয়ে অনুপ্রবেশকারী নরম্যান জনগোষ্ঠীর ফরাসি ভাষা অভিজাতবর্গের ব্যবহার্য ভাষা হয়ে ওঠে। প্রশাসন থেকে হেঁশেল, সবকিছুতেই ফরাসি শব্দের ব্যবহার বাড়ে।

তাই গোরু, শুয়োর, ভেড়া ইত্যাদি পশুর জন্য প্রতিপালনকারী বা শিকারি নিম্নবর্গের প্রাচীন ইংরেজি ভাষার 'cow', 'pig', 'sheep' ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার অব্যাহত থাকলেও; পশুগুলির মাংস অভিজাতবর্গের খাবারের পাতে উঠলে সেগুলি যথাক্রমে 'boeuf', 'porc', 'mouton' ইত্যাদি ফরাসি শব্দে রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীকালে যেগুলির ইংরেজিকরণে গঠিত হওয়া 'beef', 'pork', 'mutton' ইত্যাদি শব্দ ইংরেজি শব্দভাণ্ডারে জায়গা করে নেয়।

____________________

এমনকি সেই তালিকা থেকে 'chicken' (প্রাচীন ইংরেজি: 'cicen')-ও বাদ পড়েনি। খাবারের পাতে নতুন নাম পেয়েছে 'pullet' (ফরাসি শব্দ 'poulet'-য়ের ইংরেজিকরণ; যা থেকে পরবর্তীকালে 'poultry' শব্দটি এসেছে)। বাদ পড়েছে কেবল মাছ। মাছের ('fish') 'মাংসের' ফরাসিজাত কোনো প্রতিশব্দ নেই। থাকবেই বা কি করে! 'fish'-য়ের ফরাসি 'poisson' যে প্রায় বিষ ('poison')।

Sunday, 16 January 2022

১৬ই জানুয়ারি ২০২২, রবিবার

১৯৮৬ সাল। দক্ষিণ আফ্রিকা। নেলসন ম্যান্ডেলা কেপ টাউনের পলসমুর জেলে বন্দি। পশ্চিমি দুনিয়ার চাপে পড়ে সে সময়ের বর্ণবাদী শেতাঙ্গ সরকার অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম ফ্রেসারকে ম্যান্ডেলার সাথে দেখা করার অনুমতি দেয়। ফ্রেসার দেখা করতে এলে, ম্যান্ডেলা সবার আগে তাকে যে প্রশ্নটি করেন সেটি হল -- "মিস্টার ফ্রেসার, ডন ব্র্যাডম্যান কি এখনও বেঁচে আছেন?"

____________________

ডন ব্র্যাডম্যান তখনও বেঁচে ছিলেন। ম্যান্ডেলার কারামুক্তির (১৯৯০) পর ফ্রেসার তাকে ব্র্যাডম্যানের সই করা একটি ব্যাট উপহার দেন। চিঠি মারফৎ দুই কিংবদন্তির যোগাযোগ থাকলেও, মুখোমুখি তাদের কোনোদিন দেখা হয়নি।