Tuesday, 13 December 2022
১২ই ডিসেম্বর ২০২২, সোমবার
Thursday, 8 December 2022
৯ই ডিসেম্বর ২০২২, শুক্রবার
ব্রিটিশ সত্যাগ্রহী
১৯১৭ সালের জুন মাস। ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। হোম রুল আন্দোলনের প্রণেতা অ্যানি বেসান্তকে ভারতবর্ষের টালমাটাল রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে মাদ্রাজ গভর্নর তাকে গ্রেফতার করার সিদ্ধান্ত নেন এবং মাদ্রাজ প্রদেশের পাহাড়ি শহর উটাকামুন্ডের (বর্তমানে উটি) একটি পাহাড়ি কুটিরে গৃহবন্দি করে রাখেন। ফলস্বরূপ প্রতিবাদ অনিবার্য। শুধু মাদ্রাজ প্রদেশেই নয়, বাংলা ও বোম্বাই সহ যুক্ত প্রদেশের নানা স্থানে সভা-আলোচনার মাধ্যমে এই বেআইনি গ্রেফতারের কড়া নিন্দা করা হয়। এই কাজে দেশের নানা প্রান্তের জাতীয়তাবাদী সংবাদমাধ্যমগুলোও যোগ দেয়। বোম্বাই থেকে প্রকাশিত 'দ্য বোম্বাই ক্রনিক্যালে'র সম্পাদক ছিলেন বেঞ্জামিন গাই হরনিম্যান। ভারতবাসীর মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে স্বসমর্পিত বি জি হরনিম্যান এই অন্যায়ের প্রতিবাদে নিজেকে কেবল সম্পাদকীয়তেই সীমাবদ্ধ রাখেননি; প্রত্যক্ষ আন্দোলনে যোগদানের সিদ্ধান্তও নিয়ে বসেন। সেই উদ্দেশ্যে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারস্থ হতে শুরু করেন তিনি। সেরকমই দুইজন নেতা - মদন মোহল মালব্য ও মহম্মদ আলি জিন্নার সহযোগিতা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে ব্যর্থমনোরথ হরনিম্যান অবশেষে কংগ্রেসের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ মোতিলাল নেহরুর জ্যেষ্ঠ সন্তান সদ্য ব্যারিস্টারি প্রাপ্ত উদীয়মান নেতা জওহরলাল নেহরুকে চিঠি লেখেন। চিঠিতে অ্যানি বেসান্তকে কারামুক্ত করার পরিকল্পনাস্বরূপ এক আকর্ষণীয় পন্থার অবতারণা করেন তিনি। পন্থাটির বুনিয়াদ হল নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ। সমসাময়িক ভারতের রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের ধারণা অশ্রুতপূর্ব ছিল না। সদ্য দক্ষিণ-আফ্রিকা ফেরত আরেক ব্যারিস্টার মাস দুয়েক আগে বিহারের চম্পারণে কৃষক আন্দোলনের পটভূমিতে উল্লিখিত পন্থাটি পারদর্শিতার সাথে প্রয়োগ করেন এবং দ্রুত সাফল্যও অর্জন করেন। যদিও হরনিম্যান তার পন্থার জন্য কোন আধ্যাত্মিক নাম পছন্দ করেননি (যেমনটি করেছিলেন দক্ষিণ-আফ্রিকা ফেরত ব্যারিস্টারটি), তবুও নিঃসন্দেহে বলা যায় সেটি একপ্রকার সত্যাগ্রহই।
হরনিম্যানকে তাঁর সত্যাগ্রহ বাস্তবায়নের প্রয়োজন পড়েনি। আলোচনা সভা ও সংবাদমাধ্যমগুলির ক্রমবর্ধমান সমালোচনার চাপে অবশেষে অ্যানি বেসান্তকে মুক্তি দেওয়া হয়। অ্যানি বেসান্ত সহজে মুক্তি না পেলে, সম্ভবত, বি জি হরনিম্যানের নেতৃত্বে পরিচালিত সত্যাগ্রহ আন্দোলনের এক অনন্য নিদর্শন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে পরবর্তী গান্ধী-সত্যাগ্রহের সাথে একাসনে স্থান লাভ করতো।
____________________
বি জি হরনিম্যান দক্ষিণ-আফ্রিকা তথা ভারতবর্ষে (চম্পারণে) গান্ধীজির সত্যাগ্রহ আন্দোলন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাঁদের বন্ধুস্থানীয় বলা না গেলেও, পত্রমারফৎ তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তাই হরনিম্যানের নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ অবতারণার মননে গান্ধীজির ভূমিকা থাকা মোটেই বিস্ময়কর নয়।
Sunday, 4 December 2022
৪ই ডিসেম্বর ২০২২, রবিবার
ইতিহাস বইয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদ ননীগোপাল মজুমদারের কোনরকম উল্লেখ পেয়েছি বলে মনে পড়ে না। সিন্ধু সভ্যতা আলোচনা প্রসঙ্গে যে কয়েকজন ঐতিহাসিক, প্রত্নতত্ত্ববিদ কিংবা নৃবিজ্ঞানীর কথা জেনেছিলাম তাদের মধ্যে দয়ারাম সাহনি (হরপ্পার আবিষ্কর্তা, ১৯২১), রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (মহেঞ্জোদারোর আবিষ্কর্তা, ১৯২২), স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম, স্যার জন মার্শাল এবং স্যার মর্টিমার হুইলারের নাম মনে রয়েছে। পরবর্তীকালে মেহেরগড় (সভ্যতা) পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হলে ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক জাঁ ফ্রাঁসোয়া জারিজের নামও জানতে পারি। অথচ সিন্ধু সভ্যতার ৬২টি বিভিন্ন ভগ্নাবশেষস্থলের আবিষ্কর্তা ননীগোপাল মজুমদারের কিংবদন্তি তৎকালীন তথা বর্তমান জনসাধারণের কাছে বিশেষ (যদি না কিছুই) প্রচার-প্রসার পায়নি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র ননীগোপালের বিষয় ছিল সংস্কৃত এবং প্রাচীন ভারতের ইতিহাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই দিকপাল আচার্য - হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকরের তত্ত্বাবধানে সংস্কৃত সাহিত্য ও লিপি পাঠে সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেন মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজের এই প্রাক্তন ছাত্রটি। অন্যদিকে প্রত্নবিদ্যায় তাঁর আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে প্রাথমিক ভূমিকাটি পালন করেন স্বয়ং রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (এবং আর-এক প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ রমাপ্রসাদ চন্দ)। প্রত্নবিদ্যায় হাতেখড়ির পর তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। একাধারে গবেষণায় নামযশ-বৃত্তির পাশাপাশি, কর্মক্ষেত্রে ক্রমোন্নতির জেরে অবশেষে স্যার জন মার্শাল এবং দয়ারাম সাহনির সংস্পর্শে আসেন। যোগ দেন ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ সংস্থায় (আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া)। ননীগোপালের কাজের দক্ষতা, পাণ্ডিত্য ও নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে মার্শাল সরাসরি তাকে খনন কার্যের অ্যাসিন্ট্যান্ট সুপারিন্টেন্ডেন্ট পদে নিযুক্ত করেন। প্রত্নবিদ্যার প্রায় সকল ক্ষেত্রেই (শিলালিপি পাঠ, মুদ্রা বিষয়ক বিদ্যা, মূর্তিচর্চা, শিল্পের ইতিহাস ও প্রদর্শনশালা সংক্রান্ত বিদ্যা) তাঁর গভীর অভিজ্ঞতা থাকলেও, প্রধানত প্রাক-খনন সমীক্ষা ও খননকার্য পদ্ধতি বিষয়ে তিনি কালজয়ী দক্ষতার পরিচয় দেন। মার্কিন প্রত্নতাত্ত্বিক গ্রেগরি পসেলের কথায় - "মজুমদারের ক্ষেত্রপরীক্ষা পদ্ধতি ছিল স্বকীয় এবং সময়ের থেকে অনেকটা এগিয়ে। তাঁর যুক্তিসঙ্গত নিয়মানুগ অনুসন্ধান ও পরবর্তী ধাপে রিপোর্ট বা বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকাশনা এমন উঁচু দরের ছিল যে এখনও সেই পদ্ধতি আমরা অনুসরণ করে থাকি।" ননীগোপাল মজুমদারের প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যগুলির মধ্যে স্মরণীয় উজ্জ্বল দৃষ্টান্তটি হল ঝুকর প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কার (১৯২৭-২৮)। মহেঞ্জোদারো আবিষ্কারের পর ১৯১৮-১৯ সাল নাগাদ অনতিদূরে অবস্থিত এই প্রত্নক্ষেত্রটি রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় পরিদর্শন করে যান। তিনি স্থানটিকে কুষান যুগের একটি বৌদ্ধস্তূপের ভগ্নাবশেষ বলে অনুমান করেন। প্রাথমিক খননকার্যের পর কুষান যুগের কিছু প্রত্নবস্তু মিললে ধারণাটি বদ্ধপরিকর হয় তাঁর। কিন্তু ননীগোপালের মনে সন্দেহ থেকে যায়। টানা প্রায় ছয় সপ্তাহ অক্লান্ত পরিশ্রমের পর একটি তামার বর্শাফলক আবিষ্কার করেন তিনি, যেটির সাথে সিন্ধু সভ্যতার প্রত্ননিদর্শনের মিল পাওয়া যায়। ফলাটির সৌজন্যে তিনি নিশ্চিত হন যে, ঝুকরের সাথে সিন্ধু সভ্যতার যোগসূত্র আছে। তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তিগুলির মধ্যে আরেকটি হল আমরি আবিষ্কার। আমরি প্রত্নক্ষেত্র আবিষ্কার শুধু হরপ্পা আর মহেঞ্জোদারোর মধ্যে যোগসূত্রই স্থাপন করে না; এটি ইঙ্গিত দেয় যে, সিন্ধু সভ্যতা আরও একাধিক স্তরে বিকশিত হয়েছিল। সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন প্রাণকেন্দ্র চানহুদারোরও আবিষ্কর্তা ছিলেন এই ননীগোপাল মজুমদার। "তাঁর লেখা 'Inscriptions of Bengal' আজও প্রত্নতত্ত্বে ধ্রুপদী রচনা হিসেবে গণ্য হয়।" তাঁর অন্যান্য গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল তাঁর স্মৃতিকথা 'Explorations in Sindh', সাঁচী স্তূপ নিয়ে লেখা 'The Monuments of Sanchi' ইত্যাদি। তিন সন্তানের পিতা স্বনামধন্য এই প্রত্নতত্ত্ববিদকে অকালে উপজাতীয় পার্বত্য দস্যুদের গুলিতে প্রাণ খোয়াতে হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৯। অনেকের অনুমান, প্রাচীন শিলালিপি পাঠে দক্ষ (ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপি বিশেষজ্ঞ) ননীগোপাল মজুমদার আরও কিছু দিন বেঁচে থাকলে সিন্ধু লিপির (ব্রাহ্মী লিপির সাথে সদৃশ্য) পাঠোদ্ধার করে ফেলতেন যা আজও অধরাই রয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র: একটি হত্যারহস্য ও প্রত্নজিজ্ঞাসা, প্রসূন চৌধুরী (দেশ ১৭ নভেম্বর, ২০২২)