Thursday, 8 December 2022

৯ই ডিসেম্বর ২০২২, শুক্রবার

ব্রিটিশ সত্যাগ্রহী

১৯১৭ সালের জুন মাস। ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। হোম রুল আন্দোলনের প্রণেতা অ্যানি বেসান্তকে ভারতবর্ষের টালমাটাল রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে মাদ্রাজ গভর্নর তাকে গ্রেফতার করার সিদ্ধান্ত নেন এবং মাদ্রাজ প্রদেশের পাহাড়ি শহর উটাকামুন্ডের (বর্তমানে উটি) একটি পাহাড়ি কুটিরে গৃহবন্দি করে রাখেন। ফলস্বরূপ প্রতিবাদ অনিবার্য। শুধু মাদ্রাজ প্রদেশেই নয়, বাংলা ও বোম্বাই সহ যুক্ত প্রদেশের নানা স্থানে সভা-আলোচনার মাধ্যমে এই বেআইনি গ্রেফতারের কড়া নিন্দা করা হয়। এই কাজে দেশের নানা প্রান্তের জাতীয়তাবাদী সংবাদমাধ্যমগুলোও যোগ দেয়। বোম্বাই থেকে প্রকাশিত 'দ্য বোম্বাই ক্রনিক্যালে'র সম্পাদক ছিলেন বেঞ্জামিন গাই হরনিম্যান। ভারতবাসীর মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে স্বসমর্পিত বি জি হরনিম্যান এই অন্যায়ের প্রতিবাদে নিজেকে কেবল সম্পাদকীয়তেই সীমাবদ্ধ রাখেননি; প্রত্যক্ষ আন্দোলনে যোগদানের সিদ্ধান্তও নিয়ে বসেন। সেই উদ্দেশ্যে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারস্থ হতে শুরু করেন তিনি। সেরকমই দুইজন নেতা - মদন মোহল মালব্য ও মহম্মদ আলি জিন্নার সহযোগিতা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে ব্যর্থমনোরথ হরনিম্যান অবশেষে কংগ্রেসের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ মোতিলাল নেহরুর জ্যেষ্ঠ সন্তান সদ্য ব্যারিস্টারি প্রাপ্ত উদীয়মান নেতা জওহরলাল নেহরুকে চিঠি লেখেন। চিঠিতে অ্যানি বেসান্তকে কারামুক্ত করার পরিকল্পনাস্বরূপ এক আকর্ষণীয় পন্থার অবতারণা করেন তিনি। পন্থাটির বুনিয়াদ হল নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ। সমসাময়িক ভারতের রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধের ধারণা অশ্রুতপূর্ব ছিল না। সদ্য দক্ষিণ-আফ্রিকা ফেরত আরেক ব্যারিস্টার মাস দুয়েক আগে বিহারের চম্পারণে কৃষক আন্দোলনের পটভূমিতে উল্লিখিত পন্থাটি পারদর্শিতার সাথে প্রয়োগ করেন এবং দ্রুত সাফল্যও অর্জন করেন। যদিও হরনিম্যান তার পন্থার জন্য কোন আধ্যাত্মিক নাম পছন্দ করেননি (যেমনটি করেছিলেন দক্ষিণ-আফ্রিকা ফেরত ব্যারিস্টারটি), তবুও নিঃসন্দেহে বলা যায় সেটি একপ্রকার সত্যাগ্রহই।

হরনিম্যানকে তাঁর সত্যাগ্রহ বাস্তবায়নের প্রয়োজন পড়েনি। আলোচনা সভা ও সংবাদমাধ্যমগুলির ক্রমবর্ধমান সমালোচনার চাপে অবশেষে অ্যানি বেসান্তকে মুক্তি দেওয়া হয়। অ্যানি বেসান্ত সহজে মুক্তি না পেলে, সম্ভবত, বি জি হরনিম্যানের নেতৃত্বে পরিচালিত সত্যাগ্রহ আন্দোলনের এক অনন্য নিদর্শন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে পরবর্তী গান্ধী-সত্যাগ্রহের সাথে একাসনে স্থান লাভ করতো।

____________________

বি জি হরনিম্যান দক্ষিণ-আফ্রিকা তথা ভারতবর্ষে (চম্পারণে) গান্ধীজির সত্যাগ্রহ আন্দোলন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। তাঁদের বন্ধুস্থানীয় বলা না গেলেও, পত্রমারফৎ তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তাই হরনিম্যানের নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ অবতারণার মননে গান্ধীজির ভূমিকা থাকা মোটেই বিস্ময়কর নয়।

No comments:

Post a Comment