আজ অলোক ভট্টাচার্যের জন্মদিন । কে এই অলোক ভট্টাচার্য, তাই তো ?
এক কথায় উত্তরটি হবে ক্রিকেটার । আর নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে বাঙালি । কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয় । তাহলে বিস্তারিত বলার আগে, একটি গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট ম্যাচের কথা বলি -
সালটা ১৯৮০ । ভারত সফরে এসেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান । ছয় ম্যাচের টেস্ট সিরিজের আর মাত্র একটি ম্যাচ বাকি । সেটি অনুষ্ঠিত হবে কলকাতায় । গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের অধিনায়কত্বে ভারত ইতিমধ্যে ২-০ তে এগিয়ে অর্থাৎ সিরিজ পকেটে । ইডেন গার্ডেনসে ব্যবধানটা আর একটু বাড়িয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে খেলতে নামছে কপিল, সুনীল, কিরমানিরা । অন্যদিকে ঘরে ফেরার আগে অন্তত একটি জয় ঝুলিতে পোরার আকাঙ্ক্ষায় বদ্ধপরিকর পাকিস্তান । চাইবে নাই বা কেন । সেই ম্যাচটি ছিল পাকিস্তানের অধিনায়ক আসিফ ইকবালের বিদায়ী টেস্ট ম্যাচ । ছয় নম্বর জায়গাটা ফাঁকা করে দেওয়া এবং অধিনায়কত্বের ব্যাটনটা জাভেদ মিয়াদাদের হাতে তুলে দেওয়ার আগে শেষ বারের মতো জ্বলে উঠতে চান দলের 'ড্যাসিং এন্ড হ্যান্ডসম' ডানহাতি ব্যাটসম্যানটি ।
যাই হোক । ম্যাচের শুরুতে ভারত টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় এবং স্কোর বোর্ডে মোট ৩৩১ রান যোগ করে । পরেরদিন ফিল্ডিং করতে গিয়ে গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ দেখেন তার দলের স্লিপের স্থায়ী ফিল্ডার সুনীল গাভাসকারের মারাত্মক গলায় যন্ত্রণা । মাঠে নামতে পারবেন না । অনন্যোপায় হয়ে দ্বাদশ ব্যক্তির ডাক পড়লো । স্থানীয় খেলোয়াড়দের থেকেই দ্বাদশ ব্যক্তিকে দলে নেওয়া হতো, এটিই ছিল প্রচলন । তাই রিজার্ভ বেঞ্চে ছিলেন প্রণব নন্দী এবং অলোক ভট্টাচার্য । অবশেষে চেতন চৌহান, রজার বিনি, সন্দীপ পাটিলদের সাথে মাঠে নামলেন হাওড়ার বাসিন্দা বাংলার রঞ্জি দলের খেলোয়াড় অলোক ভট্টাচার্য । হ্যাঁ, এই সেই অলোক ভট্টাচার্য । এটিই ছিল তার একমাত্র আন্তর্জাতিক আবির্ভাব । সেই ম্যাচে দুর্দান্ত ফিল্ডিং করে দর্শকদের নজর কাড়লেও আন্তর্জাতিক স্তরে মাঠে ফেরার পুনরায় সুযোগ পাননি তিনি । তবুও তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন, থাকবেন । ক্রিকেটের গণ্ডির মধ্যেই তার আরও বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় আমরা পাই ।
'অলা' নামেই বেশি পরিচিত অলোক ভট্টাচার্য খেলোয়াড় হিসেবে ছিলেন ডান-হাতি অফ-স্পিনার । তবে লেগ-স্পিনটাও ছিল আয়ত্তের মধ্যে । তাই তার গুগলি খেলতে গিয়ে ব্যাটসম্যানদের ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়াই স্বাভাবিক । ব্যাটিংয়ে যে একদম অক্ষম ছিলেন তা হয় । পিচ আঁকরে কিছুক্ষণ প্রতিরোধ দেওয়ার ক্ষমতাটিও ছিল । এবং সবচেয়ে অবিস্মরণীয় যে প্রতিভাটি ছিল, সেটি হল তার ফিল্ডিং । তিনি যে সময়ের খেলোয়াড়, সে সময় একজন বোলারের কাছ থেকে ধুরন্ধর ফিল্ডিং আশা করাটাই বাড়াবাড়ি । কিন্তু ঠিক এই জায়গাটায় অলোক ভট্টাচার্য নিজেকে আর পাঁচজনের থেকে আলাদা করে রাখতে পেরেছিলেন ।
তার সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হিসেবে ১৯৭৪-৭৫য়ের রঞ্জি মরশুমে আসামের বিরুদ্ধে বোলিং পারফরম্যান্সকে উল্লেখ করা যেতে পারে । সেই ম্যাচে তার বোলিং ফিগার ছিল ১২.২-৬-১১-১০ । দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৭ রানের বিনিময়ে ৭টি উইকেট সংগ্রহ করে বাংলা দলকে জয় উপহার দেন তিনি ।
১৯৭০ সালে বাংলা দলের হয়ে অভিষেক হয় অলোক ভট্টাচার্যের । জাতীয় দলে ডাক না এলেও, প্রথম সারির ক্রিকেটে তাকে থেমে থাকতে হয়নি । ৪২টি ম্যাচ খেলে সংগ্রহ করেছেন ১৩৪টি উইকেট । উইকেট সংখ্যা আহামরি কিছু না হলেও বোলিং গড় এবং স্টাইক রেট ছিল দুর্দান্ত । রান দেওয়ার ব্যাপারেও ছিলেন প্রচণ্ড কৃপণ । তাই প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের চাপে ফেলতে তার অবদান অস্বীকার করার পথ নেই । উইকেট পড়া তো খালি সময়ের অপেক্ষা ।
সীমিত ওভারের খেলায় চমক আনতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন । ৮টি লিস্ট এ ম্যাচ খেলার পর সাকুল্যে ১টি মাত্র উইকেটই তিনি সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন ।
বাংলার হয়ে খেলা ছাড়াও অলোক ভট্টাচার্য বেশ কিছু স্থানীয় ক্লাবের হয়ে ক্রিকেট খেলেছেন । মহামেডান, ইস্ট বেঙ্গল প্রভৃতি ক্লাবের হয়ে প্রচুর দাপুটে ম্যাচ খেলেছেন । শেষ ক্লাব ছিল শ্যামবাজার ।
বাংলার প্রাক্তন অধিনায়ক সম্বরণ অলোক ভট্টাচার্যের ব্যাপারে স্মৃতিচারণ করে বলছেন, 'জোরের ওপর লেগ স্পিন করতে পারতো ।...একবার আমেদাবাদে দলীপে পশ্চিমাঞ্চলের হয়ে কারসন ঘাউড়িকে দারুণ বেকায়দায় ফেলেছিল । কারসন বুঝতেই পারছিল না অলা কি বল করছে ।' ভারতের জাতীয় দলের খেলোয়াড়, এই কারসন ঘাউড়ি ছিলেন সেই সময় ভারতের নির্ভরযোগ্য অলরাউন্ডার । রঞ্জির পাশাপাশি অলোক ভট্টাচার্য ১৯৭৫-৮০য়ের মধ্যে পূর্বাঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন ।
ক্রিকেট খেলোয়াড় হিসেবেই তার অবদান শেষ হয়ে যায়নি । অবসর গ্রহনের পর ক্রিকেট আম্পায়ারিংয়ে মনোনিবেশ করেন । স্থানীয় ক্রিকেটে কড়া এবং তুখোড় আম্পায়ারের প্রসঙ্গ উঠলেই প্রথমে অলোক ভট্টাচার্যের নাম আসবে । ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান (ক্রিকেট) ম্যাচ কিংবা ঘরোয়া কোনও ক্লাব ম্যাচের ফাইনাল মানেই এক্সপার্ট আম্পায়ার অলোক ভট্টাচার্য । প্রথম শ্রেণির ম্যাচেই আম্পায়ারিং করেই ক্ষান্ত হননি তিনি । আন্তর্জাতিক সীমিত ওভারের ম্যাচেও আম্পায়ারিংয়ের সুযোগ পেয়েছেন । তবে সংখ্যাটি নিতান্তই কম - মাত্র ৩টি । ২০০২ সালে মোহালিতে ভারত বনাম জিম্বাবোয়ে ম্যাচে তাকে শেষ আম্পায়ারিং করতে দেখা গেছে ।
এরপর তাকে দেখা যায় কোচের ভূমিকায় । বাংলার কনিষ্ঠ দলের কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সাথে । তবে এরচেয়ে বেশিদূর আর এগোননি ।
শেষ জীবনে প্রশাসকের ভূমিকাটি বেছে নেন পোড় খাওয়া বাঙালি ক্রিকেটার অলোক ভট্টাচার্য । জীবনের চড়াই-উতড়াইয়ে প্রথম শারীরিক বাঁধার সম্মুখীন হন তিনি । বাইপাস সার্জারি হয় । এতে একটুও দমে যাননি । ফের মাঠে ফিরে সিএবির বরিষ্ঠ দলের নির্বাচকের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন ।
বাংলার আর এক প্রাক্তন অধিনায়ক লক্ষ্মীরতন শুক্লার কথায়, 'অনূর্ধ্ব-১৬ তে আমি যে বার প্রথম গায়ে বাংলার জার্সি পড়ি, সেই ম্যাচে অলোক স্যর কোচ । আমায় ডাকতেন টাইগার বলে । সবচেয়ে বড় কথা্ (তিনি) অনেক বড় মনের মানুষ ।'
গত বছর (২০১৬) ২৫ ডিসেম্বর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান । তার প্রতি শেষ সম্মান হিসেবে তার মরদেহ সিএবিতে নিয়ে আসা হয়, সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়য়ের আনুষ্ঠানিকতায় ।
(সৌজন্যে কলকাতা ক্রিকেট ক্লাব গ্রুপের সদস্য বিভাস মল্লিক, পত্রিকা এ-বেলা এবং ইএসপিএনক্রিকইনফো)