Saturday, 25 May 2024

২৫শে মে ২০২৪, শনিবার, তৃতীয় প্রহর

পিঙ্ক ট্যাক্স বা গোলাপি করের ব্যাপারে প্রথম জানলাম। হাইদ্রাবাদের নালসার জাতীয় আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সহস্ত্রাংশু পাণ্ডের লেখা When pink is a taxing color প্রবন্ধটি গোলাপি করের প্রসঙ্গে লেখা। বাজারে বিক্রি হওয়া বেশ কিছু পণ্যদ্রব্য - বিশেষ করে যেগুলি নারীদের উপযোগী - লিঙ্গভেদে ভিন্ন মূল্যের হয়ে থাকে এবং প্রায় প্রত্যেক ক্ষেত্রেই নারীদের জন্য নির্ধারিত পণ্যদ্রব্যগুলিতে অধিকতর মূল্য ধার্য হয়। একই দ্রব্যের জন্য নারীদের এই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়কেই গোলাপি কর বা পিঙ্ক ট্যাক্স বলা হচ্ছে। ১৯৯৪ সালে প্রথম এই শব্দ জোড়াটি ব্যবহার হলেও, ২০১৫ সালে নিউইয়র্কের এক সরকারী সংস্থার বাণিজ্যিক সমীক্ষায় 'পিঙ্ক ট্যাক্সের' আলোচনার বিস্তারিত উল্লেখ পাওয়া যায়। সহস্ত্রাংশু পাণ্ডের প্রবন্ধটিতে আলোচিত দুটি বিশেষ বিষয়ে আমার আগ্রহ জন্মায় - একটি হল পিঙ্ক ট্যাক্স সংশ্লিষ্ট বিষয় এবং পিঙ্ক ট্যাক্সের সূত্র ধরেই অন্য আরেকটি সাধারণ বিষয়।

সহস্ত্রাংশু পাণ্ডের মতে, পাশ্চাত্য নির্ধারিত পিঙ্ক ট্যাক্সের সংজ্ঞায় যথেষ্ট ত্রুটি আছে। সংখ্যার বিচারে মূলত দুইটি। প্রথমটি হল, পিঙ্ক ট্যাক্সের আলোচনায় ট্রান্সজেন্ডার সহ অন্যান্য এলজিবিটিকিউ-য়ের অন্তর্ভুক্ত সম্প্রদায়গুলিকে সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। সে সকল সম্প্রদায়ের মানুষেরা যে এই বৈষম্যের শিকার হতে পারেন (এবং অবশ্যই হন) তা ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয়নি। দ্বিতীয়টি হল, পিঙ্ক ট্যাক্সের পরিসর কেবল দৈনন্দিন ব্যবহার্য কয়েকটি জিনিসপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সমাজের অনেক ক্ষেত্রেই তার ব্যাপক এবং গভীর কিন্তু আপাত অদৃশ্য দৃষ্টান্তের সন্ধান পায়, যার দায়ভার কেবল এবং কেবলমাত্র নারীদেরই বহন করতে হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি নারীদের ঘরের বাইরে নিজস্ব সুরক্ষার জন্য প্রচলিত বিবিধ সরঞ্জাম (যেমন - পেপার স্প্রে, স্টান গান ইত্যাদি) কেনার উল্লেখ করেছেন - পুরুষদের যেগুলি কখনই ব্যবহার করতে হয় না।

আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়টি হল, সাধারণ ভারতবাসীর অপরাপর একটি উল্লেখযোগ্য ভ্রান্ত ধারণা। যে নয়া যাবতীয় কিছুর উৎপত্তি সেই পাশ্চাত্যেই। পিঙ্ক ট্যাক্সের ধারণাটিও ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু সেটি সঠিক নয়। অভিন্ন নামটির প্রচলন ভারতবর্ষে হয়নি ঠিকই, কিন্তু ভারতবর্ষে অনেক আগে থেকেই পিঙ্ক ট্যাক্স প্রচলিত ছিল এবং বলাই বাহুল্য, এখনও আছে। উনিশ শতকের শুরুতে ট্রাভাঙ্কর (কোচিন) রাজ্যে ধার্য মুল্লাকরম বা স্তন কর - যা নিচু শ্রেণীর (নাদের, এজাভা ইত্যাদি) অস্পৃশ্য মহিলাদের উপর লাগু হতো এবং যার প্রবিধানে স্তন ঢেকে রাখার জন্য তাদের মাথাপিছু কর দিতে হতো - ছিল এক শোষণমূলক অমানবিক পিঙ্ক ট্যাক্স। পণ প্রথা হল আরেকটি বিশেষ ধরনের পিঙ্ক ট্যাক্স। চিরন্তন এই প্রথার প্রচলন বর্তমান (এমনকি শিক্ষিত ও বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত) সমাজে বেড়েছে বই কমেনি।

স্পষ্টতই, পিঙ্ক ট্যাক্স কেবল আর্থিক বৈষম্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটির প্রভাব অর্থনৈতিক পরিসীমা ছাড়িয়ে সামাজিক বৈষম্যের বলয়ে প্রবেশ করেছে। সেখানে পীড়িতদের সামাজিক পরিচয় এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন। এই বৈষম্য সমূলে নির্মূল না করলে, নারীত্ব, যা নারীর ভূষণের সাথে তুলনীয়, অযাচিত কালিমায় পর্যবসিত হবে।

Wednesday, 22 May 2024

২২শে মে ২০২৪, বুধবার, প্রথম প্রহর

দ্য টেলিগ্রাফে গত শনিবারের প্রবন্ধে (Nehru's Patel) ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ কিভাবে পূর্বেকার দুই কমরেড ও সহকর্মী - জওহরলাল নেহরু এবং সর্দার বল্লভভাই পটেল - বর্তমান কালে দুই প্রতিপক্ষ ও বিরোধী হিসেবে জনসমক্ষে প্রদর্শিত হচ্ছেন, তার সংক্ষিপ্ত কিন্তু যথার্থ কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। কেবল নেহরুই নন, সমগ্র কংগ্রেস পার্টি থেকে পটেলকে বিচ্ছিন্ন করে, তাঁকে নরেন্দ্র মোদীর তথা বিজেপির আদর্শগত নতুন আইকন হিসেবে বারংবার প্রচার করার সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির পেছনে প্রাথমিকভাবে ও প্রধানত দায়ী হচ্ছে জওহরলাল নেহরুর খোদ নিজের পরিবার - গান্ধী পরিবার। দেশের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর অকালমৃত্যুর (১৯৬৬) পর কংগ্রেস পার্টি নেহরুর একমাত্র সন্তান ইন্দিরা গান্ধীকে শাস্ত্রীর উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচন করে। ঘটনার সূত্রপাত হয় সেখানেই। ইন্দিরাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে ভেবেই কংগ্রেসের প্রধানরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু হিতে বিপরীত হয়। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের সাথে সাথে কংগ্রেস পার্টিরও সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন এবং পার্টিকে একটা 'পারিবারিক ফার্মে' পরিনত করেন। শুরু হয় তাঁর পিতৃপ্রচার। ছোট বড় যাবতীয় সরকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাবার নাম জুড়ে দিতে শুরু করেন। তিনি যে পটেলের অবদানের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলেন না, তা নয় - জাতীয় পুলিশ একাডেমী পটেলের নামে প্রতিষ্ঠা করা হয় - কিন্তু তাঁর সরকারের সিংহভাগ প্রচারে ঠাই পান একমাত্র নেহরু। মায়ের (মৃত্যুর) পর বড় ছেলে রাজীব সে কাজে সিদ্ধহস্ত হন। মা ছেলে মিলে কংগ্রেস পার্টির ইতিহাসকে কেবলমাত্র একটি পরিবারের ইতিহাসে পর্যবসিত করেন। অব্যবস্থা চরমে ওঠে যখন রাজীব গান্ধীর স্ত্রী সোনিয়া কংগ্রেসের সভাপতি (১৯৯৮) হন। তাঁর বিবেচনায় কংগ্রেসের ইতিহাসে পটেলের কোন স্থান ছিল না। ছিল না মৌলানা আজাদ, সরোজিনী নাইডু বা কে কামরাজের কোন ভূমিকা। মাঝে মধ্যে মহাত্মা গান্ধীর নাম উল্লেখ হতো বইকি, কিন্তু প্রায় বাকি প্রচারটার পুরোটাই ছিল একটি মাত্র পরিবারের। এমনকি নেহরু বা ইন্দিরাকে ছাপিয়ে রাজীব গান্ধী কংগ্রেস তথা তৎকালীন সরকারের মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০০৪ থেকে ২০১৪-র মাঝে (কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএর শাসনে) প্রচুর সরকারী প্রকল্প রাজীব গান্ধীর নামে রাখা হয়। তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে অবিবেচকের মতো সরকারী অর্থ ব্যয় করা হয়।

সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে এগিয়ে আসেন নরেন্দ্র মোদী এবং পরবর্তীকালে তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি। যদিও তিনি আগাগোড়া থেকে আরএসএসের কিংবদন্তী কে বি হেডগেওয়ার এবং এম এস গোলওয়ালকরের আদর্শে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। কর্মজীবনের অনেক পরে তিনি পটেলকে স্তুতি গাইতে শুরু করেন। ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে অংশগ্রহণ কালে নরেন্দ্র মোদীর পটেলভক্তি উচ্ছ্বসিত বেগ পায়। মোদীর সাথে সাথে বিজেপি পার্টিও পটেলের গুণকীর্তনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে। তার মহত্তম পরিণতি হিসেবে আমরা দেখতে পাই পটেলের স্মৃতিসৌধ স্ট্যাচু অফ ইউনিটি।

রামচন্দ্র গুহ লিখছেন, "কংগ্রেসের ইতিহাসকে কেবলমাত্র একটি পরিবারের ইতিহাসে রূপান্তরিত করার সোনিয়া গান্ধীর প্রচেষ্টাকে সর্দার পটেল হয়তো একান্ত কৌতুকের চোখেই দেখতেন; কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর নাম ও অবদানের অনিষ্টকর অপব্যবহার করে বিজেপি পার্টির দেশগঠনের নেপথ্যে ক্রিয়াশীল এক নিরন্তর যুগলবন্দীকে ভাঙার অপচেষ্টা দেখে ক্রোধ সংবরণ করতে পারতেন না।"

স্বাধীনতা পরবর্তী দেশগঠন কালে সর্দার বল্লভভাই পটেল এবং জওহরলাল নেহরুর অনবদ্য জুড়ি কেবল আধুনিক ভারতবর্ষের ইতিহাসেই নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও বিরল। তাঁদের জুড়ি কেবল আদর্শগত উৎকৃষ্টতার পরিচায়কই ছিল না, দেশের জন্য অত্যাবশ্যকও ছিল।

Tuesday, 21 May 2024

২১ শে মে ২০২৪, মঙ্গলবার, তৃতীয় প্রহর

প্রায় দেড় বছর পর এখানে লিখতে এলাম। সময়ের ব্যবধানটুকু সামান্য হলেও, এরই মাঝে অনেক কিছু কাটিয়ে এসেছি। অনেক কিছু পাল্টে এসেছি। কিছু খুইয়েছি, প্রচুর পেয়েছি। দুই মাস ঘরছাড়া থেকেছি। আবার গত মাস দুয়েক থেকে নতুন বউয়ের সাথে ঘর সংসার করছি। পিত্ত (পড়ে?) গেছে গত বছর এপ্রিলে, সঙ্গে ফাউ গেছে দেড় সের শরীরের মাস সহ লক্ষাধিক টাকা। এখন সুস্থ, সুখ-সংসারের মায়ায় মন বেঁধে লিখতে (টাইপ করতে) বসেছি। গরমের ছুটি শুরু হয়ে গেছে। নতুন বছর, গরমের ছুটি বা পুজোর ছুটি এলে মনস্থির করি নতুন কিছু করার। এবারও কোনো ব্যতিক্রম হচ্ছে না। রাজমোহন গান্ধীর দক্ষিণ ভারতের ইতিহাসের ওপর লেখা 'মডার্ন সাউথ ইন্ডিয়া' বইটা পড়া শুরু করেছি। ফরাসির তালিম তো চলছেই। তার সাথে ভাবলাম নিয়মিত ব্লগ লেখাটা শুরু করি। একটা নতুন পাঠিকা জুটেছে। সেই প্রধান অনুপ্রেরণা। কিন্তু কি লিখি? সাহিত্য আমার কম্ম নয়। বুদ্ধিজীবী টাইপ লেখার ক্ষমতা আমার নেই। কাকের মতো এখানে সেখানে এই সেই খুঁটে চেটে পেট চালায়। (মন্ত্র সাধনার মতো মেধা সাধনা বলে কি কিছু হয়?) তাই ঠিক করেছি, আপাতত, রোজকার পড়াশোনায় যা কিছু সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হচ্ছি তাই কমবেশি কম্বিনেশনে ডিজিবদ্ধ (ডিজিট্যালি লিপিবদ্ধ, আই-টি সমাস) করবো। নিজের রোজনামচা ঘেঁষা অহরহ পঠনপাঠন মার্কা কিছু একটার হর দিনের সংকলন। দেখা যাক, কয়দিন চলে।