পিঙ্ক ট্যাক্স বা গোলাপি করের ব্যাপারে প্রথম জানলাম। হাইদ্রাবাদের নালসার জাতীয় আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সহস্ত্রাংশু পাণ্ডের লেখা When pink is a taxing color প্রবন্ধটি গোলাপি করের প্রসঙ্গে লেখা। বাজারে বিক্রি হওয়া বেশ কিছু পণ্যদ্রব্য - বিশেষ করে যেগুলি নারীদের উপযোগী - লিঙ্গভেদে ভিন্ন মূল্যের হয়ে থাকে এবং প্রায় প্রত্যেক ক্ষেত্রেই নারীদের জন্য নির্ধারিত পণ্যদ্রব্যগুলিতে অধিকতর মূল্য ধার্য হয়। একই দ্রব্যের জন্য নারীদের এই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়কেই গোলাপি কর বা পিঙ্ক ট্যাক্স বলা হচ্ছে। ১৯৯৪ সালে প্রথম এই শব্দ জোড়াটি ব্যবহার হলেও, ২০১৫ সালে নিউইয়র্কের এক সরকারী সংস্থার বাণিজ্যিক সমীক্ষায় 'পিঙ্ক ট্যাক্সের' আলোচনার বিস্তারিত উল্লেখ পাওয়া যায়। সহস্ত্রাংশু পাণ্ডের প্রবন্ধটিতে আলোচিত দুটি বিশেষ বিষয়ে আমার আগ্রহ জন্মায় - একটি হল পিঙ্ক ট্যাক্স সংশ্লিষ্ট বিষয় এবং পিঙ্ক ট্যাক্সের সূত্র ধরেই অন্য আরেকটি সাধারণ বিষয়।
সহস্ত্রাংশু পাণ্ডের মতে, পাশ্চাত্য নির্ধারিত পিঙ্ক ট্যাক্সের সংজ্ঞায় যথেষ্ট ত্রুটি আছে। সংখ্যার বিচারে মূলত দুইটি। প্রথমটি হল, পিঙ্ক ট্যাক্সের আলোচনায় ট্রান্সজেন্ডার সহ অন্যান্য এলজিবিটিকিউ-য়ের অন্তর্ভুক্ত সম্প্রদায়গুলিকে সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। সে সকল সম্প্রদায়ের মানুষেরা যে এই বৈষম্যের শিকার হতে পারেন (এবং অবশ্যই হন) তা ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয়নি। দ্বিতীয়টি হল, পিঙ্ক ট্যাক্সের পরিসর কেবল দৈনন্দিন ব্যবহার্য কয়েকটি জিনিসপত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সমাজের অনেক ক্ষেত্রেই তার ব্যাপক এবং গভীর কিন্তু আপাত অদৃশ্য দৃষ্টান্তের সন্ধান পায়, যার দায়ভার কেবল এবং কেবলমাত্র নারীদেরই বহন করতে হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি নারীদের ঘরের বাইরে নিজস্ব সুরক্ষার জন্য প্রচলিত বিবিধ সরঞ্জাম (যেমন - পেপার স্প্রে, স্টান গান ইত্যাদি) কেনার উল্লেখ করেছেন - পুরুষদের যেগুলি কখনই ব্যবহার করতে হয় না।
আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়টি হল, সাধারণ ভারতবাসীর অপরাপর একটি উল্লেখযোগ্য ভ্রান্ত ধারণা। যে নয়া যাবতীয় কিছুর উৎপত্তি সেই পাশ্চাত্যেই। পিঙ্ক ট্যাক্সের ধারণাটিও ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু সেটি সঠিক নয়। অভিন্ন নামটির প্রচলন ভারতবর্ষে হয়নি ঠিকই, কিন্তু ভারতবর্ষে অনেক আগে থেকেই পিঙ্ক ট্যাক্স প্রচলিত ছিল এবং বলাই বাহুল্য, এখনও আছে। উনিশ শতকের শুরুতে ট্রাভাঙ্কর (কোচিন) রাজ্যে ধার্য মুল্লাকরম বা স্তন কর - যা নিচু শ্রেণীর (নাদের, এজাভা ইত্যাদি) অস্পৃশ্য মহিলাদের উপর লাগু হতো এবং যার প্রবিধানে স্তন ঢেকে রাখার জন্য তাদের মাথাপিছু কর দিতে হতো - ছিল এক শোষণমূলক অমানবিক পিঙ্ক ট্যাক্স। পণ প্রথা হল আরেকটি বিশেষ ধরনের পিঙ্ক ট্যাক্স। চিরন্তন এই প্রথার প্রচলন বর্তমান (এমনকি শিক্ষিত ও বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত) সমাজে বেড়েছে বই কমেনি।
স্পষ্টতই, পিঙ্ক ট্যাক্স কেবল আর্থিক বৈষম্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটির প্রভাব অর্থনৈতিক পরিসীমা ছাড়িয়ে সামাজিক বৈষম্যের বলয়ে প্রবেশ করেছে। সেখানে পীড়িতদের সামাজিক পরিচয় এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন। এই বৈষম্য সমূলে নির্মূল না করলে, নারীত্ব, যা নারীর ভূষণের সাথে তুলনীয়, অযাচিত কালিমায় পর্যবসিত হবে।