Wednesday, 29 July 2020

চিবিক্ত

ছয়

কাউকে এড়িয়ে চলতে গেলে তার উপস্থিতিকে অস্বীকার করাটা আবশ্যিক। চিবিক্ত ভান করতে শুরু করে যেন ককটেল গ্রুপে সে আর ডেপুটি ছাড়া আর কেউ নেই। কেবলমাত্র ডেপুটিকে উদ্দেশ্য করে কথা বলতে থাকে। অনেক কিছুই বলতে থাকে। 'ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি' জোরে জোরে বলতে হয়, যাতে স্বয়ং ভূতও শুনতে পায়। ডেপুটি ডেপুটির ভূমিকা ভালো ভাবেই পালন করে। অন্যদিকে মোদী আর বিজেপিকে নিয়ে লালের বিরক্তিকর মিমস শেয়ার চলতে থাকে। 

হয়তো চিবিক্ত আদৌ ক্ত নয়, কেবল মাত্র চিবি মুতু। তাতে লালের কিছু এসে যায় না! পারলে সে চিবিকে ক্ত বানিয়েই ছাড়ছে। কিন্তু লালও নিশ্চিত নয়, ঠিক কোন ভূত দেখে চিবিক্ত চিৎকার করে উঠবে?

২১শে জুন

সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যার পেছনে বলিউডের নেপোটিজম কতটা দায়ী বা আদৌ দায়ী কি না, সেটা বর্তমানে জাতীয় বিতর্কের রূপ নেয়। ককটেলের সদস্যরাও তাতে অংশ নেয়। বলিউডের অভিনেত্রী সোনম কাপুর নেপোটিজমের সমর্থনে বিতর্কমূলক মন্তব্য করে। সেটিকে কেন্দ্র করে শেষ দিনের লড়াই শুরু হয়।

লাল: নাচনেওয়ালিরাও অহংকার দেখাতে কম যায় না।

ডেপুটি: ঠিক।

চিবিক্ত: নেপোটিজম তো বলিউডে বরাবরই। এটা একটা হিউজ প্রবলেম। এতদিন মানুষ সোচ্চার হয়েছে এটা ভালো কথা। যদিও নেপোটিজম শুধু বলিউডে নয়, এই দেশের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে রয়েছে। ইভেন ইন্ডিয়ান পলিটিক্সের হিস্ট্রিতে তো আষ্টেপিষ্টে আছে। হ্যাঁ আমি নেহেরু ফ্যামিলির কথাই বলছি। তিন পরপর প্রজন্মের তিনজন ইন্ডিয়ার প্রাইম মিনিস্টার থেকেছে, জাস্ট ভাবা যায়! মনে হয় গণতন্ত্র নয়, রাজতন্ত্র চলছিল এ দেশে। একটা ফ্যামিলি ইন্ডিয়াকে শাসন করছে দীর্ঘদিন ধরে। এটাই ভারতের বৃহত্তম নেপোটিজমের এক্সাম্পল। জানিনা কেন স্বল্প খ্যাত, অ্যাভারেজ লেভেল অ্যাকটরকে মরে গিয়ে ব্যাপারটা সবাইকে মনে করাতে হলো! বাকি থাকলো সহানুভূতির কথা? যদি সুইসাইড করে মরে থাকে, তাহলে বলবো যে নিজের লাইফের প্রতি কোন সিমপ্যাথি শো করেনি, তার প্রতি কিইবা সিমপ্যাথি থাকবে।

লাল: সুযোগের টুঁ পেলেই নেহরুর ভূত নামানোয় মরিয়া মোদীর মতো মুতে নুনু ঝাঁকিয়ে নেওয়ার স্বতঃস্ফূর্ত আস্ফালনে ভক্তগণ বিরত থাকবে, 'জাস্ট ভাবা যায়'? আলু পচা পর্তুগাল দায়ী, রাবন পচা সীতা। ভোট দেয় ভিখারি, আমি বাবু সরকারি।

বাঁধ ভেঙে দাও...বাঁধ ভেঙে দাও...বাঁধ ভেঙে দাও...দিলও ঠিক চিবিক্ত বাঁধ ভেঙে

চিবিক্ত: আমার এই লেখাটা কিন্তু ফরোয়ার্ডেড নয়। আমার নিজের লেখা, নিজের ফিলিংস।

কাজেই যা বলবি, যাকে বলবি, ভেবে বলবি। ততটাই বলবি, যতটা পরে রেশনালাইজ করতে পারবি, যতটা যাকে বলছিস ততটা তাকে বোঝাতে পারবি। যতটা জেনারালাইজ করতে পারবি। ব্যক্তিগত আক্রমণ করার জন্য আশা করি গ্রুপটা খোলা হয়নি।

বাছা-বাছা তত্ত্বকথা জ্ঞানী-গুণীদের কোট থেকে নোংরা খিস্তিতে নেমে এসেছিস দেখছি। "তোমাকে বলিনি, ইন জেনারেল বলছি, তুমি গায়ে মাখছো কেন?", এসব কথা বলে আশা করি পরে মেকআপ করার চেষ্টাও করবি না। ঘাসে মুখ দিয়ে কেউ চলে না। বিচারবুদ্ধি সবারই আছে। একটা পার্টিকুলার পোষ্টের এগেনস্টে কিছু বলার মানে, পোস্টটা যার তাকেই বলা, সেটা না বোঝার মতন ইমম্যাচিউরিটি নিশ্চয়ই আর নেই।

লাল: যাঃ বাবা! দিনরাত বিজেপির জপ করে করে এই অবস্থা হয়েছে রাজ্যের। নবারুণ ভট্টাচার্যকে ছুড়ে ফেলে হিন্দিভাষীদের রামায়ণ-মহাভারতের আদলে কথা বলতে হবে দেখছি - মাতাশ্রী, পিতাশ্রী, মহর্ষি। গোমূত্রে কুলকুচি নিকট ভবিষ্যৎ।

ব্যক্তিগত আক্রমণে নির্দেশক সর্বনাম ব্যবহার্য। হ্যাঁ এবার আজান শুনে মোল্লা বেচ্যান হলে আমি কি করতে পারি।

২২শে জুন

ডেপুটি: একটু বেশি বিটারনেস ভরে গেছে তোমার মধ্যে, আমরা বিরোধী হতে পারি, শত্রু নিশ্চই নই।তাই এত তীক্ষ্ণ শব্দের কি খুব দরকার আছে?

লাল: কে তীক্ষ্ণ শব্দ ব্যবহার করছে?

ডেপুটি: তুমি, আবার কে!

লাল: আর ডেপুটিটা কে?

ডেপুটি: কে?

লাল: বয়কট চায়না ছেড়ে, "ভাবো, ভাবো। ভাবা প্র্যাক্‌টিস‌ করো।"

ডেপুটি: কোন কনটেক্সটে বলছো?

লাল বুঝিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না (কারণ, ডেপুটি 'কনটেক্সট'টা ঠিকই বুঝতে পেরেছে। তার বদলে লাল যারা ইংরেজি সিনেমা হিন্দি বা অন্য ভাষায় ডাবিং দেখতে পছন্দ করে, তাদের ব্যঙ্গ করে একটি মিম শেয়ার করে। আর এই গ্রুপে 'যারা' বলেতে কেবল একজনই আছে।

বিজেপির রামদাস আঠওলের হোটেল-রেস্টুরেন্টে চাইনিজ খাবার বয়কটের পরামর্শ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের অধিবাসীদের ওপর তার কি প্রভাব পড়তে পারে সে বিষয়ে আগের দিন করা মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে লাল একটি ভিডিও শেয়ার করে। বিজেপির ভক্তদের দ্বারা মুম্বইয়ের কোনো একটি চীনা খেলনার দোকান ভাঙচুরের ভিডিও।

লাল: দোকানটি যদিও মুম্বাইয়ে এবং আমি নিশ্চিত দোকানদার সরকারি বেতনভোগী সুবিধাবাদী শ্রেণীর লোক নন। 'বিটারনেস' লোকে সখে পালন করে না।

এদিকে ডেপুটি লেগেই আছে।

ডেপুটি: ডেপুটি কেনো বললে বলো?

লাল: (সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে) আর যখন উঠপাখির মতো মাটিতে মাথা গুঁজে পড়ে থাকার মতো মানুষ দেখি, তখন আর নিয়ন্ত্রণে থাকে না।

ডেপুটি: ঠিক আছে।

ঠিক আছে। এবার অনুচ্ছেদ রচনার জন্য প্রস্তুত হোন।

চিবিক্ত: নিজেকে এডুকেটেড ভাবা ভালো। বাট আমি মনে করি এডুকেশন নম্র ভদ্র হওয়া শেখায়। এটাও এডুকেশনের একটা পার্ট। না হলে তো পাঠ্যবইয়ে নবারুনের লেখা থাকতো। যদিও ডব্লিউবিতে কথাঞ্জলির কিছু কিছু অংশ পাঠ্যবইতে ঢুকে গেলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এডুকেশন অপমান সহ্য করার ক্ষমতা শেখায়। অন্যকে ধুয়ে দেওয়া তে কোন ক্রেডিট নেই। আফটার সার্টেন টাইম সেটা সবাই বুঝতে পারে, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। যারা ইংলিশ বোঝো, তাদের সঙ্গেও যেমন মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলাটা অন্যায় নয়, সেরকম নেটফ্লিক্সের কনটেন্ট হিন্দি অর বাংলা ডাব্ড‌ দেখাও অশিক্ষার পরিচয় নয়।

(অন্য ভাষায় ডাবিংয়ের মিমটির প্রসঙ্গে) আমি ডেপুটিকে বলেছিলাম যে আমি 'স্ট্রেঞ্জার থিংস' হিন্দি ডাব্‌ডে দেখলাম সিজন ৩টা। তাই এটাও আমাকে বলা হয়েছে বুঝতেই পারছি। এই গ্রুপে আসার পরের দিন থেকে এরকম কথা শুনেই যাচ্ছি। হ্যাঁ, এডুকেশন অপমান সহ্য করার ক্ষমতা শেখায় কিন্তু তারও একটা লিমিট আছে। লাল অর ডেপুটি ডব্লিউবিসিএস, ইউপিএসসি অর আরও বেটার কোন সার্ভিস পেয়ে গেলে তোরাও সরকারি বেতনভোগী প্রিভিলেজড ক্লাসের লোক হয়ে যাবি। এতে কোনো অপরাধ নেই, আছে কি? একবার নয়, একাধিকবার বলা হয়েছে। আর এই গ্রুপে সরকারি চাকুরে আপাতত একজনই আছে সেটা নিশ্চয়ই মনে করিয়ে দিতে হবে না। এটা তো ওপেন প্ল্যাটফর্ম নয়, যেখানে জেনেরালাইজ বক্তৃতা দেওয়া যেতে পারে। এখানে জাস্ট তিন জনই আছে। এখানে রানাঘাটের (ডেপুটির বাড়ি) লোকদের নামে কিছু বললে ডেপুটির গায়েই লাগবে, যতই আমি বলি না কেন যে আমি রানাঘাটের জেনারেল পাবলিকের কথা বলছিলাম।

আমি নিজেও কোনদিন মোদীকে সমর্থন করে একটা অক্ষর লিখিনি এই গ্রুপে। কারন আমি নিজেও মোদীর সমর্থক নই। আমিতো ডব্লিউবিয়ের প্রায় সব মিনিস্টার কে হেট করি, কিন্তু কই, এই গ্রুপে কারো সম্পর্কে তো খারাপ কিছু লিখিনি। তখনই লিখতাম, যদি এই মাত্র তিনজনের সংকীর্ণ গ্রুপে তিনজনেরই পলিটিক্যাল মতামত এবং ভিউ একই রকম হতো। তা নয় যেখানে, তখন সে সব বলা বা পোস্ট করার মানে কারোর না কারোর গায়ে লেগে যেতে পারে। বললাম তো কাউকে হার্ট করা বা ধুয়ে দিতে সবাই পারে নিজের নিজের পদ্ধতিতে, বাট সামনের মানুষটা যদি ডাইরেক্টলি অর ইনডাইরেক্টলি আমার কোন ক্ষতি না করে, তাহলে সেটা করতে যাওয়া অমানবিক, এবং অতিমাত্রায় বোকামো।

চায়না জিনিস বর্জনের পক্ষে আমি আজকে ছিলাম না। আগেও মনে হয়েছে। হ্যাঁ, হয়তো তেমন কোনো ইনিশিয়েটিভ নিইনি। এবারে পরিস্থিতি অন্যরকম, তাই কিছুটা হয়তো নিতে পারবো। বাট এ সবকিছুই আমার বিচার বুদ্ধি দিয়ে বিশ্লেষণ করে মন স্থির করা। মোদী বলেছে বলে নয়। মোদী কখনোই আমার অর আমাদের পথপ্রদর্শক হতে পারে না। কিন্তু সে তো আজ ক্ষমতায়, সে তো চাইবেই তার মতন করে জনগণকে ম্যানিপুলেট করতে। এটাই পলিটিক্স, আর এটা ডার্টি হবেই। মতামত ভিন্ন হতেই পারে। এটাই ন্যাচারাল। কিন্তু তার জন্যে কাউকে হার্ট করার মধ্যে বিন্দুমাত্র ক্রেডিট নেই। এই কথাটা আসন্ন ১০ ইয়ার্সের মধ্যে ক্লিয়ারলি বুঝে যাবি। সে তুই তখন স্বীকার করিস বা না করিস।
গ্রুপটা খুলেছিলাম শুধুমাত্র সুস্থ আলোচনা, আর কিছু ফিলিংস আদান-প্রদানের জন্য। যেন তিনজনেরই গ্রুপে আসার আনন্দ পায়, যেন বসে কিছুটা গল্পগুজব করার মতন এনভায়রনমেন্ট তৈরি হয়। বাট এটা একটা ঘৃণ্য, অসুস্থ, খিস্তি-খামারি যুক্ত, কাদা ছোড়াছুড়ির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তাও এটা পাড়ার রক নয়, যে রাজনীতি নিয়ে কড়া কড়া কথা শুনিয়ে দেব অল্প পরিচিত লোকটাকে। নিজের যেটা এন্টারটেইনমেন্ট মনে হচ্ছে, সেটা যেন কেউ পার্সোনালি না নেয়, আমার ভাবাবেগ যেন অন্যকে শুধুমাত্র হার্ট করে পর্যদুস্ত না করে, সেই খেয়াল সবার রাখা উচিত।

আমার তাড়াতাড়ি লিখতে গিয়ে টাইপিং মিসটেক আর বাংলা অক্ষরে না লেখার জন্য হয়তো কথা শুনতে হতে পারে। কিন্তু ঠাট্টা ইয়ার্কি নিজের জায়গায়, হার্ট করে আনন্দ পাওয়াটা কাউকে খুন করে আনন্দ পাওয়ার মতন অনেকটা। এডুকেটেড মনে করা, আর সত্যিকারের হওয়ার মধ্যে পার্থক্যটা আজ হাড়ে হাড়ে লক্ষ্য করলাম।

উপভোগকালে মুখ বন্ধ রাখাই শ্রেয়। ডেপুটি তার চিপকে উদ্ধারে এগিয়ে আসে। চিবিক্তের অক্সিজেন - সিনেমা নিয়ে কথা বলতে শুরু করে।  কিন্তু ততক্ষণে ফুসফুস বিকল হয়ে পড়েছে।

(ডেপুটিকে বিশেষ একটি সিনেমা প্রসঙ্গে) আচ্ছা, এটা কি বলিউডের নয় তুই বল। বলিউডকে মাদারচোদ বলেছিস তুই। কিন্তু কই বয়কট তো করিসনি। তার কারণটা কি বলতো? অনেক কিছু ভালোও আছে বলিউডে। আর থাকবেও। মানুষের কীর্তির ঘৃণ্যতম জিনিস হলে নিশ্চয়ই এটাকে বাদ দিয়েই চলতে পারতিস। আর একটা কথা, তুই কি হিন্দি ডাব্‌ড কিছু দেখিস না? আজ পর্যন্ত কোনো ইংলিস ফিল্ম দেখিসনি এভাবে? আমার মনে হয় আমার থেকেও অনেক বেশি দেখেছিস। কারণ আমি ২০ ইয়ারস আগে থেকে সাবটাইটেল দিয়ে দেখতে বেশি অভ্যস্ত। কিন্তু তবুও মাঝে মধ্যে হিন্দি ডাব্‌ড খোঁজ করি কেন? তার ২টো কারণ, ১) কিছু খুচরো কিন্তু ইমপরটেন্ট কথা, ফিলিংস, ভাবনা ইংলিসে কখনো কখনো বিলীন হয়ে যায়। স্পেশালি আমেরিকান অ্যাকসেন্টে যেসব ফিল্মে কনভারসেশন থাকে। ২) ফ্যামিলির সবাই বোঝে। সবার সঙ্গে বসে দেখা যায়। হিন্দি ল্যাঙ্গুয়েজটাকে প্রোমোট করার জন্য নয়।

ডেপুটি: সরি বাট আমি এখন ডাবিংয়ের পক্ষে নেই, রিসেন্টলি অ্যাভেঞ্জার্সয়ের ডাবিং শুনলে আত্মহত্যা করতে মনে করবে।

চিবিক্ত: এখন নেই। বাট বলিউড যে আমাদের হিন্দি শিখিয়েছে, সেটা কি অস্বীকার করতে পারবি? ফিল্ম দেখাও শিখেছি বলিউডের হাত ধরে আমরা প্রায় সবাই। আগে বলিউডে নেপোটিজম ছিল না? নাকি তখন হিন্দিতে অ্যাক্টর অ্যাক্ট্রেসরা কথা বলতো না?

ডেপুটি: এই সবের ক্রেডিট তুমি ফালতু সিনেমাগুলোকেই দেবে।

দোলনায় দুলতে দুলতে মাঝে মাঝে পা নামিয়ে মাটিতে চাগাড় দিতে হয়, পাছে যাতে সেটি থেমে না যায়। 

লাল: আমি মনে করি ঘোড়ার ডিম! বাস, ঘোড়া ডিম পেড়ে দিল। নিজের স্বার্থে হাওয়া লাগানোর উপযুক্ত করে 'আমি মনে করি এটা ঠিক, ওটা ঠিক' বলে দিলেই তো আর হল না। শিক্ষাকে এভাবে নিজের স্বার্থে নাচানো শিক্ষার উদ্দেশ্যকেই বিফল করে। যেমন আমার মতে, শিক্ষা হল - যদি গোয়ার্তুমি করে তবে গুরুজনদেরকেও মুখের উপর 'থামুন তো মশাই' বলে ঘাড় ধরে ঠিকটা দেখিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু আমি এটা শিক্ষার ব্যানারে প্রচার করে বেড়াই না। শিক্ষা বিনয়ী হতেও শেখায়,  বোমা বানাতেও শেখায় কিন্তু কোনোটিতেও রত্নাকরের মতো দাবি বসায় না। কাপুরুষ ভীতুদের জন্য ওসব বাতেলামার্ক নীতিকথা।

'এডুকেশন অপমান সহ্য করার ক্ষমতা শেখায়' বলে পালন করতেও শেখা উচিত।

(তাই এটাও আমাকে বলা হয়েছে প্রসঙ্গে) সব কথা এভাবে গায়ে মাখলে কিছু করার নেই।

চিবিক্ত: গোঁয়ার্তুমি তুই করছিস, আমি নই। তোর কথাই ঠিক। আমারই উচিৎ এখন ঠাস করে চড় মেরে তোকে শেখানো। পালন যথেষ্ট পরিমানে করেছি বলেই বলছি অপমান সহ্য করার কথা। নিজে যা পালন করি না, তা বলিও না।

অবশ্যই গায়ে মাখবো। তুই পার্সোনালি বলবি, আর আমি পার্সোনালি নেব না? এরকম আবার হয় নাকি সোনা?

(ডেপুটিকে, ফালতু সিনেমাকে ক্রেডিট দেওয়ার প্রসঙ্গে) ৯৯% ফালতু হতে পারে। ১০০% নয়। আমি বলিউডের পতাকা ধরি না। বাট যেটা ঠিক মানতেই হবে। বলিউড ফিল্মের থেকে এট লিস্ট টেন টাইমস বেশি ফিল্ম আমি নিজেও দেখি হলিউডের। কিন্তু বলিউডের সবটাই তো আর খারাপ হতে পারে না।

চিবিক্তের হঠাৎ উপলব্ধি হয় যে তাকে এখন দুমুখো লড়াই লড়তে হচ্ছে। মিত্রপক্ষের ডেপুটিই যদি বেঁকে বসে তাহলে রণে ভঙ্গ দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। 

লাল: (মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের একটি উদ্ধৃতি শেয়ার করে) সবকিছুর শেষে আমরা আমাদের শত্রুদের কথাগুলো মনে রাখবো না, কিন্তু মনে রাখবো বন্ধুদের নীরবতা।

(চায়না জিনিস বর্জনের প্রসঙ্গে) মোদি সরাসরি কিছু করেনি, করেনা, করবেও না। মুরোদ নেই। ২০০২-এ গুজরাটে হাজার হাজার মুসলমান খুন তো মোদি নিজে করেনি। আর আজ সাধারণ মানুষের ধ্যানধারণা তৈরি মোদি ঘরে ঘরে গিয়ে কানে কানে মন্ত্র বলে করে আসছে না। তার জন্য নানা গণমাধ্যমে টাকা ঢালছে। সেগুলো গিলে আমজনতা নিজের মতামত তৈরি করছে। সেগুলো যে মোদির বিষ্ঠা ছাড়া আর কিছু না, সে যে কেউ সুস্থ মস্তিষ্কের লোকই বলে দেবে।

(গ্রুপটার উদ্দেশ্য বোঝানোর প্রসঙ্গে) আসলে হোয়াটসঅ্যাপের মতো মেয়েলি মাধ্যমে অনেকদিন ছিলাম না তো তাই আর কি। আর যে কদিন ছিলাম মেয়েলিপনা সেকদিনও কম করেছি।

'এডুকেটেড মনে করা, আর সত্যিকারের হওয়ার মধ্যে পার্থক্যটা আজ হাড়ে হাড়ে লক্ষ্য করলাম' বা এই ধরণের মন্তব্য যাদের উদ্দেশ্যে করা হয়, ইতিহাস সাক্ষী আছে, তারা কোনোদিনই স্বয়ং সে দাবি করেনা।

আমিও বানাবো - বিজেপির চামচা মনে করা, আর সত্যিকারের হওয়ার মধ্যে পার্থ্যকটা...না না কোনো পার্থক্য নেই।

এবার ডিম ফোটার পালা। লালের এভাবে চিবিক্তের প্রতি নির্মম নিষ্ঠুর হওয়ার কারণ  বেরিয়ে আসে।

(গুগল করে ক্রিকেট রেকর্ড দেখার প্রসঙ্গ তুলে) না, আর চেপে লাভ নেই।

এই কথাটা ছিল লর্ড অফ দ্য রিংসের শয়তান বালরগ এবং এই গ্রুপে প্রথম ব্যক্তিগত আক্রমণ। এই বালরগ গ্যানডালফকে টানতে টানতে দেখো কতটা নিচে নিয়ে এসেছে। মজার কথা কথাটা আমি 'পার্সোনালি' যতটা না নিয়েছি, খেয়াল রাখো, পুরাঘটিত বর্তমান ব্যবহার করছি, অর্থাৎ এখনও আছে, তার চেয়েও বেশি নিয়েছি সামগ্রিক তাচ্ছিল্য হিসেবে। হাজার বার পড়ো, হাজার জনকে পড়াও; দিয়ে বালরগের তেজটা মেপে দেখো।

(কিছুক্ষণ পরে) সেদিন বলে দিলেই ভালো হতো, তাহলে এত বড়ো খাদে তলাতে হতো না। না না, এই কথাটা না, এখন যেটা বলবো সেটি। যে, গুগল করে রেকর্ডের কথা বলছো! তুমি আজ পর্যন্ত যতটা ক্রিকেট জেনেছো সবই, এই গুগল করেই, আধঘন্টাও লাগবে না আমার জানতে। এই না যে আমার বিশাল গতি, বরঞ্চ এই যে, অতিরিক্ত বেশি কিছু জানার নেই। অবশেষে অহংকার দেখিয়েই দিলাম।

কাল রাস্তার লোক বলতো, তর্কে না পারলে - 'ও তোমার পড়াশোনা নেই, যাও গিয়ে অমুক বিষয়টা পড়ো...' তো কিছু গা করিনি। এখন ঘরের লোকও যদি সুযোগ না ছাড়ে।

ডেপুটি: আমি বাদে সবাই এমন পার্সোনালি নিচ্ছ কেন? এই ভাবে ঝামেলা বাড়বে।

চিবিক্ত: ওকে। তাহলে আমাকে নিয়ে, আর আমার লেখা বা কথা নিয়ে তোর গ্রিভেন্স অনেক আগের। আমার তো মনে হয় অনেক দিনের। দেন যা করেছিস, সেসব ন্যাচারল। আর হ্যাঁ, পড়াতে বলেছিস তো অন্য কাউকে, পড়িয়েছি। বার বার পড়িয়েছি। তারপর আমার মনে হয়েছে যে আমাকে প্রত্যেক পদক্ষেপে অপমান করা হয়েছে এই গ্রুপে। আমার স্পাইন থাকলে নাকি আমি অনেক আগেই সমুচিত জবাব দিতাম এরকম কথাও শুনতে হয়েছে। এনিওয়ে, হয়তো এই দিনটার জন্যেই ওয়েট করছিলাম। সব ক্লিয়ার হলো। ওটা গুগলের লিমিটেশন বলেছিলাম, তোর গুগল করার লিমিটেশন নয়। আমি কতটা অপরাগ, কতটা নিজের লোকেদের প্রতি দুর্বল, সেটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলি।

আমি গ্রুপে ম্যাসেজ হিস্ট্রি রাখি না। সব ডিল করে দি। নাহলে দেখাতে পারতাম আসল ব্যক্তিগত আক্রমণগুলো এর অনেক আগেকার।

চাইনিজ জিনিস বর্জন নিয়েই বিভিন্ন কথা প্রসঙ্গে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট আর ফুটবলের কথা উঠে আসে। আমার বক্তব্য, যে যদি ১৯৮৩ ডব্লুসিয়ের কথা বাদও দি, তাহলে নিশ্চয়ই ক্রিকেট জন্মের সময় থেকেই ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টিম তার মর্যাদা পায়নি। সময় লেগেছিল, গভর্নমেন্ট, স্পোর্টস অথরিটি, জনগন, স্পনসররা ভরসা দেখিয়েছিল বলেই না একটা টিম দাঁড়িয়েছিল কোনও না কোনও সময়।

সেটাও তো ইন ফিউচার হতেও পারে ইন্ডিয়ান ফুটবলে। তা না করে ধুস, ওদের দ্বারা হবে না। এই বলে যদি দূরে সরিয়ে দি, তাহলে উন্নতির থেকে অবনতি হবে বেশি। আমার সব কথার বক্তব্য ছিল এটাই।

নাম আর পদবীর মাঝে, শুরুতে, শেষে যেমন অনেকের আরও অনেক নাম থাকে (শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটারদের মতো), তেমন চিবিক্ত মুতুরও এখানে সেখানে অনেক নাম সাঁটানো যায়। একগুঁয়ে, অহংকারী, ধরি মাছ না ছুঁই পানি, বাঁচালের জলজ্যান্ত এরকম নিদর্শন দুটো খুঁজে পাওয়া ভার। মহাশয় যা দেখবেন তাই ঠিক। যা ভাববেন তাই ঠিক। যা বলবেন তাই ঠিক। শুধু শোনার ক্ষেত্রেই সব ভুল!

চাইনিজ জিনিস আজ যারা বর্জন করার কথা বলছে তারা কিন্তু সবাই মোদী অনুগামী নয়। মোদী বিরোধীও আছে। যেমন আমি। মোদী বলেছে বলে করবো এটা কখনো মনেই আসেনি, বা আসবেও না। নিজের তো একটা মস্তিষ্ক আছে নাকি। কিন্তু তা সত্ত্বেও বার বার আমাকে শুনতে হচ্ছে আমি নাকি মোদীর চামচা। এই জাস্ট একটু আগেই বললি।

কি করবি তোর এত বিদ্বেষ তিনজনের গ্রুপে ছড়িয়ে? শান্তি পেয়ে থাকলে ভালো, তুই বলেছিলি মতবাদের মিল না হলে তুই ধুয়ে দিস তাকে। তা সেটা আমার ওপর সাকসেসফুলি অ্যাপ্লাই করে নিশ্চয়ই এবারে খুশি?

ডেপুটি এখন বিভীষণ।

ডেপুটি: লাল তোমার পলিটিকাল ভিউয়ের সাথে একমত, চিবিক্তের সাথে না; সেটা তুমি বুঝতেই পারছ। কিন্তু তুমি যে বলছো তোমার উপর এখানে আগে পার্সোনাল অ্যাটাক শুরু হয়েছে, আর সেটা অনেকবার করা হয়েছে, সেটাই বুঝতে পারছি না কোথায় হয়েছে? একটু আগে তুমি একটা পোস্ট মেনশন করে দেখালে সেটা আমি বুঝতে পারলাম না এখানে পার্সোনাল আক্রমণটা কোথায়?

চিবিক্ত: ডেপুটি বললো আমার পলিটিক্যাল ভিউয়ের সাথে ও একমত না। হতেও পারে, এতে প্রবলেমের কি আছে। কিন্তু আমার ভিউয়ের সাথে একমত না হতে গেলে আগে তো আমার মতামত জানতে হবে। আমি গ্রুপে টিল নাও এমন কোনো ম্যাসেজ করিনি যা থেকে আমার পলিটিক্যাল ভিউ ক্লিয়ার হয়। চাইনিজ জিনিস বর্জনের সঙ্গে আমার মনে এবং আমার মতে পলিটিক্সের কোনও সম্পর্ক নেই। ইকোনমিক্সের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে। আমার ধারণা যে শুধু চাইনিজ কেন, সব বিদেশি জিনিস আস্তে আস্তে বর্জন করতে হবে। লাগুক ২০ ইয়ার্স। যে গভর্নমেন্টই থাক। বাট করতে হবে। আমি টিএমসি, বিজেপি, সিপিএম, এদের নিয়ে কোনও খিল্লিমূলক পোস্ট করিনি। আবার যেসব খিল্লিমূলক পোস্ট হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও কিছু বলিনি। শুধু নেপোটিজম আমার পছন্দ নয় সেটা বলিউডেই হোক, আর ইন্ডিয়ান পলিটিক্সে সেটাই বলেছি। সেখানেও ন্যাশানাল কংগ্রেসকে নিয়ে একটাও বিদ্বেষমূলক কথা উচ্চারণ করিনি।

তাহলে কি দেখে, বা আমার কোন মন্তব্য শুনে আমার পলিটিক্যাল ভিউস বুঝতে পারলি বল।

ডেপুটি: (চীনা বর্জনকারীরা মোদির অনুগামী নয় প্রসঙ্গে) এটা বিজেপি ছাড়াও অন্যরা বলছে। বিজেপি শুধু বলছে, করছে কিছু না। অন্যরা তাও চেষ্টা করছে।

লাল যা বলবে একটু সহজ-সরল করে বলবে। বুঝতে অসুবিধা হয়। এবার আমিও তো জানিনা, তাই কনটেক্সটগুলো ধরতে পারি না। লর্ড অফ দ্য রিংসের মতো একজাম্পল টেনে বললে কি করে বুঝবো?

চিবিক্ত: (বিজেপি বলছে, করছে না প্রসঙ্গে) ঠিক। কিন্তু লক্ষ্য করে দেখ, যারা একদমই চায়না ব্যানের বিরুদ্ধে, তারা কিন্তু কোনও না কোনও দিক থেকে মোদী হেটারস অবশ্যই। তারা কোনও যুক্তি শুনতে চাইছে না। মানা না মানা তো সম্পূর্ণ নিজের ব্যাপার। সেটাই লালকে আমি বোঝাতে গেছিলাম যে মোদী বিরোধিতার সঙ্গে চায়না ব্যানকে গুলিয়ে ফেলিস না। মোদীকে হেট করছিস কর। যথেষ্ট কারণও আছে। কিন্তু চায়না ব্যানটাকে সম্পূর্ণ অন্য পার্সপেক্টিভে দেখ। আগে তো বুঝতেই পারছিলাম না যে কেন ও চায়না দের সম্পর্কে খারাপ শুনতে চাইছে না। পরে বুঝলাম কারণটা সেই পলিটিক্যাল, যে বিষয়টার পাস দিয়েও যেতে ভালো লাগে না আর। (খেয়াল আছে তো?)

যাকগে। বাদ দে। গুসসা থুক দো। অবশ্যই মাস্ক খুলে।

কে শোনে কার কথা! লালের 'থুকা' এখনও বাকি আছে।

লাল: বিজেপির চামচা হতে গেলে প্রোফাইল পিকচারে পদ্মফুল বা রিংটোনে বন্দেমাতরম দিতে হয় না। বিজেপি হচ্ছে একাধিক স্টেজের অসুখ,যেমন ক্যান্সার। তো একজন ক্যান্সার রুগীর ছবি কল্পনা করলে মুণ্ডিত মস্তক রুগ্ন ফিকে চামড়ার লোকের ছবিই ভেসে আসে, কিন্তু তা তো নয়। ক্যান্সারের যেমন স্টেজ আছে - কিছু স্টেজে যেমন টেরও পাওয়া যায় না লোকটি অসুস্থ - বিজেপির ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি সেরকম। আবার ছোটো করার জন্য হাত নিশপিশ করার আগেই বলে রাখি, আক্ষরিক অর্থে পড়াশুনা করা যাকে বলে, বিজেপির ওপর গত কয়েক বছরে যেটুকু পড়াশোনা করে জেনেছি, তাতে একটুও বাড়িয়ে বলছি না, আর যেভাবে ক্যান্সার রুগীদের প্রসঙ্গে বলে - চিবিক্তের ফার্স্ট স্টেজ চলছে।একজন বিজেপির ভক্ত হওয়ার যে যে উপসর্গগুলো আছে, সবকটি তোমার মধ্যে উপস্থিত। টিপিক্যাল কেস স্টাডি বলতে পারো। স্বীকার করছি সেগুলো ভালো করে পরীক্ষা করার লোভে আরও ঘিয়ে আগুন দিয়েছি। আমার কথা উড়িয়ে দিতে পারো, কিন্তু তত্ত্ব এবং তথ্যমূলক প্রমাণ দিয়ে বলতে পারি - তুমি ভক্ত হওয়ার পথে।

কিছু উপসর্গ উল্লেখ করি।

(মমতার ভক্তদের সাথে তর্ক করবেন না প্রসঙ্গে) উপসর্গ এক, অন্যের ঘাড়ে জোর জবরদস্তি বিরোধী কোনো পার্টির তকমা এঁটে দেওয়া।

(মোদী বিরোধিতা আবিষ্কার প্রসঙ্গে) উপসর্গ দুই, সমস্ত প্রকার সমালোচনাকে মোদী বিরোধিতা বাতলে দেওয়া।

মজার কথা, তুমি 'প্রিভিয়াস চ্যাট' মুছে দিতে পারো বাকিরা না। ডেপুটি, একবার খুঁজে দেখ 'মোদী বিরোধিতা'র, আসলে বিদ্বেষ, সার্টিফিকেট কে বিলি করতে শুরু করে।

(নেপোটিজম প্রসঙ্গে) উপসর্গ তিন, দেশের যে কোনো সমস্যায়, তা সে ব্যক্তিগত কোষ্টকাঠিন্য হলেও, নেহরু-গান্ধী পরিবারকে কাঠগড়ায় তোলা।

এছাড়া ভ্রান্ত জাতীয়তাবাদ, জেনোফোবিয়া, গুগল করো, এগুলোতো আছেই।

গোঁয়ার গোঁয়ার্তুমি না করলে সে আর কিসের গোঁয়ার। কিন্তু চিবিক্ত শুরু গোঁয়ারই নয়, নির্বোধ আহাম্মকও।

চিবিক্ত: (উপসর্গ তিন প্রসঙ্গে) বলিউডের নেপোটিজম দেশের সমস্যা কি না তর্ক থাকতে পারে। কিন্তু দেশের রাজনীতিতে নেপোটিজম অবশ্যই দেশের সমস্যা। এটা ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। কোষ্টকাঠিন্যের মতন সমস্যা নিয়ে তুই হয়তো ঘৃণা উগলে দিতে পারিস। আমি কখনই তা করি না।

(উপসর্গ দুই প্রসঙ্গে) হ্যাঁ, আমি প্রিভিয়াস মেসেজ ডেল করে দি। কিন্তু মনে যে থাকে না এমন নয়। ভালো করে ওই কনভারসেশনটা রিড করলেই যে কেও বুঝে যাবে যে মোদীর কথা কে আগে তুলেছিল। তখন ব্যাপারটা আমার কাছে ক্লিয়ার হয়। পলিটিক্স নিয়ে অর মোদী নিয়ে কথা আমি আগে তুলিনি। কাজেই ধুয়ে দেওয়ার কাজটাও তুই আগে শুরু করেছিস।

(উপসর্গ এক প্রসঙ্গে) বিরোধী পার্টির তকমা তখন জুড়েছি, যখন তুই আমাকে মোদীর চামচা বলেছিস। পাটকেল নিতে না পারলে ঢিল ছুড়িস কেন?

ডেপুটি: উপসর্গ আছে মানেই ওই দিকে যাবে নাও হতে পারে। বাট চিবিক্ত, লাল যে যে পয়েন্টগুলো দিলো সেগুলো কিন্তু ঠিক। এই ভাবেই কখন যে তুমি ভক্তদের দলে চলে যাবে ধরতেও পারবে না, তোমার মনে হবে যে তুমি মোদীর হার্ডকোর সাপোর্টার না, তাও তুমি ওনাকেই ভোট দিয়ে দেবে। তারপর কিন্তু রিগ্রেট করতে হবে।

চিবিক্ত: (বিজেপির চামচা হতে গেলে প্রসঙ্গে লালকে) যদি আমি ভক্ত হওয়ার পথেও থাকি, সেক্ষেত্রেও তোর এইসব ছেঁদো যুক্তি, পিএমের প্রতি বিপুল বিষোদ্গার আমাকে আটকাতে বা ফিরিয়ে আনতে পারবে না। অত সখ তো আন্দোলন কর না। পথে নাম, রাজনীতি কর। এই তিন জনের গ্রুপে বসে ভাষণটা এবারে থামা। বাহাদুরি ভেবে যেটাকে ভুল করছিস, সেটাকে বালখিল্য বলে আর কাহাতক ভুলে থাকবো?

(ডেপুটির উপসর্গে মন্তব্য প্রসঙ্গে) সো হোয়াট? লাল আটকাবে আমাকে? যে যুক্তি দিতে গেলেই কুকথা ছাড়া বলতে পারে না। এক্সাম্পল দিতে গেলে যাকে পোঁদ, কোষ্টকাঠিন্য, নুনু এসবের আশ্রয় নিতে হয়? হা হা (হাসি)।

যদি মনে হয় যে কেউ ভুল দলকে সমর্থন করছে তাহলে হয় তাকে ধুয়ে দাও, এই অ্যাটিটিউড ঠিক নয়। কারো সঙ্গেই এইরকম করা উচিৎ নয়। যদি একজন কেও যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে ফিরিয়ে আনতে পারিস, তাহলে ক্রেডিট। আর না পারলেও চেষ্টা করেছিলিস ভাবতে পারিস।

রইলো বাকি আমার সমর্থনের কথা? সেতো শুধু আমি নিজেই জানি। উপসর্গ তো আমিও ১০টা বলতে পারি লালের ফ্রাস্ট্রেটেড হওয়ার।

গুরুজনের কথা লাল তুলেছে, আমি না। কারণ আমি গুরুজনের দোহাই দিয়ে কাউকে চুপ করিয়ে দিতে চাই নি। যদি চাইতাম, তাহলে এই গ্রুপটাই খুলতাম না। মনে হয় এই গ্রুপটা খোলাটাই সবার পছন্দ হয়নি। হোয়াটসঅ্যাপ তো অনলি মেয়েলি মাধ্যম। অসাধারণ উক্তি।

ডেপুটি: এটা ঠিক বিলো দ্য বেল্ট, লাল গেছে।

চিবিক্ত: কিন্তু এটাও ঠিক যে আমি অল্প হলেও বয়সে বড়। তাই যেটুকু সম্মান এখনও আছে, সেটুকু নিয়ে কেটে পড়তে চাই গ্রুপ থেকে। কারণ মনে হয় তাতেই লাল শান্তি পাবে। মুখে বলতেও পারে আর না বললেও এটা ভাববে সিওর, যে দেখলে কেমন লেজ গুটিয়ে পালালো যুক্তি তর্কতে না পেরে। সফল হোক তোর আস্ফালন।

এই বলে মুহূর্তের মধ্যে গ্রুপ থেকে বেরিয়ে যায় চিবিক্ত।

ডেপুটি: হয়ে গেলো। এটাই হবে বুঝতে পারছিলাম। এত স্ট্রং ওয়ার্ডস ইউস ্না করলে হতো না? লাল, এটা ফ্যামিলি গ্রুপ ছিল, সেটাকে অর্ণব গোস্বামীর ফালতু শো বানিয়ে দিলে।

লাল: আমি স্বীকার করছি, আমার কথায়, খাস করে রাজনীতি প্রসঙ্গে, একটা উগ্রতা আছে। এমনকি সময় বিশেষে সেটি তীব্রতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু এটাও তোকে মানতে হবে, বিজেপির প্রতি একান্ত দুর্বলতা না থাকলে কেও ওভাবে সমস্ত কথা গায়ে মেখে ঝগড়া করতে আসে না।

ডেপুটি: ঠিক আছে। এটা এইভাবে তখন বললেই হতো।

লাল: আর এই নয় যে চিবিক্তের সাথে আমারা সসম্ভ্রমে গুরুজনদের মতো ব্যবহার করি। বিজেপির সমালোচনা নিতে পারেনি, দিয়ে ন্যাকাকান্না কেঁদে লাভ আছে।

ডেপুটি: এতো বোঝো আর এইটা বোঝো না যে এটা ফ্যামিলি গ্রুপ, আর চিবিক্ত আমাদের থেকে বড়ো। এই ভাবে কথা এখানে মানায় না।

লাল: কোন কথাটা বল? নুনু? ওটা তো একটা উপলক্ষ। বরঞ্চ আমাকে ঘুরে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত শিশুটাকে হাতে ধরিয়ে দিলাম। তোর 'মাদারচোদ', 'চুতিয়া' হজম করে নিল, আর আমার 'নুনু' খিস্তি গালাগালি হয়ে গেল।  

ডেপুটি: চিবিক্ত আমাদের পলিটিক্যাল এনিমি না, তাই তুমি যে ভাবে বলেছো সেটা ঠিক না।

লাল: অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে...এই ধারণায় আমি বিশ্বাসী, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।

ডেপুটি: ফ্যামিলির সাথে তাই বলে...?

লাল: কিন্তু বিজেপির চামচা যদি ফ্যামিলির চামড়া চাপিয়ে আসে তো কি করবো? ফ্যামিলিকেও সেটা বোঝা উচিত।

ডেপুটি: তুমি যা করলে, এবার সে আমদের কথা আর শুনবে? আরো ওই দিকেই যাবে। তুমি ওই দিকেই ঠেলে দিলে।

লাল: আরে ডেপুটি, তুই কি কানা? জম্বি হয়ে বসে আছে, ঘাড়ে কামড়টা এখনো বসায়নি এই যা। তুই দেখা একটা, মাত্র একটা, আমার এই হাজারো মন্তব্যে একটা, যেটা পড়ে চিবিক্ত বলেছে, হ্যাঁ ঠিক বলেছিস। তা তো বলেইনি, উল্টে লম্বা লম্বা অনুচ্ছেদ রচনা লিখে গেছে। আমি পরিষ্কার মোদী বিদ্বেষী স্বীকার করছি। তাই বলে, আমার একটা কথাও ঠিক মনে না হওয়ার কি কারণ থাকতে পারে? হয় অহংকার, নয় ভগ্নাংশের লব-হরে কাটাকুটি করে সরল করে নে, মোদী বিদ্বেষীর বিপরীতে মোদী ভক্ত। 

ডেপুটি: মোদী কে ভালো লাগতেই পারে।

লাল: তো খুলে স্বীকার না করে ন্যাকামো করে লাভ কি?

ডেপুটি: একবার আমরো লেগেছিলো।

লাল: আরে আমি ২০১৪তে ভোট দিয়েছি। আর শুনবি, ২০১৪ তে আমাকে যুক্তি-তর্ক-গল্প দিয়ে কে রাজি করেছিল মোদীকে ভোট দিতে?

ডেপুটি: ওরে বোকাচোদা! চিবিক্ত?


সংলাপ এখানেই ফুরোলো, নটে গাছটি মুড়োলো। শুভ নিদ্রা আদানপ্রদানে ডেপুটি আর লালও গ্রুপ থেকে বিদায় নেয়। বিদায়ের আগে গ্রুপের নাম 'ককটেল' পাল্টে 'বেঁচে থাক' করে দেয় লাল। ডেপুটিকে আগেই জানিয়ে রাখে, গ্রুপটিকে সে স্মারক করে রাখতে চায়। কিন্তু কি বেঁচে থাক? হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নাম দেওয়ার সাথে সাথে, গ্রুপের জুতসই ছবি দেওয়ারও ব্যবস্থা থাকে। এতদিন সাধারণ একটি  হেডফোন মাথায় ইমোজির ছবি ছিল। লাল তার পরিবর্তে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের পতাকা সেঁটে দেয়, তাতে লেখা 'চীনের চেয়ারম্যান আমাদের চেয়ারম্যান'।



পুনশ্চ: অপরাধী অবশ্যই লাল। অহিংস একজনকে, তা সে যতই মুসলিম ভীতু চীন বিরোধী ভক্ত হোক না কেন, এভাবে নাকানিচোবানি খাইয়ে হেনস্থা করার জন্য নয়; একটা পাগলা শুয়োরকে পোঁদে গরম আংটার ছ্যাঁকা দিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দেওয়ার জন্য। পাঠক সাবধান! আপনার ফোনে চাইনিজ অ্যাপস নেই তো?

(সমাপ্ত)

Tuesday, 28 July 2020

চিবিক্ত

পাঁচ

ফেক নিউজ বা ভুয়ো খবরের (যার ভারতে এখন রমরমা বাজার, তার জন্য অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ) ভিত্তি কিন্তু রিয়েল নিউজ অর্থাৎ বাস্তব খবরই। হাওয়ায় ভুয়ো খবর তৈরি করাটা কঠিন কাজ নয়, কিন্তু সেটিকে নতুন সত্য বলে সাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াটা যথেষ্ট কষ্টের। তার চেয়ে প্রচলিত সত্যের অর্ধেকটি চাপা দিয়ে, তার জায়গায় মিথ্যে চাপিয়ে দিলে সেটি সহজেই সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। তার ওপর মিথ্যেটি ব্যক্তিগত রুচি ও প্রত্যাশা মোতাবেক হয় তো সেটি আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। তাই ইন্দিরা গান্ধীর স্বামী স্বাধীনতা সংগ্রামী ফিরোজ জাহাঙ্গীর গান্ধী (গান্ধীভক্ত হওয়ার দরুন পদবীটি মহাত্মা গান্ধীর পদবীর সাথে খাপ খাইয়ে নেন) নামের ব্যক্তিই ছিলেন। এখন পদবীটি পাল্টে খান করে দিলে, এবং সেই খান কিভাবে গান্ধী হয়ে গেল তার পিছনে একটা মনগড়া গল্প জুড়ে প্রচার চালালে সাধারণে সেটাই বেশি বিশ্বাস করবে। তাজমহল যে আসলে শিবের মন্দির তেজো মহালয়া, তার ভুয়ো খবরও অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে গেছে। আর এই ভুয়ো খবর ছড়ানোর সবচেয়ে বড়ো মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ।

ফিরোজ খান থেকে তেজো মহালয়া সমস্তরকম ভুয়ো খবর শেয়ারে সিদ্ধহস্ত চিবিক্ত। পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, 'ভারতবর্ষে মুসলিম ৬০ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে ৮০' - এই ধরণের পরিসংখ্যান হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে দেওয়া একমাত্র মুতু সম্প্রদায়েরই কাজ। ককটেলেও চিবিক্ত মুতু ভুয়ো খবর শেয়ার অব্যাহত রাখে। একদল বিশিষ্ট বাঙালির ছবি দেখিয়ে, যাদের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জগদীশচন্দ্র বসু প্রমুখেরা উপস্থিত, তাদের মধ্যে বিশেষ একজনকে কেসব চন্দ্র নাগ বলে দাবি করে। ব্যক্তিটি আসলে নাগেন্দ্রনাথ নাগ। এনসি নাগকে কেসি নাগ বানিয়ে অঙ্কপ্রেমী বাঙালিদের রগড় করতে ক্ষতি নেই ঠিকই, কিন্তু এভাবেই সত্যকে মিথ্যে করে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় প্রোপ্যাগান্ডা চালাচ্ছে চিবিক্তের দলবল।

১৬ই জুন

আজও যথারীতি শান্ত ককটেল। শেষে বিবাদ বাঁধায় ডেপুটি। আসল অপরাধীটি যদিও লাল। সম্পূর্ণ এক অন্য মাধ্যম টুইটারে অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যায় হতাশ ডেপুটি লেখে, "বলিউড মাদারচোদ থি, মাদারচোদ হে অউর মাদারচোদ রহেগি। অডিয়েন্স ভি চুতিয়া থি, চুতিয়া হে অউর চুতিয়া রহেগি।" লাল সেটি গ্রুপে শেয়ার করে দেয় এবং বক্তব্যটির প্রতি নিজের কূটনৈতিক সমর্থন জানায়। বলিউডপ্রেমী চিবিক্তের এবার ফেটে পড়ার পালা।

লাল: তীব্র শব্দাবলী, তবে একচুলও মাত্রাতিরিক্ত নয়। আমি সহমত, মানুষের সৃষ্টির জঘন্যতম নিদর্শন এই বলিউড।

ডেপুটি: থ্যাঙ্কস।

চিবিক্ত: কত ভালো প্রভাব, তাই না? একেই বলে গুরুমারা বিদ্যা। এই সুন্দর শব্দযুগল তো এই ঘৃণ্য তম বলিউড থেকেই আত্তীকরণ করা।

লাল: সমস্যাটা সেখানেই, নিজের ব্যক্তিগত জীবনধারাকে অন্যদেরও জীবনধারা ভেবে বসলে ভুল ধারণা তো তৈরি হবেই। এই যেমন, আমি যদি বলি, 'যারা পাতা ওল্টাতে জানে না তারা বইয়ের মর্ম বোঝে না' - এটা কত বোকা-বোকা কথা হবে, কারণ কাগজের পাতা না উল্টেও বই পড়া যায়, এটা আর বুঝিয়ে বলতে হবে না।

তুমি হয়তো বলিউড থেকে ওই বিশেষ শব্দদুটো 'আত্তীকরণ' করেছো, কিন্তু বাকিরা তা নাও করতে পারে।

আমি যেমন এই গানটা থেকে 'আত্তীকরণ' করেছি।

এই বলে লাল অ্যান্টিফা ইন্ডিয়া মিউজিকের একটি গান, মোদী মাদারচোদ হে, শেয়ার করে।

১৭ই জুন

চিবিক্ত: এখানেই বোঝা যায় তুই কত বড় হিপোক্রিট। কারণ তুই এবং যার পোস্ট, সে নিজেও এই শব্দগুলো বলিউড থেকেই শিখেছে। যেমন বাংলা বলা শিখেছিস তোর মা, বাবা, পরিবারদের থেকে। আর যেটুকু হিন্দি জানিস, সেটাও বলিউডেরই অবদান।

(অন্যদের নিজের সাথে গুলিয়ে ফেলা প্রসঙ্গে) একদম নয়। তোর ১০০% লাইফ স্টাইল আমার জানা নেই, এটা আশা করি ভুল করেও ভাববি না। কোন অচিন গ্রহের অচিন মানুষ তো তুই নস আর আমি কিছু জাস্ট মনে করে উক্তি করছিনা, সিওর হয়ে করছি।

লাল: এখন জোর করলে আমি কি করতে পারি। আমি হিন্দি প্রাইমারি স্কুলে আর হিন্দি খবর শুনে শিখেছি। এখন ডুয়োলিংগো তে শিখছি, কিছুদিন পর বই পড়তে শুরু করবো ভাবছি। তাও যদি জোর জবরদস্তি বলো না বলিউড শিখিয়েছে, তাহলে আর কি বলবো? তাই তাহলে।

আর আমরা বলিউডকে বলছি, বলিউডপ্রেমীদের বলছি থোড়াই।

শেষবারের মতো কথোপকথনের দিক সিনেমা ইত্যাদির দিকে ঘোরানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে চিবিক্ত। কিন্তু লাল এখন  লাগামছাড়া।

১৮ই জুন

চিবিক্ত চুপ হয়ে গেলেও, লাল তার আক্রমণ চালু রাখে। আসানসোলে বিজেপি সমর্থকরা চীনের রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তাঁর কুশপুতুল পোড়ায়। কিন্তু উপস্থিত এক ভক্ত রাষ্ট্রপতি শি জিন্পিংয়ের বদলে উত্তর কোরিয়ার প্রধান কিম জং উনের নাম নিয়ে ভাষণ দিতে থাকে। সেই খবর দেখিয়ে চিবিক্তকে রাগানোর চেষ্টা করে লাল।

লাল: গত পাঁচ বছরে বিজেপি 'গর্বিত ভারতীয়' থাকার সাধ আগাগোড়াই ঘুচিয়ে দিয়েছে, এখন 'গর্বিত বাঙালির' পাতেও দেখছি থাবা বসবে।

ক্ত কে ছেড়ে লাল এবার চিবিকে পাকড়াও করে।

সকালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিজেপির রামদাস আঠওলে দেশের সমস্ত হোটেল রেস্টুরেন্টকে চাইনিজ খাবার বয়কট করতে বলেছেন। কাল যদি এই উন্মাদনার বসে উত্তর-পূর্ব ভারতের কোনো অধিবাসীর দোকান বা সম্পত্তির ক্ষতি হয় তাহলে তার দায় 'বয়কট চায়না'র সকলপ্রকার সমর্থকদের সমানভাবে ভাগ করে নিতে হবে।

ফের বলিউডকে নিয়ে বাঁকা মন্তব্য করে লাল। আজ যেন শেষ দেখেই ছাড়বে। মনে হচ্ছে যেন শরীর থেকে ভূত নয়, ভূত থেকে শরীরকে ভাগানোর চেষ্টায় মরিয়া লাল। একটার পর একটা যাচ্ছেতাই মোদী এবং বিজেপি বিরোধী খবর, মিমস, ভিডিও ইত্যাদি শেয়ার করতে থাকে সে। ঠিক ততটাই নৈপুণ্যের সাথে সকলপ্রকার উস্কানিকে অবজ্ঞাভরে এড়িয়ে যায় চিবিক্ত। পাল্টা নিজের, নিজের মেয়ের ছবি দেখিয়ে আবেগকে কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রয়াস করে। তাতেও জল ঢেলে দেয় লাল। চিবিক্ত আর এরকমভাবে কতক্ষণ চুপ করে থাকতে পারে? কিন্তু লালেরইবা এরকম একগুঁয়ে নাছোড়বান্দা  মানসিকতার কারণ কি হতে পারে? দুদিন পরেই তা পরিষ্কার হবে।

(চলবে)

Monday, 27 July 2020

চিবিক্ত

চার

একবার কাউকে ঝাঁটা পেটাতে শুরু করলে থামতে ইচ্ছে করে না। যুবতী মেয়ের ভূত হোক কিংবা পতিদেবতার আলুর দোষ, ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতে কার না ভালো লাগে। চিবিক্তের মধ্যে যে ভক্তের ভূত ভর করেছে, তা জানতে পেরে লালের ভিতরের ওঝাটাও জেগে ওঠে। আর সে থামছে না। কাউকে থামতেও দেবে না।

৬ই জুন চুপচাপ কেটে যায়। তবে ডেপুটির খুচরো মিমস শেয়ার চলতে থাকে। পরেরদিনও বাকিদের চুপচাপ দেখে আর থাকতে না পেরে, ঝাঁটা থেকে একটা কাঠি খসিয়ে চিবিক্তকে খোঁচাতে শুরু করে দেয় লাল।

৭ই জুন

লাল: কি রে ডেপুটি, চীন হোয়াটসঅ্যাপেও টাকা ঢাললো নাকি?

ডেপুটি: জানি না। সব কিছুতেই চায়না চলে এসেছে।

লাল: চল তাহলে প্র্যাকটিস শুরু করে দিই - কিলাই বুয়ান জুও নুলি দি রেনমেন, বা উমেন দি জিওরু জুচেং...

ওপরের দুর্বোধ্য শব্দগুলি চীনের জাতীয় সঙ্গীতের অংশ।

ডেপুটি: (হেসে) চিবিক্ত ক্ষেপে যাবে!

এই তো, যথেষ্ট! কাঠিটি ফের ঝাঁটায় গুঁজে নেয় লাল।

চিবিক্ত: মমতার ভক্তদের সাথে তর্ক করবেন না, মোদি হেটার দের প্রতি সহানুভূতি দেখান। মনে রাখবেন আমাদের রোগের সাথে লড়তে হবে, রুগীর সাথে নয়। জনস্বার্থে প্রচারিত (হাসির চেষ্টা)।

লাল: আমি তো গু খায় (মোদিকে সমর্থন করি), তাহলে তুইও নিশ্চয় গু খাস (বিরোধী নেতাকে সমর্থন করিস), এই মানসিকতা নিয়ে চীনকে জব্দ করতে চলেছে ওপো-ভিভো টিকটকবাসী, মানে ভারতবাসী।

যদিও আমি মমতা ব্যানার্জির সমর্থনেই থাকবো, যতদিন তিনি বিজেপি আর সঙ্ঘের বেনো জল বাংলায় ঢোকা থেকে ঠেকিয়ে রাখবেন। কিন্তু ঘরের শত্রু বিভীষণগুলোর কি ব্যবস্থা করা যায় সে নিয়ে ভাবতে হবে।

চিবিক্তের পদবীটি বলা হয়নি। চিবিক্ত মুতু। চিন বিরোধী ভক্ত মুসলিম ভীতু। মুসলিম ভীতিটি বিয়ের যৌতুক। একসময় বলতে শুনেছি, হিন্দু ধর্মকে সংকটে ফেলতে বদ্ধপরিকর ভারতের সমস্ত মুসলমান নাকি তাদের হিন্দু বন্ধুদের গোরুর মাংস খাওয়ানোর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ভারতবর্ষে মুসলিম ৬০ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে ৮০। ২০২৯শে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছে একজন মুসলমান। তাই ধর্মপ্রাণ চিবিক্ত মুতু সস্ত্রীক পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতবর্ষকে মুসলমান শাসন থেকে মুক্ত করতে গোপনে লড়াই চালাচ্ছে। লাল এইসব ভালোকরেই জানে। তাই সে দিক থেকেও কাঠি করতে চেষ্টা চালায়। 

ইসঃ! যদি বাংলায় এক শেখ আব্দুল্লা বা মুজিবুর রহমানের মতো লিডার থাকতো।

কিন্তু ব্যর্থ হয়। আলোচনা আবার সেই সিনেমা, ওয়েব-সিরিজের দিকে ঘুরে যায়। 

দিন পাঁচেক অপেক্ষার পর অন্য দিক থেকে আক্রমণের ছক কষতে শুরু করে দেয় লাল। এদিকে চিবিক্তও বেশ কায়দা করে গা বাঁচিয়ে আসছে। লালের প্রত্যেক উস্কানিমূলক মন্তব্য সাফল্যের সাথে অবজ্ঞাভরে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু কতক্ষণ?

আগেই বলেছি, লকডাউনে চিবিক্ত মহাশয় নাকি ৫৪ খানা ওয়েব সিরিজ দেখেছেন। লকডাউনে লালও রামচন্দ্র গুহের লেখা সদ্যপ্রকাশিত গান্ধীজীর একটি জীবনী পড়ে। সেটা জানানোর সুযোগে লাল চিবিক্তকে আবার খোঁচা দিতে শুরু করে।

লাল: (বইটির ছবি দেখিয়ে) সংখ্যা-সংস্কৃতির সাথে একান্ত তাল মেলানোর তাগিদে ভাবছি কোন সংখ্যাটি ব্যবহার করবো! ১১০০+ (পাতা), ৯৯৯ (দাম), ৩৩ (বছরের গান্ধীর জীবনী, মাত্র), নাকি নিছক ২ (মাস ধরে পড়লাম)? বড়ো আক্ষেপের সাথে স্বীকার করছি, হালফিল যুগের হালচাল বিচার করে, যে উপযুক্ত সংখ্যাটি হবে ১ - এক, একটি মাত্র হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড - যা ক্ষমতা রাখে দশকের অক্লান্ত গবেষণার পরিণতি এই বিশালায়তন বইটিকে মুহূর্তে নস্যাৎ করে দেওয়ার; পাঠকের প্রজ্ঞা তো কোথাকার ছাড়!

খোঁচায় কাজ দেয়। কিন্তু চিবিক্ত ঠিক কি বোঝাতে চায় বোঝা যায় না।

চিবিক্ত: অ্যাবসলিউটলি রাইট। অ্যান্ড দিস ইস দ্য ওয়ান পোস্ট ইন হোয়াটসঅ্যাপ। (সাথে গান্ধীজীর তিনটি বানরের - একটি অন্যায় দেখে না, অন্যটি অন্যায় শুনে না এবং অপরটি অন্যায় বলে না - ইমোজি পাঠায়)

লাল: গান্ধীজিকে যেটুকু জানলাম, তা থেকে বলবো, গান্ধীজির তিনটি জনপ্রিয় বাঁদরের একটিরও নীতি সম্পূর্ণরূপে পালন করতে পারেননি। একবার না একবার জীবনের কোথাও পদস্খলন ঘটেছে। যতই হোক তিনিও তো একজন মানুষই ছিলেন। তবে হ্যাঁ, যদি এমন একটি বাঁদর থাকতো, যে তার যৌনাঙ্গ চেপে বসে আছে, তাহলে বলা যেত তার নীতি গান্ধীজি আমৃত্যু পালন করেছেন (অবশ্যই ব্রহ্মচর্য গ্রহণের পর)।

(কিছুক্ষণ পর ক্রিকেটের প্রসঙ্গ টেনে) প্রায় তিন দশক হয়েছে মারা গেছেন, নইলে কড়া একখানা ই-মেইল পাঠিয়ে ভালো করে ধ্যাতানি দিতাম ব্রিটিশ সাংবাদিক জন আর্লটকে। বলিহারি লোক বটে! না মানে, ১৯৫০-এ ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইংল্যান্ড সফরের ওপর স্মৃতিচারণমূলক আর্টিকেল লিখতে বসে খালি রেকর্ডের কথা বলবে, তা না, মাঠে উপস্থিত ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান দর্শকদের উচ্ছ্বাস বর্ণনা করতে লেগে গেছে। ঠিক আছে, মানছি আবেগের বশে না বলে থাকা যায় না। তাই বলে সেগুলো গুগলে ছেড়ে দিতে হয়! খুব জোর পরিবার পরিজন বা বন্ধুবান্ধবদের বলতে হয় যাতে তারা সময় বিশেষে অপরকে বলতে পারে অবশ্যই একচেটিয়া মালিকানার সাথে। নইলে আলি-আলামিন-আকবর যে কেউ পড়ে জেনে যাবে যে।

গতবারের বইমেলায় এক বন্ধুর সুপারিশে উজ্জ্বল চক্রবর্তীর লেখা 'পদ্মরাগের অভিযান' কেনার পর পাশে দাঁড়ানো বন্ধুটি রীতিমতো সকলকে শুনিয়ে যে কথাটি বলেছিল, তা আমার সারা জীবন মনে থাকবে। সে বলেছিল - 'যাই হোক, তোর কাছে স্বয়ং উজ্জ্বল চক্রবর্তীর অটোগ্রাফ দেওয়া কপিটা তো নেই...যেটা আমার কাছে আছে।'

চিবিক্ত: পদ্মরাগের অভিযান। এই বইটা কি নিয়ে লেখা? মানে কিসের গল্প বা উপন্যাস?

অনবদ্য ভঙ্গিতে তর্ক থেকে গা বাঁচিয়ে নেয় চিবিক্ত। এমনকি তার ফলে লালও হাল ছেড়ে দেয়। ঝাঁটাটিকে আপাতত বিছানার তলায় রেখে, বাকিদের সাথে সুস্থ আলোচনায় যোগ দেয়। সিদ্ধান্ত নেয়, ফের চিবিক্ত বাড়াবাড়ি না করলে, লালও বাড়াবাড়ি করবে না। এভাবেই চলতে থাকে কিছু দিন। কিন্তু দিন চারেক পর পরিস্থিতি বিগড়ে দেয় ডেপুটি।

(চলবে)

Sunday, 26 July 2020

চিবিক্ত

তিন

জাতীয়তাবাদ একটা শিশুসুলভ ব্যারাম, মনুষ্যজাতির হামরোগের মত। শারীরিক ব্যাধিটি মোকাবিলা করতে পালং শাক আর মিষ্টি কুমড়োর চচ্চড়ি কিংবা বালিশের তলায় নিমপাতাই যথেষ্ট;মানসিক ব্যাধিটির জন্য চাই নারকেল ঝ্যাঁটা - ঝেঁটিয়ে ভূত তাড়ানোর জন্য।

লাল ভেবেছিল (যদিও চাইনি) আগের দিনের তর্কবিতর্কের জল রাতের মধ্যেই শুকিয়ে যাবে,আজ আর গড়াবে না। এমনকি আইনস্টাইনের কথাটির প্রতিক্রিয়ায় চিবিক্তের ফিকে হাসি তারই ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু মিনিট পাঁচেক পরেই আলিবাবা-বাইদুর ব্যাপারে লালের শেষ রাতের মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে  চিবিক্ত তৃতীয় দিনের সংলাপ শুরু করে।

৪ঠা জুন

চিবিক্ত: ইন্ডিয়াতেও হয়তো ভালো অল্টারনেটিভ বেরোবে। ওয়েট করতে হবে। ভরসা রাখতে হবে। গান্ধীজী একবার বিদেশি পণ্য বর্জন নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন। তারপর আর কোনোদিন তেমন কোনো বড়ো আন্দোলন হয়েছে বলে জানি না। কিন্তু এই মুহূর্তে বিদেশি পণ্য বর্জনের একটা জোয়ার এসেছে। এটাই হাই টাইম ইন্ডিয়ান ইনভেন্টরদের ওপর বিশ্বাস দেখানোর। অলরেডি কিন্তু জিপিএস-এর অল্টারনেটিভ ন্যাভআইসি লঞ্চ করেছে কোনো কোনো ফোনে। রিভিউ ভালো, যেসব অ্যাপের অল্টারনেটিভ ইন্ডিয়ান অ্যাপগুলো বললাম। বেশ কয়েকটা আমি ইউস করছি, সত্যি ভালো। হ্যাঁ, এটা ঠিক, হার্ডওয়্যারের অল্টারনেটিভ তৈরি হতে টাইম লাগবে। ততদিনে যে যে বিদেশি প্রোডাক্ট হাতে আছে, সেগুলোই ইউস করি। ফেলে তো কেও দিতে বলছে না। মনে রাখিস, এসব কথা আমি বলছি যে নিজেই একসময় প্রায় দশ-এগারো বার দশ-এগারোটা ডিফারেন্ট ডিফারেন্ট আইটেম কাস্টম ডিউটি দিয়েও অনলাইনে অর্ডার করে আনিয়েছি। বাংগুর, আলিবাবা, আলিএক্সপ্রেস, অস্ট্রেলিয়ান কোবো এট সেটরা সাইট থেকে। ইন্ডিয়ান সাইটগুলোতে অ্যাভেলেবল ছিল না বলে।

জ্ঞানপাপী ঢাকি। মগজে মোবাইল না মোবাইলে মগজ, সেটাই প্রশ্ন।

লাল: প্রথমত, গান্ধীজি 'বিদেশি পণ্য বর্জন নিয়ে' কোনোদিনই আন্দোলন' করেননি। তাঁর আন্দোলনের আর পাঁচটি কর্মসূচির মধ্যে সেটি একটি থাকতে পারে, তবুও 'স্বদেশি পণ্য গ্রহণ' এই আদর্শে। দ্বিতীয়ত, যেটি আমাদের তর্কে খাপ খায়,কত সহজেই আমরা সেটির সমর্থনে চলে যায়। আজন্ম গান্ধীজীকে গাল দেওয়া সুভাষপ্রেমী বাঙালির কাছে তাই আজ রবীন্দ্রনাথ ব্রাত্য। তিনি বিলিতি বর্জনকে হীন দৃষ্টিতে দেখতেন, আর স্বদেশীর প্রতি তাঁর যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। 'ঘরে বাইরে' দ্রষ্টব্য।

আর কি দেখে বলছো 'জোয়ার এসেছে'? হ্যাঁ জোয়ার এসেছে মোবাইল সহ ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যায়, তাই তাদের ফেসবুক পোস্ট বা হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে 'বিদেশি পণ্য বর্জনের জোয়ার' আসতে পারে।

ডেপুটি: একদম ঠিক। গ্রাউন্ড লেভেল না সরকার করতে চাইবে, না মানুষ, দুদিনেই এই হুজুগ হাওয়া হবে।

(আইনস্টাইনের উক্তিটির প্রসঙ্গে) ন্যাশানালিজম আমার কাছে খারাপ কিছু না তবে হাইপার-ন্যাশানালিজম, হিটলারের মতো, ওটা খারাপ মনে করি।

লাল: নিজেদের খামতি ঢাকতে অন্যকে থুতু ছিটানো স্বাধীন ভারতের অন্যতম বৈচিত্র। বৈদেশিক নীতির ব্যর্থতা ঢাকতে বাণিজ্যে থুতু। পঙ্গপাল দমনে ব্যর্থ তো পাকিস্তানকে থুতু। এমনকি একসময় (গুগল করে জেনে বলছি) লাল বাহাদুর শাস্ত্রী নাকি ভারতীয়দের একবেলা করে না খেয়ে থাকার 'আবেদন' জানিয়েছিলেন। দেশবাসীর মুখে খাবার তুলে দেওয়ার অক্ষমতা ঢাকতে এরকম ন্যাংটামোর নিদর্শন ইতিহাসে বিরল। যদিও, মোদী আলাদা লেভেলেই খেলছে, ইতিহাস-রেকর্ড একাকার করে কোথায় গিয়ে থামবে তার আলোচনা যদিও এখানে অপ্রাসঙ্গিক।

চিবিক্তের 'চিবি' এবার 'ক্ত'য়ের ভূমিকা নেয়।

চিবিক্ত: আসল কথাটা এতক্ষণে বেরোলো। আসল কথাটা হল মোদী। এবারে এত তর্কের কারণ আমার কাছে ক্লিয়ার হল। বিদ্বেষ এতটাই যে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পর্যন্ত গেছে। সমর্থন আর অসমর্থনের জায়গাটা পরিষ্কার হল।

(জোয়ারে প্রশ্ন তোলার প্রসঙ্গে) একদম ডাহা ভুল কথা এবং ভুল ধারণা। আমার অফিস, আমার পাড়া, আমার খুব কাছের কিছু স্কুল ফ্রেন্ডস্‌ (যাদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়), স্ত্রীর অফিস, মেয়ের স্কুলের প্যারেন্টস্‌। আপাতত এই লকডাউনে সোশ্যাল নেটওয়ার্কের হেল্প ছাড়া আর বেশি বিস্তৃতির প্রয়োজন নেই। এইসব গ্রুপের (হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ নয়) মানুষদের কথা, মতামত জেনেই বলছি।

লাল: সংরক্ষনশীল কোনো এক হিন্দুকে মুসলমান বলে দাও দেখবে সেটিকে সে গালি হিসেবে গ্রহণ করছে এবং তার ফলে রেগেও যাচ্ছে। তর্কে না পারলে বিজেপির চামচাদের সার্টিফিকেট ছিল - 'মুসলমানপ্রেমী', 'মুসলমান তোষণকারী', 'যা নামটা পাল্টে অমুক মহম্মদ রেখে দে' ইত্যাদি, এখন তাদের সংগ্রহশালায় তে নতুন অস্ত্র এসেছে - 'ও তুমি মোদী বিদ্বেষী'। এই শুনে পিছুপা হয়ে পড়াটাই সবচেয়ে বোকামো। হ্যাঁ, তো কি হল আমি মোদীকে ঘৃণা করি, তারপর বল।

(লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পর্যন্ত গেছে প্রসঙ্গে) 'তাসখন্দ ফাইল' থেকে ইতিহাসের নোট নিলে এই হয়। বিজেপির দালাল মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী থেকে শুরু করে বল্লভভাই প্যাটেল সবাই বিজেপিরই লোক। নেহরু আর তার পরিবার খালি কংগ্রেস। বিজেপির কি ব্যাকুলতা দেখো, বাপ নেই তো পাশের বাড়ির কাকুকেই বাবা বলে ডাকবি!

সত্যি এটা সেরা ছিল, বিবেক অগ্নিহোত্রীর চোখে জল চলে আসবে। 'বিদ্বেষ এতটাই যে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পর্যন্ত গেছে'। মানতে হল, বিজেপি ষোলআনা সফল হয়েছে, এই দেখাতে যে, কংগ্রেস শুধু নেহরু আর তার খানদান, আর বাকি সবাই বিজেপি।

(কিছুক্ষণ ভেবে) তাহলে তো বড় চিন্তার বিষয়। হ্যামলিনের বাঁশি ভালোই বাজছে তাহলে কানে।

চিবিক্ত: না ষোলোআনা সফল এখনও হয়নি। পিকচার আভি বাকি হে মেরে দোস্ত।

তবে এটা যে তুই মোদি হেটারস্‌ বলেই কিছুতেই সহজ সরল কথাটা মানতে পারছিস না। নাহলে ইজিলি মাথায় ঢুকে যেত। ভারতীয়রা ভারতীয় পণ্য ইউস করবে অন্য দেশের পণ্যের তুলনায়। এটাই তো ন্যাচারাল। এটা বোঝার, বিশ্বাস করার জন্য রকেট সায়েন্স জানার প্রয়োজন নেই।

লাল: একটা সফল এবং আন্তর্জাতিক স্তরের ষোলোআনা ভারতীয় প্রোডাক্ট যেটি আমি ব্যবহার করি না, কোনোদিন করবোও না - বলিউড সিনেমা । রকেট সায়েন্স?

চিবিক্ত: (গাল লাল ইমোজি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়)

লেখালিখির জন্য বাকিদের বলেছিল চিবিক্ত। লাল দেখলো এই সুযোগ। সময় নিয়ে ছোটোখাটো একটা প্রবন্ধ প্রস্তুত করে ফেললো লাল। এই অবসরে ডেপুটির মোদী মিমস চলতে থাকে।

৫ই জুন

লাল: কিছু তথ্যঃ- এক, ভারতে বাজারে যে চীনের পণ্যদ্রব্য আছে তার আর্থিক মূল্য প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার। যদিও, চীনের মোট রপ্তানির মাত্র ৩%। স্পষ্টতই এই ৩% রপ্তানির ক্ষতিতে চীন ভারতের সীমান্ত থেকে সৈন্য সরিয়ে নেবে তা মোটেই মনে হয় না। এবার উল্টো দিকটা বলি। ৭৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির বিনিময়ে চীন ১৭ বিলিয়ন ডলারের ভারতীয় দ্রব্য আমদানি করে, যার পরিমান তুলনায় কম হলেও, ভারতের মোট রপ্তানির সেটি ৫.৩%। এখন, ভারতের হুজুগকে কানমলা দিতে চীনও যদি পাল্টা বয়কট শুরু করে তো কি হবে একবার ভাবো।

দুই, মোবাইলকেন্দ্রিক জীবনের চোটে চীনা দ্রব্য মানে দুটো জিনিসই মাথায় ঘোরে - মোবাইল ফোন আর ফোনের অ্যাপ। তাই টিকটক আনইন্সটল করেই ভাবি চীনকে পুরো ধরাশায়ী করে দিলাম। হাজারটার মধ্যে একটি উদাহরণ দিই - আমাদের দেশের বিমানগুলোর মধ্যে অন্যতম হল বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স এবং ৭৪৭ (আমার মতো পাবলিক, যে বাপের জন্মে বিমানবন্দরে পর্যন্ত পা রাখেনি, সেও, অবশ্যই গুগল করে, এই বিমানগুলোকে চেনে)। এই বিমানগুলোর পার্টস্‌, কলকব্জার প্রধান সাপ্লাইয়ার হচ্ছে জিয়ান এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রিয়াল কর্প - একটা চীনা কোম্পানি। স্ট্যাচু অফ ইউনিটি তৈরিতে যে ব্রোঞ্জ ব্যবহার হয়েছে, তা এসেছে চীন থেকে।

আন্দাজে যেকোনো একটা ডিজিট্যাল অ্যাপের নাম নাও দেখবে তার পেছনে কোনো না কোনো চীনা ব্যবসায়ীর টাকা খাটছে। স্টার্ট আপ নিয়ে ভারতীয়দের যে এত উন্মাদনা, এই স্টার্ট আপ এর পেছনেও চীনের টাকা খাটছে।

মজার কথা, যে বাইজুস ওপো কে হটিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট টিমের স্পন্সরসিপ নিয়েছিল এবং যার ফলে এই বয়কটপ্রেমীরা আহ্লাদে আটখানা হয়ে গিয়েছিল, সেই বাইজুস তেও চীনের টাকা খাটছে। গতকাল বলছিলে না হাইক, তাতেও।

তিন, এই ধরণের বয়কট কতটা সফল হয় তারও দৃষ্টান্ত দিই। এই ইরানের উদাহরণ নাও। মাইবাপ আমেরিকা পুরো বিশ্বকে লাল চোখ দেখিয়ে রেখেছে - ইরানের সাথে কোনোপ্রকার আমদানি রপ্তানি চলবে না। তা সত্ত্বেও ইরান, কটি দেশে মাল রপ্তানি করে জানো? ভারতীয় ফুটবল টিমের র‍্যাঙ্কের চেয়েও বেশি - ১২৮।

বিস্তারিত না গিয়ে বলছি, এরকম বয়কটের নমুনা গোটা বিশ্বে প্রচুর আছে। ডেনমার্কের বিরুদ্বে সমস্ত মুসলিম দেশগুলোর বয়কট, জাপানের বিরুদ্ধে খোদ চীনের বয়কট ইত্যাদি। এতে বয়কটকারী দেশগুলোর সাথে ছাড়া, নিজেদের সামগ্রিক বাণিজ্যে কচু ফারাক পড়েছে।

মোদ্দা কথা যে দেশ, নিজের সেনার জন্য একটা বিমান বানাতে পারে না; শ্রমিকদের বিদেশ-বিভূঁইয়ে পাঠিয়ে দেয় কাজ করার জন্য (দিয়ে অক্ষয় কুমার সিনেমা বানায়); এমনকি নিজের তৈরি জিনিসই পছন্দমতো বিক্রি করতে পারেনা, সে দেশে বসে বয়কটের স্বপ্ন দেখা যা, ইউরোপিয়ান কোনো এক ফুটবল লীগের প্রথম না, দ্বিতীয় না, তৃতীয় স্তরের একটা টিমে জায়গা পেয়ে রিজার্ভ বেঞ্চে বসে কাটানো খেলোয়ারের অধিনায়কত্বে ফুটবল বিশ্বকাপ জেতার আশাও তাই।

চিবিক্ত সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে প্রবন্ধটি। সিনেমার দিকে আলোচনার মোড় ঘোরানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা দিয়ে দিনের সংলাপ শেষ হয়।


(চলবে)

Friday, 24 July 2020

চিবিক্ত

দুই

ভারতে প্রচলিত খান দশের চাইনিজ অ্যাপ (যেমন - শেয়ারইট, জেন্ডার, ক্যামস্ক্যানার, টিকটক ইত্যাদি) আর তার বিকল্প একাধিক ভারতীয় অ্যাপের এক লম্বা ফর্দ দিয়ে দিনের সংলাপ শুরু করে চিবিক্ত।


৩রা জুন

ডেপুটি: আমার জেন্ডার আছে। 

(কিছুক্ষণ পর) এসব তো ঠিক আছে, কিন্তু আমার ফোনটাই চাইনিজ।

হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে একটি মিম শেয়ার করে ডেপুটি। মিমে মোদীর লাম্পট্যের ইঙ্গিত স্পষ্ট। মিমটিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে চিবিক্তের ফর্দকে নিশানায় রেখে লাল তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে শুরু করে। আসন্ন বাকযুদ্ধ!

লাল: গত দুই দশক ধরে চীন সাথে চীনের মানুষদের যেভাবে চারিত্রিক এবং নৈতিক দিক থেকে কলুষিত করা হচ্ছে, সেটি চরম দুঃখজনক এবং অবাঞ্ছিত। গত তিন-চার মাসে সেটি প্রবলতর হয়েছে, বলাই বাহুল্য।

(ফোনটি চাইনিজ প্রসঙ্গে, ডেপুটিকে) এমনকি যে হোয়াটসঅ্যাপ আমরা ব্যবহার করছি (সাথে ফেসবুক) তার মালিকের বউই চাইনিজ। বর্ণবৈষম্যের দরুণ বলছি না - প্রিসিলা চ্যান জন্মগত আমেরিকান হলেও, তার বাবা-মা চাইনিজ রিফিউজি ছিল।

চিবিক্ত: (ডেপুটিকে) সে তো আমারটাও। কিন্তু সেটা তো আর ফেলে দিতে পারবো না। নেক্সট কোনো চাইনিজ ফোন কিনবো না।

আমি চাইনিজ প্রোডাক্ট বর্জনের পক্ষে। শুধু চাইনিজ কেন, অন্য দেশের প্রোডাক্টও আস্তে আস্তে বর্জন করা উচিৎ বলে মনে করি। কোয়ালিটির সঙ্গে অল্প বিস্তর কম্প্রোমাইজ করেও ইন্ডিয়ান প্রোডাক্ট কেনা উচিৎ। কারণটা অন্য কিছু নয়। এতে নিশ্চয় দেশের ইকোনমির ওপর প্রভাব পড়বে।

ফের প্রসঙ্গ থেকে সরে মোদীর ওপর আরেকটি মিম শেয়ার করে ডেপুটি। এই মিমের ইঙ্গিতে মোদীকে চোর বোঝানো হয় (কোভিড-১৯ মহামারির মোকাবিলায় পিএমকেয়ারস তহবিলের টাকা চুরির প্রসঙ্গে)।

ডেপুটি: অবশ্যই তবে কাউকে বাধ্য করার বিপক্ষে।

লাল: (চিবিক্তকে) এটা খুবই সরল মন্তব্য এবং এর পিছনে ধারণাটা নিছক মধ্যযুগীয় (সাবধান, এটা না অপশব্দ না ব্যক্তিগত আক্রমণ, বরঞ্চ সম্পূর্ণ আক্ষরিক) - কারণ, এই আমার লাভ অর্থাৎ তোমার ক্ষতি - এই ধরণের 'জিরো সাম' অর্থনৈতিক  শৃঙ্খলা বর্তমানে অপ্রচলিত। এখন মুক্ত অর্থনীতির যুগে ক্ষতিকে শূন্য রেখে দুপক্ষ সমান লাভের ভাগীদার হতে পারে। খাস করে বিশ্বায়নের যুগে, যেখানে ভারতের মতো দেশ সক্রিয় অংশগ্রহণকারী, সেখানে 'বয়কট-স্বদেশীর' আস্ফালন নিজের পায়ে কুড়ুল মারার সমান। মজার কথা ভারতবাসীদের ষোলোআনা স্বদেশী চীনের বিরুদ্ধেই - আমেরিকা তো 'ব্রাদার ফ্রম আনাদার মাদার'।

ডেপুটি: ইয়েস।

চিবিক্ত: স্বদেশি ব্যাপারটা খারাপ না। একটা প্রচলিত কথা শুনে থাকবি, যারা ভারতের স্বাধীনতার জন্য প্রকাশ্যে বা লুকিয়ে লড়াই করতো, তাদেরকে বলা হতো, অমুক লোক স্বদেশি করে। কথা সম্পূর্ণ ভুল না। আর একজনের বেশি লাভ হলে, অন্যজনের ক্ষতি বা কম লাভ হবেই এটাই সরল অঙ্ক। বিদেশি জিনিস বর্জন না করলে স্বদেশি জিনিস মাথাচাড়া দিতে পারবে না। কারণ কিছুটা টেকনোলজিক্যাল খামতি, কিছুটা স্পন্সরসিপের। সেই স্পন্সরসিপটা ইনডাইরেক্টলি, যারা সমর্থ দেশবাসি, তাদের কাছ থেকে আশা করাটা অন্যায় নয়। কিছুটা ব্যর্থ তা হতে পারে।

তাছাড়া আমি কিন্তু অনলি চাইনিজ প্রোডাক্ট বর্জন করার পক্ষে নই। অন্য দেশের প্রোডাক্টের ক্ষেত্রেও একই অভিমত। যেসব জিনিসের ইন্ডিয়ান অল্টারনেটিভ আছে, সেসব জিনিসের ক্ষেত্রে তো বটেই। এ জন্যই আমি হাইক ইউস করার পক্ষপাতী, হোয়াটসঅ্যাপ নয়। কিন্তু যদি কেও না থাকে, তাহলে আমি কি একা অনলাইন বসে থাকবো?

পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের অর্থনীতি কি কেবলমাত্র একটা মোবাইল ফোন আর তাতে উপস্থিত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপের ওপরই নির্ভরশীল?

মাইক্রোম্যাক্স, কার্বন, লাভা, ইন্টেক্স - এরা কেওই খুব খারাপ ফোন বের করে না। আমি পর পর তিনটে অ্যান্ড্রয়েড কিনেছিলাম মাইক্রোম্যাক্সের, আর উইন্ডোজ ফোনটা লাভার। বাট, এখন চাইলেও আর ওগুলো মার্কেটে নেই। দায়ী কে?

লাল: এই প্রসঙ্গে একটা তথ্য জানিয়ে রাখি, এখন সত্যিই মাইক্রোম্যাক্স সহ অন্যান্য স্বদেশী মোবাইল কোম্পানির লালবাতি জ্বলে গেছে, কিন্তু যে সামান্য সময়ের জন্য ব্যাপক বাজার করে রেখেছিল, সে সময়ের অর্থাৎ বছর ৫-৬ আগের কথা বলছি, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের খবর, যে আমরা বাইরে থেকে দেশি ফোন নিয়ে মাতামাতি করছি কিন্তু আসলে খালি খাপটা দেশে তৈরি হচ্ছে, কলকব্জার পুরোটাই চীন থেকে আসছে।

এখন সে কাপড়টুকুও গা থেকে খসে গেছে।

ডেপুটি: (চিবিক্তকে) তোমার কথার সাথে আমিও একই মত, কিন্তু ব্যাপারটা হল আমরা সস্তায় ভালো জিনিস নেবো সেটা হিউম্যান টেনডেন্সি, পাল্টানো যাবে না, নিজেরটা পাল্টালেও সমাজ কখনোই বদলাবে না, যদি না সরকার পুরোপুরি ব্যান না করে।

(লালকে) ঠিক, মাইক্রোম্যাক্সের বাজার ওরা নিজেই নষ্ট করছে, ভালো ফোন বের না করে।

লাল: ভারতীয়দের ভারতীয় দ্রব্যের প্রতি সহানুভূতি, ফুটবল বিশ্বকাপে ভারতের সমর্থনেরই সমতুল্য...হ্যাঁ সেই ৫০শে খেলার কথা ছিল, তবে এবার বেহালা ব্রাজিল, আহিরীটোলা আর্জেন্টিনা।

চিবিক্ত: (ডেপুটিকে) হ্যাঁ, ঠিক আমি এটারই পক্ষে। গভর্নমেন্টেরই ইনিশিয়েটিভ নিয়ে বন্ধ করা উচিৎ। তারই অপেক্ষায় আছি আমি। যেকোনো কিছুর শুরুতো করতেই হবে, আমিই না হয় করলাম।

(লালকে) ভুল। ১৯৮৩ ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ দেখিসনি, তাই তদানীন্তন অবস্থা সম্পর্কে, গুগল করে রেকর্ড ছাড়া বেশি কিছু জানতে পারবি কি না জানিনা। বাট বাবার নিজের দেখা, আর বাবার কাছেই আমার শোনা - ১৯৮৩ ওয়ার্ল্ড কাপের আগে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট নিয়েও তোর মতন মতবাদ অনেক ভারতীয়দেরই ছিল। পরের চিত্রটা যে আলাদা, আশা করি বলে দিতে হবে না। আর ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবলে আমার ১০০% সমর্থন টিল নাও ইন্ডিয়ার প্রতি থাকবে।

নিজের বক্তব্যের সমর্থনে একটি ফেসবুক ভিডিও শেয়ার করে চিবিক্ত। এখানে এই মজাদার মানসিকতাটি উল্লেখ না করলেই নয়। তর্কে নিজের যুক্তিগুলো (তথ্য নয়) বিশেষ কার্যকরী না হলে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সেই একই যুক্তি (তথ্য নয়) ব্যবহার করে তর্কযোদ্ধা বিপক্ষের ওপর কর্তৃত্ব ফলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে। তর্ক যে দলভারী করে জেতা যায় না এটা অনেক সময় অনেকেরই খেয়াল থাকে না।

লাল: গুগলের জ্ঞান থেকেই বলছি, ১৯৮৩-এর বিশ্বকাপ জেতার অনেক আগে, ১৯৫২-র মাদ্রাজ টেস্ট জয়, ৬৮-তে ডুনেডিন, ১৯৭১-এ ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ডে সিরিজ জয়, রঞ্জি থেকে মার্চেন্ট, সুভাষ গুপ্তে থেকে মানকড়, পেস কোয়াটার, গাভাস্কার...বিশ্বদরবারে ভারতীয় ক্রিকেটের রমরমা আগাগোড়া থেকেই ছিল। একটা ভাগ্যক্রমে বিশ্বকাপ জয় কেবল দর্শকের সংখ্যা আর আগ্রহ বৃদ্ধি করেছিল, ক্রিকেটের স্তর না। এখন, গুগল করে বা প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি থেকে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতীয় ফুটবলের কিছু নমুনা দাও তো। এমনকি পারলে ইউরোপের কোনো বড় ক্লাবে প্রথম সারির কোনো ভারতীয় ফুটবলারের নাম বলো তো...না মানে আমার সত্যিই জানা নেই।

যাই হোক, "গুগল করে রেকর্ড ছাড়া বেশি কিছু জানতে পারবি না"...কথাটা এমন হল, মিশরের ইতিহাস নিয়ে মন্তব্য করছি, হঠাৎ কলকাতা মিউজিয়ামের মমিটা জেগে উঠে বললো, গুগল করে বেশি কি আর জানবি, আমাকে জিজ্ঞেস কর টলেমির তাড়া খেয়ে ক্লিওপেট্রা যখন সিরিয়ায় পিঠটান দিল তখন লোহিত সাগরে বৈঠা আমিই বয়েছিলাম। না মানে একান্ত তিমি মাছ বা বাবা লোকনাথ না হলে কতদূর আর মানুষ প্রত্যক্ষদর্শী হবে...সেই গুগলই করবে।

ডেপুটি হেসে ফেলে (হাসির ইমোজি ব্যবহার করে বোঝায়)।

চিবিক্ত: সবই তো রেকর্ডের কথাই বললি। আমি জানতাম, তাই আগেই বললাম (চিবিক্তও হাসে আর কি)। কিন্তু তুই শুধু উইনারদের সঙ্গেই থাকবি। 'কেবল দর্শকের সংখ্যা আর আগ্রহ বৃদ্ধি', তোর এই কথাটা এমন হল যে, দর্শকের নাম্বারের আগ্রহটা কোনো ম্যাটর করে না। কিন্তু মজার ব্যাপার, ওটাই আসল। ক্রিকেটে জেতে বলে ওটাকেই সমর্থন করবি, আর ফুটবলে হারে বলে সেই টিমটা কি উগান্ডার হয়ে গেল রে পাগলা? বীরভূমের মাটির ফুটবলারও রিজার্ভড বেঞ্চে বসে থাকলেও থাকতেই পারে। তবুও বলবো খেলার স্তরও বেড়েছিল। কারণ অন্য ক্রিকেট কান্ট্রিগুলোর ইন্ডিয়ার প্রতি সম্মান বেড়েছিল, ভারতীয় ক্রিকেটারদের কনফিডেন্স বেড়েছিল। যেটা কিনা তোরা ফুটবলারদের ক্ষেত্রে একদিন দেখবি, এই আশাটুকুও রাখতে পারিস না!

(মমি প্রসঙ্গে, লালকে) জানি এটা স্টুডেন্ট পড়ানোর সাইড এফেক্ট। আমারও হয়। মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে এসে একটা বড়সড় সার্কাস্টিক ওয়ে তে একজ্যাম্পেল দেওয়া।

যে দেশের প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু, সেই চাইনা কিন্তু ম্যাক্সিমাম ক্ষেত্রে অন্য দেশের প্রোডাক্ট, সফটওয়্যার ইউস করতে দেয় না। ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্ট অনেক লিবারেল। চাইনিজ প্রোডাক্টকে ব্যান করেনি। তাই এইসব আলোচনা করতে পারছি। চায়নার ফরম্যাট ফলো করলে অনেক দিন আগেই বিদেশি বেশ কিছু আইটেম বন্ধ হয়ে যেত।

ডেপুটি: একেই বলে স্বদেশি।

চিবিক্ত: হ্যাঁ, আমি জাতীয়তাবাদের পক্ষে। থিয়েটারে ন্যাশানাল অ্যান্থেমে দাঁড়ানো থেকে পাকিস্তানের ফ্ল্যাগধারীদের নিরস্ত্র করা, এসবে আমার পূর্ণ সমর্থন আছে। করোনার জন্য বাড়ি থেকে বেরোতে আমরা ভয় পায়, বর্ডারে গিয়ে বন্ধুক ধরে তো আর দেশভক্তি শো করতে পারবো না।

লাল: গ্যালারি ভর্তি দর্শক-প্যাশন-উন্মাদনা এসব ক্রিকেটে আদিখ্যেতা, আবার এসব ছাড়া ফুটবল ফিকে। হ্যাঁ, টাকা রোজগার করতে হবে, ক্রিকেট খেলোয়াড়দেরও তো ঘর সংসার আছে, তাই এই মাতামাতি মাখামাখি ব্যাপার। শূন্য গ্যালারিতেও ক্রিকেট ইতিহাসে গড়েছে, এখন ইডেনে টেস্ট হলেও কটা লোক আসে দেখতে? আসলে ২০০ বছরের গোলামির দায় আছে ক্রিকেটে, যেখানে ফুটবল প্রেমটা গা বাঁচানো, লোক দেখানো - নইলে জাতীয় অধিনায়ককে হাত জোড় করে আবেদন করতে হয় মাঠে আসার জন্য!

(যে দেশের প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু প্রসঙ্গে) কারণ চীনের আমাজনের জবাবে আলিবাবা আছে, গুগলের জবাবে বাইদু...আর ভারত, ফ্লিপকার্টকেও বিক্রি করে দিয়েছে আমেরিকাকে। তাই ভারত সরকারের মুরোদ নেই, চীনের নীতি অনুসরণ করার...মজার কথা কৃষিতে আমরা এখনও মধ্যযুগে, শিল্পে প্রস্তরযুগ, একমাত্র যেটিতে সম্ভাবনা ছিল 'জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন' নেওয়ার (এবং যেটি ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড) সেই তথ্যপ্রযুক্তিতেও ভারতের অবদান - নামিদামি কোম্পানিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত খুঁজে বেরোনো। ওই সত্য নাদেল্লা ভারতীয় বংশোদ্ভূত, ওই সুন্দর পিচাই ভারতীয় বংশোদ্ভূত...বলে রাখি অভিজিৎ ব্যানার্জীও ভারতীয় বংশোদ্ভূত কিন্তু তার স্ত্রী এখনও ফরাসি।

(চিবিক্তকে বিশেষকরে) অ্যালবার্ট আইনস্টাইন একসময় বলেছিলেন, জাতীয়তাবাদ একটা শিশুসুলভ ব্যারাম, মনুষ্যজাতির হামরোগের মত।

ইতিমধ্যে রাত বারোটা তেত্রিশ। আজকের মতো সংলাপ এখানেই শেষ হয়। কেবল মিমের মধ্যেই আজ সীমাবদ্ধ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মাননীয় নরেন্দ্র মোদীজি। কাল থাকবেন না।


(চলবে)

Wednesday, 22 July 2020

চিবিক্ত

এক

১১ই মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাস সংক্রমিত কোভিড-১৯ রোগটিকে বিশ্বব্যাপী মহামারী ঘোষণা করে। এর মধ্যেই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা লক্ষাধিক। ঠিক এগারো দিন পর ভারত সরকার ২১ দিনের দেশব্যাপী লকডাউন জারি করে। বন্ধ হয় দেশ।

প্রথম লকডাউন ব্যর্থ হয়। এরপর আরও তিন দফায় লকডাউন বাড়ানো হয়। এমনকি চতুর্থ লকডাউনের (১৮-৩১শে মে) পর ১লা জুন থেকে শুরু হয় 'আন-লক'। ততদিনে দেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রুগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই লক্ষ।

২রা মে করোনাভাইরাসের জন্মভূমি চীন তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে ভারত ও চীনের বিতর্কিত সীমা অতিক্রম করে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় প্রবেশ করে। একদিকে ভারতীয় সৈন্য চীনা অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে এগিয়ে যায়, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদের নেশায় বুঁদ ভারতবাসী এগিয়ে আসে চীন বিরোধী প্রতিক্রিয়া নিয়ে। চীনাদ্রব্য বর্জনের ভূত আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সুবিধাভোগী শ্রেণির কিছু মানুষের মাথায়। তাদেরই একজন আজকের সংলাপের এক চরিত্র চিবিক্ত - চিন বিরোধী ভক্ত।

পেশায় সরকারি চাকুরে (এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরের সন্তান এবং সরকারি চাকুরের স্বামী) চিবিক্ত তার দুই নিকট আত্মীয় - ডেপুটি এবং লালকে (দুজনেই বেকার যুবক) নিয়ে ২রা জুন এক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলে, নাম রাখে 'ককটেল'। উদ্দেশ্য, চিবিক্তের কথায় - "যেকোনো ধরণের আলোচনা...ফিল্ম, ওয়েব সিরিজ (এটা বিশেষ করে বলার কারণ, চিবিক্ত লকডাউনে ৫৪টি ওয়েব সিরিজ দেখেছে), টেকনোলজি, কোভিড-১৯, পলিটিক্স (খেয়াল রাখবেন), দেশ, প্রেম ইত্যাদি...বই, গল্প, নিজের লেখা এইসবও চলবে।" চিবিক্তের মতে তিনজনের 'ফ্রিকোয়েন্সি ম্যাচ করে বলে' এই গ্রুপটা খোলা হয়েছে। কিন্তু কেউই কল্পনা করতে পারেনি, এমনকি দিন দশেক পেরনোর পরেও, যে গ্রুপটির আয়ু হবে সাকুল্যে ২১ দিন - প্রথম লকডাউনের মেয়াদ। ককটেল গ্রুপ এবং তার সাথে বহুদিনের নিকট আত্মীয়তার অকালমৃত্যুর পেছনে যে বাদানুবাদ ইন্ধন জুগিয়েছে সেগুলোই সংলাপের আকারে এখানে তুলে দেওয়া হল।

বলার অপেক্ষা রাখে না, চরিত্রদের নাম পাল্টে দেওয়া হয়েছে। কেউই কিন্তু জানেনা সে কে - না চিবিক্ত, না ডেপুটি। তবে চিবিক্ত, ডেপুটি এবং লাল - তিনটি প্রতীকী নামই সংলাপের প্রত্যেক পর্বেই নামকরনের সার্থকতার পরিচয় দিয়ে গেছে।

নাম পাল্টানো হলেও কারোরই সংলাপে কোনপ্রকার হেরফের করা হয়নি। তিনজনেরই কথা বলার ধরণ, শব্দের চয়ন আর যতিচিহ্নের অবস্থান অবিকল এক রেখে দেওয়া হয়েছে। কথকের আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সাথে, পাঠক যেন তার বোধ ও রুচির আন্দাজ পেতে পারে সে কথা মাথায় রেখেই, এবং সংলাপটিকে আরও উপভোগ্য করে তোলার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেকারণে, পাঠকদের মাত্রাতিরিক্ত অহেতুক ইংরেজি শব্দ নিজগুণে সহ্য করে নেওয়ার জন্য অনুরোধ রইলো।

সংলাপের সম্পাদক লাল 'মাত্রাতিরিক্ত অহেতুক ইংরেজি শব্দ' ব্যবহারের রুচি রাখে না।

২রা জুন

চিবিক্ত আর ডেপুটির কথোপকথন দিয়ে শুরু হয় গ্রুপের সংলাপ। গ্রুপের নাম 'ককটেল' আগেই বলেছি। তবে নামে নামের সাথে আছে বেশ কিছু ইমোজিও। তাদের মধ্যে একটি হল পতাকা। ভারতের পতাকা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটি ছিল আফ্রিকার একটি দেশ নাইজারের। প্রশ্ন তোলে লাল। ভারতের পতাকার বদলে নাইজারের পতাকা ব্যবহারের কারণ আর কিছুই না, নাইজারের পতাকা অনেকটা ভারতের পতাকার মতোই দেখতে (কেবলমাত্র অশোকচক্রের জায়গায় কমলা রঙে ভরাট একটি বৃত্ত আছে) এবং সেটি চিনতে ভুল করে ফেলে চিবিক্ত। তবে চিবিক্তের ভুল হবে তাই কখনো হয়! স্বাভাবিক উত্তর আসে - 'একচুয়ালি খুঁজে পাইনি।'

আফ্রিকার দেশ নাইজার শুনে (ইংরেজি বানান Niger), ডেপুটির মনে হয় এখান থেকেই বর্ণবিদ্বেষমূলক শব্দ 'নিগার' শব্দটি এসেছে। যদিও ধারণাটি ভুল। লাল শুধরে দেয় যে, নিগ্রোর অপভ্রংশ নিগারের বুৎপত্তি ল্যাটিন শব্দ 'নিগ্রাম' থেকে, যার মানে কালো। এদিকে নাইজার নাম এসেছে নাইজার নদী থেকে, যার আবার বুৎপত্তি স্থানীয় টুয়ারেগ ভাষায় n'eghirren শব্দটি থেকে, যার মানে স্রোতস্বিনী।

পাঠক ভাবতেই পারেন, হঠাৎ করে এমন জ্ঞানগম্যি ভরা কথাবার্তা শুরু হয়ে গেল কেন। স্বয়ং সম্পাদক হয়ে লাল বেশ নিজের ঢাকটা পেটাতে শুরু করেছে দেখছি! আসলে লালের এখানে পাণ্ডিত্যের কিছু নেই। ইন্টারনেট খুঁজে উপরের তথ্যগুলো জানাতে মিনিট পাঁচেকের বেশি লাগবে না। লাল তাই করেছে। লক্ষ্য করার বিষয়টি হল, বাকি দুজনের কাছে সহজলভ্য ইন্টারনেটের অফুরন্ত জোগান থাকলেও, নিজে থেকে সামান্য কিছু তথ্য খুঁজে বের করার বিন্দুমাত্র ফুরসৎ নেই। তাদের, বিশেষকরে চিবিক্তের আসল ফুরসৎ প্রোপাগান্ডায় (প্রচারণা শব্দটি ব্যবহার করে, ব্যাঘ্রকে আর শার্দূল বানালাম না), সে সংলাপ এগোলেই পাঠক বুঝতে পারবেন।

এরপর স্বাভাবিক কারনেই আলোচনা করোনা ভাইরাসের দিকে মোড় নেয়। ইস্রায়েল সহ আরও কয়েকটি দেশে টীকা আবিষ্কারের খবর জানায় চিবিক্ত। এরপর, পুনরায়, ইন্টারনেটে নিজে পরিশ্রম করে খোঁজা এড়িয়ে চিবিক্ত বাকি দুজনের কাছে  পার্ভাটনিমফোম্যানিয়াকসেক্সিহাইপার সেক্সুয়াল' - এই চারটি শব্দের পার্থক্য জানতে চায়। এবং পুনরায়, ডেপুটি ইন্টারনেটের সাহায্য না নিয়েই, নিজের মতে চারটি শব্দের পার্থক্য বুঝিয়ে দেয়। চিবিক্তের ইন্টারনেট খুঁজে কিছু জানতে অরুচি আছে, সে বললে চিবিক্তের প্রতি অবিচার করা হবে। আসলে চিবিক্ত তার ষোলোআনা পরিশ্রম প্রোপাগান্ডায় ব্যয় করতে ইচ্ছুক।

সংলাপের বিজ্ঞাপন দিয়ে, শুরু থেকেই কেবল বর্ণনাই করে যাচ্ছি সেটি খেয়াল আছে। ভূমিকাকে একটু দেরি হয়ে গেল, ঠিকই, তবে এবার শুরু করা যেতে পারে -

চিবিক্ত: ওকে, নাও এই চারটে ওয়ার্ডের মিনিংয়ের মধ্যে প্রপার ডিফারেন্সগুলো কি কেউ বলবে?
পার্ভাট
নিমফোম্যানিয়াক
সেক্সি
হাইপার সেক্সুয়াল।

লাল: এটা ডেপুটি বলবে...ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে। (লাল আর ডেপুটির বয়সের ফারাক বছর দুয়েকের, দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক, তাই রসিকতাটা স্বাভাবিক)

চিবিক্ত: গুগল করেও বলা যাবে। বাট কপি-পেস্ট চলবে না। নিজে বুঝে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলতে হবে।

ডেপুটি: হাইপার সেক্সুয়াল অ্যান্ড নিমফোম্যানিয়াক এটা বায়োলজিক্যালি অ্যান্ড সাইকোলজিক্যালি ডিফারেন্ট দ্যান সেক্সি, অ্যান্ড পার্ভাট। মিনিং ওয়াইস।

চিবিক্ত: ওকে। তারপর?

ডেপুটি: একটু ভেবে বলছি।

চিবিক্ত: ওকে।

ডেপুটি: হাইপার সেক্সুয়াল অ্যান্ড নিমফোম্যানিয়াক এটা অর্গানিক এটা চেঞ্জ করা যাবে না। কিন্তু পার্ভাট, সেক্সি এটা হলো মানুষের স্বভাব। তাই স্বভাব যেমন করা যায়, তাই বদলানো ও যাবে। উকি, ঝুঁকি মারা স্বভাব, সেক্সটুয়াল হেংলামো হলো পার্ভাট। এটা নিমফোম্যানিয়াকদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায় না। হাইপার সেক্সুয়ালদের সেক্সচুয়াল ফ্যান্টাসি খুব হাই হয়, যেমন 'ফিফটি সেডস্‌ অফ গ্রে'তে হিরোটা যেমন।

চিবিক্ত: ওকে, অনেকটা ক্লিয়ার হলো।

ডেপুটি: হয়তো ১০০% ঠিক হয়নি, বাট আমি যা জানি তাই বললাম।

চিবিক্ত: না ঠিক আছে, আমি ঠিকঠাক ডিফারেনশিয়েট করতে পারছিলাম না। এবার অনেকটা পরিষ্কার হল।

এরপর সিনেমা, ফের সিনেমা থেকে ওয়েব সিরিজ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। লাল আলোচনা থেকে দূরেই থাকে।

অবশেষে চিবিক্ত এক প্রস্তাব পেশ করে। লেখালেখির প্রস্তাব।

চিবিক্ত: আমার একটা প্রস্তাব আছে। তিন জনকেই চেষ্টা করতে হবে মান্থলি অ্যাট লিস্ট ১টা নিজের লেখা কিছু গ্রুপে দিতে। সেটা যা খুশি হতে পারে। পদ্য, স্টোরি, প্রবন্ধ, শায়রী, গান, কোনো কিছু নিয়ে প্রতিবেদন এট সেটেরা যা কিছু হতে পারে।

লাল: আমার আপত্তি নেই। তবে আমি তথ্যপূর্ণ লেখা পছন্দ করি - লিখতে পড়তে দুটোই। সেকারণে, আমার লেখা বিরক্তিকর লাগতে পারে।

চিবিক্ত: বাঃ! খুব ভালো। 

(তথ্যপূর্ণ লেখা প্রসঙ্গে) ভালো কথা তো। 

(বিরক্তিকর লাগার প্রসঙ্গে) সেটা বাকি দুজনের কারও মনে হলে জানাতে পারে।

বলে রাখি, যারা হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারে অভ্যস্ত তারা জানবেন নিশ্চয়ই, চ্যাটে অন্যের রিপ্লাইয়ের অপেক্ষা না রেখে পরপর একাধিক ব্লকে মেসেজ পাঠানো যেতে পারে। জবাবে নিদিষ্ট ব্লক-মেসেজকে সিলেক্ট করে নিদিষ্ট রিপ্লাই দেওয়া হয়ে থাকে। এখানে সেরকম নিদিষ্ট রিপ্লাইকে বন্ধনীর মধ্যে 'প্রসঙ্গ' উল্লেখ করে  লেখা হয়েছে।

ডেপুটি: চেষ্টা করবো।

এরপর আরও কিছু সিনেমা নিয়ে আলাপ-আলোচনার পর, আজকের মতো কথোপকথন শেষ হয়। পারিবাকির গ্রুপে পারিবারিক পরিবেশ - এটাই প্রত্যাশিত। তবে পরের দিন শুরুতেই বোমা ফাটায় চিবিক্ত।

(চলবে)

Thursday, 30 April 2020

৩০শে এপ্রিল

সত্তরের দশক। পরিচালক নাতি তার দাদুর তৈরি চরিত্রগুলো নিয়ে নিজের মতো কাহিনি লিখে সিনেমা বানাবে বলে উঠেপড়ে লেগেছে। ছায়াছবির এক দৃশ্যে ভবঘুরে চরণদাস বাউল রাজাকে গান গেয়ে শোনাচ্ছে। বাউলের অভিনয় করবেন গায়ক রবীন মজুমদার। সুরকার কমল দাশগুপ্তের জুটি রবীন মজুমদার বহুদিন আগেই পেশাদারি গান গাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। ইদানীং মনোযোগ দিয়েছেন অভিনয়ে। পাছে অভিমান করে বসেন, তাই বাউল চরিত্রে অভিনয়ের সাথে সাথে বাউলের গানটি গাওয়ারও প্রস্তাব তাকে দেওয়া হয়। তিনি প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। 

সিনেমার ডজনখানেক গানের সবকটিই অনুপ ঘোষালের গাওয়া। কিন্তু বাউল গান তাঁর কণ্ঠে বেমানান। শেষমেশ গানটি গাইলেন অমর পাল - 'দেখ ভাল জনে রইলো ভাঙ্গা ঘরে / মন্দ যে সে সিংহাসনে চড়ে'।

সেখান থেকেই অমর পালের সাথে আমার পরিচয়। জানলাম তিনি লোকসংগীত শিল্পী। 'কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়'-এর পর খুঁজে খুঁজে তাঁর আরেকটি গান শুনলাম - 'পরের জায়গা পরের জমিন ঘর বানাইয়া আমি রই, আমি তো এই ঘরের মালিক নই।' পড়ে গেলাম প্রেমে। আর ঠিক তার পরের গানেই জুটলো যাতনা। এক আগন্তুক কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসলো। 'উঠ উঠ গৌর চাঁদ নিশি পোহাইল...' গানটির শেষ লাইন - 'করজোড় করি কহে বাসুদেব রায়...'। কে এই বাসুদেব রায়?

'সনার বরণ গৌর চাঁদ - এলো নদিয়ায় রে।' ভাবলাম নদিয়ায় একবার ঢুঁ মেরে দেখি। আর যখন পদবীটি হল 'রায়', তখন নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের বংশপঞ্জিটায় চোখ বোলালে ক্ষতি কি! কিন্তু সে গুড়ে বালি। রাজবংশের আদি পুরুষ ভবানন্দ (যদিও মজুমদার) থেকে কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের মাঝে কোনো বাসুদেবকেই খুঁজে পেলাম না। পরে বুঝলাম বৃথাই সন্ধান। কারণ, গৌর শ্রীচৈতন্যকে 'করজোড় করি' কিছু বলার সুযোগ নদিয়ার কোনো রাজারই ছিল না - মহাপ্রভুর মহাপ্রস্থানকাল ষোলো শতকে, যেখানে ভবানন্দ বাংলার নবাব ইসমাইল খাঁর কৃপায় সবে রাজা হচ্ছেন ঠিক তার পরের শতকে।

অবশেষে সাহায্য মিললো এক ভাইয়ের কাছ থেকে। বিষয়টি হল ভণিতা। বারো ক্লাসে পড়েছিলাম, বেমালুম ভুলেও গিয়েছিলাম - কবিতা বা গানের শেষ অংশে রচয়িতার ইচ্ছে হলে স্বয়ং নিজের নামটি জুড়ে দিয়ে কবিতা বা গানটি শেষ করে। এই রেওয়াজকে ভণিতা বলা হয়ে থাকে। কৃত্তিবাস ওঝার রামায়ন ('সীতা সীতা বলি রাম ছাড়িলা নিশ্বাস / গাইল উত্তরাকাণ্ডে কবি কৃত্তিবাস') কিংবা রামপ্রসাদী গান ('গুরুদত্ত বীজ রোপন করে , ভক্তিবারি সেঁচে দেনা । / একা যদি না পারিস মন রামপ্রসাদ কে সঙ্গে নে না ।।') ছাড়াও আরো গাদা গাদা উদাহরণ আছে। তাহলে দাঁড়াচ্ছে, বাসুদেব রায় মহাশয় আর কেউ নন স্বয়ং গানটির গীতিকার। সমস্যা সমাধান!

কিন্তু অমর পাল সেখানেই মুক্তি দিলেন না। আগ্রহকে খামচে ধরলেন আরেকটি গানে। তার আগে 'রাই জাগো রাই জাগো', 'বৃন্দাবন বিলাসিনী', 'হরি দিন তো গেল' গানগুলি শুনিয়ে দিলেন। শেষে পেশ করলেন 'জাগো হে এ নগরবাসী'। 

কোনোদিন আশা করিনি গান বুঝতে ভূগোল ভোগাবে। এই গানে হল ঠিক তাই। ব্যাপারটি কি, খুলে বলা দরকার। গানের শুরুতে 'মুখে জয় রাধা শ্রী রাধা' থাকলেও গানের মাঝে এসে হাজির হয়েছেন আরও অনেক দেব, দেবী এমনকি পুণ্যস্থান। গায়ক একে একে চার দিকের নাম নিয়ে বন্দনা করে চলেছেন সেই দিকের বিশেষ বিশেষ অধিষ্ঠাত্রী দেব, দেবী বা পুণ্যস্থানের। যেমন, 'উত্তরে বন্দনা করি কৈলাস শিখর', সাথে 'তার পাছে' আছেন 'শিব আর পার্বতী' - গায়ক সকলকে বন্দনা করছেন। পূর্বদিকে আছেন শাশ্বত সূর্যদেব। তাই গায়ক গাইছেন - 'পূবেতে বন্দনা করি পূবের দিবাকর'।

উত্তর আর পূর্বদিক নিয়ে কোনো সমস্যা হল না। সমস্যা শুরু হল বাকি দুটি দিক নিয়ে - পশ্চিম আর দক্ষিণ। পশ্চিমের ধাঁধা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাতে হল না। একটু বুদ্ধি খাটিয়েই বুঝতে পারলাম গায়ক কেন - 'পশ্চিমে বন্দনা করি ঠাকুর জগন্নাথ'। পুরীর জগন্নাথ দেবের জগন্নাথ মন্দির ওড়িশা রাজ্যে অর্থাৎ পূর্ব ভারতে। সেটি পশ্চিমে গেল কি করে? উত্তরটি সহজ। শ্রী জগন্নাথ দেব ভারতবর্ষের পূর্বভাগে বিরাজ করলেও বাংলার সাপেক্ষে তিনি পশ্চিমে। গীতিকার যদি পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডিতে বসেও গানটি লেখেন, জগন্নাথ দেব তার পশ্চিমেই থাকবেন।

ভুল দূরে থাক, ভ্রান্তি ষোলোআনা। এবার পালা দক্ষিণের। এবং এই দক্ষিণের রহস্য উদঘাটনেই খেতে হল বারোআনা নাকানিচোবানি। এমনকি যুক্তিতর্ক খুঁজে পাওয়ার পরেও যে সেটি সম্পূর্ণ ঠিক, এমন দাবি করার আত্মবিশ্বাসেও রীতিমতো ফাঁকি রয়ে গেছে। তবু জানাতে ক্ষতি কি!

আছে 'দক্ষিণে বন্দনা করি কালিদয় সাগর'। কালিদয় সাগরটি কোথায়? আমার জানা নেই। গীতিকার যখন নিজের অবস্থান - বাংলা - ঠিক করে দিয়েছেন তখন স্বাভাবিক ইঙ্গিতটি যাবে বঙ্গোপসাগরের দিকে। যেমন আছে গঙ্গাসাগর। জানিয়ে রাখি, কালিদয় সাগর যে আস্ত একখানি সাগর কখনই হবে না, এ ধারণা শুরু থেকেই ছিল (যেমন না গঙ্গাসাগর সাগর, না বঙ্গোপসাগর)। যাই হোক, এবার প্রশ্ন হল কালিদয় সাগর কি বঙ্গোপসাগরেরই কোনো প্রতিশব্দ - যেটি হওয়ার সম্ভাবনা কালিদাসের সাথে আদি শঙ্করের সাক্ষাতের সম্ভাবনার কাছাকাছি, না কি উপসাগরের বিশেষ একটি অংশ? মুহূর্তে মনে পড়ে গেল কালাপানির কথা। এই কালাপানি পেরিয়েই, সকলে জানে, আছে আন্দামানের সেলুলার জেল। যেখান থেকে সসম্মানে ফিরে এসেছিলেন বীরপুরুষ সাভারকর।

এখন 'কালি' আর 'কালা'-র মধ্যে কোনো ফারাক নেই। আর পানি সাগর হতে আপত্তি কোথায়? কিন্তু না! সহজেই দেখিয়ে দেওয়া যায় কালিদয় সাগর আর কালাপানি এক নয়। উপায় অনেক। প্রথমত, কালাপানি কেবল একটিমাত্র ভৌগলিক স্থান নয় - ভারত-নেপাল সীমান্তে উত্তরাখণ্ড রাজ্যে আরেকটি কালাপানি আছে। প্রশ্ন জাগতে পারে সমুদ্র সীমা ছাড়িয়ে এতদূরে এরকম মহাদেশীয় অবস্থানে 'পানি' এল কোথা থেকে! উত্তর - হিমালয়। এই কালাপানির পানি মিঠাপানি। নদীর জল। পানি যে সাগরের পানিই হবে সেরকম কোনো শর্ত নেই। স্থানীয় কালী (নেপালে মহাকালী) নদী যে দুটি প্রধান জলধারা মিলে সৃষ্টি হয়েছে তার একটি হল শার্দা, যার আরেক নাম কালাপানি। এমনকি এই কালাপানি নদীর উপত্যকায় অবস্থিত বিশেষ একটি অঞ্চলের নামও কালাপানি।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমে গাইবান্ধা জেলায় মাত্র ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ছোট্ট একটি নদী আছে যেটির নামও কালাপানি। কোনটিকে ছেড়ে কোনটিকে তাহলে কালিদয় বলবো?

দ্বিতীয়ত, বিখ্যাত যে কালাপানির কথা আমরা ছোটোবেলা থেকে (ইতিহাস বই মারফৎ) শুনে আসছি তার কোনো নিদিষ্ট ভৌগলিক অবস্থান নেই। পৌরাণিক মতে কালাপানি হল ভূখণ্ড পারের সমুদ্র। সে যেকোনো সমুদ্র হতে পারে। আর সে 'সমুদ্র উল্লঙ্ঘন' মানেই জাত খোয়ানো। হিন্দু ধর্মের এই প্রাচীন কুসংস্কার মধ্যযুগ পেরিয়ে আধুনিক যুগেও জায়গা করে নিয়েছে। তাই ভারতবর্ষে কোনোদিন ফার্ডিনান্ড ম্যাগেলান বা আমেরিগো ভেসপুচি জন্মাতে পারেনি।

সিপাহি বিদ্রোহের পর থেকে রাজনৈতিক কয়েদিদের দ্বীপান্তরের ব্যবস্থা শুরু করে ব্রিটিশ সরকার। উনিশ শতকের শেষে আন্দামানে গড়ে ওঠে কুখ্যাত সেলুলার জেল। কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু কয়েদিদের সৌজন্যে সেলুলার জেলের নাম হয়ে দাঁড়ালো কালাপানি। কারাবাসে কোনো অসম্মান নেই, জাতের বালাই যত কালাপানি। এমনকি কয়েদি নির্বাসনের অনেক আগে থেকেই ধর্মান্ধ ভারতীয় বেগার শ্রমিকদের দেশান্তরের সময়েও কালাপানি পেরনোর ভয় ভর করে উঠতো।  

পুরনো ধারণা হলেও, কালাপানি শব্দের ব্যবহার তুলনায় আধুনিক। শাস্ত্র বা সে ধরণের পুঁথিপত্রে 'কালাপানি' শব্দের সরাসরি কোনো ব্যবহার নেই। সবার উপরে, কালিদয় সাগরের সাথে কালাপানির ঐতিহাসিক যোগসূত্রের তথ্য অন্তত আমার চোখে পড়েনি।

এত পরিশ্রম নিতান্তই কৌতূহলের খাতিরে। কারণ, কালিদয় সাগর যে আর কিছুই না, আজকের বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক পুরাকীর্তি মহাস্থানগড়ের অন্যান্য বিশখানেক দর্শনীয় স্থানের একটি, সেটি মুহূর্তেই খুঁজে বের করে নেওয়া যায়। প্রাচীন বঙ্গের পুণ্ড্রবর্ধন নগর আজকের মহাস্থানগড়। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বগুড়া জেলার অন্তর্গত এই গড়ে আছে মানকালীর ঢিবি থেকে বৈরাগীর ভিটা, বেহুলার বাসর ঘর থেকে পরশুরামের প্রাসাদ। তেমনই একটি দর্শনীয় স্থান হল কালীদহ সাগর। আদতে একটি বিল কালীদয় সাগর ঐতিহাসিক গড় জরিপা দুর্গের উত্তরদিকের পরিখার কাজ করতো। 

মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে শতভিষা নক্ষত্র (আরেক নাম বরুণ) যোগ কালে গঙ্গাস্নান করলে শত সূর্যগ্রহণকালে গঙ্গাস্নান অপেক্ষাও বেশি পুণ্য হয়। লোকমুখে প্রচলিত নাম বারুণী স্নান। তবে কাছে গঙ্গা না পেলে মানুষ কি করবে? উপায় সহজ, কাছেপিঠের কোনো খাল-বিলের পাড়ে প্রথমে গঙ্গাপুজ সেরে নিয়ে জলে ডুব দিলেই হল - 'যা দেবী সর্বভুতেষূ...'। এই কারণে এককালের পরিখা কালীদয় সাগর আজ হয়ে উঠেছে স্থানীয় হিন্দুদের তীর্থ। গঙ্গাপুজা, সংকীর্তনের সাথে সাথে পাপমোচন পিণ্ডদান কিছুই বাকি থাকে না এখানে। সাথে দিন পনেরো ধরে আয়োজন চলে মেলার। 

এই তাহলে 'দক্ষিণে বন্দনা করি কালিদয় সাগর'। কিন্তু দক্ষিণ হল কোথায়। অখণ্ড বাংলার সোজা উত্তরভাগে অবস্থান করছে কালীদয় সাগর। হে মহাপ্রভু, উত্তরের স্থান দক্ষিণে আসে কি করে। তা কি অসম্ভব! মোটেই না। ভূগোল বলে, উত্তরের উত্তের গেলে আগের উত্তরটি দক্ষিণ হয়ে যায়। অর্থাৎ যিনি গানটি লিখছেন, তিনি অবশ্যই নদিয়ায় বসে লিখছেন না তাহলে। তিনি আছেন বাংলার বাইরে - উত্তরে অসমের কোথাও। কিন্তু অসমের কোথায়? এবার সেটি খোঁজার পালা।

সাহায্য এল গানের সুত্রেই। 'মুখে জয় রাধা শ্রী রাধা বইলা পোহাইল নিশি'। 'বইলা' রাঢ়ী উপভাষার কথা না সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। কিন্তু সেটি রাজবংশী না বঙ্গালী, তা বলা কঠিন - অন্তত আমার পক্ষে। তাহলে উপায়? উত্তরবঙ্গ এবং অসম সংলগ্ন এলাকায় চলতি উপভাষাগুলির স্থানীয় সাহিত্য বা গানগুলির ওপর একবার করে চোখ বুলিয়ে দেখার বুদ্ধিটা মাথায় এল। যদি কিছু মেলে।

ইউরেকা! মিলেও গেল! একটি বই পেলাম। বলা উচিৎ তার একটি মাত্র অধ্যায় পেলাম। বইটির নাম জানা গেল না তবে তার এই বিচ্ছিন্ন অধ্যায়টি - 'বরাক উপত্যকায় লোকশিল্পে লোকসাহিত্যের স্বরূপ সন্ধান' - থেকে সোনার ডিমটি পেয়ে গেলাম। তার আগে বলে রাখি বরাক উপত্যকাটি কোথায়? বর্তমান আসামের (পূর্বভাগে) কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি - এই তিন জেলা নিয়ে বরাক নদীর অববাহিকায় বরাক উপত্যকা অবস্থান করছে। স্বাধীনতার আগে করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি (বর্তমানে পূর্ববঙ্গ বাংলাদেশের) সিলেট জেলার অন্তর্গত ছিল। সেখান থেকেই স্থানীয় লোকেদের মুখের ভাষার নাম হয়েছে সিলেটি। 

সিলেটি ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বরাক অঞ্চলের লোকসাহিত্য স্থানীয় লোকশিল্প এবং সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। 'আইমঙ্গল, বিচার গান, থাকগান, ধামাইল, মারিফতি গান, শিতালংসার গান, গাজীর গান, ফকিরি গান, পটের গান, জারি গান, মুর্শিদি গান, হিন্দু-মুসলিম বিবাহগীতি, পই বা ভাঙ্গানি, প্রবাদ, ছড়া, লোকসংগীত, নাজিম গীতি, ওঝা নাচ ও গান, বারমাস্যা, মেয়েলী গীত ও ব্রতকথা, কিচ্ছা বা লোককথা, হাছনরাজার গান ইত্যাদি' এই লোকসাহিত্যের ফসল এবং প্রত্যেকটির সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে অনন্য সব লোকসংস্কৃতি।

এরকমই একটি লোকসংস্কৃতির নিদর্শন হল বাঙালি হিন্দু-মহিলাদের সূর্যব্রত পালন। উপোস থাকা, মানত করা ইত্যাদির সাথে সাথে সূর্য বন্দনার রীতি আছে এই ব্রতে। ঊষাকালে সূর্য উদয় হওয়ার আগে থেকেই গান গেয়ে সূর্য বন্দনা শুরু করতে হয়। সূর্য বন্দনাকালে প্রচলিত গানগুলির মধ্যে একটি গান শুরু হচ্ছে এইভাবে -  

বন্দনা রে হরি দেব নারায়ন।
প্রথমে বন্দনা করি শ্রী গুরু চরণ।।

অবাক কাণ্ড! দেখি, এই গানের মাঝেই একেবারে অক্ষত অবস্থায় 'জাগো হে নগরাবাসী'র চার দিকের চার দেবদেবীর উল্লেখ আছে। 'পূর্বে বন্দনা করি পূর্বে উদয় ভানু'...'পশ্চিমে বন্দনা করি পশ্চিমে সিংহাসন' (তার পাছে বন্দনা করি ক্ষেত্র জগন্নাথ)...'উত্তরে বন্দনা করি দেবতার আসন' এবং অবশ্যই, দক্ষিণে বন্দনা করি কালিদয় সাগর'।

শান্তি! শান্তি! শান্তি!

বলার অপেক্ষা রাখে না, এই লোকগীতিই শতশত মানুষের মুখে মুখে এসে পৌঁছেছে বাংলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে; অবশেষে অমর পালের কণ্ঠে। এরপর কোথায় যাবে জানা নেই, তবে এটুকু জানা আছে, গানখানি যেখানেই যাক, বরাবরের মতো উত্তরে বন্দনা পাবে কৈলাস শিখর, পূর্বে দিবাকর, পশ্চিমে ঠাকুর জগন্নাথ আর দক্ষিণে কালিদয় সাগর।

*****

পুনশ্চ: ভৌগলিক বিচারে কালীদহ সাগর বরাক উপত্যকার এমন কিছু দক্ষিণে অবস্থান করে না (আসলে অবস্থান করছে পশ্চিমে)। এমনকি উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত বরাক উপত্যকার কিছু কিছু অঞ্চল কালীদয় সাগরেরই দক্ষিণে অবস্থান করছে। সংশয়ের গোদ, তার উপরে বিষফোঁড়া হয়ে হাজির হল দক্ষিণে চট্টগ্রামের ফেনী সদরের কালীদহ ইউনিয়ন। আরেকটি কালিদয় সাগরের শরিক।

তাতে কি হল? দক্ষিণে অবস্থান হলেও, না এই জায়গা তীর্থক্ষেত্র, না এর নামের শেষে সাগর আছে। তবে তার সাথে এই তথ্যটিও জানিয়ে রাখা দরকার - আদিকবি কানাহরি দত্তের মনসামঙ্গল কাব্য পূর্ববঙ্গে পদ্মপুরাণ নামে বেশি জনপ্রিয় এবং তার লেখকও আলাদা - বাইশকবি। পদ্মপুরাণে 'পদ্মার জন্ম বিবরন' পর্বে উল্লেখ আছে - 'উপনীত হয়ে শিব কালীদহ তীরে। / বিল্ববৃক্ষ তলে বসে প্রফুল্ল অন্তরে' লাইন দুটির সূত্র ধরে সিলেট, সুনামগঞ্জ (সিলেটের পশ্চিমে) সহ স্থানীয় হাওরাঞ্চলের (সাগরসদৃশ বিস্তৃত জলাভূমিকে বলে হাওর) বাসিন্দারা পদ্মপুরাণে নিজেদের অধিকার জাহির করতে দাবি করে যে তাদের আজকের বাসস্থান এককালে এই কালীদহ সাগরের নীচে ছিল। ঠিক এই একই অধিকার ফলাতে একই রকমের দাবি অন্য আরেকটি যে অঞ্চলের লোকেরা করে আসছে তাদের বাসস্থান হল চট্টগ্রাম।