Wednesday, 22 July 2020

চিবিক্ত

এক

১১ই মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাস সংক্রমিত কোভিড-১৯ রোগটিকে বিশ্বব্যাপী মহামারী ঘোষণা করে। এর মধ্যেই করোনা আক্রান্তের সংখ্যা লক্ষাধিক। ঠিক এগারো দিন পর ভারত সরকার ২১ দিনের দেশব্যাপী লকডাউন জারি করে। বন্ধ হয় দেশ।

প্রথম লকডাউন ব্যর্থ হয়। এরপর আরও তিন দফায় লকডাউন বাড়ানো হয়। এমনকি চতুর্থ লকডাউনের (১৮-৩১শে মে) পর ১লা জুন থেকে শুরু হয় 'আন-লক'। ততদিনে দেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রুগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই লক্ষ।

২রা মে করোনাভাইরাসের জন্মভূমি চীন তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে ভারত ও চীনের বিতর্কিত সীমা অতিক্রম করে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় প্রবেশ করে। একদিকে ভারতীয় সৈন্য চীনা অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে এগিয়ে যায়, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদের নেশায় বুঁদ ভারতবাসী এগিয়ে আসে চীন বিরোধী প্রতিক্রিয়া নিয়ে। চীনাদ্রব্য বর্জনের ভূত আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে সুবিধাভোগী শ্রেণির কিছু মানুষের মাথায়। তাদেরই একজন আজকের সংলাপের এক চরিত্র চিবিক্ত - চিন বিরোধী ভক্ত।

পেশায় সরকারি চাকুরে (এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরের সন্তান এবং সরকারি চাকুরের স্বামী) চিবিক্ত তার দুই নিকট আত্মীয় - ডেপুটি এবং লালকে (দুজনেই বেকার যুবক) নিয়ে ২রা জুন এক হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলে, নাম রাখে 'ককটেল'। উদ্দেশ্য, চিবিক্তের কথায় - "যেকোনো ধরণের আলোচনা...ফিল্ম, ওয়েব সিরিজ (এটা বিশেষ করে বলার কারণ, চিবিক্ত লকডাউনে ৫৪টি ওয়েব সিরিজ দেখেছে), টেকনোলজি, কোভিড-১৯, পলিটিক্স (খেয়াল রাখবেন), দেশ, প্রেম ইত্যাদি...বই, গল্প, নিজের লেখা এইসবও চলবে।" চিবিক্তের মতে তিনজনের 'ফ্রিকোয়েন্সি ম্যাচ করে বলে' এই গ্রুপটা খোলা হয়েছে। কিন্তু কেউই কল্পনা করতে পারেনি, এমনকি দিন দশেক পেরনোর পরেও, যে গ্রুপটির আয়ু হবে সাকুল্যে ২১ দিন - প্রথম লকডাউনের মেয়াদ। ককটেল গ্রুপ এবং তার সাথে বহুদিনের নিকট আত্মীয়তার অকালমৃত্যুর পেছনে যে বাদানুবাদ ইন্ধন জুগিয়েছে সেগুলোই সংলাপের আকারে এখানে তুলে দেওয়া হল।

বলার অপেক্ষা রাখে না, চরিত্রদের নাম পাল্টে দেওয়া হয়েছে। কেউই কিন্তু জানেনা সে কে - না চিবিক্ত, না ডেপুটি। তবে চিবিক্ত, ডেপুটি এবং লাল - তিনটি প্রতীকী নামই সংলাপের প্রত্যেক পর্বেই নামকরনের সার্থকতার পরিচয় দিয়ে গেছে।

নাম পাল্টানো হলেও কারোরই সংলাপে কোনপ্রকার হেরফের করা হয়নি। তিনজনেরই কথা বলার ধরণ, শব্দের চয়ন আর যতিচিহ্নের অবস্থান অবিকল এক রেখে দেওয়া হয়েছে। কথকের আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সাথে, পাঠক যেন তার বোধ ও রুচির আন্দাজ পেতে পারে সে কথা মাথায় রেখেই, এবং সংলাপটিকে আরও উপভোগ্য করে তোলার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেকারণে, পাঠকদের মাত্রাতিরিক্ত অহেতুক ইংরেজি শব্দ নিজগুণে সহ্য করে নেওয়ার জন্য অনুরোধ রইলো।

সংলাপের সম্পাদক লাল 'মাত্রাতিরিক্ত অহেতুক ইংরেজি শব্দ' ব্যবহারের রুচি রাখে না।

২রা জুন

চিবিক্ত আর ডেপুটির কথোপকথন দিয়ে শুরু হয় গ্রুপের সংলাপ। গ্রুপের নাম 'ককটেল' আগেই বলেছি। তবে নামে নামের সাথে আছে বেশ কিছু ইমোজিও। তাদের মধ্যে একটি হল পতাকা। ভারতের পতাকা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটি ছিল আফ্রিকার একটি দেশ নাইজারের। প্রশ্ন তোলে লাল। ভারতের পতাকার বদলে নাইজারের পতাকা ব্যবহারের কারণ আর কিছুই না, নাইজারের পতাকা অনেকটা ভারতের পতাকার মতোই দেখতে (কেবলমাত্র অশোকচক্রের জায়গায় কমলা রঙে ভরাট একটি বৃত্ত আছে) এবং সেটি চিনতে ভুল করে ফেলে চিবিক্ত। তবে চিবিক্তের ভুল হবে তাই কখনো হয়! স্বাভাবিক উত্তর আসে - 'একচুয়ালি খুঁজে পাইনি।'

আফ্রিকার দেশ নাইজার শুনে (ইংরেজি বানান Niger), ডেপুটির মনে হয় এখান থেকেই বর্ণবিদ্বেষমূলক শব্দ 'নিগার' শব্দটি এসেছে। যদিও ধারণাটি ভুল। লাল শুধরে দেয় যে, নিগ্রোর অপভ্রংশ নিগারের বুৎপত্তি ল্যাটিন শব্দ 'নিগ্রাম' থেকে, যার মানে কালো। এদিকে নাইজার নাম এসেছে নাইজার নদী থেকে, যার আবার বুৎপত্তি স্থানীয় টুয়ারেগ ভাষায় n'eghirren শব্দটি থেকে, যার মানে স্রোতস্বিনী।

পাঠক ভাবতেই পারেন, হঠাৎ করে এমন জ্ঞানগম্যি ভরা কথাবার্তা শুরু হয়ে গেল কেন। স্বয়ং সম্পাদক হয়ে লাল বেশ নিজের ঢাকটা পেটাতে শুরু করেছে দেখছি! আসলে লালের এখানে পাণ্ডিত্যের কিছু নেই। ইন্টারনেট খুঁজে উপরের তথ্যগুলো জানাতে মিনিট পাঁচেকের বেশি লাগবে না। লাল তাই করেছে। লক্ষ্য করার বিষয়টি হল, বাকি দুজনের কাছে সহজলভ্য ইন্টারনেটের অফুরন্ত জোগান থাকলেও, নিজে থেকে সামান্য কিছু তথ্য খুঁজে বের করার বিন্দুমাত্র ফুরসৎ নেই। তাদের, বিশেষকরে চিবিক্তের আসল ফুরসৎ প্রোপাগান্ডায় (প্রচারণা শব্দটি ব্যবহার করে, ব্যাঘ্রকে আর শার্দূল বানালাম না), সে সংলাপ এগোলেই পাঠক বুঝতে পারবেন।

এরপর স্বাভাবিক কারনেই আলোচনা করোনা ভাইরাসের দিকে মোড় নেয়। ইস্রায়েল সহ আরও কয়েকটি দেশে টীকা আবিষ্কারের খবর জানায় চিবিক্ত। এরপর, পুনরায়, ইন্টারনেটে নিজে পরিশ্রম করে খোঁজা এড়িয়ে চিবিক্ত বাকি দুজনের কাছে  পার্ভাটনিমফোম্যানিয়াকসেক্সিহাইপার সেক্সুয়াল' - এই চারটি শব্দের পার্থক্য জানতে চায়। এবং পুনরায়, ডেপুটি ইন্টারনেটের সাহায্য না নিয়েই, নিজের মতে চারটি শব্দের পার্থক্য বুঝিয়ে দেয়। চিবিক্তের ইন্টারনেট খুঁজে কিছু জানতে অরুচি আছে, সে বললে চিবিক্তের প্রতি অবিচার করা হবে। আসলে চিবিক্ত তার ষোলোআনা পরিশ্রম প্রোপাগান্ডায় ব্যয় করতে ইচ্ছুক।

সংলাপের বিজ্ঞাপন দিয়ে, শুরু থেকেই কেবল বর্ণনাই করে যাচ্ছি সেটি খেয়াল আছে। ভূমিকাকে একটু দেরি হয়ে গেল, ঠিকই, তবে এবার শুরু করা যেতে পারে -

চিবিক্ত: ওকে, নাও এই চারটে ওয়ার্ডের মিনিংয়ের মধ্যে প্রপার ডিফারেন্সগুলো কি কেউ বলবে?
পার্ভাট
নিমফোম্যানিয়াক
সেক্সি
হাইপার সেক্সুয়াল।

লাল: এটা ডেপুটি বলবে...ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে। (লাল আর ডেপুটির বয়সের ফারাক বছর দুয়েকের, দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক, তাই রসিকতাটা স্বাভাবিক)

চিবিক্ত: গুগল করেও বলা যাবে। বাট কপি-পেস্ট চলবে না। নিজে বুঝে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলতে হবে।

ডেপুটি: হাইপার সেক্সুয়াল অ্যান্ড নিমফোম্যানিয়াক এটা বায়োলজিক্যালি অ্যান্ড সাইকোলজিক্যালি ডিফারেন্ট দ্যান সেক্সি, অ্যান্ড পার্ভাট। মিনিং ওয়াইস।

চিবিক্ত: ওকে। তারপর?

ডেপুটি: একটু ভেবে বলছি।

চিবিক্ত: ওকে।

ডেপুটি: হাইপার সেক্সুয়াল অ্যান্ড নিমফোম্যানিয়াক এটা অর্গানিক এটা চেঞ্জ করা যাবে না। কিন্তু পার্ভাট, সেক্সি এটা হলো মানুষের স্বভাব। তাই স্বভাব যেমন করা যায়, তাই বদলানো ও যাবে। উকি, ঝুঁকি মারা স্বভাব, সেক্সটুয়াল হেংলামো হলো পার্ভাট। এটা নিমফোম্যানিয়াকদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায় না। হাইপার সেক্সুয়ালদের সেক্সচুয়াল ফ্যান্টাসি খুব হাই হয়, যেমন 'ফিফটি সেডস্‌ অফ গ্রে'তে হিরোটা যেমন।

চিবিক্ত: ওকে, অনেকটা ক্লিয়ার হলো।

ডেপুটি: হয়তো ১০০% ঠিক হয়নি, বাট আমি যা জানি তাই বললাম।

চিবিক্ত: না ঠিক আছে, আমি ঠিকঠাক ডিফারেনশিয়েট করতে পারছিলাম না। এবার অনেকটা পরিষ্কার হল।

এরপর সিনেমা, ফের সিনেমা থেকে ওয়েব সিরিজ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। লাল আলোচনা থেকে দূরেই থাকে।

অবশেষে চিবিক্ত এক প্রস্তাব পেশ করে। লেখালেখির প্রস্তাব।

চিবিক্ত: আমার একটা প্রস্তাব আছে। তিন জনকেই চেষ্টা করতে হবে মান্থলি অ্যাট লিস্ট ১টা নিজের লেখা কিছু গ্রুপে দিতে। সেটা যা খুশি হতে পারে। পদ্য, স্টোরি, প্রবন্ধ, শায়রী, গান, কোনো কিছু নিয়ে প্রতিবেদন এট সেটেরা যা কিছু হতে পারে।

লাল: আমার আপত্তি নেই। তবে আমি তথ্যপূর্ণ লেখা পছন্দ করি - লিখতে পড়তে দুটোই। সেকারণে, আমার লেখা বিরক্তিকর লাগতে পারে।

চিবিক্ত: বাঃ! খুব ভালো। 

(তথ্যপূর্ণ লেখা প্রসঙ্গে) ভালো কথা তো। 

(বিরক্তিকর লাগার প্রসঙ্গে) সেটা বাকি দুজনের কারও মনে হলে জানাতে পারে।

বলে রাখি, যারা হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারে অভ্যস্ত তারা জানবেন নিশ্চয়ই, চ্যাটে অন্যের রিপ্লাইয়ের অপেক্ষা না রেখে পরপর একাধিক ব্লকে মেসেজ পাঠানো যেতে পারে। জবাবে নিদিষ্ট ব্লক-মেসেজকে সিলেক্ট করে নিদিষ্ট রিপ্লাই দেওয়া হয়ে থাকে। এখানে সেরকম নিদিষ্ট রিপ্লাইকে বন্ধনীর মধ্যে 'প্রসঙ্গ' উল্লেখ করে  লেখা হয়েছে।

ডেপুটি: চেষ্টা করবো।

এরপর আরও কিছু সিনেমা নিয়ে আলাপ-আলোচনার পর, আজকের মতো কথোপকথন শেষ হয়। পারিবাকির গ্রুপে পারিবারিক পরিবেশ - এটাই প্রত্যাশিত। তবে পরের দিন শুরুতেই বোমা ফাটায় চিবিক্ত।

(চলবে)

No comments:

Post a Comment