Sunday, 26 July 2020

চিবিক্ত

তিন

জাতীয়তাবাদ একটা শিশুসুলভ ব্যারাম, মনুষ্যজাতির হামরোগের মত। শারীরিক ব্যাধিটি মোকাবিলা করতে পালং শাক আর মিষ্টি কুমড়োর চচ্চড়ি কিংবা বালিশের তলায় নিমপাতাই যথেষ্ট;মানসিক ব্যাধিটির জন্য চাই নারকেল ঝ্যাঁটা - ঝেঁটিয়ে ভূত তাড়ানোর জন্য।

লাল ভেবেছিল (যদিও চাইনি) আগের দিনের তর্কবিতর্কের জল রাতের মধ্যেই শুকিয়ে যাবে,আজ আর গড়াবে না। এমনকি আইনস্টাইনের কথাটির প্রতিক্রিয়ায় চিবিক্তের ফিকে হাসি তারই ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু মিনিট পাঁচেক পরেই আলিবাবা-বাইদুর ব্যাপারে লালের শেষ রাতের মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে  চিবিক্ত তৃতীয় দিনের সংলাপ শুরু করে।

৪ঠা জুন

চিবিক্ত: ইন্ডিয়াতেও হয়তো ভালো অল্টারনেটিভ বেরোবে। ওয়েট করতে হবে। ভরসা রাখতে হবে। গান্ধীজী একবার বিদেশি পণ্য বর্জন নিয়ে আন্দোলন করেছিলেন। তারপর আর কোনোদিন তেমন কোনো বড়ো আন্দোলন হয়েছে বলে জানি না। কিন্তু এই মুহূর্তে বিদেশি পণ্য বর্জনের একটা জোয়ার এসেছে। এটাই হাই টাইম ইন্ডিয়ান ইনভেন্টরদের ওপর বিশ্বাস দেখানোর। অলরেডি কিন্তু জিপিএস-এর অল্টারনেটিভ ন্যাভআইসি লঞ্চ করেছে কোনো কোনো ফোনে। রিভিউ ভালো, যেসব অ্যাপের অল্টারনেটিভ ইন্ডিয়ান অ্যাপগুলো বললাম। বেশ কয়েকটা আমি ইউস করছি, সত্যি ভালো। হ্যাঁ, এটা ঠিক, হার্ডওয়্যারের অল্টারনেটিভ তৈরি হতে টাইম লাগবে। ততদিনে যে যে বিদেশি প্রোডাক্ট হাতে আছে, সেগুলোই ইউস করি। ফেলে তো কেও দিতে বলছে না। মনে রাখিস, এসব কথা আমি বলছি যে নিজেই একসময় প্রায় দশ-এগারো বার দশ-এগারোটা ডিফারেন্ট ডিফারেন্ট আইটেম কাস্টম ডিউটি দিয়েও অনলাইনে অর্ডার করে আনিয়েছি। বাংগুর, আলিবাবা, আলিএক্সপ্রেস, অস্ট্রেলিয়ান কোবো এট সেটরা সাইট থেকে। ইন্ডিয়ান সাইটগুলোতে অ্যাভেলেবল ছিল না বলে।

জ্ঞানপাপী ঢাকি। মগজে মোবাইল না মোবাইলে মগজ, সেটাই প্রশ্ন।

লাল: প্রথমত, গান্ধীজি 'বিদেশি পণ্য বর্জন নিয়ে' কোনোদিনই আন্দোলন' করেননি। তাঁর আন্দোলনের আর পাঁচটি কর্মসূচির মধ্যে সেটি একটি থাকতে পারে, তবুও 'স্বদেশি পণ্য গ্রহণ' এই আদর্শে। দ্বিতীয়ত, যেটি আমাদের তর্কে খাপ খায়,কত সহজেই আমরা সেটির সমর্থনে চলে যায়। আজন্ম গান্ধীজীকে গাল দেওয়া সুভাষপ্রেমী বাঙালির কাছে তাই আজ রবীন্দ্রনাথ ব্রাত্য। তিনি বিলিতি বর্জনকে হীন দৃষ্টিতে দেখতেন, আর স্বদেশীর প্রতি তাঁর যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। 'ঘরে বাইরে' দ্রষ্টব্য।

আর কি দেখে বলছো 'জোয়ার এসেছে'? হ্যাঁ জোয়ার এসেছে মোবাইল সহ ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যায়, তাই তাদের ফেসবুক পোস্ট বা হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে 'বিদেশি পণ্য বর্জনের জোয়ার' আসতে পারে।

ডেপুটি: একদম ঠিক। গ্রাউন্ড লেভেল না সরকার করতে চাইবে, না মানুষ, দুদিনেই এই হুজুগ হাওয়া হবে।

(আইনস্টাইনের উক্তিটির প্রসঙ্গে) ন্যাশানালিজম আমার কাছে খারাপ কিছু না তবে হাইপার-ন্যাশানালিজম, হিটলারের মতো, ওটা খারাপ মনে করি।

লাল: নিজেদের খামতি ঢাকতে অন্যকে থুতু ছিটানো স্বাধীন ভারতের অন্যতম বৈচিত্র। বৈদেশিক নীতির ব্যর্থতা ঢাকতে বাণিজ্যে থুতু। পঙ্গপাল দমনে ব্যর্থ তো পাকিস্তানকে থুতু। এমনকি একসময় (গুগল করে জেনে বলছি) লাল বাহাদুর শাস্ত্রী নাকি ভারতীয়দের একবেলা করে না খেয়ে থাকার 'আবেদন' জানিয়েছিলেন। দেশবাসীর মুখে খাবার তুলে দেওয়ার অক্ষমতা ঢাকতে এরকম ন্যাংটামোর নিদর্শন ইতিহাসে বিরল। যদিও, মোদী আলাদা লেভেলেই খেলছে, ইতিহাস-রেকর্ড একাকার করে কোথায় গিয়ে থামবে তার আলোচনা যদিও এখানে অপ্রাসঙ্গিক।

চিবিক্তের 'চিবি' এবার 'ক্ত'য়ের ভূমিকা নেয়।

চিবিক্ত: আসল কথাটা এতক্ষণে বেরোলো। আসল কথাটা হল মোদী। এবারে এত তর্কের কারণ আমার কাছে ক্লিয়ার হল। বিদ্বেষ এতটাই যে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পর্যন্ত গেছে। সমর্থন আর অসমর্থনের জায়গাটা পরিষ্কার হল।

(জোয়ারে প্রশ্ন তোলার প্রসঙ্গে) একদম ডাহা ভুল কথা এবং ভুল ধারণা। আমার অফিস, আমার পাড়া, আমার খুব কাছের কিছু স্কুল ফ্রেন্ডস্‌ (যাদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়), স্ত্রীর অফিস, মেয়ের স্কুলের প্যারেন্টস্‌। আপাতত এই লকডাউনে সোশ্যাল নেটওয়ার্কের হেল্প ছাড়া আর বেশি বিস্তৃতির প্রয়োজন নেই। এইসব গ্রুপের (হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ নয়) মানুষদের কথা, মতামত জেনেই বলছি।

লাল: সংরক্ষনশীল কোনো এক হিন্দুকে মুসলমান বলে দাও দেখবে সেটিকে সে গালি হিসেবে গ্রহণ করছে এবং তার ফলে রেগেও যাচ্ছে। তর্কে না পারলে বিজেপির চামচাদের সার্টিফিকেট ছিল - 'মুসলমানপ্রেমী', 'মুসলমান তোষণকারী', 'যা নামটা পাল্টে অমুক মহম্মদ রেখে দে' ইত্যাদি, এখন তাদের সংগ্রহশালায় তে নতুন অস্ত্র এসেছে - 'ও তুমি মোদী বিদ্বেষী'। এই শুনে পিছুপা হয়ে পড়াটাই সবচেয়ে বোকামো। হ্যাঁ, তো কি হল আমি মোদীকে ঘৃণা করি, তারপর বল।

(লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পর্যন্ত গেছে প্রসঙ্গে) 'তাসখন্দ ফাইল' থেকে ইতিহাসের নোট নিলে এই হয়। বিজেপির দালাল মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী থেকে শুরু করে বল্লভভাই প্যাটেল সবাই বিজেপিরই লোক। নেহরু আর তার পরিবার খালি কংগ্রেস। বিজেপির কি ব্যাকুলতা দেখো, বাপ নেই তো পাশের বাড়ির কাকুকেই বাবা বলে ডাকবি!

সত্যি এটা সেরা ছিল, বিবেক অগ্নিহোত্রীর চোখে জল চলে আসবে। 'বিদ্বেষ এতটাই যে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পর্যন্ত গেছে'। মানতে হল, বিজেপি ষোলআনা সফল হয়েছে, এই দেখাতে যে, কংগ্রেস শুধু নেহরু আর তার খানদান, আর বাকি সবাই বিজেপি।

(কিছুক্ষণ ভেবে) তাহলে তো বড় চিন্তার বিষয়। হ্যামলিনের বাঁশি ভালোই বাজছে তাহলে কানে।

চিবিক্ত: না ষোলোআনা সফল এখনও হয়নি। পিকচার আভি বাকি হে মেরে দোস্ত।

তবে এটা যে তুই মোদি হেটারস্‌ বলেই কিছুতেই সহজ সরল কথাটা মানতে পারছিস না। নাহলে ইজিলি মাথায় ঢুকে যেত। ভারতীয়রা ভারতীয় পণ্য ইউস করবে অন্য দেশের পণ্যের তুলনায়। এটাই তো ন্যাচারাল। এটা বোঝার, বিশ্বাস করার জন্য রকেট সায়েন্স জানার প্রয়োজন নেই।

লাল: একটা সফল এবং আন্তর্জাতিক স্তরের ষোলোআনা ভারতীয় প্রোডাক্ট যেটি আমি ব্যবহার করি না, কোনোদিন করবোও না - বলিউড সিনেমা । রকেট সায়েন্স?

চিবিক্ত: (গাল লাল ইমোজি ব্যবহার করতে বাধ্য হয়)

লেখালিখির জন্য বাকিদের বলেছিল চিবিক্ত। লাল দেখলো এই সুযোগ। সময় নিয়ে ছোটোখাটো একটা প্রবন্ধ প্রস্তুত করে ফেললো লাল। এই অবসরে ডেপুটির মোদী মিমস চলতে থাকে।

৫ই জুন

লাল: কিছু তথ্যঃ- এক, ভারতে বাজারে যে চীনের পণ্যদ্রব্য আছে তার আর্থিক মূল্য প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার। যদিও, চীনের মোট রপ্তানির মাত্র ৩%। স্পষ্টতই এই ৩% রপ্তানির ক্ষতিতে চীন ভারতের সীমান্ত থেকে সৈন্য সরিয়ে নেবে তা মোটেই মনে হয় না। এবার উল্টো দিকটা বলি। ৭৫ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির বিনিময়ে চীন ১৭ বিলিয়ন ডলারের ভারতীয় দ্রব্য আমদানি করে, যার পরিমান তুলনায় কম হলেও, ভারতের মোট রপ্তানির সেটি ৫.৩%। এখন, ভারতের হুজুগকে কানমলা দিতে চীনও যদি পাল্টা বয়কট শুরু করে তো কি হবে একবার ভাবো।

দুই, মোবাইলকেন্দ্রিক জীবনের চোটে চীনা দ্রব্য মানে দুটো জিনিসই মাথায় ঘোরে - মোবাইল ফোন আর ফোনের অ্যাপ। তাই টিকটক আনইন্সটল করেই ভাবি চীনকে পুরো ধরাশায়ী করে দিলাম। হাজারটার মধ্যে একটি উদাহরণ দিই - আমাদের দেশের বিমানগুলোর মধ্যে অন্যতম হল বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স এবং ৭৪৭ (আমার মতো পাবলিক, যে বাপের জন্মে বিমানবন্দরে পর্যন্ত পা রাখেনি, সেও, অবশ্যই গুগল করে, এই বিমানগুলোকে চেনে)। এই বিমানগুলোর পার্টস্‌, কলকব্জার প্রধান সাপ্লাইয়ার হচ্ছে জিয়ান এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রিয়াল কর্প - একটা চীনা কোম্পানি। স্ট্যাচু অফ ইউনিটি তৈরিতে যে ব্রোঞ্জ ব্যবহার হয়েছে, তা এসেছে চীন থেকে।

আন্দাজে যেকোনো একটা ডিজিট্যাল অ্যাপের নাম নাও দেখবে তার পেছনে কোনো না কোনো চীনা ব্যবসায়ীর টাকা খাটছে। স্টার্ট আপ নিয়ে ভারতীয়দের যে এত উন্মাদনা, এই স্টার্ট আপ এর পেছনেও চীনের টাকা খাটছে।

মজার কথা, যে বাইজুস ওপো কে হটিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট টিমের স্পন্সরসিপ নিয়েছিল এবং যার ফলে এই বয়কটপ্রেমীরা আহ্লাদে আটখানা হয়ে গিয়েছিল, সেই বাইজুস তেও চীনের টাকা খাটছে। গতকাল বলছিলে না হাইক, তাতেও।

তিন, এই ধরণের বয়কট কতটা সফল হয় তারও দৃষ্টান্ত দিই। এই ইরানের উদাহরণ নাও। মাইবাপ আমেরিকা পুরো বিশ্বকে লাল চোখ দেখিয়ে রেখেছে - ইরানের সাথে কোনোপ্রকার আমদানি রপ্তানি চলবে না। তা সত্ত্বেও ইরান, কটি দেশে মাল রপ্তানি করে জানো? ভারতীয় ফুটবল টিমের র‍্যাঙ্কের চেয়েও বেশি - ১২৮।

বিস্তারিত না গিয়ে বলছি, এরকম বয়কটের নমুনা গোটা বিশ্বে প্রচুর আছে। ডেনমার্কের বিরুদ্বে সমস্ত মুসলিম দেশগুলোর বয়কট, জাপানের বিরুদ্ধে খোদ চীনের বয়কট ইত্যাদি। এতে বয়কটকারী দেশগুলোর সাথে ছাড়া, নিজেদের সামগ্রিক বাণিজ্যে কচু ফারাক পড়েছে।

মোদ্দা কথা যে দেশ, নিজের সেনার জন্য একটা বিমান বানাতে পারে না; শ্রমিকদের বিদেশ-বিভূঁইয়ে পাঠিয়ে দেয় কাজ করার জন্য (দিয়ে অক্ষয় কুমার সিনেমা বানায়); এমনকি নিজের তৈরি জিনিসই পছন্দমতো বিক্রি করতে পারেনা, সে দেশে বসে বয়কটের স্বপ্ন দেখা যা, ইউরোপিয়ান কোনো এক ফুটবল লীগের প্রথম না, দ্বিতীয় না, তৃতীয় স্তরের একটা টিমে জায়গা পেয়ে রিজার্ভ বেঞ্চে বসে কাটানো খেলোয়ারের অধিনায়কত্বে ফুটবল বিশ্বকাপ জেতার আশাও তাই।

চিবিক্ত সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে প্রবন্ধটি। সিনেমার দিকে আলোচনার মোড় ঘোরানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা দিয়ে দিনের সংলাপ শেষ হয়।


(চলবে)

No comments:

Post a Comment