পাঁচ
ফেক নিউজ বা ভুয়ো খবরের (যার ভারতে এখন রমরমা বাজার, তার জন্য অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ) ভিত্তি কিন্তু রিয়েল নিউজ অর্থাৎ বাস্তব খবরই। হাওয়ায় ভুয়ো খবর তৈরি করাটা কঠিন কাজ নয়, কিন্তু সেটিকে নতুন সত্য বলে সাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াটা যথেষ্ট কষ্টের। তার চেয়ে প্রচলিত সত্যের অর্ধেকটি চাপা দিয়ে, তার জায়গায় মিথ্যে চাপিয়ে দিলে সেটি সহজেই সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। তার ওপর মিথ্যেটি ব্যক্তিগত রুচি ও প্রত্যাশা মোতাবেক হয় তো সেটি আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। তাই ইন্দিরা গান্ধীর স্বামী স্বাধীনতা সংগ্রামী ফিরোজ জাহাঙ্গীর গান্ধী (গান্ধীভক্ত হওয়ার দরুন পদবীটি মহাত্মা গান্ধীর পদবীর সাথে খাপ খাইয়ে নেন) নামের ব্যক্তিই ছিলেন। এখন পদবীটি পাল্টে খান করে দিলে, এবং সেই খান কিভাবে গান্ধী হয়ে গেল তার পিছনে একটা মনগড়া গল্প জুড়ে প্রচার চালালে সাধারণে সেটাই বেশি বিশ্বাস করবে। তাজমহল যে আসলে শিবের মন্দির তেজো মহালয়া, তার ভুয়ো খবরও অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে গেছে। আর এই ভুয়ো খবর ছড়ানোর সবচেয়ে বড়ো মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ।
ফিরোজ খান থেকে তেজো মহালয়া সমস্তরকম ভুয়ো খবর শেয়ারে সিদ্ধহস্ত চিবিক্ত। পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, 'ভারতবর্ষে মুসলিম ৬০ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে ৮০' - এই ধরণের পরিসংখ্যান হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে দেওয়া একমাত্র মুতু সম্প্রদায়েরই কাজ। ককটেলেও চিবিক্ত মুতু ভুয়ো খবর শেয়ার অব্যাহত রাখে। একদল বিশিষ্ট বাঙালির ছবি দেখিয়ে, যাদের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জগদীশচন্দ্র বসু প্রমুখেরা উপস্থিত, তাদের মধ্যে বিশেষ একজনকে কেসব চন্দ্র নাগ বলে দাবি করে। ব্যক্তিটি আসলে নাগেন্দ্রনাথ নাগ। এনসি নাগকে কেসি নাগ বানিয়ে অঙ্কপ্রেমী বাঙালিদের রগড় করতে ক্ষতি নেই ঠিকই, কিন্তু এভাবেই সত্যকে মিথ্যে করে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় প্রোপ্যাগান্ডা চালাচ্ছে চিবিক্তের দলবল।
১৬ই জুন
আজও যথারীতি শান্ত ককটেল। শেষে বিবাদ বাঁধায় ডেপুটি। আসল অপরাধীটি যদিও লাল। সম্পূর্ণ এক অন্য মাধ্যম টুইটারে অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যায় হতাশ ডেপুটি লেখে, "বলিউড মাদারচোদ থি, মাদারচোদ হে অউর মাদারচোদ রহেগি। অডিয়েন্স ভি চুতিয়া থি, চুতিয়া হে অউর চুতিয়া রহেগি।" লাল সেটি গ্রুপে শেয়ার করে দেয় এবং বক্তব্যটির প্রতি নিজের কূটনৈতিক সমর্থন জানায়। বলিউডপ্রেমী চিবিক্তের এবার ফেটে পড়ার পালা।
লাল: তীব্র শব্দাবলী, তবে একচুলও মাত্রাতিরিক্ত নয়। আমি সহমত, মানুষের সৃষ্টির জঘন্যতম নিদর্শন এই বলিউড।
ডেপুটি: থ্যাঙ্কস।
চিবিক্ত: কত ভালো প্রভাব, তাই না? একেই বলে গুরুমারা বিদ্যা। এই সুন্দর শব্দযুগল তো এই ঘৃণ্য তম বলিউড থেকেই আত্তীকরণ করা।
লাল: সমস্যাটা সেখানেই, নিজের ব্যক্তিগত জীবনধারাকে অন্যদেরও জীবনধারা ভেবে বসলে ভুল ধারণা তো তৈরি হবেই। এই যেমন, আমি যদি বলি, 'যারা পাতা ওল্টাতে জানে না তারা বইয়ের মর্ম বোঝে না' - এটা কত বোকা-বোকা কথা হবে, কারণ কাগজের পাতা না উল্টেও বই পড়া যায়, এটা আর বুঝিয়ে বলতে হবে না।
তুমি হয়তো বলিউড থেকে ওই বিশেষ শব্দদুটো 'আত্তীকরণ' করেছো, কিন্তু বাকিরা তা নাও করতে পারে।
আমি যেমন এই গানটা থেকে 'আত্তীকরণ' করেছি।
এই বলে লাল অ্যান্টিফা ইন্ডিয়া মিউজিকের একটি গান, মোদী মাদারচোদ হে, শেয়ার করে।
১৭ই জুন
চিবিক্ত: এখানেই বোঝা যায় তুই কত বড় হিপোক্রিট। কারণ তুই এবং যার পোস্ট, সে নিজেও এই শব্দগুলো বলিউড থেকেই শিখেছে। যেমন বাংলা বলা শিখেছিস তোর মা, বাবা, পরিবারদের থেকে। আর যেটুকু হিন্দি জানিস, সেটাও বলিউডেরই অবদান।
(অন্যদের নিজের সাথে গুলিয়ে ফেলা প্রসঙ্গে) একদম নয়। তোর ১০০% লাইফ স্টাইল আমার জানা নেই, এটা আশা করি ভুল করেও ভাববি না। কোন অচিন গ্রহের অচিন মানুষ তো তুই নস আর আমি কিছু জাস্ট মনে করে উক্তি করছিনা, সিওর হয়ে করছি।
লাল: এখন জোর করলে আমি কি করতে পারি। আমি হিন্দি প্রাইমারি স্কুলে আর হিন্দি খবর শুনে শিখেছি। এখন ডুয়োলিংগো তে শিখছি, কিছুদিন পর বই পড়তে শুরু করবো ভাবছি। তাও যদি জোর জবরদস্তি বলো না বলিউড শিখিয়েছে, তাহলে আর কি বলবো? তাই তাহলে।
আর আমরা বলিউডকে বলছি, বলিউডপ্রেমীদের বলছি থোড়াই।
শেষবারের মতো কথোপকথনের দিক সিনেমা ইত্যাদির দিকে ঘোরানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে চিবিক্ত। কিন্তু লাল এখন লাগামছাড়া।
১৮ই জুন
চিবিক্ত চুপ হয়ে গেলেও, লাল তার আক্রমণ চালু রাখে। আসানসোলে বিজেপি সমর্থকরা চীনের রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তাঁর কুশপুতুল পোড়ায়। কিন্তু উপস্থিত এক ভক্ত রাষ্ট্রপতি শি জিন্পিংয়ের বদলে উত্তর কোরিয়ার প্রধান কিম জং উনের নাম নিয়ে ভাষণ দিতে থাকে। সেই খবর দেখিয়ে চিবিক্তকে রাগানোর চেষ্টা করে লাল।
লাল: গত পাঁচ বছরে বিজেপি 'গর্বিত ভারতীয়' থাকার সাধ আগাগোড়াই ঘুচিয়ে দিয়েছে, এখন 'গর্বিত বাঙালির' পাতেও দেখছি থাবা বসবে।
ক্ত কে ছেড়ে লাল এবার চিবিকে পাকড়াও করে।
সকালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিজেপির রামদাস আঠওলে দেশের সমস্ত হোটেল রেস্টুরেন্টকে চাইনিজ খাবার বয়কট করতে বলেছেন। কাল যদি এই উন্মাদনার বসে উত্তর-পূর্ব ভারতের কোনো অধিবাসীর দোকান বা সম্পত্তির ক্ষতি হয় তাহলে তার দায় 'বয়কট চায়না'র সকলপ্রকার সমর্থকদের সমানভাবে ভাগ করে নিতে হবে।
ফের বলিউডকে নিয়ে বাঁকা মন্তব্য করে লাল। আজ যেন শেষ দেখেই ছাড়বে। মনে হচ্ছে যেন শরীর থেকে ভূত নয়, ভূত থেকে শরীরকে ভাগানোর চেষ্টায় মরিয়া লাল। একটার পর একটা যাচ্ছেতাই মোদী এবং বিজেপি বিরোধী খবর, মিমস, ভিডিও ইত্যাদি শেয়ার করতে থাকে সে। ঠিক ততটাই নৈপুণ্যের সাথে সকলপ্রকার উস্কানিকে অবজ্ঞাভরে এড়িয়ে যায় চিবিক্ত। পাল্টা নিজের, নিজের মেয়ের ছবি দেখিয়ে আবেগকে কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রয়াস করে। তাতেও জল ঢেলে দেয় লাল। চিবিক্ত আর এরকমভাবে কতক্ষণ চুপ করে থাকতে পারে? কিন্তু লালেরইবা এরকম একগুঁয়ে নাছোড়বান্দা মানসিকতার কারণ কি হতে পারে? দুদিন পরেই তা পরিষ্কার হবে।
(চলবে)
No comments:
Post a Comment