এক দুই তিন চার...
দ্বিঘাত সমীকরণ - বললেই একজনের নাম মুখে চলে আসে । শ্রীধর আচার্য । তিনিই একমাত্র ভারতীয় ম্যাথামেটিশিয়ান যার নাম স্কুলের অঙ্ক বইয়ে বাঘা বাঘা পণ্ডিতদের সাথে উচ্চারিত হয়েছে । থ্যালাস, পীথাগোরাস, ইউক্লিড পড়তে পড়তে গর্ব করে বলি আমাদের শ্রীধর আচার্যও আছেন । এখানে আরও একটু গর্ব যোগ করে দিই । তিনি যে গ্রামে জন্মেছিলেন সেই গ্রামের নাম ছিল ভুরিশ্রেষ্ঠী, যার এখনকার নাম ভুরশুট, আর এই ভুরশুট ভারতবর্ষের যে জেলায় অবস্থিত সেই জেলাটির নাম হল হুগলী । বাঁকুড়ার পূর্বদিক ঘেঁষে পশ্চিমবঙ্গের যে জেলাটি আছে সেটি - হুগলী । ও হরি, সেই হিসেবে শ্রীধর আচার্য বাঙালিও হচ্ছেন !
যখন প্রসঙ্গ এল, তখন বলে রাখি, এই ভুরশুট গ্রামে আরও একজন মহান লোক জন্মেছিলেন । তিনি ছিলেন কবি । এবং তাঁর কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়ে তখনকার নদীয়ার রাজা বিখ্যাত কৃষ্ণচন্দ্র রায়, যার নামে কৃষ্ণনগরের নাম, তাঁকে রায়গুণাকর উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন । কে ছিল সেই কবি ?
যাই হোক, শ্রীধর আচার্যে ফিরে আসি । গীতার 'ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্' অথবা ঈশোপনিষদের, এই যেমন, 'তেন ত্যক্তেন ভূঞ্জীথা। মা গৃধঃ কস্যস্বিদ ধনম' ইত্যাদি শ্লোকের চেয়েও পপুলার কিছু যদি মানুষের, খাস করে স্কুলের ছেলেমেয়েদের মুখে মুখে ঘোরে তাহলে সেটি হল - মাইনাস বি, প্লাস মাইনাস রুট বি স্কোয়ার মাইনাস ফোর এ সি, বাই টু এ । শ্রীধর আচার্যের সূত্র - দ্বিঘাত সমীকরণের বীজ বের করার সূত্র । কিন্তু দ্বিঘাত সমীকরণের বীজ কি করে বের করা যেতে পারে, তার একটা আইডিয়া কিন্তু অনেক আগে থেকেই ভারতীয় ম্যাথামেটিশিয়ানদের ছিল । আর্যভট্ট, ওই যে শূন্য আবিষ্কারের পেটেন্ট বা মালিকানা যার কাছে আছে তিনি, দ্বিঘাত সমীকরণ নিয়ে আঁক কষাকষি করেছিলেন ; বিশেষ সফল হননি । শূন্য আবিষ্কারের আরেকজন দাবিদার - ব্রহ্মগুপ্তও ফর্মুলা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন । কিন্তু আলটিমেটলি সফল হয়েছিলেন কেবলমাত্র শ্রীধর ।
শূন্য আবিষ্কারের পেটেন্ট - এরকম কথা কেন বলছি, তাই তো ? ব্যাপারটা বলি । কোন কিছু কে আবিষ্কার করলো, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ - আবিষ্কার করা জিনিসটিকে কে মানুষের কাছে পৌঁছে দিল বা ভবিষ্যতে সেটি কাজে আসতে পারে তার ব্যবস্থা করে গেল । ধরা যাক সম্রাট অশোক তাঁর কোন এক শিলালিপিতে, 'কলিঙ্গ জয় করার পর আর কয়টি যুদ্ধ লড়েছিলেন' তার উত্তরে, একটা বড়ো গোল্লা খোদাই করিয়ে যদি রাখতেন তাহলে কি জেমস প্রিন্সেপ লাফিয়ে বেড়াতেন - আরে ভাই দেবনাম প্রিয় প্রিয়দর্শী অশোকই শূন্য আবিষ্কার করেছিলেন ! সিরিয়াসলি বললে, এই মৌর্য যুগেরই একজন গণিতজ্ঞ, নাম পিঙ্গল, তাঁর লেখা অঙ্ক বইয়ে সংস্কৃত 'শূন্য' শব্দটি ব্যবহার করেছেন ; বাইনারি নম্বর - 0 আর 1 - বোঝাতে । কিন্তু যেহেতু, আর্যভট্ট বা ব্রহ্মগুপ্ত শূন্যকে একজন সংখ্যার সম্মান দিলেন, শুধু তাই নয় আর পাঁচটা সংখ্যা নিয়ে যা যা করা যায়, যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ, সেগুলোও শূন্যকে নিয়েও করলেন, তাই আর কি তাঁদের নামডাকটাই একটু বেশি ।
এই পিঙ্গল, ইনার একজন ভাইও ছিল । অনেকেরই থাকে ! তবে এই ভাইটির বেশ নামডাক হয়েছিল । ছিলেন সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ । নাম পাণিনি ।
'The mind is not a vessel to be filled, but a fire to be kindled.' - প্রথম সহস্রাব্দের শুরুতেই এটি টের পান গ্রীক ঐতিহাসিক প্লুতার্ক । অন্যভাবে বললে, একটি প্রশ্নের উত্তর অন্য একটি প্রশ্নের জন্ম দেয় । সে দর্শন হোক কিংবা অঙ্ক ।
দ্বিঘাত সমীকরণের হইচইয়ের সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে - ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধানের সূত্রও কি তাহলে বের করা যাবে ? সেটি পেলে পরে আরেক ঘাত বাড়াবো । এভাবে চলতে থাকবে । যদিও একঘাত সমীকরণ নিয়ে কেও মাথা ব্যথা দেখাননি ।

সমীকরণের বীজ নির্ণয় করতে বিশেষ কোনো পরিশ্রমের প্রয়োজন নেই । এই সমীকরণের একটি মাত্র বীজ এবং সেটি হল

।
কিন্তু ত্রিঘাত সমীকরণের ক্ষেত্রে কি হবে ? শ্রীধর আচার্যের সূত্র তো খালি দ্বিঘাতে খাটে । আর ত্রিঘাতের জন্য এমন সূত্র চাই যেটি তিন তিনটি বীজ দেবে । কারণ, আমরা জানি, যে সমীকরণের যত ঘাত তার তত সংখ্যক বীজ ।
সময়কালে আসা যাক । শ্রীধর আচার্য 800-900 খ্রিস্টাব্দের লোক ছিলেন । এরপর ভারত তথা পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক ঘটনা ঘটে । পরিবর্তন আসে । সারা বিশ্বের শিল্প-সংস্কৃতি-বিজ্ঞানের কেন্দ্র ইউরোপে শিফট করে যায় । ডাইরেক্ট 1400-1500 শতাব্দীতে চলে আয় । ইউরোপ । নবজাগরণের যুগ । একদিকে লিওনার্দো অন্যদিকে রাফায়েল, এখানে শেকসপিয়র তো ওখানে মেকিয়াভেলি - এক এক ক্ষেত্রে এক এক পণ্ডিত চারিদিক আলো করে বসে আছেন । রেনেসাঁর হাওয়া অঙ্ক আর বিজ্ঞানকেও ছাড়েনি । গ্যালিলিও, কোপারনিকাস, ডে-কার্তে (যার দাক্ষিণ্যে স্থানাঙ্ক জ্যামিতির জন্ম হয়েছিল) সহ কতশত হোমরাচোমরা নাম তো এই সময়েই উঠে এসেছিল । এমনকি এইসব মহান মনীষীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই নিউটন, অয়লার, গাউস, পাস্কেল, ডালটন, অ্যাভোগাড্রো, ডি ক্যান্ডোল, ল্যামার্ক প্রমুখেরা বাজার গরম করে তোলেন । সবাই সুপারস্টার । এঁরাই সবসময় লাইমলাইটে থেকেছেন । যখনই অঙ্ক বা বিজ্ঞানের হিরোদের কথা স্মরণ করা হয়েছে তখন এদের নামই আগে এসেছে । কিন্তু এই হিরোদের আড়ালে অনেক সাইড-হিরোও কাজ করে গেছেন, আমাদের অঙ্ক আর বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, হিরোদের হিরোগিরিকে রীতিমতো আসান করে এসেছেন । এরকমই কয়েকজন সাইডকিক (ব্যাপক অর্থে সাইডকিক, কিন্তু নিজের নিজের কাজে হিরোর চেয়ে কিছু কম নয়) অবশেষে, প্রায় 600 বছর অপেক্ষার পর, ত্রিঘাত সমীকরণ এবং সাথে সাথে চতুর্থ-ঘাত সমীকরণের বীজ বের করার সূত্র দিয়ে বসেন । তাঁদেরই কথা বলবো ।
চলে আসা যাক 1535 সালে, ইতালিতে । ভারতে তখন মোগল সম্রাট হুমায়ুনের রাজত্ব চলছে । ওদিকে তিনি গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহের সাথে যুদ্ধ করতে ব্যস্ত, এদিকে ইতালির বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে আয়োজিত হতে চলেছে ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধান করার কম্পিটিশন । কম্পিটিশনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা মাত্র দুই - এন্টোনিও মারিয়া ডেল ফিওর এবং নিকোলো ফন্টানা । একে অপরকে ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধান করতে দেবে, গুনে গুনে ঠিক 30টি, যে বেশি পারবে সে জিতবে - সহজ নিয়ম ।
কম্পিটিশন শুরু হওয়ার আগে কিছু কথা বলে রাখি । দ্বিঘাত সমীকরণের মতো ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধানের ক্ষেত্রেও নাচানাচি অনেক আগে থেকেই শুরু হয় । অনেক ম্যাথামেটিশিয়ানই সময় অসময়ে ত্রিঘাত সমীকরণ নিয়ে উঠে পড়ে লাগেন । বলাই বাহুল্য বেশিরভাগই ব্যর্থ হন । অবশেষে এই ইতালির বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন ম্যাথামেটিশিয়ান এক বিশেষ ধরণের ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধানের নিয়ম বের করতে সক্ষম হন । 'বিশেষ ধরণের' কেন বললাম তাই তো ? কারণ, ত্রিঘাত সমীকরণের সাধারণ যে রূপ,

-এর প্রথমেই সমাধান বের করা বেশ কষ্টকর ছিল । তাই ম্যাথামেটিশিয়ানরা সমীকরণটিকে বিশেষ বিশেষ রূপে ভাগ করে ফের সমাধান বের করার চেষ্টা করতেন । দ্বিঘাত সমীকরণের সাথে তুলনা করলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে ।

– এটা দ্বিঘাত সমীকরণের সাধারণ রূপ । কিন্তু সব দ্বিঘাত সমীকরণই তো আর এই আকারের হয় না । কিছু

এই আকারেরও হয়, আবার কিছু

এই আকারেরও হয় ।

এর কথা না হয় ছেড়েই দিলাম । ঠিক একই ভাবে ত্রিঘাত সমীকরণগুলির মধ্যে কিছু কিছু

আকারের, আবার কিছু

এই আকারের । যাই হোক সেগুলো নিয়ে আর মাথায় গণ্ডগোল পাকিয়ে লাভ নেই । অবশেষে বোলোগনার যে ম্যাথামেটিশিয়ান ‘এক বিশেষ ধরণের ত্রিঘাত সমাধানের নিয়ম বের করতে সক্ষম হলেন’ তার নাম স্পিওনে ডেল ফেরো । বিশেষ ধরণেরই হোক – বের তো করেছেন । এই ডেল ফেরোরই ছাত্র হচ্ছে এন্টোনিও মারিয়া ডেল ফিওর । তিনিও বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র । গুরুর কাছে ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান শিখে বসে আছেন । তো একদিন হঠাৎ কোথা থেকে এক চালচুলোহীন তোতলা তাকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বসেন – আমিও জানি ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধান করতে ! এই তোতলার নামই নিকোলো ফন্টানা । দুঃখের বিষয় তার তোতলামির জন্য তাকে সবাই টার্টাগ্লিয়া বলেই ডাকে ।
এই হল গিয়ে কম্পিটিশনের পটভূমি । সবাই ভেবেছিল লড়াইটা ডেভিড বনাম গোলিয়াথ হতে চলেছে – এবং হয়েছিলও তাই । বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তার ওপর গুরুদেব ডেল ফেরোর কাছে তালিম পাওয়া সত্ত্বেও এন্টোনিও ফিওর টার্টাগ্লিয়ার দেওয়া সবকটি ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধান করতে পারেননি । অন্যদিকে কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা একলব্য – যার না ছিল কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী, না ছিল কোনো গুরুদেবের আশীর্বাদ – টার্টাগ্লিয়া মাত্র ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই ফিওরের দেওয়া সবকটি সমীকরণ সমাধান করে দেন । বোঝাই যাচ্ছে, টার্টাগ্লিয়া সব ধরণের ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধানের সাধারণ নিয়ম বের করতে সফল হয়েছিলেন । যাই হোক সেদিন কম্পিটিশনের পুরষ্কার টার্টাগ্লিয়া ফেরত দিয়ে দিয়েছিলেন । সম্মানটাই তার কাছে যথেষ্ট ছিল ।
কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়, বরঞ্চ শুরু । এবার মাঠে নামেন এমন একজন, যাকে ম্যাথামেটিশিয়ান পরে, জুয়াড়ি আগে বলা উচিৎ । যদিও তাতে তাঁকে অসম্মান করাই হচ্ছে । কারণ গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, জীববিদ্যা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জ্যোতিষবিদ্যা ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদির চর্চা থেকে সময় বেঁচে গেলে পরে তিনি জুয়াবিদ্যা চর্চা করতেন । এই ধরণের সবজান্তা লোকেদের বলা হয় পলিম্যাথ । ম্যাথ অর্থাৎ অঙ্ক কিন্তু পিছু ছাড়ছে না ! যাই হোক এই গুণধর মহাশয়ের নাম জিরোলামো কার্দানো (অনেকের কাছে জেরোম কার্দান) । আর ইনিই ত্রিঘাত সমীকরণের শ্রীধর আচার্য, মানে, স্কুল কলেজের বইয়ে ইনার নামের সুত্রেই ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান বের করা হয় । তবে টার্টাগ্লিয়ার কি হল ? সেটাই বলবো ।
কার্দানো যে পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই । তার লেখা বই আর্স ম্যাগনা (ইংরেজি তর্জমা করলে হয় ‘The Great Art’)-কে বীজগণিতের অন্যতম সেরা বই হিসেবে এবং খোদ তাঁকে ইউরোপের নবজাগরণের শ্রেষ্ঠ প্রভাবশালী ম্যাথামেটিশিয়ান হিসেবে মান্য করা হয় । অঙ্ক, বিজ্ঞান সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে তার অবদানের লিস্ট তৈরি করতে বসলে এখানে আর শেষ করা যাবে না । সম্ভাবনা তত্ত্ব থেকে হাই স্পিড প্রিন্টিং প্রেস তৈরির পেছনে তাঁর অবদান আছে । যতই হোক, তিনি স্বভাবে ছিলেন এক নম্বরের খচ্চর । জুয়োয় হেরে হেরে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিলেন । শেষে ঠিক করলেন বই লিখবেন, তাতে যদি দু’পয়সা আয় হয় । এরকম একদিন কার্দানোর কানে ফিওর বনাম ফন্টানার কম্পিটিশনের খবর এসে পৌঁছল । তিনি রীতিমতো অবাক হলেন । ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান যে কেও বের করতে পারবে, ব্যাপারটি তিনি সহজে মেনে নিতে পারছিলেন না । কারণ তিনি এতদিন জেনে এসেছেন ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান সম্ভব নয় । ইতালির জনৈক ম্যাথামেটিশিয়ান লুকা প্যাসিওলি, তার লেখা বই সুমা দি অ্যারেথমেটিকা, জিওমেট্রিকা, প্রোপোরসিওনি এট্ প্রোপোরসিওনালিটা (ইংরেজি হরফে ‘Summary of arithmetic, geometry, proportions and proportionality’)তে এই দাবি করেছেন । প্যাসিওলি সে বিষয়ে কোনো খাঁটি প্রমাণ দিয়েছিলেন কি না সে জানা নেই, তবে কার্দানো তার বক্তব্য কেন মেনে নিয়েছিলেন, তার একটা ধারণা করা যায় । যতই হোক বড়ো মানুষের সহকর্মী যখন বলছেন তখন ঠিকই বলবেন – এটাই হয়তো ভেবেছিলেন কার্দানো । এই বড়ো মানুষটি ছিলেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ।
কিন্তু টার্টাগ্লিয়ার ‘অসম্ভবকে সম্ভব করার’ খবর পাওয়ার পর, কার্দানোর আগ্রহ তৈরি হয় । তিনি সরাসরি টার্টাগ্লিয়ার কাছে ছুটে যান, জানতে, ভাই কি করে করলে ? একটা গোপন কথা বলি, টার্টাগ্লিয়ার কাছে যাওয়ার আগে, কার্দানোও খাতা কলম নিয়ে বসেছিলেন, নিজে কিছু যদি বের করতে পারেন, এই ভেবে । পারেন নি । তাই টার্টাগ্লিয়ার কাছে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন । টার্টাগ্লিয়া কার্দানোর অনুরোধ রাখতে নারাজ । কার্দানো টোপ দিলেন । বললেন, আমি একটা বই বের করতে চলেছি, তাতে ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধাণের ওপর আমার গবেষণার বিস্তারিত উল্লেখ আছে (ষোলোআনা ঢপ), তাতে তুমি যদি তোমার সূত্র অ্যাড করতে চাও, আমার কোনো আপত্তি হবে না । তবে রে ! আমার সূত্র যদি লোককে জানাতে হয় তবে নিজেই নিজের বই বের করবো – এই ছিল টার্টাগ্লিয়ার স্বাভাবিক উত্তর । কার্দানোকে তিনি সূত্র বলতে যাবে কোন দুঃখে ? এমনকি শেষমেশ কার্দানো এও প্রতিশ্রুতি দেন, আচ্ছা ঠিক আছে আমার বইয়ে ছাপাবো না, কিন্তু কি করে সমাধান করলে সেটুকু তো বলো । টার্টাগ্লিয়া তাতেও রাজি হলেন না ।
ব্যর্থ কার্দানো এবার তার খচ্চরপনা শুরু করলেন । সোজা পথে কাম হাসিল না হওয়ায় ছল-চাতুরীর শরণাপন্ন হলেন । প্রথমে টার্টাগ্লিয়ার সমালোচনা শুরু করলেন - পরিষ্কার ভাষায় যাকে বলে পেছনে লাগা ! কার্দানোও টার্টাগ্লিয়াকে ওপেন চ্যালেঞ্জ দিতে শুরু করলেন, ঠিক যেমনটি টার্টাগ্লিয়া করেছিল ফিয়োরর বিরুদ্ধে । তাতেও কিছু কাজ হল না । এবার টার্টাগ্লিয়ার ওপর সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন, কঠোর নয়, নরম উপায়ে । ইতালির মিলান শহরের তৎকালীন গভর্নর আলফনসো ডি’অ্যাভালস ছিলেন কার্দানোর বন্ধু এবং পৃষ্টপোষক । তার কাছে কার্দানো টার্টাগ্লিয়ার বিদ্যাবুদ্ধির খুব প্রশংসা করলেন এবং সেটি চিঠি মারফৎ টার্টাগ্লিয়াকেও জানালেন – এই যেমন, মিলানের গভর্নরকে তোমার কথা বলছিলাম, জানো, তিনি খুব ইমপ্রেসড হলেন তোমার কথা শুনে...ইত্যাদি ইত্যাদি । কার্দানোর টোপ এইবার গিলে নেন টার্টাগ্লিয়া । বেচারার কি দোষ ? সরস্বতী সহায় হলেও লক্ষ্মীর কৃপা কখনই পাননি তিনি । ইন্সটিটিউশনাল ব্যাকিং যাকে বলে, তার ছিল না । মামুলি একটা স্কুলে পড়াতেন । অবসরে টিউশনি । ঘরে বউ-বাচ্চা । টার্টাগ্লিয়া ভাবলেন, মিলানের মতো বড়ো শহরের গভর্নরের যদি কৃপাদৃষ্টি মেলে, তবে এই ছন্নছাড়া জীবন পিছনে ফেলে সম্মানের এবং অবশ্যই মোটা মাইনের একটা চাকরি জোগাড় করা অসম্ভব হবে না । যেমন ভাবনা তেমন কাজ । ভেনিস ছেড়ে টার্টাগ্লিয়া মিলানের পথে রওনা হলেন । কার্দানোর সাথে দেখা হল । কার্দানো দুঃখের সাথে জানালেন, গভর্নর তো শহরের বাইরে, কবে ফিরবেন বলে যাননি । টার্টাগ্লিয়া হতাশ হলেন । কার্দানো কিন্তু অতিথি সৎকারে কোনো ত্রুটি রাখলেন না । টার্টাগ্লিয়ার যথেষ্ট খাতির যত্ন করার পর সুযোগ বুঝে ত্রিঘাত সমীকরণের প্রসঙ্গ তুললেন । টার্টাগ্লিয়া কার্দানোর চালাকি বুঝতে পারেন । এই ছিল তার মনে ! তখনও টার্টাগ্লিয়া সূত্র জানাতে নারাজ । অনেকক্ষণ টানাপড়েনের পর রীতিমতো তিতিবিরক্ত হয়ে টার্টাগ্লিয়া তার সূত্র কার্দানোকে জানাতে বাধ্য হন । শর্ত রাখেন – এক, বইয়ে ছাপানো যাবে না এবং দুই, তিনি সহজ ভাষায় সূত্রটি বলবেন না । তার পরিবর্তে ধাঁধা বা হেয়ালি বা ইংরেজিতে যাকে বলে কোডেড ল্যাঙ্গুয়েজে এবং কবিতার আকারে সূত্রটি কার্দানোকে জানিয়ে আসেন । পঁচিশ লাইনের ইতালীয় সেই কবিতাটিই ছিল সব ধরণের ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধানের মূলমন্ত্র ।
সংশয় এবং হতাশা নিয়ে টার্টাগ্লিয়া বাড়ি ফিরে এলেন । পরের বছর কার্দানোর দুটো বই পাবলিশড হল । টার্টাগ্লিয়া বই দুটি হাতে পাওয়া মাত্রই তন্ন তন্ন করে খুঁজতে শুরু করলেন, তার সূত্র কার্দানো ছাপিয়েছে কি না । না ছাপায়নি । কার্দানো তাহলে কথা রেখেছে । সে ততটাও খচ্চর নয় । বলে রাখি দুটি বইয়ের একটিরও নাম কিন্তু আর্স ম্যাগনা ছিল না । তাহলে আর্স ম্যাগনা কার্দানো বের করবে কবে ? সন্দেহের বিষয় !
মাঠে এবার আরেকজন নামলেন, নাম লোডোভিকো ফেরারি । ইনি ছিলেন কার্দানোর ছাত্র, নিন্দুকেরা বলে চাকর । কার্দানোর তত্ত্বাবধানে ফেরারি অঙ্ক শিখছিলেন । কার্দানোর দাক্ষিণ্যে টার্টাগ্লিয়ার ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধানের সূত্র শিখে ফেলেন তিনি । গুরু-শিষ্য প্রায়ই একসাথে বসে টার্টাগ্লিয়ার সূত্র সব ধরণের ত্রিঘাত সমীকরণের সমাধান বের করতে পারছে কি না চেক করতেন । এমনকি সে সূত্র ব্যবহার করে যেকোনো ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধান করা যাবে, প্রমাণ করারও চেষ্টা করতেন । তখনই ফেরারির খেয়াল হয়, আচ্ছা টার্টাগ্লিয়ার সূত্র কাজে লাগিয়ে ত্রিঘাতের পরবর্তী চতুর্ঘাত সমীকরণের সমাধান সূত্র বের করার চেষ্টা করলে কেমন হয় ? কার্দানো বিশেষ আগ্রহ না দেখালেও, ফেরারি কিন্তু চতুর্ঘাত সমীকরণ সমাধান করতে উঠেপড়ে লাগেন । এবং সফলও হন । ভাবা যায় !
মাঝে কার্দানো ফেরারিকে নিয়ে বোলোগনা ঘুরতে গিয়েছিলেন । সেখানে গিয়ে জানতে পারেন যতই টার্টাগ্লিয়া ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধানের সার্বজনীন উপায় ঠাওরে থাকুক না কেন, প্রথম তো স্পিওনে ডেল ফেরোই বের করেছিলেন কি করে সমাধান করতে হয়, তা সে বিশেষ একধরনের ত্রিঘাত সমীকরণই হোক না কেন । অর্থাৎ কপিরাইটের ভাগীদার যদি কেও হয় তবে সে ডেল ফেরোই হবেন । এই তথ্য কার্দানোর কাছে উস্কানির মতো কাজ করে । একদিকে দেখলেন টার্টাগ্লিয়া তার সূত্র নিয়ে কোনো বই এখনও পর্যন্ত বের করেনি, অন্যদিকে ফেরারি আবার চতুর্ঘাত সমীকরণ সমাধানের নিয়ম বের করে দিয়েছে – দুটোই যদি এক বইয়ে ছাপানো যায় তবে বিক্রির ছয়লাপ হয়ে যাবে । কার্দানো আর অপেক্ষা করলেন না, টার্টাগ্লিয়াকে জানানোরও প্রয়োজন মনে করলেন না । ছাপিয়ে দিলেন তার বিখ্যাত বই – আর্টিস ম্যাগনি, সিভ দি রেগুলিস অ্যালজেব্রিসিস লিবের উনাস সংক্ষেপে আর্স ম্যাগনা । তাতে অবশ্য ডেল ফেরো, টার্টাগ্লিয়া, ফেরারি সকলের অবদানের কথা উল্লেখ করলেন বটে কিন্তু বই তো কার্দানোর নামে । তাই বইয়ের বিষয়বস্তুও তাঁর নামেই চলবে । তার নামেই সব সূত্র স্কুলে কলেজে পড়া হবে ।
এরপরেও ঘটনার চাপানউতোর চলতে থাকে । কিন্তু সেগুলো বলে আর ঘুম পারিয়ে লাভ নেই । যেমন, টার্টাগ্লিয়া জানতে পেরে রীতিমতো ক্ষেপে যান । কার্দানোকে আক্রমণ করে তিনিও একখানি বই লেখেন । তাতে বিশেষ কিছু পার্থক্য হয়নি । অনেকদিন ধরে টার্টাগ্লিয়া তার প্রতিবাদ চালিয়ে গিয়েছিলেন । এমনকি ফেরারি কার্দানোর হয়ে টার্টাগ্লিয়ার সাথে লড়াইয়ে নামেন । ফের সেই চ্যালেঞ্জ । এইবার টার্টাগ্লিয়া ব্যর্থ হন । ফেরারি বুঝিয়ে দেন, ম্যাথামেটিশিয়ানদের মধ্যে তিনিও একজন কেউকেটা । তার জন্য কার্দানোও তাকে আড়াল করার সাহস দেখাননি । ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধানের কৃতিত্ব নিজের নামে নিলেও, চতুর্ঘাত সমীকরণ সমাধানের মালিকানা ফেরারির হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন । টার্টাগ্লিয়া শেষ জীবনে একটা সম্মানের চাকরি পেয়েছিলেন বইকি, কিন্তু ফেরারির কাছে হারের ফলে সেখানেও অমর্যাদার আঁচড় পড়ে ।
টার্টাগ্লিয়াকে যে কেও মনে রাখেনি, এরকম কিন্তু নয় । ইউক্লিডের লেখা বই ‘এলিমেন্ট’, আর্কিমিডিসের অনেক লেখাপত্র তিনি ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেন টার্টাগ্লিয়া । তার লেখা নোভা সিন্টিয়া বইয়ে ক্ষেপণাস্ত্র (কামান যাকে বলিস) তৈরিতে অঙ্ককে কাজে লাগানোর উল্লেখ আছে । এমনকি অনেক জায়গায় ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধান করার নিয়ম কেবলমাত্র ‘কার্দানোর নিয়ম’ বা ‘কার্দানের নিয়ম’ না বলে ‘কার্দানো-টার্টাগ্লিয়ার নিয়ম’ও বলা হয় । কিন্তু তবুও খেদ থেকেই গিয়েছিল টার্টাগ্লিয়ার । আমৃত্যু সেটি বহন করেছিলেন তিনি, তার সাথে সাধের দারিদ্রও । টার্টাগ্লিয়ার জন্মস্থান ব্রাসিয়ায় গেলে, স্থানীয় সান্টা মারিয়া চার্চের চত্বরে মার্বেলের তৈরি তাঁর এক মূর্তি দেখতে পাওয়া যাবে । পাথরের বেদির ওপর বসে আছেন টার্টাগ্লিয়া । বাঁহাত কোলে ফেলে রেখেছেন । আর ডান হাতে কম্পাস দিয়ে কি সব আঁকিবুঁকি করছেন । এরকমভাবেই যুগে যুগে অঙ্ক করে যাবেন তিনি, সম্মান বা স্বীকৃতি কে দিল বা না দিল বয়েই গেল তাতে ।