Wednesday, 30 August 2017

২০১৭, ২৫ আগস্ট

কি পাঁচকুলা কি সোফিয়ান ! কামিম্পং থেকে পেরাম্বুর !

আমার এক আওয়ারা আশিক কমরেড বন্ধু এক সময় বলেছিল, একবার কাশ্মীরের মানুষগুলোর দিকে চেয়ে দেখতে । কি অসহ্য তকলিফে তাদের দিন গুজরান হয় । সহ্যের সীমা না ছাড়ালে কি তারা রাস্তায় নামে !

তাই আজ কি জানি হঠাৎ খেয়াল হল, নাকি আওয়ারা আশিক কমরেড বন্ধুকে মনে পড়ল, তাই কাশ্মীরের ছবিগুলো দেখছিলাম । মানুষজন রাস্তায় নেমে এসেছে । প্রতিরোধে পুলিশ-সেনা-স্পেশাল ফোর্স । একপক্ষ পাথর ছুঁড়ছে, অপরপক্ষ কাঁদানে গ্যাস । যাতা কাণ্ড !

পরে জানলাম, ছিঃ ছিঃ, দেখুন আমিও কত মূর্খ, সেই ছবিগুলো আদৌ কাশ্মীরের নয় । কোন একজন গুরমিত রাম রহিম সিংহের সাজা হওয়ায় প্রতিবাদে তার অনুগামীরা পঞ্জাব হরিয়ানার বিভিন্ন শহরে হিংস্র বর্বরতায় নেমে এসেছে ।

দেখছি, আমার 'আওয়ারা আশিক কমরেড বন্ধু'র কাছে মানুষ চেনার আর্টটা শিখে নিতে হবে । নইলে কারা কাশ্মীরি আর কারাই বা জাঠ বোঝা দায় হয়ে উঠবে ।

২০১৭, ২৭ আগস্ট

জড়বুদ্ধিসম্পন্ন অন্ধভক্ত কাট-গোঁয়াররাও লজ্জা পায়, যখন দেখে তাদের চেয়ে বেশি নিন্দুকেরা বাবা রাম-রহিমের নাম জপ করছে ।

২০১৭, ২২ আগস্ট

সেদিন দেখি, আমাদের নারানদা উত্তেজিত হয়ে জামা-প্যান্টের পকেট হাতড়াচ্ছে । সেই ফাঁকে তার অলক্ষ্যে একটি খুচরো কয়েন পকেট থেকে লাফিয়ে রাস্তায় পড়ে যায় ।

লোকে বলছে নাকি এলেবেলে কয়েন না, সে 'বিশাল সিক্কা' !

২০১৭, ১৫ আগস্ট

হে ভারতভাগ্যবিধাতা,

আজকের এই দিনে তোমার কাছে একটাই প্রার্থনা । সেই সমস্ত বানচোত উদারচেতা দরাজকেতা জ্ঞানবর্তুল বীরপুঙ্গবদের হাত থেকে দেশের সরল সাধারণ নিরীহ মানুষদের রক্ষা করো । তারা অতশত তত্ত্ব বোঝে না । বোঝে না মহান কেতাদুরস্ত আদর্শের কচকচানি । উড়তে থাকা তেরঙার নীচে খুদাই খিদমতগার সেই মানুষগুলোর নিষ্পাপ আনন্দকে যারা হেয় তাচ্ছিল্য ব্যঙ্গবিদ্রূপ করে তাদের গুহ্যদ্বারে আছোলা বাঁশ গুঁজে দেওয়ার 'দাও শকতি' । সেই সব ভোঁতাভাষণ আঁতেলবশন ভাঁওতাবাজদের নির্মূল করার জন্য 'দাও বল' । যাতে আমার দেশের মানুষ গলা ছেড়ে নির্দ্বিধায় গায়তে পারে জনগণমন-অধিনায়ক গান ।

জয় হিন্দ

২০১৭, ৮ আগস্ট

পিকুর সাথে 'রোজা' সিনেমা দেখার সময় -

কাশ্মীরি সন্ত্রাসবাদী লিয়াকতের হুকুমে ভারতের পতাকায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় । প্রাণের পরোয়া না করে জ্বলন্ত পতাকার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সিনেমার নায়ক ঋষি কুমার । যেভাবেই হোক সে তা রক্ষা করবেই । চরম মুহূর্ত...

ঘাড় ঘুরিয়ে পিকুকে জিজ্ঞেস করলাম, 'তুই থাকলে এরকম করতিস ?' মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো সে এবং ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলো 'কেন জানিস?' কেন'র কারণটা আমি মোটেই আশা করিনি । বলল...
'তুই এমনও কাওকে পাবি, যে ব্যাপারটাকে হেসে উড়িয়ে দেবে ; বলবে ন্যাকামো, ঢং, দেশভক্তির ভড়ং । ঠাট্টা-তামাশা দূরে থাক, হয়তো সিনেমাটা পাতেও নেবে না । এই তাদের মতো বীর-পুঙ্গবদের জানানোর জন্য যে আমার মতোও অনেকে আছে, যারা অতশত তত্ত্ব বোঝে না, বরঞ্চ সরল মনে দেশকে ভালোবাসে ।'

২০১৭, ৬ আগস্ট

মহান আমেরিকা বোমা মেরে যাবে

আমরা দিবসের পর দিবস ক্যালেন্ডার ভরিয়ে যাব
যতদিন না আমাদের নিজের একটা হিরোশিমা হয়...

২০১৭, ৫ আগস্ট

একটা দল বানান । মতের মিল, ভাবনা-চিন্তা এক ইত্যাদি ওসবের কিছু দরকার নেই । কন্ট্রাক্ট বেসিসে দল হবে । একে অপরের চামচা । এই ধরুন আপনি লেজটা নাড়লেন, বাকিদের কেও ডুগডুগি বা কেও ঝুনঝুনি বাজালো । কেও গলা ছাড়ল, 'কেয়া বাত, কেয়া বাত', 'নাজুক, নাজুক' । বাকিদের হাততালিই যথেষ্ট । এভাবেই চলবে - সার্কুলার প্রসেস ।

দেখবেন, চারিদিকে খালি মুগ্ধতা । রাতারাতি শিল্পী হয়ে উঠেছেন অথবা জননেতা । সংবর্ধনা ।

তবে হ্যাঁ, নিজের খাতের তালিটাও ভুলবেন না । কালচারটাকে সাসটেইন করতে হবে তো । হু হু, কালচারই তো । বনেদি-ফনেদি জুড়ে দিলে আরও বেটার ।

এভাবে প্রোটন-নিউট্রনে ঠাসা এক একটা নিউক্লিয়াস । গাদাগুচ্ছের নিউক্লিয়াস । ফিউশন-ফিশন চলবে । অ্যাটম বোমা ফাটবে ।

তালি কিন্তু চলতে থাকবে ।

প্রথম বনাম অস্ট্রেলিয়া

টেস্ট ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর একটা আলাদা মাধুর্য আছে - তা সে ৯০-র দশকের স্টিভ ওয়ার অপ্রতিরোধ্য অস্ট্রেলিয়াকেই হোক বা হালের স্টিভ স্মিথের অসহায়প্রায় অস্ট্রেলিয়াকে হোক - আমন্ত্রণ জানিয়ে ঘরে ডেকে হোক বা তা রক্ষা করতে গিয়েই হোক - তাতে কোনও পার্থক্য নেই । বরাবরের আত্মবিশ্বাস ও ঔদ্ধত্যে ভরপুর এই দলটিকে মাটিতে মুখ থুবড়ে ফেলার চরম ইচ্ছা প্রতিপক্ষ কোন দলেরই বা হবে না ?

আজ এশিয়া মহাদেশের চতুর্থ দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্ট ম্যাচে হারানোর কৃতিত্ব দেখায় বাংলাদেশ । সদ্য অনুমতিপ্রাপ্ত আফগানিস্থান এখনও তাদের টেস্ট খেলাই শুরু করেনি । তাই তাদের আপাতত ধর্তব্যের মধ্যে আনা হচ্ছে না ।

যাই হোক, অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে বাংলাদেশের ১৭ বছর অপেক্ষা করতে হল (২০০০ সালে টেস্ট শিরোপা পাওয়ার পর) । ধন্য অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম । যদিও আজকের এই ম্যাচের আগে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ মাত্র ৪টি টেস্ট খেলার সুযোগ পেয়েছে - দুটো অস্ট্রেলিয়ায় (২০০৩) এবং দুটো ঘরের মাঠে (২০০৫-০৬) । (এই ৪টে ম্যাচেই অস্ট্রেলিয়া জয়লাভ করে) অর্থাৎ, সময়টা ১৭ বছর হলেও মাত্র ৫টা টেস্ট ম্যাচের অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশ জয় ছিনিয়ে নিতে সফল হয় ।

এখন অস্ট্রেলিয়াকে 'কত তাড়াতাড়ি টেস্ট ম্যাচে হারানোর' প্রসঙ্গে বাকি তিনটি প্রতিবেশী দেশের (ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা) তুলনা করলে আকর্ষণীয় কিছু তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায় । এবং আছেও তাই !

প্রথমে শ্রীলঙ্কার কথায় আসা যাক । বান্দুলা ওয়ার্নাপুরার অধিনায়কত্বে ১৯৮১-৮২ সাল নাগাদ টেস্ট খেলা শুরু করে ছোট্ট এই সমুদ্রবেষ্টিত দেশটি । গত বছর (২০১৬) অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউসের দাপটে অস্ট্রেলিয়াকে সিরিজ হোয়াইটওয়াশের (৩-০) মুখোমুখি হতে হলেও, এর আগে অস্ট্রেলিয়াকে একবার মাত্রই শ্রীলঙ্কার কাছে পরাজয়ের ভাগীদার হতে হয়েছিল । সনৎ জয়সূর্যের দল ১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্ট ম্যাচে পরাজিত করে এবং সেটিই ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে শ্রীলঙ্কার প্রথম টেস্ট জয় । মজার কথা, সেই সিরিজটি (৩ ম্যাচের সিরিজ, বাকি দুটি ড্র) শ্রীলঙ্কা জিতে যায় । তারপর এই ১৮ বছরে কেবলমাত্র ৩টি টেস্ট জয়ই শ্রীলঙ্কার ভাগ্যে জুটেছে । (এই পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা বনাম অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ম্যাচের সংখ্যা ২৯) । অতএব, টেস্ট খেলতে শুরু করার ১৮টা বছর পর শ্রীলঙ্কা প্রথম অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে কোনও টেস্ট ম্যাচ জেতে - ১৩ বার মুখোমুখি হওয়ার পর ।

তাহলে শ্রীলঙ্কার তুলনায় বাংলাদেশ এগিয়ে ।

কোনোপ্রকার সাসপেন্সে না গিয়ে ভারতবর্ষের প্রসঙ্গে আসা যাক । এশিয়া মহাদেশের প্রথম ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ এবং বর্তমানে এক নম্বর টেস্ট দলেকে ২৭ বছর (যদিও সেই তুলনায় মাত্র ১০টি টেস্ট ম্যাচ) অপেক্ষা করতে হয়েছিল অস্ট্রেলিয়াকে প্রথমবার হারানোর জন্য । গুলাবরাই রামচন্দের নেতৃত্বে প্রথম জয়টি আসে (কানপুরে, ১৯৫৯) - সি কে নাইডুর পরাধীন ভারতবর্ষের ইংল্যান্ড সফরের (১৯৩২) ২৭ বছর পর । এর পরেও ভারত অস্ট্রেলিয়াকে বহুবার হারিয়েছে । তাদের দেশে গিয়ে হারিয়ে এসেছে ।

তবুও বাংলাদেশই এগিয়ে !

পাকিস্তান । কি আর বলবো ! প্রথম সাক্ষাতেই কেল্লাফতে । আবদুল হাফিজ কারদারের নেতৃত্বে ১৯৫২-তে ভারতের বিরুদ্ধে টেস্ট ক্রিকেটে হাতেখড়ি এই দেশটির আর তার ৪ বছরের মাথায় প্রথম টেস্টেই অস্ট্রেলিয়া মাত (১৯৫৬) । এমনকি সিরিজেও (৩ ম্যাচের সিরিজ ১-০) ।

শেষ হাসি কার ঘরে ?

দেখতে গেলে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় জয়ের স্বাদ পেতে পাকিস্তানকে ২০টি বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল, যেখানে ভারতবর্ষ সেই একই পরিমান সময়ের ব্যবধানে খান ছয়েক জয়ের হাসি তো অবশ্যই হেসেছিল ।

Thursday, 24 August 2017

দ্বাদশ ব্যক্তি

আজ অলোক ভট্টাচার্যের জন্মদিন । কে এই অলোক ভট্টাচার্য, তাই তো ? 
এক কথায় উত্তরটি হবে ক্রিকেটার । আর নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে বাঙালি । কিন্তু এটুকুই যথেষ্ট নয় । তাহলে বিস্তারিত বলার আগে, একটি গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট ম্যাচের কথা বলি -

সালটা ১৯৮০ । ভারত সফরে এসেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান । ছয় ম্যাচের টেস্ট সিরিজের আর মাত্র একটি ম্যাচ বাকি । সেটি অনুষ্ঠিত হবে কলকাতায় । গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথের অধিনায়কত্বে ভারত ইতিমধ্যে ২-০ তে এগিয়ে অর্থাৎ সিরিজ পকেটে । ইডেন গার্ডেনসে ব্যবধানটা আর একটু বাড়িয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে খেলতে নামছে কপিল, সুনীল, কিরমানিরা । অন্যদিকে ঘরে ফেরার আগে অন্তত একটি জয় ঝুলিতে পোরার আকাঙ্ক্ষায় বদ্ধপরিকর পাকিস্তান । চাইবে নাই বা কেন । সেই ম্যাচটি ছিল পাকিস্তানের অধিনায়ক আসিফ ইকবালের বিদায়ী টেস্ট ম্যাচ । ছয় নম্বর জায়গাটা ফাঁকা করে দেওয়া এবং অধিনায়কত্বের ব্যাটনটা জাভেদ মিয়াদাদের হাতে তুলে দেওয়ার আগে শেষ বারের মতো জ্বলে উঠতে চান দলের 'ড্যাসিং এন্ড হ্যান্ডসম' ডানহাতি ব্যাটসম্যানটি । 

যাই হোক । ম্যাচের শুরুতে ভারত টসে জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় এবং স্কোর বোর্ডে মোট ৩৩১ রান যোগ করে । পরেরদিন ফিল্ডিং করতে গিয়ে গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ দেখেন তার দলের স্লিপের স্থায়ী ফিল্ডার সুনীল গাভাসকারের মারাত্মক গলায় যন্ত্রণা । মাঠে নামতে পারবেন না । অনন্যোপায় হয়ে দ্বাদশ ব্যক্তির ডাক পড়লো । স্থানীয় খেলোয়াড়দের থেকেই দ্বাদশ ব্যক্তিকে দলে নেওয়া হতো, এটিই ছিল প্রচলন । তাই রিজার্ভ বেঞ্চে ছিলেন প্রণব নন্দী এবং অলোক ভট্টাচার্য । অবশেষে চেতন চৌহান, রজার বিনি, সন্দীপ পাটিলদের সাথে মাঠে নামলেন হাওড়ার বাসিন্দা বাংলার রঞ্জি দলের খেলোয়াড় অলোক ভট্টাচার্য । হ্যাঁ, এই সেই অলোক ভট্টাচার্য । এটিই ছিল তার একমাত্র আন্তর্জাতিক আবির্ভাব । সেই ম্যাচে দুর্দান্ত ফিল্ডিং করে দর্শকদের নজর কাড়লেও আন্তর্জাতিক স্তরে মাঠে ফেরার পুনরায় সুযোগ পাননি তিনি । তবুও তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন, থাকবেন । ক্রিকেটের গণ্ডির মধ্যেই তার আরও বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় আমরা পাই ।

'অলা' নামেই বেশি পরিচিত অলোক ভট্টাচার্য খেলোয়াড় হিসেবে ছিলেন ডান-হাতি অফ-স্পিনার । তবে লেগ-স্পিনটাও ছিল আয়ত্তের মধ্যে । তাই তার গুগলি খেলতে গিয়ে ব্যাটসম্যানদের ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়াই স্বাভাবিক । ব্যাটিংয়ে যে একদম অক্ষম ছিলেন তা হয় । পিচ আঁকরে কিছুক্ষণ প্রতিরোধ দেওয়ার ক্ষমতাটিও ছিল । এবং সবচেয়ে অবিস্মরণীয় যে প্রতিভাটি ছিল, সেটি হল তার ফিল্ডিং । তিনি যে সময়ের খেলোয়াড়, সে সময় একজন বোলারের কাছ থেকে ধুরন্ধর ফিল্ডিং আশা করাটাই বাড়াবাড়ি । কিন্তু ঠিক এই জায়গাটায় অলোক ভট্টাচার্য নিজেকে আর পাঁচজনের থেকে আলাদা করে রাখতে পেরেছিলেন ।

তার সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান হিসেবে ১৯৭৪-৭৫য়ের রঞ্জি মরশুমে আসামের বিরুদ্ধে বোলিং পারফরম্যান্সকে উল্লেখ করা যেতে পারে । সেই ম্যাচে তার বোলিং ফিগার ছিল ১২.২-৬-১১-১০ । দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৭ রানের বিনিময়ে ৭টি উইকেট সংগ্রহ করে বাংলা দলকে জয় উপহার দেন তিনি । 

১৯৭০ সালে বাংলা দলের হয়ে অভিষেক হয় অলোক ভট্টাচার্যের । জাতীয় দলে ডাক না এলেও, প্রথম সারির ক্রিকেটে তাকে থেমে থাকতে হয়নি । ৪২টি ম্যাচ খেলে সংগ্রহ করেছেন ১৩৪টি উইকেট । উইকেট সংখ্যা আহামরি কিছু না হলেও বোলিং গড় এবং স্টাইক রেট ছিল দুর্দান্ত । রান দেওয়ার ব্যাপারেও ছিলেন প্রচণ্ড কৃপণ । তাই প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের চাপে ফেলতে তার অবদান অস্বীকার করার পথ নেই । উইকেট পড়া তো খালি সময়ের অপেক্ষা ।

সীমিত ওভারের খেলায় চমক আনতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন । ৮টি লিস্ট এ ম্যাচ খেলার পর সাকুল্যে ১টি মাত্র উইকেটই তিনি সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন ।

বাংলার হয়ে খেলা ছাড়াও অলোক ভট্টাচার্য বেশ কিছু স্থানীয় ক্লাবের হয়ে ক্রিকেট খেলেছেন । মহামেডান, ইস্ট বেঙ্গল প্রভৃতি ক্লাবের হয়ে প্রচুর দাপুটে ম্যাচ খেলেছেন । শেষ ক্লাব ছিল শ্যামবাজার ।

বাংলার প্রাক্তন অধিনায়ক সম্বরণ অলোক ভট্টাচার্যের ব্যাপারে স্মৃতিচারণ করে বলছেন, 'জোরের ওপর লেগ স্পিন করতে পারতো ।...একবার আমেদাবাদে দলীপে পশ্চিমাঞ্চলের হয়ে কারসন ঘাউড়িকে দারুণ বেকায়দায় ফেলেছিল । কারসন বুঝতেই পারছিল না অলা কি বল করছে ।'  ভারতের জাতীয় দলের খেলোয়াড়, এই কারসন ঘাউড়ি ছিলেন সেই সময় ভারতের নির্ভরযোগ্য অলরাউন্ডার । রঞ্জির পাশাপাশি অলোক ভট্টাচার্য ১৯৭৫-৮০য়ের মধ্যে পূর্বাঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন ।

ক্রিকেট খেলোয়াড় হিসেবেই তার অবদান শেষ হয়ে যায়নি । অবসর গ্রহনের পর ক্রিকেট আম্পায়ারিংয়ে মনোনিবেশ করেন । স্থানীয় ক্রিকেটে কড়া এবং তুখোড় আম্পায়ারের প্রসঙ্গ উঠলেই প্রথমে অলোক ভট্টাচার্যের নাম আসবে । ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান (ক্রিকেট) ম্যাচ কিংবা ঘরোয়া কোনও ক্লাব ম্যাচের ফাইনাল মানেই এক্সপার্ট আম্পায়ার অলোক ভট্টাচার্য । প্রথম শ্রেণির ম্যাচেই আম্পায়ারিং করেই ক্ষান্ত হননি তিনি । আন্তর্জাতিক সীমিত ওভারের ম্যাচেও আম্পায়ারিংয়ের সুযোগ পেয়েছেন । তবে সংখ্যাটি নিতান্তই কম - মাত্র ৩টি । ২০০২ সালে মোহালিতে ভারত বনাম জিম্বাবোয়ে ম্যাচে তাকে শেষ আম্পায়ারিং করতে দেখা গেছে ।

এরপর তাকে দেখা যায় কোচের ভূমিকায় । বাংলার কনিষ্ঠ দলের কোচের দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠার সাথে । তবে এরচেয়ে বেশিদূর আর এগোননি ।

শেষ জীবনে প্রশাসকের ভূমিকাটি বেছে নেন পোড় খাওয়া বাঙালি ক্রিকেটার অলোক ভট্টাচার্য । জীবনের চড়াই-উতড়াইয়ে প্রথম শারীরিক বাঁধার সম্মুখীন হন তিনি । বাইপাস সার্জারি হয় । এতে একটুও দমে যাননি । ফের মাঠে ফিরে সিএবির বরিষ্ঠ দলের নির্বাচকের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন ।

বাংলার আর এক প্রাক্তন অধিনায়ক লক্ষ্মীরতন শুক্লার কথায়, 'অনূর্ধ্ব-১৬ তে আমি যে বার প্রথম গায়ে বাংলার জার্সি পড়ি, সেই ম্যাচে অলোক স্যর কোচ । আমায় ডাকতেন টাইগার বলে । সবচেয়ে বড় কথা্‌ (তিনি) অনেক বড় মনের মানুষ ।' 

গত বছর (২০১৬) ২৫ ডিসেম্বর তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান । তার প্রতি শেষ সম্মান হিসেবে তার মরদেহ সিএবিতে নিয়ে আসা হয়, সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়য়ের আনুষ্ঠানিকতায় ।

(সৌজন্যে কলকাতা ক্রিকেট ক্লাব গ্রুপের সদস্য বিভাস মল্লিক, পত্রিকা এ-বেলা এবং ইএসপিএনক্রিকইনফো)

Thursday, 3 August 2017

২০১৭, ৩ আগস্ট

বলছি কার্যকলাপ এক হলেও তার উদ্দেশ্য বা অভিসন্ধি এক নাও হতে পারে । সেদিনের ঘটনা -

৭৯এ-তে করে বারাসাত যাচ্ছি । উঠেছি শ্যামবাজারেই । পাতিপুকুর স্টপেজে একখান ছোকরা বাসে উঠল । বসলো ঠিক আমার সামনের সিটটিতে, টাকমাথা এক বয়স্ক ভদ্রলোকের পাশে । তখনই খেয়াল করলাম, ভদ্রলোকের বাঁ হাতের বুড়ো বাদে বাকি চারখানা আঙুলই গোড়া থেকে কাটা । দুর্ঘটনা বা কোনও রোমহর্ষক কাহিনির পরিণাম হতে পারে । অস্বাভাবিক কোনোকিছু দেখলেই তার পেছনে কোনও না কোন উদ্ভট গল্প কল্পনা করার বাতিক আমার বহুদিনের । তাই কি করে চারটে আঙুল কাটা পড়তে পারে, এই নিয়ে হ্যান-ত্যান ভাবতে লাগলাম । ভদ্রলোকটি পাশে বসলে না হয় আগ্রহ দেখিয়ে ঘটনাটা (বা আদৌ কোনও ঘটনা আছে কি না) জিজ্ঞেস করা যেত কিন্তু পিছনে বসে সেটা করা ঠিক ধাতে সইবে না । কিছুক্ষণ পর দেখি পাশের ছোকরাটিও উনার হাতখানা লক্ষ্য করছে । আমার মতো তারও চোখেমুখে কৌতূহল । ভালোই হল, আমার হয়ে সেই না হয় প্রশ্নটা করুক । এদিকে ভদ্রলোকটিও দেখি টের পেয়েছেন । ধরাবাঁধা প্রশ্ন আসবে । এর আগেও কতশত অনুসন্ধিৎসুর কৌতূহল মিটিয়ে থাকবেন । হয়তো মুখস্থ হয়ে গেছে উত্তর । তবুও মনে হল একটু গুছিয়ে নিলেন । আমিও মাথা বাড়ালাম । বাব্বা, দেখি কি আমার পাশের জনও আমাকে ফলো করছে । যাই হোক, তিন তিনখানি শ্রোতা । ছোকরাটি মাথা ঘুরিয়ে, 'মানে বলছিলাম কি, কিছু মনে না করেন...' ভূমিকা সেরে প্রশ্ন করল, 'আপনার ছুঁচতে অসুবিধা হয় না?'

Tuesday, 25 July 2017

একটি সত্য ঘটনাকে অনুসরণ করে

গল্পটা পেলাম । পড়ুন ভালো...নাও লাগতে পারে, কারণ কপি করতে একটু সমস্যা হয়ে গেছে ।

সেদিন মনজিনিসে গেছিলাম । ও থুড়ি, মনজিনিস নয়, মিও আমরে । তো যাই হোক, আমি বোধহয় একটা স্যান্ডুইচ জাতীয় কিছু একটা চিবিয়ে গলাধঃকরণ করছিলাম, বিশেষ তাড়া ছিল না সেদিন, তাই এসি দোকানঘরে বসে একটু সময় নিয়েই খাচ্ছিলাম ।

এমন সময় এক পিতা-পুত্রের আগমন । পুত্রটি বড় জোর বছর দশেক, সাথে শীর্ণকায় দারিদ্রক্লিষ্ট মজদুর বাবা। দোকানে ঢুকেই বিস্মিত ছেলেকে বললেন, 'নে দ্যাখ এবার । যা নিবি দ্যাখ ।'

দোকানের সার্ভিস বয়দেরও চাউনি খুব একটা আপ্যায়ন সুলভ নয় । কিঞ্চিৎ গম্ভীর মুখেই তাকিয়ে ওই অনাহূত আগন্তুকের দিকে । বেচারি বাবাটি এমনিতেই ঘাবড়ে গেছে, তারপর চেষ্টাকৃত স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে আরো গোলমাল করে ফেলছে । আর বাচ্চা ছেলেটির চোখে যেন গোটা গ্যালাক্সি । এত ঐশ্বর্য যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে থাকতে পারে, সেটাই বোধহয় তার হিসেবেই বাইরে । এরপর শুরু হলো বার্থডে কেক বাছাই করা । খুব সম্ভবত ছোট্ট ছেলের জন্মদিন বড়লোকদের মতো পালন করার ইচ্ছাতেই এই 'মিও আমরে'র আগমন । ছেলেটির তো সবকটি কেকই পছন্দ, অনেক ঝাড়াই বাছাই করে একটা বাছাইও হলো । কিন্তু মুশকিল হল অন্য জায়গায় ।

লোকটি হাতের মুঠো মধ্যে দলা পাকানো ঠিক একটি ১০০ টাকার নোট । একটিই । আর কিচ্ছু নেই । হয়তো তার ধারণা ছিলো ১০০ টাকা একটা গোটা কেক কেনার পক্ষে যথেষ্ট, হয়তো ওটা তার গোটা একদিনের রোজগার্ । কিন্তু হা হতোস্মি, পছন্দের কেক তো নয়ই, বরং হিসেব করে দেখা গেলো সবচেয়ে কমদামি ভ্যানিলা কেকটারও দাম ১৬০ টাকা । এর কমে কোনো বার্থডে কেক হয় না । অসহায় বাবাটি অবান্তর কিছু তর্ক করল সার্ভিস বয়গুলির সাথে । ছেলেগুলি উদাসীন ভঙ্গিতে পাত্তাই দিলো না ।

আমি অনেক্ষন ধরে লক্ষ করছিলাম এই নরনারায়ণদুটিকে । ছেলের চোখ ছলছলে, অপ্রস্তুত বাবার ছটফটানি, সব মিলে বড় অসহায় এক পরিস্থিতি । পায়ে পায়ে এগোলুম আমি । সসঙ্কোচে বললুম,

- কিছু মনে করবেন না, এই কেকটা আমায় কিনে দিতে দেবেন ওকে ?
- না দিদি, লাগবে না ।
- দিন না কিনে দিতে, না হয় ছেলেটার মুখ চেয়েই কিনে দিতে দিন ?
- বললাম তো লাগবে না । ক্ষুব্ধ বাবার কড়া উত্তর্ । 
- তাহলে অন্তত ৬০টাকাই আমায় দিতে দিন, যেটুকু কম পড়েছে ?
- নাআআআ...। আমাদের লাগবে না ।

অসহায় সেই মানবশিশু বাবার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমার দিকে করুন মুখে তাকিয়ে । ঝকঝকে দুই চোখে হাজার ওয়াটের আলো । কিন্তু নাহ । কিছুতেই বাবা গললো না । কেক কেনাও আর হলো না । এমন অভিজ্ঞতা অবশ্য আমার আগেও হয়েছে । ট্রেনে শ্রমিক মায়ের কোলে শীর্ণকায়া শিশুটি চিল চিৎকার করে একটা কমলালেবু চেয়েছিল । আমার হাজার অনুরোধ উপরোধেও সেই মা আমায় কমলালেবু কিনে দিতে দেয়নি । নিজে তার বললে কিনে দিয়েছিল ২টাকার ঝুরিভাজা, তবুও আমায় দিতে দেয়নি ।

বাবা-ছেলে চলেই যাচ্ছিল দোকান ছেড়ে । হঠাৎ কি মনে করে বাবা কাউন্টারের সামনে এলো । ভালো করে দাম দেখে দেখে ছেলেকে কিনে দিলো ২টি রঙ্গীন প্যাস্ট্রি, আর ২/৪ টে মোড়কের চকোলেট । সঙ্কুচিত, ব্যর্থ বাবাটি দাম মেটাচ্ছেন ওই ১০০ টাকার হিসেবের মধ্যেই, আর ছেলেটি পায়ে পায়ে এসে দাড়িয়েছে আমার পাশে । হঠাৎ দেখি আমার আঁচলে ঈষৎ টান । দেখি পাশে দাড়িঁয়ে সেই দেবশিশু । সেই জ্বলজ্বলে কাঁচস্বচ্ছ চোখ । আমার ভারতবর্ষ...

আমার অপমানিত সত্তায় প্রলেপ দিচ্ছে নির্মল এক হাসি দিয়ে । দেখি হাতে গুঁজে দিলো একটি চকোলেট । ওই সামান্য সম্ভারের থেকেও সে আমায় দিতে পারলো ? চোখে জল এসে গেলো আমার্ । অবচেতন ভাবে হাত বাড়ালাম সেই পুন্যের দানে । এ জিনিস অস্বীকার করব, এত স্পর্ধা আমার কই ?

হায় রে ছেলে, তোকে আমি উপহার দিতে গেছিলাম, উল্টে তুইই আমায় দিয়ে দিলি ? সারাজীবন ধরে হামলে পড়ে নিতে নিতে আমি তো ভুলেই গেছিলাম যে দিতে গেলেও কিছু যোগ্যতা লাগে । পকেটে টাকা থাকলেই দেওয়া যায় না ।

এই আমার দেশ । সুজলা সুফলা জন্মভূমি । এখানে ভিখারীকে ভিক্ষা দিতে গেলেও প্রণাম করতে হয়, কারণ সে আমায় দান করার সুযোগ করে দিয়েছে । এখনো হয়তো আমার অন্তর থেকে সেই প্রণাম আসেনি, তাই বুঝি আমার দান গ্রহণ করলেন না আমার জীবনদেবতা ।

বাবার হাত ধরে পরিপূর্ণ মনে বেরিয়ে...এ কি ! ছেলেটিকে তো বাবার হাত ধরে বেরিয়ে যাওয়ার কথা । সে না করে আমার দিকে দুচোখ ভর্তি প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে আছে কেন ! আমি থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, 'কিছু বলবি ?' ছেলেটি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর অবশেষে মুখ খুলল । ঘুরিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলো, 'আচ্ছা, এই গল্পে আমার নাম কি দিয়েছেন ? বাবার গোটা একদিনের রোজগার তো ১০০টাকা বর্তে দিলেন, কিন্তু বাবার রোজগারের উপায়টা কি হবে ঠিক করেছেন ? আচ্ছা আমার ভাই আছে ? মা আছে ? আমাদের কটি ঘর ? আলো আছে ? জল আসে ?' 

একনাগাড়ে প্রশ্নগুলো করে গেল ছেলেটি । আমার কপালে ঘাম । কেন এইসব প্রশ্ন করছে আমাকে ? আমি কি কিছু খারাপ ব্যবহার করলাম তাদের সাথে ? ক্ষণিকের পরিতৃপ্তি মুহূর্তে বিষিয়ে গেল । বিরক্তির সাথেই জবাব দিলাম, 'এসব প্রশ্নের মানে কি ?' সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল, 'নেহাৎ গল্পের মানুষ বলে কি কৌতূহল থাকতে নেই ?'

- কোন গল্প ? কিসের গল্প ?
- এই যে এতক্ষণ আমাকে দেখে মনে মনে গল্প বানাচ্ছিলেন । (ছেলেটির চোখে কৌতুক )
- আমি কেন গল্প বানাতে যাব ! আমি এখানে গল্প বানাতে আসিনি, খেতে এসেছি ।
- সে তো অবশ্যই , কিন্তু আমাকে পেয়ে যে গল্পের প্লট ফেঁদে বসলেন, সেইটির কথাই বলছি । আমার বাবার হাতে ১০০টাকা, কেকের দাম ১৬০টাকা, চকোলেট উপহার ইত্যাদি ইত্যাদি ।
- সে তো সব চোখের সামনেই ঘটা । 
- না । (ছেলেটির চোখদুটো দপ করে জ্বলে উঠল ) কিছুই ঘটেনি । কেবল একটি ছেলে বাবার হাত ধরে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে গিয়েছিল এবং কাঁচের বাইরে থেকে ভিতরের সাজানো খাবারগুলো বড় বড় চোখ করে দেখছিল । তাই দেখে সঙ্গে সঙ্গে আপনি এত সুন্দর গল্প ফেঁদে বসলেন ! 
- আমার ইচ্ছে, আমি যা খুশি করি তোর কি ! তোর তো কোনও অস্তিত্বই নেই ।
- কে বলেছে ? জড় অস্তিত্ব নেই তো কি হল, ধারণার মধ্যে তো আছি...
- (কথা থামিয়ে) এইটুকু ছেলে আবার এত কথা বেরোয় কোথা থেকে ?
- সেটিই তো প্রমাণ, আমি আসলে কেও না, আপনারই ধারণা ; যেটি আপনার অন্য একটি ধারণার বিরোধিতা করছে । - কিন্তু এরকম ঘটনা যে হয় না তা তো নয় ?
- অবশ্যই হয়, কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে । যেখানে প্ররোচনার কোনও স্থান নেই, অভিনয়ের কোনও স্থান...
- ওকে ! ওকে ! ওকে ! আমার ভুল হয়ে গেছে । তুই এবার যা । 
- আমার তো আর কোথাও যাওয়ার নেই । আমাকে তো আপনি সকলের কাছে পৌঁছে দিয়ে গেলেন ।
- তবে যেমনটা ছিল তেমনটাই থাক না বাবা আমার । কত সুন্দর গল্পটা শেষ করছিলাম । (কিছুক্ষণ থেমে) হ্যাঁ গল্পই । আপনারা যা শুনছিলের তা সবই গল্প । ছেলেটি ঠিকই বলেছে বাইরে দেখলাম ওরকমই একজন বাবার হাত ধরে গেল, দিয়ে এরকম এরকম হতে পারে মাথায় এসে গেল, তাই আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম । বিশ্বাস করুন কোনও অসৎ প্রচারের ইচ্ছে আমার নেই । বাইরে ছেলেটিকে ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে থাকতে দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল । তাই নিজেকে আটকাতে পারলাম না । ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ।

ক্ষমা করে দিলে গল্পটা শেষ করে দিই, কেমন ? কোথায় যেন ছিলাম , হ্যাঁ মনে পড়েছে -

বাবার হাত ধরে পরিপূর্ণ মনে বেরিয়ে যাচ্ছে আমার ছোট্ট ভারতবর্ষ । মনে মনে বললুম তোকে উপহার দিতে আর পারলাম কই ? বরং তোর দান ই হাত পেতে নিলাম । তবুও মনেপ্রাণে আশীর্বাদ করলাম অনেক অনেক বড়ো মানুষ হ । এত বড়ো হ, যে কোনো একদিন এই 'মিও আমরে'র মতো বড় দোকানের মালিক হয়ে যাস তুই । সেদিন দোকানের সব কেক তোর হোক  ।

কথাগুলো শেষ করে দেখি, বাবা-ছেলে কেও কোত্থাও নেই । কেবল দুজন সার্ভিস বয় আমার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে ।

Sunday, 23 July 2017

২০১৭, ২৩ জুলাই

অবাক লাগে

কোনও ব্রিটিশ খেলোয়াড় বা সংবাদদাতা ভারতবর্ষের সমালোচনা করলে (অবশ্যই খেলা সম্পর্কিত) আমাদের একটা রেডিমেড উত্তর ঠোঁটেই লেগে থাকে - 

ইংল্যান্ড তো ক্রিকেট আবিষ্কার করেছে, কতবার বিশ্বকাপ জিতেছে ?
(পিয়ের্স মরগ্যান - বীরেন্দ্র শেওয়াগ কাণ্ড দ্রষ্টব্য)

আমি না হয় পুরুষতান্ত্রিক (বিশিষ্টজনদের কাছ থেকে সার্টিফিকেট আছে, যেমন - তমোঘ্ন হালদার) কিন্তু সেই সব জনগন কারা যারা এই ধরণের বক্তব্য সমর্থন করেন ? উপভোগ করেন ! বুক চাপড়ে প্রচার করেন ।

কেবল এটিই নয়, এই নিয়ে চতুর্থবার মহিলা ক্রিকেট বিশ্বকাপ জেতে ইংল্যান্ডের মহিলা ক্রিকেট দল । এমনকি প্রথম বিশ্বকাপটিও ইংল্যান্ড জিতেছিল, যেটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল পুরুষদের বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার দুইবছর আগে ।

২০১৭, ২৩ জুলাই

শাহবাগ আন্দোলনের পূর্বতন সক্রিয় কর্মী, সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট এবং কার্টুনিস্ট সানিউর রহমান জন্মসূত্রে মুসলমান হলেও তিনি নিজেকে নাস্তিক বলে প্রচার করতেন । মূলত ব্লগ এবং ফেসবুকের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক অপপ্রচার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রবন্ধ থেকে শুরু করে কার্টুন, ভিডিও ইত্যাদি প্রচার করতেন । মাঝে ২০১৩ সালে বাংলাদেশের মহাখালীতে দুর্বৃত্তদের দ্বারা আক্রান্ত হন । বুকে ও পিঠে ছুরি চালায় হামলাকারীরা । সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান এবং তারপর থেকে দীর্ঘকাল প্রবাসে কাটান (সম্ভবত সৌদি আরব) । এই আক্রমণের পর থেকেই তার জীবন নতুন মোড় নেয় । একদা নাস্তিক সানিউর রহমান প্রবল ইসলাম বিদ্বেষী হয়ে ওঠে । তার প্রোপ্যাগান্ডা বন্ধ হয় না, কেবল ইসলাম বিদ্বেষী হয়ে ওঠে । তবুও ততদিন স্বঘোষিত নাস্তিকই ছিলেন । এদিকে বাংলাদেশের সীমা ছাড়িয়ে ভারতবর্ষেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি, খাস করে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটা বিশেষ অংশে । তার সাথে সাথে সমালোচনারও সম্মুখীন হতে হয় । স্পষ্টতই, প্রশ্ন ওঠে, তিনি যদি পোশাকি নাস্তিক হন, তবে কেবল ইসলাম বিদ্বেষী কার্যকলাপ করছেন কেন ? খাস করে সেই দেশে যেখানে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বাড়বাড়ন্ত বেশি । ঠিক এটিই ছিল, সানিউর রহমানের নাস্তিকতার কবরে শেষ মাটি । এরপর তিনি হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার অনুকুলে প্রোপ্যাগান্ডা শুরু করেন । ভারতবর্ষের বেশ কিছু হিন্দু সাম্প্রদায়িক জননেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন ইত্যাদি । আর এই আজ দেখছি 'সানিউর রহমান ওরফে অর্জুন' । এটিই আমি তার ইতিহাস জানতাম ।

Friday, 21 July 2017

২০১৭, ২১ জুলাই

পাথুরিয়াঘাটার অধিবাসী মনোরঞ্জন নস্কর তার সংগ্রহের গ্রামোফোন রেকর্ডগুলি মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি দোকানে বিক্রি করে দিয়ে আসেন । কৌতুহলী দোকানদার কারণ জানতে চাইলে সত্তর ছুঁই বৃদ্ধ ছাড়া ছাড়া কথায় উত্তর দিয়েছিলেন, 'পিট সিগার চলে গেলেন, উডি গাথরি, হ্যাঙ্ক উইলিয়ামস, সিসকো, ব্রাউনি এরা তো কবেই চলে গেছে, আমারও দিন শেষ হয়ে এল ; ছেলে কেজি দরে বিক্রি করে দেওয়ার চাইতে দেখলাম কোনও সঙ্গীতপ্রেমীর জন্য যদি রেকর্ডগুলোর ব্যবস্থা করে দেওয়া যায় তাহলে ভালোই হয় । ওই আর কি !' 

এই মাত্র বছর তিনেক আগের ঘটনা । পরের বছরই ইহলোক থেকে বিদায় নেন মনোরঞ্জন নস্কর । তার মৃত্যুর তিনমাস আগে, তার বিক্রি করে দেওয়া রেকর্ডগুলি থেকে বেশ কিছু রেকর্ড কিনে নিয়ে যায় প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র অপূর্ব ঘোষ । এরকমভাবে অনেক রেকর্ডই সংগ্রহ করেছে সে । তাদের কলুটোলা লেনের বাড়িতে একটি পুরনো গ্রামোফোন আছে, যার বর্তমান মালিক এখন সে । যদিও গান শোনার সমস্ত প্রকার আধুনিক সরঞ্জাম তার আছে, তবুও সময় অসময়ে বন্ধুবান্ধব এলে তাদের রগড় দেখানোর জন্য ফনোগ্রাফের তলায় কালো চাকতির চক্কর লাগায় । অনভিজ্ঞ বন্ধুরাও বাহবা দেয় । 

যেমন আজ দিচ্ছে, লাইক-কমেন্ট-শেয়ার । তাদের বন্ধু অপূর্ব লিঙ্কিন পার্ক রক ব্যান্ডের গায়ক চেস্টার চার্লস্‌ বেনিংটনের আকস্মিক মৃত্যুর শোকে জর্জরিত হয়ে তার বহুকালের সঞ্চিত লিঙ্কিন পার্কের রেকর্ডের কালেকশানের ছবি দিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায় । রেকর্ডগুলো পাশাপাশি সাজানো, বোঝা যাচ্ছে না আদৌ লিঙ্কিন পার্ক কি না ! তবুও সন্দেহ কিসের, ওর বাড়ি গিয়ে তো দেখে এসেছে কি সব বিদেশি নাম । লিঙ্কিন পার্কই হবে, যে ব্যান্ডটা তাদের প্রথম অ্যালবাম প্রকাশ করে মাত্র ১৭ বছর আগে । 

Thursday, 20 July 2017

২০১৭, ২০ জুলাই

জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করার পর (২০ জুন) অনিল কুম্বলের রিপ্লেইসমেন্ট হিসেবে ধারাভাষ্যকার এবং দলের পূর্বতন ডিরেক্টর রবি শাস্ত্রীকে প্রধান কোচের ভূমিকায় মনোনীত করা হয় । সেই সময়ে দেওয়া এক ইন্টারভিউ প্রসঙ্গে - 

ওয়েলকাম ব্যাক রবি শাস্ত্রী । হেড কোচের দায়িত্ব হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অধিনায়ক বিরাট কোহলির চাটুকারিতা শুরু করে দিয়েছেন তিনি । নয় কি ! তবে 'খেলোয়াড়দের প্রচেষ্টাই টিম ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিক সাফল্যের একমাত্র কারণ' কেন বলবেন ? সেখানেই থামেননি, তার সঙ্গে কোচের কৃতিত্বকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছেন । বিতর্ক এড়াতে নিজের নামটা ব্যবহার করে আরও বলেছেন, 'রবি শাস্ত্রী বা অনিল কুম্বলের মতো লোকেরা আসবে যাবে...' । একজন কোচের কি সামান্যতম সম্মানটুকুও প্রাপ্য নয় । কি দরকার ছিল ২০১১-র বিশ্বকাপ জয়ের পর গ্যারি কার্স্টেনকে কাঁধে তুলে মাঠের চক্কর দেওয়ার । সবার ওপর নিজে একজন কোচ হয়ে তিনি কিভাবে আরেকজন কোচের ভূমিকাকে হেয় করতে পারেন ! আদৌ কি তিনি জাতীয় দলের কোচ, নাকি অধিনায়কের মোসাহেব মাত্র ?

২০১৭, ১৪ জুলাই

মার্কিন পরিচালক ডেভিড ফিঞ্চার পরিচালিত ক্রাইম-থ্রিলার চলচ্চিত্র জোডিয়াকের (২০০৭) মুখ্য অভিনেতা জেক ইলেনহলের অভিনয় প্রসঙ্গে -

আইরন ম্যান না হাল্ক ?
এটা প্রায়ই দেখা যায় যে একান্ত ভক্তেরা তাদের প্রিয় সিনেমার কাল্পনিক চরিত্রগুলিকে তাদের রিয়েল লাইফ অভিনেতাদের সাথে এক করে ফেলে । খাস করে চরিত্রগুলো কোনও সুপারহিরোর হয় তো কথাই নেয় । সে কারণে আইরন ম্যান আর রবার্ট ডাউনি জুনিয়র একই লোক হয়ে যায় ! ঠিক যেমনটি হাল্ক এবং মার্ক রাফালো ।
স্বাভাবিকভাবে তুলনার সময়ও তারা ভুলে যায়, তুলনাটা ঠিক কাদের করছে, আইরন ম্যান আর হাল্ক নাকি রবার্ট ডাউনি জুনিয়র আর মার্ক রাফালো !
ঠিক এই তুলনাটাই যদি কারোর করার থাকে, তাহলে তাদেরকে নিচের সিনেমাটি না দেখাই ভালো । কারণ, এই সিনেমাটিতে রবার্ট ডাউনি জুনিয়র আর মার্ক রাফালো উভয়েই অভিনয় করেছেন এবং দুর্ভাগ্যক্রমে জেক ইলেনহলও অভিনয় করছেন, ইভেন নট বিয়িং আ সুপারহিরো ।

২০১৭, ১৯ জুলাই

এক বন্ধু দেখায় যে স্পোর্টসকীড়া নামে খেলাধুলা জগতের একটি ওয়েবসাইটে এলিয়ট করনিস নামে একজন ইংল্যান্ডবাসী ফিচারড রাইটার '5 most selfish acts in the history of ODI cricket' অর্থাৎ 'ওয়ান-ডে (ইন্টারন্যাশনাল) ক্রিকেটের পাঁচটি চরম স্বার্থপর কর্মকাণ্ডের' তালিকা পেশ করেছে । সেই তালিকায় সুনীল গাভাসকার, সচীন তেন্ডুলকর, জাক কালিস এবং ডেভিড ওয়ার্না্রের মতো বিখ্যাত চারজনের সাথে আরেকজনও আছেন, মাইকেল ভ্যানডর্ট, যার ওডিআই ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা সাকুল্যে এক । প্রাথমিকভাবেই ধারণা করা যাচ্ছে, বড় খেলোয়াড়দের নাম ব্যবহার করে একপ্রকার সস্তা  চমক দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তালিকাটি প্রস্তুত করা হয়েছে । যদিও তালিকার খেসারতে লেখা অনুচ্ছেদে পাঁচজন ব্যাটসম্যানের বিশেষ পাঁচটি ইনিংসকে 'মোস্ট সেলফিস অ্যাক্ট' হিসেবে ধরে ব্যাপারটি আলোচনা করা হয়েছে । ভাগ্যিস ! সম্পূর্ণ ক্যারিয়ারের ভিত্তিতে যদি এই তালিকা বানানো হতো, তাহলে কেবলমাত্র ভূমিকা দেখেই অবিলম্বে ঘোষণা করে দেওয়া যেত - টোটাল রাবিশ ! 


যদিও এইপ্রকার 'সেলফিস অ্যাক্ট' খোঁজার ধারণাটাই রাবিশ ।  সে প্রসঙ্গ প্রথমে মুলতুবি রাখা হচ্ছে । তার আগে সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যাক, আলোচ্য পাঁচটি 'মোস্ট সেলফিস অ্যাক্ট' কতটা সেলফিস !


প্রথমে ছোটো থেকে শুরু করা যাক । ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত ভিক্টোরিয়া বিটার  বা সংক্ষেপে ভিবি সিরিজের অস্ট্রেলিয়া বনাম শ্রীলঙ্কা প্রথম ম্যাচে শ্রীলঙ্কার ব্যাটসম্যান মাইকেল ভ্যানডর্টের ১১৭ বলে ৪৮ রানের ইনিংসটাকে 'মোস্ট সেলফিস অ্যাক্ট' হিসেবে তৃতীয় স্থানে রাখা হয়েছে । এটিকে নাকচ করার পক্ষে বক্তব্য :

সেই মরশুমে ১২ জনের টিম নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চলছিল । আইসিসি আন্তর্জাতিক দলের সদস্য সংখ্যা ১১ থেকে বাড়িয়ে ১২ করে দেয়, যেখানে ১১ জন কেবল ব্যাট আর ফিল্ডিং করতে পারবে (এবং বোলিংও, বলাই বাহুল্য) । এই মাইকেল ভ্যানডর্ট ছিলেন সেই ম্যাচে মুথাইয়া মুরলীধরনের রিপ্লেসমেন্ট । জীবনের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামছেন, তাও আবার কখন ! টিম যখন ৩১৮ তাড়া করতে নেমে স্কোরবোর্ডে ২-১ এবং ১০ ওভার পর ৩২-৩ । আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে বসে আছেন কুমার সঙ্গকারা এবং ক্রিজের অপর প্রান্তে আছেন অফ ফর্মে থাকা তিলকরত্নে দিলশান । সবার ওপর প্রতিপক্ষ বিশ্বজয়ী অস্ট্রেলিয়া । ভ্যানডর্ট যে ১০০টা বল খেলেছেন এই অনেক ।

অস্ট্রেলীয় ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নারের একটি শতরানের ইনিংসকে পাঁচ নম্বরে স্থান দেওয়া হয়েছে । সালটা ২০১২ । স্থান সেই অস্ট্রেলিয়া । কমনওয়েলথ ব্যাংক ত্রিদেশীয় সিরিজের দ্বিতীয় ফাইনাল (জানিয়ে রাখা উচিৎ, অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত ওয়ান-ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে সাধারণত তিনটি ফাইনাল ম্যাচ খেলা হয়) ।টস জিতে ওপেন করতে নেমে ওয়ার্নার ১৪০ বল খেলে করেন ১০০ রান । স্বার্থপরতার মাপকাঠিতে এটিকেও সহজে অগ্রাহ্য করা যায়, কারণ :

এক, অস্ট্রেলিয়া ১-০ তে ফাইনালে এগিয়ে । দুই, ডেভিড ওয়ার্নার সিরিজে দুর্দান্ত ফর্মে, আগের ম্যাচেই ভরাসদায়ক সেঞ্চুরি করে (১৬৩) ম্যাচ জিতিয়েছেন । তিন, ওই পার্টিকুলার ম্যাচে মাইকেল ক্লার্ক অপরদিকে বিধ্বংসী ব্যাটিং করছেন (এমনকি সিরিজেও ভালো ফর্মে) । চার, পরের ব্যাটসম্যান মাইক হাসির ফর্ম অফ । এমনকি অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটি হেরে গেলেও ওয়ার্নারের এই ৪০ বলের (যদি ধরে নিই ১০০ স্ট্রাইক রেটে রান করলে ওয়ার্নারকে মাফ করে দেওয়া যেত) অপব্যয়কে বিশেষভাবে অভিযুক্ত করার অজুহাত বৃথা, কারণ শ্রীলঙ্কা প্রায় ৩৫ বল হাতে থাকতেই ম্যাচ জিতে নেয় । তাই 'মোস্ট সেলফিস এক্ট' বলাটা বাড়াবাড়ি । নয় কি ? 

তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা অল-রাউন্ডার (টেস্ট এবং ওয়ান-ডে উভয় মিলিয়ে) জাক কালিস । তার 'সেলফিস অ্যাক্ট'টি হল ৬৩ বলে ৪৮ রানের একটি ইনিংস । এটিও অবিলম্বে বাদ দেওয়া যায় ।

খেলাটা ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত আইসিসি বিশ্বকাপের গ্রুপ লিগের ম্যাচ । প্রতিপক্ষ অপরাজেয় অস্ট্রেলিয়া । টার্গেট ৩৭৮ ! মেনে নেওয়া হল আগের বছরই ৪৩৪ রান তাড়া করে অবিশ্বাস্য এবং ঐতিহাসিক জয় লাভ করেছে এই টিম । কিন্তু এখানে সিচুয়েশান আলাদা ।এ বি ডিভিলিয়ার্স ও গ্রেম স্মিথ ঝোড়ো ওপেনিং স্টার্ট দিলেও (২০ ওভারে ১৬০), সেই ঝড়েই পাকা ফলের মতো উইকেট পরতে থাকে । তার মাঝে তিন নম্বরে ব্যাট করতে নামা কালিসের ইনিংসটা বিশাল 'সেলফিস এক্ট' !! কালিসের পর বাকি আট জন ব্যাটসম্যানের মোট রান ৫৬, সর্বোচ্চ মার্ক বাউচারের ২২ । ক্রিকেট খেলায় রান করতে গেলে পার্টনারশিপের দরকার হয় । কালিস পার্টনারশিপটা করবে কার সাথে ? এক্সট্রা রানের  সাথে ?

এক নম্বরে যাকে রাখা হয়েছে তার ইনিংসের তো কোনপ্রকার আলোচনারই প্রয়োজন নেই । প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপের (প্রুডেন্সিয়াল কাপ, ১৯৭৫) প্রথম গ্রুপ লিগের ম্যাচে (ওয়ান-ডে নম্বর ১৯!) ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সুনীল গাভাসকারের কুখ্যাত ১৭৪ বলে অপরাজিত ৩৬ রানের ইনিংসটি নাকি স্বার্থপরতার শিরোমণি' । বরঞ্চ সেই ইনিংসের জন্য সুনীল গাভাসকারকে আইসিসি সম্মান দেওয়া উচিৎ ছিল । সেই সময় একটা কথা প্রচলিত ছিল, ইন্ডিয়া ওয়ানডে ম্যাচও ড্র করার জন্য খেলে । তাহলে আইডিয়া করতে অসুবিধে নেই টিমের কেমন অবস্থা ! প্রতিপক্ষ, শক্তিশালী ইংল্যান্ড তাও আবার ঘরের মাঠে । ইন্ডিয়াকে ব্যাট করতে পাঠিয়েছে ৩৩৪ রান তাড়া করতে । সে সময় সেকেন্ডে ব্যাট করে কোনও টিম ৩০০ই তোলেনি তো করবে ৩০০ রান চেজ ! আর কেবল যে গাভাসকারই 'মোস্ট সেলফিস' ওয়েতে ব্যাট করেছেন, যদি পিটিয়ে খেলতেন তো জিতে যেত - তাও নয় । বাকিদের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে - আরেক ওপেনার একনাথ সোলকার করেন ৮ রান ৩৪ বলে, মিডল অর্ডারে বৃজেশ পটেল করেন ১৬ রান ৫৭ বলে । ৬ জন ব্যাটসম্যান তো ব্যাট করতেই নামেনি । ভুলে গেলে চলবে না ক্রিজে দুজন ব্যাটসম্যান থাকে, একজন না ।

সবার শেষে সচীন তেন্ডুলকর । তার শততম শতরানের ইনিংস, হায়রে, 'সেলফিস অ্যাক্টের' ফাঁদে পড়বে, একথা দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করা যায় না । যে খেলোয়াড় দলের হয়ে ৪৫০র ওপর ওয়ান-ডে খেলেছেন (টেস্ট ক্রিকেট বাদ দিয়ে), অসংখ্য ম্যাচ জিতিয়েছেন, দেশের অধিনায়কত্ব সামলেছেন (যদিও তা ধর্তব্যের বাইরে), ক্যারিয়ারের শেষ সময়ে যুবা টিমের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন, তিনিই তার শেষ ওয়ান-ডে ইনিংসে (যদিও না, এরপর আর একটি ম্যাচ খেলেন) করে ফেললেন 'মোস্ট সেলফিস অ্যাক্ট' ! এশিয়া কাপ, ২০১২ । বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ১০০তম ১০০টি সম্পূর্ণ করতে তিনি ১৩৮টি বল ব্যবহার করেন । শেষ ২০ রান করতে প্রায় ৪০টি বল নেন । স্ট্রাইক রেট মেরামত করার আগেই আউট হয়ে যান - স্কোর ১১৪(১৪৭) । বোর্ডে ২৮৯ রান তুলেও ম্যাচটি হেরে যায় ভারত । শেষ ১০০টি করতে সচীনের ৩৪টি ইনিংস লাগে । বয়স তখন ৩৯ । হতাশ সচীন স্বয়ং দায় চাপান মিডিয়ার ওপর । তার কথায়, 'সবাই কেবল ১০০টি সেঞ্চুরির কথা বলাবলি করছে; কেও ভেবেও দেখছে না ৯৯টি সেঞ্চুরি অলরেডি হয়ে আছে ।' ১০০ কোটি মানুষের বোঝা কাঁধে নিয়ে ২৪ বছর ধরে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন । নিজেই বুঝতে পেরেছেন এবার সরে দাঁড়ানোর সময়, নতুনকে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার সময় । তাই আর দেরি করলে চলবে না । কিন্তু সবাই মুখ চেয়ে বসে আছে ১০০টা ১০০র ! তাই এই 'সেলফিস অ্যাক্টের' দায়বদ্ধতা কেবল সচীনেরই না, তার ভক্তদেরও । 

উপরের আলোচনায় একটা ব্যাপার লক্ষণীয় যে, এলিয়ট করনিসের নির্বাচিত পাঁচটি ইনিংসই ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং ইনিংস এবং সবকটিই হেরে যাওয়া টিম থেকে ! অর্থাৎ, 

এক, বোলাররা যে 'সেলফিস অ্যাক্ট' করতে পারে এটি তিনি ধারণাতেই আনছেন না অথবা বোলারদের স্পষ্টভাবে অগ্রাহ্য করছেন । 

দুই, ম্যাচ হারলেই উইচ হান্টিংয়ের মতো স্বার্থপর খোঁজা হয়েছে । গাদাগুচ্ছের উদাহরণ পাওয়া যাবে, যেগুলোকে ঠিক একই মাপকাঠিতে স্বার্থপর বলা চলে কিন্তু সেগুলো ধামা চাপা পড়ে গেছে কারণ অ্যাট দি এন্ড অফ দ্য ডে টিম জিতে গেছে অথবা গোটা টিমই বিচ্ছিরিভাবে ব্যর্থ হয়েছে । 

তিন, মেথডলজিতেও গলদ আছে । কেবলমাত্র স্কোর কার্ড দেখে কি করে বলে দেওয়া যায় স্বার্থপর ? এলিয়ট করনিস বল নষ্ট করার ওপরই একমাত্র জোর দিয়েছেন । একবল খেলেও (এমনকি একটি বল না খেলেও) স্বার্থপরতা দেখানো যেতে পারে । নন স্ট্রাইকে থেকে স্ট্রাইকার ব্যাটসম্যানকে আউট করার নজির অজস্র । খারাপ শট খেলে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উইকেটটাকে বিসর্জন দিয়ে আসা, একপ্রকার স্বার্থপরতার পর্যায়েই পড়ে ।

 কি করে ? 

কারণ, ভুলে গেলে চলবে না ক্রিকেট একটি দলভিত্তিক খেলা, খেলা চলাকালীন (এমনকি ব্যাটিংয়ের সময়ও) একক খেলোয়াড়ের কোনও অস্তিত্ব নেই । তাই টিম বহির্ভূত চিন্তাভাবনাই স্বার্থপরতা - তাতে নিজের কথা ভাবা হোক বা না হোক । সে বিচারে টেকনিক্যালি সচীনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়ই । আবার জেন্টেলসম্যান গেমের  ডকট্রিনকে অগ্রাহ্য করাও চলে না ।

তাহলে কি স্বার্থপরতা বলে কিছু হবে না ?

স্বার্থপরতা বিচার করা, সামগ্রিক সমালোচনারই একটা অঙ্গ । ইতিবাচক, নেতিবাচক উভয় প্রকার সমালোচনার কথা মাথায় রেখেই স্বার্থপরতা বিচারকে সমালোচনার আওতা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়াই ভালো । কারণ স্বার্থপর একটি কঠোর শব্দ । ম্যাচ গড়াপেটা, ডোপিংয়ের মতো কলঙ্কজনক অপকর্ম অলরেডি ক্রিকেটের মর্যাদাকে খর্ব করেছে । টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে । শিল্প এখন একতরফা - ব্যাটিং, বলা ভালো পাওয়ার হিটিং । এর মাঝে যদি স্বার্থপরতার বেনো জল ঢুকে যায় , তাহলে স্বার্থপরতা ক্রিকেটের অঙ্গ এটি একটি বদ্ধমূল ধারণা হয়ে দাঁড়াবে - যেটি কখনই হতে দেওয়া চলে না । 

পুনশ্চ - যদিও ঘা খুঁটে লাভ নেই তবুও প্রসঙ্গ যখন উঠেছে তখন এই অ্যাক্টটির উল্লেখ না করে পারা গেল না । উইলস ওয়ার্ল্ড সিরিজ ১৯৯৪য়ের ভারত বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচে টসে জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ব্যাট করতে পাঠায় ভারত । ৫০ ওভার সম্পূর্ণ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৫৭ রান করে । ভারত ৪৬ রানে ম্যাচটি হেরে যায় । না অলআউট হয়নি । পুরো পঞ্চাশ ওভারই ব্যাটিং করে ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা (যদিও সাতজন অর্থাৎ ভারতের মাত্র পাঁচ উইকেট পড়েছিল) এবং তাদের মধ্যে সেসময়ের ভারতীয় দলের নির্ভরযোগ্য অল-রাউন্ডার মনোজ প্রভাকর সেঞ্চুরিও করেন । কিন্তু তার জন্য তিনি ১৫৪টি বল ব্যবহার করেন । তাকে সঙ্গত দেন উইকেটকিপার নয়ন মোঙ্গিয়া । তিনি ম্যাচ শেষে অপরাজিত ছিলেন (মনোজ প্রভাকরের সাথে) ৪ রানে, নিয়েছিলেন ২১টি বল । কমই! 

Wednesday, 12 July 2017

২০১৭, ১২ জুলাই

কেন্দ্রীয় চলচ্চিত্র অনুমোদন পর্ষদ (যা আমদের কাছে সেন্সর বোর্ড নামে অধিক পরিচিত) পরিচালক সুমন ঘোষকে স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছে - নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে কেন্দ্র করে তাঁর দ্বারা পরিচালিত আসন্ন 'দ্য আরগুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান' তথ্যচিত্রটি থেকে চারটি বিশেষ শব্দ মুছে ফেলতে । অর্থাৎ, পরোক্ষভাবে অমর্ত্য সেনকেই শব্দগুলি ব্যবহার করতে বারণ করা হয়েছে । সেই বিশেষ চারটি শব্দ হল -

গুজরাত, গো বা গাই (গরু ঠিক না), হিন্দুত্ববাদ এবং হিন্দু ভারত

প্রত্যাহত বীতশ্রদ্ধ বাঙালি সুমন ঘোষ সেই মুহূর্তে একটিমাত্র শব্দই বলতে পেরেছিলেন, যা পহেলাজ নিহালনি সহ উপস্থিত অন্যান্য অবাঙালিরা 'চুল' ভেবে অগ্রাহ্য করে যান ।

২০১৭, ৫ জুলাই

ল্যান্ড অফ লিবার্টি - মহান আমেরিকায় (পণ্ডিতেরা বলতে আসবেন না, আমেরিকা বলে কোনও দেশ নেই, সেটি মহাদেশ । চোখ বুজে রাখুন, একদিন খুলবেন, দেখবেন গোটা পৃথিবী আমেরিকা হয়ে গেছে) একটা কথা প্রচলিত আছে ('চল বোমা ফেলে আসি' বাদে) -

We, on this continent (America) should never forget, that man first crossed the Atlantic not to find soil for their ploughs, but to secure liberty for their souls.

অর্থাৎ, মহাসাগর পারি দিয়েছি ভোগদখলের খোঁজে নয়, মুক্তির খোঁজে ।

হরি ওম

২০১৭, ১২ জুলাই

সন্দীপ শর্মা - একজন হিন্দু সন্ত্রাসবাদী (অবশ্যই রাষ্ট্রের সীলমোহর সাঁটানো) পেয়ে অনেক আনুষ্ঠানিক লিবারেলই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন ।

('হিন্দু'টাও রাষ্ট্রের সীলমোহর সাঁটানো, সরকারি দলিল সাক্ষ্য দেবে)

২০১৭, ৪ জুলাই

দ্য ডিস (২০০০) সিনেমাটির একটি দৃশ্য (অ্যাপোলো ১১-র অভিযানকাল) :
মেয়ে বাবাকে (শহরের মেয়র) জিজ্ঞেস করছে (চাঁদে পা রাখার দিন, বিশ্বজুড়ে টিভিতে টেলিকাস্ট হবে সেই প্রসঙ্গে)
- ভারতের লোকেরাও কি টিভিতে দেখবে ?
- (বাবার উত্তর) অবশ্যই ! তবে সবাই মিলে একটা টিভিতেই । (ঘরে উপস্থিত সকলের হাসি)

২০১৭, ৩০ জুন

নট ইন মাই নেম - নতুন কিছু জিগির নয় । সমাজ-রাজনীতির বিভিন্ন স্তরে বহুদিন ধরেই এই বুলিটি ব্যবহৃত হয়ে এসেছে, তবে উদ্দেশ্য এবং আদর্শ উভয়েই ছিল বিপরীত এবং ন্যাক্কারজনক ।
যেমন - প্রোমোটারের কাছে নেতার ফোন আসছে, 'আপনার কমপ্লেক্সে একটা ফ্ল্যাট চাই বাট...নট ইন মাই নেম ।'
বাবার জেব খসিয়ে কিশোর ছেলে মোটর গাড়ির মালিক কিন্তু কাগজপত্র...নট ইন মাই নেম ।
ভগ্নহৃদয় কবিকে প্রাক্তন প্রেমিকার হুমকি, 'তোমার এই ছাইভস্ম কবিতাগুলো ছাপতে পারো কিন্তু...নট ইন মাই নেম ।'
এমনকি, খাওয়ার বেলায় আছি, কিন্তু খাওয়ার বিল...নট ইন মাই নেম ।
ইত্যাদি ।

Monday, 3 July 2017

২০১৭, ৩ জুলাই

সৌরভ গাঙ্গুলীর সাথে কি আর ধোনির তুলনা হয় । কোন জিনিসটাতে ধোনি সৌরভকে পিছনে ফেলতে পেরেছে ? না অধিনায়কত্ব, না বিদেশে টেস্ট জয় ! এমনকি এই কালকে বেশি বল খেলে ৫০ রানের গণ্ডি পেরোনোর কৃতিত্বেও ধোনি অনেক পিছিয়ে । দাদা সেটি করেছেন - একবার নয়, দুই দুবার । আর তার চেয়েও বড় কথা রান তাড়া করতে গিয়ে লোয়ার অর্ডারে নেমে স্লো ফিফটি সবাই পারে ! টসে জিতে ওপেন করতে নেমে কাওকে এরকম কৃতিত্ব করতে দেখেছেন কি ?

Sunday, 2 July 2017

২০১৭, ৩০ জুন

মাকে নিয়ে মারামারি -

দেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে একটা ব্যাপারে প্রশ্ন না করে থাকা যাচ্ছে না । ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের আগে কোথায় ছিল গোমাতার প্রতি এত ভালোবাসা, এত টান ? কোথায় ছিল তার স্বেচ্ছাসেবী সন্তানেরা ?
তাই স্বয়ং কবি কাজী নজরুল ইসলাম ফেসবুকে ছাড়লেন -

"মা গো ! আমায় বল্‌তে পারিস কোথায় ছিলাম আমি -
কোন্‌ না-জানা দেশ থেকে তোর কোলে এলাম নামি ?"

ব্যাঙ্গ-বিদ্রূপ সর্বস্ব সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রতিক্রিয়ার জোয়ার লেগে গেল । সঙ্গে সঙ্গে সুভাষ মুখোপাধ্যায় মজা করে টুইট করলেন -

"আমি ভীষণ ভালবাসতাম আমার মা-কে
-কখনও মুখ ফুটে বলি নি ।"

ও তাই নাকি ! এখন বলছি । মায়ের বিপদে সোচ্চার সন্তান ।

রবি ঠাকুর কি বসে বসে খালি রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস চেঞ্জ করবেন ! তিনিও দিলেন কয়েক লাইন পোষ্ট করে -

"‘আমি আছি, ভয় কেন, মা, করো !’
তুমি বললে, ‘যাস নে খোকা ওরে,’
আমি বলি, ‘দেখো-নাচুপ করে ।’
ছুটিয়ে ঘোড়া গেলেম তাদের মাঝে,
কী ভয়ানক লড়াই হল মা যে
শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা ।
কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে,
কত লোকের মাথা পড়ল কাটা ।।
এত লোকের সঙ্গে লড়াই ক'রে,
ভাবছ খোকা গেলই বুঝি মরে ।
আমি তখন রক্ত মেখে ঘেমে
বলছি এসে, ‘লড়াই গেছে থেমে,’
তুমি শুনে পালকি থেকে নেমে
চুমো খেয়ে নিচ্ছ আমায় কোলে
বলছ, ‘ভাগ্যে খোকা সঙ্গে ছিল’
কী দুর্দশাই হত তা না হলে !’"

- আচ্ছা যদি '১৯-এ ফের সরকার পাল্টায়, তখন ?
- স্বেচ্ছাসৈনিকদের নজরদারি লাটে উঠবে আর কি ।
- তখন গো-মা কোথায় যাবে ?
- চুলোয় ! ঘরের মায়ের কথা মনে পড়বে তখন...

দূরদর্শী অখ্যাত এক কবি সুফিয়া তার পারসোনাল ব্লগে সেই কথা ইয়াদ করে লিখলেন -

"শহর ছেড়ে গ্রাম
গ্রামের শেষে বাড়ি
বাড়ির সামনে পুকুর পাড়ে
মা ঘুমিয়ে আছে মাটির ঘরে
চারটি বছর ধরে।
আমি ঘুমাই দালান কোঠার ঘরে
নরম বিছানার পরে ।"

কিন্তু ফাইনাল হিটটা আসে পীতাম্বর দাসের থেকে (মতান্তরে মুকুন্দ দাস) । তিনি ১৮ বছরের একটি ছেলের লাইভ ভিডিও আপলোড করেন । ছেলেটি সেই দিনটির কথা অ্যান্টিসিপেট করে গাইছে -

"একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি..."

২০১৭, ২ জুলাই

ঘুঁটেঠাসা মগজ নিয়ে গরুর মুখোশ পরে রাস্তাঘাটে মেয়েদের প্রতিবাদ দেখে আর কেও হোক বা না হোক বারট্রান্ড রাসেল অবশ্যই খুশি হবেন ।

তাদের বক্তব্যটি কি ?

প্রথমত বলে রাখি, যে সমস্ত জড়বুদ্ধিসম্পন্ন আবাংদের উদ্দেশ্যে এইসব ব্যঙ্গাত্মক ডেমনস্ট্রেশান করা হচ্ছে তারা সোজা আঙুলের ঘি নয় । তাদের ওষুধ আলাদা ।

দ্বিতীয়ত, এইসব হালকা চালের খাস্তা বিদ্রূপ পেশ করে আসল সমস্যার গভীরতাটিকে রীতিমতো তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হচ্ছে । মানুষ কবে বুঝবে সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলকালাম করলে অভিজিৎ ভট্টাচার্য হওয়া যায়, সমস্যার সমাধান পাওয়া যায় না ।

তৃতীয়ত, গরুর সাথে মহিলাদের হেতু যোগ করার মানেটাও ঠিক পরিষ্কার নয় ! চাওয়া হচ্ছে, যারা বিফ খায়, তাদের অধিকার বজায় থাকুক । তাই তো ? তবে জবাইও চলবে ! এবার জবাই যারা করবে তারা তো গরুর মুখোশ পরা মেয়েদের খোরাকের চোখে দেখবে, ভক্তির চোখে নয় !

অর্থাৎ মেয়েরা তাদের বনেদি ফেমিনিজমের কচকচানিতে মুখোশ তুলে নিয়েছে, নাকি গো-ভক্তির নামে মানুষ মারার প্রতিবাদে ? নাকি স্রেফ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাঁওতা দিতে ? তারাই জানে ।

২০১৭, ২৮ জুন

এক, শতাব্দীর শুরুতেই কলঙ্কিত ক্রিকেট । খেল চর্চার অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায় ম্যাচ ফিক্সিং এবং বেটিং । পথিকৃৎদের মধ্যে মোহাম্মদ আজহারউদ্দীন, অজয় জাদেজা, হানসি ক্রনিয়ে, সেলিম মালিকদের মতো বাঘা বাঘা নাম উঠে আসে । প্রশ্ন ওঠে ক্রিকেট কি আদৌ জেন্টলম্যানস গেম ?

দুই, কেবল ২০০৩ বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের কোচ হিসেবেই নয়, জন জিওফ্রে রাইটকে মনে রাখা হবে ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রথম বিদেশি কোচ হিসেবেও । '৯০ এর দশকে কোচের ভূমিকায় প্রাক্তন খেলোয়াড়দেরই দেখা গিয়েছে ।

তিন, ক্যারি প্যাকারের ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেটের দৌলতে প্রথমবার ক্রিকেট খেলোয়াড়দের রঙিন পোশাকে খেলতে দেখা যায় । সেও বেশি দিন আগের ঘটনা না - '৭০ এর দশকের শেষ ।

চার, দুসরা ! সাকলাইন মুশতাক ! জনক ! সেও '৯০ এর দশক । (যদিও নামটা দিয়েছিল মইন খান)

অর্থাৎ ম্যাচ ফিক্সিং, বিদেশি কোচ, রঙিন জার্সি, দুসরা - এই ব্যাপারগুলো এমন কিছু সেকেলে না ।

নয়া ! তাই তো ?

ভুল ! সম্পূর্ণ ভুল !

কেন আমির খান অভিনীত আশুতোষ গোয়ারিকরের 'লগান' দেখেননি ? প্রায় ২০০ বছরের পুরনো ঘটনা অবলম্বনে !

(হিউজ প্রাইজ মানিও এই লিস্টে থাকতে পারে)
দীপ্তকীর্তি চৌধুরীর বই Cricket ! All You Wanted to Know about the World Cup থেকে

২০১৭, ১৩ জুন

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল, নাকি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া কারবার ! লর্ড মাউন্টব্যাটেন কি স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিলেন, তাঁর পরিকল্পনার জেরে 'গড সেভ দ্য কুইনের' বংশবদগুলো ফের একসাথে লড়াই দিতে একাট্টা হবে ! আইরনি - তখন ছিল না, এখন আছে - ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ।

২০১৭, ৩০ মে

সবাই দেখছে যে, কমরেড উলঙ্গ, তবুও
সবাই হাততালি দিচ্ছে ।
সবাই চেঁচিয়ে বলছে ; সেলাম, সেলাম !
কারও হাতে হাতুড়ি, কারও কাস্তে ;
কেউ-বা নিজের চাড্ডি গেঞ্জি লাল আলতায় চুবিয়ে নিয়ে এসেছে ;
কেউ-বা নৈরাজ্যবাদী, কেউ
কলামনিস্ট, রেডিক্যাল, অ্যাক্টিভিস্ট ;
কেউ ভাবছে, এই বুঝি আস্‌লি বিপ্লব, মগজে
ঢুকছে না যদিও, তবুও,
অন্তত হওয়াটা কিছু অসম্ভব নয় ।
তামাশাটা সবাই জানে !
কিন্তু সেই ভিড়ের ভিতরে
শুধুই স্লোগান-উচ্চারক কিছু
আপাদমস্তক বাঁচাল, ফন্দিবাজ অথবা আঁতেল
ক্যাডার ছিল না ।
একটি গরুও ছিল ।
দুগ্ধবতী, সরল, সিন্ধি একটি গরু ।
নেমেছে ডায়াস ছেড়ে কমরেড প্রকাশ্য রাস্তায় ।
আবার হাততালি উঠছে, সঙ্গে স্লোগান ;
জমে উঠছে
ক্যাডারদের ভিড় ।
কিন্তু সেই গরুটিকে আমি
ভিড়ের ভিতরে আজ কোথাও দেখছি না ।
গরুটি কোথায় গেল ? কেউ কি কোথাও তাকে
গোয়াল ঘরে বেঁধে
লুকিয়ে রেখেছে ?
নাকি সে ভুষি-খুদ-খড় খেয়ে দেয়ে
ঘুমিয়ে গেছে
কোনো গেরস্ত
বাড়ির উঠানে, কিংবা একান্তে দাঁড়িয়ে জাবর কাটছে ?
যাও, তাকে যেমন করেই হোক
ধরে আনো ।
সে এসে একবার এই উলঙ্গ কমরেডের সামনে
নির্ভয়ে দাঁড়াক ।
সে এসে একবার এই স্লোগানের ঊর্ধ্বে গলা তুলে
জিজ্ঞাসা করুক :
হাম্বাআআআআআআআ...

কৃতজ্ঞতা স্বীকার - নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
অনুপ্রেরণায় - তমোঘ্ন হালদার

২০১৭, ১০ জুন

রামপুরহাটবাসীরা,

ভাবতে পারছেন, আর কয়েকদিন পর যখন পাঁচমাথায় গিয়ে দাঁড়াবেন ; না, না, পকেট থেকে ফোনটা বের করতে হবে না, কিংবা হাতে ঘড়ি থাকলেও কনুইয়ে ভাঁজ দিতে হবে না - খালি মাথাটা খানেক তুলবেন - নবনির্মিত ক্লক টাওয়ারই আপনার 'কটা বাজলো'র উত্তর দিয়ে দেবে ।
তবে হ্যাঁ, একটু সাবধানে ! মানে, ট্র্যাফিক সিগন্যালের মতো সামান্য জিনিসটারই যা একটু অভাব ; এই ধরুন বিভোর হয়ে মেট্রোপলিটন ফিলিংস আনার চেষ্টা করছেন, আচমকা পিছন থেকে কানে বাজিয়ে সঙ্গে ঠুকে দিয়ে চলে গেল ।
মহকুমা হাসপাতালের নবীকরণ অর্থাৎ রিনোভেশান জাতীয় কিছু করা হচ্ছে কি না জানি না, তাই সেখানে গিয়ে মুগ্ধ হওয়ার কিছু থাকবে না, আশা করি ।

২০১৭, ২৬ মার্চ

এমনি জাস্ট জানিয়ে রাখছি - শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় যার তার ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করেন না, বেছে বেছে বন্ধু বানান । তাই তো তাঁর লক্ষাধিক ফলোয়ার । তবে কি না...তাঁর শেষ ১৫০ টি বন্ধুর মধ্যে ১০০ টিই মহিলা ।
(আমি কিছু কিন্তু মন্তব্য করিনি)
যাই হোক এবার তাঁর ফ্রেন্ড লিস্ট লুকানোর সময় এসেছে ।

২০১৭, ২৩ মার্চ

এতক্ষণে হয়তো ছড়িয়ে গেছে তেজ বাহাদুর যাদবের মৃতদেহ আবিষ্কার হয়েছে । যে মহাশয় আবিষ্কারটি করেছেন, গুগল তরজমা করে উনার নাম বলছে - আস্ফান্দিয়ার ভিত্তানি । ইনি পাকিস্তানি, নিজেকে রেসিস্ট বলে দাবি করেন ইত্যাদি ।
আমার বক্তব্য অন্যত্র ।
হ্যাঁ, আবার এটাও হয়তো অনেকে জেনে ফেলেছেন ব্যাপারটা একটা গুল । শর্মিলা যাদব স্বয়ং জানিয়েছেন ইত্যাদি ইত্যাদি ।
এখানেও আমার কিছু বলার নেই ।
এমনকি, বেশ কিছু পাকিস্তানির হাত-পা ছুড়ে মড়াকান্নাও আমার বক্তব্যের বিষয় নয় - আহাঃ সে দেখবার জিনিস !
আমার যত আহ্লাদ এই সিদ্ধার্থ বাকারিয়াকে নিয়ে । স্বয়ং সেবক । এবিভিপি । বিজেপি । ইনি দেখলেন, এবার তো সরকারের দিকে আঙুল উঠবে । আবার জেএনইউ সরগরম হওয়ার সম্ভাবনা, নেহি চলেগা, নেহি চলেগা - তাই নিজেই আগেভাগে প্রচার করতে লাগলেন - তেজ বাহাদুরের মৃত্যু 'সমাজতন্ত্রের ফল, নকশাল, মাওবাদীদের কার্যকলাপ ইত্যাদি ইত্যাদি।'
বিঃদ্রঃ - এক, সিদ্ধার্থ বাকারিয়া আবার নিজেকে গ্রন্থানুরাগী বা বিবলিওফাইল বলে দাবি করেন ।
দুই, আমার অতো নলেজ নেই, তাই সন্দেহ আছে, তেজ বাহাদুরের মতো লোকের জন্য কি জেএনইউ নারা লাগাবে ! না মানে...

২০১৭, ১২ মার্চ

নিঃসন্দেহে আজ রাজ্য জুড়ে অনেক সাংস্কৃতিক মঞ্চের নাম রাখা হয়েছে 'কালিকাপ্রসাদ মঞ্চ' এবং নিঃসন্দেহে যারা এই নামটি নির্বাচন করেছেন, তথা যারা সমর্থনসহ বলেছেন, 'এর চেয়ে আর উপযুক্ত কিইবা হতে পারে !' তারা অজান্তেই, তা যতই সূক্ষ্ম হোক না কেন, কালিকাপ্রসাদের মৃত্যুকে আহ্লাদের অবকাশ হিসাবে ব্যবহার করেছেন । বিজ্ঞানসম্মতভাবে বললে, 'অভ্যাসগত প্রতিবর্তের হেতু মনুষ্য অবচেতনে, আরোপিত চাহিদা এবং তদুপযোগী উপস্থিত উপকরণের মিথষ্ক্রিয়াজাত' আহ্লাদ হল এই আহ্লাদ এবং এটি সম্পূর্ণ ভণ্ডামিমুক্ত নয় । গোদা বাংলায় বললে, কালিকাপ্রসাদের মৃত্যুতে এতদিন তাঁরা শোকাহত আত্মীয়ের ভূমিকা পালন করছিলেন, আজ তাঁরা খোল-করতাল নিয়ে কীর্তনিয়ার দলে যোগ দিয়েছেন । অথবা বলা যায় কাল ছিলেন রোগীর ঘরের লোক, আজ হয়েছেন ডাক্তার বা নেহাৎ কম্পাউন্ডার (শ্মশানের ডোম বলতে চেয়েছিলাম, দেখলাম সদ্য নির্বাপিত বর্ণাশ্রমের সুপ্ত আগ্নেয়গিরি উস্কে দিয়ে লাভ নেই) । জবানবন্দিতে - 'কেও তো চায়নি যে মরে যান কিন্তু মরে গেলে কি আর করা যাবে !' অর্থাৎ তাঁরা অতটাও শোকস্তব্ধ নন যে বসন্তোৎসব পালিত হবে না, মঞ্চ দাঁড়াবে না, হবে না গান-নাচ-ফুর্তি । আনন্দ করে ঘরে ফিরেছেন অনেকক্ষণ হল, কিন্তু মঞ্চ ফাঁকা রয়ে গেল - কালিকাপ্রসাদের মঞ্চ ।

২০১৭, ২ ফেব্রুয়ারি

বিশ্বজুড়ে আমেরিকার দরিয়াদিলির প্রচার চলছে। মা রে, কি মহান উদার দেশ - স্বৈরাচারী ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে পড়ে জাহান্নমে যেতে চলেছে। কেশ! ডোনাল্ড ট্রাম্প তো এক অনিবার্য পরিণতি মাত্র...

২০১৭, ২৬ ফেব্রুয়ারি

একান্ত ভক্তের ভক্তির প্রদর্শন কি কেবলমাত্র পোষ্টের পরিপাটিতেই সীমাবদ্ধ?

২০১৭, ৪ জানুয়ারি

হিন্দু হলেও, কোনও এক উপলক্ষে খ্রিষ্টানদের চার্চে বসে গীটার বাজানোর পরিণামে ভোপাল নিবাসী বিশাল মিত্রের সঙ্গে রিতু দুবের বিয়ে আটকায় স্থানীয় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্মীবৃন্দ - নেতৃত্ব দেন প্রাক্তন বজরং দলের আয়োজক এবং বর্তমান বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা দেবেন্দ্র রাওয়াত।

এ তো গেল কপি পেস্ট। তবে এর থেকে অনুসিন্ধান্তগুলো কীরকম করা যেতে পারে ভাবতে পারছেন? (জানি না বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রোপ্যাগান্ডাতে আছে কি না, তবে অসম্ভবও নয়) যেমন আমি কয়েকটা বলি -

১) বিয়ের অনুষ্ঠানে বিসমিল্লাহ্‌ খানের সানাই বাজালেই ধরবে,
২) যদি ভেবে থাকেন বিয়েতে বিরিয়ানির আইটেম রাখবেন তবে এখনই তা খারিজ করুন, কারণ ধরবে,
৩) একেবারে চলে যায় ফুলসজ্জায়, খালি এটুকু বলি, যা করবেন করুন, খ্রিষ্টান অধ্যুষিত ওয়েস্টার্ন কেরামতি করবেন না, কারণ, বলা যায় না, ধরবে,
৪) হানিমুনের কথা ভুলকরেও মুখে আনবেন না, মধুচন্দ্রিমা শব্দটি ব্যবহার করুন। যাই হোক মধুচন্দ্রিমায় গিয়ে লঞ্চে-বোটে চেপে রস করতে বৌকে নিয়ে টাইটানিক পোস দেবেন না, কারণ, টাইটনিক কম, কর্মীরা রিডিমার ক্রাইস্ট বেশি বুঝবে, ফলে, সেখানেও ধরবে,

আর খেয়ালে আসছে না। আপনারা ভাবতে পারেন।

২০১৬, ১২ ডিসেম্বর

দেখি অনেকের একুশেই কলেজের পাঠ শেষ কিন্তু চাকরী পেতে পেতে সেই ত্রিশ। আবার অনেকে কলেজের মুখই দেখল না, অথচ বেশ কয়েক বছর ধরে মাইনের টাকা গুনে যাচ্ছে। অনেকে সখ করে সিঙ্গেল মম হচ্ছে অথবা পরিস্থিতিতে ড্যাড, আবার অনেক দম্পতির অনেক বছর হয়ে গেল, এখনও ছেলেপুলে হয়নি। ঝুড়ি ঝুড়ি ইন এ রিলেশানসিপের স্ট্যাটাস দেখি, আবার দেখি ফরএভার অ্যালোনের শেয়ার। বলতে চাইছি, প্রত্যেকেরই জীবনটা ব্যক্তিগত এবং সময়ের সাথে বাঁধা। বন্ধুদের দেখে ভাবি, 'কোথা থেকে কোথায় চলে গেল' অথবা 'কি ছিল, কি হল' - আদৌ কি তাই? মোটেই না। তাদের জীবন বইছে তাদের নিজের নিজের খাতে, নিজের নিজের তালে। তাই বলি, লাগাম শক্ত করে ধরে রাখো, সামনে খাদ তাই পড়বে ভেবোনা, আসলে লাফ দেওয়ার সময় এসেছে।

পেলাম (জুলিসা লোয়েশা বলে কে জানি একজন লিখেছেন)

২০১৬, ২১ ডিসেম্বর

ভারতবাসীর ইতিহাসচেতনা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে। সন্তানের পছন্দমতো নাম রাখাতেও মা-বাবার সাধ আহ্লাদ আজ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। অন্যদিকে ঐতিহাসিক কিংবদন্তীদের গায়ে এঁটে দেওয়া হচ্ছে মামুলি ঠগ অনুপ্রবেশকারীর তকমা। ধর্মের চশমায় আজ তাই তৈমুরকে দেখি খালি হিন্দু মন্দির ধ্বংসকারী বিভীষিকা রূপে, ভুলে যাই 'লোহা' বা 'সাহসী রাজা'র আখ্যান। সত্যিই, নামে কি যাই আসে? যে জাঁকিয়ে তোলে, তাঁর কাছেই চিরকালের স্বত্ব চলে যায়। তাই সিংহের পরিচয় হারিয়ে 'ওসামা' আজ সন্ত্রাসের প্রতীক।

খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে।
রামরাজ্যে ঢোকার হুকুম সেকিউলারের বেশে।।

২০১৬, ১৮ নভেম্বর

ভারতবর্ষে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২২,৫০০ লোক মরছে। এর মধ্যে সবই তো আর, 'বাবুজি কি উমর হো চুকী থী' টাইপের পাবলিক নয়; সুইসাইড, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, 'বড্ড ভালোমানুষ ছিলেন, কি থেকে কি হয়ে গেল' টাইপের অক্কা পাওয়া পাবলিকও আছে। আছে প্রচুর চাষাভুষো, মজুর, ভিখিরি, মাতব্বর, মাতাল। কেষ্টবিষ্টুরা বাদ! ব্যাস! যেকটা মালের জন-ধন অ্যাকাউন্ট আছে, লাগাও তকমা, 'ডিমনিটাইজেশান ডেথ টল' - ৫০০-১০০০ এর ভূত দেখেই যেন ফটো হয়েছে। মরার দুদিন আগে এটিএমের লাইনে দেখা পেলে তো আর কথাই নেই।

এই ধরনের কথা সত্যিই অসভ্যতা। মানুষ মরছে, এই নিয়ে ইয়ার্কি!

আসলে মানুষ যে মরছে, আর তার খবর যারা আপনার কাছে পেশ করছে তারাই আসল আড্ডাটা দিচ্ছে। ৫০০-১০০০ এর ফাঁপরে টসকে যাওয়াদের জন্য যারা মড়াকান্না কাঁদছে, তারা হচ্ছে পলিটিক্যাল মাদারি - আপনাকে বাঁদর বানিয়ে নাচাবে। বার্ড-ফ্লু বা ডেঙ্গুতে লোক মরলে তাদের কিছু যাই আসে না। ভূমিকম্পে কজন চাপা পড়ল, সে নিয়ে তাদের কোনও মাথাব্যথা নেই। কিন্তু কজন চাষা গলায় দড়ি দিল বা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাকে গুম করে দেওয়া হল - দেখবেন ডেমনস্ট্রেশন! যে কোনও ইস্যুতে পলিটিক্যাল ইন্টারেস্ট থাকলেই হল - ন্যাংটো হয়ে রাস্তায় গড়াগড়ি খাবে। 'নেহি চলেঙ্গে! নেহি চলেঙ্গে!' তাছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে কি আর 'ভারত তেরে টুকরে হোঙ্গে - ইনশাল্লাহ! ইনশাল্লাহ!' তখন চুপ মেরে থাকাই ভালো!

তাই বলছি, রাস্তায় রাস্তায় টলি বা টোটো করে ঘোরা দানপেটি বা চাদরে সিক্কা ছুঁড়বেন না, যান, এই তো কয়েক পা গেলেই মন্দির-মসজিদ পেয়ে যাবেন।

২০১৬, ১০ নভেম্বর

৫০০-১০০০ এর কিচির-মিচিরের ফলে কয়েকটি ব্যাপার পরিষ্কার হল, অন্তত আমার কাছে -

১) কার কেমন বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা,
২) কার রাজনৈতিক ঝোঁক কোনদিকে,
৩) কার কি ধরনের সামাজিক মানসিকতা - উদার না সঙ্কীর্ণ,
৪) (এটা অবিশ্বাস্য, কিন্তু সত্যি) কার বিড়ি-সিগারেটের রুচি আছে,
৫) কার দেশের চিন্তা কম, আমেরিকার চিন্তা বেশি, এবং,
৬) কার, ভাই, কিছুই এসে যায় না...

২০১৬, ৮ নভেম্বর

পৌরসভা যদি ঘোষণা করে কাল সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ 'থাকিবে' (আমাদের পৌরসভা এখনও সাধুতে আটকে), তাহলে ভোর থেকেই কাইকুই রাগারাগি শুরু হয়ে যায়। এবার আটটায় ভাগা বিদ্যুৎ যদি বেলা এগারোতেই ব্যাক করে তো ফের স্বস্তির নিঃশ্বাস। যাক বাঁচা গেল। কিন্তু আমরা বেমালুম ভুলে যায় ঘন্টা তিনেকের বিদ্যুৎ চুরি। এই ধরনের পলিটিক্যাল ফেট্টি প্রচুর মিলবে। সরকার ছুঁচোবাজি ছেড়েছে - আপার ক্লাসদের দিয়ে চাষাভুষো থেকে দিন আনি দিন খাই'দের ডিমোরালাইজ করার জন্য। যে দেশে ২৭ কোটি এককথায় ভিখিরি, তাদেরকে ভুলে ১২ কোটি ফেসবুক ইউজারের কান্না বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নাজিব আহমেদ কই? তার লাশ কি পৌছল মায়ের কাছে? কাশ্মীরে ঠাণ্ডা পড়েছে কি খুব? ২৯ লাখ একনও এইডসের কবলে। ক্রমশ...

২০১৬, ৯ নভেম্বর

আমেরিকা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে -

শিক্ষা, বানিজ্য, চিকিৎসা, আত্মীয়তা এবং ভ্রমন - এগুলোকে বাদ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যে সমস্ত সুবিধাভোগীরা, বিশেষত মেয়েরা দেশে নোংরা ছড়িয়ে, শেষে আমেরিকায় ঘর-সংসার পাতার আকাশ-কুসুম স্বপ্ন দেখছে, তাদের জন্য কি কিছু ব্যবস্থা নেবেন নতুন রাষ্ট্রপতি? না কি তাঁর 'অ্যান্টি-ইমিগ্রেশন' ভাবমূর্তি নিছক ধাপ্পাবাজি মাত্র!

বিপদও কি বিপদে পড়ে?

২০১৬, ৭ নভেম্বর

স্পেশাল ইনভেস্টিগেশান টিম! এক থেকে বাড়িয়ে দু'লাখ মিলবে যদি খবর দেয়! রাষ্ট্রপতির কাছে আর্জি! এসব যেন বুঝেও না বোঝার ভান। অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের পারিষদকে সপাটে থাবড়া দিয়ে হাওয়া নাজিব আহমেদ, আজ ২৩ দিন হল। যেখানে মুসলমান ছাত্রদের থেকে গেরুয়া-খাকির কোনওপ্রকার সমালোচনা শুনলেই তামাম মায়ের দালালরা আইএসআইএস তকমার রাষ্ট্রীয় ভাতা জুটিয়ে দেয়, সেখানে কি করে নাজিব আহমেদকে জলজ্যান্ত ফিরে পাওয়ার আশা রাখে মিডিয়াসর্বস্ব দেশবাসী? কিন্তু মায়ের মন কি আর অত সহজে মানে। ছেলে আসবেই ধরে বসে আছেন। আর আমরা কোনান ডয়েলের ভক্ত, মরা শার্লককে ফেরানো যায় তো, লাপতা নাজিবকে নয় কেন? আসবে, নাজিব আহমেদ আসবে। হয়তো খান দশেক বিগ বাজারের পলিথিন ব্যাগে। পাহাড়গঞ্জের বস্তিবাসীরা আনবে, দিয়ে দু'লাখ বিশ-পঁচিশ হাজারে ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়ে যাবে। রাতে মুরগী জবাই পার্টি হবে।

২০১৬, ১ নভেম্বর

মাকে এবছর মামার বাড়ি নিয়ে যাওয়া হল না। তাই বলে কি আর শাস্ত্র ক্ষান্ত দেবে!
বলে, 'তো ক্যায় হুয়া? যতদিন দাদারা থাকবে ততদিন ফোঁটা দিতে হবে।'
এবার তো হাতের কাছে নেই, তবে দেবে কোথায়?
বলে কিনা - 'দেওয়ালে!
যুগযুগ জিও শাস্ত্রাচ্ছন্ন হিন্দুর সংস্কৃতি - মেনে নিলাম তোমার বিধান। বলি হ্যাঁ, ওদিকেও কি মামাদেরকে দেওয়ালে মাথা ঠুকতে হবে নাকি?

২০১৬, ২৩ অক্টোবর

ইন্ডিয়া জিতেছে...ভালো সময় যাচ্ছে। কাল কবাডি, আজ হকিতে আন্ডার ১৮ আর সবকা বাপ ক্রিকেট। তাই বলে 'কুদোস' 'কুদোস' করে কোঁতাকুতির কি আছে! উপভোগের চেয়ে কতক্ষণে বাতেলা ছোঁড়াছুড়ি করবো, সেই দিকে তাল। এই ওই করে কিছু সাঁটিয়ে সঙ্গে 'লল', 'রওফল', 'বিআরবি', 'এএফকে', 'ডব্লুটিএফ' কত কি! বাংলা ভোগে। তাই কবি বলছেন -

মেরে গেছে পিছু ইংরেজে, তাই বুলসিট বলি মুখে
কাঠি খেলে ঠিক, রেগেমেগে চার অক্ষর ছাড়ি সুখে।

পাঁচ অক্ষর, ছয় অক্ষর, সাত অক্ষর...টু বি কন্টিনিউড

২০১৬, ২ অক্টোবর

আজকের এই বিশেষ দিনটিতে কি বছরব্যাপী - টাকায় মুক্ত কেশলুপ্ত বৃদ্ধের প্রতিচ্ছবি নয়, গুপ্ত কেশলুপ্ত বীরের প্রতিচ্ছবি চাই, এর হরতাল বন্ধ থাকবে?

২০১৬, ২৯ সেপ্টেম্বর

গদিতে পোঙা গুজে আদিখ্যেতা - 'জয় জওয়ান।' গিয়ে ঠোকাঠুকি করো - আমি বহাল বাতেলা ছাড়ি। 'জয় হিন্দ!' বেহায়া ছোকরা, যা তোর মাকে গিয়ে বল, এবার বিজয়ায় সিঁদুর মাখামাখিটা ভালো করে করতে; বাপ টস্‌কে গেলে হোয়াইট ওয়াস। কার কি যায় আসে! উরির ১৮ এখন ব্যাকডেটেড। সব শালা এস.সি. এস.টি. গেঁয়ো। কই পৈতে, পৈতে কই? নাকি সে রিসার্ভ বাংলা টেলির ইষ্টিকুটুমে - মা-কাকিমাদের চোখে কলসি। এদিকে দাঁড়ি-টুপি মুসলমানের পাক-তুলোধনায় উথলে ওঠে একই বোঁটায় দুটি কুসুম। আর কাইকুই দেখলে যা বেটা পাকিস্তান। থুতু ছেটাছিটিতেই দেশভক্তের অঞ্জলি। আর একটা দোসর আছে - চকদে! আজ সার্জিক্যাল, ভোরে 'জাগো তুমি জাগো' দিয়ে ধূম পড়বে ওয়াচিং এস.এস.ধোনি অ্যাট সুইট হোম। ওদিকে ঘরে লাশ পৌছবে কবে?

মালাউনই বটি। ঘরে মা লাল পর্দা ঝোলায়।

২০১৬, ২৩ জুলাই

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্বনামধন্য তসলিমা নাসরিনকে খবর পাঠাচ্ছেন, যে পরের বার কলকাতায় এলে বাংলাদেশ থেকে যেন গরুর মাংস নিয়ে আসে, খাবেন।
(দ্বিখণ্ডিত)
দেশের তিনকোটি গরুর মধ্যেও কি তিনি তাঁর স্বাদের গরু খুঁজে পেলেন না, যে পদ্মার ইলিশ ভুলে খোদ ওপার বাংলা থেকে গরু আবদার করে বসলেন?
কেন জানেন?
কারণ,
জামার নীচে পৈতে আর আস্তিনের তলায়
তাবিজ ঢেকে
এক নৈকষ্য কুলীনের ছাঁ
আমাকে পরিষ্কার বোঝাল
দুনিয়াটাকে কীভাবে বদলাতে হবে।।
(২, দুয়ো, এই ভাই, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা)

২০১৬, ১৫ জুলাই

প্রথম: মনে আছে তো, একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের হস্তক্ষেপে কি হয়েছিল?
দ্বিতীয়: কাম লোপাট, পূর্ব পাকিস্তান হাতছাড়া...
প্রথম: আই এস ঠিক একই ভয় করছে।
দ্বিতীয়: তাহলে কাশ্মীরে একটা পাঁঠা বলি দিয়ে আসি?

২০১৭, ২৮ মে

মাধ্যমিকের সাফল্য দূরদর্শনের স্টুডিয়োতে বসে মহাকাশচারীর মহড়া দেয় । উৎসবে সামিল লাখো পরিচয়, তবু ঢাকা পড়ে যায় হাতে গোনা মুখে । বছর ঘুরলে ফের রঙিন পোস্টার চাপে । সংবর্ধনার ফর্দে কেবল নামগুলো নতুন । রতনের রোশনাই বাড়ে বছরে বছরে । তেমনই বেড়ে চলে হারিয়ে যাওয়া প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় মুখগুলো । শংসাপত্র বনে রয়ে যায়, গৃহশিক্ষকের শ্রীবৃদ্ধিতে খরচ হয় খালি ।

যারা স্বপ্ন দেখে, তারা মাইক-ক্যামেরার অপেক্ষা রাখে না...

২০১৭, ২০ মে

লোডশেডিং মনে পড়ে ? সেই আগে আসতো...

এই তো এবারেরই ঘটনা । হাওড়ার ঘুসুড়ি এলাকায় স্থানীয় প্রতিভামণ্ডলী (কি ভাবছেন, প্রতিভা কি কেবল আপনার এলাকাতেই ধরে) রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে ছোট্ট করে সান্ধ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে । জেনারেটরের চাঁদাটা ওঠেনি খালি (আইপিএলের টিকিটের সাথে কম্প্রোমাইজ করতে হয়েছে, সেকথা আমি বলছি না) তবে বাকি সব টিপটপ । পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্ষদের ওপর অগাধ ভরসা রেখে অনুষ্ঠান শুরু হয় । এগোয়ও ভালো । উঠতি কবিরা স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন (নিন্দুকেরা বলবে শব্দ-ছন্দের দেদার বাওয়াল) । নাচনকোঁদন তো ছিলই । ছিঃ ! ছিঃ ! থুড়ি ! থুড়ি ! নেত্ত...নৃত্য পরিবেশন করেন পাড়ার বিউটি কাকিমা ( শেষ নেচেছিলেন বিয়ের আগে বাপের বাড়ির পুজোর বিসর্জনে । কোনও এক অজ্ঞাত কারণে তার পরই উনার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়) । অবশেষে বিদায়ী সঙ্গীত (তাই তো বলে, নাকি) পরিবেশন করতে মঞ্চে ওঠেন লোকাল হেমন্ত । হারমোনিয়ামে খানেক প্যা-পো করে যেই গলা ছাড়তে যাবেন - সাপের পাঁচ পা ! ব্ল্যাক আউট !

কারেন্ট গ্যয়া...
এ শুরু হল আবার...
এই বলেছিলাম জেনেটারের ব্যবস্থা করতে...
আবার সেই আগের মতো...
ত্যার বাআ...

লোকাল হেমন্ত চা-খেকো আড্ডাবাজ ভাবুক কাম রসিক টাইপ । গলা খাঁকারি দিয়ে সবাইকে চুপ করিয়ে, খালি গলায় বিদায়ী সঙ্গীত শুরু করেন । ভয়ঙ্কর রকমের প্রাসঙ্গিক । রীতিমতো ভেংচি...

প্যা-পো-পা-পু-পু-পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়...

২০১৭, ২২ মে

বছরে এই আজকের দিনটা খুবই আহ্লাদের হয় । ভারতবর্ষের ক্রিকেটপ্রেমীরা গত দু'মাসের হাঁপিয়ে ওঠা ফুর্তি-আনন্দের ঘোর কাটিয়ে পুরনো স্বাচ্ছন্দ্যে ফিরে আসে । মনে পড়ে যায় - এই দু'মাস আগেই একটা স্মরণীয় হোম সিজন শেষ করে এসেছে । সামনে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি । আজ থেকে সন্ধ্যের আড্ডায় কেকেআর আর আরসিবিকে নিয়ে দলাদলি বন্ধ । স্কুল, টিউশন হোক বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ - গৌতম গম্ভীরকে নিয়ে মাথাব্যথাটা কেকেআর সমর্থকদের গণ্ডি পেরিয়ে সুদূর নাগেরকোয়িলে দিল্লীর সমর্থকদেরও মাথাব্যথা হয়ে উঠবে । পঞ্জাবের উন্মাদ সমর্থকেরা (প্রীতি জিন্টারও হতে পারে) রবীন উত্থাপ্পা বা সুরেশ রায়নাকে জাতীয় দলে ফেরাবার দাবীতে শোরগোল শুরু করতেই পারে । হায়দ্রাবাদবাসী বিরিয়ানি-বিক্রেতার শোরগোলটা পুনের রাহুল ত্রিপাঠি বা দিল্লির ঋষভ পন্থকে নিয়ে হলে, অবাক হওয়ার কিছু নেই । অন্ধকার গুহা থেকে বেরিয়ে ফের অধিনায়কত্বের ব্যাটনটা তুলে ধরবে বিরাট কোহলি - লাল-কালো-জিও বিরাট কোহলি নয়, ম্যান-ইন-ব্লু-ওপো বিরাট কোহলি । দোরগোড়ায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান । ৪ জুনের অপেক্ষা...
দুঃখ খালি একটাই । সেই দিনটিতে এমন কয়েকজনকে পাবেন যাদের আনন্দের সাথে আপনার আনন্দটাকে ঠিক খাতে মেলাতে পারবেন না । কি আর করা যাবে...

২০১৭, ৩ মে

বাহুবলী ২ সিনেমাটি মাত্র ৩ দিনেই ২১টি রেকর্ড ভেঙ্গেছে । ঋতুপর্ণ ঘোষ কেন মাত্র ৪৯য়েই বিদায় নিলেন তা আন্দাজ করে নিন্দা রটানোর ইচ্ছে আমার নেই ; কিন্তু যারা গতকাল '৯৬ বছর বয়সেও মানুষ বাঁচে...'র ন্যাকামো করছিলেন, তারা মানিকবাবুকে জন্মদিনে কি উপহার দিতেন, সেটি খুব জানতে ইচ্ছে হয় ! সৃজিতের খিস্তি ? রি সেনের পুসি ? কোঁয়াশিক মুখার্জীর গান্ডু ?

বিশ্বাস করুন, দেবকে পেলে বরঞ্চ খুশিই হতেন । ছেলেটা অন্তত ডায়লগ্ বলে, চাটাচাটি করে না ।

২০১৭, ৭ মে

রাজকাহিনী দেখলাম । সমালোচনা করতে বসিনি, যদিও অনেককিছুই বলা যায় । কেবলমাত্র একটি জিনিস না বলে পারছি না । সৃজিত মুখোপাধ্যায় জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে বেগম জানের কোঠা বাড়িটি সুন্দরভাবে সাজিয়েছেন । হিন্দু, মুসলমান, বাউরি, বাগদি, কে নেই, এমন কি কমলা ঠাকুমাও আছেন । কেবলমাত্র একটিও চিঙ্কি নেই । আমি সেরকম ইতিহাস সচেতন নই । বাংলার গনিকালয়গুলিতে চিঙ্কিদের অনুপ্রবেশের সন-তারিখ আমার জানা নেই । সে কি স্বাধীনতার পরে ? স্বাধীন ভারত সরকারের নর্থ-ইস্ট উন্নয়ন পদক্ষেপের পরে অনুপ্রবেশ শুরু হয় ? নাকি ধরে নেব, সৃজিতবাবু তাঁর ব্যক্তিগত রুচিবশত বেগম জানের কোঠায় চিঙ্কিদের ব্রাত্য রেখেছেন ? কারণ, বর্তমান বেগম জানদের কোঠায় চিঙ্কিদের প্রোপরশান নেগলিজেবল নয় ।

২০১৭, ২৬ মার্চ

ক্লাস এইটের ছেলেমেয়েরা অনেককিছুই বোঝার ক্ষমতা রাখে । বোঝার ক্ষমতা রাখে, এতক্ষণ ধরে একটি ছেলেকে যাচ্ছেতাই মারার পর হঠাৎ কেন ছেলেটির নাম শুনেই স্যরের ভোল পাল্টে গেল ? ভীষণ মূর্তি ছেড়ে কেন তিনি বিনয়ের বাটি বনে গেলেন ?

'বাবুসোনা তোমার বাড়ি কোথায় ? ভাত খাবে না, বাবুসোনা ? থালা আনোনি ? আমি থালা কিনে দেব ?'

এই পদস্খলনের পরিণতি যখন ঘৃণা হয়ে ফিরে আসবে, তখন সাধের কবিতা দিয়েও তাকে ঠেকানো যাবে না ।
(খোলা খিস্তিখেউরের কথাগুলো না হয় বাদই দিলাম)

২০১৭, ২২ মার্চ

বর্তমান বাংলার কতিপত উচ্চবিত্ত শিক্ষিত সম্প্রদায় , যারা নিজেদেরকে ফিলানথ্রপিস্ট বুদ্ধিজীবী বলে দাবি করেন , তাদেরকে নির্দ্বিধায় ষষ্ট শ্রেণীর পরিবেশ ও বিজ্ঞান বিষয়ের পাঠ্যক্রমের মিথোজীবী অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করা হোক । গোবক ও গরুর উদাহরণের পাশাপাশি এই ধরনের নমুনা বুদ্ধিজীবীদের সচিত্র নিদর্শন নিঃসন্দেহে ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ বৃদ্ধিতে কার্যকারী হবে ; কারণ তাদেরও যে মানুষের মতো হাত-পা-ত্রিশূল আছে ।

মিথোজীবী কেন ?

কারণ , একজন কবিতা লিখলেন । কিন্তু কেও খাবে না । তখন একদল মোসাহেবকে সেটি নিয়ে দহরম-মহরম শুরু করতে হয় । সমালোচনার আড়ালে চলে প্রোমোশানের ব্যবসা । এছাড়া আছে সদ্যোজাত চাটুকার বালক-বালিকার দল । 'কি দিলেন দাদা' , 'চাবুক' , 'পুরো বাণী' - স্লোগানে স্লোগানে তোষামোদের হাতেখড়ি । এর হাতে তার ঢাক আর তার হাতে ওর খঞ্জনি । পুরো ঘাড়ে ঘাড় মিলিয়ে চলে মিউচুয়াল চামচাগিরি । এদিকে জুটেও যায় চেলাচামুণ্ডা । 'আপনার লেখাটা পড়ে কারকোজিয়ান রাইটার ভিকতর নাভোরস্কির কথা মনে পডে গেল ।' মাথাচুলকানো হাভাতাদের থেকে মিলে যায় সম্ভ্রম । আর কি চাই ! কেও বেগরবাই করতে এলেই চাড্ডি ফাড্ডি বলে , দু'চারটে কাঁচাপাকা কেতাবি বুলি হেদিয়ে ভাগিয়ে দাও ।

তাতে লাভ ?

'আনন্দ' , নিদেনপক্ষে 'দে'জ' - শ্রেষ্ঠ কবিতার বৌছার ।

বিঃদ্রঃ - নমুনা শব্দটিকে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ।

২০১৭, ২১ মার্চ

কবি শ্রীজাত স্মরণে -

সকাল থেকে ট্রিমারটি খুঁজে পাচ্ছেন না কবি । গেল কোথায় ? মুখভর্তি আগাছাগুলোকে সাফ করতে না পারলে যথারীতি সমস্যায় পড়বেন । ইউরোপ ভ্রমণে এসেছেন, অলরেডি অনেক জায়গা ঘোরাও হয়ে গেছে ; অথচ পোষ্ট দেওয়ার মতো ভালো ছবি তোলা হয়নি । ডি এস এল আরটা ব্যাগে ঢোকাতে ভুলে গিয়েছিলেন - যতই হোক কবি বলে কথা ! তাই বন্ধু দম্পতিকে পইপই করে বলে দিয়েছেন - সঙ্গে ক্যামেরাটা আনতে । তারা যোগ দিলে পম্পেলি ঘুরতে যাবেন । কিন্তু এই দশায় ! কোঁকড়ানো দাড়িগুলি সাধের ফ্রেঞ্চকাটটিকে ফ্যাকাশে করে দিয়েছে । দুই কানের পাশে তুলসী চক্রবর্তী স্টাইলে খাড়া খাড়া চুলগুলি সুড়সুড়ি দিচ্ছে । এই রূপ দেখলে পরে কবিতার শেয়ার কমে যাবে । তাই কবি যথারীতি বিরক্ত হয়ে লিখেই ফেললেন -

সময়ে ওষুধ, নইলে বেড়ে যায় সবরকম রোগই...

হ্যাঁ রোগই ! দাড়িগোঁফ বুঝে ফেললে চাটন দিতে শুরু করবে হতচ্ছাড়াগুলো । কনফিউস করে দেওয়ার জন্য সঙ্গে জুড়ে দিলেন -

ভিখ পেতে পেতে তুমি রাজা হয়ে ওঠো, গেঁয়ো যোগী।

এদিকে স্ত্রী সবে ঘুম থেকে উঠেছেন । আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে দেখেন তার কবি-বরটি ঘরময় কি যেন খুঁজে বেড়াচ্ছেন । কিছু একটা আন্দাজ করতে পারায় কবি-পত্নীর কানদুটি হঠাৎ লাল হয়ে ওঠে । ফিসফিসিয়ে বলেন, 'আমার ভ্যানিটি ব্যাগটায় দেখো, সাইডের ছোটো চেনটায় । কথা শোনামাত্র ব্যাগে হুমড়ি খেয়ে পড়েন কবি । কিন্তু ট্রিমারের পরিবর্তে তিন প্যাকেট কন্ডোম আবিষ্কার করায় যারপরনাই রেগে গেলেন তিনি । স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন -

উঠেই নির্দেশ দাও, ধর্মের তলব দিকে দিকে...

স্ত্রীও অবাক হন । 'তবে তুমি খুঁজছোটা কি ?' - উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করেন । উত্তর পাওয়ার পর ব্যঙ্গ করে বলেন, 'নিজ-স্ত্রীকে ভুলে পরস্ত্রীর জন্য থোবড়া শৌখিন করা হচ্ছে বুঝি ।' কথাটি কাঁটা হয়ে ফোটে । স্ত্রীর ভর্ৎসনাকে ঠাই দেন নিজের কবিতায় । লেখেন -

মৃগয়ায় খুঁজে ফেরো অন্য কোনও ধর্মের নারীকে।

এবার কবি একটু দার্শনিক হলেন । ভাবতে লাগলেন, চুলদাড়ি ইমেজের মাহাত্ম্য । মৃত কোশগুলি নিয়ে কি কেও মাতামাতি করে ? কবির সাফল্যে এদের অবদানই বা কি ? কিন্তু পাবলিকে এই চুল-দাড়িতেই মজে । উস্কোখুস্কো পাখির বাসার মতো চুল, মুখভর্তি কাঁচাপাকা দাড়ি, ন্যাতানো বগলঘামা পাঞ্জাবি, মোটা ফ্রেমের চশমা - এটাই তো গড়পড়তা বাঙালি কবির ডিফল্ট ইমেজ । এই কবির যদিও মাথাভর্তি টাক । তবে সুমনমার্কা নয় । স্টেডিয়ামে কিছু দর্শককে বসিয়ে রাখা হয়েছে । তাই কবির পরিপাটি এই ফ্রেঞ্চকাটটিকে নিয়েই । সেটি দেখেই লোকে চেনে। একে মুছে ফেলা যাবে না । কবি কলম চালালেন -

যে–হরিণ মৃত, তারও মাংসে তুমি চাও অধিকার
এমন রাজত্বে মৃত্যু সহজে তো হবে না তোমার।

ট্রিমার খুঁজে না পাওয়ার হতাশায় কবি দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন ! ফ্রাসট্রেটেড হয়ে এরই মধ্যে খান চারেক সিগারেট শেষ করে দিয়েছেন, গোটা ঘর ছাইয়ে ভর্তি ।

বাতাসে হাপর নামে, দেশ জুড়ে অধর্মের ছাই...

তবে কি রেজারেই কাজ চালাতে হবে ? এই প্রাচীন পদ্ধতি যে তিনি কবেই পরিত্যাগ করেছেন ।

প্রতি নির্বাচনে আমরা শতাব্দীপিছনে ফিরে যাই ।

তাতেও সমস্যা ! কাছে একটি মাত্র ব্লেড । স্ত্রী বলে রেখেছিলেন তিনি সেটি ব্যবহার করবেন । একটা হাতকাটা টপ এনেছেন । সেটি পরতে গেলে ক্লিন আন্ডার-আর্মস চায় । কিন্তু এখন আর তা হচ্ছে না । কবি সপাটে জানিয়ে দিলেন, যে আজ অন্য পোশাকেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে, কারণ তার প্রয়োজনটা আগে ।

যেখানে পুরুষধর্ম ধর্ম-পুরুষের অন্য নাম

আর অপেক্ষা নয় । কবি কাজ শুরু করে দিলেন । মুখে ফোম মাখিয়ে যেই না অস্ত্র চালাতে যাবেন, সেই দিলেন ঘ্যাঁচ করে গালটা কেটে । আর যাই কোথায় !

আর আমি নারীর মৃত্যু পার করেও শিকার হলাম।

'বালের' বলে আর্তনাদ করে উঠলেন কবি । স্ত্রী ছুটে এসে গালে একটা তোয়ালে চেপে ধরলেন । স্বামীর হতাশা ঠাওর করতে পেরে তিনি বললেন, 'ছাড়ো তো, আজও কোথাও বেরনোর ইচ্ছে নেই । ওই অলিগলি ঘুরেই না হয় দিনটা কাটিয়ে দেব । কাল তো ওরা আসছেই...'

অবশেষে স্ত্রীর কথাই মেনে নিতে হল । বেলাটা বিছানাতেই কাটিয়ে দিলেন কবি । কিন্তু পাঠকদেরও তো আর বিছানায় চাপানো যায় না । তাই তাদের মাথা ঘামিয়ে পাণ্ডিত্য ফলানোর জন্য শেষ দু'লাইন ছেড়ে দিলেন -

আমাকে ধর্ষণ করবে যদ্দিন কবর থেকে তুলে –
কন্ডোম পরানো থাকবে, তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে!
(যা বোঝার তোরা বুঝ'গা)

শেষ অবধি একসাথে -

সময়ে ওষুধ, নইলে বেড়ে যায় সবরকম রোগই
ভিখ পেতে পেতে তুমি রাজা হয়ে ওঠো, গেঁয়ো যোগী।
উঠেই নির্দেশ দাও, ধর্মের তলব দিকে দিকে
মৃগয়ায় খুঁজে ফেরো অন্য কোনও ধর্মের নারীকে।
যে–হরিণ মৃত, তারও মাংসে তুমি চাও অধিকার
এমন রাজত্বে মৃত্যু সহজে তো হবে না তোমার।
বাতাসে হাপর নামে, দেশ জুড়ে অধর্মের ছাই...
প্রতি নির্বাচনে আমরা শতাব্দীপিছনে ফিরে যাই।
যেখানে পুরুষধর্ম ধর্ম-পুরুষের অন্য নাম
আর আমি নারীর মৃত্যু পার করেও শিকার হলাম।
আমাকে ধর্ষণ করবে যদ্দিন কবর থেকে তুলে –
কন্ডোম পরানো থাকবে, তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে!

অনুপ্রেরণায় স্বয়ং কবিবর

২০১৭, ১২ মার্চ

ফটোগ্রাফার স্মরণে -

শহরতলির শিল্পীরা, বিশেষ করে স্বনির্ভর আলোকচিত্র শিল্পীরা নির্ভেজাল যোগ সাধনের স্বার্থে শরীর পাতন করেন বটে ; তবুও তাদের 'গেঁয়ো যোগীর' প্রাপ্য ভিখটুকুও নসীব হয় না । আদর এবং অভ্যর্থনা খালি সামাজিক গণমাধ্যমগুলিতেই ভুঁড়ি ভুঁড়ি পছন্দ, বেশ খানেক মন্তব্য এবং খানকয়েক ভাগ গ্রহনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে । এমনকি পথেঘাটে গুণগ্রাহীদের থেকে সাদর সম্ভাষণও জোটে না এই হতভাগ্য উপনাগরিক শিল্পীদের । সত্যিই হৃদয় বিদারক বঞ্চনা !
তাই বঞ্চিত হতশ্রদ্ধ আলোককলাকুশলীরা সুযোগ পেলেই ছুটে যায় অবাধ এবং বৃহত্তর আনুকূল্যের সন্ধানে । দুর্গোৎসবের শুরুতে কামারটুলি হোক অথবা বসন্তোৎসব চলাকালীন জোড়াসাঁকো বা শান্তিনিকেতন - তাদের দেখা মেলে ধূলাচ্ছন্ন ধরায় ধরাশায়ী ধ্যানমগ্ন কল্পতরু রূপে । এলাহি খাতির মেলে । মহানগরীর বিশেষ্যহীন উঁচু লোকেদের সংযত প্রশংসায় গদগদ শিল্পীরা বিনয়ের বটুয়া বনে যান । বিনামূল্য শ্রম বিলিয়ে তখন তাদের আহ্লাদে আটখানা বদন - সে এক দেখবার জিনিস ! সমুদ্রপারের শ্বেতাঙ্গ 'রমণ'-রমণীদের অভ্যর্থনা কুড়োতেও পিছুপা হননা তারা - পরিবর্তে খালি একটা 'পিলিজ, ওয়ান টুগেদার পিকচার !'

সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য - এই নিয়েই তো বাঙালির গৌরব ।

(গুরুচণ্ডালী তথা ব্যাকারণগত দোষের সম্ভাবনা আছে, তাই আগাম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি)

২০১৭, ৮ মার্চ

আজকের একটি বিশেষ কথোপকথনের কিছু অংশ -
নারী : সত্যিই, behind every successful man there is a woman এবং শুধু তাই না, তারা পুরুষদের থেকে এগিয়েও আছে । তাই, সবাই বল three cheers for...
পুরুষ : (স্বগত) বাল ! (প্রকাশ্যে) মোটেই না...একজন পুরুষের সাফল্যের পিছনে নিজেরই প্যাশন, ডেডিকেশান কাজ করে । নিজের হার্ড ওয়ার্কে সে সফল হয় ।
নারী : কেও ফেলিওর হয় না বুঝি ?
পুরুষ : অবশ্যই হয় এবং দেখবেন সেখানেই বরং কোনও মেয়ে কলকাঠি নেড়েছে ।
নারী : অনেক সময় দেখবেন মেয়েদের থেকে রিজেক্টেড হয়ে অনেক ছেলে...
পুরুষ : বলুন না - ল্যাং খেয়ে ।
নারী : ওই যাই হোক । ...তার ফলে ছেলেদের ভাগ্য ঘুরে যায়, তারা হার্ড ওয়ার্কিং হয়ে যায় । সেই ঘুরে ফিরে ছেলেটার সাফল্যের পিছনে মেয়েটারই হাত রইল...
পুরুষ : (কিছুক্ষণ ভেবে) পারিবারিক বা সোস্যাল ভায়োলেন্সের শিকার হয়েও অনেক নারী সরব হয়ে ওঠে - নির্ভয়ে প্রতিবাদ জানায় । তাদের মধ্যে থেকে উঠে আসে মালালা ইয়সুফজাই বা লক্ষ্মী আগরওয়ালের মতো মেয়েরা...
নারী : (মুখে চোখে উদ্দীপনা) (স্বগত) পেরেছি মালটাকে বাগে আনতে...
পুরুষ : (ক্রমশ)...তাহলে বলতে হবে তাদের অনুপ্রেরণারও বড় অংশীদার সেই সমস্ত সমাজের পাষণ্ড পুরুষগুলো - যারা অত্যাচার করে, অ্যাসিড ছোড়ে...
নারী : (সজোরে) চুপ কর ! তুই একটা মিসোজিনিস্ট...এত বড় বড় বলছিস শেষে তো সেই মেয়েদেরকেই বিয়ে করবি ।
পুরুষ : সে তো করতেই হবে । না করলে উদ্ধার করবে কে !

২০১৭, ২৭ জানুয়ারি

প্রজাতন্ত্র দিবসের মরশুমে পথে-ঘাটে নানা ধরণের সোশ্যাল এক্সপেরিমেন্ট চলে । মাঝ রাস্তায় পতাকা ফেলে রেখে পরীক্ষা করা - কে কি ধরণের প্রতিক্রিয়া দেয় ; অথবা, ১০০০ টাকার বিনিময়ে ছোট্ট একটুকরো কাগজের পতাকা দু'টুকরো করার ঘোরতম
চ্যালেঞ্জ ইত্যাদি । প্রত্যাশিত ফলাফলগুলোকে ঢাকঢোল পিটিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয় । কিছু নিদর্শন চাপা পড়ে যায় - সেগুলো না হয় বাদই দিলাম । অনেক যুবক যুবতী এই গৌরবময় কাজের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেয় । অনেক প্রতিভাবান তরুণ-তরুণী সুন্দর সুন্দর কমার্শিয়াল অথবা শর্ট ফিল্ম তৈরি করে দেশবাসীকে (এবং বহু প্রবাসী) কাঁদায় । বিশেষ উপলক্ষে নানা সম্মানও লাভ করে ।
এসব আর কিছুই না, একপ্রকার জটিল মানসিক ইনসিকিউরিটিজনিত সামাজিক উন্মাদনা ।

২০১৭, ৬ জানুয়ারি

উত্তর ভারত :

না না, সেকিউলার দেশের লোকজনেরা যাতে অন্যকিছু ভেবে না বসে, তাই প্রচলিত আছে, লালা গুলাম সারওয়ার নাকি তাঁর সন্তানকে পিতৃদত্ত নাম নিয়ে বম্বেতে চলচিত্রের নামে ভাঁড়ামি করতে সম্মতি দেননি। তাই মহম্মদ ইউসুফ খান বনে গেলেন দিলীপ কুমার। (দেবিকা রাণীর অনুরোধে ভগবতি চরণ বর্মার দেওয়া নাম দিলীপ কুমার কে বলল!)

দক্ষিণ ভারত :

রাজাগোপাল কুলশেখরা মারা গিয়েছেন দশ বছর হল। সুফিসন্ত করিমুল্লাহ শাহ কাদরীর সংস্পর্শে ইসলামের প্রতি ঝোঁক বেড়েছে; যদিও তখনও তিনি দিলীপ কুমার। বোনের কুষ্ঠি গড়াতে গিয়ে জ্যোতিষীকে বলেই ফেললেন মনের ইচ্ছে - খুব তাড়াতাড়িই মুসলমান হবেন আর এই ভোঁদামার্কা নামটিও পছন্দ নয়, তাই নতুন কোনও নাম বাতলে দিলে ভালো হয়। হিন্দু জ্যোতিষী দিলেনও একটি নাম। যুবক দিলীপ মাকে গিয়ে জানালো। মা সংশোধন করে আব্দুল শব্দটি বদলে দিলেন। পহচান পেল আল্লা-রাখা রহমান। (মা কস্তূরী পরে করিমা)

২০১৬, ১৯ ডিসেম্বর

পোখরানে যখন ভারতের পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরীক্ষা করা হয়, তখন পরপর পাঁচখানা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এর দেখাদেখি, দিন পনেরো পরই পাকিস্তানও চাঘাইয়ে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটায় এবং গুনে গুনে সংখ্যাটি রাখে ১ খানা বেশি।
যাই হোক, পাকিস্তানি খেলোয়ার আজহার আলি এ বছর অক্টোবরে অপরাজিত ৩০২ রান করে। আজ কারুন নায়ার করে গুনে গুনে ১ রান বেশি।

২০১৬, ১৯ অক্টোবর

আমার শহরে বেশ কিছু কবি-সাহিত্যিক আছেন। 'স্নিগ্ধ সুপ্রভাত' থেকে 'সন্ধ্যাকালীন শুভেচ্ছা' বিলি করেন। কালচারাল অ্যাটমোস্ফিয়ার। ঠেকে ঠেকে ইন্টেলেকচুয়ালদের ঠোকাঠুকি লাগে প্রায়শই। হামেশাই টুকটাক নাটক-ফাটক চলে। দুমদাম কালচারাল প্রোগ্রাম তো লেগেই আছে। ফোটোগ্রাফারও মিলবে ভুরিভুরি। অকেশানে এক্সিবিশনও নাকি হয়। পত্রিকা-ফত্রিকা, সাক্ষাৎকার, বর্ষপূর্তি-ফুর্তি আর কত কি বলব...

খালি বছর গেলে বইমেলাটা রেগুলারলি হয় না।

২০১৬, ২ অক্টোবর

স্বামী নিখিলানন্দের লেখা থেকে, ১৯৫৩

রামকে ছাড়লেন। শিবকে ধরলেন। বিয়ে করা ব্যাপারটাতে তাঁর মাথাব্যথা ছিল না। বৌ তো শিবেরও ছিল। তবে বৌ বাঁচাতে বানর নিয়ে দেদার দৌড় মেরেও ঘরের প্রজা এবং যুগ পেরিয়ে ধর্মান্তরিত কায়স্থের কাছে চাটন খাওয়ার কোনও মানে হয় না - তাই জয় শিব শম্ভুই ঠিক হ্যায়। যুক্তি দিলেন, বিবাহ দাসত্ব। ও ফাঁদে পা দিলে কেল্লাফতে। তার চেয়ে খানিক গাঁজা-ভাং খাওয়া ফার বেটার। সে দোষ ত্যাগের মহিমায় পুষিয়ে যাবে। এদিকে যোগী সন্ন্যাসীরা মনে আঁক কাটতে শুরু করলো। জন্ম নিল বিবেক...

২০১৬, ১ সেপ্টেম্বর

মফঃস্বলের অভিজ্ঞতা থেকে:
কিছু স্বঘোষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের (আর্থিক পর্যায়ে নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং সামাজিক ও নৈতিক পর্যায়ে দরিদ্র সীমার নিচে) বিশেষ একপ্রকার সদস্য - যাদেরকে সমাজ ঘরের মেয়ে বলেই চেনে, অভিনব 'ছেলে ধরা' আইনটি শিবরাত্রির টোটকা স্বরূপ মাথায় তুলে নিয়েছে।
মাধ্যমিক গেল। উচ্চমাধ্যমিক গেল। অবশেষে কোথাও ঠাই না পেলে পড়ে আছে কারিগরি বিদ্যা, বাপের বেতনের চেয়েও বেশি জয়েন্ট এন্ট্রান্সের র‍্যাঙ্ক। তাতেও মেয়ের মায়ের বুকভরা আশা - পঞ্চাশ হাজার মাসিক মাইনের চাকরি লাগাবেই লাগাবে।
ষোলোআনা শৈশবের অভিজ্ঞতা বলছে, হাফপ্যান্ট পরা, উসকোখুসকো চুলওয়ালা, কালো বেঁটে সেই লোকটাই ছেলেধরা। কেও কি ভাবতে পারে, ছেলেধরারা গগলস হিল টপ জিন্‌স পড়েও ঘুরে বেড়ায়। WBUT সপ্তাহে দুদিন ছুটি দিয়েছে - বাস, আর যাই কোথায়। মাসে দুদিন বাড়ি আর বাকি কয়দিন চিকেন কারি। প্রিন্সেপ ঘাট, মিলেনিয়াম পার্ক, এলিয়ট পার্ক, ভিক্টোরিয়া তো আবাধ বিচরনে প্রসিদ্ধ। সন্ত্রাস বই যা ছড়াবে ছড়াও। পারমিশান হ্যাঁয়।
বলরামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কোমরের নিচে গদা চালানো নিষিদ্ধ। ইদানীং ধর্মরক্ষা করতে গিয়ে ভীমের পথেই মাঝে মধ্যে চলে যেতে হয়। মালদার পার্টি থাকলে তো পুজোর কেনাকাটা সুনিশ্চিত। পার্টি ফসকে গেলে, টেনশন নট - ফ্রেন্ডলিস্ট ঘাঁটলেই হল। সমাপ্ত।
ক্লাইম্যাক্স। কয়েকদিন পর দেখলেন অমুক জায়গায় তমুক ছাত্রীর গণধর্ষণ, দিয়ে হত্যা। আর যাই কোথায়, আলমারি থেকে পুরনো প্যান্ট বের করবেন - কী রাস্তায় মোমবাতি ধরে বসতে হবে না। প্রমুখ দিদি বা বৌদি কোমর বেঁধে ক্যাম্পেন করবেন। তামাশা চলবে আর কি। তবে যদি একটু চেষ্টা চরিত্র করে সম্ভব হয় দেখবেন মেয়েটির ফেসবুকের চ্যাটবক্স খুলে। অশ্লীল কথোপকথনে আপনারই শ্রীঅঙ্গ মাথায় উঠে যাবে। বলছি না - সব মেয়েই করে। তবে করে তো অবশ্যই। ওদের নাকি পড়াশুনোয় কত চাপ। চাপ হবে না ই বা কেন বলুন। শুধু ছেলে ধরলেই কি হল, তাকে হাতে ধরে রাখা যথেষ্ট পরিশ্রমের কাজ - তার পরেও কি আর পড়াশোনায় সময় পাওয়া যায়? কুকুরের মত জিভ বের করে, যে পার্টি যত ফেলবে তার দিকে ছুটে চলে যাওয়ার মানসিকতা সম্পন্ন আমাদের এই 'ঘরের মেয়ে' যখন মাসের শেষে বাড়ি ফেরে, ভাই বোনেদের শাসন করে, তখন তাদের মা পঞ্চাশ হাজার মাইনের গুড়ে জাল দিতে দিতে বলে - 'আমার মেয়ের মত মেয়ে হয় না। সবাই আমার মত মেয়ে পায় না।'

২০১৬, ২২ এপ্রিল

এই দেশে যা কাটখোট্টা গরম পড়ে তাতে মোটেও বিশ্বাস হয় না যে প্রমথেশ বরুয়া, উৎপল দত্ত, কমল হাসান, সাবানা আজমি প্রমুখেরা সব বানের জলে ভেসে এসেছেন। তবুও সবাইকে কাঁচকলা দেখিয়ে ফ্যান ঘুরাচ্ছেন শাহ রুখ খান।

Wednesday, 21 June 2017

সংগ্রহ ৬ - লিখছেন মুহম্মদ সবুর

বাঙালির ক্রিকেট খেলা

‘রণজি ক্রিকেট প্রতিযোগিতার সেমিফাইনাল খেলায় বাঙালা ও আসাম সম্মিলিত দল হায়দরাবাদ দলকে ১২৭ রানে পরাজিত করিয়া বিজয়ী হইয়াছে। এইরূপ ফলাফলের আশা আমরা পূর্ব হইতে করিয়াছিলাম, সুতরাং ইহাতে কোনোরূপ আশ্চার্য্যান্বিত হই নাই।’ আশ্চর্য হওয়ার কথা না থাকলেও ফাইনালে হেরে বাংলা-আসাম দল রানার্সআপ হয়েছিল। তবে দলটি শিরোপা জিতেছিল একবারই, পরের বছর ১৯৩৮ সালে। ওই প্রথম এবং ওই শেষ। ১৯৩৭ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আন্তঃপ্রাদেশিক ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় বাংলা দলের সেমিফাইনাল খেলার পর্যালোচনায় ক্রীড়া লেখক ব্রজরঞ্জন রায় উল্লিখিত মন্তব্য করেছিলেন। রণজি ট্রফি শুরু হয়েছিল ১৯৩৫ সালে। তবে এ উপমহাদেশে ক্রিকেট খেলার চল ছিল সেই আঠারো শতকেই। প্রথম যে ম্যাচের কথা নথিবদ্ধ আছে, তা খেলা হয়েছিল ১৭২১ সালে। অবশ্য খেলেছিলেন ইউরোপীয় বণিকরা। যদিও কারও কারও মনে হতে পারে এটা এমন আর কী! ডাচ, দিনেমার, পর্তুগিজ, ব্রিটিশরা জাহাজ থেকে নেমে ব্যাট-বল নিয়ে মাঠে নেমে পড়ল- আর এটাকেই উপমহাদেশে ক্রিকেট জন্মের প্রথম শুভক্ষণ বলে মেনে নেয়া সঠিক হবে না।
ক্রিকেট গবেষকরা অবশ্য বলছেন, ১৭৮০ সালে কলকাতায় ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব গড়ে উঠেছিল। হিকির বেঙ্গল গেজেটেও এর উল্লেখ আছে। তবে তা ইংরেজদেরই খেলা ছিল। সংগঠিতভাবে বাঙালিরা খেলতে শুরু করে ১৮৭০ ও ১৮৮০ সাল থেকে। ১৮৯০ সালে কোচবিহারের মহারাজা বিপুল অর্থ ব্যয়ে তিনটি ক্রিকেট দল গঠন করেন। সবই শ্বেতাঙ্গ এবং পেশাদার খেলোয়াড়। ক্রিকেটের জন্য কলকাতায় আলিপুরে মাঠ কিনে নাম দিলেন উডল্যান্ডস মাঠ। নাটোরের মহারাজাও বসে থাকেননি। তিনিও দল গঠন করলেন। ১৯০০ সালে নাটোর দলে বাঙালি খেলোয়াড় ছাড়াও ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্যের সেরা ক্রিকেটারদের দলে জড়ো করা হয়। বালিগঞ্জে লাখ টাকা ব্যয়ে বানালেন ক্রিকেট মাঠ- নাটোর পার্ক। ১৯১১ সালে নাটোর দল বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর পরপরই কলকাতায় গড়ে ওঠে বিভিন্ন ক্রিকেট ক্লাব। কোচবিহারের মহারাজা ইংল্যান্ড থেকে কোচও আনিয়েছিলেন প্রশিক্ষণের জন্য। অবশ্য ১৯৩০ সাল থেকে বাংলার ক্রিকেট আধুনিক হতে শুরু করে। উপমহাদেশে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট শুরু হয় ১৯৯২ সালে। ধর্মীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক এ খেলায় ১৯০৭ সালে ইংরেজ ও পার্সির পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায় এবং ১৯১২ সালে মুসলিম সম্প্রদায় দল প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলে। ১৯৩২ সালে প্রথম টেস্ট ম্যাচ হয়। অবশ্য তা ক্রিকেটের তীর্থস্থান ইংল্যান্ডের লর্ডসে। ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক সাম্প্রদায়িক প্রতিযোগিতার বিপরীতে ১৯৩৫ সালে চালু হয় রণজি ট্রফি। অসাম্প্রদায়িক এবং রাজ্য ও প্রাদেশিক দলগুলোকে নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
শুরু থেকেই রণজি ট্রফিতে বাংলা ও আসাম সম্মিলিত দল খেলে আসছে। দলে ইউরোপীয়দের আধিক্য ছিল তখনও। ১৯৩৭ সালে বাংলা দল সেমিফাইনাল খেলে হায়দরাবাদ দলের সঙ্গে। ইংরেজ হোসি ছিলেন বাংলা দলের অধিনায়ক। হায়দরাবাদ দলে একজনও প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলায় সুনাম অর্জনকারী খেলোয়াড় ছিল না। তবু তারা বাংলা দলকে বেশ বেগ পাইয়ে দিয়েছে। ব্রজরঞ্জন রায় সাপ্তাহিক দেশ ৪র্থ বর্ষ, ফেব্র“য়ারি ১৯৩৭ সংখ্যায় খেলার পর্যালোচনায় লিখেছিলেন, ‘ফিল্ডিং ও বোলিং বিষয়ে হায়দরাবাদের খেলোয়াড়গণের অনেকেরই নৈপুণ্য নামজাদা খেলোয়াড়গণের অপেক্ষা কোনো অংশে ন্যূন দেখা যায় নাই। বিশেষ করিয়া ওই দলের হায়দার আলীর বোলিং খুবই যে উচ্চাঙ্গের তাহাতে কোনোই সন্দেহ নাই। তাহার বোলিংয়ের বিরুদ্ধে খেলিতে বাঙালা ও আসাম দলের ব্যটিসম্যানগণকে রীতিমতো ভয়ে ভয়ে ব্যাট চালাইতে হইয়াছে। বিশেষ করিয়া বাঙালা দলের ইউরোপীয় খেলোয়াড়গণের ব্যাটিং অস্বচ্ছন্দতা বেশ উপভোগের বিষয় হইয়াছিল। এই খেলোয়াড়টি যে শীঘ্রই ভারতীয় প্রথম শ্রেণীর খেলোয়াড়গণের মধ্যে স্থান পাইবেন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। তাহা ছাড়া, আইবরা, ভজুবা, মেটা প্রভৃতি তরুণ খেলোয়াড়গণের ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং বেশ দর্শনযোগ্য হইয়াছিল। ইহাদের খেলা বাঙালার নামজাদা খেলোয়াড়গণের অপেক্ষা যে কোনো অংশেই নিুস্তরের হয় নাই, ইহা নিঃসন্দেহে বলা চলে। হায়দরাবাদ দল পরাজিত হইয়াছে। কিন্তু তাহা হইলেও উক্ত দলের কয়েকজন খেলোয়াড়ের ক্রীড়ানৈপুণ্য বাঙালার ক্রীড়ামোদীগণের প্রাণে চিরজাগ্রত থাকিবে।’ নামজাদা খেলোয়াড় না হয়েও সুযোগ-সুবিধা পেলে সাধারণ খেলোয়াড়রাও যে অশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করতে পারে, হায়দরাবাদের খেলোয়াড়রা তার প্রমাণ দিয়েছে বলে ক্রীড়াভাষ্যকার উল্লেখ করেছেন।
ধর্ম-সম্প্রদায়ভিত্তিক খেলার বিরুদ্ধে চালু হয়েছিল রণজি ট্রফি। এ প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য উৎসাহী সাধারণ প্রাদেশিক ক্রিকেট খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক বা প্রতিনিধিত্বমূলক ক্রিকেট খেলার জন্য অনুশীলনের সুবিধা করে দেয়া। বাংলার ক্রিকেট দল নির্বাচন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশও করা হয়েছে। ‘বাঙালা দলের এই বিজয়ের জন্য দায়ী কাহারা?’ উপশিরোনামে ব্রজরঞ্জন রায় লিখেছেন, ‘বাঙালা দলের এই বিজয়ের জন্য দায়ী কাহারা তাহা বিশেষভাবে চিন্তা করিয়া দেখিলে দেখা যায়, বাঙালার তরুণ উৎসাহী ক্রিকেট খেলোয়াড়গণই জয়লাভের পথ প্রশস্ত করিয়াছেন এবং অভিজ্ঞ ধুরন্ধর ইউরোপীয় ক্রিকেট খেলোয়াড়গণ যে পটভূমির পশ্চাতেই রহিয়াছেন, একথা দর্শকগণের লক্ষ্য করতে বোধ হয় গোল বাধে নাই। ইউরোপীয় খেলোয়াড়গণ উক্ত খেলায় প্রকৃতপক্ষেই বিশেষ কিছু কৃতিত্ব প্রদর্শন করিতে পারেন নাই, কি ব্যাটিং, কি বোলিং, সকল বিষয়েই বাঙালার তরুণ খেলোয়াড়গণই সর্ব্বময় দর্শকগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছেন।’
বাংলা দলের মুসলিম খেলোয়াড় ছিলেন একজন, কামাল। প্রথম ইনিংসের খেলায় তরুণ খেলোয়াড় কামাল নবম উইকেটে শতাধিক রান তুলেছেন। তার এ খেলা দলের ইউরোপীয় খেলোয়াড়দের সব প্রয়াসকেই ম্লান করে দিয়েছে বলে ভাষ্যকার উল্লেখ করে বলেছেন, ‘এই খেলোয়াড়টি প্রকৃতপক্ষেই ঐ দিন দলের ভাগ্য পরিবর্তন করিয়া দিয়াছিলেন। ইহা সত্য যে, সেই সময় বিপক্ষ দলের বোলারগণের বলের তীব্রতাও পূর্বের ন্যায় ছিল না। তথাপি ১০০ মিনিটের মধ্যে ১০০ রান তুলিয়া তিনি যে অশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করিয়াছেন, ইহা অস্বীকার করিবার কোনো উপায় নাই।’ কামালের পর খেলায় বাংলা দলের কার্ত্তিক বসু ও সুঁটে ব্যানার্জি খেলেন। তাদের ব্যাটিং ‘প্রশংসার যোগ্য’ ছিল। কার্ত্তিক বসু প্রথম ইনিংসের খেলায় হায়দরাবাদ দলের আক্রমণের চরম প্রকোপ সহ্য করেছিলেন এবং পরবর্তী ব্যাটসম্যানরা যাতে রান তুলতে পারে, তার পথ সহজ করে দিয়েছিলেন। সুঁটে ব্যানার্জি শেষ মুহূর্তে পিচে গিয়ে ৪৭ রান করে নট আউট ছিলেন। তিনি কামালকে শতাধিক রান করার পক্ষে সাহায্য করেছিলেন। এই খেলায় বোলিং বিষয়ে বাংলার তরুণ খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। কারণ হায়দরাবাদ দলের উভয় ইনিংসে সুঁটে ব্যানার্জি ও কমল ভট্টাচার্য অধিক সংখ্যক উইকেট লাভ করেছিলেন। হায়দরাবাদের দ্বিতীয় ইনিংসে কমল ভট্টাচার্যের বোলিং খুবই ভালো হয়েছিল। তিনি ১৪ দশমিক ৫ ওভার বল করে ৬টি মেডেন ও ২৯ রানে ৩টি উইকেট পেয়েছিলেন। অপর বাঙালি খেলোয়াড় খোকন সেন দ্বিতীয় ইনিংসের খেলায় শেষ সময় ১৮ রান করে দলভুক্ত হওয়ার যে সম্পূর্ণ উপযুক্ত, তা তিনি প্রমাণ করেছেন। ‘কারণ বেরেন্ড, স্কিনার, হোসি প্রভৃতি ধুরন্ধর খেলোয়াড়গণ ইহা অপেক্ষা অনেক কম রানে আউট হইয়াছেন। সুতরাং এই খেলায় উৎসাহী তরুণ ভারতীয় খেলোয়াড়গণই সর্ব্ব বিষয়ে ইউরোপীয়ান খেলোয়াড়গণ অপেক্ষা সাফল্য লাভ করিয়াছেন। অতএব দলে অধিক সংখ্যক ইউরোপীয়ান খেলোয়াড় না লইলেও যে বাঙালা ও আসাম দলের খেলার ফল হতাশাব্যঞ্জক হইত না, তাহা উক্ত খেলার ফলাফল হইতেই প্রমাণিত হইয়াছে।’
ধর্মভিত্তিক ব্রিটিশদের গড়া পাঁচ দলের বোম্বাই পেন্টাঙ্গুলার নামে খ্যাত প্রেসিডেন্সি ম্যাচ অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ১৮৯২ সালে শুরু হওয়া প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের বিকাশে এ ম্যাচ যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিল। তবে এ খেলার জনপ্রিয়তার কারণে রণজি ট্রফি প্রতিযোগিতা সর্বার্থেই মার খাচ্ছিল। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড সাম্প্রদায়িক খেলা বন্ধের জোর দাবি জানায়। গান্ধীও এ খেলা বন্ধে বিবৃতি দেন। কিন্তু জনপ্রিয়তার কারণে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রতিযোগিতা ম্যাচ অব্যাহত ছিল। রণজি ট্রফি চালুর পর প্রাদেশিক ক্রিকেট দলগুলো প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলার সুযোগ পেয়েছিল।
১৯৩৭ সালে হায়দরাবাদ দলকে সেমিফাইনালে পরাজিত করে বাংলা দল ফাইনালে নবনগর দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। দল নির্বাচনে ফাইনালে বাংলা ও আসাম দলে ইউরোপীয়দের প্রাধান্য দেয়া হয়। দলের অধিনায়ক হিসেবে হোসিকে নির্বাচিত করায় বাংলা দল ক্ষুব্ধ হয়। কারণ হোসি কখনও উপমহাদেশের বড় কোনো ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় অধিনায়কত্ব করেননি। তদুপরি স্থানীয় খেলোয়াড়দের সম্পর্কে তার বিশেষ কিছু জানা ছিল না। বাঙালিরা আশা করেছিল কার্ত্তিক বসুকে অধিনায়ক করা হবে। কারণ কার্ত্তিক বসু ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে বড় খেলায় অধিনায়কত্ব করেছেন। অধিকাংশ ভারতীয় সেরা খেলোয়াড়ের সঙ্গে বা বিপক্ষে খেলার সুযোগ পেয়েছেন। সুতরাং দলে এমন খেলোয়াড় থাকার পরও একজন ইউরোপীয়কে অধিনায়ক করা হয়েছে, এমনকি দুর্বল ইউরোপীয় খেলোয়াড়কে টিমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অবশ্য শ্বেতাঙ্গ খেলোয়াড়রা বরাবর অধিনায়ক হয়েছেন। ব্রজরঞ্জন রায় মন্তব্য করেছেন, ‘একজন ইউরোপীয়ানই অধিনায়ক হইবেন, ইহা যদি তাহাদের বিধি থাকে, তবে আমাদের বলিবার আর কিছু নাই।’ অবশ্যই বলার আর কিছু ছিল না। ১৯৩৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ফাইনালে বাংলা দল মুম্বাইয়ের নবনগর দলের কাছে ৫ উইকেটে হেরেছিল। ইউরোপীয় খেলোয়াড়রা কোনো সুবিধা করতে পারেনি।
৮৮ বছর আগে বাঙালির ক্রিকেট খেলা কণ্টকমুক্ত ছিল না। ইউরোপীয়দের নির্দেশ মেনে চলতে হতো। ফলে বাঙালির ক্রিকেট বিকাশ সহজসাধ্য হয়নি। উপমহাদেশের ক্রিকেটে বাঙালির অবস্থান এখন অবশ্য অনেক উপরে। টেস্ট ক্রিকেট থেকে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে এখন বাঙালি চূড়ান্ত জয়ের আশায় পথ পাড়ি দিচ্ছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১৫-এ ইতিমধ্যেই কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেছে। 

সূত্র - যুগান্তর, ১৪ মার্চ ২০১৫

Tuesday, 20 June 2017

সংগ্রহ ৫ - লিখছেন সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায়

ইডেন উদ্যান থেকে বলছি

‘অজয় বসু। ...আমার সহযোগী ভাষ্যকার কমল ভট্টাচার্য ও পুষ্পেন সরকার।...’ ক্রিকেটের নন্দনকাননে ব্যাট-বলের লড়াই শুরুর আগে বেতার তরঙ্গে এ ভাবেই ধরা দিতেন তাঁরা

আ-উ-ট! আ-উ-ট! আ-উ-ট! প্রথম বলেই ইন্দ্রপতন। উইকেটরক্ষক জেফ দুঁজোর দস্তানায় প্রাণ জমা দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন ক্রিকেট-সম্রাট সুনীল মনোহর গাওস্কর। সোনা ঝরা রোদের এই শীতের সকালে কাতারে কাতারে দর্শক এখনও আসন পাওয়ার প্রতীক্ষায়। তার আগেই সিংহাসনচ্যুত তাঁদের অধীশ্বর। স্তম্ভিত ইডেন উদ্যান। বাকরুদ্ধ ক্রিকেটের নন্দনকানন।  লক্ষ লক্ষ হৃদয়ের কল্লোল নিমেষে বদলে যাচ্ছে প্রিয়জন হারা হাহাকারে...
ইডেনে ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট ম্যাচ। প্রথম দিন। সময়টা আশির দশকের গোড়া।
দিন শুরু করেছিলেন বোলার ম্যালকম মার্শাল। ও প্রান্তে ব্যাট হাতে সুনীল গাওস্কর।
প্রথম বল। খেলতে গিয়ে মিস করলেন গাওস্কর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দর্শক শুনলেন তারস্বরে চিৎকার। হা-উ-জ দ্যা-ট! আম্পায়ারের আঙুল তোলার অপেক্ষা না করে প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটা দিলেন সুনীল।

তার পরই বেতার তরঙ্গে ভেসে এল চিকন গলায় ওই ধারাভাষ্য।
এই অননুকরণীয় বিবরণ কার, বলতে এক মুহূর্ত সময় নেবেন না, এমন বাঙালি আজও অসংখ্য। হ্যাঁ, অজয় বসু।
’৭৬-এর ইডেন। ভারত বনাম ইংল্যান্ড। একনাথ সোলকারের ঢিমে লয়ের ব্যাটিং-এ বিরক্ত গোটা মাঠ।
তাঁর এক হাত দূরে সিলি পয়েন্টে দাঁড়িয়ে ইংরেজ অধিনায়ক টনি গ্রেগ।
হঠাৎ এগিয়ে এলেন তিনি। সোলকারের কাছ থেকে ব্যাটটা চেয়ে ‘শ্যাডো’ করে দেখিয়ে দিলেন কী ভাবে স্ট্রোক খেলতে হয়। হাসিতে ফেটে পড়ল ইডেন। তাতেও সোলকারের হেলদোল হল না।
পরে ইংল্যান্ডের ইনিংস। এ বার শুরু গ্রেগের ঠুকঠুকানি। তাতে ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে দাঁড়ানো সোলকার একই কাণ্ড করলেন।
পরের বলেই বাউন্ডারি মারলেন গ্রেগ। তার পরই দূর থেকে সবাই দেখলেন, গ্রেগ সোলকারকে কী যেন বলছেন!
তখন না ছিল স্টাম্প ক্যামেরা, না বাইশ গজে লুকোনো মাইক্রোফোন। তাতে কী! গ্রেগ-সোলকারের মধ্যে কী চলছিল— কমেন্ট্রি বক্সে বসেই তার কাল্পনিক অথচ অদ্ভুত মুচমুচে সংলাপ বলে গেলেন ধারাভাষ্যকার।— “গ্রেগ বললে, বাপু সোলকার, মাস্টারমশায়ের তো শেখানোটা কাজ। কিন্তু ছাত্রকেও তো তেমন হতে হবে। কাজের কাজটা তো তাকেই করতে হয়। তোমায় শিখিয়ে কাজ হয়নি। দেখো আমি কেমন করে দেখালাম।”
ধারাভাষ্যকার কে? বলতে লাগে না তা’ও। কমল ভট্টাচার্য।
আর তৃতীয় জন?
তাঁর বণর্না ছিল অনুপুঙ্ক্ষ। সামনে ঘটে চলা প্রতিটি দৃশ্যের একটি পলও যেন বাদ দেওয়ার নয়।
পুষ্পেন সরকার।
... “ক্লাব হাউস প্রান্তে প্রস্তুত কপিলদেব। দৌড় শুরু। উইকেটের গা ঘেঁষে ডেলিভারি... গুডলেন্থ বল। বাঁ পা বলের কাছে নিয়ে ব্যাটে-প্যাডে এতটুকু ফাঁক না রেখে রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে খেললেন জাভেদ মিঁয়াদাদ। বল চলে গেল কপিলের কাছে। এ বলেও কোনও রান হল না। রান যা ছিল তাই। দু উইকেটে হারিয়ে পাকিস্তান...!”
বাংলা ধারাভাষ্যের ত্রয়ী। এঁদের সকালটা অবশ্যম্ভাবী শুরু হত অজয় বসুকে দিয়ে।
ষাটের দশক থেকে কমপক্ষে তার পরের পঁচিশ-তিরিশ বছর কখনও শহরের টেস্ট ম্যাচে দিনের প্রথম ডেলিভারির বাংলা ধারাবিবরণী অন্য কারও গলায় শোনা যায়নি।
কিন্তু কেন?
“আসলে সেটা ওঁরা তিন জন মিলেই ঠিক করেছিলেন। আজীবন যার নড়চড় হয়নি। অসাধারণ বোঝাপড়া ছিল ওঁদের,” শ্যামবাজারে বহুকালের পৈতৃক বাড়ির দোতলার অগোছালো ঘরের খাটে বসে বলছিলেন কমলবাবুর ছেলে শ্রীকান্ত ভট্টাচার্য।
তিনজনেই পরবর্তী কালে কিংবদন্তি হয়ে যাওয়া ভাষ্যকার। অথচ আশ্চর্য, প্রথম যখন ধারাভাষ্যের প্রস্তাব এসেছিল প্রায় উড়িয়েই দিয়েছিলেন কমলবাবু।
কী ভাবে এসেছিল প্রস্তাব?
“বাবা তত দিনে কর্মকর্তা হিসেবে সিএবিতে এরিয়ান ক্লাবকে রিপ্রেজেন্ট করে ফেলেছেন। ক্লাবের ক্রিকেট টিমের কোচও হয়েছেন। অজয়কাকু আবার যুগান্তরে খেলার পাতায় নিয়মিত লেখালেখি করছেন। পরে বাবাও যুগান্তরে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে মার্কেটিং বিভাগে। অজয়কাকু তো বহু দিন যুগান্তরের স্পোর্টস এডিটরও ছিলেন,” বলছিলেন শ্রীকান্ত।

তাঁর কথায়, দু’জনেই শত ঘোষ অর্থাৎ যুগান্তরের অন্যতম মালিক প্রফুল্লকান্তি ঘোষের বন্ধুস্থানীয়। কারও এক জনের কাছে আকাশবাণী থেকে প্রস্তাবটা আসে যুগান্তর অফিসে। সম্ভবত দু’জনের মধ্যে যাঁর কাছে প্রস্তাবটা প্রথম এসেছিল, তিনি-ই অপর জনকে খবরটা দেন। তবে পুষ্পেন সরকার বেশ কিছু দিন পর ওই দলে যোগ দিয়েছিলেন।
সে-সময়ের পোড়খাওয়া ক্রীড়া সাংবাদিকদের কাছে গল্পটা অবশ্য একটু অন্যরকম।
সে ১৯৫৯-৬০ সালের কথা। ইডেনে ভারত-অস্ট্রেলিয়ার পঞ্চম টেস্ট। তার আগে আকাশবাণী ঠিক করল এ ম্যাচের ধারাবিবরণী দেওয়া হবে বাংলাতে।
কমলবাবু তখন ময়দানে তো বটেই রেডিয়োর অনেকের কাছেই চেনামুখ। আকাশবাণীর তখনকার প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ মুস্তাফি প্রস্তাব পাড়লেন ওঁর কাছে।
শুনেই কমলবাবু ‘না’ করে দেন। ওঁর যুক্তি, ক্রিকেটে এমন সব শব্দ আছে, যার কোনও বাংলা হয় না। এ দিকে মুস্তাফি নাছোড়। — “কেন হবে না, অবশ্যই হবে।”
এ বার অজয় বসুর সঙ্গে কথা বলেন কমলবাবু। অজয়বাবুও সব শুনে বলেন, “না হওয়ার তো কিছু নেই।”
তাই শুনে কমলবাবু নড়েচড়ে বসলেন। এ দিকে হাতে মাত্র এক সপ্তাহ।
পর দিনই রেডিয়োর সঙ্গে চুক্তি করেন ওঁরা। তারপর দুজনে মিলে সোজা চলে যান এরিয়ান মাঠে। সেখানেই ধারাভাষ্যর মকশো করেন। তখনই ঠিক হয়ে যায়, মাঠ, আশপাশ ইত্যাদি নিয়ে বলবেন অজয় বসু। আর ক্রিকেটের টেকনিক্যাল দিক নিয়ে বলবেন কমল ভট্টাচার্য।
ইতিহাসের মুখবন্ধ এমনই।
প্রথম ম্যাচেই দুর্দান্ত শুরু। জনপ্রিয়তা উঠল তুঙ্গে। আর তাঁদের ধারাভাষ্যের ইনিংস যত গড়াতে থাকল তত দেখা গেল, অবিস্মরণীয় সব বাক্যবন্ধ জুড়তে জুড়তে ওঁরা ক্রিকেটটাকে বাড়ির অন্দরমহলে নিয়ে চলেছেন। দিনকয়েকের মধ্যেই বাংলা জনপ্রিয় গানের কলির পাশাপাশি পাড়ার রকে, গেরস্থের সদরে গুনগুন করে জমে উঠল অজয় বসুর ‘ইডেনের গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ’, ‘সবুজ মখমলের মতো ঘাস’ কিংবা কমল ভট্টাচার্যর ‘পিছনের পায়ে ভর করে ব্যাক খেলেছেন’, ‘ব্যাটস্ম্যান দৌড়ে রান চুরি করে নিলেন’-এর মতো ভূরি ভূরি সব বাক্য।

“আসলে এ রকম কথাগুলো বাবা বা অজয়কাকু খুব যে ভেবেচিন্তে বলতেন তা কিন্তু নয়। মনে আছে, বাবা এক বার ঘরোয়া আড্ডায় এমনও বলেছিলেন, ‘পিছিয়ে এসে ব্যাক খেলেছে’ বলে আমি নিজেই পরক্ষণে বুঝতে পেরেছিলাম কথাটা একটু হাস্যকর হয়ে গেল। কিন্তু যখন দেখলাম তার পরের কয়েক দিনেও কেউ তা নিয়ে  কোনও  উচ্চবাচ্চ্য করলেন না, উল্টে কেউ কেউ এ’ও বললেন তাঁরা নাকি অন্য রকম মজা পেয়েছেন, তখন ভাবলাম, ব্যাপারটা বেশ খেয়েছে!” এত বছর পর ফাঁস করলেন প্রয়াত কমল ভট্টাচার্যের ষাটোর্ধ্ব ছেলে।
যাঁর ক্রিকেট-ফুটবল, দু’টো খেলারই অনেক বার ধারাবিবরণী দিয়েছেন অজয়-কমল-পুষ্পেন, সেই চুনী গোস্বামী বলছিলেন, “এঁদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব, ক্রিকেট খেলাটাকে বাঙালির রান্নাঘরে ঢুকিয়ে দিতে পারা। কমলদা-অজয়দার বাংলা কমেন্ট্রি শুনে বাঙালি বাড়ির গিন্নিরাও ক্রিকেটটা শিখে ফেলেছিল।”
বাংলা ধারাভাষ্যের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের তুলনা করতে গিয়ে চুনী এ বার বললেন, “কমলদার ছিল ওঁর মিষ্টি স্বভাবের মতোই মিষ্টি ধারাবিবরণী। মেয়েদের মধ্যে অজয়দার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিল কমলদার কমেন্ট্রি। আমি এ রকম অনেক পরিবারকে চিনি, জানি।”
চুনী গোস্বামীর মনে আছে, ১৯৬৯-৭০-এর রঞ্জি সেমিফাইনালে মহীশূর ম্যাচে বাংলা দলের ম্যানেজার হয়ে গিয়েছিলেন কমল ভট্টাচার্য। দলে ছিলেন চুনী। তখন আরও বেশি করে ওঁর কোমল স্বভাবের ছোঁয়া পেয়েছিলেন উনি।
চুনীর কথায়, তাঁর স্বভাবের সঙ্গে কোথায় যেন মিলে যেত ওঁর বলাটাও। আটপৌরে, ঘরোয়া। সাধারণ বাঙালি বাড়িতে যে ভাবে বাবা-কাকা, মা-জেঠিমা, ভাইবোন নিজেদের মধ্যে কথা বলে, কমল ভট্টাচার্যর কমেন্ট্রি ছিল অনেকটা সেই ধাঁচের। কমলবাবুর জীবন জুড়ে ছিল বৈঠকী-পনা, অনাড়ম্বর মেঠো ভঙ্গি। সেই স্বাদও মিশে যেত তাঁর ধারাভাষ্যে।
এ মত কখনওই অস্বীকার করার নয়। ১৪/এ মোহনলাল স্ট্রিট। কমলবাবুর ডেরা। যে ডেরায় আড্ডা, গানবাজনা, ছুটির দিনের সকালে চুটিয়ে তাস খেলা ছিল নিত্যকার ব্যাপার। এ বাড়ি থেকে অজয় বসুর বাগবাজারের গ্যালিফ স্ট্রিটের বাড়ি ছিল খুব কাছে। দু’জনের প্রায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল একে অন্যের বাড়ি। বরং পুষ্পেন সরকারের বাড়ি ‘খেলাঘর’ বেশ দূরে। বারাসত।
‘কমলদা’র বাড়ির তাসের আড্ডায় মাঝে মাঝেই দেখা যেত পঙ্কজ রায়কে।
ইডেনে টেস্ট খেলতে এলে মুস্তাক আলি, লালা অমরনাথ একবার না একবার ও বাড়ি ঢুঁ মারতেনই। পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়ও যে কত বার আড্ডা দিয়েছেন সেখানে, গুনে শেষ করা যাবে না। আর আসতেন গানের জগতের মানুষেরা!

কমলবাবুর ছিলেন আরও দুই ভাই। সুরকার নির্মল ভট্টাচার্য আর গীতিকার অনিল ভট্টাচার্য। ওঁরা মোহনলাল স্ট্রিটের বাড়িতেই থাকতেন। ওঁদের কাছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র থেকে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, ধনঞ্জয়-পান্নালাল, সতীনাথ-উৎপলা, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র— কে না আসতেন! বাড়িতে হামেশাই গানের আসর বসত। এই মজলিশি আবহাওয়াটা কি কমল ভট্টাচার্য বয়ে বেড়াতেন তার সংলাপে? হয়তো তাই।
যে জন্য হয়তো’বা মাঠে হঠাৎ একটা কুকুর ঢুকে গেলেও তাঁর বলার আওতায় চলে আসত, “বিশ্বনাথ ব্যাট উঁচিয়ে সারমেয়টিকে বললে, অনেক তো ছোটাছুটি করলে, এ বার আমায় একটু দৌড়তে দাও।” ঠিক এ ভাবেই তাঁর ধারাভাষ্যে ঢুকে পড়ত মাথার ওপর দিয়ে গোঁ গোঁ করে চলে যাওয়া উড়োজাহাজ, আকাশে লাট খাওয়া কোনও ঘুড়ি কিংবা ঘাসের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে চলা একটা পাখি।
চুনী গোস্বামী বলছিলেন, “তুলনায় অজয় বসু অভিজাত, ভারিক্কি। বেছে বেছে শব্দ বলতেন। যে জন্য অনেক সময় কারও কারও কাছে একটু খটমট লাগত অজয়দার ধারাবিবরণী। তেমনি আবার অনেকের মুখে এ-ও শুনেছি, অজয় বসুর বাংলা ভাষার ওপর যা দখল, যে রকম সাহিত্যপ্রবণ মানসিকতা ছিল, তাতে কমেন্ট্রি লাইনে না গেলে হয়তো সাহিত্যিক হতেন!” 
ঠিক একই রকম কথা বলছিলেন নীলিমেশ রায়চৌধুরী। বাংলা ধারাবিবরণীর তিন মহাতারার সঙ্গেই মাইক ‘শেয়ার’ করার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। বলছিলেন, “আজও মনে পড়ে তিরানব্বইয়ে হিরো কাপ ফাইনালে অজয়দার সঙ্গে ধারাভাষ্য দেওয়া।”
নীলিমেশের মতে, “অজয়দার ভাষার ওপর দখল ছিল যে কোনও বাংলা ভাষাবিদের মতোই। এত বিকল্প শব্দের ভাণ্ডার ছিল ঝুলিতে! জায়গা মতো ঠিক শব্দটা ব্যবহারে জুড়ি ছিল না।”
তার সঙ্গে বিচিত্র সব ঘটনার অনুষঙ্গ জুড়ে অদ্ভুত সব মোচড়। ষাটের দশকের এমনই এক ধারাবিবরণী যেমন অনেক প্রবীণ সাংবাদিকের কানে আজও বাজে।
ইংল্যান্ড টেস্ট খেলছে ইডেনে। এমএল জয়সীমার ব্যাটের দাপটে ছত্রখান ইংরেজ-আক্রমণ। সেঞ্চুরির একেবারে কাছে এসে বিশাল ছক্কা হাঁকালেন জয়। ধারাভাষ্যে অজয় বসু। বললেন, “শুনেছি কাল আগুন লেগেছিল ইডেনে গ্যালারির কোনও এক অংশে। আজও আগুন। তবে এ দিন আর গ্যালারিতে নয়, আগুন লেগেছে জয়সীমার ব্যাটে।” আসলে আগের দিনই খড়ের ছাউনি দেওয়া গ্যালারিতে আগুন ধরেছিল। অজয় বসু তাকেই ধার করে জুড়ে দিলেন তাঁর ভাষ্যে।
এই ‘ত্রয়ী’র দলে পুষ্পেন সরকার ইউনিক ছিলেন তাঁর পরিসংখ্যান দেওয়ার ক্ষমতায়।
সব মিলিয়ে এই ত্রিবেণী সঙ্গমে যা দাঁড়িয়েছিল, তা হল— টেস্টের কোনও বড় টেকনিক্যাল ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়ার দরকার পড়লে কমেন্ট্রি বক্সে অজয় বসুর বাঁধাধরা কথা ছিল, ‘কমলদা, মাইকটা ধরুন’। আবার ম্যাচের বিশেষ আবহের জমকালো বর্ণনা দেওয়ার সময় এলেই কমল ভট্টাচার্য সব সময় বলতেন, ‘অজয়, এ বার তোমার পালা।’ আর কেউ সেঞ্চুরিতে পৌঁছলে বা পাঁচ উইকেট নিলে সেই সময় অবশ্যম্ভাবী মাইকটা চলে যেত পুষ্পেন সরকারের কাছে। সেই সেঞ্চুরিয়ান বা স্টার বোলারের স্ট্যাটিক্সটিক্স ওঁর চেয়ে বেশি ভাল তখন আর কে গড়গড় করে মাইকে বলে চলবেন! 
তিন জনেরই একটা অভ্যাস ছিল। সতীর্থ ধারাভাষ্যকার কোনও ভুল করে ফেললে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে নিজে দায়িত্ব নিয়ে সেটা সামলে দেওয়া। “কমলজ্যেঠু হয়তো অন্যমনস্কতায় এক জন অফস্পিনারকে লেগস্পিনার বলে ফেলেছেন, পাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে নিজের মাইক টেনে নিয়ে আমার বাবা সামলে দিয়েছেন, ‘ও লেগস্পিনটা করলেও খুব খারাপ করত না বোধহয়, কী বলেন কমলবাবু!’ আবার কখনও বাবা হুড়োহুড়িতে স্কোয়ার লেগকে লেগ স্লিপ বলে বসেছেন, কমলজ্যেঠু সঙ্গে সঙ্গে হাতের মাইক ‘অন’ করে বলে উঠেছেন, ‘অজয়, ওটা সত্যিই স্কোয়ার লেগ, না লেগ স্লিপ এখান থেকে বোঝা একটু মুশকিল!’ এতটাই বোঝাপড়া আর ‘ফেলোফিলিং’ ছিল ওঁদের মধ্যে কমেন্ট্রির সময়,” বলছিলেন অজয়-কন্যা।
এ নিয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে ওঁদের উদার সংবেদনশীল মনের গল্প শোনালেন শ্রীরূপা বসু। বেসরকারি ম্যাচে ভারতের মহিলা ক্রিকেট দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন শ্রীরূপা। আবার ধারাভাষ্যও দিয়েছেন বেশ কয়েক বছর।
শ্রীরূপা বলছিলেন, “আমাকে তো অনেকে ভাবতেন অজয় বসুর মেয়ে! উনি বসু, আমিও বসু। এমনকী ময়দানের অনেকে আমাকে বলতেন, ‘তুমি তো অজয় বসুর মেয়ে!’ সেই মানুষের সঙ্গে আমি একসঙ্গে কমেন্ট্রি করেছি যেমন, তেমনি অজয়দা আমার খেলা ক্রিকেট ম্যাচেরও ধারাবিবরণী দিয়েছেন। কমলদা, পুষ্পেনদার সঙ্গেও ধারাবিবরণী দিয়েছি। এ রকম অনেক বার হয়েছে, পেছন থেকে ওঁদের কেউ না কেউ আমাকে কোন পজিশনে কে ফিল্ড করছেন, প্রম্পট্ করে গিয়েছেন। ওঁরা কোনও নতুন ধারাভাষ্যকারের দিকে এতটাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন।”
কাজের প্রতি অসীম দরদ, প্রগাঢ় শ্রদ্ধা, মমতা না থাকলে কি এতটা সম্ভব? “টেস্ট ম্যাচের দিনগুলো বাবাকে দেখতাম রোজ রাতে শোওয়ার আগে এক গ্লাস উষ্ণ গরম জলে অল্প নুন ফেলে গার্গল করতে। সকালে উঠেও একই রুটিন। অজয়কাকু নাকি সারা দিনের কমেন্ট্রির পর বাড়ি এসে গরম জলে গার্গল করার পর মুখে এক টুকরো যষ্টিমধু অনেকক্ষণ পুরে রাখতেন। পুষ্পেনকাকু কোল্ড ড্রিঙ্কসের ভক্ত ছিলেন। কিন্তু ইডেন টেস্টের সপ্তাহটা কোল্ড ড্রিঙ্কসের ধার মাড়াতেন না”, জানালেন শ্রীকান্ত।
নেশাভাঙ যে তাঁরা করতেন না, তা নয়, অজয়বাবু আর কমলবাবু সিগারেট, মদ দু’টোই খেতেন। পুষ্পেন সরকার মদ না খেলেও ধূমপান করতেন। কিন্তু কোনও দিন কাউকেই কেউ বাড়াবাড়ি করতে দেখেননি।
এক বার লেন হাটন ইংল্যান্ড টিমের সঙ্গে কোনও এক কর্তা হিসেবে ইডেন টেস্টের সময় শহরে এসেছিলেন। অনেক বয়স তখন। শ্রীকান্ত বলছিলেন, “বাবা আর অজয়কাকাকে টেস্টের বিশ্রামের দিন তাঁর হোটেলে আসার জন্য নেমন্তন্ন করেন উনি। বলেছিলেন, ‘খেলার দিন আসতে বলছি না। সারা দিন মাইক হাতে বকবক করে নির্ঘাত ক্লান্ত থাকবে তোমরা।’ তো হাটনের পাশে মদের গ্লাস হাতে বাবার ছবি এখনও আমাদের বাড়িতে আছে।”
মাঠচরা প্রবীণদের কেউ কেউ বলেন, ওঁদের কমেন্ট্রি বক্সে ঢুকতে দেখলে মনে হত, খেলার ধারাবিবরণী দিতে নয়, যেন মন্দিরে উপাসনায় চলেছেন তিন পূজারি! কেমন ছিল তাঁদের সেই ‘মন্দির’?
কমেন্ট্রি বক্সটা ছিল এখনকার ক্লাবহাউসের একেবারে উল্টো দিকে। এখন যেখানে ইডেনের ইলেকট্রনিক জায়ান্ট স্কোরবোর্ড, ষাট-সত্তরের দশকে সেখানে ছিল হাতে চালানো স্কোরবোর্ড। আর ঠিক তার তলায় ছিল কাঠের পাটাতনের ওপর লোহা দিয়ে বানানো কমেন্ট্রি বক্স। কমেন্ট্রি রুম-টুম তখন স্বপ্নের অতীত।
পুরনো রঞ্জি স্ট্যান্ড ছিল যেটা, তার নীচের গেট দিয়ে কমল ভট্টাচার্য, অজয় বসু, পুষ্পেন সরকার ইডেনে ঢুকতেন। “এক বার আমি বাবার সঙ্গে সেখান দিয়ে ঢুকছি। বাবার একটু পিছনে পড়ে গিয়েছিলাম বোধহয়, গেটে পুলিশ আমাকে আটকাল। বাবা পুলিশকে বললেন, ‘এ আমার ছেলে।’ উত্তরে খানিকটা অবাক হয়ে সেই পুলিশকর্মী বাবাকে বলেছিলেন, ‘কমলদা আপনার ক’টা ছেলে? এর মধ্যেই তো আরও দু’টো ছোকরা নিজেদের কমল ভট্টাচার্যের ছেলে পরিচয় দিয়ে মাঠে ঢুকে গিয়েছে!’ ছেলে-বুড়ো সবার কাছে ‘কমলদা’র এতটাই জনপ্রিয়তা ছিল!” গড় গড় করে বলে চললেন শ্রীকান্তবাবু।
খেলা-পাগল বাঙালির কাছে মহাত্রয়ীর জনপ্রিয়তা এতটাই বেশি ছিল যে, ধারাভাষ্য ঘিরে একবার ঐতিহাসিক বিতর্কও থামানো হয় সেই জনপ্রিয়তাকে ভর করেই। বিতর্কের মূলে বাংলার বিখ্যাত প্রবীণ ক্রিকেটার কার্তিক বসু। সে বার রেডিয়োয় তিনি বিশেষজ্ঞের ভূমিকায়।
আটাত্তর সাল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট হার বাঁচাতে শেষ দিন চায়ের পর দাঁতে দাঁত চেপে লড়ছে। ক্রিজ কামড়ে পড়ে আছেন ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক আলভিন কালীচরণ। এমন একটা সময় অজয়বাবু মাইক হাতে কার্তিক বসুর কাছে জানতে চাইলেন, ‘‘কী বুঝছেন কার্তিকবাবু, এই অবস্থায় আর কতটা প্রতিরোধ দিতে পারবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ?”
উত্তরে সহভাষ্যকার, আপামর রেডিও শ্রোতা এমনকী আকাশবাণীর প্রোডাকশনের লোকজনদের চোখ প্রায় কপালে তুলে দিয়ে কার্তিক বসু বলে দেন, “শালা কালীচরণটা যতক্ষণ আছে, ততক্ষণ ভারতের আশা নেই।”
ব্যস, আকাশবাণীতে পরের পর অভিযোগের ফোন। এটা কী ভাষা! কেন এ রকম এক জনকে বাঙালির হৃদয়ের কমেন্ট্রি টিমের সঙ্গে বসতে দিয়েছেন? যত বিখ্যাত প্রাক্তন ক্রিকেটারই হন না কেন তিনি!
অজয়-কমল যুগলবন্দিও তখন যেন খানিকটা বেসামাল। “পর দিন অজয়কাকু আর বাবা উত্তেজনার বশে যে যার মাইক নেওয়ার বদলে একসঙ্গে একটাই মাইকে পরের কয়েক মিনিট কমেন্ট্রি করেছিলেন। আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন বোঝাতে যে, কার্তিক বসু কথাটা গুড স্পিরিটে বলেছেন। কোনও খারাপ সেন্সে নয়।”
পড়তি ফর্মের বিষেন সিংহ বেদীকে কটাক্ষ করেও একবার বেশ উৎপটাং কথা বলে ফেলেছিলেন কার্তিক বসু। “বেদীর আঙুলে আর কিছু নেই। ওই আঙুল দিয়ে সন্ধ্যাহ্নিক করা যেতে পারে। বল আর ঘুরবে না।” আবার বিতর্ক। সে বারও ওই একই কায়দায় সামাল দেন ওই অজয়-কমল জুটিই।
 নজিরের পর নজির, একের পর এক সাফল্য এঁদের যে কী উচ্চতায় নিয়ে গেছে! ওঁদের আগমন, উত্থান, বিদায় নেওয়ার মাঝে মাঠ-ময়দানে বহু বহু রেকর্ড ভেঙেছে। গড়েছে। কিন্তু এঁদের তৈরি রেকর্ডগুলো যেন আদি-অনন্তের। এমনই এক প্রসঙ্গ উঠতে কমল-তনয় আরেক অদ্ভুত কীর্তির কথা তুললেন।— বাবা-ছেলে একসঙ্গে টেস্ট ক্রিকেটের ধারাভাষ্য দেওয়ার নজিরও বোধহয় প্রথম বাংলা কমেন্ট্রিতেই (নাকি এটাই একমাত্র নজির! খোঁজ নেওয়া যেতে পারে।)। এ ঘটনার মুখরাটাও ওঁদের মতোই স্মৃতির মধ্যে কম উজ্জ্বল নয়।
কী রকম? কমল-পুত্র শ্রীকান্তের মুখেই শোনা যাক। “আমি যে কলকাতা আকাশবাণীতে বাংলা ধারাবিবরণীর জন্য অডিশন দিয়েছি বাবা জানতেনই না। এক দিন স্টেশন ডিরেক্টর নাকি একটা ক্যাসেট দেখিয়ে বাবাকে বলেছিলেন, শ্রীকান্ত নামের একটা ছেলে, আপনাদের শ্যামবাজারের দিকেই থাকে, ভাবছি একে পরের ম্যাচের বাংলা কমেন্ট্রি টিমে রাখব। বাবা নাকি বলেছিলেন, ‘এই শ্রীকান্ত কি মোহনলাল স্ট্রিটে থাকে?’ উত্তরে ‘হ্যাঁ’ শুনে ফের বাবা নাকি বলেন, বাড়ির নম্বর কি ১৪/এ? তাতেও ‘হ্যাঁ’ শুনে বাবা বলেছিলেন, তা হলে এই শ্রীকান্ত আমার ছেলে। তার পর নাকি স্টেশন ডিরেক্টরের চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল। ‘আপনি এতক্ষণ সেটাই বলেননি?’ বলে নাকি বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন ভদ্রলোক।”
তবে আসল মজাটা এর পরে। “ম্যাচের দু’দিন আগে থেকে বাড়িতে আমি আর বাবা রীতিমতো রিহার্সাল দিয়েছিলাম কী ভাবে কমেন্ট্রিতে আমরা বাবা-ছেলে নিজেদের মধ্যে কথা বলব।”
বাবাকে যে সেদিন ছেলের ডাকনাম ভুলতে হয়েছিল! আর ছেলেকেও তাঁর বাবাকে নাগাড়ে বলে যেতে হয়েছিল ‘কমলবাবু’!
কঠিন পিচে দুরন্ত পেস বোলার সামলানোর মতো এ’ও কি কম কঠিন কাজ!

সূত্র - আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৫