Tuesday, 25 July 2017

একটি সত্য ঘটনাকে অনুসরণ করে

গল্পটা পেলাম । পড়ুন ভালো...নাও লাগতে পারে, কারণ কপি করতে একটু সমস্যা হয়ে গেছে ।

সেদিন মনজিনিসে গেছিলাম । ও থুড়ি, মনজিনিস নয়, মিও আমরে । তো যাই হোক, আমি বোধহয় একটা স্যান্ডুইচ জাতীয় কিছু একটা চিবিয়ে গলাধঃকরণ করছিলাম, বিশেষ তাড়া ছিল না সেদিন, তাই এসি দোকানঘরে বসে একটু সময় নিয়েই খাচ্ছিলাম ।

এমন সময় এক পিতা-পুত্রের আগমন । পুত্রটি বড় জোর বছর দশেক, সাথে শীর্ণকায় দারিদ্রক্লিষ্ট মজদুর বাবা। দোকানে ঢুকেই বিস্মিত ছেলেকে বললেন, 'নে দ্যাখ এবার । যা নিবি দ্যাখ ।'

দোকানের সার্ভিস বয়দেরও চাউনি খুব একটা আপ্যায়ন সুলভ নয় । কিঞ্চিৎ গম্ভীর মুখেই তাকিয়ে ওই অনাহূত আগন্তুকের দিকে । বেচারি বাবাটি এমনিতেই ঘাবড়ে গেছে, তারপর চেষ্টাকৃত স্মার্টনেস দেখাতে গিয়ে আরো গোলমাল করে ফেলছে । আর বাচ্চা ছেলেটির চোখে যেন গোটা গ্যালাক্সি । এত ঐশ্বর্য যে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে থাকতে পারে, সেটাই বোধহয় তার হিসেবেই বাইরে । এরপর শুরু হলো বার্থডে কেক বাছাই করা । খুব সম্ভবত ছোট্ট ছেলের জন্মদিন বড়লোকদের মতো পালন করার ইচ্ছাতেই এই 'মিও আমরে'র আগমন । ছেলেটির তো সবকটি কেকই পছন্দ, অনেক ঝাড়াই বাছাই করে একটা বাছাইও হলো । কিন্তু মুশকিল হল অন্য জায়গায় ।

লোকটি হাতের মুঠো মধ্যে দলা পাকানো ঠিক একটি ১০০ টাকার নোট । একটিই । আর কিচ্ছু নেই । হয়তো তার ধারণা ছিলো ১০০ টাকা একটা গোটা কেক কেনার পক্ষে যথেষ্ট, হয়তো ওটা তার গোটা একদিনের রোজগার্ । কিন্তু হা হতোস্মি, পছন্দের কেক তো নয়ই, বরং হিসেব করে দেখা গেলো সবচেয়ে কমদামি ভ্যানিলা কেকটারও দাম ১৬০ টাকা । এর কমে কোনো বার্থডে কেক হয় না । অসহায় বাবাটি অবান্তর কিছু তর্ক করল সার্ভিস বয়গুলির সাথে । ছেলেগুলি উদাসীন ভঙ্গিতে পাত্তাই দিলো না ।

আমি অনেক্ষন ধরে লক্ষ করছিলাম এই নরনারায়ণদুটিকে । ছেলের চোখ ছলছলে, অপ্রস্তুত বাবার ছটফটানি, সব মিলে বড় অসহায় এক পরিস্থিতি । পায়ে পায়ে এগোলুম আমি । সসঙ্কোচে বললুম,

- কিছু মনে করবেন না, এই কেকটা আমায় কিনে দিতে দেবেন ওকে ?
- না দিদি, লাগবে না ।
- দিন না কিনে দিতে, না হয় ছেলেটার মুখ চেয়েই কিনে দিতে দিন ?
- বললাম তো লাগবে না । ক্ষুব্ধ বাবার কড়া উত্তর্ । 
- তাহলে অন্তত ৬০টাকাই আমায় দিতে দিন, যেটুকু কম পড়েছে ?
- নাআআআ...। আমাদের লাগবে না ।

অসহায় সেই মানবশিশু বাবার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমার দিকে করুন মুখে তাকিয়ে । ঝকঝকে দুই চোখে হাজার ওয়াটের আলো । কিন্তু নাহ । কিছুতেই বাবা গললো না । কেক কেনাও আর হলো না । এমন অভিজ্ঞতা অবশ্য আমার আগেও হয়েছে । ট্রেনে শ্রমিক মায়ের কোলে শীর্ণকায়া শিশুটি চিল চিৎকার করে একটা কমলালেবু চেয়েছিল । আমার হাজার অনুরোধ উপরোধেও সেই মা আমায় কমলালেবু কিনে দিতে দেয়নি । নিজে তার বললে কিনে দিয়েছিল ২টাকার ঝুরিভাজা, তবুও আমায় দিতে দেয়নি ।

বাবা-ছেলে চলেই যাচ্ছিল দোকান ছেড়ে । হঠাৎ কি মনে করে বাবা কাউন্টারের সামনে এলো । ভালো করে দাম দেখে দেখে ছেলেকে কিনে দিলো ২টি রঙ্গীন প্যাস্ট্রি, আর ২/৪ টে মোড়কের চকোলেট । সঙ্কুচিত, ব্যর্থ বাবাটি দাম মেটাচ্ছেন ওই ১০০ টাকার হিসেবের মধ্যেই, আর ছেলেটি পায়ে পায়ে এসে দাড়িয়েছে আমার পাশে । হঠাৎ দেখি আমার আঁচলে ঈষৎ টান । দেখি পাশে দাড়িঁয়ে সেই দেবশিশু । সেই জ্বলজ্বলে কাঁচস্বচ্ছ চোখ । আমার ভারতবর্ষ...

আমার অপমানিত সত্তায় প্রলেপ দিচ্ছে নির্মল এক হাসি দিয়ে । দেখি হাতে গুঁজে দিলো একটি চকোলেট । ওই সামান্য সম্ভারের থেকেও সে আমায় দিতে পারলো ? চোখে জল এসে গেলো আমার্ । অবচেতন ভাবে হাত বাড়ালাম সেই পুন্যের দানে । এ জিনিস অস্বীকার করব, এত স্পর্ধা আমার কই ?

হায় রে ছেলে, তোকে আমি উপহার দিতে গেছিলাম, উল্টে তুইই আমায় দিয়ে দিলি ? সারাজীবন ধরে হামলে পড়ে নিতে নিতে আমি তো ভুলেই গেছিলাম যে দিতে গেলেও কিছু যোগ্যতা লাগে । পকেটে টাকা থাকলেই দেওয়া যায় না ।

এই আমার দেশ । সুজলা সুফলা জন্মভূমি । এখানে ভিখারীকে ভিক্ষা দিতে গেলেও প্রণাম করতে হয়, কারণ সে আমায় দান করার সুযোগ করে দিয়েছে । এখনো হয়তো আমার অন্তর থেকে সেই প্রণাম আসেনি, তাই বুঝি আমার দান গ্রহণ করলেন না আমার জীবনদেবতা ।

বাবার হাত ধরে পরিপূর্ণ মনে বেরিয়ে...এ কি ! ছেলেটিকে তো বাবার হাত ধরে বেরিয়ে যাওয়ার কথা । সে না করে আমার দিকে দুচোখ ভর্তি প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে আছে কেন ! আমি থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, 'কিছু বলবি ?' ছেলেটি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর অবশেষে মুখ খুলল । ঘুরিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলো, 'আচ্ছা, এই গল্পে আমার নাম কি দিয়েছেন ? বাবার গোটা একদিনের রোজগার তো ১০০টাকা বর্তে দিলেন, কিন্তু বাবার রোজগারের উপায়টা কি হবে ঠিক করেছেন ? আচ্ছা আমার ভাই আছে ? মা আছে ? আমাদের কটি ঘর ? আলো আছে ? জল আসে ?' 

একনাগাড়ে প্রশ্নগুলো করে গেল ছেলেটি । আমার কপালে ঘাম । কেন এইসব প্রশ্ন করছে আমাকে ? আমি কি কিছু খারাপ ব্যবহার করলাম তাদের সাথে ? ক্ষণিকের পরিতৃপ্তি মুহূর্তে বিষিয়ে গেল । বিরক্তির সাথেই জবাব দিলাম, 'এসব প্রশ্নের মানে কি ?' সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল, 'নেহাৎ গল্পের মানুষ বলে কি কৌতূহল থাকতে নেই ?'

- কোন গল্প ? কিসের গল্প ?
- এই যে এতক্ষণ আমাকে দেখে মনে মনে গল্প বানাচ্ছিলেন । (ছেলেটির চোখে কৌতুক )
- আমি কেন গল্প বানাতে যাব ! আমি এখানে গল্প বানাতে আসিনি, খেতে এসেছি ।
- সে তো অবশ্যই , কিন্তু আমাকে পেয়ে যে গল্পের প্লট ফেঁদে বসলেন, সেইটির কথাই বলছি । আমার বাবার হাতে ১০০টাকা, কেকের দাম ১৬০টাকা, চকোলেট উপহার ইত্যাদি ইত্যাদি ।
- সে তো সব চোখের সামনেই ঘটা । 
- না । (ছেলেটির চোখদুটো দপ করে জ্বলে উঠল ) কিছুই ঘটেনি । কেবল একটি ছেলে বাবার হাত ধরে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে গিয়েছিল এবং কাঁচের বাইরে থেকে ভিতরের সাজানো খাবারগুলো বড় বড় চোখ করে দেখছিল । তাই দেখে সঙ্গে সঙ্গে আপনি এত সুন্দর গল্প ফেঁদে বসলেন ! 
- আমার ইচ্ছে, আমি যা খুশি করি তোর কি ! তোর তো কোনও অস্তিত্বই নেই ।
- কে বলেছে ? জড় অস্তিত্ব নেই তো কি হল, ধারণার মধ্যে তো আছি...
- (কথা থামিয়ে) এইটুকু ছেলে আবার এত কথা বেরোয় কোথা থেকে ?
- সেটিই তো প্রমাণ, আমি আসলে কেও না, আপনারই ধারণা ; যেটি আপনার অন্য একটি ধারণার বিরোধিতা করছে । - কিন্তু এরকম ঘটনা যে হয় না তা তো নয় ?
- অবশ্যই হয়, কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে । যেখানে প্ররোচনার কোনও স্থান নেই, অভিনয়ের কোনও স্থান...
- ওকে ! ওকে ! ওকে ! আমার ভুল হয়ে গেছে । তুই এবার যা । 
- আমার তো আর কোথাও যাওয়ার নেই । আমাকে তো আপনি সকলের কাছে পৌঁছে দিয়ে গেলেন ।
- তবে যেমনটা ছিল তেমনটাই থাক না বাবা আমার । কত সুন্দর গল্পটা শেষ করছিলাম । (কিছুক্ষণ থেমে) হ্যাঁ গল্পই । আপনারা যা শুনছিলের তা সবই গল্প । ছেলেটি ঠিকই বলেছে বাইরে দেখলাম ওরকমই একজন বাবার হাত ধরে গেল, দিয়ে এরকম এরকম হতে পারে মাথায় এসে গেল, তাই আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম । বিশ্বাস করুন কোনও অসৎ প্রচারের ইচ্ছে আমার নেই । বাইরে ছেলেটিকে ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে থাকতে দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল । তাই নিজেকে আটকাতে পারলাম না । ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ।

ক্ষমা করে দিলে গল্পটা শেষ করে দিই, কেমন ? কোথায় যেন ছিলাম , হ্যাঁ মনে পড়েছে -

বাবার হাত ধরে পরিপূর্ণ মনে বেরিয়ে যাচ্ছে আমার ছোট্ট ভারতবর্ষ । মনে মনে বললুম তোকে উপহার দিতে আর পারলাম কই ? বরং তোর দান ই হাত পেতে নিলাম । তবুও মনেপ্রাণে আশীর্বাদ করলাম অনেক অনেক বড়ো মানুষ হ । এত বড়ো হ, যে কোনো একদিন এই 'মিও আমরে'র মতো বড় দোকানের মালিক হয়ে যাস তুই । সেদিন দোকানের সব কেক তোর হোক  ।

কথাগুলো শেষ করে দেখি, বাবা-ছেলে কেও কোত্থাও নেই । কেবল দুজন সার্ভিস বয় আমার দিকে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে ।

No comments:

Post a Comment