Wednesday, 21 June 2017

সংগ্রহ ৬ - লিখছেন মুহম্মদ সবুর

বাঙালির ক্রিকেট খেলা

‘রণজি ক্রিকেট প্রতিযোগিতার সেমিফাইনাল খেলায় বাঙালা ও আসাম সম্মিলিত দল হায়দরাবাদ দলকে ১২৭ রানে পরাজিত করিয়া বিজয়ী হইয়াছে। এইরূপ ফলাফলের আশা আমরা পূর্ব হইতে করিয়াছিলাম, সুতরাং ইহাতে কোনোরূপ আশ্চার্য্যান্বিত হই নাই।’ আশ্চর্য হওয়ার কথা না থাকলেও ফাইনালে হেরে বাংলা-আসাম দল রানার্সআপ হয়েছিল। তবে দলটি শিরোপা জিতেছিল একবারই, পরের বছর ১৯৩৮ সালে। ওই প্রথম এবং ওই শেষ। ১৯৩৭ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আন্তঃপ্রাদেশিক ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় বাংলা দলের সেমিফাইনাল খেলার পর্যালোচনায় ক্রীড়া লেখক ব্রজরঞ্জন রায় উল্লিখিত মন্তব্য করেছিলেন। রণজি ট্রফি শুরু হয়েছিল ১৯৩৫ সালে। তবে এ উপমহাদেশে ক্রিকেট খেলার চল ছিল সেই আঠারো শতকেই। প্রথম যে ম্যাচের কথা নথিবদ্ধ আছে, তা খেলা হয়েছিল ১৭২১ সালে। অবশ্য খেলেছিলেন ইউরোপীয় বণিকরা। যদিও কারও কারও মনে হতে পারে এটা এমন আর কী! ডাচ, দিনেমার, পর্তুগিজ, ব্রিটিশরা জাহাজ থেকে নেমে ব্যাট-বল নিয়ে মাঠে নেমে পড়ল- আর এটাকেই উপমহাদেশে ক্রিকেট জন্মের প্রথম শুভক্ষণ বলে মেনে নেয়া সঠিক হবে না।
ক্রিকেট গবেষকরা অবশ্য বলছেন, ১৭৮০ সালে কলকাতায় ক্যালকাটা ক্রিকেট ক্লাব গড়ে উঠেছিল। হিকির বেঙ্গল গেজেটেও এর উল্লেখ আছে। তবে তা ইংরেজদেরই খেলা ছিল। সংগঠিতভাবে বাঙালিরা খেলতে শুরু করে ১৮৭০ ও ১৮৮০ সাল থেকে। ১৮৯০ সালে কোচবিহারের মহারাজা বিপুল অর্থ ব্যয়ে তিনটি ক্রিকেট দল গঠন করেন। সবই শ্বেতাঙ্গ এবং পেশাদার খেলোয়াড়। ক্রিকেটের জন্য কলকাতায় আলিপুরে মাঠ কিনে নাম দিলেন উডল্যান্ডস মাঠ। নাটোরের মহারাজাও বসে থাকেননি। তিনিও দল গঠন করলেন। ১৯০০ সালে নাটোর দলে বাঙালি খেলোয়াড় ছাড়াও ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজ্যের সেরা ক্রিকেটারদের দলে জড়ো করা হয়। বালিগঞ্জে লাখ টাকা ব্যয়ে বানালেন ক্রিকেট মাঠ- নাটোর পার্ক। ১৯১১ সালে নাটোর দল বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর পরপরই কলকাতায় গড়ে ওঠে বিভিন্ন ক্রিকেট ক্লাব। কোচবিহারের মহারাজা ইংল্যান্ড থেকে কোচও আনিয়েছিলেন প্রশিক্ষণের জন্য। অবশ্য ১৯৩০ সাল থেকে বাংলার ক্রিকেট আধুনিক হতে শুরু করে। উপমহাদেশে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট শুরু হয় ১৯৯২ সালে। ধর্মীয় সম্প্রদায়ভিত্তিক এ খেলায় ১৯০৭ সালে ইংরেজ ও পার্সির পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায় এবং ১৯১২ সালে মুসলিম সম্প্রদায় দল প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলে। ১৯৩২ সালে প্রথম টেস্ট ম্যাচ হয়। অবশ্য তা ক্রিকেটের তীর্থস্থান ইংল্যান্ডের লর্ডসে। ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক সাম্প্রদায়িক প্রতিযোগিতার বিপরীতে ১৯৩৫ সালে চালু হয় রণজি ট্রফি। অসাম্প্রদায়িক এবং রাজ্য ও প্রাদেশিক দলগুলোকে নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
শুরু থেকেই রণজি ট্রফিতে বাংলা ও আসাম সম্মিলিত দল খেলে আসছে। দলে ইউরোপীয়দের আধিক্য ছিল তখনও। ১৯৩৭ সালে বাংলা দল সেমিফাইনাল খেলে হায়দরাবাদ দলের সঙ্গে। ইংরেজ হোসি ছিলেন বাংলা দলের অধিনায়ক। হায়দরাবাদ দলে একজনও প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলায় সুনাম অর্জনকারী খেলোয়াড় ছিল না। তবু তারা বাংলা দলকে বেশ বেগ পাইয়ে দিয়েছে। ব্রজরঞ্জন রায় সাপ্তাহিক দেশ ৪র্থ বর্ষ, ফেব্র“য়ারি ১৯৩৭ সংখ্যায় খেলার পর্যালোচনায় লিখেছিলেন, ‘ফিল্ডিং ও বোলিং বিষয়ে হায়দরাবাদের খেলোয়াড়গণের অনেকেরই নৈপুণ্য নামজাদা খেলোয়াড়গণের অপেক্ষা কোনো অংশে ন্যূন দেখা যায় নাই। বিশেষ করিয়া ওই দলের হায়দার আলীর বোলিং খুবই যে উচ্চাঙ্গের তাহাতে কোনোই সন্দেহ নাই। তাহার বোলিংয়ের বিরুদ্ধে খেলিতে বাঙালা ও আসাম দলের ব্যটিসম্যানগণকে রীতিমতো ভয়ে ভয়ে ব্যাট চালাইতে হইয়াছে। বিশেষ করিয়া বাঙালা দলের ইউরোপীয় খেলোয়াড়গণের ব্যাটিং অস্বচ্ছন্দতা বেশ উপভোগের বিষয় হইয়াছিল। এই খেলোয়াড়টি যে শীঘ্রই ভারতীয় প্রথম শ্রেণীর খেলোয়াড়গণের মধ্যে স্থান পাইবেন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। তাহা ছাড়া, আইবরা, ভজুবা, মেটা প্রভৃতি তরুণ খেলোয়াড়গণের ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং বেশ দর্শনযোগ্য হইয়াছিল। ইহাদের খেলা বাঙালার নামজাদা খেলোয়াড়গণের অপেক্ষা যে কোনো অংশেই নিুস্তরের হয় নাই, ইহা নিঃসন্দেহে বলা চলে। হায়দরাবাদ দল পরাজিত হইয়াছে। কিন্তু তাহা হইলেও উক্ত দলের কয়েকজন খেলোয়াড়ের ক্রীড়ানৈপুণ্য বাঙালার ক্রীড়ামোদীগণের প্রাণে চিরজাগ্রত থাকিবে।’ নামজাদা খেলোয়াড় না হয়েও সুযোগ-সুবিধা পেলে সাধারণ খেলোয়াড়রাও যে অশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করতে পারে, হায়দরাবাদের খেলোয়াড়রা তার প্রমাণ দিয়েছে বলে ক্রীড়াভাষ্যকার উল্লেখ করেছেন।
ধর্ম-সম্প্রদায়ভিত্তিক খেলার বিরুদ্ধে চালু হয়েছিল রণজি ট্রফি। এ প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য উৎসাহী সাধারণ প্রাদেশিক ক্রিকেট খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক বা প্রতিনিধিত্বমূলক ক্রিকেট খেলার জন্য অনুশীলনের সুবিধা করে দেয়া। বাংলার ক্রিকেট দল নির্বাচন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশও করা হয়েছে। ‘বাঙালা দলের এই বিজয়ের জন্য দায়ী কাহারা?’ উপশিরোনামে ব্রজরঞ্জন রায় লিখেছেন, ‘বাঙালা দলের এই বিজয়ের জন্য দায়ী কাহারা তাহা বিশেষভাবে চিন্তা করিয়া দেখিলে দেখা যায়, বাঙালার তরুণ উৎসাহী ক্রিকেট খেলোয়াড়গণই জয়লাভের পথ প্রশস্ত করিয়াছেন এবং অভিজ্ঞ ধুরন্ধর ইউরোপীয় ক্রিকেট খেলোয়াড়গণ যে পটভূমির পশ্চাতেই রহিয়াছেন, একথা দর্শকগণের লক্ষ্য করতে বোধ হয় গোল বাধে নাই। ইউরোপীয় খেলোয়াড়গণ উক্ত খেলায় প্রকৃতপক্ষেই বিশেষ কিছু কৃতিত্ব প্রদর্শন করিতে পারেন নাই, কি ব্যাটিং, কি বোলিং, সকল বিষয়েই বাঙালার তরুণ খেলোয়াড়গণই সর্ব্বময় দর্শকগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছেন।’
বাংলা দলের মুসলিম খেলোয়াড় ছিলেন একজন, কামাল। প্রথম ইনিংসের খেলায় তরুণ খেলোয়াড় কামাল নবম উইকেটে শতাধিক রান তুলেছেন। তার এ খেলা দলের ইউরোপীয় খেলোয়াড়দের সব প্রয়াসকেই ম্লান করে দিয়েছে বলে ভাষ্যকার উল্লেখ করে বলেছেন, ‘এই খেলোয়াড়টি প্রকৃতপক্ষেই ঐ দিন দলের ভাগ্য পরিবর্তন করিয়া দিয়াছিলেন। ইহা সত্য যে, সেই সময় বিপক্ষ দলের বোলারগণের বলের তীব্রতাও পূর্বের ন্যায় ছিল না। তথাপি ১০০ মিনিটের মধ্যে ১০০ রান তুলিয়া তিনি যে অশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করিয়াছেন, ইহা অস্বীকার করিবার কোনো উপায় নাই।’ কামালের পর খেলায় বাংলা দলের কার্ত্তিক বসু ও সুঁটে ব্যানার্জি খেলেন। তাদের ব্যাটিং ‘প্রশংসার যোগ্য’ ছিল। কার্ত্তিক বসু প্রথম ইনিংসের খেলায় হায়দরাবাদ দলের আক্রমণের চরম প্রকোপ সহ্য করেছিলেন এবং পরবর্তী ব্যাটসম্যানরা যাতে রান তুলতে পারে, তার পথ সহজ করে দিয়েছিলেন। সুঁটে ব্যানার্জি শেষ মুহূর্তে পিচে গিয়ে ৪৭ রান করে নট আউট ছিলেন। তিনি কামালকে শতাধিক রান করার পক্ষে সাহায্য করেছিলেন। এই খেলায় বোলিং বিষয়ে বাংলার তরুণ খেলোয়াড়দের কৃতিত্ব বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। কারণ হায়দরাবাদ দলের উভয় ইনিংসে সুঁটে ব্যানার্জি ও কমল ভট্টাচার্য অধিক সংখ্যক উইকেট লাভ করেছিলেন। হায়দরাবাদের দ্বিতীয় ইনিংসে কমল ভট্টাচার্যের বোলিং খুবই ভালো হয়েছিল। তিনি ১৪ দশমিক ৫ ওভার বল করে ৬টি মেডেন ও ২৯ রানে ৩টি উইকেট পেয়েছিলেন। অপর বাঙালি খেলোয়াড় খোকন সেন দ্বিতীয় ইনিংসের খেলায় শেষ সময় ১৮ রান করে দলভুক্ত হওয়ার যে সম্পূর্ণ উপযুক্ত, তা তিনি প্রমাণ করেছেন। ‘কারণ বেরেন্ড, স্কিনার, হোসি প্রভৃতি ধুরন্ধর খেলোয়াড়গণ ইহা অপেক্ষা অনেক কম রানে আউট হইয়াছেন। সুতরাং এই খেলায় উৎসাহী তরুণ ভারতীয় খেলোয়াড়গণই সর্ব্ব বিষয়ে ইউরোপীয়ান খেলোয়াড়গণ অপেক্ষা সাফল্য লাভ করিয়াছেন। অতএব দলে অধিক সংখ্যক ইউরোপীয়ান খেলোয়াড় না লইলেও যে বাঙালা ও আসাম দলের খেলার ফল হতাশাব্যঞ্জক হইত না, তাহা উক্ত খেলার ফলাফল হইতেই প্রমাণিত হইয়াছে।’
ধর্মভিত্তিক ব্রিটিশদের গড়া পাঁচ দলের বোম্বাই পেন্টাঙ্গুলার নামে খ্যাত প্রেসিডেন্সি ম্যাচ অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ১৮৯২ সালে শুরু হওয়া প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের বিকাশে এ ম্যাচ যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিল। তবে এ খেলার জনপ্রিয়তার কারণে রণজি ট্রফি প্রতিযোগিতা সর্বার্থেই মার খাচ্ছিল। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড সাম্প্রদায়িক খেলা বন্ধের জোর দাবি জানায়। গান্ধীও এ খেলা বন্ধে বিবৃতি দেন। কিন্তু জনপ্রিয়তার কারণে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রতিযোগিতা ম্যাচ অব্যাহত ছিল। রণজি ট্রফি চালুর পর প্রাদেশিক ক্রিকেট দলগুলো প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলার সুযোগ পেয়েছিল।
১৯৩৭ সালে হায়দরাবাদ দলকে সেমিফাইনালে পরাজিত করে বাংলা দল ফাইনালে নবনগর দলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। দল নির্বাচনে ফাইনালে বাংলা ও আসাম দলে ইউরোপীয়দের প্রাধান্য দেয়া হয়। দলের অধিনায়ক হিসেবে হোসিকে নির্বাচিত করায় বাংলা দল ক্ষুব্ধ হয়। কারণ হোসি কখনও উপমহাদেশের বড় কোনো ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় অধিনায়কত্ব করেননি। তদুপরি স্থানীয় খেলোয়াড়দের সম্পর্কে তার বিশেষ কিছু জানা ছিল না। বাঙালিরা আশা করেছিল কার্ত্তিক বসুকে অধিনায়ক করা হবে। কারণ কার্ত্তিক বসু ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে বড় খেলায় অধিনায়কত্ব করেছেন। অধিকাংশ ভারতীয় সেরা খেলোয়াড়ের সঙ্গে বা বিপক্ষে খেলার সুযোগ পেয়েছেন। সুতরাং দলে এমন খেলোয়াড় থাকার পরও একজন ইউরোপীয়কে অধিনায়ক করা হয়েছে, এমনকি দুর্বল ইউরোপীয় খেলোয়াড়কে টিমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অবশ্য শ্বেতাঙ্গ খেলোয়াড়রা বরাবর অধিনায়ক হয়েছেন। ব্রজরঞ্জন রায় মন্তব্য করেছেন, ‘একজন ইউরোপীয়ানই অধিনায়ক হইবেন, ইহা যদি তাহাদের বিধি থাকে, তবে আমাদের বলিবার আর কিছু নাই।’ অবশ্যই বলার আর কিছু ছিল না। ১৯৩৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ফাইনালে বাংলা দল মুম্বাইয়ের নবনগর দলের কাছে ৫ উইকেটে হেরেছিল। ইউরোপীয় খেলোয়াড়রা কোনো সুবিধা করতে পারেনি।
৮৮ বছর আগে বাঙালির ক্রিকেট খেলা কণ্টকমুক্ত ছিল না। ইউরোপীয়দের নির্দেশ মেনে চলতে হতো। ফলে বাঙালির ক্রিকেট বিকাশ সহজসাধ্য হয়নি। উপমহাদেশের ক্রিকেটে বাঙালির অবস্থান এখন অবশ্য অনেক উপরে। টেস্ট ক্রিকেট থেকে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে এখন বাঙালি চূড়ান্ত জয়ের আশায় পথ পাড়ি দিচ্ছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১৫-এ ইতিমধ্যেই কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেছে। 

সূত্র - যুগান্তর, ১৪ মার্চ ২০১৫

Tuesday, 20 June 2017

সংগ্রহ ৫ - লিখছেন সুপ্রিয় মুখোপাধ্যায়

ইডেন উদ্যান থেকে বলছি

‘অজয় বসু। ...আমার সহযোগী ভাষ্যকার কমল ভট্টাচার্য ও পুষ্পেন সরকার।...’ ক্রিকেটের নন্দনকাননে ব্যাট-বলের লড়াই শুরুর আগে বেতার তরঙ্গে এ ভাবেই ধরা দিতেন তাঁরা

আ-উ-ট! আ-উ-ট! আ-উ-ট! প্রথম বলেই ইন্দ্রপতন। উইকেটরক্ষক জেফ দুঁজোর দস্তানায় প্রাণ জমা দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন ক্রিকেট-সম্রাট সুনীল মনোহর গাওস্কর। সোনা ঝরা রোদের এই শীতের সকালে কাতারে কাতারে দর্শক এখনও আসন পাওয়ার প্রতীক্ষায়। তার আগেই সিংহাসনচ্যুত তাঁদের অধীশ্বর। স্তম্ভিত ইডেন উদ্যান। বাকরুদ্ধ ক্রিকেটের নন্দনকানন।  লক্ষ লক্ষ হৃদয়ের কল্লোল নিমেষে বদলে যাচ্ছে প্রিয়জন হারা হাহাকারে...
ইডেনে ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট ম্যাচ। প্রথম দিন। সময়টা আশির দশকের গোড়া।
দিন শুরু করেছিলেন বোলার ম্যালকম মার্শাল। ও প্রান্তে ব্যাট হাতে সুনীল গাওস্কর।
প্রথম বল। খেলতে গিয়ে মিস করলেন গাওস্কর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দর্শক শুনলেন তারস্বরে চিৎকার। হা-উ-জ দ্যা-ট! আম্পায়ারের আঙুল তোলার অপেক্ষা না করে প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটা দিলেন সুনীল।

তার পরই বেতার তরঙ্গে ভেসে এল চিকন গলায় ওই ধারাভাষ্য।
এই অননুকরণীয় বিবরণ কার, বলতে এক মুহূর্ত সময় নেবেন না, এমন বাঙালি আজও অসংখ্য। হ্যাঁ, অজয় বসু।
’৭৬-এর ইডেন। ভারত বনাম ইংল্যান্ড। একনাথ সোলকারের ঢিমে লয়ের ব্যাটিং-এ বিরক্ত গোটা মাঠ।
তাঁর এক হাত দূরে সিলি পয়েন্টে দাঁড়িয়ে ইংরেজ অধিনায়ক টনি গ্রেগ।
হঠাৎ এগিয়ে এলেন তিনি। সোলকারের কাছ থেকে ব্যাটটা চেয়ে ‘শ্যাডো’ করে দেখিয়ে দিলেন কী ভাবে স্ট্রোক খেলতে হয়। হাসিতে ফেটে পড়ল ইডেন। তাতেও সোলকারের হেলদোল হল না।
পরে ইংল্যান্ডের ইনিংস। এ বার শুরু গ্রেগের ঠুকঠুকানি। তাতে ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে দাঁড়ানো সোলকার একই কাণ্ড করলেন।
পরের বলেই বাউন্ডারি মারলেন গ্রেগ। তার পরই দূর থেকে সবাই দেখলেন, গ্রেগ সোলকারকে কী যেন বলছেন!
তখন না ছিল স্টাম্প ক্যামেরা, না বাইশ গজে লুকোনো মাইক্রোফোন। তাতে কী! গ্রেগ-সোলকারের মধ্যে কী চলছিল— কমেন্ট্রি বক্সে বসেই তার কাল্পনিক অথচ অদ্ভুত মুচমুচে সংলাপ বলে গেলেন ধারাভাষ্যকার।— “গ্রেগ বললে, বাপু সোলকার, মাস্টারমশায়ের তো শেখানোটা কাজ। কিন্তু ছাত্রকেও তো তেমন হতে হবে। কাজের কাজটা তো তাকেই করতে হয়। তোমায় শিখিয়ে কাজ হয়নি। দেখো আমি কেমন করে দেখালাম।”
ধারাভাষ্যকার কে? বলতে লাগে না তা’ও। কমল ভট্টাচার্য।
আর তৃতীয় জন?
তাঁর বণর্না ছিল অনুপুঙ্ক্ষ। সামনে ঘটে চলা প্রতিটি দৃশ্যের একটি পলও যেন বাদ দেওয়ার নয়।
পুষ্পেন সরকার।
... “ক্লাব হাউস প্রান্তে প্রস্তুত কপিলদেব। দৌড় শুরু। উইকেটের গা ঘেঁষে ডেলিভারি... গুডলেন্থ বল। বাঁ পা বলের কাছে নিয়ে ব্যাটে-প্যাডে এতটুকু ফাঁক না রেখে রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে খেললেন জাভেদ মিঁয়াদাদ। বল চলে গেল কপিলের কাছে। এ বলেও কোনও রান হল না। রান যা ছিল তাই। দু উইকেটে হারিয়ে পাকিস্তান...!”
বাংলা ধারাভাষ্যের ত্রয়ী। এঁদের সকালটা অবশ্যম্ভাবী শুরু হত অজয় বসুকে দিয়ে।
ষাটের দশক থেকে কমপক্ষে তার পরের পঁচিশ-তিরিশ বছর কখনও শহরের টেস্ট ম্যাচে দিনের প্রথম ডেলিভারির বাংলা ধারাবিবরণী অন্য কারও গলায় শোনা যায়নি।
কিন্তু কেন?
“আসলে সেটা ওঁরা তিন জন মিলেই ঠিক করেছিলেন। আজীবন যার নড়চড় হয়নি। অসাধারণ বোঝাপড়া ছিল ওঁদের,” শ্যামবাজারে বহুকালের পৈতৃক বাড়ির দোতলার অগোছালো ঘরের খাটে বসে বলছিলেন কমলবাবুর ছেলে শ্রীকান্ত ভট্টাচার্য।
তিনজনেই পরবর্তী কালে কিংবদন্তি হয়ে যাওয়া ভাষ্যকার। অথচ আশ্চর্য, প্রথম যখন ধারাভাষ্যের প্রস্তাব এসেছিল প্রায় উড়িয়েই দিয়েছিলেন কমলবাবু।
কী ভাবে এসেছিল প্রস্তাব?
“বাবা তত দিনে কর্মকর্তা হিসেবে সিএবিতে এরিয়ান ক্লাবকে রিপ্রেজেন্ট করে ফেলেছেন। ক্লাবের ক্রিকেট টিমের কোচও হয়েছেন। অজয়কাকু আবার যুগান্তরে খেলার পাতায় নিয়মিত লেখালেখি করছেন। পরে বাবাও যুগান্তরে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে মার্কেটিং বিভাগে। অজয়কাকু তো বহু দিন যুগান্তরের স্পোর্টস এডিটরও ছিলেন,” বলছিলেন শ্রীকান্ত।

তাঁর কথায়, দু’জনেই শত ঘোষ অর্থাৎ যুগান্তরের অন্যতম মালিক প্রফুল্লকান্তি ঘোষের বন্ধুস্থানীয়। কারও এক জনের কাছে আকাশবাণী থেকে প্রস্তাবটা আসে যুগান্তর অফিসে। সম্ভবত দু’জনের মধ্যে যাঁর কাছে প্রস্তাবটা প্রথম এসেছিল, তিনি-ই অপর জনকে খবরটা দেন। তবে পুষ্পেন সরকার বেশ কিছু দিন পর ওই দলে যোগ দিয়েছিলেন।
সে-সময়ের পোড়খাওয়া ক্রীড়া সাংবাদিকদের কাছে গল্পটা অবশ্য একটু অন্যরকম।
সে ১৯৫৯-৬০ সালের কথা। ইডেনে ভারত-অস্ট্রেলিয়ার পঞ্চম টেস্ট। তার আগে আকাশবাণী ঠিক করল এ ম্যাচের ধারাবিবরণী দেওয়া হবে বাংলাতে।
কমলবাবু তখন ময়দানে তো বটেই রেডিয়োর অনেকের কাছেই চেনামুখ। আকাশবাণীর তখনকার প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ মুস্তাফি প্রস্তাব পাড়লেন ওঁর কাছে।
শুনেই কমলবাবু ‘না’ করে দেন। ওঁর যুক্তি, ক্রিকেটে এমন সব শব্দ আছে, যার কোনও বাংলা হয় না। এ দিকে মুস্তাফি নাছোড়। — “কেন হবে না, অবশ্যই হবে।”
এ বার অজয় বসুর সঙ্গে কথা বলেন কমলবাবু। অজয়বাবুও সব শুনে বলেন, “না হওয়ার তো কিছু নেই।”
তাই শুনে কমলবাবু নড়েচড়ে বসলেন। এ দিকে হাতে মাত্র এক সপ্তাহ।
পর দিনই রেডিয়োর সঙ্গে চুক্তি করেন ওঁরা। তারপর দুজনে মিলে সোজা চলে যান এরিয়ান মাঠে। সেখানেই ধারাভাষ্যর মকশো করেন। তখনই ঠিক হয়ে যায়, মাঠ, আশপাশ ইত্যাদি নিয়ে বলবেন অজয় বসু। আর ক্রিকেটের টেকনিক্যাল দিক নিয়ে বলবেন কমল ভট্টাচার্য।
ইতিহাসের মুখবন্ধ এমনই।
প্রথম ম্যাচেই দুর্দান্ত শুরু। জনপ্রিয়তা উঠল তুঙ্গে। আর তাঁদের ধারাভাষ্যের ইনিংস যত গড়াতে থাকল তত দেখা গেল, অবিস্মরণীয় সব বাক্যবন্ধ জুড়তে জুড়তে ওঁরা ক্রিকেটটাকে বাড়ির অন্দরমহলে নিয়ে চলেছেন। দিনকয়েকের মধ্যেই বাংলা জনপ্রিয় গানের কলির পাশাপাশি পাড়ার রকে, গেরস্থের সদরে গুনগুন করে জমে উঠল অজয় বসুর ‘ইডেনের গ্যালারি কানায় কানায় পূর্ণ’, ‘সবুজ মখমলের মতো ঘাস’ কিংবা কমল ভট্টাচার্যর ‘পিছনের পায়ে ভর করে ব্যাক খেলেছেন’, ‘ব্যাটস্ম্যান দৌড়ে রান চুরি করে নিলেন’-এর মতো ভূরি ভূরি সব বাক্য।

“আসলে এ রকম কথাগুলো বাবা বা অজয়কাকু খুব যে ভেবেচিন্তে বলতেন তা কিন্তু নয়। মনে আছে, বাবা এক বার ঘরোয়া আড্ডায় এমনও বলেছিলেন, ‘পিছিয়ে এসে ব্যাক খেলেছে’ বলে আমি নিজেই পরক্ষণে বুঝতে পেরেছিলাম কথাটা একটু হাস্যকর হয়ে গেল। কিন্তু যখন দেখলাম তার পরের কয়েক দিনেও কেউ তা নিয়ে  কোনও  উচ্চবাচ্চ্য করলেন না, উল্টে কেউ কেউ এ’ও বললেন তাঁরা নাকি অন্য রকম মজা পেয়েছেন, তখন ভাবলাম, ব্যাপারটা বেশ খেয়েছে!” এত বছর পর ফাঁস করলেন প্রয়াত কমল ভট্টাচার্যের ষাটোর্ধ্ব ছেলে।
যাঁর ক্রিকেট-ফুটবল, দু’টো খেলারই অনেক বার ধারাবিবরণী দিয়েছেন অজয়-কমল-পুষ্পেন, সেই চুনী গোস্বামী বলছিলেন, “এঁদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব, ক্রিকেট খেলাটাকে বাঙালির রান্নাঘরে ঢুকিয়ে দিতে পারা। কমলদা-অজয়দার বাংলা কমেন্ট্রি শুনে বাঙালি বাড়ির গিন্নিরাও ক্রিকেটটা শিখে ফেলেছিল।”
বাংলা ধারাভাষ্যের ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের তুলনা করতে গিয়ে চুনী এ বার বললেন, “কমলদার ছিল ওঁর মিষ্টি স্বভাবের মতোই মিষ্টি ধারাবিবরণী। মেয়েদের মধ্যে অজয়দার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিল কমলদার কমেন্ট্রি। আমি এ রকম অনেক পরিবারকে চিনি, জানি।”
চুনী গোস্বামীর মনে আছে, ১৯৬৯-৭০-এর রঞ্জি সেমিফাইনালে মহীশূর ম্যাচে বাংলা দলের ম্যানেজার হয়ে গিয়েছিলেন কমল ভট্টাচার্য। দলে ছিলেন চুনী। তখন আরও বেশি করে ওঁর কোমল স্বভাবের ছোঁয়া পেয়েছিলেন উনি।
চুনীর কথায়, তাঁর স্বভাবের সঙ্গে কোথায় যেন মিলে যেত ওঁর বলাটাও। আটপৌরে, ঘরোয়া। সাধারণ বাঙালি বাড়িতে যে ভাবে বাবা-কাকা, মা-জেঠিমা, ভাইবোন নিজেদের মধ্যে কথা বলে, কমল ভট্টাচার্যর কমেন্ট্রি ছিল অনেকটা সেই ধাঁচের। কমলবাবুর জীবন জুড়ে ছিল বৈঠকী-পনা, অনাড়ম্বর মেঠো ভঙ্গি। সেই স্বাদও মিশে যেত তাঁর ধারাভাষ্যে।
এ মত কখনওই অস্বীকার করার নয়। ১৪/এ মোহনলাল স্ট্রিট। কমলবাবুর ডেরা। যে ডেরায় আড্ডা, গানবাজনা, ছুটির দিনের সকালে চুটিয়ে তাস খেলা ছিল নিত্যকার ব্যাপার। এ বাড়ি থেকে অজয় বসুর বাগবাজারের গ্যালিফ স্ট্রিটের বাড়ি ছিল খুব কাছে। দু’জনের প্রায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল একে অন্যের বাড়ি। বরং পুষ্পেন সরকারের বাড়ি ‘খেলাঘর’ বেশ দূরে। বারাসত।
‘কমলদা’র বাড়ির তাসের আড্ডায় মাঝে মাঝেই দেখা যেত পঙ্কজ রায়কে।
ইডেনে টেস্ট খেলতে এলে মুস্তাক আলি, লালা অমরনাথ একবার না একবার ও বাড়ি ঢুঁ মারতেনই। পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়ও যে কত বার আড্ডা দিয়েছেন সেখানে, গুনে শেষ করা যাবে না। আর আসতেন গানের জগতের মানুষেরা!

কমলবাবুর ছিলেন আরও দুই ভাই। সুরকার নির্মল ভট্টাচার্য আর গীতিকার অনিল ভট্টাচার্য। ওঁরা মোহনলাল স্ট্রিটের বাড়িতেই থাকতেন। ওঁদের কাছে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র থেকে প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, ধনঞ্জয়-পান্নালাল, সতীনাথ-উৎপলা, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র— কে না আসতেন! বাড়িতে হামেশাই গানের আসর বসত। এই মজলিশি আবহাওয়াটা কি কমল ভট্টাচার্য বয়ে বেড়াতেন তার সংলাপে? হয়তো তাই।
যে জন্য হয়তো’বা মাঠে হঠাৎ একটা কুকুর ঢুকে গেলেও তাঁর বলার আওতায় চলে আসত, “বিশ্বনাথ ব্যাট উঁচিয়ে সারমেয়টিকে বললে, অনেক তো ছোটাছুটি করলে, এ বার আমায় একটু দৌড়তে দাও।” ঠিক এ ভাবেই তাঁর ধারাভাষ্যে ঢুকে পড়ত মাথার ওপর দিয়ে গোঁ গোঁ করে চলে যাওয়া উড়োজাহাজ, আকাশে লাট খাওয়া কোনও ঘুড়ি কিংবা ঘাসের ওপর লাফিয়ে লাফিয়ে চলা একটা পাখি।
চুনী গোস্বামী বলছিলেন, “তুলনায় অজয় বসু অভিজাত, ভারিক্কি। বেছে বেছে শব্দ বলতেন। যে জন্য অনেক সময় কারও কারও কাছে একটু খটমট লাগত অজয়দার ধারাবিবরণী। তেমনি আবার অনেকের মুখে এ-ও শুনেছি, অজয় বসুর বাংলা ভাষার ওপর যা দখল, যে রকম সাহিত্যপ্রবণ মানসিকতা ছিল, তাতে কমেন্ট্রি লাইনে না গেলে হয়তো সাহিত্যিক হতেন!” 
ঠিক একই রকম কথা বলছিলেন নীলিমেশ রায়চৌধুরী। বাংলা ধারাবিবরণীর তিন মহাতারার সঙ্গেই মাইক ‘শেয়ার’ করার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। বলছিলেন, “আজও মনে পড়ে তিরানব্বইয়ে হিরো কাপ ফাইনালে অজয়দার সঙ্গে ধারাভাষ্য দেওয়া।”
নীলিমেশের মতে, “অজয়দার ভাষার ওপর দখল ছিল যে কোনও বাংলা ভাষাবিদের মতোই। এত বিকল্প শব্দের ভাণ্ডার ছিল ঝুলিতে! জায়গা মতো ঠিক শব্দটা ব্যবহারে জুড়ি ছিল না।”
তার সঙ্গে বিচিত্র সব ঘটনার অনুষঙ্গ জুড়ে অদ্ভুত সব মোচড়। ষাটের দশকের এমনই এক ধারাবিবরণী যেমন অনেক প্রবীণ সাংবাদিকের কানে আজও বাজে।
ইংল্যান্ড টেস্ট খেলছে ইডেনে। এমএল জয়সীমার ব্যাটের দাপটে ছত্রখান ইংরেজ-আক্রমণ। সেঞ্চুরির একেবারে কাছে এসে বিশাল ছক্কা হাঁকালেন জয়। ধারাভাষ্যে অজয় বসু। বললেন, “শুনেছি কাল আগুন লেগেছিল ইডেনে গ্যালারির কোনও এক অংশে। আজও আগুন। তবে এ দিন আর গ্যালারিতে নয়, আগুন লেগেছে জয়সীমার ব্যাটে।” আসলে আগের দিনই খড়ের ছাউনি দেওয়া গ্যালারিতে আগুন ধরেছিল। অজয় বসু তাকেই ধার করে জুড়ে দিলেন তাঁর ভাষ্যে।
এই ‘ত্রয়ী’র দলে পুষ্পেন সরকার ইউনিক ছিলেন তাঁর পরিসংখ্যান দেওয়ার ক্ষমতায়।
সব মিলিয়ে এই ত্রিবেণী সঙ্গমে যা দাঁড়িয়েছিল, তা হল— টেস্টের কোনও বড় টেকনিক্যাল ঘটনার ব্যাখ্যা দেওয়ার দরকার পড়লে কমেন্ট্রি বক্সে অজয় বসুর বাঁধাধরা কথা ছিল, ‘কমলদা, মাইকটা ধরুন’। আবার ম্যাচের বিশেষ আবহের জমকালো বর্ণনা দেওয়ার সময় এলেই কমল ভট্টাচার্য সব সময় বলতেন, ‘অজয়, এ বার তোমার পালা।’ আর কেউ সেঞ্চুরিতে পৌঁছলে বা পাঁচ উইকেট নিলে সেই সময় অবশ্যম্ভাবী মাইকটা চলে যেত পুষ্পেন সরকারের কাছে। সেই সেঞ্চুরিয়ান বা স্টার বোলারের স্ট্যাটিক্সটিক্স ওঁর চেয়ে বেশি ভাল তখন আর কে গড়গড় করে মাইকে বলে চলবেন! 
তিন জনেরই একটা অভ্যাস ছিল। সতীর্থ ধারাভাষ্যকার কোনও ভুল করে ফেললে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে নিজে দায়িত্ব নিয়ে সেটা সামলে দেওয়া। “কমলজ্যেঠু হয়তো অন্যমনস্কতায় এক জন অফস্পিনারকে লেগস্পিনার বলে ফেলেছেন, পাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে নিজের মাইক টেনে নিয়ে আমার বাবা সামলে দিয়েছেন, ‘ও লেগস্পিনটা করলেও খুব খারাপ করত না বোধহয়, কী বলেন কমলবাবু!’ আবার কখনও বাবা হুড়োহুড়িতে স্কোয়ার লেগকে লেগ স্লিপ বলে বসেছেন, কমলজ্যেঠু সঙ্গে সঙ্গে হাতের মাইক ‘অন’ করে বলে উঠেছেন, ‘অজয়, ওটা সত্যিই স্কোয়ার লেগ, না লেগ স্লিপ এখান থেকে বোঝা একটু মুশকিল!’ এতটাই বোঝাপড়া আর ‘ফেলোফিলিং’ ছিল ওঁদের মধ্যে কমেন্ট্রির সময়,” বলছিলেন অজয়-কন্যা।
এ নিয়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে ওঁদের উদার সংবেদনশীল মনের গল্প শোনালেন শ্রীরূপা বসু। বেসরকারি ম্যাচে ভারতের মহিলা ক্রিকেট দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন শ্রীরূপা। আবার ধারাভাষ্যও দিয়েছেন বেশ কয়েক বছর।
শ্রীরূপা বলছিলেন, “আমাকে তো অনেকে ভাবতেন অজয় বসুর মেয়ে! উনি বসু, আমিও বসু। এমনকী ময়দানের অনেকে আমাকে বলতেন, ‘তুমি তো অজয় বসুর মেয়ে!’ সেই মানুষের সঙ্গে আমি একসঙ্গে কমেন্ট্রি করেছি যেমন, তেমনি অজয়দা আমার খেলা ক্রিকেট ম্যাচেরও ধারাবিবরণী দিয়েছেন। কমলদা, পুষ্পেনদার সঙ্গেও ধারাবিবরণী দিয়েছি। এ রকম অনেক বার হয়েছে, পেছন থেকে ওঁদের কেউ না কেউ আমাকে কোন পজিশনে কে ফিল্ড করছেন, প্রম্পট্ করে গিয়েছেন। ওঁরা কোনও নতুন ধারাভাষ্যকারের দিকে এতটাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন।”
কাজের প্রতি অসীম দরদ, প্রগাঢ় শ্রদ্ধা, মমতা না থাকলে কি এতটা সম্ভব? “টেস্ট ম্যাচের দিনগুলো বাবাকে দেখতাম রোজ রাতে শোওয়ার আগে এক গ্লাস উষ্ণ গরম জলে অল্প নুন ফেলে গার্গল করতে। সকালে উঠেও একই রুটিন। অজয়কাকু নাকি সারা দিনের কমেন্ট্রির পর বাড়ি এসে গরম জলে গার্গল করার পর মুখে এক টুকরো যষ্টিমধু অনেকক্ষণ পুরে রাখতেন। পুষ্পেনকাকু কোল্ড ড্রিঙ্কসের ভক্ত ছিলেন। কিন্তু ইডেন টেস্টের সপ্তাহটা কোল্ড ড্রিঙ্কসের ধার মাড়াতেন না”, জানালেন শ্রীকান্ত।
নেশাভাঙ যে তাঁরা করতেন না, তা নয়, অজয়বাবু আর কমলবাবু সিগারেট, মদ দু’টোই খেতেন। পুষ্পেন সরকার মদ না খেলেও ধূমপান করতেন। কিন্তু কোনও দিন কাউকেই কেউ বাড়াবাড়ি করতে দেখেননি।
এক বার লেন হাটন ইংল্যান্ড টিমের সঙ্গে কোনও এক কর্তা হিসেবে ইডেন টেস্টের সময় শহরে এসেছিলেন। অনেক বয়স তখন। শ্রীকান্ত বলছিলেন, “বাবা আর অজয়কাকাকে টেস্টের বিশ্রামের দিন তাঁর হোটেলে আসার জন্য নেমন্তন্ন করেন উনি। বলেছিলেন, ‘খেলার দিন আসতে বলছি না। সারা দিন মাইক হাতে বকবক করে নির্ঘাত ক্লান্ত থাকবে তোমরা।’ তো হাটনের পাশে মদের গ্লাস হাতে বাবার ছবি এখনও আমাদের বাড়িতে আছে।”
মাঠচরা প্রবীণদের কেউ কেউ বলেন, ওঁদের কমেন্ট্রি বক্সে ঢুকতে দেখলে মনে হত, খেলার ধারাবিবরণী দিতে নয়, যেন মন্দিরে উপাসনায় চলেছেন তিন পূজারি! কেমন ছিল তাঁদের সেই ‘মন্দির’?
কমেন্ট্রি বক্সটা ছিল এখনকার ক্লাবহাউসের একেবারে উল্টো দিকে। এখন যেখানে ইডেনের ইলেকট্রনিক জায়ান্ট স্কোরবোর্ড, ষাট-সত্তরের দশকে সেখানে ছিল হাতে চালানো স্কোরবোর্ড। আর ঠিক তার তলায় ছিল কাঠের পাটাতনের ওপর লোহা দিয়ে বানানো কমেন্ট্রি বক্স। কমেন্ট্রি রুম-টুম তখন স্বপ্নের অতীত।
পুরনো রঞ্জি স্ট্যান্ড ছিল যেটা, তার নীচের গেট দিয়ে কমল ভট্টাচার্য, অজয় বসু, পুষ্পেন সরকার ইডেনে ঢুকতেন। “এক বার আমি বাবার সঙ্গে সেখান দিয়ে ঢুকছি। বাবার একটু পিছনে পড়ে গিয়েছিলাম বোধহয়, গেটে পুলিশ আমাকে আটকাল। বাবা পুলিশকে বললেন, ‘এ আমার ছেলে।’ উত্তরে খানিকটা অবাক হয়ে সেই পুলিশকর্মী বাবাকে বলেছিলেন, ‘কমলদা আপনার ক’টা ছেলে? এর মধ্যেই তো আরও দু’টো ছোকরা নিজেদের কমল ভট্টাচার্যের ছেলে পরিচয় দিয়ে মাঠে ঢুকে গিয়েছে!’ ছেলে-বুড়ো সবার কাছে ‘কমলদা’র এতটাই জনপ্রিয়তা ছিল!” গড় গড় করে বলে চললেন শ্রীকান্তবাবু।
খেলা-পাগল বাঙালির কাছে মহাত্রয়ীর জনপ্রিয়তা এতটাই বেশি ছিল যে, ধারাভাষ্য ঘিরে একবার ঐতিহাসিক বিতর্কও থামানো হয় সেই জনপ্রিয়তাকে ভর করেই। বিতর্কের মূলে বাংলার বিখ্যাত প্রবীণ ক্রিকেটার কার্তিক বসু। সে বার রেডিয়োয় তিনি বিশেষজ্ঞের ভূমিকায়।
আটাত্তর সাল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট হার বাঁচাতে শেষ দিন চায়ের পর দাঁতে দাঁত চেপে লড়ছে। ক্রিজ কামড়ে পড়ে আছেন ক্যারিবিয়ান অধিনায়ক আলভিন কালীচরণ। এমন একটা সময় অজয়বাবু মাইক হাতে কার্তিক বসুর কাছে জানতে চাইলেন, ‘‘কী বুঝছেন কার্তিকবাবু, এই অবস্থায় আর কতটা প্রতিরোধ দিতে পারবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ?”
উত্তরে সহভাষ্যকার, আপামর রেডিও শ্রোতা এমনকী আকাশবাণীর প্রোডাকশনের লোকজনদের চোখ প্রায় কপালে তুলে দিয়ে কার্তিক বসু বলে দেন, “শালা কালীচরণটা যতক্ষণ আছে, ততক্ষণ ভারতের আশা নেই।”
ব্যস, আকাশবাণীতে পরের পর অভিযোগের ফোন। এটা কী ভাষা! কেন এ রকম এক জনকে বাঙালির হৃদয়ের কমেন্ট্রি টিমের সঙ্গে বসতে দিয়েছেন? যত বিখ্যাত প্রাক্তন ক্রিকেটারই হন না কেন তিনি!
অজয়-কমল যুগলবন্দিও তখন যেন খানিকটা বেসামাল। “পর দিন অজয়কাকু আর বাবা উত্তেজনার বশে যে যার মাইক নেওয়ার বদলে একসঙ্গে একটাই মাইকে পরের কয়েক মিনিট কমেন্ট্রি করেছিলেন। আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন বোঝাতে যে, কার্তিক বসু কথাটা গুড স্পিরিটে বলেছেন। কোনও খারাপ সেন্সে নয়।”
পড়তি ফর্মের বিষেন সিংহ বেদীকে কটাক্ষ করেও একবার বেশ উৎপটাং কথা বলে ফেলেছিলেন কার্তিক বসু। “বেদীর আঙুলে আর কিছু নেই। ওই আঙুল দিয়ে সন্ধ্যাহ্নিক করা যেতে পারে। বল আর ঘুরবে না।” আবার বিতর্ক। সে বারও ওই একই কায়দায় সামাল দেন ওই অজয়-কমল জুটিই।
 নজিরের পর নজির, একের পর এক সাফল্য এঁদের যে কী উচ্চতায় নিয়ে গেছে! ওঁদের আগমন, উত্থান, বিদায় নেওয়ার মাঝে মাঠ-ময়দানে বহু বহু রেকর্ড ভেঙেছে। গড়েছে। কিন্তু এঁদের তৈরি রেকর্ডগুলো যেন আদি-অনন্তের। এমনই এক প্রসঙ্গ উঠতে কমল-তনয় আরেক অদ্ভুত কীর্তির কথা তুললেন।— বাবা-ছেলে একসঙ্গে টেস্ট ক্রিকেটের ধারাভাষ্য দেওয়ার নজিরও বোধহয় প্রথম বাংলা কমেন্ট্রিতেই (নাকি এটাই একমাত্র নজির! খোঁজ নেওয়া যেতে পারে।)। এ ঘটনার মুখরাটাও ওঁদের মতোই স্মৃতির মধ্যে কম উজ্জ্বল নয়।
কী রকম? কমল-পুত্র শ্রীকান্তের মুখেই শোনা যাক। “আমি যে কলকাতা আকাশবাণীতে বাংলা ধারাবিবরণীর জন্য অডিশন দিয়েছি বাবা জানতেনই না। এক দিন স্টেশন ডিরেক্টর নাকি একটা ক্যাসেট দেখিয়ে বাবাকে বলেছিলেন, শ্রীকান্ত নামের একটা ছেলে, আপনাদের শ্যামবাজারের দিকেই থাকে, ভাবছি একে পরের ম্যাচের বাংলা কমেন্ট্রি টিমে রাখব। বাবা নাকি বলেছিলেন, ‘এই শ্রীকান্ত কি মোহনলাল স্ট্রিটে থাকে?’ উত্তরে ‘হ্যাঁ’ শুনে ফের বাবা নাকি বলেন, বাড়ির নম্বর কি ১৪/এ? তাতেও ‘হ্যাঁ’ শুনে বাবা বলেছিলেন, তা হলে এই শ্রীকান্ত আমার ছেলে। তার পর নাকি স্টেশন ডিরেক্টরের চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল। ‘আপনি এতক্ষণ সেটাই বলেননি?’ বলে নাকি বাবাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন ভদ্রলোক।”
তবে আসল মজাটা এর পরে। “ম্যাচের দু’দিন আগে থেকে বাড়িতে আমি আর বাবা রীতিমতো রিহার্সাল দিয়েছিলাম কী ভাবে কমেন্ট্রিতে আমরা বাবা-ছেলে নিজেদের মধ্যে কথা বলব।”
বাবাকে যে সেদিন ছেলের ডাকনাম ভুলতে হয়েছিল! আর ছেলেকেও তাঁর বাবাকে নাগাড়ে বলে যেতে হয়েছিল ‘কমলবাবু’!
কঠিন পিচে দুরন্ত পেস বোলার সামলানোর মতো এ’ও কি কম কঠিন কাজ!

সূত্র - আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩১ জানুয়ারি, ২০১৫

সংগ্রহ ৪ - লিখছেন আবদুল মান্নান

একজন ত্রিকালদর্শীর ক্রিকেটের গল্প

বেশ ক’দিন দৈনিক পত্রিকাগুলোর প্রধান শিরোনাম হতে বেগম জিয়ার নিরর্থক অবরোধ, হরতাল আর পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ হত্যার সংবাদের পরিবর্তে জায়গা করে নিয়েছে সাহেবদের খেলা ক্রিকেট। শুধু বাংলাদেশে নয় বহির্বিশ্বেও এখন সাহেবদের এই ক্রিকেট সংবাদ শিরোনাম। তাতে অবশ্য সাহেবদের তেমন কোন অবদান নেই। অবদান বাংলাদেশের, যারা বিশ্ব ক্রিকেট আসরে খেলতে অর্ধ দুনিয়া পাড়ি দিয়ে গিয়েছিল সুদূর অস্ট্রেলিয়ায়। টান টান উত্তেজনার মধ্যে ১৯ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে বাংলাদেশ আর ভারত কোয়ার্টার ফাইনাল খেললো। গ্যালারিতে ভারতীয়দের সংখ্যা বাংলাদেশিদের কয়েকগুণ বেশি কারণ এই শহরে তাদের আগমন অনেক আগে  থেকে। তারপরও বাংলাদেশ-ভারত বলে কথা। কয়েক হাজার বাঙালি সেই খেলায় উপস্থিত হয়েছিলেন তাদের টিমকে উত্সাহ যোগাতে।শেষতক সেই খেলাকে বরবাদ করে দিল তিন আম্পায়ার, পাকিস্তানের আলীমদার, ইংল্যান্ডের ইয়ান গোল্ড আর থার্ড আম্পায়ার অস্ট্রেলিয়ার স্টিভ ডেবিস তাদের মারাত্মক একপেশে ও ভুল সিদ্ধান্তে।  এই সব কথা ইতোমধ্যে দেশের মানুষ সবিস্তারে জেনেছেন তার পুনরুল্লেখ করতে চাই না।  কোয়ার্টার ফাইনালে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ভারত ৩০৩ রানে ইনিংস শেষ করে। তার জবাবে ভারত আর মাঠের ভিতরে ও বাইরে তিন আম্পায়ারের বিরুদ্ধে খেলে অনেক কষ্টে বাংলাদেশ  ১৯৩ রান সংগ্রহ করেছিল। আম্পায়ারিং নিয়ে বিশ্বের অনেক বাঘা বাঘা খেলোয়াড় ও গণমাধ্যম, এমন কী লন্ডনের ইকনমিস্ট পত্রিকা পর্যন্ত সমালোচনা করেছে। ব্যতিক্রম শুধু কোলকাতার আনন্দবাজার। পারলে তারা বাংলাদেশের টিমকে ক্লাব টিমের সাথে তুলনা করে। বাংলাদেশের বাঙালিরা সাহেবদের খেলা ক্রিকেট খেলছে তা সম্ভবত তাদের পছন্দ নয়।  বাংলাদেশ দল গত রবিবার অনেকটা বীরের বেশে দেশে ফিরেছে। কয়েক হাজার ক্রিকেট পাগল মানুষ বিমানবন্দরে সমবেত হয়েছিলেন তাদের নতুন বীরদের সংবর্ধনা জানাতে। কোন টিম খালি হাতে দেশে ফিরলে এমন সংবর্ধনায় সিক্ত হওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল। আবেগপ্রবণ বাঙালির পক্ষে এমন ঘটনার জন্ম দেয়া সম্ভব।

আমার জন্ম যে চট্টগ্রাম শহরে তাকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের আঁতুড়ঘর বললে অত্যুক্তি হবে না। তার মধ্যে আমার পাড়াতো আছেই। সে কথায় পরে আসছি। সেই বৃটিশ আমল  থেকে চট্টগ্রামে ইংরেজদের সংখ্যা অন্য যে কোন জেলার চেয়ে বেশি ছিল কারণ এখানে ছিল আসাম বেঙ্গল রেলের সদর দপ্তর আর ছিল বন্দর। এই সব দেখভাল করার দায়িত্বে ছিল ইংরেজরা। এক সময় বেশ কয়েকটি চা বাগানও গড়ে উঠেছিল। শিপিং কোম্পানি ছিল বেশ কয়েকটা। এক সময় বার্মা অয়েল কোম্পানি ঘাঁটি গাড়লো চট্টগ্রামে। সার্সন রোডের পাহাড়ে বানানো হলো আট গর্তের একটি মনোরম  গলফ কোর্স। আর ছিল সেনানিবাস, জেলা আদালত। সব জায়গায় ইংরেজদের রমরমা উপস্থিতি। নেটিভদের মাথার উপর ছড়ি ঘুরানোর পর হাতে অজস্র সময়। সময় কাটাতে শুরু হলো রবিবারের ক্রিকেট। সাহেব বনাম সাহেব। রেলের পোলোগ্রাউন্ড আর দামপাড়ার পুলিশ লাইনে খেলা হতো। পলোগ্রাউন্ডে পোলো খেলাও হতো মাঝে-মাঝে। দূর থেকে দেখতো বাঙালিরা। কাছে যাওয়ার হুকুম নেই। দেশ ভাগ হওয়ার পর আমাদের বাড়ির সামনে গড়ে উঠলো দুই গ্যালারির ষ্টেডিয়াম। নাম হলো জেলা প্রশাসক নেয়াজ মোহাম্মদের নামে। পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর উত্তরাধিকার সূত্রে ভারতীয় আর পাকিস্তানিরা  ইংরেজদের কাছ  থেকে ক্রিকেট নামের খেলাটিও পেলো। কিন্তু কোন পাকিস্তানি টিমে বাঙালিদের জায়গা হয় না। মাছ ভাত খাওয়া বাঙালি কী আর ক্রিকেট খেলতে পারবে? তারাতো খেলবে ডাংগুলি আর হাডুডু। একবার লতিফ নামের ঢাকার এক খেলোয়াড় দ্বাদশ ব্যক্তি হিসেবে পাকিস্তান দলে অন্তর্ভুক্ত হলো। আমাদের সে কী উত্তেজনা। দ্বাদশ ব্যক্তি মানে জল বিরতির সময় মাঠে বালতিতে পানি আর তোয়েলা নিয়ে যাওয়া। মাঝে-মধ্যে ডাক পড়লে ফিল্ডিংও করতে পারে। তাতেই বাঙালি খুশি। লতিফ আসলে ছিল অবাঙালি। শুনেছি বর্তমানে করাচিতে থাকেন। সে’দিন রকিবুল জানালো করাচিতে গেলে তার সাথে কয়েকবার দেখা করার চেষ্টা করেছেন। কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। এখনতো আমাদের পদ্মা পাড়ের এগারজন খেলোয়াড় দুনিয়া কাঁপিয়ে দিতে পারে। ছোট বেলায়  ভারত-পাকিস্তান খেলা মানেই আলাদা উত্তেজনা। পাকিস্তানের সাথে এই দেশে ভারত প্রথম ম্যাচ খেলেছিল ১৯৫৫ সালে এই ঢাকায়। ১৯৬০ সালে পাকিস্তান ভারতে খেলতে গেলে হৈ চৈ পড়ে যায় ভাল বা খারাপ খেলার কারণে নয় আম্পায়ার সন্তোষ গাঙ্গুলি মা কালীর দিব্যি দিয়ে মাঠে নেমেছিলেন ভারতের বিপক্ষে তিনি কোন এলবিডাব্লিউ দিবেন না সে কারণে। খবর আরো আছে। চারিদিকে কানাঘুষা লতা মুঙ্গেশকার নাকি পাকিস্তানের সুদর্শন মিডিয়াম ফাস্ট বোলার ফজল মাহমুদের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন। সবাই বলাবলি শুরু করলো আমাদের খেলোয়াড়দের চরিত্র নষ্ট করার জন্য ভারতীয় ষড়যন্ত্র।

টিভি নামক বাক্সটি তখনো এদেশে আসেনি। ভরসা রেডিও। তাও সকলের বাসায় নেই। পাড়ায় তামিমের দাদা মানে আকরামের বাবা মোহাম্মদ হোসেনের খাজা হোটেল। তখন ওরা আমাদের ভাড়াটে। খাজা হোটেলের একটি ঢাউস রেডিও ছিল। তাতে ধারা বর্ণনা শোনা যেত। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে সময় ধারা বর্ণনা শুনেছি। তখন যারা ধারা বর্ণনা দিতেন তারা সাধারণত সাবেক খেলোয়াড় হতেন না। পাকিস্তানি ওমর কোরেশি, জামশেদ মার্কার, চিশতি মুজাহিদ, আতিকুজ্জামান খান (বাঙালি) মাঠে বসে অসম্ভব ভাল ধারা বর্ণনা দিতেন। এখনতো ঢাকায় বসেও অস্ট্রেলিয়ার খেলার ধারা বর্ণনা দেয়া যায় টিভিতে খেলা দেখে। কোলকাতা রেডিও হতে বাংলায় ধারা বর্ণনা দিয়ে বাঙালির মনে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন অজয় বসু, কমল বসু ও প্রেমাংসু চট্টোপাধ্যায়। এমন কাব্যিক ছন্দে ধারা বর্ণনা এখন আর শোনা যায় না। খেলা নিয়ে লেখা যে একটি অমর সাহিত্য হতে পারে তা প্রমাণ করেছিলেন কোলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার মতি নন্দী আর শঙ্করী প্রসাদ বসু। শঙ্করী প্রসাদের রমণীয় ক্রিকেট বই’এ ১৯৬১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-অস্ট্রেলিয়ার ‘টাই’ টেস্ট ম্যাচের বর্ণনা পড়লে এখনো দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে।

বলা হয় ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেট। ছিল এক সময়। পঞ্চাশ ষাটের দশকে। তখন কোন খেলোয়াড় আউট হলে আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা না করে প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটা দিতেন। সব শেষ এই কাজটি করেছিলেন শচীন টেন্ডুলকার। সেই ভদ্রলোক ক্রিকেটারদের মধ্যে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার বিল লরি, ববি সিম্পসন, নীল হার্ভে, নর্মাল ও’নীল, রীচি বোনো,এডাম গিলক্রিস্ট, ইংল্যাংন্ডের টম গ্রেবনি, টেড ডেকষ্টার, কেন্ ব্যারিংটন, ব্যারি রির্চাডসন, কলিন কাউড্রে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের ভিভ রিচার্ডস, লেসলি হল, গেরি সোবার্স, রোহান কানহাই, লেন্স গিভস, ফ্রানক্ ওরেল, কনরাড হান্ট। ভারতের বাপু নদিকার্নি, পঙ্কজ রয়, দীলিপ সারদেশাই, মনসুর আলী খান পতৌদি, আবেদ আলি, সেলিম দুর্রানি, গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ, সুনীল গাভাস্কার, শচীন টেন্ডুলকার কম যান কিসে ? পাকিস্তানের আবদুল হাফিজ কারদার, ফজল মাহমুদ, হানিফ মোহাম্মদ, মুস্তাক মোহাম্মদ, জাভেদ বার্কি, নসিমুল গনি, ইন্তেখাব আলম, ইমরান খান, ইমতিয়াজ আহমেদের নামতো করতেই হয়। নিউজিল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরে এবং ক্রিকেট খেললেও ক্রিকেটে তাদের সাফল্য কম হলেও তাদের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই ভদ্র। দক্ষিণ আফ্রিকা বর্ণবাদের কারণে দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে ছিল। বাংলাদেশের ওয়ানডে ও টেস্ট ক্রিকেটের যাত্রা যথাক্রমে ১৯৯৭ সালে ও ২০০০ সালে। এ পর্যন্ত বিশ্বের সব দলকে তারা একদিনের ক্রিকেটে হারিয়েছে ও টেস্ট ক্রিকেটেও হারিয়েছে কয়েকটি দলকে।

বাংলাদেশের ক্রিকেটে চট্টগ্রাম ষ্টার ক্লাবের অবদান অনস্বীকার্য। আমার পাড়ার সামনে ষ্টেডিয়াম ও আউটার ষ্টেডিয়াম।সেই দুটি মাঠকে ঘিরে আশি আর নব্বই-এর দশকে গড়ে উঠেছিল সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে ষ্টার সামার ক্রিকেট। উদ্যোক্তা আসগার ব্রাদার্স, মানে রাশেদ আসগার, সাহেদ আসগার, ওয়াহিদ আসগার আর মোর্শেদ আসগার। রাশেদ ছাড়া বাকি সকলে শখের ক্রিকেটার। তবে এক কথায় বলতে গেলে সকলেই  ক্রিকেট পাগল। বাবার মূল ব্যবসা সিনেমা প্রদর্শন হলেও সব ভাইয়ের মন ক্রিকেটে। তাদের চট্টগ্রাম, ঢাকা ও কোলকাতায় গোটা ছয়েক সিনেমা হল ছিল।  গাঁটের পয়সা খরচ করে দীর্ঘদিন ধরে ঘরোয়া ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন এ’দেশে অভূতপূর্ব। ফলাফল জাতি পেয়েছে নান্নু, নোবেল, আকরাম, আফতাব, ফয়সাল ডিকেন্স, নাজিমুদ্দিন, নাফিস, মমিনুল, তামিমের মতো ক্রিকেটারদের। তামিমের বাবা ইকবাল আমার কয়েক বছরের ছোট। অসম্ভব ভাল ছেলে এবং ভাল খেলোয়াড়। আমাদের সাথে পাড়ার ফুটবল আর ক্রিকেট দু’টাই খেলতো। অকালে মৃত্যু হয়েছিল। নান্নু নোবেলদের বাবা শামসুল আবেদিন পাকিস্তানের হাবিব ব্যাংকে চাকরি করতেন। ভাল ক্লাব ক্রিকেট খেলতেন। একাত্তরে শহীদ হন। রাশেদ আসগার কিছুদিন আগে মারা গেছেন। ষ্টার ক্রিকেটই শুধু নয় চট্টগ্রামে এখন আর কোন  সিরিয়াস ক্রিকেট বা ফুটবল কোনটাই হয় না। আউটার ষ্টেডিয়াম এখন মেলাওয়ালাদের দখলে। চট্টগ্রাম হতে বেশ ক’জন খেলোয়াড় জাতীয় পর্যায়ে উঠে এসেছে। সকলে নিজ চেষ্টায়। তবে ষ্টার ক্রিকেটের জন্য তার কর্ণধারদের অবশ্যই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন।

ভদ্রলোকের খেলা এখন আর ভদ্রলোকের হাতে নেই। এখন ম্যাচ ফিক্সিং হয়। আম্পায়ারকেও কেনা যায়। গ্রাউন্ডস কিউরেটরও বাদ যান না। খোদ আইসিসিকে বশ করা যায় কারণ এখন এখানে কর্পোরেট পুঁজি ঢুকেছে যার সিংহ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে ভারত। কোন খেলায় ভারত না খেললে আয়োজকদের ক্ষতি কয়েক মিলিয়ন ডলার। সেখানে বাংলাদেশ কী ভাবে জিতবে বলে আশা করি ? অবস্থা এমন চলতে থাকলে মনে হয় অদূর ভবিষ্যতে ভারতকে ভারতের সাথেই খেলতে হবে। পদ্মা পাড়ের মাশরাফিদের প্রাণঢালা অভিনন্দন। তোমাদের অর্জনে বাংলাদেশের ষোলকোটি মানুষ গর্বিত।

 লেখক: সাবেক উপাচার্যচট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। গবেষক ও বিশ্লেষক।

সূত্র - দৈনিক ইত্তেফাক ২৫ মার্চ, ২০১৫ ইং

সংগ্রহ ৩ - লিখছেন আনিসুল হক

স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। স্বামী আছেন আরেক শহরে। তিনি হাসপাতালে ফোন করলেন। ‘আমি ৭ নম্বর কেবিনের পেসেন্টের হাজব্যান্ড। কী অবস্থা বলেন তো এখন?’
যিনি ফোন ধরেছেন তিনি তখন বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা দেখছেন টেলিভিশনে। শুধু তিনি একা দেখছেন তা-ই নয়, হাসপাতালের আরও অনেক দর্শনার্থী, কর্মচারীও ভিড় করে টেলিভিশন দেখছেন। তাই তিনি অবস্থার বর্ণনা দিলেন, ‘খুব ভালো অবস্থা। আমরা দুজনকে আউট করেছি। এরই মধ্যে একজন ডাক। লাঞ্চের আগেই আরেকজনকে আউট করা যাবে, চিন্তা করবেন না।’
স্বামী বেচারা ডাকের মানে যদি হাঁস বুঝে থাকেন, তাহলে তাঁর জ্ঞান হারানো ছাড়া আর কী-ই বা করার থাকবে?
এবার শুনুন একটা সত্যিকারের হাসপাতালের গল্প। বাংলাদেশ-ভারত খেলা হচ্ছে। ঢাকার একটা বড় বেসরকারি হাসপাতালের লবিতে বড় একটা টেলিভিশন স্থাপন করা হয়েছে। রাত বাড়ছে। এই লবিতে বসে যাঁরা খেলা দেখছেন তাঁরা সবাই গুরুতর রোগীদের আত্মীয়স্বজন। কারও বাবাকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে, কারও ছেলের অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশন হয়েছে, কারও বা স্বামীর ক্যানসার। এঁদের সবারই মন খারাপ করার জন্য বাস্তব পরিস্থিতি আর কারণ রয়েছে। কিন্তু সেই বাস্তবতা ভুলে তাঁরা হাততালি দিয়ে উঠছেন। একটু আগেও তাঁদের মন বড়ো খারাপ ছিল। ভারত ৩৭০ করেছে। রানটা ডিঙোনো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ব্যাট করতে নেমে ইমরুল কায়েস দারুণ পেটাচ্ছেন। রানের গড় খুব ভালো। একটা করে চার হচ্ছে আর তাঁরা সোল্লাসে চিৎকার করে উঠছেন। একটু পরে ইমরুল কায়েস আউট হয়ে গেলেন। খেলার গতি থিতিয়ে এল। সাকিব আল হাসান আউট হওয়ার পরে বোঝা গেল, আর আশা নেই। এই দর্শকদের মধ্যে নেমে এল চরম হতাশা। ‘আমরা আপনার বাবার ভেন্টিলেটর খুলে নিতে যাচ্ছি,’ ডাক্তার বললেন এক দর্শনার্থী তরুণকে। বাবার যে বাঁচার আশা আর নেই, ছেলে সেটা আগে থেকেই জানে। নেই, তবুও তো এখনো আছেন। একটু পরে বাবা থাকবেন না। এরপরে বলতে হবে, ছিলেন। বাবা অতীতকাল হয়ে যাবেন। ‘ভেন্টিলেটর খুলে নিতে যাচ্ছি’—এ কথা শোনার পরও তরুণটির আফসোস তার বাবার জন্য নয়, বাংলাদেশের আরেকটা খেলোয়াড়ের আউট হওয়া নিয়ে। ইস, নাইম যদি থাকত! ও তো ছক্কা মারতে জানে। ওর নামই না ছক্কা-নাইম!
সত্যিকারের এই গল্প শুনে আমার নিজের চোখটাও ছলছল করে ওঠে। এটা কি ক্রিকেটের জন্য আমাদের ভালোবাসা, নাকি দেশের জন্য?
কেমন অদ্ভুত না ব্যাপারটা! ক্রিকেট তো একটা খেলাই। খেলায় জয়-পরাজয় থাকবে। সেটা বড় নয়, আসল লক্ষ্য হলো আনন্দ। কিন্তু সেই খেলা আমাদের কীভাবে এ রকম ঘোরতর নিমজ্জনের মধ্যে নিয়ে যায়! আপন-পর ভুলিয়ে দেয়। প্রিয়জনের মৃত্যুর ব্যথা ভুলিয়ে দেয় প্রিয় দলের সাফল্য বা ব্যর্থতা। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল না হয় নিজের দেশের দল, আমাদের বহু ব্যর্থতার দেশে একটুখানি সাফল্যের আশ্বাস, জীবনের নানা মাঠে মার খেতে খেতে একটুখানি বিজয়ের সম্ভাবনা, কিন্তু বিশ্বকাপ ফুটবলে যে আমরা মেতে উঠি ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনাকে নিয়ে, প্রিয় দল হেরে গেলে এই দেশে অন্তত চার-পাঁচজন মারা যান হূদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে, তার কী মানে?
মনটা একটু আর্দ্র হয়ে উঠল কি? আচ্ছা আচ্ছা, এবার তাহলে একটা কৌতুক। ২০০৭ সাল। বাংলাদেশের সঙ্গে হেরে গেছে শিরোপা-প্রত্যাশী ভারত। তারপর শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে বিশ্বকাপ থেকেই। ধোনি আর বাইরে বেরোতে পারছেন না। তিনি একটা পারলারে গিয়ে মাথায় লম্বা চুল লাগালেন। কপালে টিপ, ঠোঁটে রঞ্জিনী বুলিয়ে, ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে মেয়ে সেজে তিনি উঠেছেন ট্রেনে। এ সময় তাঁর পাশে আরেকজন তরুণী এসে বসল। সে তাঁকে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি ধোনি?’ ধোনি আঁতকে উঠলেন, ‘কী করে টের পেলেন?’
‘আরে, টের পাব না? আমি তো শেবাগ।’
ক্রিকেট নিয়ে বিখ্যাত সাহিত্যিকেরা কী কী লিখেছেন? এ কথা বললে আমার বন্ধু ক্রীড়ালেখক উৎপল শুভ্র নিশ্চয়ই আমাকে মারতে আসবেন। বলবেন, ক্রিকেট নিজেই সাহিত্য, সাহিত্যিকদের লেখার অপেক্ষায় ক্রিকেট বসে নেই! কথা সত্য, ক্রিকেট নিয়ে লেখা হয়েছে লাখ লাখ পাতা, সেসব ক্রিকেট-সাহিত্য বলেই গণ্য। কাজেই ক্রিকেট-লেখকেরা নিজেরাই সাহিত্যিক। কথাটা যে সত্য, তা তো শুভ্রর নিজের লেখা পড়লেই বোঝা যায়। রবীন্দ্রনাথ ক্রিকেট নিয়ে কি কিছু লিখেছিলেন? শুভ্র বলেছেন, বল নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কিছু উক্তি পাওয়া যায়, যেমন, ‘বল দাও মোরে বল দাও।’ কিন্তু সেটা ফুটবল না ক্রিকেট নিয়ে সে বিষয়ে পণ্ডিতেরা এখনো স্থিরমত হতে পারেননি। কিন্তু বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কি কিছু কল্পনা করা যায়? ২০১১ সালের বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত দিয়ে। আমরা প্রাণভরে গেয়েছি, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ ফলে এখানেও রবীন্দ্রনাথ। তবে বাংলা ক্রিকেট-সাহিত্য কিংবা ক্রিকেট-সাংবাদিকতায় রবীন্দ্রনাথের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে একটা কাহিনি অন্তত পাওয়া যাচ্ছে ইন্টারনেটে। বরিয়া মজুমদার নামে একজন লিখেছেন আনন্দবাজার পত্রিকায় ক্রিকেট-সাংবাদিকতা শুরুর দিনগুলোর কথা। বাংলা ক্রিকেট-সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ব্রজরঞ্জন রায় আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকদের রাজি করালেন ক্রিকেটের জন্য স্থান বরাদ্দ করতে। ব্রজরঞ্জন লিখবেন বিনিপয়সায়, বলাইবাহুল্য। পত্রিকার উদ্যোক্তারা রাজি হলেন। কিন্তু ব্রজরঞ্জন পড়লেন মুশকিলে। এই ক্রিকেটীয় পরিভাষাগুলোর তর্জমা কী হবে? উপায়ান্তর না দেখে তিনি দেখা করতে গেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ নাকি তাঁকে প্রচণ্ড উৎসাহ দিয়েছিলেন, অভয় দিয়েছিলেন। ‘তুমি বাংলা করতে আরম্ভ করে দাও, পরিভাষা আবিষ্কার করতে থাকো, আজকে তুমি যা লিখতে শুরু করবে, একদিন তা-ই প্রমিত বলে চালু হয়ে যাবে।’ রবীন্দ্রনাথ এই কনসালটেন্সির জন্য কোনো পয়সা নেননি, বরিয়া মজুমদার আমাদের জানাচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথের এই আশ্বাসের পরও যে কেন ব্রজরঞ্জন আমাদের এলবিডব্লিউর একটা বাংলা প্রতিশব্দ উপহার দিলেন না! হয়তো সেটা হতে পারত ‘উপূপা’ (উইকেটের পূর্বেই পা)। কট বিহাইন্ডের বাংলা হতে পারত ‘পাছে ধরা’ বা ‘পিছে ধরা’। স্লিপের বাংলা কি হতে পারত পিচ্ছিল বা পিছলা? কিন্তু তা হয়নি, অগত্যা আমাদের ইংরেজি দিয়েই চালাতে হচ্ছে।
বাংলা ভাষার হাল জমানার লেখক-কবিরা ক্রিকেট নিয়ে প্রচুর লিখছেন। সম্ভবত লিখতে বাধ্য হচ্ছেন। শামসুর রাহমান ক্রিকেটানুরাগী ছিলেন, নির্মলেন্দু গুণ তো এখন প্রায় পেশাদার ক্রিকেট (ও ফুটবল) লেখক। ওই বাংলায় শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় প্রমুখের ক্রিকেট-লেখার খ্যাতি আছে।
অন্তত একজন নোবেল বিজয়ী লেখকের ক্রিকেটপ্রীতি বহুল প্রচারিত। তিনি হ্যারল্ড পিন্টার (১৯৩০-২০০৮)। নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা, কবি। ব্রিটিশ নাটকের সবচেয়ে অগ্রগণ্য প্রতিনিধি হিসেবে ২০০৫ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলেছেন, গেইটি ক্রিকেট ক্লাবের সভাপতি ছিলেন, ছিলেন ইয়র্কশায়ার ক্রিকেট ক্লাবের আজীবন সমর্থক। তিনি বলেছিলেন, ‘ক্রিকেট আমার জীবনের প্রধান অবসেশনগুলোর একটা। আমি সারাক্ষণই ক্রিকেট খেলি, দেখি, পড়ি।’ ক্রিকেট নিয়ে তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান উক্তিটা হলো, ‘আমি এ রকম ভাবতে চাই যে ঈশ্বর এই পৃথিবীতে যা কিছু সৃজন করেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে মহান সৃষ্টি হলো ক্রিকেট। এটা সেক্সের চেয়ে মহত্তর, যদিও সেক্স জিনিসটাও কম ভালো নয়।’ কথাটা ভাবার মতো। একই কথা আমিও বলতে পারতাম, কিন্তু সেটা ক্রিকেট নিয়ে নয়, ফুটবল নিয়ে। ফুটবলের সঙ্গে ওই ব্যাপারটার বেশি মিল, কিন্তু ক্রিকেটের সঙ্গে যদি তাকে তুলনা করতে হয়, তাহলে বলতে হয়, তাতে কেবল শরীরী আশ্লেষ জড়িত নয়, আছে হৃদয়পুরের জটিলতাও, ফুটবল হয়তো নিছকই কামনার ব্যাপার, ক্রিকেট হয়তো প্রেমপূর্ণ কামনা। নাটকের লোক পিন্টার বলেছেন, ‘ক্রিকেট আর নাটকের মধ্যে অনেক মিল। যখন কেউ স্লিপে একটা ক্যাচ মিস করে, যখন আম্পায়ার একটা এলবিডব্লিউর আবেদন নাকচ করে দেন, তখন যে উত্তেজনাটা তৈরি হয় সেটা ঠিক যেন মঞ্চনাটকেরই উত্তেজনা।’ পিন্টারের কাছে দুই প্লেই এক, খেলা অর্থে প্লে আর নাটক অর্থে প্লে। তাই তো, ব্যাপারটা তো আগে খেয়াল করিনি। আমিও তো তাহলে খেলোয়াড়, কারণ আমিও তো প্লে লিখেছি। সেটা ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলিনি। টেনিস বল দিয়ে ছয় চারা বা আমরা বলতাম কিংকং, সেটা খেলেছি প্রচুর। আর খেলতাম ফুটবল। এর কারণটা অর্থনৈতিক। ৩৫ টাকা দিয়ে একটা ৩ নম্বর ফুটবলই আমাদের পাড়ার ছেলেদের পক্ষে কেনা বড় কঠিন ছিল। ফুটবল তো জাম্বুরা দিয়েও খেলা যায়, কচুরিপানার শুকনো বৃন্ত দিয়ে পোঁটলা বানালেও খুব ভালো ফুটবল হতো আমাদের সময়। কিন্তু ক্রিকেট খেলতে আয়োজনটা করতে হতো বেশি। কাঠের তক্তা কাটো, উইকেট বানাও, পিচ বানাও। না, আমরা ক্রিকেট খেলিনি তেমন। তখন জানতাম, রাজার খেলা ক্রিকেট, খেলার রাজা ফুটবল। আমাদের ছোটবেলার খেলার মাঠের সঙ্গীসাথিদের কেউই তো রাজার ছেলে ছিল না। সেই ক্রিকেট কি এখন প্রজার খেলা হয়ে উঠেছে? বাংলাদেশে ক্রিকেট বিশ্বকাপ নিয়ে পথে পথে মানুষের হুল্লোড় দেখে ক্রিকইনফো লিখেছে, এটা হলো পিপলস ওয়ার্ল্ড কাপ। মানুষের বিশ্বকাপ। লিখেছে, বাংলাদেশ বিশ্বকাপকে তার আত্মা ফিরিয়ে দিয়েছে। শুনতে ভালোই লাগছে। ক্রিকেট এই উপমহাদেশে এনেছিল ব্রিটিশ প্রভুরা, প্রথমে তারা এটা খেলত একঘেঁয়েমি কাটাতে, তারপর— উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিকরা যেমন বলছেন—তারা খেলত, ন্যাটিভদের আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করার সুবিধার জন্যে, তারপর তারা স্থানীয়দেরকেও খেলাটা শেখাতে লাগল, তখন উদ্দেশ্যটা ছিল ‘বাদামি সাহেব’ তৈরি করা। এখন উত্তর-ঔপনিবেশিক কালে, সাহেবদের ‘জেন্টলমেন’স গেম্স’-কে বস্তিতে নামিয়ে এনেছে প্রাক্তন অনেক কলোনি, আর বনেদি ক্রিকেটের বিশ্বকাপকে বাংলাদেশ করে তুলেছে সকলের বিশ্বকাপ, গণমানুষের সার্বজনীন উৎসব। বাংলাদেশের মাধ্যমেই শুরু হোক গণতন্ত্রের পথে ক্রিকেটের যাত্রা, রাজার খেলা হয়ে উঠুক সবার খেলা, সাধারণের, নিম্নবর্গেরও।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১১

Monday, 19 June 2017

সংগ্রহ ২ - লিখছেন অমি রহমান পিয়াল

পাকিস্তান সমর্থন, ক্রিকেট, রাজনীতি ও ১৯৭১

"ঢাকা স্টেডিয়ামে যতবার ভারত ও পাকিস্তান দলের খেলা হয়েছে প্রতিবারই বাংলাদেশী দর্শকের শতকরা প্রায় ৯৯ জনই পাকিস্তান দলের প্রতিই আবেগপূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যানার প্রদর্শন করলেও তা দর্শকদের মনে সামান্য প্রভাবও বিস্তার করতে পারেনি। দর্শকরা ঐ ব্যানার দেখে মন্তব্য করেছে ‘রাখ মিয়া মুক্তিযুদ্ধের কথা, এখানে মুসলমানদের বিজয় চাই’… ‘ধর্মনিরপেক্ষবাদী ও ভারতপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীদের মন্তব্যের কথা শুনেছি। তারা নাকি বলেন, আমরা বছরের পর বছর চেষ্টা করে যুবসমাজের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সঞ্চারের জন্য যে আপ্রাণ চেষ্টা করি তা স্টেডিয়ামে পাক-ভারত খেলায়ই নস্যাত হয়ে যায়।"
– শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী ও ঘাতক দল জামায়াতে ইসলামীর প্রাক্তন আমির গোলাম আযম (আত্মজীবনী জীবনে যা দেখলাম ৩য় খন্ড, পৃ: ১২৬-১২৭)
এক.
ক্রিকেটের সঙ্গে রাজনীতির কোনো যোগ নেই এই মিথ্যাচার যারা করেন তারা হয় অজ্ঞতার কারণে করেন কিংবা জ্ঞানপাপে। ক্রিকেটের ইতিহাস পড়লে তাদের জানা থাকার কথা বর্ণবাদী নীতির (শুধু শ্বেতাঙ্গরাই খেলবে, শুধু শ্বেতাঙ্গদের বিপেক্ষেই খেলবে) কারণে ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেট খেলতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়ানডেও।নিষেধাজ্ঞা ওঠার আগ পর্যন্ত তাদের প্রথম অধিনায়ক কেপলার ওয়েসেলস অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট ক্রিকেট খেলেছেন। রবিন স্মিথ-অ্যালান ল্যাম্ব যেমন ইংল্যান্ডে। শুধু ক্রিকেট নয়, একই কারণে তারা ‘৯২র আগপর্যন্ত তিন যুগ নিষিদ্ধ ছিলো অলিম্পিকে। ফুটবলেও।একটি দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিকভাবে বর্জন করার এই নীতি তাহলে কোন নীতি? পাকিস্তান ভারতে দীর্ঘদিন ক্রিকেট খেলেনি এবং ইদানিং খেলছে না কোন নীতিতে? স্পন্সর কম পাবে বলে বাংলাদেশকে খেলতে না ডাকা ভারতের ব্যবসায়িক নীতিতে নিশ্চয়ই নয়, সিদ্ধান্তটা রাজনৈতিক। ক্রিকেট রাজনীতি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনাবলীর সঙ্গেও তেমনি জড়িয়ে রয়েছে ক্রিকেট।
২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সালে ঢাকায় শুরু হয়েছিলো পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড একাদশ ও আন্তর্জাতিক একাদশের মধ্যে চারদিনের একটি ম্যাচ। রেকর্ড বইয়ে এই ধরণের ম্যাচগুলো প্রথম শ্রেনীর ম্যাচ হিসেবে নথিবদ্ধ হয়। আন্তর্জাতিক সেই ম্যাচে ওপেনার হিসেবে সুযোগ পেয়েছিলেন পাকিস্তানের হয়ে খেলা একমাত্র বাঙালী ক্রিকেটার রকিবুল হাসান। টেস্ট ক্রিকেট তাকে হাতছানি দিচ্ছিলো অনেকদিন ধরেই এবং সব ঠিকঠাক থাকলে জাতীয় দলের প্রথম একাদশে সুযোপ পাওয়াটা ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। হয়তো আসন্ন ইংল্যান্ড সফরেই জুটে যেত সেটা। দু বছর আগে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টেও টুয়েলভথ ম্যান হিসেবে দলে ছিলেন তিনি। (আমি নিশ্চিত না টুয়েলভথ ম্যানের টেস্ট ক্যাপ তখন জুটতো কিনা)।
প্রথম ইনিংসে মাত্র এক রান করে এলবিডব্লু হয়ে সাজঘরে ফেরা রকিবুলের কৃতিত্ব হয়তো পারফরম্যান্সে অনুদিত হয়নি সে ম্যাচে। পরের ইনিংসেও করেছেন এক রান, অবশ্য পাকিস্তানী লিজেন্ড মোশতাক মোহাম্মদ প্রথম ইনিংসে করেছিলেন শূন্য রান। কিন্তু নিজেকে আলাদাভাবে চিনিয়েছিলেন রকিবুল অন্যভাবে। গানস অ্যান্ড মুর ব্যাটে জয় বাংলা লেখা ও স্বাধীন বাংলার মানচিত্র আঁকা স্টিকার নিয়ে খেলতে নেমেছিলেন আঠারোর ওই দীপ্ত তরুণ। বন্ধু শেখ কামালের (বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে)মাধ্যমে গাড়ীর স্টিকার জোগাড় করে সেটাই লাগিয়েছিলেন ব্যাটে। এর মূল্যও দিতে হয়েছে তাকে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হুলিয়া মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। অস্ত্র হাতে নেননি, বদলে সংগঠিত করেছেন ক্রিকেটারদের। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের মতো মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অনুদান ও মুক্তিযুদ্ধের জন্য স্বীকৃতির পাশাপাশি দেশের ক্রিকেটকে তুলে ধরতে গঠন করেছিলেন স্বাধীন বাংলা ক্রিকেট দল। কিন্তু ক্রিকেট মৌসুম আসার আগেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়, প্রদর্শনী ম্যাচে নামা হয়নি আর। রকিবুল চাইলেই ‘জয় বাংলা’র বদলে তলোয়ার মার্কা স্টিকার নিয়েই খেলতে পারতেন। চরম আনুগত্য দেখিয়ে সুযোগ পেতে পারতেন পাকিস্তান টেস্ট দলে। কিন্তু স্বাধীন দেশের জন্য, স্বাধীন মানচিত্রের জন্য তিনি আজন্ম লালিত সাধকে কোরবানি দিতে দু’বার ভাবেননি। তার এই আত্মত্যাগকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কিভাবে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ ধ্বনি তোলো প্রিয় প্রজন্ম!
রকিবুলের খেলা সেই ম্যাচ চতুর্থ দিনে গড়ালো যেদিন, ক্যালেন্ডারে ১ মার্চ। সেদিন দুপুরে রেডিওতে ভেসে এলো ইয়াহিয়ার ঘোষণা : ৩ মার্চ অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। মুহূর্তে গোটা স্টেডিয়াম প্রকম্পিত হলো জয় বাংলা শ্লোগানে। হাতে থাকা পত্রিকা দিয়ে আগুন জ্বালানো হলো গ্যালারিতে। পুড়লো পাকিস্তানের পতাকা। ম্যাচ পরিত্যক্ত। মাঠে থাকা সামরিক-আধাসামরিক বাহিনীর বন্দুকগুলো তাক হলো বিদ্রোহের শ্লোগান ধরা বাঙালীদের দিকে। ঠেকানো গেলো না। অগ্নিঝরা মার্চের প্রথম প্রতিবাদ এবং অনিবার্য যুদ্ধের চূড়ান্ত গতি নির্ধারণ করে দেওয়া আন্দোলনের প্রথম স্রোতটা জন্ম নিলো ওই ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে। একটা ক্রিকেট ম্যাচ থেকে। চাইলেই তো ইতিহাসকে মুছে ফেলা যাবে না।
দুই.
শহীদ আবদুল হালিম চৌধুরী বীর বিক্রম তার বন্ধু রকিবুল হাসানের মতো ভাগ্যবান নন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রিকেটে খেলার সৌভাগ্য তার হয়নি। তবে জাতীয় পর্যায়ে নজর কাড়ছিলেন। ডাক নাম জুয়েল। মোহামেডান স্পোর্টিং ও আজাদ বয়েজ ক্লাবের হয়ে ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলেছেন। উইকেটকিপার এবং মারকুটে ব্যাটসম্যান হিসেবে তুমুল খ্যাতিমান। স্লগ সুইপ স্পেশালিস্ট। প্রাদেশিক ক্রিকেটে নাম করেছেন। কায়েদে আযম ট্রফিতে রকিবুল-জুয়েল রুমমেট বরাবর। দুজনেই পূর্ব পাকিস্তান দলের ওপেনার।মার্চের আগুন জুয়েলকেও দ্রোহী করেছিলো। ঘর ছাড়তে পারছিলেন না মায়ের তীব্র স্নেহের নিগড়ে। সেটা ছিড়লেন ৩১ মে।সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যাওয়ার ক’দিন আগে মাকে নিজের বাধাই করা একটা ছবি দিয়ে বলেছিলেন. ‘আমি যখন থাকবো না, এই ছবিতেই আমাকে পাবে’।
মেলাঘরে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন দুই নম্বর সেক্টরে ট্রেনিং নেন জুয়েল। ফেরেন ঢাকা কাঁপিয়ে ফেলা গেরিলা দল ‘ক্র্যাক প্লাটুন’-এর একজন হিসেবে। সহযোদ্ধা হাবিবুল আলম বীরপ্রতীকের স্মৃতিচারণে জুয়েল চিত্রিত হয়েছেন প্রচণ্ড বুদ্ধিদীপ্ত, সাহসী এবং ঠান্ডা মাথার একজন যোদ্ধা হিসেবে যিনি ক্রিকেট ব্যাটের মতোই সাবলীলভাবেই অস্ত্র চালাতে পারতেন। ঢাকায় বেশ ক’টি অপারেশনে অংশ নিয়েছেন জুয়েল। সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে বোমা হামলা চালাতে গিয়ে আহত হন তিনি, বাঁহাতের তিনটি আঙুল জখম হয় তার। সহযোদ্ধা কাজী কামালুদ্দিন তাকে নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের ছাত্র আবু এস সালাম কুটুর বাসায়। সেখান থেকে কুটু তাকে নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেলে, নিউরোসার্জারির অধ্যাপক রশীদ উদ্দিন আহমেদ জুয়েলের হাতের চিকিৎসা করেন এবং ব্যান্ডেজ বেধে দেন। পরে ডাঃ আজিজুর রহমানও জুয়েলের আঙুলের চিকিৎসা দেন।
২৯ আগস্ট আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে ধরা পড়েন জুয়েল। বড় মগবাজারে আজাদের (আনিসুল হকের মা উপন্যাসখ্যাত) বাসায় সেরাতে ছিলেন তিনি। পাকিস্তান সেনাবাহিনী সেখানে হানা দিয়ে জুয়েল, আজাদ, কাজী কামাল ও আজাদের দুই ছোটভাইকে ঘুম ভাঙিয়ে ডেকে তুলে এবং উঠানে লাইন করে দাড়া করায়। জুয়েলের ব্যান্ডেজ বাধা হাত দেখে সেই ভাঙা আঙুলে চাপ দিয়ে ধরা হয় তার কাছ থেকে কথা বের করতে। জান্তব চিৎকারে ভেঙে পড়েন জুয়েল, কাজী কামাল ওই সময়টায় পালিয়ে যান। বাকিদের হাতকড়া পড়িয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। আজাদের ভাইদের পরে অবশ্য ছেড়ে দেওয়া হয় বয়স খুব কম বলে। সেরাতে পাকিস্তানীদের হাতে আরও ধরা পড়েছিলেন রুমি, বদি, আলতাফ মাহমুদসহ অনেকে। হাবিবুল আলম জানিয়েছেন অক্টোবরের শেষার্ধে কিংবা নভেম্বরের শুরুতে এদের সবাইকে হত্যা করা হয় বলে জানতে পারেন মুক্তিযোদ্ধারা।
যে মানুষটা জুয়েলের হাতের ক্রিকেট ব্যাটকে স্টেনগান বানিয়ে দিয়েছিলেন তিনি মুশতাক আহমেদ। শহীদ মুশতাক আহমেদ। ক্রীড়া সংগঠক মুশতাক ছিলেন আজাদ বয়েজ ক্লাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। দিনরাত তাকে পাওয়া যেত ক্লাবেই। ২৫ মার্চ গণহত্যার রাতে নির্মমতার শিকার হন মুশতাকও। ২৭ মার্চ বন্ধু সৈয়দ আশরাফুল হককে (ক্রিকেট কর্মকর্তা) নিয়ে মুশতাকের উপুড় হয়ে পড়ে থাকা লাশ দেখে আসেন জুয়েল। প্রিয় মুশতাকভাইর শরীর ভেদ করা বুলেটগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার শপথটা নেন তখনই। প্রতি বছর বিজয় দিবসে শহীদ জুয়েল-মুশতাক প্রীতি ক্রিকেট হয়। দুজনের নামে দুটো স্ট্যান্ড রয়েছে মীরপুর শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। সেই স্ট্যান্ডের নীচে পাকিস্তানী পতাকা যখন দোলে, তাদের আত্মা কষ্ট পায়। ভাঙা তিন আঙুল মোচড়ের চেয়ে তীব্র আর্তচিৎকার দেয় জুয়েলের আত্মা। কষ্ট পান এস এ মান্নান ওরফে লাডু ভাইর আত্মা। স্টেডিয়ামের প্রিয় মুখ, খেলোয়াড় এবং ক্রীড়া সাংবাদিক। ডেইলি অবজারভার পত্রিকার স্পোর্টস এডিটর ছিলেন তিনি। তার লাশ রায়েরবাজারে পড়েছিলো শহীদ বুদ্ধিজীবিদের সঙ্গে। জামায়াতে ইসলামীর ঘাতক আল-বদরদের নৃশংস নির্মম হত্যা তালিকায় ছিলো ক্রীড়াঙ্গনও। তাদের লাশের উপরও দাড়িয়ে বাংলাদেশ।
তিন.
১৯৮০ সালের কথা, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় পাকিস্তানের নাগরিকরা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে, তাদের একজন গোলাম আযম। সেবছরই ঢাকায় প্রথমবারের মতো খেলতে এসেছে পাকিস্তান। স্বনামে নয় অবশ্য, দলের নাম ওমর কোরেশী একাদশ, খেলোয়াড়দের সবাই টেস্ট প্লেয়ার। জাতীয় দলে আছেন প্রায় সবাই। অধিনায়ক ইমরান খান। পিআইএর বিমানটা থামতেই টারমাকে ভিড় করে থাকা তরুণীদের মাঝে চাঞ্চল্য আর উল্লাস, শেষ বারের মতো ছোট আয়নায় মুখ দেখছে অনেকে। দরজা খুলতে দেখা দিলেন স্বপ্নের পুরুষ। হাসিটা কি একটু শ্লেষাত্মক! সিড়ি বেয়ে নামতে নামতে তরুণীদের উদ্দেশ্যে দুহাত জোড় করে ইমরান উচ্চারণ করেছিলেন ‘নমস্তে’। শরীর ভেজা শিহরণে সেই সম্বোধন উপেক্ষা করেছিলো তরুণীরা, কিন্তু পিক করেছিলো প্রেস। ইমরান ও পাকিস্তানকে গালি শুনতে হয়েছিলো কিছু তেজী বাঙালী যুবকের। বাংলাদেশের মাটিতে ইমরান খানের ওই একমাত্র খেলা। পরের বছর এশিয়া কাপ বাংলাদেশে আয়োজিত হয়েছিলো। কিন্তু সেবার পাকিস্তানকে ভাগাভাগি করে নেতৃত্ব দিয়েছেন জাভেদ মিয়াদাদ আর আবদুল কাদির। ইমরান আসেননি।
সেই ইমরান ২১ বছর পর পাকিস্তানী টিভিতে স্মৃতিচারণ করেন সেই ম্যাচের (এবং ভারতের বিপক্ষে চ্যারিটি ম্যাচ বলে ভুল উল্লেখ করেন)। পাকিস্তানের বিজয়ে জনগনের উল্লাসে নাকি তার মন আদ্র হয়েছে। তখন তার মনে হয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভুল করেছে। নিজেদের ভাইদের বুকে তারা গুলি চালিয়েছে। এজন্য পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়া উচিত। এবং এখানে বাড়তি কিছু কথাও আছে। একাত্তরে তিনি সেনাবাহিনীকে ডিফেন্ড করেছেন, লোকজনকে বলেছেন সব ঝুট হ্যায়। কিন্তু দু বছর পর এক বাঙালী বন্ধুর কাছে শুনে নাকি তার মত বদলায়। এবং আমরা সেই সাক্ষাতকারে সাবেক অধিনায়ক ইমরান খানের বদলে তেহরিক ই ইনসাফ নামে একটি রাজনৈতিক দলের প্রধানকেই দেখতে পাই, যার লক্ষ্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হওয়া। এবং পাকিস্তানের সঙ্গে রিকনসিলিয়েশনওয়ালারা (দৈনিক প্রথম আলোর নেতৃত্বে) তার এইসব কথাবার্তা ব্যাপক উদ্দীপনা সহকারে তুলে ধরে।
ব্রিটিশ ম্যাগাজিন ক্যারাভানের জানুয়ারী ২০১২ সংখ্যায় এক সাক্ষাতকারের অংশবিশেষ নিয়ে এদের ব্যাপক উল্লাস লক্ষ্য করা যায়। বাস্তবতা হচ্ছে প্রতিপক্ষের কাছে ‘তালিবান কিং’ উপাধি পাওয়া ইমরান রাজনৈতিক স্বার্থেই তালিবানদের ডিফেন্ড করেন সেই সাক্ষাতকারে। এবং তুলনা করেন বাংলাদেশের মুক্তিযু্দ্ধের গণহত্যার সঙ্গে। তিনি একবারও বলেন না আমাদের মতোই স্বাধিকারের জন্য দীর্ঘদিন লড়ে যাওয়া বেলুচিস্তানের কথা, বেলুচদের কথা। বলেন তালিবানদের কথা, পশতুনদের কথা। যাদের বিরুদ্ধে নাকি পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের মতোই নির্মম। এবং সেই প্রসঙ্গেই বলেন, ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা থেকে শেষ ফ্লাইটে তিনি যাত্রী ছিলেন। ঢাকায় থাকতে শুনেছেন বাঙালী হত্যার পরিকল্পনা, তাদের কিভাবে মারতে হবে যেমন এখন বলা হয় আফগান পশতুনদের ক্ষেত্রে।ইমরান নিজেও পশতুন। তার পুরা নাম ইমরান খান নিয়াজী।
১৯৭১ সালের মার্চে ইমরানের খানের ঢাকা সফর খেলার উদ্দেশ্যে ছিলো না। ঢাকার ম্যাচে ইমরান দলে ছিলেন না। রকিবুল হাসানের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি ১ মার্চ স্টেডিয়াম থেকে পাকিস্তান দলকে ঢাকা সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। এবং তারা ঢাকা ছাড়ে ৪ মার্চ। যাওয়ার আগে জহির আব্বাস রকিবুলকে বলেন আবার শিগগিরই দেখা হবে আমাদের, রকিবুলের জবাব ছিলো- হয়তো দেখা হবে, তবে আমার হয়তো পাসপোর্ট ভিন্ন থাকবে, ভিন্ন দেশের, ভিন্ন নামের। সেই মার্চে ঢাকায় আরেকজন ক্রিকেটার অতিথি ছিলেন। আবদুল হাফিজ কারদার। পাকিস্তানের সর্বকালের সেরা অধিনায়কদের একজন। ইয়াহিয়া খানের সফরসঙ্গী ছিলেন তিনি। ২৫ মার্চে ঢাকা ছেড়ে যাওয়া সেই ফ্লাইটে ছিলেন তারাও। তার আগে গণহত্যার ব্লুপ্রিন্ট ‘অপারেশন সার্চলাইট’কে থাম্বস আপ দিয়ে গেছেন ইয়াহিয়া ক্ষমতায় তার দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে।এবং ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পনের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে গণহত্যা চালানোর জন্য দায়ী লোকটিও একজন পশতুন,ইমরানের মতোই পাঞ্জাবের মিয়াওয়ালি থেকে আসা লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী।
চার.
ঢাকার ম্যাচে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড একাদশের দলে ইমরান খান ছিলেন না। তবে রকিবুল হাসানের মতো তাকেও জাতীয় দল হাতছানি দিচ্ছিলো। সেই ডাক তিনি পেলেন ইংল্যান্ড সফরে। সে দেশের সিমিং কন্ডিশনে তার মতো মিডিয়াম পেস সিমারের বেশ কদর। ইমরান খানের অভিষেক হলো বার্মিংহাম টেস্টে। এর আগে প্র্যাকটিসের সময়ও তার দেখা হয়েছে বাইরে বাঙালীদের মিছিল।দেখেছেন মে ফেয়ার হোটেলের সামনে।বস্তুত ইংল্যান্ডের মাটিতে পা দেয়ার পর থেকেই বাঙালীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েছিলো পাকিস্তানী ক্রিকেটাররা। দাবি সত্য হলে তখন নিশ্চয়ই সবাইকে পূর্ব পাকিস্তানে কিচ্ছু ঘটেনি বলে বোঝাচ্ছেন ইমরান, সেনাবাহিনীর পক্ষ নিয়ে গলা ফাটাচ্ছেন!
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলো ঘটিয়েছেন ইংল্যান্ড প্রবাসী বাঙালীরা। ফ্রান্সে গিয়ে দাতা দেশগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি করে পাকিস্তানকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া বন্ধ করেছিলেন তারা। আর বাংলাদেশের পক্ষে তাদের যাবতীয় আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিলো ২৮ মার্চ, স্মলহিথ থেকে। সেদিনের সেই সভা ছিলো শপথ সভা, প্রিয় জন্মভূমিকে শত্রুমুক্ত করার জন্য যার যা সাধ্য আছে তাই নিয়ে পাশে দাড়ানোর শপথ। বেগম বদরুন্নেসা পাশা তাদের একজন। বিয়েতে পাওয়া যাবতীয় স্বর্ণালংকার তিনি খুলে দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সাহায্যে দাতব্য তহবিলে। সেই সভাতেই হামলা করেছিলো পাকিস্তানীরা। ১৫-১৬ জন বাঙালী ছুরিকাহত হন তাদের হাতে। লোকজন যখন ভয়ে পালাচ্ছে তখন জ্বালাময়ী এক বক্তৃতা দিয়েছিলেন বদরুন্নেসা, ‘ভাইয়েরা আপনাদের ভাই বোনদের কথা ভাবুন, আপনাদের মায়ের কথা ভাবুন। ভাবুন একবার তারা কি অবস্থায় আছে। আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হয়েছে মাত্র, আমাদের পালানোর উপায় নেই, সময় হয়েছে ঘুরে দাড়িয়ে লড়ার, যুদ্ধ করার।’ সবাই ফিরে এসেছিলেন।
২৭ এপ্রিল পাকিস্তান ক্রিকেট দল ইংল্যান্ডে পা রাখার পর থেকেই শুরু হয় বাঙালীদের বিক্ষোভ। ৫ মে মে ফেয়ার হোটেলে পাকিস্তান দলের সম্বর্ধনামূলক এক ডিনারে তারা ঢোকার সময় বাঙালীরা ব্যানার প্ল্যাকার্ড নিয়ে তুমুল বিক্ষোভ জানায়। ঘটনাস্থল থেকে গ্রেফতার করা হয় ২২ জন বাঙালীকে। বার্মিংহাম টেস্টের আগে পাকিস্তান দলের প্র্যাকটিসের বাইরে নিয়মিতই মিছিল করেছেন বাঙালীরা। সবচেয়ে বড় বিক্ষোভটি হয়েছিলো টেস্ট ম্যাচ শুরুর দিন। চার পাচটি বাস ভর্তি হয়ে বাঙালীরা মাঠের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেছেন, উড়িয়েছেন স্বাধীন বাংলার পতাকা। পোড়ানো হয়েছে পাকিস্তানের পতাকা। সেই ম্যাচের দিন পাকিস্তানীদের সঙ্গে তাদের তুমুল বিতন্ডা হয়েছে, যদিও সেদিন কোনো হামলা হয়নি।
একই সিরিজে একটি ব্যাটে স্বাক্ষর করেছিলো পাকিস্তান ও ইংলিশ ক্রিকেট দল। লর্ডসে ওই ব্যাটটি নিলামে তোলা হয়েছিলো পাকিস্তানী শরণার্থীদের সাহায্যে। সেই টাকা ইয়াহিয়া সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিলো। সে টাকার ব্যবহার কিসে হয়েছিলো তা জানা যায়নি।
অনেক বছর পর বার্মিংহামে সবুজশাড়ি লাল ব্লাউজ পড়ে খেলা দেখতে গিয়েছিলেন মিসেস বদরুন নেসা পাশা। গিয়েছিলেন বাংলাদেশ দলকে সমর্থন দিতে। নিজেদের দেশ টেস্ট ম্যাচ খেলছে এই গর্বে উদ্বেল ছিলেন তিনি। আর আমাদের তরুণরা কোনো টুর্নামেন্টে নিজের দেশ শুরুতেই বাদ পড়লে পাকিস্তানের মাঝে নিজেদের খুজি। আফসোস, একবারও ভাবি না সেইসব মানুষের আত্মত্যাগের কথা!
পাঁচ.
ছবিটা পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ২০০৯ সালের টুর্নামেন্টের। টুর্নামেন্টের নাম আলবদর টুর্নামেন্ট। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ড পরিচালিত করেছিলো যে নৃশংস খুনী গোষ্ঠী, তাদের নাম আল বদর। গঠন করা হয়েছিলো আইজেটির পূর্ব পাকিস্তান উইং ইসলামী ছাত্র সংঘের (বর্তমানে ইসলামী ছাত্র শিবির) সদস্যদের নিয়ে। যার প্রধান ছিলেন বর্তমান জামাতের আমির ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে গ্রেফতার মতিউর রহমান নিজামী। পূর্ব পাকিস্তান প্রধান ছিলেন আলী আহসান মুজাহিদ। কামারুজ্জামান ছিলেন আল বদরের প্রধান সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধে নিহত সেই আলবদরের স্মৃতিতে এই টুর্নামেন্ট আয়োজন করে আইজেটি। এই ভিডিওটি টুর্নামেন্টের সমাপনী বক্তৃতার। সেখানে লেখা: Nazim e Ala Islami Jamiat Talaba Pakistan,Br. Ateeq ur Rehman Khan Speaks in IJT Punjab Medical College’s Albadar Floodlight Sports Festival 2009. Dedicated to the martyrs of Albadr East Pakistan
আমাদের যেসব তরুণরা স্রেফ মুসলমান বলে পাকিস্তান সমর্থন করো, তাদের আরেকবার ভাবতে বলি। খুব কৌশলে তোমাদের মধ্যে তাদের জন্য প্রীতির জন্ম দেওয়া হচ্ছে নানা ছুতোয়, নানা অজুহাতে, নানা মধুমাখা কথায়, নানা প্রচারণায়। ৩০ লাখ শহীদ, ২ লাখ বীরাঙ্গনা, এক কোটি উদ্বাস্তু যাদের কীর্তি, সেই পাকিস্তানীদের প্রতি ভালোবাসা জন্মাতে নিত্য পরিশ্রম করছে তাদের এদেশীয় দোসররা। যারা পাকিস্তানকে ভাই মনে করে, এদেশকে মনে করে পূর্ব পাকিস্তান।
ফেসবুকে আছেন তারা তো নিয়মিতই দেখছেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে কিরকম বিতর্কিত স্ট্যাটাস ও ছবি শেয়ার করে এই পাকিস্তানপন্থী জারজরা। বাস্তবতা আরো নির্মম আরো নিষ্ঠুর, তার প্রমাণ এই ছবিটা। গত বছর বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করে ইসলামী ছাত্র শিবির। দেখতেই পাচ্ছেন সেই টুর্নামেন্টের বিজয়ী কারা! পাকিস্তানের জার্সি পড়িয়ে জেতানো এই অবুঝ কিশোরদের বিপরীতে কারা খেলেছিলো? কোন দল? একটু মাথা খাটালেই উত্তরটা পেয়ে যাবেন।
শেষ কথা:
৩০ লাখ শহীদের অভিশাপ নিও না ভাই ও বোনেরা, লাখো বীরাঙ্গনার লুটানো সম্ভ্রমের কথা একবার ভেবো- নিজের মা কিংবা বোনকে তাদের জায়গায় বসিও পারলে। এবং ওদের পাতা ফাদে পা দিও না। স্রেফ নিজেদের যুদ্ধাপরাধের পাপ ঢাকতেই তারা তোমাদের বিভ্রান্ত করছে। পাকিস্তানীদের সুনাম করছে। ওদের মেনে নিতে বলছে। এই গল্পে সেই গল্পে। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন, বাঙালীর শ্রেষ্ঠ অর্জন। আর তা এসেছিলো এই নিষ্ঠুর, নির্মম পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধেই, যারা মুসলমান হওয়ার পরও আমাদের রেহাই দেয়নি। আজ কিসের ভাই। কার রক্ত মাড়িয়ে? কার ছিন্ন শাড়ি পায়ে ঠেলে পাকিস্তানকে ভালোবাসবে। নিজেকে বাঙালী ভাবো, দেশটাকে ভালোবাসো। ৪১ বছর কি খুব দীর্ঘ সময় সব অপমান ভুলে যাওয়ার? সব রক্ত, অসম্মাণ, লুন্ঠণ ভুলে যাওয়ার? জাতীয় পতাকার কথা ভাবো, ওই লালটা শহীদের রক্ত, ওই সবুজটা বীরাঙ্গনাদের শাড়ি। এবার সিদ্ধান্ত নাও, স্রেফ ধর্ম পরিচয়ে একাত্তরকে অস্বীকার করবে কিনা! শহীদ, বীরাঙ্গনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগকে অস্বীকার করবে কিনা! যদি করো, তোমার কোনো যোগ্যতা নেই এই দেশকে ধারণ করার। তুমি বিশ্বাসঘাতক। তুমি বেঈমান। দেশপ্রেম যদি ঈমানের অঙ্গ হয়, সেই ঈমান তোমার নেই। আরেকবার ভাবো। ভুল হয়, ভুল শোধরানো যায়। এদেশ তোমার-আমার। যারা এর জন্মকে অস্বীকার করেছিলো তাদের নয়, তাদের তাবেদারদের নয়। তুমি কি আমাদের দলে. নাকি ওদের? তোমার রক্ত কার কথা বলে?
কৃতজ্ঞতা: স্বাধীনতা ট্রাস্ট, হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক, বিবিসি বাংলা, দৈনিক ইত্তেফাক ।

সংগ্রহ ১ - লিখছেন আনন্দরূপ রায়

১৯৯৬ সালে সৌরভ গাঙ্গুলীর ভারতীয় দলে অন্তর্ভুক্তির পর মুম্বাই এবং দক্ষিণী লবির সাংবাদিকরা গেল গেল রব তুলেছিল, যে কেন ভি ভি এস লক্ষণ এর মতো প্রতিভাবান প্লেয়ার থাকতে একে দলে ঢোকানো হল? বাঁ হাতিই যদি নিতে হয় তাহলে অভিজ্ঞ ডব্লিউ ভি রমনকেই আবার ডাকা যেত। তখন ভারতীয় বোর্ডের কিছু বাঘা কর্মকর্তা তাদের আশ্বস্ত করে দিয়ে বলেছিলেন - আরে বহুদিন ধরে বেঙ্গল থেকে কোন প্লেয়ার নেওয়া হয় না, বোর্ড নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে কোটা হিসাবে একজনকে নেওয়া হয়েছে আর নিলেই কি খেলাতে হবে নাকি? স্বয়ং আজাহার নির্বাচনী সভায় সৌরভের অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতা করে তুলকালাম করেছিলেন। কিন্তু গত দুই বছরে গাঙ্গুলীর ধারাবাহিক পারফরম্যান্স আর সম্বরণ ব্যানার্জির উপস্থিত বুদ্ধি, গলার জোর, মেরুদন্ড শক্ত করে থাকা সব মিলিয়ে মিশিয়ে সৌরভ ভারতীয় দলে ঢুকে পড়েন। তারসঙ্গে ১৯৯৬ এর বিশ্বকাপে ভারতীয় দলের খারাপ পারফরম্যান্স, ইডেন বিতর্ক, আজাহার সঙ্গীত বিজলানী কেচ্ছা সবকিছুই একটা অনুঘটকের কাজ করেছিল। ইংল্যাণ্ডের দল ঘোষণা হওয়ার পরে সৌরভকে নিয়ে প্রথম বিদ্রুপটা ছুঁড়ে দিয়েছিলেন গাভাস্কার - "ও তো কলকাত্তা কা রসগুল্লা হ্যায়" রবি শাস্ত্রী সরাসরিই বলেছিলেন - "কোটার মাল"। আসলে এরা সবচেয়ে ভাল ওয়াকিবহাল ছিলেন সৌরভের ক্ষমতা সম্পর্কে। তাই সৌরভ গাঙ্গুলীর ভবিষ্যৎ মহীরুহ হওয়ার সম্ভাবনাকে অচিরেই শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। নির্বাচন কমিটির বৈঠকের পরে প্রবল বাঙালি বিদ্বেষী নির্বাচক সন্দীপ পাটিল ব্যাঙ্গ করে বলেছিলেন - "আজ সম্বরণ আমাদের খাওয়াবে। সৌরভকে শেষ পর্যন্ত ও দলে ঢুকিয়েই ছাড়ল" ব্যাপারটা এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায় যে মধ্যাঞ্চলের নির্বাচক গোপাল শর্মা চিৎকার করে বলতে বাধ্য হন - "শাট আপ স্যান্ডি! সমস্ত কিছুর একটা সীমা আছে।" উত্তরে সম্বরণ ব্যানার্জি হেসে বলেছিলেন - "তোমাদের তুলনায় এই বাঙালিরা একটু গরীব, কিন্তু নিশ্চই খাওয়াবো। তবে সৌরভকে দলে ঢোকাতে পারলাম বলে নয়, ভারতীয় দলকে সৌরভের মতো একটা ক্রিকেটার দিতে পারলাম বলে। "আসলে সম্বরণ ব্যানার্জি নিজেই তো একজন বঞ্চিত তারকা। একটা সময়ে সৈয়দ কিরমানির পরেই দ্বিতীয় সেরা ভারতীয় উইকেট রক্ষক হিসাবে সম্বরণ ব্যানার্জির নামই আসতো। ভারতীয় A দল, অবশিষ্ট ভারতীয় একাদশ, বোর্ড প্রেসিডেন্ট একাদশ, পূর্বাঞ্চল, বাংলা দলের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে নজরকাড়া সাফল্য ছিল সম্বরনের। কিন্তু তিনি যেহেতু সিং, শর্মা, যাদব বা আইয়ার হয়ে নির্ভেজাল বন্দোপাধ্যায়, তাই ভারতীয় টেস্ট দলের দরজা চিরকাল তার মুখের ওপরে বন্ধই ছিল। নিজের ক্রিকেট জীবনের সেরা সময়ে পড়ন্ত বেলার কিরমানির ছায়ায় ঢাকা ছিলেন। কিরমানির অবসরের পরে বহুবার দল নির্বাচনী টেবিলে তার নাম আলোচিত হলেও রাজ সিং দুংগাপুর, নিরঞ্জন শাহদের মতো নেপথ্য মহপুরুষদের কৃপায় বারবার তার নাম খারিজ হয়ে যায়। একবুক যন্ত্রনা নিয়ে দেখেছেন তাঁকে ব্রাত্য রেখে যোগ্যতায় তার চেয়ে ধারে এবং ভরে বহু যোজন দূরে থাকা দ্বিতীয় শ্রেণীর উইকেট কিপার চন্দ্রকান্ত পন্ডিত অথবা সদানন্দ বিশ্বনাথ স্রেফ দক্ষিণী লবির জোরে টেস্ট দলে জায়গা পেয়ে গেছে। নিজের ওপর হওয়া অবিচারের শোধ সম্বরন সুদে আসলে তুলে ছিলেন স্রোতের বিরুদ্ধে সৌরভকে ভারতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করিয়ে। পরে ভারতীয় ক্রিকেটের মানচিত্রেই না থাকা ওড়িশা থেকে শিবসুন্দর দাস, দেবাশীষ মোহান্তি এবং সঞ্জয় রাউলও জাতীয় দলে সুযোগ পেয়েছিলেন লড়াকু সম্বরনের জন্যে।
১৯৯৬ এর ইংল্যান্ড সফরে সৌরভের কেরিয়ার চিরকালের মতো শেষ করে দেওয়ার ব্লু প্রিন্ট ফ্লাইটে বসেই বানিয়ে ফেলেছিলেন আজাহার আর পাটিল। হোটেলে চেক ইন করার পরে আজাহার সৌরভকে বলেছিলেন - "ভালো করে ইংল্যান্ড ঘোর, বাজার কর , আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা করো", মানে ভুলেও ক্রিকেট খেলার বা দলে জায়গা পাওয়ার কথা মনে স্থান দিও না। প্লেয়ারদের ফিডব্যাক রিপোর্টে সৌরভ সম্পর্কে ভয়ংকর সব অভিযোগ করেছিলেন পাটিল। পাটিল জানতেন ১৯৯২ সালে সৌরভ যখন ভারতীয় দলে প্রথম নির্বাচিত হন তখন তার নাম শ্রীকান্ত, শাস্ত্রী সহ বেশ কিছু প্লেয়ার অভিযোগ করেছিলেন সৌরভ নাকি উদ্ধত এবং তাদেরকে সিনিয়র ক্রিকেটার হিসাবে সম্মান করেন না। যেটা সৌরভ পরে মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন অভিযোগ বলেছিলেন। সেটাকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করলেন পাটিল। রিপোর্টে লিখলেন "সৌরভ টিমম্যান নন, ম্যাচের আগে কারোর সাথে কথা বলেননা, একা একা ঘুরঘুর করেন।" এখানে আমরা নিজেরা যারা খেলাধুলা অল্পবিস্তর করি তারা একটা কথা বলতে চাই যে, খেলাধুলায় চূড়ান্ত ক্ষেত্রে নামার আগে মনোসংযোগ বলে একটা কথা আছে। আমরা নিজেরাও টুর্নামেন্টে ফাইট করার একদিন আগে থেকে কথাবার্তা কম বলি, খেলাটা নিয়ে, প্রতিপক্ষকে নিয়ে ভাবনা চিন্তা করি, একাত্ম হওয়ার চেষ্টা করি। ফাইট শুরুর আগে এককোনে চেয়ার টেনে নিয়ে চোখ বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকি, গেম রিড করি। এগুলোর সাথে ঔদ্ধত্বের কোন সম্পর্কই নেই। আমার মতো দু চার আনার অজ্ঞাতকুলশীল স্পোর্টসম্যান যে জিনিসটা জানে সেটা সন্দীপ পাটিলের মতো বিশ্বমানের ক্রীড়াবিদ কি জানেন না? কিন্তু ইচ্ছাকৃত ভাবে বিনোদ কাম্বলীর রাস্তা পরিষ্কার রাখার জন্যে পাটিলরা ওই কাজ করেছিলেন। আজহারের সাথে সিধুর ইগোর লড়াই চরমে পৌঁছে সিধু মাঝপথে সফর ছেড়ে চলে এলেও সৌরভের নাম ভাবা হয়নি। ঠিক ছিল রাহুল দ্রাবিড় আর বিক্রম রাঠোর এর নাম। কিন্তু এরপরে প্র্যাকটিসে সুনীল জোশির আঙুল ভাঙ্গায় কোনভাবেই উপায় না দেখে সৌরভকে খেলাতে বাধ্য হয় ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট। লর্ডসের স্যাঁতস্যাঁতে পিচে সৌরভকে ওয়ান ডাউনে ঠেলে দেন পাটিল-আজাহার জুটি। উদ্দেশ্য পরিষ্কার সৌরভ ডমিনিক কর্ক আর অ্যালেন মুলালির বিষাক্ত সুইং এর সামনে খাবি খেয়ে অল্প রানে আউট হবেন আর তারপরেই ওৎ পেতে থাকা মুম্বাই আর দক্ষিণী মিডিয়ার সাহায্যে শেয়ালের চিৎকার করে সৌরভ অযোগ্য এই বলে সৌরভের ক্যারিয়ার জন্মের মতো শেষ করে দেওয়া হবে। সঙ্গ দেওয়ার জন্যে মাত্রাতিরিক্ত উদার, খাঁটি ভারতীয় বাঙালী কাঁকড়ারা তো আছেই। লর্ডসে সৌরভ কি করেছিলেন সেটা বিশ্বক্রিকেটের রূপকথায় ঢুকে গেছে। কিন্তু যদি তিনি শূন্য রানে আউট হতেন তাহলে কি হত? দিলীপ বেঙ্গসরকার ১৬ টা টেস্ট খেলার পরে জীবনের প্রথম হাফ সেঞ্চুরী করেছিলেন, যে গাভাসকার প্রথম তিনটে টেস্টে ৭০০ রান করেছিলেন সেই গাভাস্কারের ১০০০ হাজার টেস্ট রান পুরো করতে ১২ টা টেস্ট লেগেছিল। সৌরভ পেতেন এতগুলো সুযোগ? রোহিত শর্মা পরপর নয়টা ম্যাচে দুই অংকের স্কোরে পৌঁছাতে পারেননি। তবুও দশ নম্বর ম্যাচটা খেলার সুযোগ কেন পায় জানেন কারন ঠিক সেই সময়েই মহারাষ্ট্রের মিডিয়া আর কর্মকর্তারা খাঁটি ভারতীয় থেকে খাঁটি মুম্বাইয়া হয়ে যায়। এদের জন্যেই শচীন, লক্ষণ, দ্রাবিড় সৌরভের সমসাময়িক হয়েও কেউ ২০১২ কেউ ২০১৩ আবার কেউ ২০১৪ তে অবসর নিতে পারেন আর ফর্মের শিখরে থাকা সৌরভকে অকাল অবসর নিতে বাধ্য করা হয় ২০০৮ সালে। চ্যাপেল কান্ডে সারা ভারতের ক্রিকেটপ্রেমী সৌরভের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল আর ভারতীয় বোর্ড ছিল সৌরভের বিপক্ষে। কিন্তু তখনও কিছু অতিরিক্ত ক্রিকেটবোদ্ধা, সর্বভারতীয় লিবারেল বাঙালি কাঁকড়া মহারাষ্ট্র এবং দক্ষিণ ভারতীয় লবির সাথে গলা মিলিয়ে সৌরভ কত খারাপ এবং রাহুল দ্রাবিড় অধিনায়ক এবং ক্রিকেটার হিসাবে কত উচ্চমানের সেই প্রচারে ব্যস্ত ছিল।
সারা জীবনে অদ্ভুত অদ্ভুত সব অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে বেঙ্গল টাইগারকে। প্রথমে বলা হত ক্রিকেটই খেলতে পারেন না, লর্ডসের পরে নতুন গান শুরু হল টেস্টে মোটামুটি চললেও ওয়ানডে এর দ্বারা হবে না। টরন্টোতে একটা ম্যাচে কুম্বলেরও পরে আট নম্বরে সৌরভকে ব্যাট করতে পাঠিয়েছিলেন পাটিল। খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন সাকুল্যে আটটা বল। ১২ রানে নট আউট ছিলেন। তারমধ্যেই ওয়াসিম আক্রমের একটা ব্যানানা ইনসুইঙ্গারকে স্ট্রেট ড্রাইভে বাউন্ডারিতে পাঠিয়েছিলেন, শটটা আজও চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে। পরের ম্যাচেই বাদ পড়েছিলেন। সেইজন্য নিজের দশহাজার ওয়ানডে রান পূর্ন করার পরে একটা দুর্দান্ত স্টেটমেন্ট দিয়েছিলেন, তখন চ্যাপেল, মোড়ে দুই জোড়া ফলা দিয়ে সৌরভকে ছিন্নভিন্ন করছেন শরদ পাওয়ার। অধিনায়কত্ব পাওয়ার লোভে জেন্টেলম্যান রাহুল দ্রাবিড় তখন নগ্ন ব্রুটাস। সেই সময়ে দশ হাজার রান পূর্ন করে সংবাদিকদের বলেছিলেন - "জীবনের প্রথম ওয়ান ডে রানটা করার পরে জানতাম না পরের ম্যাচে দলে থাকবো কিনা। আজ দশ হাজার ওয়ান ডে রান করার পরেও জানিনা পরের ম্যাচে জায়গা থাকবে কিনা।"
খুব ভালো সিঙ্গেলস জাজ করতে পারতেন সৌরভ, সেইজন্যে অতিরিক্ত বাহাদুরি দেখাতে গিয়ে নির্বোধের মতো রান আউট হতেন না এটাকে একশ্রেণীর মিডিয়া প্রচার করতো সৌরভ রান নিতে পারেন না। ঘোড়াতেও হাসবে শুনলে। শচীন, লক্ষণ ক্যাচ ফেললে ওটা ক্রিকেটেরই অঙ্গ কিন্তু সৌরভের একটা মিসফিল্ড হলেই খাঁটি ভারতীয় জাতীয়তাবাদী ক্রিকেটপ্রেমী বাঙালি কাঁকড়াগুলো গেল গেল রব তুলেছে। অথচ সৌরভের মতো উচুঁ ক্যাচ ধরার দক্ষতা অতীত বর্তমান মিলিয়েও কোন ভারতীয় ক্রিকেটারের নেই। ফ্লাড লাইটের ওপরে চলে যাওয়া ক্যাচগুলো কি অসাধারন দক্ষতায় তালুবন্দী করতেন। ক্লোজ ইন ফিল্ডার হিসাবেও দুর্দান্ত ছিলেন। সবচেয়ে হাস্যকর অভিযোগ ছিল গাঙ্গুলী জোরে বল খেলতে পারে না। আঠেরো হাজার রান শুধুই স্পিনের বিরুদ্ধে এসেছে? কার্টেলে অ্যামব্রস, ওয়াসিম আক্রম, চামুন্ডা ব্যাস, আকিব জাভেদ, ড্যারেন গফ, ডোনাল্ড, পোলক, ব্রেট লি-রা ঠ্যাঙানি খায়নি দাদার হাতে? শোয়েব আখতারের বল বুকে লেগে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পরেও হসপিটাল থেকে এসে দুরন্ত ৫৭ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। ওয়াকার ইউনুসের মার খাওয়ার কথা বললেই লোকে সচিনের কথা বা ১৯৯৬ বিশ্বকাপে জাদেজার কথা বলে। এর থেকেও ভয়ংকর মার ইউনুস সৌরভের হাতে খেয়েছিলেন ১৯৯৭ এ করাচির ওয়ান ডেতে। পাকিস্তান এর বিরুদ্ধে ভারতকে ধারাবাহিকভাবে জিততে শিখিয়ে ছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলী। অফ সাইডের স্কোয়ার কাট আর কভার ড্রাইভ সর্বকালের সেরা। হিংসুকরা বলতো অন সাইডে খেলতে পারেন না। কতবড় নির্বোধ হলে এই কথাকে সমর্থন করা যায়। এতবড় দুর্বলতা নিয়ে ১২ বছর এই আকাশছোঁয়া সাফল্য নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা সম্ভব?
২০০৬ এর শেষদিকে সৌরভের কামব্যাক যখন নিশ্চিত। তখন কাছের লোকেরা বলেছিল - "এত তাড়াহুড়োর দরকার কি, এই সিরিজটার ওপরে সারা জীবনের ক্রিকেট কেরিয়ার দাঁড়িয়ে আছে। তোমাকে আতস কাচের নিচে ফেলে দেখছে গোটা ক্রিকেট বিশ্ব, কি দরকার দক্ষিণ আফ্রিকার গ্রিনটপে গিয়ে স্টেইন, মর্কেল, অ্যান্তিনিদের মুখোমুখি হওয়ার? এরচেয়ে অনেক দুর্বল ওয়েস্ট ইন্ডিজ ভারতে আসছে এরপরেই ওদের বিরুদ্ধে সহজ সিরিজে কামব্যাক করো।" উত্তরে দেওয়ালের কোনা থেকে ব্যাট তুলে উত্তেজিত ভাবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন সৌরভ। শ্যাডো করতে করতে জবাব দিয়েছিলেন - "এইভাবে কাপুরুষের মতো ক্রিকেট কেন কোন খেলাই হয় না, এইভাবে বাচঁতে শিখিনি, যার সত্যিকারের ক্ষমতা আছে সে স্থান আর প্রতিপক্ষ বিচার করে না। যদি ক্ষমতা থাকে তো ওখানেই কিছু করে দেখাবো।" কি করেছিলেন ইতিহাসে লেখা আছে।
২০০৩ সালে পাকিস্তানের এক সাংবাদিক তৎকালীন অধিনায়ক সৌরভকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন - রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেসকে (শোয়েব আখতার) থামাবেন কি করে? মহারাজ উত্তর দিয়েছিলেন - কেন? চেন টেনে! সচিন সম্পর্কে কটাক্ষ করা শোয়েব আখতারও নিজের আত্মজীবনীতে সৌরভ সমন্ধে লিখেছেন - "শরীরটা মানুষের কিন্তু ভেতরের খাঁচাটা দৈত্যের।" শাহিদ আফ্রিদি বলেছেন - "ও বন্দাহি থোড়া অলগ হ্যায়" ক্রিস গেইল বলেছেন - "আইপিএল থেকে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সৌরভ গাঙ্গুলীর সাথে ওপেন করতে নামা , ওর মতো ম্যাচ রিডিং করতে আর কাউকে দেখিনি "। এঞ্জেলো ম্যাথুজ বলেছেন - "যে সৌরভকে সম্মান করতে পারেনা সে ক্রিকেটকে সম্মান করতে পারেনা। আইপিএল এ সৌরভের অধিনায়কত্বে খেলতে পেরে আমি গর্বিত।"
খেলোয়াড় জীবনে অসংখ্য সমস্যার সমাধান করেছেন একদম সামনে থেকে। ম্যাচ ফিক্সিং করে আজাহার-জাদেজারা ক্রিকেটকে ধর্ষণ করে সরে পড়ার পরে চাপ সামলাতে না পেরে ভদ্রলোক সচিনও যখন পালালেন তখন এক্কেবারে যাতা, অসংখ্য দোষে দুষ্ট গাঙ্গুলীর ঘাড়ে অধিনায়কত্বের বোঝা ফেলে নিশ্চিন্ত হয়েছিল ভারতীয় ক্রিকেট। ২০০০ থেকে ২০০৮ সেরা ক্রিকেট খেলেছিল ভারত। এক সময়ে ভারতীয় ক্রিকেটে ওপেনিং জুড়ি টিকত দুই থেকে পাঁচ ওভার। বলা হল গাঙ্গুলিকে ধরে ওপেনার বানিয়ে দেওয়া হোক। ঘরোয়া ক্রিকেটেও ওপেন না করা সাহসী সৌরভ নিজের কেরিয়ার বাজী রেখে ইনিংস শুরু করতে রাজি হয়ে যান। কচ্ছপের মতো ব্যাট করা দ্রাবিড়ের ওয়ান ডে ক্যারিয়ার বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন উইকেট কিপার হিসাবে খাড়া করে দিয়ে। শেহবাগকে বলেছিলেন ২৫ টা ম্যাচে শূন্য করলেও ২৬ নম্বর ম্যাচটা তুই খেলবি, যতক্ষন আমি অধিনায়ক হিসাবে আছি। ধোনিকে সুযোগ দিয়েছিলেন, ব্যাটিং অর্ডারে ওপরে তুলে এনেছিলেন।
শুধু নিজে কারোর কাছ থেকে কোন নিরাপত্তা বা সাহায্যের আশ্বাস পাননি। সবচেয়ে বড় দুটো ভুল করেছিলেন ২০০৩ ওয়ান্ডার্সে বিশ্বকাপ ফাইনালে টস জিতে ফিল্ডিং নিয়ে আর তৎকালীন মন্ত্রী অশোক দাশগুপ্তের সাথে কথা বলে নির্বাচক কমিটির চেয়ারম্যান দিলীপ বেঙ্গসরকারকে ক্রিকেট একাডেমির জন্যে জমির ব্যবস্থা করে দেবেন বলে। যেটা সম্ভব না হওয়ায় বেঙ্গসরকার অস্ট্রেলিয়া সফরে ওয়ানডে টিম থেকে সৌরভকে ছাঁটাই করেন। মদত দেন ধোনি যিনি সৌরভের ব্যক্তিত্বের সামনে হীনমন্যতায় ভুগতেন। আর ছিলেন শ্রীনিবাসন ও গুরুনাথ মায়াপ্পন। শ্বশুর-জামাই আবার ম্যাচ গড়াপেটার ব্যবসা নতুন করে শুরু করেছিলেন। যেটা সৌরভের মতো একটা লোক থাকলে কিছুতেই সম্ভব হচ্ছিল না। সেইজন্যেই হঠাৎ করে অবসর ঘোষণার পরে সৌরভ প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন - "আজ রাত্রে নিশ্চিন্তে ঘুমাবো।" কি আশ্চর্যের কথা, একজন ক্রিকেটার যে সারা জীবন শান্তিতে ক্রিকেটটাই খেলতে পারেননি। শ্রীনির জামাই অলরেডি হাজতবাস করেছেন। বাকিরা এই আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত সিস্টেমএর মধ্যে একে তাকে ধরে বেঁচে গেছেন। খবর বেরোচ্ছে ভারতে ২০১১ বিশ্বকাপের বেশ কিছু ম্যাচ নাকি গড়াপেটা হয়েছিল। মুকুল মুদগল কমিটির আদালতের কাছে পেশ করা বন্ধ খামে যে কোন কোন রথী মহারথীর নাম আছে কে জানে।
আনন্দরূপ রায়

Friday, 9 June 2017

৩ জুন, ২০১৭

'পাকিস্তান কা মতলব কেয়া হে ? লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ । নারায়ে তাকবীর । আল্লা হো আকবর । পাকিস্তান জিন্দাবাদ ।' ম্যাচ যত গড়াতে থাকে, সুপরিচিত এই স্লোগানগুলি ততই জোরালো হতে থাকে । পাকিস্তানের জয় অনিবার্য ।
২০০৯ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ঘটনা । দুবাইয়ের কোনও এক হোটেলের রুমে বসে সেই দিনটির কথা মনে করছেন পাকিস্তানের সমর্থক শান আগা । রুমের অনেকে যদিও ভারতীয় ।
কিন্তু যখন খেলা শেষ হয় তখন হাতে গোনা ক'জন উপস্থিত আছে । বলাই বাহুল্য, বেশিরভাগই পাকিস্তানি । দু'জন ভারতীয় - সাইফ আর হুরেজ । তারাই শানকে নিমন্ত্রণ দিয়েছিলেন ম্যাচ দেখার জন্য ।
'...লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ।', রব ওঠে ।
'ক্রিকেট খেলাতে এসবের কি খুব প্রয়োজন আছে', রীতিমতো বিরক্ত হয়েই প্রশ্নটা করেছিলেন সাইফ ।
শান উত্তর দিয়েছিলেন, 'পাকিস্তান ইসলামের দেশ, আল্লা হমারে সাথ হে...'
সাইফ আর হুরেজ, দু'জনের মুখেই হাসি, 'মুসলমান তো আমরাও । তাছাড়া পাকিস্তানের চেয়ে বেশি মুসলমান ভারতে আছে, অন্তত কম তো নয়ই ।'
তাদের কথাগুলো অস্বীকার করতে পারেননি শান । বোকার মতো খালি বলেছিলেন, 'নারায়ে তাকবীর ।'
সেটিই ছিল আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের শেষ জয় । আট বছর আগে ।
(নারায়ে তাকবীর বা 'নারা-ই-তকবীর'-এর অর্থ আল্লার নারা (জিগির বা স্লোগান) মতান্তরে আল্লাই সর্বশ্রেষ্ঠ)
(পাকিস্তানের পত্রিকা 'দ্য ডন' থেকে)

মে ৩১, ২০১৭

নির্ঘাত অপদেবতা !
দু'হাতে ছটা করে আঙুল । তার ওপর জন্ম থেকেই দু'খানা দাঁত । অপদেবতা নয়তো কি ! এ ছেলে বেশিদিন বাঁচবে না । খুব জোর দশ বছর...
জ্যোতিষীর ভবিষ্যৎবাণী যে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল, তা বলাই বাহুল্য ।
আজও সে 'অপদেবতার সন্তান' বেঁচে আছে । এই জুলাইয়ে ৮১ বছর পূর্ণ হবে । কর্মক্ষেত্রে সাফল্য পেয়েছেন যথেষ্ট । কাজে বাঁধা না পড়ে, তার জন্য ছেলেবেলাতেই দু'হাতের অতিরিক্ত আঙুলদুটি নিজেই ছুড়ি দিয়ে কেটে বাদ দিয়ে দেন । দাম্পত্য জীবন সুখের না হলেও, দুটি পুত্রসন্তান ও একটি দত্তক কন্যাসন্তানের পিতা ।
তবে এসবের বাইরেও তিনি ছোটোখাটো কিছু কাজকর্ম করে গেছেন । যার জন্য তার একটু নামডাক আছে বইকি । এই যেমন - প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে (আন্তর্জাতিক স্তরে না হয় ছেড়েই দিলাম) তিনিই প্রথম দেখালেন এক ওভারের ছটি বলের প্রত্যেকটিতেই ছক্কা মারা যায়, বোলার কোনও আপত্তি করবে না । তিনিই প্রথম যিনি জীবনের প্রথম একশোটিকে তিনশো রানে পরিণত করেন । এমনকি সবচেয়ে কমবয়সি খেলোয়াড় হিসেবে তিনশো রানের রেকর্ডটি ডন ব্র্যাডম্যানের কাছ থেকে কেড়ে নেন । ইত্যাদি ইত্যাদি । শুনেছি নাকি ইংল্যান্ডের রাণীর কাছ থেকে নাইট উপাধিও পেয়েছিলেন । এও শুনেছি দুটি আলাদা দেশের নাগরিকত্বও আছে নাকি তার, যা বিশেষ কিছু লোকেরাই পেয়ে থাকেন ।

মে ২৪, ২০১৭

জীবন স্যারের কাছে শুনেছিলাম । নামটা যদিও পরে জেনেছি । ক্যামেরুন কাফি । কৃতিত্ব বলতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের জাতীয় দলের পোশাকে ১৫ টি টেস্ট ম্যাচ এবং ৪১ টি ওয়ান-ডে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন । শচীন তেন্ডুলকরকে বার তিনেক আউট করেছেন, এটিও কম বড় কথা নয় । এসবের বাইরেও তিনি একটি অভূতপূর্ব ঘটনার জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন, সীমিত ওভারের ক্রিটেটের ইতিহাসে যা বিরল ।
জীবন স্যার ভূমিকাটা দিয়েছিলেন অনেকটা এইরকম, 'এমন কোনওদিন দেখেছিস একটি রান না করেও, একটি উইকেট না নিয়েও, এমনকি একটি ক্যাচ না ধরেও কেও ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হয়েছে ?'
২০০১ সালে কোকা-কোলা কাপের প্রথম ম্যাচে জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে জয়লাভের পর ক্যামেরুন কাফি ঠিক ওই ঢংয়েই ম্যান অফ দ্য ম্যাচের অ্যাওয়ার্ডটি পেয়েছিলেন । সে ম্যাচে ব্যাট করার সুযোগই পাননি তিনি । এমনকি ১০ ওভারের স্পেল সম্পূর্ণ করেও একটি মাত্র উইকেটও সংগ্রহ করতে পারেননি । ক্যাচের সংখ্যাও শূন্য । তবে ?
৬ ফুট ৮ ইঞ্চি দীর্ঘ ডান হাতি বোলারটির বোলিং ফিগারটা দেখলে কিছুটা ধারণা করা যেতে পারে । ১০-২-২০-০ । ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২৬৬ রান তাড়া করতে নেমে ২৩৯ রানেই থেমে যেতে হয় জিম্বাবোয়েকে । মারভ্যন ডিলন খান তিনেক উইকেট নিলেও, একমাত্র ক্যামেরুন কাফি ছাড়া কোনও বোলারই ৪.৮০ অপেক্ষা কম ইকোনমি রেট রাখতে সক্ষম হননি । তাই ২৭ রানের জয়টা নিঃসন্দেহে কাফিরই অবদান হয়ে দাঁড়ায় । এমনকি ড্যারেন গঙ্গা, ক্রিস গেইল এবং শিবনারায়ণ চন্দ্রপলের অর্ধশতরানও তার অবদানের কাছে ফিকে হয়ে যায় ।
যদিও অ্যান্ডি ব্লিগনটকে রান আউট করার কথাটা জীবন স্যার বলেছিলেন কি না খেয়াল নেই । সেই সময় ঝোড়ো ইনিংস খেলার সুবাদে অ্যান্ডি ব্লিগনটের চর্চা করেননি এরকম ক্রিকেট প্রেমী খুব কমই আছে । হয়তো অ্যান্ডি ব্লিগনটের চতুর্থ উইকেটটিই সেই ম্যাচের টারনিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়, যা সম্ভব হয় ক্যামেরুন কাফির সৌজন্যে ।

২২ মে, ২০১৭

বছরের এই আজকের দিনটা খুবই আহ্লাদের হয় । ভারতবর্ষের ক্রিকেটপ্রেমীরা গত দু'মাসের হাঁপিয়ে ওঠা ফুর্তি-আনন্দের ঘোর কাটিয়ে পুরনো স্বাচ্ছন্দ্যে ফিরে আসে । মনে পড়ে যায় - এই দু'মাস আগেই একটা স্মরণীয় হোম সিজন শেষ করে এসেছে । সামনে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি । আজ থেকে সন্ধ্যের আড্ডায় কেকেআর আর আরসিবিকে নিয়ে দলাদলি বন্ধ । স্কুল, টিউশন হোক বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ - গৌতম গম্ভীরকে নিয়ে মাথাব্যথাটা কেকেআর সমর্থকদের গণ্ডি পেরিয়ে সুদূর নাগেরকোয়িলে দিল্লীর সমর্থকদেরও মাথাব্যথা হয়ে উঠবে । পঞ্জাবের উন্মাদ সমর্থকেরা (প্রীতি জিন্টারও হতে পারে) রবীন উত্থাপ্পা বা সুরেশ রায়নাকে জাতীয় দলে ফেরাবার দাবীতে শোরগোল শুরু করতেই পারে । হায়দ্রাবাদবাসী বিরিয়ানি-বিক্রেতার শোরগোলটা পুনের রাহুল ত্রিপাঠি বা দিল্লির ঋষভ পন্থকে নিয়ে হলে, অবাক হওয়ার কিছু নেই । অন্ধকার গুহা থেকে বেরিয়ে ফের অধিনায়কত্বের ব্যাটনটা তুলে ধরবে বিরাট কোহলি - লাল-কালো-জিও বিরাট কোহলি নয়, ম্যান-ইন-ব্লু-ওপো বিরাট কোহলি । দোরগোড়ায় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান । ৪ জুনের অপেক্ষা...
দুঃখ খালি একটাই । সেই দিনটিতে এমন কয়েকজনকে পাবেন যাদের আনন্দের সাথে আপনার আনন্দটাকে ঠিক খাতে মেলাতে পারবেন না । কি আর করা যাবে...

এপ্রিল ২৪, ২০১৭

একটা সময় গিয়েছে, যখন অনাহূত এই জন্মতিথিটি আশঙ্কা বই আর কিছু দেয়নি...বয়স হয়ে যাচ্ছে যে, আর কতদিন খেলবে !
করুণ উত্তর দিতাম, কেন অনেকেই তো চল্লিশে খেলে ।
খাতার মলাটে সস্তা স্টিকারে বেঁচে থাক সচীন -

চিলেকোঠায় ভাঙা এম আর এফ ব্যাটে বেঁচে থাক সচীন ।