স্কুলে, স্মৃতি যতখানি মদত দেয়, পড়েছিলাম অ্যানি বেসান্ত এবং বাল গঙ্গাধর তিলকের উদ্যোগে ভারতবর্ষে হোমরুল আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। তদানীন্তন রাজনৈতিক মঞ্চে গান্ধীজির আবির্ভাবের পূর্বেকার ঘটনা। ধারণা জন্মায় এবং সেটি এতদিন অবধি বহালও থাকে, যে তাদের যৌথ প্রচেষ্টায় 'হোম রুল লীগ' প্রতিষ্ঠা হয় এবং আন্দোলনের পুরোভাগে তাঁরা একত্রে নেতৃত্ব দেন। ধারণাটি ভুল। প্রথমত তিলক ছিলেন চরমপন্থী নেতা, অন্যদিকে বেসান্ত প্রতিনিধিত্ব করতেন নরমপন্থীদের। তিলক যেখানে চরমপন্থার ক্ষিপ্রতায় লাগাম টানতে ব্রিটিশ শাসন পরিবর্জনের পরিকল্পনা ত্যাগ করে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সম্মেলনের ডাক দেন, বেসান্ত সেখানে নরমপন্থার আবেদন-নিবেদন নীতিতে বিরতি এনে স্বশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিতে সম্মেলন শুরু করেন (তাঁর অনুপ্রেরণার উৎস ছিল নিজস্ব জন্মভুমি আয়ারল্যান্ডের স্থানীয় হোম রুল আন্দোলন)। ঘটনাক্রমে দুই সম্মেলনই ঘটে একই বছরের (১৯১৫) একই মাসে (ডিসেম্বর) - কেবলমাত্র সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে। স্থানের ব্যবধানও সামান্য - তিলকের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় পুনায়, বেসান্তের বোম্বাইয়ে। আন্দাজ করা যায়, তিলক এবং বেসান্ত একে অপরের কর্মকাণ্ডে যথেষ্ট রূপে ওয়াকিবহাল ছিলেন (এমনকি একদা গোপালকৃষ্ণ গোখলের সাথে পরামর্শ করে বেসান্ত তিলককে নরমপন্থায় নিয়ে আসার ব্যর্থ প্রচেষ্টাও চালিয়েছিলেন)। হোম রুল লীগের নামকরনের ক্ষেত্রে দুই প্রতিনিধির প্রতিযোগিতা (যদিও গঠনমূলক) জনসমক্ষে স্পষ্ট হয়ে ওঠে - তিলক লীগের নামের আগে 'ভারতীয়' শব্দটি জুড়ে দেন; মাস কয়েক পর বেসান্ত নিজের লীগের নামের আগে যোগ করে দেন 'সর্বভারতীয়' শব্দটি। বলাই বাহুল্য, দুই লীগকেই ব্রিটিশ সরকারের সমান অসন্তোষ এবং তজ্জনিত সমান প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়।
Monday, 28 November 2022
Sunday, 27 November 2022
২৭শে নভেম্বর ২০২২, রবিবার
আজ কবি কুসুমকুমারী দাশ মারা গেলেন। মাসউদ আহমাদের 'কাঞ্চনফুলের কবি'র ২০তম সংখ্যায়। শোকস্তব্ধ জ্যেষ্ঠ পুত্র জীবনানন্দ দাশের কাছে ক্ষতিটি অপূরণীয়। কেবল কবিতা চর্চার অনুপ্রেরণা হিসেবেই নয়, 'জীবনের প্রতিটি বাঁকে, সুখে ও বিরহে' কুসুমকুমারী ছিলেন 'তাঁর শ্রেষ্ঠ অবলম্বন'। 'বন্ধু-মনোভাবাপন্ন ও স্নেহময়ী মা' সন্তানকে 'জীবন ও পরিপার্শ্ব কী ভাবে দেখতে হয়, সংসারে মানুষকে কেমন করে অনুভব ও আয়ত্ত করতে হয়' সবই শিখিয়েছিলেন। প্রাপ্তবয়স্ক জীবনানন্দের সংসারে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা সকলেই আছে, ভাই-বোনেরাও আছে সাথে পাশে, তবুও মায়ের চলে যাওয়ার যন্ত্রণাটা কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। বৃষ্টিস্নাত শীতের রাতে (কেওড়াতলা) শ্মশানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ছেন। চোখে জল নিয়ে ঠাঁই দাড়িয়ে থাকছেন। ভাবছেন মায়ের কথা। বাবার কথা?
ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়ের পাণ্ডব গোয়েন্দার কোনো গল্পই পূর্বে আমি পড়িনি। ভবিষ্যতে আর পড়তেও চাই না। আনন্দমেলায় এগারো মাস ধরে চলা শিরোনামহীন এক পাণ্ডব গোয়েন্দা কাহিনি আজই পড়ে শেষ করলাম। এক কথায় বললে, তৃতীয় শ্রেণীর (পড়ুন থার্ড ক্লাস) লেখা। অশীতিপর বৃদ্ধ হরিদ্বার তীর্থ সেরে ভ্রমণকাহিনী লিখতে চেয়েছিলেন, হয়তো। 'দেশ' পাত্তা দেয়নি। তাই 'পাণ্ডব গোয়েন্দা'কে অবলম্বন করে আনন্দমেলার পাঠকদের বারোটা বাজান। এনিড ব্ল্যাইটনের ভূত দেখা দেবে মিনসেকে। কারণ, সাহিত্যের বিচারে কদর্য তো অবশ্যই, আদর্শগত দিক থেকেও পশ্চাদগামী - সংরক্ষণশীল, পুরুষতান্ত্রিক, মধ্যযুগীয় চিন্তাধারায় ভর্তি। সঙ্গমে স্নানের প্রস্তাবের উত্তরে পাণ্ডবপ্রধান বাবলুর আড়ালে লেখক তাঁর মানসিকতা স্পষ্ট করে দেন - "বিলু ভোম্বলকে নিয়ে সঙ্গমেই যাব। মেয়েরা বরং ঘরেই থাকুক।' বাচ্চু, বিচ্ছু ছাড়াও একাধিক নারীচরিত্রকে কাহিনিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা দিয়েছেন ঠিকই - তাদের অনেকে আবার চারিত্রিক দৃঢতা এবং অসম সাহসিকতার সফল ও ব্যর্থ দুই'ই দৃষ্টান্ত রেখেছে - কিন্তু সকলকেই (এমনকি দুর্ভাগ্যজনকভাবে খুদে বালিকা পাঠকাদেরও) পদে পদে লেখক (বাবলু মারফৎ) বুঝিয়ে দিয়েছেন তারা দ্বিতীয় লিঙ্গের বেশি কিছু নয়। মুখাপেক্ষী, আজ্ঞানুবর্তী, অধীন। কাহিনির ধারাবাহিকতাও নিম্ন মানের। এমন কোনো সংখ্যা (মোট ২২ টি) যায়নি যেখানে চা খাওয়ার উল্লেখ নেই। সুযোগ পেলেই চায়ের ব্যবস্থা। নিরর্থক অনাবশ্যক খুঁটিনাটিতে ভরে দায়সারাভাবে তাড়াহুড়োতে শেষ করা হয়েছে কাহিনি - যদিও তাতে পাঠককুলের মঙ্গলই হয়েছে।
এর চেয়ে ঢের ভালো মাত্র ১২টা সংখ্যাতেই শেষ রুপম চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসিকা 'অশ্বারোহী ঈশ্বর'। রহস্য-রোমাঞ্চ-ইতিহাস-কৌতুক মিশিয়ে আদিবাসী গোষ্ঠীর কিংবদন্তি দেবতা খারমুনকে প্রেক্ষাপটে রেখে লেখা এই কাহিনি যথেষ্ট উপভোগ্য। যদিও এটিও অনেকটা তাড়াহুড়ো করে শেষ করা হল বলে আমার মনে হয়। দেখা যাক পরবর্তী আনন্দমেলা সংখ্যায় নতুন কি বা কি কি ধারাবাহিক শুরু হয়।
Subscribe to:
Posts (Atom)