Friday, 2 April 2021

রামায়ণের গল্প ৫

হরিশ্চন্দ্রের গল্প[১] সকলেরই জানা। মুনি বিশ্বামিত্রের সাথে বাওয়ালি মারতে গিয়ে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। কিন্তু তার সূত্রপাত কোথায়, সম্ভবত অনেকেই সেটা জানেন না। বলি তাহলে?

দণ্ডের বংশধর হরিশ্চন্দ্র সূর্যবংশের জনপ্রিয় রাজা। ঘরে সুন্দরী বউ শৈব্যা। ছেলে রুহিদাস। প্রজারা বিন্দাস। মর্ত্যে সবই ঠিকঠাক চলছে, কিন্তু স্বর্গে গোলমাল পাকিয়ে বসলো দেবরাজ ইন্দ্র। কাম-ধান্দায় খোলামকুচি, সাহেবিয়ানায় ষোলোআনা। রোজকার মতো স্বর্গপুরীর রাজসভায় নাচ-গান চলছে। সিংহাসনে বসে বসে ঝিমোচ্ছে ইন্দ্র। তবে পাঁচজন যুবতী নাচনেওয়ালি, থুড়ি, নাচুনে...না না ফের থুড়ি, নর্তকীদের জোশে কিছুমাত্র খামতি নেই। বরঞ্চ উল্টো - সময় যত গড়াচ্ছে তাদের গতরের দোলন-কোদনও তত বাড়ছে। হঠাৎ তাল গেল বিগড়ে। চোখ এড়ালো না ইন্দ্রের। অমরাবতীর পুরন্দরের সামনে তালভঙ্গ চাট্টিখানিক কথা নয়। শাস্তি নিশ্চিত। অভিশাপ আসন্ন।

বিশ্বামিত্র মুনির তপোবনে নির্বাসিত হল অভিশপ্ত পাঁচজন নর্তকী। মাঝে কান্নাকাটি করায় অভিশাপ ভাঙার উপায় বলে দেয় ইন্দ্র। রাজা হরিশ্চন্দ্র এসে একবার দেখা দিলেই মুক্তি।

এবার ঝাঁজাল চাটু থেকে জ্বলন্ত আখায় পড়ার পালা। বিশ্বামিত্রের তপোবনের রীতি-রেওয়াজ কিছুই নর্তকীদের জানা নেই! মনের আনন্দে তারা সেখানে ডাল ভাঙে, ফুল তোলে। তাদের আন্দাজ নেই বিশ্বামিত্র এইসব তামাশা দেখলে যারপরনাই ভড়কে যাবে। 

হলও সেই। সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে বনে ঢুকে মুনি বিশ্বামিত্র দেখে তার সখের তপোবন তোলপাড় করে রেখেছে মেয়েগুলো। এখন বিশ্বামিত্রের পালা অভিশাপ দেওয়ার । তবে ঠিক অভিশাপ না, বুড়ো বেছে নিল ভেল্কিবাজি। মেয়েরা ফুল তুলতে এলে তাদেরকে ছুমন্তর করে গাছের লতাপাতা দিয়ে বেঁধে ফেলল। মেয়েগুলোকে জব্দ করে আহ্লাদে আটখানা বিশ্বামিত্র! তাদের বাঁধা অবস্থাতে রেখেই, সাথে বেশ কয়েক ফাউ ভালোমন্দ শুনিয়ে নিজের কাজে চলে গেল সে।

মেয়েদের পর এবার হরি আসবে বিশুকে খ্যাপাতে। একদিন বিশ্বামিত্রের বনে শিকার করতে আসে হরিশ্চন্দ্র। শিকার মেলে কচু। অবশেষে ব্যর্থ, ক্লান্ত হরিশ্চন্দ্র এক গাছতলায় আরাম করতে বসলে কাদের যেন কান্নার আওয়াজ শুনতে পায়। খোঁজ নিয়ে দেখে সেই মেয়েরা আঁটকে আছে। সঙ্গে সঙ্গে তাদের ছাড়িয়ে দেয় হরিশ্চন্দ্র। এক ঢিলে দুই পাখি। বিশ্বামিত্রের বাঁধন থেকেও মুক্তি, ইন্দ্রের অভিশাপ থেকেও রেহাই। মনের আনন্দে চম্পট দেয় মেয়েদের দল। এদিকে রাজা হরিশ্চন্দ্রও নিজ রাজ্যে ফিরে আসে। ঘুণাক্ষরেরও কি তখন টের পেয়েছিল তার সাথে কি হতে চলেছে!


____________________

[১]হরিশ্চন্দ্রের দানধ্যানের দেমাগ দেখে বিশ্বামিত্র তার কাছে গোটা পৃথিবী দাবি করে বসে। প্রতীকী স্বরূপ তিন তোলা (ভরি) মাটি হস্তান্তরিত হলে, কুটিল (এবং কুপিতও - কারণ উপরিলিখিত) বিশ্বামিত্র 'দানের দক্ষিণা' (কন্যাদানের দক্ষিণা যেমন পণ) হিসেবে সাত কোটি স্বর্ণমুদ্রা দাবি করে। দে এবার কোথা থেকে দিবি! ফেঁসে যায় আত্মতুষ্ট হরিশ্চন্দ্র। বৌ-বাচ্চাকে রীতিমতো বিক্রি করে সাত কোটি সোনা জোগাড় করতে হয় তাকে। বারাণসীর ঘাটে মড়া পুড়িয়ে, এঁটোকাঁটা খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছিল। সাধের নামও গিয়েছিল পাল্টে - হরিশ্চন্দ্র থেকে হরিদাস। এখানেই দুর্দশা শেষ হয়ে যায়নি। বৌ শৈব্যা ছেলে রুহিদাসকে নিয়ে এক ব্রাহ্মণের ঘরে ঝিয়ের কাজ করতো। রুহিদাস একদিন বনে ফুল তুলতে গেলে সাপের কামড় খেয়ে বেঘোরে মারা পরে। গরীবের মড়া পোড়াতেও ঝামেলা। শ্মশানের ডোম ৫০ কাহন (৪ কাহনে ১ টাকা) দাবি করে। ডোম আর কেউ না, স্বয়ং রাজা হরিশ্চন্দ্র ওরফে হরিদাস। পূর্বস্মৃতি ধুয়ে-মুছে একাকার। শৈব্যার কাকুতিতে অবশেষে জ্ঞান ফেরে। মা-বাবা মড়া সন্তান নিয়ে আগুনে ঝাঁপ দিতে যায়। ফাঁপরে পড়ে ধর্মরাজ (ইন্দ্র না, যম) মধ্যস্থতা করে। রুহিদাসের প্রাণ ফিরে আসে। ঘটনাটা রাষ্ট্র হলে, চাপে পড়ে বিশ্বামিত্র হরিশ্চন্দ্রকে তার রাজ্যশাসন ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। হ্যাপি এন্ডিং।

Saturday, 27 February 2021

রামায়ণের গল্প ৪

যুবনাশ্ব গেল। তার দশ পুরুষ পেরিয়ে এলো দণ্ড - যার নামে হবে দণ্ডকারণ্য। মহাশয় কৃতিত্বে যুবনাশ্বেরও এক কাঠি উপরে। দণ্ডের বাপ, নাম আবার খাণ্ড, একদিকে প্রজাপালনে ব্যস্ত; অন্যদিকে তার গুণধর বেটা প্রজাদের যুবতী মেয়েদের ধরে ধরে বলাৎকারে মত্ত। প্রজারা সাহস করে অভিযোগ জানালে রাজা খাণ্ড বুকে পাথর রেখে দণ্ডের জন্য চরম শাস্তির ব্যবস্থা করে। কি শাস্তি? বিয়ে! রাম রাজত্ব এখনো আসেনি। প্রজারা ভড়কে উঠতে পারে। তাই আগেই নির্বাসনের অজুহাত দেখিয়ে ছেলেকে বনে পাঠিয়ে দেয় রাজা। টাকা-পয়সা ইত্যাদির ব্যবস্থা করাই ছিল। বনে গিয়ে দণ্ড নগর প্রতিষ্ঠা করে নিজের নামে তার নাম রাখে দণ্ডকারণ্য। তাহলে, দশরথের আগেও ছেলেকে বনে পাঠানোর রেকর্ড আছে সূর্য বংশে।

ছেলে যতই লম্পট বলাৎকারী হোক, তাকে তো আর দূরে সরিয়ে দেওয়া যায় না। মেয়ে হলে না হয় পুড়িয়ে মারা যেত, কিন্তু ছেলে হল বংশের প্রদীপ। তাই বংশের প্রদীপ যেন নিভে না যায়, সে কথা ভেবেই ছেলের আগে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল খাণ্ড। যদিও দণ্ডের সলতে থেকে চুইয়ে পড়া তেল কোন প্রদীপের আলো হয়ে জ্বলে উঠবে তা আন্দাজ করতে পারেনি সে।

বনে গিয়েও দণ্ডের বলাৎকারের লিপ্সা ষোলোআনা বজায় থাকে। শুধু জুটলেই হলো। জুটেও গেল।

দণ্ডকারণ্যে শুক্র মুনির আশ্রম। পড়াশোনার আছিলায় প্রায়ই আশ্রমে ঢুঁ মারে দণ্ড। আসল ধান্দা মুনির মেয়ে অব্জা। সেরকমই একদিন, শুক্র মুনি তপস্যায় বেরোলে, আশ্রমে হানা দেয় দণ্ড। তখন ফুল তুলতে ব্যস্ত ছিল মুনির মেয়ে। তাকে দেখামাত্র জড়িয়ে ধরতে যায় দণ্ড। প্রথমে ভাই পাতানোর বৃথা চেষ্টা চালায় অব্জা। তাতেও নিস্তার না পেলে, নিরুপায় হয়ে, বাবার কাছে প্রথমে অনুমতি নিয়ে তাকে বিয়ে করতে অনুরোধ জানায় সে। শাস্ত্রে আছে, বিয়ে করলে বলাৎকার বৈধ।

কিন্তু কে কার কথা শুনে? অব্জাকে বলাৎকার করে দণ্ড। বিজেপি পাঠকদের জন্য - মানবজাতির আদিপিতা সপ্তর্ষির এক ঋষি শুক্রের অসহায় নিষ্পাপ মেয়েকে আঁচড়ে খামচে রক্তাক্ত করে দিন-দুপুরে বলাৎকার করে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের পূর্বপুরুষ দুষ্কর্মা দণ্ড। তবে মেরে ফেলতে পারেনি, মেরে ফেললে রাম জন্মাতো কি করে!

শুক্রমুনির কানে খবর যাওয়া মাত্র ডাক পড়লো দণ্ডের। এবার অভিশাপের পালা। আহত বাবা মেয়ের বলৎকারীকে নির্বংশ হওয়ার অভিশাপ দেয়। ডেকে এনে অভিশাপ দেওয়ার কি দরকার ছিল ভাবছেন তো? ঘরে বসেই তা দিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু কোপানলে ভস্মীভূত করতে গেলে আগে টার্গেটকে তাকে আনতে হয়। সেই ফাঁকে উপরি কিছু ভৎসনাও করে দেওয়া যায় আর কি।

শুক্রের কোপানলে মুহূর্তে পুড়ে ছাই হয়ে যায় দণ্ড। ছাই হয় তার সখের দণ্ডকারণ্য নগরও। বেঁচে থাকে শুধু নামটি, আর সেই নামের অরণ্য।

নির্বংশ হয়ে দণ্ড মারা পড়লে অযোধ্যার সিংহাসনে বসেন শুক্রেরই ভাই বশিষ্ঠ। বশিষ্ঠ হল গিয়ে ঋষি মানুষ। তপস্যা করাই তার কাজ। রাজ্য শাসন তার কাছে নিছক ঝঞ্ঝাট। তাকে ধর্মসংকট থেকে রক্ষা করলো সেই অব্জাই। একদিন ধ্যান করতে বসে বশিষ্ঠ জানতে পারলো অব্জা পোয়াতি। শুক্রকে খবরটা দিল। দরাজ মনের মানুষ শুক্র তাতে খুশিই হল। মেয়েকে পাঠিয়ে দিল অযোধ্যায়।

অব্জার ছেলে হল। নাম রাখা হল হারীত। হারীতের ছেলে হবে হরিবীজ, হরিবীজের ছেলে হরিশ্চন্দ্র।

Saturday, 13 February 2021

রামায়ণের গল্প ৩

দশরথের বাপ হওয়ার গল্পটা সকলেরই জানা। তার তুলনায় বংশের ওপেনার সূর্যের নাতির নাতি যুবনাশ্বের কেচ্ছা সেভাবে কিন্তু বাজারে রটেনি। পরের বংশধরদের বদনাম থেকে বাঁচাতেই হয়তো তাতে ধামাচাপা দিয়ে দেওয়া হয়। নইলে জনকরাজ তো দূরে থাক, কোশলরাজই সখ করে আর এই বংশে মেয়ের বিয়ে দিতো না।

করেছিলটা কি যুবনাশ্ব? আসলে করলেই ল্যাটা চুকে যেত। না করাতেই যত কেলেঙ্কারি। ঘটনাটা শুরু থেকে বলি - 

অযোধ্যার রাজা হওয়ার পর প্রসন্নের বেটা যুবনাশ্ব কন্দকরাজার কন্যা কালনিমিকে বিয়ে করে। কিন্তু বিয়ে করেই রাজা খালাস। বিছানা নিলেই রাজার ঘুম পেয়ে যায়, আর বেচারি রানি জ্বলে-পুড়ে মরে। অবশেষে আর থাকতে না পেরে লজ্জার মাথা খেয়ে বাবাকে অক্ষম জামাইয়ের অকামবৃত্তির কথা জানিয়ে ফেলে কালনিমি। শুনে প্রেস্টিজে লাগে কন্দকের। মেজাজ খুইয়ে অভিশাপ দিয়ে বসেন জামাইকে।

এদিকে অগাচণ্ডী যুবনাশ্ব বাবা বনতে এক পায়ে খাঁড়া। গুণধরের ইচ্ছে তপস্যা করে সন্তান লাভ করবে। মুনিঋষিরাও খোরাক করতে কিছু কম যায় না। তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে "কি চাও বৎস"-র উত্তরে "বাবা হতে চাই" শুনে প্রথমে তারা মিটিমিটি করে হাসে, দিয়ে হেঁয়ালি করে বলে, স্ত্রীকে সঙ্গে না আনলে আশীর্বাদ দিই কি করে!

শেষমেশ যজ্ঞ করার উপদেশ পায় যুবনাশ্ব। যজ্ঞের জল স্ত্রীকে খাওয়ালে নাকি সন্তান পাক্কা। রাত পর্যন্ত যজ্ঞ করে ক্লান্ত হয়ে পড়ে যুবনাশ্ব। শেষে যজ্ঞের জল মাথার কাছে রেখেই ঘুমিয়ে পড়ে সে। মাঝরাতে জলতেষ্টায় পড়লে তাড়াহুড়োর চোটে যজ্ঞের জল দু ঢোঁক খেয়ে ফেলে।

এবার অভিশাপ ফলবার পালা। যুবনাশ্বের পেট ফুলে ঢোল। সংবাদের শিরোনাম হলে হতো - শ্বশুর করলো জামাইকে পোয়াতি। দশ মাস পর পেটের বাঁদিক ফুঁড়ে বেরিয়ে এল এক পুত্র। যন্ত্রণায় মারা গেলেন রাজা। ব্রহ্মা সদ্যোজাতের নাম রাখলো মান্ধাতা।

সত্যযুগে যত্তোসব, খালি বদনামের বেলায় 'ঘোর কলি'।

Tuesday, 12 January 2021

রামায়ণের গল্প ২

বিশ্বাস করুন নারানের বাই না চাপলে রামায়ণ হতোই না। কাম-ধান্দা নেই একদিন দুম করে শ্রীরামচন্দ্র সেজে বৈকুণ্ঠে বসে আছে। লক্ষ্মীকে বসিয়েছে সীতা সাজিয়ে। একজনকে সোনার ছাতা ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে - সে নিশ্চয়ই লক্ষ্মণ। দুজন ফ্যান ঘুরাচ্ছে - ভরত-শত্রুঘ্ন হবে আর কি। আর একটা হনুমুখো হাত জোড় করে পায়ের কাছে বসে আছে...হনুমানই হবে। এদিকে নারদ শো দেখেই কাৎ। কেঁদে কেটে একাকার। গুরু কি সিন দেখালে মাইরি! নারদের আবার সবকিছু পাঁচকান না করলে পেটে ব্যথা শুরু হয়ে যায়। প্রথমে খবরটা পাড়ে বাপ ব্রহ্মার[১] কাছে। তারপর বাপ-বেটা মিলে পৌছায় শিবের কাছে। প্ল্যান হয় এর ওপর ইহলোকে ফিলিম হোক। কিন্তু তার আগে তো স্ক্রিপ্ট চাই। লিখবে কে? কম খরচে ছোট্টর মধ্যে নামাতে পারবে এরকম লোক চাই। বেদো আর গণশাকে দিয়ে লেখালে বিশাল হ্যাপা হবে, তাই তারা বাদ।

সুপারিশটা আসে শিবের কাছ থেকে। নারদের ভাই মহর্ষি ভৃগুর নাতিটা আজকাল দস্যুবৃত্তি করে বেড়ায়। করবে নাই বা কেন! তার বুড়ো বাপটা যে অশ্বিনীকুমারদের চ্যবন প্রাশ খেয়ে হারানো যৌবন ফিরে পেয়েছে। সারাদিন বৌয়ের সাথে প্রেমপিরীতেই ব্যস্ত। আর এদিকে ছেলে বিগড়ে হুলো বেড়াল। যতই হোক, বংশেরই ছেলে। তাই নারদ আর ব্রহ্মা মিলে ঠিক করে এই চোরকেই ঘষেমেজে সাধু বানাতে হবে। দুর্বৃত্ত রত্নাকরকে মহর্ষি বাল্মীকি বানাতে হবে।


____________________

[১]পৌরাণিক মতে ব্রহ্মা দশটি মানসপুত্রের জন্ম দেয়, যাদেরকে বলা হতো প্রজাপতি। মরীচি, অত্রি, অঙ্গিরা, পুলস্ত, পুলহ, ক্রতুজ, বশিষ্ঠ, দক্ষ, ভৃগু ও নারদ - এই  প্রজাপতিরাই মানবজাতির আদিপিতা। নারদ এদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়। ভৃগু নাতির দৌলতে খ্যাত, দক্ষ খ্যাত নিজের যজ্ঞের জন্য (যেখানে শিব আর সতী নেমন্তন্ন পাননি)। আর এই শেষ তিন প্রজাপতিকে বাদ দিয়ে বাকি সাতজন একসাথে সপ্তর্ষি নামে পরিচিত।

Saturday, 9 January 2021

রামায়ণের গল্প ১

জানিনা ঠিক কোন মালটা - সেকালের বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ, নাকি তাকে ল্যাং মেরে রাজা হওয়া তারই সভাসদ দনুজমর্দ্দন (দত্যিদানো টাইট করেছে, নামেই) গৌড়েশ্বর গণেশ, নাকি পরবর্তী শাসক রুকনউদ্দিন বারবাক শাহ - তবে এদেরই একজনের রাজসভায় ছন্দের কেরামতি দেখিয়ে নাম কামিয়েছিল জনৈক সভাসদ ভৈরব ওঝার ভাইপো, নদীয়ার ফুলিয়াগ্রামের কবি কৃত্তিবাস ওঝা[১]। কিন্তু রাজা তাকে রাজপণ্ডিতের সম্মান দিতে চাইলে, চার মেয়ের বাপ মিনসে কৃত্তিবাস ঢং দেখিয়ে বলে - "কারো কিছু নাহি লই করি পরিহার।/ যথা যাই তথায় গৌরব মাত্র সার।।" তোর ব্যাপার! এদিকে রগড় করতে রাজাও কম যায় না - হাতে ধরিয়ে দিল হাতি পোষার কাজ। "সন্তুষ্ট হইয়া রাজা দিলেন সন্তোক।/ রামায়ণ রচিতে করিলা অনুরোধ।।" আর যায় কুথি, "বাপ মায়ের আশির্বাদ গুরুর কল্যাণ" নিয়ে কৃত্তিবাস ওঝা "রাজাজ্ঞায় রচে গীত সপ্তকাণ্ড গান।"[২]


____________________

[১]বাঙালি ব্রাহ্মণদের আদি নিবাস পূর্বের রাঢ়ভূমি এবং উত্তরের (মালদার) বারিন্দ অঞ্চল। রাঢ়ি এবং বারেন্দ্রি ব্রাহ্মণদের পদবী ঠিক হতো তাদের গ্রাম বা পরগণার নামে। তাই ভাদর গ্রামের ব্রাহ্মণরা পরিচিত হল ভাদুরি নামে (অর্থাৎ পদবীতে), কুশ গ্রামের ব্রাহ্মণরা কুশারি (যা ভবিষ্যতে হবে পিরালী, পরে ঠাকুর), গাঙ্গুল গ্রামের ব্রাহ্মণরা (উপাধ্যায় যোগ করে) পদবী রাখলো গঙ্গোপাধ্যায়। বর্ধমানের চাটুতি পরগণার ব্রাহ্মণদের এক দল যেমন পদবী ঠিক করলো চট্টোপাধ্যায়, তেমনই আরেক দল ঠিক করলো চট্টরাজ। এরকমভাবেই বাঁকুড়ার অম্বিকা পরগণার মুখুটি গ্রামের ব্রাহ্মণদের পদবি মুখুটি - তাতে উপাধ্যায় জুড়ে হয় মুখোপাধ্যায়। এই মুখোপাধ্যায়ের এক দল নদীয়াবাসী হলে পদবী থেকে ভিটা গ্রামের মুখুটি ঝেড়ে ফেলে কেবল উপাধ্যায়টা ধরে রাখে। উপাধ্যায় পরবর্তীকালে লোকমুখে বিকৃত হয়ে হয় ওঝা।

[২]নানা মুনির নানা মত। অনেকের মতে কৃত্তিবাস ওঝা তার গুরু আচার্য দিবাকরের পরামর্শে সাধারণ পাবলিকের কথা ভেবে রামায়ণের পাঁচালী লিখতে শুরু করে; গৌড়েশ্বর করেছিল কেবল পৃষ্ঠপোষণ।

Wednesday, 6 January 2021

রামায়ণের গল্প ০

দশ বছর হতে চললো। কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছি। হাওড়া ষ্টেশনে হঠাৎ বাই চাপায় - গীতাপ্রেসের গুমটি থেকে ১১০ টাকা খসিয়ে (নো ছাড়) কৃত্তিবাসের রামায়ণটা কিনেছিলাম। কিনে অর্ধেকটা পড়েছিলাম - আদিকাণ্ডের অর্ধেকটা, পুরোটার না। তারপর এতদিন অব্দি সেটি আলমারিতে ঢোকানোই ছিল। নতুন বছরে নতুন কিছু করার (রেজুলুশান) জেরেই ঠিক করলাম প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে, দাঁত মেজে, মুখ ধুয়ে, চা খেয়ে...হাগা পেলে হেগে এসে...একটু একটু করে রামায়ণটা পড়বো। পড়ে রাখি - এ'বছর ভোট শেষে রাজ্যে বিজেপি সরকার এলে কাজে দেবে...প্রাণ বাঁচাতে।

তো, পড়া শুরু করে দিয়েছি। বলার অপেক্ষা রাখে না, রামায়ণ শুধু সৎমায়ের মামদোবাজির ফলে বুড়ো বাপের ভীমরতি কিংবা দেওরের দাবড়ানির পরিণতিতে বৌদির বারোটা বাজার গল্পেই সীমাবদ্ধ নেই (হলে, মহাকাব্য বলতো থোড়াই)। রামায়ণের খাঁজে খাঁজে, প্রতি পাতার ভাঁজে ভাঁজে আছে বাম্পার সব গল্প, মনকাড়া ঘটনা আর হাজার হাজার জানা-অজানা খুঁটিনাটি তথ্য। কিছু কিছু বহুকথিত, কিছু কিছু অনেকেই জানেন না। এই যেমন, বাপেরও বাপ নিরঞ্জন, তাঁর তিন বেটা ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। তাদের আবার এক বোনও আছে - কন্দিনী। কন্দিনীর মেয়ে ভানু, ভানুর বেটা মরীচ, মরীচের বেটা কশ্যপ, কশ্যপের বেটা সূর্য - আর এই সূর্যের নামেই সূর্যবংশ - যার ঘরে জন্মাবে শ্রীরামচন্দ্র।

তাই ঠিক করেছি, এক-দুই পাতা করে রোজ রামায়ণ পড়বো আর এরকমই গল্প-ঘটনা-তথ্য...যা বলবেন, আলাদা করে এখানে লিখে রাখবো। ভাষা কেমন হবে আশা করি টের পেয়ে গেছেন। আঘাত পেলে নিজগুণে মাফ করে দেবেন (অথবা ভোটটা বিজেপিকে দেবেন)। 

দেখি, এভাবে এবার কতদিন টানতে পারি!

জয় শ্রী রাম!