হরিশ্চন্দ্রের গল্প[১] সকলেরই জানা। মুনি বিশ্বামিত্রের সাথে বাওয়ালি মারতে গিয়ে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। কিন্তু তার সূত্রপাত কোথায়, সম্ভবত অনেকেই সেটা জানেন না। বলি তাহলে?
দণ্ডের বংশধর হরিশ্চন্দ্র সূর্যবংশের জনপ্রিয় রাজা। ঘরে সুন্দরী বউ শৈব্যা। ছেলে রুহিদাস। প্রজারা বিন্দাস। মর্ত্যে সবই ঠিকঠাক চলছে, কিন্তু স্বর্গে গোলমাল পাকিয়ে বসলো দেবরাজ ইন্দ্র। কাম-ধান্দায় খোলামকুচি, সাহেবিয়ানায় ষোলোআনা। রোজকার মতো স্বর্গপুরীর রাজসভায় নাচ-গান চলছে। সিংহাসনে বসে বসে ঝিমোচ্ছে ইন্দ্র। তবে পাঁচজন যুবতী নাচনেওয়ালি, থুড়ি, নাচুনে...না না ফের থুড়ি, নর্তকীদের জোশে কিছুমাত্র খামতি নেই। বরঞ্চ উল্টো - সময় যত গড়াচ্ছে তাদের গতরের দোলন-কোদনও তত বাড়ছে। হঠাৎ তাল গেল বিগড়ে। চোখ এড়ালো না ইন্দ্রের। অমরাবতীর পুরন্দরের সামনে তালভঙ্গ চাট্টিখানিক কথা নয়। শাস্তি নিশ্চিত। অভিশাপ আসন্ন।
বিশ্বামিত্র মুনির তপোবনে নির্বাসিত হল অভিশপ্ত পাঁচজন নর্তকী। মাঝে কান্নাকাটি করায় অভিশাপ ভাঙার উপায় বলে দেয় ইন্দ্র। রাজা হরিশ্চন্দ্র এসে একবার দেখা দিলেই মুক্তি।
এবার ঝাঁজাল চাটু থেকে জ্বলন্ত আখায় পড়ার পালা। বিশ্বামিত্রের তপোবনের রীতি-রেওয়াজ কিছুই নর্তকীদের জানা নেই! মনের আনন্দে তারা সেখানে ডাল ভাঙে, ফুল তোলে। তাদের আন্দাজ নেই বিশ্বামিত্র এইসব তামাশা দেখলে যারপরনাই ভড়কে যাবে।
হলও সেই। সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে বনে ঢুকে মুনি বিশ্বামিত্র দেখে তার সখের তপোবন তোলপাড় করে রেখেছে মেয়েগুলো। এখন বিশ্বামিত্রের পালা অভিশাপ দেওয়ার । তবে ঠিক অভিশাপ না, বুড়ো বেছে নিল ভেল্কিবাজি। মেয়েরা ফুল তুলতে এলে তাদেরকে ছুমন্তর করে গাছের লতাপাতা দিয়ে বেঁধে ফেলল। মেয়েগুলোকে জব্দ করে আহ্লাদে আটখানা বিশ্বামিত্র! তাদের বাঁধা অবস্থাতে রেখেই, সাথে বেশ কয়েক ফাউ ভালোমন্দ শুনিয়ে নিজের কাজে চলে গেল সে।
মেয়েদের পর এবার হরি আসবে বিশুকে খ্যাপাতে। একদিন বিশ্বামিত্রের বনে শিকার করতে আসে হরিশ্চন্দ্র। শিকার মেলে কচু। অবশেষে ব্যর্থ, ক্লান্ত হরিশ্চন্দ্র এক গাছতলায় আরাম করতে বসলে কাদের যেন কান্নার আওয়াজ শুনতে পায়। খোঁজ নিয়ে দেখে সেই মেয়েরা আঁটকে আছে। সঙ্গে সঙ্গে তাদের ছাড়িয়ে দেয় হরিশ্চন্দ্র। এক ঢিলে দুই পাখি। বিশ্বামিত্রের বাঁধন থেকেও মুক্তি, ইন্দ্রের অভিশাপ থেকেও রেহাই। মনের আনন্দে চম্পট দেয় মেয়েদের দল। এদিকে রাজা হরিশ্চন্দ্রও নিজ রাজ্যে ফিরে আসে। ঘুণাক্ষরেরও কি তখন টের পেয়েছিল তার সাথে কি হতে চলেছে!
____________________
[১]হরিশ্চন্দ্রের দানধ্যানের দেমাগ দেখে বিশ্বামিত্র তার কাছে গোটা পৃথিবী দাবি করে বসে। প্রতীকী স্বরূপ তিন তোলা (ভরি) মাটি হস্তান্তরিত হলে, কুটিল (এবং কুপিতও - কারণ উপরিলিখিত) বিশ্বামিত্র 'দানের দক্ষিণা' (কন্যাদানের দক্ষিণা যেমন পণ) হিসেবে সাত কোটি স্বর্ণমুদ্রা দাবি করে। দে এবার কোথা থেকে দিবি! ফেঁসে যায় আত্মতুষ্ট হরিশ্চন্দ্র। বৌ-বাচ্চাকে রীতিমতো বিক্রি করে সাত কোটি সোনা জোগাড় করতে হয় তাকে। বারাণসীর ঘাটে মড়া পুড়িয়ে, এঁটোকাঁটা খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছিল। সাধের নামও গিয়েছিল পাল্টে - হরিশ্চন্দ্র থেকে হরিদাস। এখানেই দুর্দশা শেষ হয়ে যায়নি। বৌ শৈব্যা ছেলে রুহিদাসকে নিয়ে এক ব্রাহ্মণের ঘরে ঝিয়ের কাজ করতো। রুহিদাস একদিন বনে ফুল তুলতে গেলে সাপের কামড় খেয়ে বেঘোরে মারা পরে। গরীবের মড়া পোড়াতেও ঝামেলা। শ্মশানের ডোম ৫০ কাহন (৪ কাহনে ১ টাকা) দাবি করে। ডোম আর কেউ না, স্বয়ং রাজা হরিশ্চন্দ্র ওরফে হরিদাস। পূর্বস্মৃতি ধুয়ে-মুছে একাকার। শৈব্যার কাকুতিতে অবশেষে জ্ঞান ফেরে। মা-বাবা মড়া সন্তান নিয়ে আগুনে ঝাঁপ দিতে যায়। ফাঁপরে পড়ে ধর্মরাজ (ইন্দ্র না, যম) মধ্যস্থতা করে। রুহিদাসের প্রাণ ফিরে আসে। ঘটনাটা রাষ্ট্র হলে, চাপে পড়ে বিশ্বামিত্র হরিশ্চন্দ্রকে তার রাজ্যশাসন ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। হ্যাপি এন্ডিং।
No comments:
Post a Comment