রিচার্ড স্টোকস নামে একজন প্রতিষ্ঠিত ইংরেজ ব্যবসায়ী কর্মসূত্রে একসময় ভারতবর্ষে আসেন। ব্যবসার কাজকর্ম সব মেটানোর পর দেখেন হাতে আরও একটা দিন অতিরিক্ত থাকছে। আবার সেই দিনই পড়েছে ওনার জন্মদিন। সঙ্গে স্ত্রীও এসেছেন। তাই ঠিক করলেন আগামী দিনটি নয়াদিল্লীতে কাটিয়েই দেশে ফিরবেন। বয়স তো আর কম হল না। এবার না হয় পূর্বপুরুষদের প্রিয় উপনিবেশেই জন্মদিনটা কাটুক। কিন্তু এই জন্মদিনই তাকে এক ঐতিহাসিক ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী করে রাখবে, তা তিনি কল্পনাও করেননি।
দিনটি রবিবার। ফেব্রুয়ারী মাস। ক্যালেন্ডারে শীত গেলেও, দিল্লীতে শীত ঋতুটি আরও কিছুদিন থাকবে। তার ওপর আজ ছুটি। ঘোরবার জন্য আদর্শ দিন হলেও স্থানীয় বন্ধুবান্ধবরা জোর করছে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে যাওয়ার জন্য।
খেলাটি যে তার বিশেষ অপছন্দ, তা নয়, তবে বিশেষ পছন্দও নয়। টিকিট কেটে সারাদিন মাঠে বসে থাকার রুচি স্টোকস সাহেবের নেই। ছেলেবেলায় খেলাটি প্রচুর খেলেছেন। এমনকি বাবার সাথে একবার ম্যাচও দেখতে গিয়েছিলেন। ওনার বাবা ছিলেন ক্রিকেটের আসল ভক্ত। কিন্তু ব্যবসাকে জীবিকা করার পর ক্রিকেট মাঠে পা রাখার ফুরসৎ আর কখনও জোটেনি। গিন্নীর তরফ থেকে কোনো প্রতিরোধ না থাকায় শেষমেশ তাকে রাজি হতে হয়।
সাম্প্রতিক ক্রিকেট খেলাটি এদেশে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। স্টোকস সাহেবের ধারনা ছিল, এদেশের লোকেদের কাছে দুটি হুজুগই জনপ্রিয় – এক, রাজনীতি আর দুই, সিনেমা। কিন্তু ১৯৮৩ –এর বিশ্বকাপ জয় আর তেন্ডুলকার নামে এক নাটা ছোকরার কেরামতির দৌলতে ক্রিকেটেরও বাজার এখন রমরমা।
খেলা চলছে ফিরোজ শাহ্ কোটলা মাঠে। টেস্ট ম্যাচের চতুর্থ দিন। ভারত বনাম পাকিস্তান। পাঁচ দিন ধরে খেলা চলেও অনেক ম্যাচ অমীমাংসিত থেকে যায়। কিন্ত এই ম্যাচের ফলাফল অনুমানযোগ্য।
চতুর্থ দিনে চতুর্থ ইনিংস শুরু হয়ে গিয়েছে। পাকিস্তানের সামনে ৪২০ রানের লক্ষ্য। কিন্তু পিচের যা অবস্থা শোনা যাচ্ছে, তাতে মনে হয় না খেলা পাঁচ দিন পর্যন্ত গড়াবে। স্টোকস সাহেব ওই তেন্ডুলকার ছোকরার ব্যাটিং দেখতে পাবেন না বলে একটু হতাশই হলেন। একবার অন্তত দেখতেন, সে কেমন খেলে। শুনলেন নাকি, প্রথম ইনিংসে ৬ আর দ্বিতীয় ইনিংসে ২৯ –এর বেশি রান করতে পারেনি তেন্ডুলকার।
লাঞ্চ পর্যন্ত কোনো উইকেট পড়ল না পাকিস্তানের। খারপ উইকেটেও বেশ ভালোই সংগ্রাম চালিয়ে গেল পাকিস্তানের ওপেনার দুজন। একটা অসম্ভব তথ্য পেয়ে স্টোকস সাহেবের তো চক্ষু চড়ক গাছ। পাকিস্তানের ওই ডানহাতি ওপেনারটি নাকি তিন বছর আগে মাত্র ৩৭ বল খেলে শত রানের গণ্ডি পেরিয়ে ছিল – যদিও ম্যাচটি ছিল সীমিত ওভারের একদিনের খেলা। একবার অ্যাসেজ চলাকালীন লীডস –এ ব্র্যাডম্যান লাঞ্চের আগে শতরান করে হুলুস্থুলু কাণ্ড করে, বাবার মুখে একথা অনেকবার শুনেছেন। কিন্তু এ যে একেবারে লাগামছাড়া কাণ্ড– আধা ঘন্টাতেই কেল্লাফতে।
ভারতীয় বোলারদের দেখে বিশেষ ভক্তি এল না স্টোকস সাহেবের। খাস করে ওই লম্বা স্পিনারটিকে কেমন অস্বস্তিকর লাগলো। স্পিনার কম, ‘স্লো’ ফাস্ট বোলার বেশি। কেমন লাফাতে লাফাতে ছুটে এসে বল করে,ছোড়েও বল বেশ দ্রুত, কিন্তু ঘোরে কই। হ্যাঁ, তবে ছেলেটির একটা জিনিসে অস্বাভাবিক পটুতা আছে –সেটি হল সোজা বল ছাড়ার, যাকে বলে স্ট্যাম্প – টু – স্ট্যাম্প ডেলেভারি। যদিও তাতে কোনো লাভ হয়নি। ছয় ওভার বল করেই ইতিমধ্যে ২৭ রান দিয়ে বসেছে। দেখা যাক ভোজন সম্পন্ন করে কি খেল দেখান মহাশয়।
লাঞ্চের পর সত্যিই মহাশয় খেল দেখাতে শুরু করলেন। বোলারটির পিতৃদত্ত পদবিটা উচ্চারণ করার ইচ্ছে স্টোকস সাহেবের নেই, কিন্তু পরপর দু’দুটো উইকেট পতনের পর স্বতঃস্ফূর্তভাবেই গোটা গ্যালারি থেকেই ভেসে আসছিল – কুম্বলে – কুম্বলে –। হ্যাট্রিক যদিও করতে পারল না, তবুও মাত্র পনেরখানা বল করেই চার-চারটে উইকেট পেয়ে গেল অনিল কুম্বলে। স্টোকস সাহেব বুঝলেন, কেবল বোঁবোঁ করে বল ঘোরানোতে কোনো কৃতিত্ব নেই, তার সাথে চাই লাইন – লেংথ – পিচিং – আরও কত কি। তাছাড়া ওনারই বা অভিজ্ঞতা কতটুকু! কুম্বলের আরও দ্রুত দুটো উইকেট নেওয়ার পরও কি ঘুনাক্ষরে ভেবেছিলেন তিনি নিজে এক বিরল অভিজ্ঞতার অংশীদার হতে চলেছেন।
অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন স্টোকস সাহেব, চটকা ভাঙল ‘জিম’ কথাটা কানে এসে... “কেও কি ‘জিম’ বলে চিৎকার করল”। “জিম’ না, ‘জাম্বো’...”, ভুল সংশোধন করে দিলেন পাশের এক দর্শক। ওই অনিল কুম্বলেরই ডাকনাম ‘জাম্বো’। এই জাম্বোর জন্যই আজ হৈহৈ রব উঠছে স্টেডিয়ামের এখানে সেখানে। কুম্বলে কি দশটা উইকেটই নেবে! এও কি কখনও সম্ভব হয়েছে! ইতিমধ্যে তার সাতটি উইকেট নেওয়া হয়ে গেছে।
সমস্ত স্টেডিয়াম উত্তেজিত। তার মধ্যে কুম্বলে আবার অন – এ – হ্যাট্রিক। হ্যাট্রিক করলেই দশে দশ।
সমস্ত দর্শকের চোখ বাইশ গজে, কিন্তু স্টোকস সাহেবের দৃষ্টি ঘোলাটে। মাথার মধ্যে একের পর এক স্মৃতি ওই কুম্বলের বলের মতো বনবন করে ঘুরছে আর দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে। এ কোন অবিশ্বাস্য ঘটনার সাক্ষী হতে চলেছেন তিনি! প্রায় তিন দশকের ব্যবসায়িক জীবনে কখনও সখ করে মাঠে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে আসেননি। বাবা নিয়ে গিয়েছিল সেই কোন ছেলেবেলায়। তারপর দীর্ঘসময় পর এই-ই স্টেডিয়াম আসা। ঘরের বন্ধুরা কি এই কাকতলীয় ঘটনা বিশ্বাস করবে? পাশের দর্শকটাই কি বিশ্বাস করবে? একাদশ ব্যাটসম্যানটা কি কুম্বলে থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবে? আটকাতে পারবে কুম্বলেকে ইতিহাস গড়ার হাত থেকে? হঠাৎ যেন বাবার মুখে শোনা একটা কথা মনে পড়ল স্টোকস সাহেবের, “জেমস ওয়ালেস বার্ক’ও শেষরক্ষা করতে পারেনি...”। কয়জনই বা পারে? ক্রিকেট ম্যাচে এরকম প্রায়শই হয়ে থাকে যে একজন ব্যাটসম্যান ব্যাপক প্রতিরোধ করেও শেষরক্ষা করতে পারেনা, জয় ছিনিয়ে নেয় প্রতিপক্ষ দল। এই ম্যাচেও না হয় তাই ঘটল। পিচের হাল দেখে এই ম্যাচের ফলাফল তো টসের সময়ই প্রায় নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল – টস জেতো ম্যাচ জেতো। তাই একাদশ ব্যাটসম্যান ওয়াকার ইউনিসের কাছে বিশেষ কিছু আশা করা চলে না। কিন্তু তাকেও কি বাকি নয়জনের মত নিজের উইকেটটা অনিল কুম্বলেকে দিয়ে আসতে হবে? ম্যাচ বাঁচিয়ে শেষরক্ষা করার খেয়াল আকাশকুসুম, কিন্তু উইকেটটা তো অন্য কেও নিতে পারে।
অবশেষে ওয়াকার ইউনিস ধর্মসংকট থেকে রক্ষা পেলেন। কিন্তু বলি হতে হল অপরজনকে। পাকিস্তান ম্যাচ হারলই, তার সাথে অনিল কুম্বলেকে দিয়ে গেল এক ইনিংসেরই দশ দশটা উইকেট। বিশ্বরেকর্ড। স্টোকস সাহেব আবেগে আপ্লুত। জন্মদিনের ভালই উপহার পেলেন। পাশে বসে থাকা স্ত্রীও তার এই উত্তেজনা টের পেয়েছেন। স্ত্রীও উপভোগ করেছে ম্যাচটি। স্টোকস সাহেব উত্তেজনায় পাশের দর্শকটির সাথে গল্প শুরু করে দিলেন, “জানেন, সেই দশ বছর বয়সে বাবার সাথে একবার মাত্র ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলাম, আর এতোদিন পর...”।
ম্যাচ শেষ। দর্শকরা সন্তুষ্ট মনে এবার যে যার বাড়ি ফিরছে...
***
প্রতীকের বাড়ি পুরুলিয়া। সে এসেছে মাসীর বাড়ি দিল্লীর শালিমার বাগে। মাসীর ছেলের সাথে আজ সে প্রথম স্টেডিয়ামে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে যাবে। কোনোওদিন সে স্টেডিয়ামে ক্রিকেট ম্যাচ দেখেনি। কিন্তু আজ মেসোর বদান্যতায় ভি আই পি ব্লকের দুটো টিকিট ওদের জুটেছে। ম্যাচ আবার ভারত-পাকিস্তানের। এই সুযোগ হাতছাড়া করা বোকামো। বলা বাহুল্য প্রতীক ক্রিকেটের পোকা।
এও কি সম্ভব! জীবনে প্রথম স্টেডিয়ামে ম্যাচ দেখা, আর সেই দিনই এক ঐতিহাসিক রেকর্ডের সাক্ষী হয়ে যাওয়া! নিজের ভাগ্যে এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না প্রতীকের। ম্যাচে যে ভারত জয়লাভ করবে, সে জানাই ছিল, কিন্তু তার সাথে এরকম উপহার। অনিল কুম্বলের এক ইনিংসেই দশে দশটা উইকেট। তবে প্রতীকের চেয়েও বড় সৌভাগ্যের উপহারটি পেলেন অন্য আরেক জন – প্রতীকের পাশে বসে থাকা একজন ইংরেজ ভদ্রলোক। সত্যিই, তার সৌভাগ্যের জুড়ি মেলা ভার। লোকটি ‘জিম’ বলে ওঠাতেই প্রতীকের কেমন যেন সন্দেহ হয়েছিল। কুম্বলেকে ভুল ডাকনামে ডাকছেন তাই, “জিম’ না, ‘জাম্বো’...” এই বলে সংশোধনও করে দেয়। কিন্তু ভুল তারই, লোকটি জিম লেকার’ই বলতে চেয়েছিলেন। জিম লেকারের নাম প্রতীক জানে। ইনিই বিশ্বে একমাত্র বোলার যিনি অনিল কুম্বলের অনেক আগেই একই নজির গড়ে গেছেন, এমনকি তার চেয়েও চমকপ্রদ নজির – একটা গোটা টেস্টে ১৯ খানা উইকেট। সময়কাল যদিও তার অজানা। সেই ম্যাচেরও অনেক ভাগ্যবান সাক্ষী ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যেরই একজন যে প্রতীকের সাথে এই ম্যাচেরও সাক্ষী হবে – তা সে কল্পনাও করেনি। রিচার্ড স্টোকস নামে এই ভদ্রলোকটি নাকি জিম লেকারেরও দশটা উইকেটের সাক্ষী। তখন ১৯৫৬ সাল, তিনি নাকি বাবার সাথে ওল্ড ট্রাফোর্ডে ম্যাচ দেখতে গিয়েছিলেন। সেইটিই ছিল তার জীবনের প্রথম ম্যাচ দেখা, আর এই নাকি ৪৩ বছর পর কোটলাতে তার দ্বিতীয় ম্যাচ দেখা। যদিও তিনি প্রতীকের কাছে স্বীকার করেছেন, জিম লেকারের বেশিরভাগ স্মৃতিই এখন আবছা...তবে একটা জিনিস তার বেশ মনে পড়ে গেছে – সেই ম্যাচে কুড়িটির মধ্যে একমাত্র যে ব্যাটসম্যানটি লেকারের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন, তার নাম জেমস ওয়ালেস বার্ক।