Saturday, 27 February 2021

রামায়ণের গল্প ৪

যুবনাশ্ব গেল। তার দশ পুরুষ পেরিয়ে এলো দণ্ড - যার নামে হবে দণ্ডকারণ্য। মহাশয় কৃতিত্বে যুবনাশ্বেরও এক কাঠি উপরে। দণ্ডের বাপ, নাম আবার খাণ্ড, একদিকে প্রজাপালনে ব্যস্ত; অন্যদিকে তার গুণধর বেটা প্রজাদের যুবতী মেয়েদের ধরে ধরে বলাৎকারে মত্ত। প্রজারা সাহস করে অভিযোগ জানালে রাজা খাণ্ড বুকে পাথর রেখে দণ্ডের জন্য চরম শাস্তির ব্যবস্থা করে। কি শাস্তি? বিয়ে! রাম রাজত্ব এখনো আসেনি। প্রজারা ভড়কে উঠতে পারে। তাই আগেই নির্বাসনের অজুহাত দেখিয়ে ছেলেকে বনে পাঠিয়ে দেয় রাজা। টাকা-পয়সা ইত্যাদির ব্যবস্থা করাই ছিল। বনে গিয়ে দণ্ড নগর প্রতিষ্ঠা করে নিজের নামে তার নাম রাখে দণ্ডকারণ্য। তাহলে, দশরথের আগেও ছেলেকে বনে পাঠানোর রেকর্ড আছে সূর্য বংশে।

ছেলে যতই লম্পট বলাৎকারী হোক, তাকে তো আর দূরে সরিয়ে দেওয়া যায় না। মেয়ে হলে না হয় পুড়িয়ে মারা যেত, কিন্তু ছেলে হল বংশের প্রদীপ। তাই বংশের প্রদীপ যেন নিভে না যায়, সে কথা ভেবেই ছেলের আগে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল খাণ্ড। যদিও দণ্ডের সলতে থেকে চুইয়ে পড়া তেল কোন প্রদীপের আলো হয়ে জ্বলে উঠবে তা আন্দাজ করতে পারেনি সে।

বনে গিয়েও দণ্ডের বলাৎকারের লিপ্সা ষোলোআনা বজায় থাকে। শুধু জুটলেই হলো। জুটেও গেল।

দণ্ডকারণ্যে শুক্র মুনির আশ্রম। পড়াশোনার আছিলায় প্রায়ই আশ্রমে ঢুঁ মারে দণ্ড। আসল ধান্দা মুনির মেয়ে অব্জা। সেরকমই একদিন, শুক্র মুনি তপস্যায় বেরোলে, আশ্রমে হানা দেয় দণ্ড। তখন ফুল তুলতে ব্যস্ত ছিল মুনির মেয়ে। তাকে দেখামাত্র জড়িয়ে ধরতে যায় দণ্ড। প্রথমে ভাই পাতানোর বৃথা চেষ্টা চালায় অব্জা। তাতেও নিস্তার না পেলে, নিরুপায় হয়ে, বাবার কাছে প্রথমে অনুমতি নিয়ে তাকে বিয়ে করতে অনুরোধ জানায় সে। শাস্ত্রে আছে, বিয়ে করলে বলাৎকার বৈধ।

কিন্তু কে কার কথা শুনে? অব্জাকে বলাৎকার করে দণ্ড। বিজেপি পাঠকদের জন্য - মানবজাতির আদিপিতা সপ্তর্ষির এক ঋষি শুক্রের অসহায় নিষ্পাপ মেয়েকে আঁচড়ে খামচে রক্তাক্ত করে দিন-দুপুরে বলাৎকার করে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের পূর্বপুরুষ দুষ্কর্মা দণ্ড। তবে মেরে ফেলতে পারেনি, মেরে ফেললে রাম জন্মাতো কি করে!

শুক্রমুনির কানে খবর যাওয়া মাত্র ডাক পড়লো দণ্ডের। এবার অভিশাপের পালা। আহত বাবা মেয়ের বলৎকারীকে নির্বংশ হওয়ার অভিশাপ দেয়। ডেকে এনে অভিশাপ দেওয়ার কি দরকার ছিল ভাবছেন তো? ঘরে বসেই তা দিয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু কোপানলে ভস্মীভূত করতে গেলে আগে টার্গেটকে তাকে আনতে হয়। সেই ফাঁকে উপরি কিছু ভৎসনাও করে দেওয়া যায় আর কি।

শুক্রের কোপানলে মুহূর্তে পুড়ে ছাই হয়ে যায় দণ্ড। ছাই হয় তার সখের দণ্ডকারণ্য নগরও। বেঁচে থাকে শুধু নামটি, আর সেই নামের অরণ্য।

নির্বংশ হয়ে দণ্ড মারা পড়লে অযোধ্যার সিংহাসনে বসেন শুক্রেরই ভাই বশিষ্ঠ। বশিষ্ঠ হল গিয়ে ঋষি মানুষ। তপস্যা করাই তার কাজ। রাজ্য শাসন তার কাছে নিছক ঝঞ্ঝাট। তাকে ধর্মসংকট থেকে রক্ষা করলো সেই অব্জাই। একদিন ধ্যান করতে বসে বশিষ্ঠ জানতে পারলো অব্জা পোয়াতি। শুক্রকে খবরটা দিল। দরাজ মনের মানুষ শুক্র তাতে খুশিই হল। মেয়েকে পাঠিয়ে দিল অযোধ্যায়।

অব্জার ছেলে হল। নাম রাখা হল হারীত। হারীতের ছেলে হবে হরিবীজ, হরিবীজের ছেলে হরিশ্চন্দ্র।

Saturday, 13 February 2021

রামায়ণের গল্প ৩

দশরথের বাপ হওয়ার গল্পটা সকলেরই জানা। তার তুলনায় বংশের ওপেনার সূর্যের নাতির নাতি যুবনাশ্বের কেচ্ছা সেভাবে কিন্তু বাজারে রটেনি। পরের বংশধরদের বদনাম থেকে বাঁচাতেই হয়তো তাতে ধামাচাপা দিয়ে দেওয়া হয়। নইলে জনকরাজ তো দূরে থাক, কোশলরাজই সখ করে আর এই বংশে মেয়ের বিয়ে দিতো না।

করেছিলটা কি যুবনাশ্ব? আসলে করলেই ল্যাটা চুকে যেত। না করাতেই যত কেলেঙ্কারি। ঘটনাটা শুরু থেকে বলি - 

অযোধ্যার রাজা হওয়ার পর প্রসন্নের বেটা যুবনাশ্ব কন্দকরাজার কন্যা কালনিমিকে বিয়ে করে। কিন্তু বিয়ে করেই রাজা খালাস। বিছানা নিলেই রাজার ঘুম পেয়ে যায়, আর বেচারি রানি জ্বলে-পুড়ে মরে। অবশেষে আর থাকতে না পেরে লজ্জার মাথা খেয়ে বাবাকে অক্ষম জামাইয়ের অকামবৃত্তির কথা জানিয়ে ফেলে কালনিমি। শুনে প্রেস্টিজে লাগে কন্দকের। মেজাজ খুইয়ে অভিশাপ দিয়ে বসেন জামাইকে।

এদিকে অগাচণ্ডী যুবনাশ্ব বাবা বনতে এক পায়ে খাঁড়া। গুণধরের ইচ্ছে তপস্যা করে সন্তান লাভ করবে। মুনিঋষিরাও খোরাক করতে কিছু কম যায় না। তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে "কি চাও বৎস"-র উত্তরে "বাবা হতে চাই" শুনে প্রথমে তারা মিটিমিটি করে হাসে, দিয়ে হেঁয়ালি করে বলে, স্ত্রীকে সঙ্গে না আনলে আশীর্বাদ দিই কি করে!

শেষমেশ যজ্ঞ করার উপদেশ পায় যুবনাশ্ব। যজ্ঞের জল স্ত্রীকে খাওয়ালে নাকি সন্তান পাক্কা। রাত পর্যন্ত যজ্ঞ করে ক্লান্ত হয়ে পড়ে যুবনাশ্ব। শেষে যজ্ঞের জল মাথার কাছে রেখেই ঘুমিয়ে পড়ে সে। মাঝরাতে জলতেষ্টায় পড়লে তাড়াহুড়োর চোটে যজ্ঞের জল দু ঢোঁক খেয়ে ফেলে।

এবার অভিশাপ ফলবার পালা। যুবনাশ্বের পেট ফুলে ঢোল। সংবাদের শিরোনাম হলে হতো - শ্বশুর করলো জামাইকে পোয়াতি। দশ মাস পর পেটের বাঁদিক ফুঁড়ে বেরিয়ে এল এক পুত্র। যন্ত্রণায় মারা গেলেন রাজা। ব্রহ্মা সদ্যোজাতের নাম রাখলো মান্ধাতা।

সত্যযুগে যত্তোসব, খালি বদনামের বেলায় 'ঘোর কলি'।