Friday, 24 August 2018

ঝুলনের জন্য ৪

অঙ্ক বললেই...

Amusement is one of the fields of applied mathematics.
- উইলিয়াম হোয়াইট*
রিক্রিয়েশনাল ম্যাথ (Recreational Math) বা বিনোদনমূলক গণিত সম্পর্কে কি কোনো ধারণা আছে ? অবশ্যই থাকা উচিৎ । বলতে গেলে সকলেরই আছে । এমনকি যারা অঙ্কের ধারেকাছে ঘেঁষতে ভয় পায়, তারাও হয়তো কখনো কখনো অজান্তেই এই জিনিসটি উপভোগ করেছে । আনন্দও পেয়েছে । ব্যাপারটা হল, চাঁদে রকেট ছোড়া কিংবা অলিম্পিয়াড কম্পিটিশনের জন্য কঠিন কঠিন প্রবলেম তৈরি করাই কেবল অঙ্কের কাজ নয় । সাহিত্যের মতো নিপাট আনন্দ দিতেও অঙ্ক রীতিমতো বদ্ধপরিকর । সাধারণের কাছে রিক্রিয়েশনাল ম্যাথ বলতে মূলত অঙ্কের ম্যাজিক, মজার খেলা বা চটজলদি যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ এইসবই বোঝায় । কিন্তু রিক্রিয়েশনাল ম্যাথের পরিধি আরও বড় । এই যেমন, কাটা-কম্পাস-স্কেল ব্যবহার না করে এক টুকরো কাগজকে ভাঁজ করে সামন্তরিক বা রম্বস বানানো, রুবিক্স কিউবের কত ধরণের কম্বিনেশন হতে পারে খুঁজে বের করা, দাবা বা ওথেলোর কয়টি আলাদা আলাদা সম্ভাব্য ফলাফল হতে পারে দেখা, ক্যালেন্ডার না দেখে বার বের করা, আর তার সাথে তো আছেই - অসংখ্য অসংখ্য সংখ্যার অসংখ্য অসংখ্য মজার মজার বৈশিষ্ট্য - কোন সংখ্যাকে 123456789 দিয়ে গুণ করলে সংখ্যাটি উল্টে যায়, কোন সংখ্যার অঙ্কগুলির সমষ্টি সেই সংখ্যাটা নিজেই, কোন সংখ্যাগুলি দিয়ে ত্রিভুজ তৈরি করা যাবে তো কোনগুলি দিয়ে 100-ভুজ ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছুই রিক্রিয়েশনাল ম্যাথের অঙ্গ । বোঝাই যাচ্ছে এর বেশিরভাগ বিষয়বস্তুই সংখ্যাতত্ত্ব (Number theory) থেকে ধার করা এবং কিছু কিছু জিনিস সাধারণস্তরের বীজগণিত, পাটিগণিত আর ইউক্লিডের জ্যামিতির দৌলতে প্রাপ্ত, তবুও মজাতে একটুকুও একঘেয়েমি নেই এখানে । বলতে গেলে, এটাই একমাত্র অঙ্কের জায়গা যেখানে, অঙ্ক 'করতে' হয় কম, দেখতে বুঝতে এবং আনন্দ পেতে হয় বেশি । এছাড়াও এর এক্তিয়ারের মধ্যে আছে ম্যাথামেটিক্যাল পাজল বা ধাঁধা । ধাঁধা বলতে আবার – দাদা দেয় একবার, বৌদি দেয় বারবার – এই ধরণের দাদাগিরিসুলভ গুগলি ভেবে বসার কোনো কারণ নেই । সিরিয়াস কিছু ম্যাথামেটিক্যাল পাজল আছে যেগুলো এখনও কেও সলভ্‌ড করে উঠতে পারেননি । তবে ভবিষ্যতে কেও না কেও অবশ্যই পারবে । বলা যায় না, যে এই লেখাটি পড়ছে সেই হয়তো কোনো একদিন ম্যাজিক স্কোয়ার সলভ বা গোল্ডবাচ কনজেকচার প্রমাণ করে দেবে । একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে রাখি, রিক্রিয়েশনাল ম্যাথকে - স্কুল-কলেজের সিলেবাসের বিরক্তিকর কঠিন এবং বোরিং অঙ্কের থেকে একেবারেই আলাদা - এরকম বলে প্রচার করা হয় ঠিকই ; এমনকি 'সিরিয়াস' ম্যাথ করেন বলে যারা গর্ব করেন, তারা রিক্রিয়েশনাল ম্যাথকে বিশেষ পাত্তা দিতে না চাইলেও, অঙ্কের যেখানেই মজা লোটার জায়গা পাওয়া যাবে রিক্রিয়েশনাল ম্যাথ ঝাঁপিয়ে পড়বে । ইলিপ্টিক কার্ভ বোঝা যাক বা না যাক, ফার্মার শেষ উপপাদ্য উপভোগ করতে দোষ কোথায় ? পল এর্ডশের মতো বড়ো ম্যাথামেটিশিয়ান বলে রেখেছেন, কোলাজ কনজেকচার প্রমাণ করার জন্য অঙ্ক এখনও পর্যন্ত রেডি হয়ে ওঠেনি । কিন্তু কোলাজ কনজেকচার কেবলমাত্র যোগ-ভাগ জানা লোকও সহজেই বুঝে যাবে । রিক্রিয়েশনাল ম্যাথের চর্চা যত এগিয়ে গেছে, সিরিয়াস ম্যাথের অনেক বিষয়বস্তুই রিক্রিয়েশনের অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে । তাই কোনটা বিনোদন আর কোনটা সিরিয়াস অঙ্কের সমস্যা তার পার্থক্য খুঁজে বের করা সত্যিই কঠিন, এবং অবশ্যই বোকামো । মার্টিন গার্ডনার, স্যাম লয়েড, হেনরি ডুডনি এবং আজকালকার অ্যালেক্স বেলো, ম্যাট পার্কারদের সৌজন্যে রিক্রিয়েশনাল ম্যাথ কেবলমাত্র অঙ্কপ্রিয় পাগলদের কাছেই নয়, অঙ্কভীতু বেচারাদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে - সিরিয়াস অঙ্কের মাঠে খেলতে নামার আগে নেট প্র্যাকটিস হিসেবে যা খুবই কার্যকরী ।

ভালোই ভূমিকা হল । এবার আসল বক্তব্যে আসি । এই রিক্রিয়েশনাল ম্যাথের খেলোয়াড় খালি স্বাভাবিক সংখ্যা বা ধনাত্মক পূর্ণ সংখ্যা । শূন্যকেও দলে নেওয়া হয়েছে । এর বাইরে অন্য ধরণের সংখ্যারা এখানে বিশেষ পাত্তা করতে পারে না । জটিল সংখ্যা, মূলদ-অমূলদ, অন্য কোথাও যতই দাদাগিরি দেখাক, এখানে সবাই চুপটি করে বসে থাকে (মাঝেসাঝে ডাক পড়লে হাজির হয় বইকি) – এমনকি স্বাভাবিক সংখ্যার ভাইরাভাই, হাতে একটা করে ‘-’ ধরে থাকা ঋণাত্মক সংখ্যাও এখানে দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক ।

এবার কিছু একটা বিষয় নিয়ে শুরু করা যেতেই পারে । সব বিষয় এক ঝোলায় ভরা সম্ভব নয় (যদি সম্ভবও হতো, তবে অসীম একটা ঝোলার দরকার পড়তো এবং অবশ্যই অসীম সময়েরও) । সব থেকে ভালো হবে নিধিরাম সর্দার দিয়ে শুরু করা যাক - 
সংখ্যাটি হল 3435 । তিন হাজার তিনশো পঁয়ত্রিশ । কি আছে এমন সংখ্যাটিতে ? সংখ্যাটির শেষে 5 আছে, মানে 5 দিয়ে ভাগ যাবে । মানে মৌলিক সংখ্যা নয় । সংখ্যাটির আরও হাজার ধরণের ‘স্পেশালিটি’ উল্লেখ করাই যায়, কিন্তু তাতে আগ্রহ কমবে বই বাড়বে না । যেমন, যদি বলি – একটিমাত্র আইডেমপোটেন্ট এলিমেন্ট আছে এরকম ছয় অর্ডারের কমিউটেটিভ সেমি-গ্রুপের সংখ্যা হচ্ছে 3435, বা ষড়ভুজাকার স্পাইরালের 34-তম সংখ্যাটি হচ্ছে 3435 ! প্রথম উদাহরণের সমস্ত কথাই মাথার উপর দিয়ে গেল, দ্বিতীয়টির শব্দগুলোর আলাদা আলাদা মানে জানা থাকলেও মোটের ওপর কিছুই বোঝা গেল না । আর সেটাই এতক্ষণ ধরে বোঝাতে চাইছি – রিক্রিয়েশনাল ম্যাথ, না হায়ার ম্যাথামেটিক্স, না জ্যামিতি, না বীজগণিত কিছুরই ধার ধরে না । যে জিনিসটি বোঝা যাবে না সে জিনিসটি রিক্রিয়েশনাল ম্যাথের বিষয়ও হবে না । তাই চিন্তা নেই, এরকম অঙ্কভূতের গল্প শুনিয়ে মোটেই ভয় দেখাবো না । তাহলে মজাদার কিছু আছে কি 3435 কে নিয়ে ? অবশ্যই আছে । তবে তার আগে অন্য কিছু হোক ।

মৌলিক সংখ্যা সম্পর্কে ধারণা আছে নিশ্চয়ই ? এবার একটা স্পেশাল মৌলিক সংখ্যার কথা বলি । থুড়ি, একটা না – জোড়া বা যমজ । হ্যাঁ, যমজ মৌলিক সংখ্যা বলেই ডাকা হয় তাদের – twin primes । যেমন – 5 ও 7 কিংবা 11 ও 13 । দুটো পরপর মৌলিক সংখ্যা । তাই যমজ মৌলিক । আচ্ছা, পরপর কই, দুইয়ের পার্থক্য আছে তো । 1 পার্থক্য হলে, তবে না হয় পরপর বলতাম । ঠিকই । কিন্তু দুর্ভাগ্য ! হবে কি করে । যে কোনো মৌলিক সংখ্যার (2 একমাত্র ব্যতিক্রম) এপাশে-ওপাশে দুপাশেই জোড় সংখ্যা । যেমন, 19 এর আগে 18, পরে 20 । তার কারণও আছে । 2 বাদে সমস্ত মৌলিক সংখ্যাই বিজোড় । আর আমরা জানি বিজোড়ের আগে জোড় আবার পরেও জোড় (ভাইস-ভার্সা) । আর জোড় সংখ্যা তো মৌলিক হতে পারে না (কারণ তারা সবসমই 2 দিয়ে ভাগ যাবে), তাই পরপর না ধরে মৌলিক সংখ্যাগুলোর ক্ষেত্রে দুইয়ের পার্থক্যকে 'পরপর' বলে ধরে নেওয়া হয় । তবে একটিমাত্র ক্ষেত্রেই আসল 'পরপর' মৌলিক সংখ্যা পাওয়া যায় । হ্যাঁ ঠিক, 2 ও 3 । এরাই একমাত্র জোড়া মৌলিক সংখ্যা, যাদের পার্থক্য 1 । যাই হোক, এখন এটা ভেবে বসা ভুল হবে যে সব মৌলিক সংখ্যারই একটা করে যমজ ভাই বা বোন থাকবে । মাথা খারাপ । ভাই বা বোন থাকলেই অনেকের নাভিশ্বাস উঠে যায়, তার ওপর যমজ ! যেমন – দুই অঙ্কের সবচেয়ে বড় মৌলিক সংখ্যা 97 কে ধরা যাক, এর পরের মৌলিক সংখ্যা 101 – 4 ঘর দূরে । আর আগেরটা, 89 সে আরও দূরে, 8 ঘর । তো 97-এর কোনো যমজ ভাইবোন নেই ।

এই যমজ মৌলিক সংখ্যা সম্পর্কে দুটো কথা বলি । সংখ্যা যত বাড়তে বাড়তে গেছে যমজ মৌলিক সংখ্যাজোড়ার ঘনত্ব তত কমতে কমতে গেছে । শুরুতে কতই না জোড়ায়-জোড়ায় ভাই বোন । 3 ও 5, 5 ও 7, 11 ও 13, 17 ও 19 । কিন্তু সংখ্যা যত বড়ো হতে থেকেছে তত যমজ মৌলিকের সংখ্যা কমতে থেকেছে । 1 থেকে 1000-এর মধ্যে 35 জোড়া যমজ মৌলিক সংখ্যা থাকলেও, সেই তুলনায় 1 থেকে 10000-এর মধ্যে বেশ কম যমজই আছে - 205 টি । একটু আলাদা ধরণের উদাহরণ দেওয়া যাক । একটু সামলে, কেমন !

2006 সালে মাইকেল কক নামে একজন ম্যাথামেটিশিয়ান Twin Prime Search নামে (সংক্ষেপে TPS) একটি কম্পিউটার নির্ভর প্রোজেক্ট চালু করেন । ভদ্রলোকেদের ভাষায় সেটিকে ডিস্ট্রিবিউটেড কম্পিউটিং প্রোজেক্ট বলা হয়ে থাকে । বড়ো বড়ো যমজ মৌলিক সংখ্যা খুঁজে বের করাই এই প্রোজেক্টের একমাত্র কাজ । TPS-এর প্রথম সাফল্য আসে 2007 সালের 15ই জানুয়ারি । এরিক ভচিয়ের নামে কেও একজন কম্পিউটার এক্সপার্ট 58711 অঙ্ক লম্বা দুটি যমজ মৌলিক সংখ্যা খুঁজে বের করেন । গোটা সংখ্যাটি লেখা অসম্ভব । সূচকের সৌজন্যে সংখ্যাদুটির ভদ্র-সভ্য রূপটি হচ্ছে  । দুই বছর পর TPS-এর দল তার চেয়েও বড়ো দুটি যমজ জোড়া খুঁজে পায় । সেটি হল  এবং এটির অঙ্কের সংখ্যা দাঁড়ায় 100355 । আগেরটি থেকে এটি কত বড়, তা সহজেই আন্দাজ করা যায় । (পরবর্তীকালে এই দুই জোড়া যমজের মাঝে আরও 4 জোড়া যমজের খোঁজ পাওয়া গেছে । দেখতে গেলে, তবুও এরা যথেষ্ট দূরে দূরে ছড়িয়ে আছে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই) । এই আজকের তারিখ পর্যন্ত সবচেয়ে বড়ো আবিষ্কৃত যমজ জোড়াটি হচ্ছে  । এটির অঙ্কের সংখ্যা মাত্র 388342 । বিশ্রাম না নিয়ে প্রতি সেকেন্ডে যদি একটি করে অঙ্ক টানা লিখতে লিখতে যায় তবে পুরো সংখ্যাটি লিখতে কম করে 4 দিন 11 ঘন্টা 52 মিনিট 22 সেকেন্ড সময় লাগবে । ভুলে গেলে চলবে না, এখানে যমজ মৌলিকের আলোচনা হচ্ছে । তাই আরও 4 দিন 11 ঘন্টা 52 মিনিট 22 সেকেন্ড লাগবে দ্বিতীয় মৌলিক সংখ্যাটি লিখতে ।

যমজ মৌলিকের ঘনত্বের ঘাটা দেখে অনেকের ধারণা হল যে, একসময় এই যমজ জোড়া শেষ হয়ে যাবে । মৌলিক সংখ্যার কমতি দেখেও হয়তো অনেকের একই জিনিস মনে হয়েছিল । কিন্তু সন্দেহ দানা বাধার আগেই ইউক্লিড প্রমাণ করে দিয়েছিলেন - মৌলিক সংখ্যা অসংখ্য । ইউক্লিড মহাশয় যমজ মৌলিক সংখ্যার ব্যাপারেও ওয়াকিবহাল ছিলেন এবং স্বাভাবিকভাবে তাঁর মনেও প্রশ্ন জেগেছিল - যমজ মৌলিক জোড়ার সংখ্যাও কি অসংখ্য ? দুর্ভাগ্যক্রমে এর কিন্তু তিনি কোনো প্রমাণ দিয়ে যেতে পারেননি । অথচ চাইলেই নতুন নতুন যমজ জোড়া খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, তাই ভেবেচিন্তে ঘোষণা করে দিলেন - হ্যাঁ, যমজ মৌলিক সংখ্যা জোড়াও অসংখ্য । অঙ্কের কোনো বিশেষ পর্যবেক্ষণের যদি প্রমাণ না পাওয়া যায় (তার সাথে সাথে ভুলও প্রমাণ না করা যায়) তবে সেগুলোকে কনজেকচার (conjecture) ঘোষণা করে দেওয়া হয় (বাংলায় বলা হয় অনুমান, কিন্তু এখানে আমরা কনজেকচারই বলবো) ।  বিজ্ঞানে যেটিকে আমরা প্রকল্প (hypothesis) বলে থাকি, অঙ্কে সেটিই হচ্ছে কনজেকচার । এই যেমন ইউক্লিড ঘোষণা করে দিলেন Twin Prime Conjecture । যতদিন না প্রমাণিত হচ্ছে ততদিন সেটিকে কনজেকচারই বলা হবে । প্রমাণিত হয়ে গেলে হয়ে যাবে সূত্র বা উপপাদ্য । আর ভুল প্রমাণ হয়ে গেলে মিলবে লবডঙ্কা ! এইসমস্ত কাণ্ডকারখানা খ্রিস্টের জন্মের 200-300 বছর আগের ঘটনা । দু'হাজারের বেশি বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো ম্যাথামেটিশিয়ানই এখনও পর্যন্ত টোয়াইন প্রাইম কনজেকচারের প্রমাণ দিতে পারেননি, ভুল প্রমাণ করতেও পারেননি ।

তাহলে রিক্রিয়েশনাল ম্যাথ সম্পর্কে ধারণা স্পষ্ট হচ্ছে ? এবার তাহলে 3435-এর গল্পে আসা যাক । আচ্ছা, কোনো সংখ্যার প্রত্যেকটি অঙ্কের ঘাতে (বা পাওয়ারে) সেই অঙ্কগুলি চাপিয়েই তাদের যোগফল বের করলে কি পাব ? উদাহরণ দেওয়া যাক । 123 সংখ্যাটি নেওয়া হল । 1 এর ঘাতে 1 চাপালে হয় , একইভাবে 2 এর ঘাতে 2 এবং 3 এর ঘাতে 3 চাপালে হয় যথাক্রমে  এবং  । এখন তাদের যোগফল নিলে পাব -  = । মজার তো কিছু হল না ! মজার জিনিস হবে যখন 123 এর বদলে 3435 সংখ্যাটি নেওয়া হবে । তখন একইভাবে 3 এর ঘাতে 3, 4 এর ঘাতে 4, ফের 3 এর ঘাতে 3, শেষে 5 এর ঘাতে 5 চাপিয়ে তাদের যোগ নিলে পাব  = , অর্থাৎ সেই সংখ্যাটা নিজেই ! আজব না ? এই ধরণের সংখ্যার একটা নাম দেওয়া হয়েছে – পারফেক্ট ডিজিট টু ডিজিট ইনভ্যারিয়েন্ট (Perfect Digit to Digit Invariant) বা শর্টে পিডিডিই বা PDDE । যদিও এটা একটা টেকনিক্যাল নাম । 2009 সালে নেদারল্যান্ডের একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, ডান ভান বার্কেল, প্রথম এটি লক্ষ্য করেন । তিনি কিন্তু 3435 এর নাম রাখলেন মুঞ্চাওজেন নম্বর । ভেঙে ভেঙে বললে হয় মুন-চাও-জেন (Munchausen Numbers) । এই ‘মুনচাওজেন’ জিনিসটা কি, খায় না মাথায় দেয় ? কোনোটিই নয় । মুনচাওজেন একজন লোকের নাম । তিনি একজন আধা কাল্পনিক আধা বাস্তব আধা মধ্যযুগীয় চরিত্র । নাম ব্যারন মুনচাওজেনের । ‘ব্যারন’ – ইউরোপের এক সম্মানীয় পদ বা উপাধি, আমাদের দেশে যেমন রায়বাহাদুর ইত্যাদি । কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীর সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের সাথে মধ্যযুগীয় ব্যারনের কি সম্পর্ক যে তার নামে নাম রাখতে যাবেন ! তার কারণ জানার আগে একটি সিনেমার কথা বলি ।

সিনেমাটির নাম হচ্ছে দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ ব্যারন মুনচাওজেন ।  1988 সালের সিনেমা । ফ্যান্টাসি । ওই ডন কুইক্‌জোট (অনেকে বলে কিহোতে) বা আমাদের নিধিরাম সর্দার টাইপ ক্যারেকটার । মুখে বড় বড় কথা – এই করেছি সেই করেছি । কিন্তু কারোরই পাত্তা পান না । সকলের কাছে তিনি একজন মামুলি পাগল কিংবা মাতাল । কিন্তু কেও যদি মনোযোগ দিয়ে একবার তার আষাঢ়ে গল্প শুনতে শুরু করে তাহলে বাচ্চারা তো দূরে থাক বুড়োধারিরাও সম্মোহিতের মতো তার কথা বিশ্বাস না করে পারে না । যাই হোক সিনেমার গল্প বলতে বসবো না । তবে এই দৃশ্যটির কথা না বললেই নয় । মোদ্দা কথা ব্যারন মুনচাওজেন অ্যাডভেঞ্চার করে বেরান । এরকমই কোনো এক সময় শত্রুপক্ষের আক্রমণ থেকে বাঁচতে পুরো ঘোড়া সমেত সমুদ্রে ঝাঁপ দেন তিনি । কিন্তু ডুবে যাওয়া তো দূরের কথা, দেখতে পাই আস্ত ঘোড়া সমেত ব্যারন মুনচাওজেন সমুদ্রের ওপর ভেসে উঠেছেন । কি করে ? ব্যারনের একটা লম্বা ঝুঁটি আছে । ব্যারন নিজের ঝুঁটি নিজেই খামচে ধরে নিজেকে জলের নিচ থেকে তুলে আনেন এবং ঝুঁটি ধরে নিজেকে জলের ওপর ভাসিয়েও রাখেন । আষাঢ়ে গল্প বলছিলাম না ! ব্যারন মুনচাওজেনের এই ব্যাপারটা ওই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের মনে ধরে । 3435 এর ক্ষেত্রে প্রত্যেকটা অঙ্ক যেন নিজেদের ঝুঁটি ধরে নিজেদেরকেই তুলে দিয়েছে নিজেদের উপর । এবং তা সত্বেও অপরিবর্তিত রয়েছে – সুরক্ষিত রয়েছে । সে থেকেই মুনচাওজেন নম্বর । বলে রাখি ব্যারন মুনচাওজেনের আসল স্রষ্টা হলেন একজন জার্মান লেখক (বৈজ্ঞানিকও) রুডলফ এরিক রাস্‌প্‌ । অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি তুরস্ক-রাশিয়ার যুদ্ধে এরোনিমাস কার্ল ফ্রেডরিক ফ্রেইহর ভন মুনচাওজেন নামে একজন সত্যিকারের জার্মান ব্যারন রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে যোগ দেন । যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরে লোকজনদের যুদ্ধক্ষেত্রের আষাঢ়ে গল্প বানিয়ে বানিয়ে শোনাতে থাকেন এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন । আর কি, তাকে নিয়েই এরিক রাস্‌প্‌ বই লিখে ফেলেন 'Baron Munchausen's Narrative of his Marvellous Travels and Campaigns in Russia' । সেই থেকেই সিনেমা । সেই থেকেই নম্বর ।

আরেকটি মুনচাওজেন নম্বর আছে । সেটা হল 1 । কারণ 1 এর ওপর 1 চাপলে 1 ই থাকে । আরও কি আছে ? খুঁজতে যাস না । আর একটিও নেই । অবশ্য মুনচাওজেন নম্বর যে হাতে গোনা সীমিত সংখ্যকই আছে, তা ম্যাথামেটিক্যালি প্রমাণিত । তাই বলে মাত্র দুটি ?

অস্ট্রেলিয়ান স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান (লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত এবং প্রাক্তন অঙ্কের শিক্ষক) ম্যাথিউ পার্কার এক অস্বস্তিকর কাজ করে বসলেন । তিনি 438579088 সংখ্যাটিকেও মুনচাওজেন নম্বর ঘোষণা করে দিলেন । প্রশ্ন উঠবে, তিনি ঘোষণা করার কে ? মুনচাওজেনের কেরামতি দেখালে মুনচাওজেন নম্বর হবে, নইলে নয় । তবুও এখানে একটি ছোট্ট সমস্যা থাকছে । লক্ষ্য করলে দেখতে পাব, সংখ্যাটির শতকের ঘরে 0 বসে আছে । 0 এর ঘাতে 0 চাপলে কি হয় আমাদের জানা নেই । অসংজ্ঞাত । 0 বাদে যেকোনো সংখ্যার ঘাতে 0 চাপলে 1 হয় জানি কিন্তু  কখনই হয় না । ম্যাথিউ পার্কার  ধরে নিয়ে দেখিয়ে দিলেন  ।

এবার  হবে, কি হবে না, সে নিয়ে তর্ক চলতে পারে । যদি ধরে নিই সত্যি, তাহলে শেষপর্যন্ত কটি মুনচাওজেন সংখ্যা পাচ্ছি ? তিনটি ? ভুল । আসল কথা তো বলতেই ভুলে গেছি, সিরিয়াস ম্যাথ হোক কিংবা রিক্রিয়েশনাল, উভয়ক্ষেত্রেই চোখ-কান খুলে রাখাটা খুবই জরুরি । 438579088 কিন্তু এখানে একা আসেনি সঙ্গে তার যমজ বোনকেও নিয়ে এসেছে । শূন্য ।  হলে 0 নিজেই একটি মুনচাওজেন নম্বর হয়ে যাচ্ছে । তাই না ?

*A Scrap-Book of Elementary Mathematics বইয়ের লেখক 

Wednesday, 22 August 2018

ঝুলনের জন্য ৩

১৭২৯

Wherever there is number, there is beauty.’

- গ্রীক দার্শনিক প্রোক্লুস*

সালটা 1918 । এক মাস হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে । ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজের অধ্যাপক গডফ্রে হার্ডি ট্যাক্সির অপেক্ষায় আছেন । তাঁর গন্তব্য লন্ডন । ঠিক লন্ডন নয়, লন্ডনের দক্ষিণ-পশ্চিমের ছোট্ট একটি শহর পুটনি । ইন্ট্রোভার্ট, অসামাজিক এবং অকৃতদার হার্ডি কেবলমাত্র দুটো জিনিসেই জীবনকে উৎসর্গ করেছেন - এক ক্রিকেট, দুই অঙ্ক । এর বাইরে অন্য কিছুতে মনোযোগ দেওয়ার সময় এবং ইচ্ছে কোনোটিই তাঁর নেই । তাঁর বন্ধুর সংখ্যাও হাতে গোনা তিন থেকে চারজন । তাদেরই একজন বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ হয়ে পুটনির এক বেসরকারি নার্সিং হোমে ভর্তি আছেন । তাকে দেখতে যাওয়ার জন্যই ট্যাক্সির অপেক্ষা । যদিও হার্ডি এই ধরণের লৌকিকতা থেকে সচরাচর নিজেকে বিরতই রাখেন, কিন্তু এই বন্ধুটির ক্ষেত্রে ব্যাপারটি অন্যরকম ।

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর একটা ট্যাক্সি পাওয়া গেল । ট্যাক্সিতে চাপার আগে হার্ডি চট করে ট্যাক্সির নম্বরটা দেখে নিলেন । 1729 । নম্বরটা তাঁর বিশেষ পছন্দ হল না । সংখ্যার প্রতি অঙ্কের লোকেদের একটা স্বাভাবিক টান বা সংস্কার থাকে (ইংরেজিতে যাকে বলে অবসেশন) । হার্ডিরও ছিল । তাই যেকোনো ধরণের নম্বর দেখা মাত্র তার বিশেষত্ব খোঁজার চেষ্টা করতেন । এখন এই 1729 নম্বরটির কি বিশেষত্ব থাকতে পারে ভাবতে লাগলেন । না, মৌলিক সংখ্যা নয় । এর ঠিক আগের সংখ্যাটি, অর্থাৎ 1728 হচ্ছে 12 এর কিউব । 1729 এর তিনটিমাত্র মৌলিক উৎপাদক আছে - 7, 13 এবং 19 । তাদের সমষ্টি 39...ধ্যাত ! বাজে একটি সংখ্যা । অকারণে, হার্ডি বিরক্ত হয়ে গেলেন । পথে আর 1729 কে নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন মনে করলেন না ।

পুটনির নার্সিং হোমে যে বন্ধুটি ভর্তি আছেন তিনিও অঙ্কের লোক । বাড়ি ভারতবর্ষে । সেখানে অঙ্ক নিয়ে পড়াশোনা কমপ্লিট করার পর টিউশন পড়িয়ে পেট চালাতেন । অবশেষে হার্ডির পৃষ্ঠপোষকতায় কেমব্রিজে আসার সুযোগ পান । ব্যাচেলার ডিগ্রি কমপ্লিট করার পর এখানে থেকেই অঙ্ক নিয়ে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন । কয়েকমাস আগে প্রথম ভারতীয় হিসেবে ট্রিনিটি কলেজের ফেলোশিপ পেয়েছেন । কিন্তু গত একবছর ধরে নানা ধরণের শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন । এই এখন যেমন যক্ষ্মা বাঁধিয়ে বসে আছেন ।

স্বাস্থ্যের খবরাখবর নেওয়ার পর হার্ডি তাঁর বন্ধুকে ট্যাক্সির নম্বরটি জানালেন । বললেন 1729, 'নীরস একটা নম্বর । আশা করি এতে যেন কোনো অশুভ ইঙ্গিত না থাকে ।' সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল, 'না । বরঞ্চ এটি খুবই ইন্টারেস্টিং একটা নম্বর ।' বলতে পারবো না অন্য কেও থাকলে এরকম স্বতঃস্ফূর্ত এবং সাততাড়াতাড়ি উত্তর দিতেন কি না । এমনকি বিরক্ত হয়ে বলতেও পারতেন - আমি এখানে যক্ষ্মায় মরতে চলেছি, আর তুমি বাপু সংখ্যার রস খুঁজে বেরচ্ছো ! কিন্তু অসুস্থ লোকটি আর পাঁচ জন সাধারণ 'অঙ্কের লোক' ছিলেন না । আমেরিকার বিখ্যাত পদার্থবিদ মিচিও কাকু তাঁকে অঙ্ক সহ গোটা বিজ্ঞান জগতের ইতিহাসে সবচেয়ে অদ্ভুত প্রতিভা বলে মনে করেন । হার্ডিরই আরেক বন্ধু এবং সহকর্মী জন লিটিলউডের মতে, 'প্রত্যেক স্বাভাবিক সংখ্যাই তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু' ।  জীবনীকার রবার্ট কানিগেল যাকে একজন 'আর্টিস্ট' এবং সংখ্যাকে যার 'শিল্পের মাধ্যম' বলে পরিচয় দিয়েছেন ('The Man Who Knew Infinity' বইতে) তিনি আর কেও নন, ভারতীয় গণিতের 'পোস্টার বয়' শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার রামানুজন ।

রামানুজন দেখালেন 1729 কে দুটো ভিন্ন উপায়ে দুটি স্বাভাবিক সংখ্যার ঘনফলের (অর্থাৎ কিউবের) সমষ্টি আকারে লেখা যায় । 1 এবং 12 এর কিউবের সমষ্টি (অর্থাৎ 1 + 1728) হল 1729, আবার 9 এবং 10-এর কিউবের সমষ্টিও (অর্থাৎ 729 এবং 1000) 1729 । শুধু তাই নয়, এরকমভাবে লেখা যায় সংখ্যাগুলোর মধ্যে 1729-ই হচ্ছে ক্ষুদ্রতম । 1729-এর চেয়ে ছোটো কোনো সংখ্যাকে দুটো কিউবের সমষ্টি আকারে লেখা তো যাবে, কিন্তু মাত্র একটি উপায়েই - দ্বিতীয় কোনো উপায় খুঁজে পাওয়া যাবে না । সেই দিন থেকে এই 1729 নম্বরটি বিখ্যাত হয়ে রয়েছে রামানুজনের নম্বর হিসেবে । অনেকে আবার হার্ডি-রামানুজনের নম্বরও বলে থাকেন । কোন কোন ক্ষেত্রে ট্যাক্সিক্যাব নম্বরও বলা হয় । যাই হোক, 1729 সংখ্যাটির একটি সরস বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেল ।

হার্ডির দুর্ভাগ্য, তিনি যে সংখ্যাটিকে নিতান্ত 'নীরস', এমনকি 'অশুভ' বলে মনে করলেন, পরবর্তীকালে তারই আরও ডজনখানেক নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য ম্যাথামেটিশিয়ানরা বের করে দিল । পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে নানান অঙ্কের লোকজন - 1729-এর আর কি কি নতুন বৈশিষ্ট্য খুঁজে বের করা যায় - তার কম্পিটিশন শুরু করে দিলেন । অনেকে সফল হলেন । অনেকে আবার আগেই খুঁজে বের করে রেখেছিলেন, জাস্ট দেখিয়ে দিলেন - এই দেখ, এই ধরণের সংখ্যার কথা আমি 300 বছর আগে বলে রেখেছিলাম, 1729 হচ্ছে সেই ধরণের সংখ্যা । কয়েকটির কথা বলা যাক ।

ফরাসি আইনজীবী এবং ম্যাথামেটিশিয়ান পিয়ের দি ফার্মা (অনেকে বলে ফার্মাট্‌) তাঁর এক বন্ধু বার্নার্ড ব্রেসিকে চিঠি মারফৎ একটি নতুন উপপাদ্য উপহার দিলেন । যদি একটি মৌলিক সংখ্যা হয় এবং যেকোনো এর সাথে পরস্পর মৌলিক সংখ্যা হয় তাহলে , দ্বারা বিভাজ্য হবে । যেমন, মৌলিক সংখ্যা 7 এবং 7-এর সাথে মৌলিক একটি সংখ্যা 10 নিলে স্পষ্টই দেখা যাবে অর্থাৎ = 999999 সংখ্যাটি 7 দ্বারা বিভাজ্য হচ্ছে । এই উপপাদ্যটি ফার্মার ছোট্ট উপপাদ্য নামে বিখ্যাত । আচ্ছা, উল্টোটাও কি সত্যি ? যদি দ্বারা বিভাজ্য হয়, তবে কি একটি মৌলিক সংখ্যা হবে ? উত্তর হচ্ছে, না । উদাহরণ হিসেবে হলে, অনেকগুলি সংখ্যা পাওয়া যায় যেক্ষেত্রে , দ্বারা বিভাজ্য হচ্ছে কিন্তু  আদৌ মৌলিক নয় । বেলজিয়ান ম্যাথামেটিশিয়ান পল পুলে 50000000 পর্যন্ত এইধরনের যতগুলি সংখ্যা আছে সবকটি খুঁজে বের করেছিলেন । তাদের মধ্যে ক্ষুদ্রতম সংখ্যাটি হল 341 । কারণ, অর্থাৎ , 341 দ্বারা বিভাজ্য কিন্তু 341 মৌলিক সংখ্যা নয় () । এই ধরণের সংখ্যার নাম দেওয়া হল ছদ্মমৌলিক সংখ্যা (ইংরেজিতে pseudoprime) । কার নামে ? অবশ্যই ফার্মার নামে । যদিও এইসব 1600 শতকের ঘটনা, কিন্তু পরে দেখা গেল 1729 সংখ্যাটিও একটি ফার্মার ছদ্মমৌলিক সংখ্যা হচ্ছে ।

অঙ্কের জগতের আইজ্যাক নিউটন লিওনার্ড অয়লারের নামেও একপ্রকারের ছদ্মমৌলিক সংখ্যা আছে । যে সমস্ত বিজোড় পূর্ণসংখ্যা, (ধরি)  দ্বারা  বিভাজ্য, যেখানে  এবং  পরস্পর মৌলিক, সে সমস্ত বিজোড় পূর্ণসংখ্যাকে অয়লারের ছদ্মমৌলিক সংখ্যা বলে । যেমন 65 একটি ছদ্মমৌলিক সংখ্যা যখন  = 12 । কারণ,  অর্থাৎ , 65 দ্বারা বিভাজ্য । এখানে একটি ব্যাপার লক্ষ্য করার আছে ।  এর একটি বিশেষ মানের জন্য যে সংখ্যাটি ছদ্মমৌলিক হচ্ছে,  এর অন্য মানের জন্য সেটি ছদ্মমৌলিক নাও হতে পারে । যেমন  = 2 এর জন্য 65 ছদ্মমৌলিক নয়, কারণ, -1 বা +1 কোনটিই 65 দিয়ে ভাগ যায় না । ফার্মার ছদ্মমৌলিকের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি প্রযোজ্য । তা স্বত্বেও কিছু কিছু সংখ্যা আছে যারা এই বাঁধা বিপত্তি গ্রাহ্য করে না ।  এর মান যাই হোক না কেন,  দ্বারা,  অবিলম্বে ভাগ চলে যায় । এই বিশেষ ধরণের  গুলির মধ্যে সবচেয়ে ছোটোটি হল 1729 ।

এরপর আমেরিকান ম্যাথামেটিশিয়ান রবার্ট কারমাইকেল মৌলিক সংখ্যা ছেড়ে যৌগিক সংখ্যার ওপর বেশি করে মনোযোগ দিলেন । তিনিও এক ধরণের সংখ্যা খুঁজে বের করলেন । নিজের নামে সংখ্যাগুলির নাম রাখলেন কারমাইকেল সংখ্যা । যে সমস্ত যৌগিক সংখ্যা, (সেই, ধরি)  দ্বারা  বিভাজ্য, যেখানে এবং  পরস্পর মৌলিক সে সমস্ত সংখ্যা হচ্ছে কারমাইকেল সংখ্যা । এখানেও দেখি 1729 ঢুকে বসে আছে । তিন নম্বর কারমাইকেল সংখ্যাটি হচ্ছে 1729 । কারণ, 1729 এর সাথে পরস্পর মৌলিক এরকম সংখ্যাগুলো, অর্থাৎ যেমন 2, 3, 4, 5 ইত্যাদির ঘাতে 1729 চাপিয়ে সেগুলি থেকে যথাক্রমে 2, 3, 4, 5 ইত্যাদি বিয়োগ করে যে সংখ্যাটি পাওয়া যাবে সেটি খোদ 1729 দ্বারা বিভাজ্য ।

খাট বা সোফা জাতীয় কোনো আসবারপত্র ব্যালেন্স করতে আমরা কাঠের কীলক ব্যবহার করে থাকি (কেকের টুকরোর মতো দেখতে, ত্রিভুজাকৃতি ঘনবস্তু) । ইংরেজিতে সেগুলোকে বলে wedge । প্রাচীন গ্রীকে ভাষায় স্পিনিক বলে একটি শব্দ আছে যার মানে এই wedge । এই স্পিনিক কথাটি ব্যবহার করে একধরণের যৌগিক সংখ্যার নামকরন করা হয়েছে । যেসব যৌগিক সংখ্যা তিনটি আলাদা আলাদা মৌলিক সংখ্যার গুণফল তাদের স্পিনিক সংখ্যা বলে । যেমন - 30 (2, 3 ও 5-র গুণফল), 715 (5, 11 ও 13-র গুণফল) ইত্যাদি । আগেই দেখিয়ে দিয়েছি  l তাই 1729-ও একটি স্পিনিক সংখ্যা ।

আরও আছে । জিসল বা জেসল সংখ্যা, হর্ষদ সংখ্যা, 12-ভুজ, 24-ভুজ, 84-ভুজ সংখ্যা ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি সবকটিরই সাধারণ উদাহরণ হচ্ছে 1729 । বোঝাই যাচ্ছে হার্ডির আত্মা এখনও শান্তি পায়নি ! কবে পাবেন ঠিক নেই । কারণ, আরও কত আজব আজব সংখ্যার লিস্টে 1729 জায়গা করে নেবে, তা আগে থেকে কে বলতে পারে (এমনকি অঙ্কের জগত ছাড়িয়ে টিভি সিনেমার জগতেও 1729 পপুলার হয়ে রয়েছে । যেমন জনপ্রিয় আমেরিকার কার্টুন টিভি শো 'ফিউচারামা'র অনেক জায়গাতেই আড়ালে আবডালে 1729-এর উল্লেখ পাওয়া গেছে) ? বলার প্রয়োজনও নেই । কারণ, বিজ্ঞানের রানি অঙ্কের অনিশ্চয়তাই অঙ্কের বিশেষত্ব । 'As far as the laws of mathematics refer to reality, they are not certain; and as far as they are certain, they do not refer to reality.' (আলবার্ট আইনস্টাইন) ।


*প্রোক্লুস না থাকলে বিখ্যাত ‘এলিমেন্টস’ বইটির লেখক যে ইউক্লিড তার ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র পাওয়াই যেত না । প্রোক্লুস তাঁর বই ‘কমেন্টারি অন দ্যা এলিমেন্টস’-এ ইউক্লিডকে ‘এলিমেন্টস’-এর লেখক বলে চিহ্নিত করেছেন ।