কবি শ্রীজাত স্মরণে -
সকাল থেকে ট্রিমারটি খুঁজে পাচ্ছেন না কবি । গেল কোথায় ? মুখভর্তি আগাছাগুলোকে সাফ করতে না পারলে যথারীতি সমস্যায় পড়বেন । ইউরোপ ভ্রমণে এসেছেন, অলরেডি অনেক জায়গা ঘোরাও হয়ে গেছে ; অথচ পোষ্ট দেওয়ার মতো ভালো ছবি তোলা হয়নি । ডি এস এল আরটা ব্যাগে ঢোকাতে ভুলে গিয়েছিলেন - যতই হোক কবি বলে কথা ! তাই বন্ধু দম্পতিকে পইপই করে বলে দিয়েছেন - সঙ্গে ক্যামেরাটা আনতে । তারা যোগ দিলে পম্পেলি ঘুরতে যাবেন । কিন্তু এই দশায় ! কোঁকড়ানো দাড়িগুলি সাধের ফ্রেঞ্চকাটটিকে ফ্যাকাশে করে দিয়েছে । দুই কানের পাশে তুলসী চক্রবর্তী স্টাইলে খাড়া খাড়া চুলগুলি সুড়সুড়ি দিচ্ছে । এই রূপ দেখলে পরে কবিতার শেয়ার কমে যাবে । তাই কবি যথারীতি বিরক্ত হয়ে লিখেই ফেললেন -সময়ে ওষুধ, নইলে বেড়ে যায় সবরকম রোগই...
হ্যাঁ রোগই ! দাড়িগোঁফ বুঝে ফেললে চাটন দিতে শুরু করবে হতচ্ছাড়াগুলো । কনফিউস করে দেওয়ার জন্য সঙ্গে জুড়ে দিলেন -
ভিখ পেতে পেতে তুমি রাজা হয়ে ওঠো, গেঁয়ো যোগী।
এদিকে স্ত্রী সবে ঘুম থেকে উঠেছেন । আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে দেখেন তার কবি-বরটি ঘরময় কি যেন খুঁজে বেড়াচ্ছেন । কিছু একটা আন্দাজ করতে পারায় কবি-পত্নীর কানদুটি হঠাৎ লাল হয়ে ওঠে । ফিসফিসিয়ে বলেন, 'আমার ভ্যানিটি ব্যাগটায় দেখো, সাইডের ছোটো চেনটায় । কথা শোনামাত্র ব্যাগে হুমড়ি খেয়ে পড়েন কবি । কিন্তু ট্রিমারের পরিবর্তে তিন প্যাকেট কন্ডোম আবিষ্কার করায় যারপরনাই রেগে গেলেন তিনি । স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন -
উঠেই নির্দেশ দাও, ধর্মের তলব দিকে দিকে...
স্ত্রীও অবাক হন । 'তবে তুমি খুঁজছোটা কি ?' - উত্তেজিত হয়ে প্রশ্ন করেন । উত্তর পাওয়ার পর ব্যঙ্গ করে বলেন, 'নিজ-স্ত্রীকে ভুলে পরস্ত্রীর জন্য থোবড়া শৌখিন করা হচ্ছে বুঝি ।' কথাটি কাঁটা হয়ে ফোটে । স্ত্রীর ভর্ৎসনাকে ঠাই দেন নিজের কবিতায় । লেখেন -
মৃগয়ায় খুঁজে ফেরো অন্য কোনও ধর্মের নারীকে।
এবার কবি একটু দার্শনিক হলেন । ভাবতে লাগলেন, চুলদাড়ি ইমেজের মাহাত্ম্য । মৃত কোশগুলি নিয়ে কি কেও মাতামাতি করে ? কবির সাফল্যে এদের অবদানই বা কি ? কিন্তু পাবলিকে এই চুল-দাড়িতেই মজে । উস্কোখুস্কো পাখির বাসার মতো চুল, মুখভর্তি কাঁচাপাকা দাড়ি, ন্যাতানো বগলঘামা পাঞ্জাবি, মোটা ফ্রেমের চশমা - এটাই তো গড়পড়তা বাঙালি কবির ডিফল্ট ইমেজ । এই কবির যদিও মাথাভর্তি টাক । তবে সুমনমার্কা নয় । স্টেডিয়ামে কিছু দর্শককে বসিয়ে রাখা হয়েছে । তাই কবির পরিপাটি এই ফ্রেঞ্চকাটটিকে নিয়েই । সেটি দেখেই লোকে চেনে। একে মুছে ফেলা যাবে না । কবি কলম চালালেন -
যে–হরিণ মৃত, তারও মাংসে তুমি চাও অধিকার
এমন রাজত্বে মৃত্যু সহজে তো হবে না তোমার।
ট্রিমার খুঁজে না পাওয়ার হতাশায় কবি দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন ! ফ্রাসট্রেটেড হয়ে এরই মধ্যে খান চারেক সিগারেট শেষ করে দিয়েছেন, গোটা ঘর ছাইয়ে ভর্তি ।
বাতাসে হাপর নামে, দেশ জুড়ে অধর্মের ছাই...
তবে কি রেজারেই কাজ চালাতে হবে ? এই প্রাচীন পদ্ধতি যে তিনি কবেই পরিত্যাগ করেছেন ।
প্রতি নির্বাচনে আমরা শতাব্দীপিছনে ফিরে যাই ।
তাতেও সমস্যা ! কাছে একটি মাত্র ব্লেড । স্ত্রী বলে রেখেছিলেন তিনি সেটি ব্যবহার করবেন । একটা হাতকাটা টপ এনেছেন । সেটি পরতে গেলে ক্লিন আন্ডার-আর্মস চায় । কিন্তু এখন আর তা হচ্ছে না । কবি সপাটে জানিয়ে দিলেন, যে আজ অন্য পোশাকেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে, কারণ তার প্রয়োজনটা আগে ।
যেখানে পুরুষধর্ম ধর্ম-পুরুষের অন্য নাম
আর অপেক্ষা নয় । কবি কাজ শুরু করে দিলেন । মুখে ফোম মাখিয়ে যেই না অস্ত্র চালাতে যাবেন, সেই দিলেন ঘ্যাঁচ করে গালটা কেটে । আর যাই কোথায় !
আর আমি নারীর মৃত্যু পার করেও শিকার হলাম।
'বালের' বলে আর্তনাদ করে উঠলেন কবি । স্ত্রী ছুটে এসে গালে একটা তোয়ালে চেপে ধরলেন । স্বামীর হতাশা ঠাওর করতে পেরে তিনি বললেন, 'ছাড়ো তো, আজও কোথাও বেরনোর ইচ্ছে নেই । ওই অলিগলি ঘুরেই না হয় দিনটা কাটিয়ে দেব । কাল তো ওরা আসছেই...'
অবশেষে স্ত্রীর কথাই মেনে নিতে হল । বেলাটা বিছানাতেই কাটিয়ে দিলেন কবি । কিন্তু পাঠকদেরও তো আর বিছানায় চাপানো যায় না । তাই তাদের মাথা ঘামিয়ে পাণ্ডিত্য ফলানোর জন্য শেষ দু'লাইন ছেড়ে দিলেন -
আমাকে ধর্ষণ করবে যদ্দিন কবর থেকে তুলে –
কন্ডোম পরানো থাকবে, তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে!
(যা বোঝার তোরা বুঝ'গা)
শেষ অবধি একসাথে -
সময়ে ওষুধ, নইলে বেড়ে যায় সবরকম রোগই
ভিখ পেতে পেতে তুমি রাজা হয়ে ওঠো, গেঁয়ো যোগী।
উঠেই নির্দেশ দাও, ধর্মের তলব দিকে দিকে
মৃগয়ায় খুঁজে ফেরো অন্য কোনও ধর্মের নারীকে।
যে–হরিণ মৃত, তারও মাংসে তুমি চাও অধিকার
এমন রাজত্বে মৃত্যু সহজে তো হবে না তোমার।
বাতাসে হাপর নামে, দেশ জুড়ে অধর্মের ছাই...
প্রতি নির্বাচনে আমরা শতাব্দীপিছনে ফিরে যাই।
যেখানে পুরুষধর্ম ধর্ম-পুরুষের অন্য নাম
আর আমি নারীর মৃত্যু পার করেও শিকার হলাম।
আমাকে ধর্ষণ করবে যদ্দিন কবর থেকে তুলে –
কন্ডোম পরানো থাকবে, তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে!
অনুপ্রেরণায় স্বয়ং কবিবর
No comments:
Post a Comment