এক বন্ধু দেখায় যে স্পোর্টসকীড়া নামে খেলাধুলা জগতের একটি ওয়েবসাইটে এলিয়ট করনিস নামে একজন ইংল্যান্ডবাসী ফিচারড রাইটার '5 most selfish acts in the history of ODI cricket' অর্থাৎ 'ওয়ান-ডে (ইন্টারন্যাশনাল) ক্রিকেটের পাঁচটি চরম স্বার্থপর কর্মকাণ্ডের' তালিকা পেশ করেছে । সেই তালিকায় সুনীল গাভাসকার, সচীন তেন্ডুলকর, জাক কালিস এবং ডেভিড ওয়ার্না্রের মতো বিখ্যাত চারজনের সাথে আরেকজনও আছেন, মাইকেল ভ্যানডর্ট, যার ওডিআই ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা সাকুল্যে এক । প্রাথমিকভাবেই ধারণা করা যাচ্ছে, বড় খেলোয়াড়দের নাম ব্যবহার করে একপ্রকার সস্তা চমক দেওয়ার উদ্দেশ্যেই তালিকাটি প্রস্তুত করা হয়েছে । যদিও তালিকার খেসারতে লেখা অনুচ্ছেদে পাঁচজন ব্যাটসম্যানের বিশেষ পাঁচটি ইনিংসকে 'মোস্ট সেলফিস অ্যাক্ট' হিসেবে ধরে ব্যাপারটি আলোচনা করা হয়েছে । ভাগ্যিস ! সম্পূর্ণ ক্যারিয়ারের ভিত্তিতে যদি এই তালিকা বানানো হতো, তাহলে কেবলমাত্র ভূমিকা দেখেই অবিলম্বে ঘোষণা করে দেওয়া যেত - টোটাল রাবিশ !
যদিও এইপ্রকার 'সেলফিস অ্যাক্ট' খোঁজার ধারণাটাই রাবিশ । সে প্রসঙ্গ প্রথমে মুলতুবি রাখা হচ্ছে । তার আগে সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যাক, আলোচ্য পাঁচটি 'মোস্ট সেলফিস অ্যাক্ট' কতটা সেলফিস !
প্রথমে ছোটো থেকে শুরু করা যাক । ২০০৬ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত ভিক্টোরিয়া বিটার বা সংক্ষেপে ভিবি সিরিজের অস্ট্রেলিয়া বনাম শ্রীলঙ্কা প্রথম ম্যাচে শ্রীলঙ্কার ব্যাটসম্যান মাইকেল ভ্যানডর্টের ১১৭ বলে ৪৮ রানের ইনিংসটাকে 'মোস্ট সেলফিস অ্যাক্ট' হিসেবে তৃতীয় স্থানে রাখা হয়েছে । এটিকে নাকচ করার পক্ষে বক্তব্য :
সেই মরশুমে ১২ জনের টিম নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট চলছিল । আইসিসি আন্তর্জাতিক দলের সদস্য সংখ্যা ১১ থেকে বাড়িয়ে ১২ করে দেয়, যেখানে ১১ জন কেবল ব্যাট আর ফিল্ডিং করতে পারবে (এবং বোলিংও, বলাই বাহুল্য) । এই মাইকেল ভ্যানডর্ট ছিলেন সেই ম্যাচে মুথাইয়া মুরলীধরনের রিপ্লেসমেন্ট । জীবনের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামছেন, তাও আবার কখন ! টিম যখন ৩১৮ তাড়া করতে নেমে স্কোরবোর্ডে ২-১ এবং ১০ ওভার পর ৩২-৩ । আউট হয়ে প্যাভিলিয়নে বসে আছেন কুমার সঙ্গকারা এবং ক্রিজের অপর প্রান্তে আছেন অফ ফর্মে থাকা তিলকরত্নে দিলশান । সবার ওপর প্রতিপক্ষ বিশ্বজয়ী অস্ট্রেলিয়া । ভ্যানডর্ট যে ১০০টা বল খেলেছেন এই অনেক ।
অস্ট্রেলীয় ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নারের একটি শতরানের ইনিংসকে পাঁচ নম্বরে স্থান দেওয়া হয়েছে । সালটা ২০১২ । স্থান সেই অস্ট্রেলিয়া । কমনওয়েলথ ব্যাংক ত্রিদেশীয় সিরিজের দ্বিতীয় ফাইনাল (জানিয়ে রাখা উচিৎ, অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত ওয়ান-ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে সাধারণত তিনটি ফাইনাল ম্যাচ খেলা হয়) ।টস জিতে ওপেন করতে নেমে ওয়ার্নার ১৪০ বল খেলে করেন ১০০ রান । স্বার্থপরতার মাপকাঠিতে এটিকেও সহজে অগ্রাহ্য করা যায়, কারণ :
এক, অস্ট্রেলিয়া ১-০ তে ফাইনালে এগিয়ে । দুই, ডেভিড ওয়ার্নার সিরিজে দুর্দান্ত ফর্মে, আগের ম্যাচেই ভরাসদায়ক সেঞ্চুরি করে (১৬৩) ম্যাচ জিতিয়েছেন । তিন, ওই পার্টিকুলার ম্যাচে মাইকেল ক্লার্ক অপরদিকে বিধ্বংসী ব্যাটিং করছেন (এমনকি সিরিজেও ভালো ফর্মে) । চার, পরের ব্যাটসম্যান মাইক হাসির ফর্ম অফ । এমনকি অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটি হেরে গেলেও ওয়ার্নারের এই ৪০ বলের (যদি ধরে নিই ১০০ স্ট্রাইক রেটে রান করলে ওয়ার্নারকে মাফ করে দেওয়া যেত) অপব্যয়কে বিশেষভাবে অভিযুক্ত করার অজুহাত বৃথা, কারণ শ্রীলঙ্কা প্রায় ৩৫ বল হাতে থাকতেই ম্যাচ জিতে নেয় । তাই 'মোস্ট সেলফিস এক্ট' বলাটা বাড়াবাড়ি । নয় কি ?
তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা অল-রাউন্ডার (টেস্ট এবং ওয়ান-ডে উভয় মিলিয়ে) জাক কালিস । তার 'সেলফিস অ্যাক্ট'টি হল ৬৩ বলে ৪৮ রানের একটি ইনিংস । এটিও অবিলম্বে বাদ দেওয়া যায় ।
খেলাটা ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত আইসিসি বিশ্বকাপের গ্রুপ লিগের ম্যাচ । প্রতিপক্ষ অপরাজেয় অস্ট্রেলিয়া । টার্গেট ৩৭৮ ! মেনে নেওয়া হল আগের বছরই ৪৩৪ রান তাড়া করে অবিশ্বাস্য এবং ঐতিহাসিক জয় লাভ করেছে এই টিম । কিন্তু এখানে সিচুয়েশান আলাদা ।এ বি ডিভিলিয়ার্স ও গ্রেম স্মিথ ঝোড়ো ওপেনিং স্টার্ট দিলেও (২০ ওভারে ১৬০), সেই ঝড়েই পাকা ফলের মতো উইকেট পরতে থাকে । তার মাঝে তিন নম্বরে ব্যাট করতে নামা কালিসের ইনিংসটা বিশাল 'সেলফিস এক্ট' !! কালিসের পর বাকি আট জন ব্যাটসম্যানের মোট রান ৫৬, সর্বোচ্চ মার্ক বাউচারের ২২ । ক্রিকেট খেলায় রান করতে গেলে পার্টনারশিপের দরকার হয় । কালিস পার্টনারশিপটা করবে কার সাথে ? এক্সট্রা রানের সাথে ?
এক নম্বরে যাকে রাখা হয়েছে তার ইনিংসের তো কোনপ্রকার আলোচনারই প্রয়োজন নেই । প্রথম ক্রিকেট বিশ্বকাপের (প্রুডেন্সিয়াল কাপ, ১৯৭৫) প্রথম গ্রুপ লিগের ম্যাচে (ওয়ান-ডে নম্বর ১৯!) ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সুনীল গাভাসকারের কুখ্যাত ১৭৪ বলে অপরাজিত ৩৬ রানের ইনিংসটি নাকি স্বার্থপরতার শিরোমণি' । বরঞ্চ সেই ইনিংসের জন্য সুনীল গাভাসকারকে আইসিসি সম্মান দেওয়া উচিৎ ছিল । সেই সময় একটা কথা প্রচলিত ছিল, ইন্ডিয়া ওয়ানডে ম্যাচও ড্র করার জন্য খেলে । তাহলে আইডিয়া করতে অসুবিধে নেই টিমের কেমন অবস্থা ! প্রতিপক্ষ, শক্তিশালী ইংল্যান্ড তাও আবার ঘরের মাঠে । ইন্ডিয়াকে ব্যাট করতে পাঠিয়েছে ৩৩৪ রান তাড়া করতে । সে সময় সেকেন্ডে ব্যাট করে কোনও টিম ৩০০ই তোলেনি তো করবে ৩০০ রান চেজ ! আর কেবল যে গাভাসকারই 'মোস্ট সেলফিস' ওয়েতে ব্যাট করেছেন, যদি পিটিয়ে খেলতেন তো জিতে যেত - তাও নয় । বাকিদের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে - আরেক ওপেনার একনাথ সোলকার করেন ৮ রান ৩৪ বলে, মিডল অর্ডারে বৃজেশ পটেল করেন ১৬ রান ৫৭ বলে । ৬ জন ব্যাটসম্যান তো ব্যাট করতেই নামেনি । ভুলে গেলে চলবে না ক্রিজে দুজন ব্যাটসম্যান থাকে, একজন না ।
সবার শেষে সচীন তেন্ডুলকর । তার শততম শতরানের ইনিংস, হায়রে, 'সেলফিস অ্যাক্টের' ফাঁদে পড়বে, একথা দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করা যায় না । যে খেলোয়াড় দলের হয়ে ৪৫০র ওপর ওয়ান-ডে খেলেছেন (টেস্ট ক্রিকেট বাদ দিয়ে), অসংখ্য ম্যাচ জিতিয়েছেন, দেশের অধিনায়কত্ব সামলেছেন (যদিও তা ধর্তব্যের বাইরে), ক্যারিয়ারের শেষ সময়ে যুবা টিমের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন, তিনিই তার শেষ ওয়ান-ডে ইনিংসে (যদিও না, এরপর আর একটি ম্যাচ খেলেন) করে ফেললেন 'মোস্ট সেলফিস অ্যাক্ট' ! এশিয়া কাপ, ২০১২ । বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ১০০তম ১০০টি সম্পূর্ণ করতে তিনি ১৩৮টি বল ব্যবহার করেন । শেষ ২০ রান করতে প্রায় ৪০টি বল নেন । স্ট্রাইক রেট মেরামত করার আগেই আউট হয়ে যান - স্কোর ১১৪(১৪৭) । বোর্ডে ২৮৯ রান তুলেও ম্যাচটি হেরে যায় ভারত । শেষ ১০০টি করতে সচীনের ৩৪টি ইনিংস লাগে । বয়স তখন ৩৯ । হতাশ সচীন স্বয়ং দায় চাপান মিডিয়ার ওপর । তার কথায়, 'সবাই কেবল ১০০টি সেঞ্চুরির কথা বলাবলি করছে; কেও ভেবেও দেখছে না ৯৯টি সেঞ্চুরি অলরেডি হয়ে আছে ।' ১০০ কোটি মানুষের বোঝা কাঁধে নিয়ে ২৪ বছর ধরে নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন । নিজেই বুঝতে পেরেছেন এবার সরে দাঁড়ানোর সময়, নতুনকে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার সময় । তাই আর দেরি করলে চলবে না । কিন্তু সবাই মুখ চেয়ে বসে আছে ১০০টা ১০০র ! তাই এই 'সেলফিস অ্যাক্টের' দায়বদ্ধতা কেবল সচীনেরই না, তার ভক্তদেরও ।
উপরের আলোচনায় একটা ব্যাপার লক্ষণীয় যে, এলিয়ট করনিসের নির্বাচিত পাঁচটি ইনিংসই ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং ইনিংস এবং সবকটিই হেরে যাওয়া টিম থেকে ! অর্থাৎ,
এক, বোলাররা যে 'সেলফিস অ্যাক্ট' করতে পারে এটি তিনি ধারণাতেই আনছেন না অথবা বোলারদের স্পষ্টভাবে অগ্রাহ্য করছেন ।
দুই, ম্যাচ হারলেই উইচ হান্টিংয়ের মতো স্বার্থপর খোঁজা হয়েছে । গাদাগুচ্ছের উদাহরণ পাওয়া যাবে, যেগুলোকে ঠিক একই মাপকাঠিতে স্বার্থপর বলা চলে কিন্তু সেগুলো ধামা চাপা পড়ে গেছে কারণ অ্যাট দি এন্ড অফ দ্য ডে টিম জিতে গেছে অথবা গোটা টিমই বিচ্ছিরিভাবে ব্যর্থ হয়েছে ।
তিন, মেথডলজিতেও গলদ আছে । কেবলমাত্র স্কোর কার্ড দেখে কি করে বলে দেওয়া যায় স্বার্থপর ? এলিয়ট করনিস বল নষ্ট করার ওপরই একমাত্র জোর দিয়েছেন । একবল খেলেও (এমনকি একটি বল না খেলেও) স্বার্থপরতা দেখানো যেতে পারে । নন স্ট্রাইকে থেকে স্ট্রাইকার ব্যাটসম্যানকে আউট করার নজির অজস্র । খারাপ শট খেলে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উইকেটটাকে বিসর্জন দিয়ে আসা, একপ্রকার স্বার্থপরতার পর্যায়েই পড়ে ।
কি করে ?
কারণ, ভুলে গেলে চলবে না ক্রিকেট একটি দলভিত্তিক খেলা, খেলা চলাকালীন (এমনকি ব্যাটিংয়ের সময়ও) একক খেলোয়াড়ের কোনও অস্তিত্ব নেই । তাই টিম বহির্ভূত চিন্তাভাবনাই স্বার্থপরতা - তাতে নিজের কথা ভাবা হোক বা না হোক । সে বিচারে টেকনিক্যালি সচীনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়ই । আবার জেন্টেলসম্যান গেমের ডকট্রিনকে অগ্রাহ্য করাও চলে না ।
তাহলে কি স্বার্থপরতা বলে কিছু হবে না ?
স্বার্থপরতা বিচার করা, সামগ্রিক সমালোচনারই একটা অঙ্গ । ইতিবাচক, নেতিবাচক উভয় প্রকার সমালোচনার কথা মাথায় রেখেই স্বার্থপরতা বিচারকে সমালোচনার আওতা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়াই ভালো । কারণ স্বার্থপর একটি কঠোর শব্দ । ম্যাচ গড়াপেটা, ডোপিংয়ের মতো কলঙ্কজনক অপকর্ম অলরেডি ক্রিকেটের মর্যাদাকে খর্ব করেছে । টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে । শিল্প এখন একতরফা - ব্যাটিং, বলা ভালো পাওয়ার হিটিং । এর মাঝে যদি স্বার্থপরতার বেনো জল ঢুকে যায় , তাহলে স্বার্থপরতা ক্রিকেটের অঙ্গ এটি একটি বদ্ধমূল ধারণা হয়ে দাঁড়াবে - যেটি কখনই হতে দেওয়া চলে না ।
পুনশ্চ - যদিও ঘা খুঁটে লাভ নেই তবুও প্রসঙ্গ যখন উঠেছে তখন এই অ্যাক্টটির উল্লেখ না করে পারা গেল না । উইলস ওয়ার্ল্ড সিরিজ ১৯৯৪য়ের ভারত বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচে টসে জিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ব্যাট করতে পাঠায় ভারত । ৫০ ওভার সম্পূর্ণ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৫৭ রান করে । ভারত ৪৬ রানে ম্যাচটি হেরে যায় । না অলআউট হয়নি । পুরো পঞ্চাশ ওভারই ব্যাটিং করে ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা (যদিও সাতজন অর্থাৎ ভারতের মাত্র পাঁচ উইকেট পড়েছিল) এবং তাদের মধ্যে সেসময়ের ভারতীয় দলের নির্ভরযোগ্য অল-রাউন্ডার মনোজ প্রভাকর সেঞ্চুরিও করেন । কিন্তু তার জন্য তিনি ১৫৪টি বল ব্যবহার করেন । তাকে সঙ্গত দেন উইকেটকিপার নয়ন মোঙ্গিয়া । তিনি ম্যাচ শেষে অপরাজিত ছিলেন (মনোজ প্রভাকরের সাথে) ৪ রানে, নিয়েছিলেন ২১টি বল । কমই!
No comments:
Post a Comment