Sunday, 15 July 2018

ঝুলনের জন্য ১

জুলিয়ান নাম্বার

গাইয়ুস জুলিয়ুস কাইসার ছিলেন প্রাচীন ইউরোপের একজন নামকরা পলিটিশিয়ান, ডাকসাইটে ঐতিহাসিকও । যদিও গোটা বিশ্বের কাছে একজন মহান শাসক হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিত – বিখ্যাত রোমান সাম্রাজ্যের শাসক । এমনকি সকলে যে নামে তাঁকে একডাকে চেনে, সেই নামটাও আলাদা – জুলিয়াস সিজার । গাইয়ুস জুলিয়ুস কাইসার ছিল জুলিয়াস সিজারের আসল নাম – ল্যাটিন নাম (সে সময় রোমান সাম্রাজ্যের সরকারি ভাষা ছিল ল্যাটিন এবং গ্রিক) এবং এই জুলিয়াস সিজার ছিল তাঁর কগনোমেন । সহজ ভাষায় বলতে গেলে ‘কগনোমেন’ হল - রোমানদের ‘ডাকনাম’ । 

রোমে ছিল তখন প্রজাতন্ত্র – ভোটের কড়চা । জুলিয়াস সিজার ছিলেন নেতা । পরে হলেন সেনাপতি । যুদ্ধ-টুদ্ধ লড়লেন । জিতলেনও । দিয়ে নিজেই সাম্রাজ্যের অল-ইন-অল হয়ে বসলেন । সিজারের উত্থানের পেছনে তাঁর কিছু বন্ধুবান্ধবের কলকাঠি নাড়া ছিল বইকি – তবে সে গল্প এখন থাক, পরে হবে । 

সালটা ছিল 46 বি.সি. – অর্থাৎ খ্রিস্ট পূর্ব 46 অব্দ । জুলিয়াস সিজারের ইচ্ছে হল কিছু একটা করি ! কিন্তু, কি করি ? রাজ্য জয় – হয়েছে – গলের (এখন যেখানে ফ্রান্স নামের দেশটি আছে) যুদ্ধ জিতেই তো যত নামডাক হল । গৃহযুদ্ধ জয় – হয়েছে – সেটা করেই তো সিংহাসনের দখন নিলেন । শাসনব্যবস্থায় সংস্কার – সেটা তো আগেই সারা হয়ে গেছে – নইলে সাম্রাজ্য টিকবে কি করে । আচ্ছা, উদ্বোধনে ফিতে কাটলে কেমন হয়, যেটা আজকালকার অনেক নেতা-মন্ত্রীরাই করেন – সেও হয়েছে – হালে রোমান দেবী ভেনাস জেনেট্রিক্সের মন্দিরের দ্বারোদঘাটন করে এলেন । মজার কথা, আজকের নেতা-মন্ত্রীরা ফিতে কাটতে গেলে কাঁচির সঙ্গে নিজের নাম খোদাই করা একটি করে মার্বেলের ফলকও নিয়ে যান । জুলিয়াস সিজারও কম কিসে, বলতে গেলে রোমান সম্রাট ; তাই তিনি খোদ নিজের একটা মূর্তিই দেবী ভেনাসের পাশে বসিয়ে এসেছিলেন । অবসর সময়ে ইতিহাস নিয়ে লেখালেখি – সেটাও চলছে – অলরেডি কমেন্টারি ডি বেলো গালিকো লিখে ছাপিয়ে ফেলেছেন (গলের যুদ্ধ বললাম না, তার সম্বন্ধেই লেখা) । তাহলে বাকি কি রইল ?

অনেক ভেবেচিন্তে দেখলেন, ক্যালেন্ডার বানালে কেমন হয় ! দরকারি একটা জিনিস । সকলেরই কাজে লাগে । এখন তাঁর নিজের নামে একটা ক্যালেন্ডার থাকলে এবং লোকে তা ব্যবহার করলে, অমর হওয়ার আরও একটি পথ পাওয়া যাবে । 

ক্যালেন্ডার জিনিসটা নতুন কিছু নয় – এমনকি যে সময়ের কথা বলছি সে সময়েও । চিন্তা নেই, ক্যালেন্ডারের ঠিকুজি-কুষ্ঠি বের করতে বসবো না । তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা না বললেই নয় । আপাতদৃষ্টিতে খুব সহজ সরল মনে হলেও, ক্যালেন্ডার জিনিসটা মোটেও অত সহজ সরল নয় । গোটা বছরকে 365 দিনে ভাগ করে বারোটা মাসে দিনগুলি অ্যাডজাস্ট করে নিলাম – ব্যস ! এতে আবার কঠিন কি ? চাইলে বারো মাসের বদলে দশ মাসেই বছর শেষ করে দিতে পারি – আর ঠিক এটাই রোমানরা এতদিন ধরে করে আসছিল । মার্চ (ল্যাটিনে মেনসিস মার্সিয়াস) থেকে বছর শুরু হয়ে ডিসেম্বরে শেষ – জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি গায়েব ; তার সাথে তাদের খাতের 59 দিন সেও হাপিশ ; কে পাবে 30 দিন আর কে 31 তাতেও হিসেব ভুলভাল ; এই করে 304 দিনের বছর – একেবারে যাচ্ছেতাই কাণ্ড ! পণ্ডিতেরা বলবে, তাতে কি হল ? হ্যাঁ, ক্যালেন্ডারের কিছুই হবে না ঠিকই, তবে ক্যালেন্ডার দেখে যারা চলবে তাদের তো মহা সমস্যা । ঋতুপরিবর্তন বা চাঁদের ঠিকানা তো আর ক্যালেন্ডার দেখে ঠিক হয় না । বরঞ্চ ক্যালেন্ডারের দায়িত্ব থাকে সেগুলি ঠিকঠাক জানানো । তাই ঠিকঠাক বলতে না পারলে আর কিইবা সাহায্য করলো ! দিন গুনতি তো সূর্যের ওঠা-নামা দেখেই ঠিক করে নেওয়া যাবে । কিন্তু গ্রীষ্ম শেষে কখন বর্ষা আসবে তার মোটামুটি একটা দিনকাল বলতে না পারলে ক্যালেন্ডার টাঙিয়ে কি লাভ ?

তো জুলিয়াস সিজার সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন । পুরনো রোমান ক্যালেন্ডারকে হটিয়ে – থুড়ি, হটিয়ে বললে ব্যাপারটা একটু রূঢ় শোনায়, বলা ভালো সংস্কার করে নতুন ক্যালেন্ডার বাজারে আনলেন । তাতে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি যোগ হল – ফলে মাস হল বারোটা । 30-31 দিনের বাঁটোয়ারার হিসেবটা ঠিকঠাক করা হল । ফেব্রুয়ারি পেল 28 দিন । এবং অবশ্যই, চার বছর পর-পর একটা করে দিন এক্সট্রা । পুরো 365 দিনের হিসেব খাপে খাপ ! আসলে 365 দিন 6 ঘন্টা । পরের বছর, 47 বি.সি. নয় কিন্তু, 45 বি.সি., আর তার পয়লা জানুয়ারি থেকেই নতুন ক্যালেন্ডার চালু হয়ে গেল । জয় সম্রাট জুলিয়াস সিজারের জয় । ক্যালেন্ডারের নাম, বলাই বাহুল্য, জুলিয়ান ক্যালেন্ডার । 

ভেবে বসার কারণ নেই – আমরা এখন যে ক্যালেন্ডার দেখি সেটি এই জুলিয়ান ক্যালেন্ডার । সেটা হচ্ছে আসলে গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার । উগো বঙ্কোম্পাগ্নি (বং-কোম্‌-পাগ-নি) নামে একজন ব্যক্তি রোমান ক্যাথলিক চার্চের পোপের দায়িত্বভার নেওয়ার পর (বলতে গেলে, একজন কেউকেটা হওয়ার পর) তাঁরও খেয়াল চাপে – কিছু করি, কিছু করি । এবং তাঁরও মতি হয় চল গিয়ে ক্যালেন্ডার করি ! কিন্তু সিজারেরটা তো বেশ চলছে – ভুল-ত্রুটি নেই বললেই চলে । লোকে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ফেলে তাঁর ক্যালেন্ডার ঘরে টাঙাতে যাবে কোন দুঃখে ? কিন্তু কথায় আছে, যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন (ব্যোমকেশ ও বরদা!) । বঙ্কোম্পাগ্নিও ছাই ওড়ালেন । দেখলেন, সিজারের ক্যালেন্ডারে বছরের হিসেব ধরা হয়েছিল 365 দিন, সাথে 6 ঘন্টা এক্সট্রা এবং তাই অ্যাডজাস্ট করতে লিপ-ইয়ারের প্রবর্তন । সিজারের দুর্ভাগ্য তখন ক্লদিয়াস টলেমি ছিলেন না । তাই তাঁর লেখা জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিখ্যাত বই আলমাগেস্টও ছিল না । তাই তা পড়ে প্রভাবিত হয়ে মধ্যযুগের স্পেনের এক রাজা আলফন্‌সো দ্য ওয়াইস তাঁর বিখ্যাত সূর্য-চন্দ্র-গ্রহ-তারাদের পারস্পরিক অবস্থানের হিসেবনিকেশ নিয়ে তৈরি আলফন্‌সাইন টেবিলও বের করতে পারছিলেন না – যেখান থেকে সৌরবছরের নিখুঁত হিসেবটা পাওয়া যাবে । টলেমি এলেন 100 খ্রিস্টাব্দে । আলফন্‌সো নিজের নামে টেবিল বের করলেন 1252 সালে । এবং তা দেখে, বঙ্কোম্পাগ্নি জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের খুঁত বের করলেন ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে । খুঁতটি হল – সঠিক সৌর বছরের নিখুঁত হিসেব - 365 দিন 5 ঘণ্টা 49 মিনিট 16 সেকেন্ড । প্রায় 6 ঘণ্টা ধরে চার বছরে 24 ঘন্টা অর্থাৎ একদিন অতিরিক্ত যেটা ধরছিলাম সেটাতে প্রকৃত সময় ক্যালেন্ডারের সময়ের চাইতে কিছুটা এগিয়ে যাচ্ছিল । বঙ্কোম্পাগ্নি এখানেই দাও মারলেন । বললেন, পুরোপুরি তো আর 6 ঘন্টা হচ্ছে না, তাই 4 বছরে 24 ঘণ্টার হিসেবটাও ভুল (আসলে 23 ঘণ্টা 17 মিনিট 4 সেকেন্ড হচ্ছে) । তিনি এই ঘাটতি মেক-আপ দিতে এরকম নিয়ম করলেন – 4 বছর পর পর লিপ-ইয়ার থাকছে থাকুক । কিন্তু 100-তম বছরের লিপ-ইয়ারগুলো বন্ধ করে দেওয়া হোক । আবার 400-তম বছরের লিপ-ইয়ার যেমন আছে চলুক । উদাহরণ দিয়ে বললে – 1992 সালটা লিপ-ইয়ার । কিন্তু 1900 সাল (যেটা 4 দিয়ে ভাগ যায়, অর্থাৎ লিপ-ইয়ার হওয়ার যোগ্য) বাতিল । আবার 2000 সাল লিপ-ইয়ার (400 দিয়ে ভাগ যাচ্ছে) । বিশাল কেরামতি আর কি ! তবে নিখুঁত হচ্ছে ব্যাপারটা, এই যা । বঙ্কোম্পাগ্নি পোপ হওয়ার পর নাম নিয়েছিলেন গ্রেগোরি । তাই তাঁর ক্যালেন্ডারের নামও গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার – যেটা সকলের ঘরের দেওয়ালে টাঙানো আছে ।

আচ্ছা, পোপ গ্রেগোরি তো টলেমির আশীর্বাদ পেয়েছিলেন । জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে যে 365 দিন 6 ঘণ্টার হিসেব নেওয়া হয়, সেটি কে দিয়েছিলেন ? হিসেব যিনি দিয়েছিলেন, তিনি হলেন হিপারকাস নাসিয়া (অনেকে হিপ্পারকাসও বলে) । তো ? কি এমন চিনে গেলাম, মামার বাড়ির লোক যেন ! নামে না চিনলেও, কাজে অবশ্যই আমরা চিনি । ইনিই হলেন লম্ব-অতি-সাইন ভূমি-অতি-কস ত্রিকোণমিতির জনক ।  

আরেকটু বলে রাখি, ক্যালেন্ডারের মালিকানা পোপ গ্রেগোরি দখলে আনলেও ক্যালেন্ডারের বোলচালে বিশেষ কিছু পাল্টাপাল্টি করার সাহস দেখাননি । বারোমাস – জানুয়ারি টু ডিসেম্বর সবকিছুই যা জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে ছিল, সবই ইনট্যাক্ট আছে ।

আচ্ছা ধরা যাক আমি আজ নিজের নামে একটা নতুন ক্যালেন্ডার চালু করলাম (রাজা শশাঙ্ক ক্যালেন্ডার চালু করতে পারলে আমি কেন না ?) । ইচ্ছে মতো নাম দিলাম – অমুক ক্যালেন্ডার । এবার বললাম পরের বছর থেকে অর্থাৎ 2019-এ আমার জন্মদিন থেকে ডেট শুরু হবে অর্থাৎ বছরের পয়লা দিন । তাই বলে কি অমুক ক্যালেন্ডারে আমার জন্মদিন কবে ছিল, তার সাল বার ইত্যাদি জানা যাবে না ? অমুক ক্যালেন্ডার ভারতের স্বাধীনতা দিবস কত সালে ছিল বলতে না পারলে তো লজ্জার বিষয় । অর্থাৎ, বোঝাই যাচ্ছে, ক্যালেন্ডার দেখে কেবল ভবিষ্যৎ নয়, অতীতের দিনক্ষণও বলা চায় । জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ক্ষেত্রেও সেটা খাটে । তাই জুলিয়ান ক্যালেন্ডার চালু 45 বি.সি.র 1লা জানুয়ারি হলেও, ক্যালেন্ডারের প্রথম দিন পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় প্রায় ৫০০০ বছর আগে, টু বি এক্স্যাক্ট 4713 বি.সি.র 1লা জানুয়ারি । কেন, এই সালটাই কেন ? কারণ কিছুই না । যে ব্যক্তি 4713 বি.সি. ঠিক করেন, নাম জোসেফ স্ক্যালিজার, সাল 1583, তিনি 4713 বি.সি.র পূর্ববর্তী আর কোনও ঐতিহাসিক ঘটনা খুঁজে পাননি, তাই 4713 বি.সি.কেই ইতিহাসের শুরু হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন । ভারতে জন্ম নিলে হয়তো আরও কিছু পিছনে যেতেন, যাই হোক ।

তাহলে দাঁড়াচ্ছে, জুলিয়ান ক্যালেন্ডার যেদিন চালু হচ্ছে অর্থাৎ 1লা জানুয়ারি 45 বি.সি. এবং দিনটি ছিল শুক্রবার – খাতায় কলমে অলরেডি 1,704,987 দিন পেরিয়ে গেছে, 4713 বি.সি.র 1লা জানুয়ারি সাপেক্ষে (কি করে পেল - সে জটিল যোগ-ভাগ) । এই দিনসংখ্যাকে বলা হয় জুলিয়ান ডে নাম্বার, সংক্ষেপে জে.ডি.এন. । ভারতের স্বাধীনতা দিবসের জে.ডি.এন. হল 2,432,413 । 44 বি.সি.র মার্চের 15ই তারিখের জে.ডি.এন. ছিল 1,705,426 । এই তারিখে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের মালিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে আততায়ীর হাতে মৃত্যুবরণ করেছিলেন ।

No comments:

Post a Comment