দুই
ভারতে প্রচলিত খান দশের চাইনিজ অ্যাপ (যেমন - শেয়ারইট, জেন্ডার, ক্যামস্ক্যানার, টিকটক ইত্যাদি) আর তার বিকল্প একাধিক ভারতীয় অ্যাপের এক লম্বা ফর্দ দিয়ে দিনের সংলাপ শুরু করে চিবিক্ত।
৩রা জুন
ডেপুটি: আমার জেন্ডার আছে।
(কিছুক্ষণ পর) এসব তো ঠিক আছে, কিন্তু আমার ফোনটাই চাইনিজ।
হঠাৎ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে একটি মিম শেয়ার করে ডেপুটি। মিমে মোদীর লাম্পট্যের ইঙ্গিত স্পষ্ট। মিমটিকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে চিবিক্তের ফর্দকে নিশানায় রেখে লাল তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে শুরু করে। আসন্ন বাকযুদ্ধ!
লাল: গত দুই দশক ধরে চীন সাথে চীনের মানুষদের যেভাবে চারিত্রিক এবং নৈতিক দিক থেকে কলুষিত করা হচ্ছে, সেটি চরম দুঃখজনক এবং অবাঞ্ছিত। গত তিন-চার মাসে সেটি প্রবলতর হয়েছে, বলাই বাহুল্য।
(ফোনটি চাইনিজ প্রসঙ্গে, ডেপুটিকে) এমনকি যে হোয়াটসঅ্যাপ আমরা ব্যবহার করছি (সাথে ফেসবুক) তার মালিকের বউই চাইনিজ। বর্ণবৈষম্যের দরুণ বলছি না - প্রিসিলা চ্যান জন্মগত আমেরিকান হলেও, তার বাবা-মা চাইনিজ রিফিউজি ছিল।
চিবিক্ত: (ডেপুটিকে) সে তো আমারটাও। কিন্তু সেটা তো আর ফেলে দিতে পারবো না। নেক্সট কোনো চাইনিজ ফোন কিনবো না।
আমি চাইনিজ প্রোডাক্ট বর্জনের পক্ষে। শুধু চাইনিজ কেন, অন্য দেশের প্রোডাক্টও আস্তে আস্তে বর্জন করা উচিৎ বলে মনে করি। কোয়ালিটির সঙ্গে অল্প বিস্তর কম্প্রোমাইজ করেও ইন্ডিয়ান প্রোডাক্ট কেনা উচিৎ। কারণটা অন্য কিছু নয়। এতে নিশ্চয় দেশের ইকোনমির ওপর প্রভাব পড়বে।
ফের প্রসঙ্গ থেকে সরে মোদীর ওপর আরেকটি মিম শেয়ার করে ডেপুটি। এই মিমের ইঙ্গিতে মোদীকে চোর বোঝানো হয় (কোভিড-১৯ মহামারির মোকাবিলায় পিএমকেয়ারস তহবিলের টাকা চুরির প্রসঙ্গে)।
ডেপুটি: অবশ্যই তবে কাউকে বাধ্য করার বিপক্ষে।
লাল: (চিবিক্তকে) এটা খুবই সরল মন্তব্য এবং এর পিছনে ধারণাটা নিছক মধ্যযুগীয় (সাবধান, এটা না অপশব্দ না ব্যক্তিগত আক্রমণ, বরঞ্চ সম্পূর্ণ আক্ষরিক) - কারণ, এই আমার লাভ অর্থাৎ তোমার ক্ষতি - এই ধরণের 'জিরো সাম' অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বর্তমানে অপ্রচলিত। এখন মুক্ত অর্থনীতির যুগে ক্ষতিকে শূন্য রেখে দুপক্ষ সমান লাভের ভাগীদার হতে পারে। খাস করে বিশ্বায়নের যুগে, যেখানে ভারতের মতো দেশ সক্রিয় অংশগ্রহণকারী, সেখানে 'বয়কট-স্বদেশীর' আস্ফালন নিজের পায়ে কুড়ুল মারার সমান। মজার কথা ভারতবাসীদের ষোলোআনা স্বদেশী চীনের বিরুদ্ধেই - আমেরিকা তো 'ব্রাদার ফ্রম আনাদার মাদার'।
ডেপুটি: ইয়েস।
চিবিক্ত: স্বদেশি ব্যাপারটা খারাপ না। একটা প্রচলিত কথা শুনে থাকবি, যারা ভারতের স্বাধীনতার জন্য প্রকাশ্যে বা লুকিয়ে লড়াই করতো, তাদেরকে বলা হতো, অমুক লোক স্বদেশি করে। কথা সম্পূর্ণ ভুল না। আর একজনের বেশি লাভ হলে, অন্যজনের ক্ষতি বা কম লাভ হবেই এটাই সরল অঙ্ক। বিদেশি জিনিস বর্জন না করলে স্বদেশি জিনিস মাথাচাড়া দিতে পারবে না। কারণ কিছুটা টেকনোলজিক্যাল খামতি, কিছুটা স্পন্সরসিপের। সেই স্পন্সরসিপটা ইনডাইরেক্টলি, যারা সমর্থ দেশবাসি, তাদের কাছ থেকে আশা করাটা অন্যায় নয়। কিছুটা ব্যর্থ তা হতে পারে।
তাছাড়া আমি কিন্তু অনলি চাইনিজ প্রোডাক্ট বর্জন করার পক্ষে নই। অন্য দেশের প্রোডাক্টের ক্ষেত্রেও একই অভিমত। যেসব জিনিসের ইন্ডিয়ান অল্টারনেটিভ আছে, সেসব জিনিসের ক্ষেত্রে তো বটেই। এ জন্যই আমি হাইক ইউস করার পক্ষপাতী, হোয়াটসঅ্যাপ নয়। কিন্তু যদি কেও না থাকে, তাহলে আমি কি একা অনলাইন বসে থাকবো?
পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের অর্থনীতি কি কেবলমাত্র একটা মোবাইল ফোন আর তাতে উপস্থিত সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপের ওপরই নির্ভরশীল?
মাইক্রোম্যাক্স, কার্বন, লাভা, ইন্টেক্স - এরা কেওই খুব খারাপ ফোন বের করে না। আমি পর পর তিনটে অ্যান্ড্রয়েড কিনেছিলাম মাইক্রোম্যাক্সের, আর উইন্ডোজ ফোনটা লাভার। বাট, এখন চাইলেও আর ওগুলো মার্কেটে নেই। দায়ী কে?
লাল: এই প্রসঙ্গে একটা তথ্য জানিয়ে রাখি, এখন সত্যিই মাইক্রোম্যাক্স সহ অন্যান্য স্বদেশী মোবাইল কোম্পানির লালবাতি জ্বলে গেছে, কিন্তু যে সামান্য সময়ের জন্য ব্যাপক বাজার করে রেখেছিল, সে সময়ের অর্থাৎ বছর ৫-৬ আগের কথা বলছি, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের খবর, যে আমরা বাইরে থেকে দেশি ফোন নিয়ে মাতামাতি করছি কিন্তু আসলে খালি খাপটা দেশে তৈরি হচ্ছে, কলকব্জার পুরোটাই চীন থেকে আসছে।
এখন সে কাপড়টুকুও গা থেকে খসে গেছে।
ডেপুটি: (চিবিক্তকে) তোমার কথার সাথে আমিও একই মত, কিন্তু ব্যাপারটা হল আমরা সস্তায় ভালো জিনিস নেবো সেটা হিউম্যান টেনডেন্সি, পাল্টানো যাবে না, নিজেরটা পাল্টালেও সমাজ কখনোই বদলাবে না, যদি না সরকার পুরোপুরি ব্যান না করে।
(লালকে) ঠিক, মাইক্রোম্যাক্সের বাজার ওরা নিজেই নষ্ট করছে, ভালো ফোন বের না করে।
লাল: ভারতীয়দের ভারতীয় দ্রব্যের প্রতি সহানুভূতি, ফুটবল বিশ্বকাপে ভারতের সমর্থনেরই সমতুল্য...হ্যাঁ সেই ৫০শে খেলার কথা ছিল, তবে এবার বেহালা ব্রাজিল, আহিরীটোলা আর্জেন্টিনা।
চিবিক্ত: (ডেপুটিকে) হ্যাঁ, ঠিক আমি এটারই পক্ষে। গভর্নমেন্টেরই ইনিশিয়েটিভ নিয়ে বন্ধ করা উচিৎ। তারই অপেক্ষায় আছি আমি। যেকোনো কিছুর শুরুতো করতেই হবে, আমিই না হয় করলাম।
(লালকে) ভুল। ১৯৮৩ ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ দেখিসনি, তাই তদানীন্তন অবস্থা সম্পর্কে, গুগল করে রেকর্ড ছাড়া বেশি কিছু জানতে পারবি কি না জানিনা। বাট বাবার নিজের দেখা, আর বাবার কাছেই আমার শোনা - ১৯৮৩ ওয়ার্ল্ড কাপের আগে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট নিয়েও তোর মতন মতবাদ অনেক ভারতীয়দেরই ছিল। পরের চিত্রটা যে আলাদা, আশা করি বলে দিতে হবে না। আর ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবলে আমার ১০০% সমর্থন টিল নাও ইন্ডিয়ার প্রতি থাকবে।
নিজের বক্তব্যের সমর্থনে একটি ফেসবুক ভিডিও শেয়ার করে চিবিক্ত। এখানে এই মজাদার মানসিকতাটি উল্লেখ না করলেই নয়। তর্কে নিজের যুক্তিগুলো (তথ্য নয়) বিশেষ কার্যকরী না হলে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সেই একই যুক্তি (তথ্য নয়) ব্যবহার করে তর্কযোদ্ধা বিপক্ষের ওপর কর্তৃত্ব ফলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে। তর্ক যে দলভারী করে জেতা যায় না এটা অনেক সময় অনেকেরই খেয়াল থাকে না।
লাল: গুগলের জ্ঞান থেকেই বলছি, ১৯৮৩-এর বিশ্বকাপ জেতার অনেক আগে, ১৯৫২-র মাদ্রাজ টেস্ট জয়, ৬৮-তে ডুনেডিন, ১৯৭১-এ ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ডে সিরিজ জয়, রঞ্জি থেকে মার্চেন্ট, সুভাষ গুপ্তে থেকে মানকড়, পেস কোয়াটার, গাভাস্কার...বিশ্বদরবারে ভারতীয় ক্রিকেটের রমরমা আগাগোড়া থেকেই ছিল। একটা ভাগ্যক্রমে বিশ্বকাপ জয় কেবল দর্শকের সংখ্যা আর আগ্রহ বৃদ্ধি করেছিল, ক্রিকেটের স্তর না। এখন, গুগল করে বা প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি থেকে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতীয় ফুটবলের কিছু নমুনা দাও তো। এমনকি পারলে ইউরোপের কোনো বড় ক্লাবে প্রথম সারির কোনো ভারতীয় ফুটবলারের নাম বলো তো...না মানে আমার সত্যিই জানা নেই।
যাই হোক, "গুগল করে রেকর্ড ছাড়া বেশি কিছু জানতে পারবি না"...কথাটা এমন হল, মিশরের ইতিহাস নিয়ে মন্তব্য করছি, হঠাৎ কলকাতা মিউজিয়ামের মমিটা জেগে উঠে বললো, গুগল করে বেশি কি আর জানবি, আমাকে জিজ্ঞেস কর টলেমির তাড়া খেয়ে ক্লিওপেট্রা যখন সিরিয়ায় পিঠটান দিল তখন লোহিত সাগরে বৈঠা আমিই বয়েছিলাম। না মানে একান্ত তিমি মাছ বা বাবা লোকনাথ না হলে কতদূর আর মানুষ প্রত্যক্ষদর্শী হবে...সেই গুগলই করবে।
ডেপুটি হেসে ফেলে (হাসির ইমোজি ব্যবহার করে বোঝায়)।
চিবিক্ত: সবই তো রেকর্ডের কথাই বললি। আমি জানতাম, তাই আগেই বললাম (চিবিক্তও হাসে আর কি)। কিন্তু তুই শুধু উইনারদের সঙ্গেই থাকবি। 'কেবল দর্শকের সংখ্যা আর আগ্রহ বৃদ্ধি', তোর এই কথাটা এমন হল যে, দর্শকের নাম্বারের আগ্রহটা কোনো ম্যাটর করে না। কিন্তু মজার ব্যাপার, ওটাই আসল। ক্রিকেটে জেতে বলে ওটাকেই সমর্থন করবি, আর ফুটবলে হারে বলে সেই টিমটা কি উগান্ডার হয়ে গেল রে পাগলা? বীরভূমের মাটির ফুটবলারও রিজার্ভড বেঞ্চে বসে থাকলেও থাকতেই পারে। তবুও বলবো খেলার স্তরও বেড়েছিল। কারণ অন্য ক্রিকেট কান্ট্রিগুলোর ইন্ডিয়ার প্রতি সম্মান বেড়েছিল, ভারতীয় ক্রিকেটারদের কনফিডেন্স বেড়েছিল। যেটা কিনা তোরা ফুটবলারদের ক্ষেত্রে একদিন দেখবি, এই আশাটুকুও রাখতে পারিস না!
(মমি প্রসঙ্গে, লালকে) জানি এটা স্টুডেন্ট পড়ানোর সাইড এফেক্ট। আমারও হয়। মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে এসে একটা বড়সড় সার্কাস্টিক ওয়ে তে একজ্যাম্পেল দেওয়া।
যে দেশের প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু, সেই চাইনা কিন্তু ম্যাক্সিমাম ক্ষেত্রে অন্য দেশের প্রোডাক্ট, সফটওয়্যার ইউস করতে দেয় না। ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্ট অনেক লিবারেল। চাইনিজ প্রোডাক্টকে ব্যান করেনি। তাই এইসব আলোচনা করতে পারছি। চায়নার ফরম্যাট ফলো করলে অনেক দিন আগেই বিদেশি বেশ কিছু আইটেম বন্ধ হয়ে যেত।
ডেপুটি: একেই বলে স্বদেশি।
চিবিক্ত: হ্যাঁ, আমি জাতীয়তাবাদের পক্ষে। থিয়েটারে ন্যাশানাল অ্যান্থেমে দাঁড়ানো থেকে পাকিস্তানের ফ্ল্যাগধারীদের নিরস্ত্র করা, এসবে আমার পূর্ণ সমর্থন আছে। করোনার জন্য বাড়ি থেকে বেরোতে আমরা ভয় পায়, বর্ডারে গিয়ে বন্ধুক ধরে তো আর দেশভক্তি শো করতে পারবো না।
লাল: গ্যালারি ভর্তি দর্শক-প্যাশন-উন্মাদনা এসব ক্রিকেটে আদিখ্যেতা, আবার এসব ছাড়া ফুটবল ফিকে। হ্যাঁ, টাকা রোজগার করতে হবে, ক্রিকেট খেলোয়াড়দেরও তো ঘর সংসার আছে, তাই এই মাতামাতি মাখামাখি ব্যাপার। শূন্য গ্যালারিতেও ক্রিকেট ইতিহাসে গড়েছে, এখন ইডেনে টেস্ট হলেও কটা লোক আসে দেখতে? আসলে ২০০ বছরের গোলামির দায় আছে ক্রিকেটে, যেখানে ফুটবল প্রেমটা গা বাঁচানো, লোক দেখানো - নইলে জাতীয় অধিনায়ককে হাত জোড় করে আবেদন করতে হয় মাঠে আসার জন্য!
(যে দেশের প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু প্রসঙ্গে) কারণ চীনের আমাজনের জবাবে আলিবাবা আছে, গুগলের জবাবে বাইদু...আর ভারত, ফ্লিপকার্টকেও বিক্রি করে দিয়েছে আমেরিকাকে। তাই ভারত সরকারের মুরোদ নেই, চীনের নীতি অনুসরণ করার...মজার কথা কৃষিতে আমরা এখনও মধ্যযুগে, শিল্পে প্রস্তরযুগ, একমাত্র যেটিতে সম্ভাবনা ছিল 'জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন' নেওয়ার (এবং যেটি ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড) সেই তথ্যপ্রযুক্তিতেও ভারতের অবদান - নামিদামি কোম্পানিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত খুঁজে বেরোনো। ওই সত্য নাদেল্লা ভারতীয় বংশোদ্ভূত, ওই সুন্দর পিচাই ভারতীয় বংশোদ্ভূত...বলে রাখি অভিজিৎ ব্যানার্জীও ভারতীয় বংশোদ্ভূত কিন্তু তার স্ত্রী এখনও ফরাসি।
(চিবিক্তকে বিশেষকরে) অ্যালবার্ট আইনস্টাইন একসময় বলেছিলেন, জাতীয়তাবাদ একটা শিশুসুলভ ব্যারাম, মনুষ্যজাতির হামরোগের মত।
ইতিমধ্যে রাত বারোটা তেত্রিশ। আজকের মতো সংলাপ এখানেই শেষ হয়। কেবল মিমের মধ্যেই আজ সীমাবদ্ধ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মাননীয় নরেন্দ্র মোদীজি। কাল থাকবেন না।
নিজের বক্তব্যের সমর্থনে একটি ফেসবুক ভিডিও শেয়ার করে চিবিক্ত। এখানে এই মজাদার মানসিকতাটি উল্লেখ না করলেই নয়। তর্কে নিজের যুক্তিগুলো (তথ্য নয়) বিশেষ কার্যকরী না হলে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির সেই একই যুক্তি (তথ্য নয়) ব্যবহার করে তর্কযোদ্ধা বিপক্ষের ওপর কর্তৃত্ব ফলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে। তর্ক যে দলভারী করে জেতা যায় না এটা অনেক সময় অনেকেরই খেয়াল থাকে না।
লাল: গুগলের জ্ঞান থেকেই বলছি, ১৯৮৩-এর বিশ্বকাপ জেতার অনেক আগে, ১৯৫২-র মাদ্রাজ টেস্ট জয়, ৬৮-তে ডুনেডিন, ১৯৭১-এ ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ডে সিরিজ জয়, রঞ্জি থেকে মার্চেন্ট, সুভাষ গুপ্তে থেকে মানকড়, পেস কোয়াটার, গাভাস্কার...বিশ্বদরবারে ভারতীয় ক্রিকেটের রমরমা আগাগোড়া থেকেই ছিল। একটা ভাগ্যক্রমে বিশ্বকাপ জয় কেবল দর্শকের সংখ্যা আর আগ্রহ বৃদ্ধি করেছিল, ক্রিকেটের স্তর না। এখন, গুগল করে বা প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি থেকে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতীয় ফুটবলের কিছু নমুনা দাও তো। এমনকি পারলে ইউরোপের কোনো বড় ক্লাবে প্রথম সারির কোনো ভারতীয় ফুটবলারের নাম বলো তো...না মানে আমার সত্যিই জানা নেই।
যাই হোক, "গুগল করে রেকর্ড ছাড়া বেশি কিছু জানতে পারবি না"...কথাটা এমন হল, মিশরের ইতিহাস নিয়ে মন্তব্য করছি, হঠাৎ কলকাতা মিউজিয়ামের মমিটা জেগে উঠে বললো, গুগল করে বেশি কি আর জানবি, আমাকে জিজ্ঞেস কর টলেমির তাড়া খেয়ে ক্লিওপেট্রা যখন সিরিয়ায় পিঠটান দিল তখন লোহিত সাগরে বৈঠা আমিই বয়েছিলাম। না মানে একান্ত তিমি মাছ বা বাবা লোকনাথ না হলে কতদূর আর মানুষ প্রত্যক্ষদর্শী হবে...সেই গুগলই করবে।
ডেপুটি হেসে ফেলে (হাসির ইমোজি ব্যবহার করে বোঝায়)।
চিবিক্ত: সবই তো রেকর্ডের কথাই বললি। আমি জানতাম, তাই আগেই বললাম (চিবিক্তও হাসে আর কি)। কিন্তু তুই শুধু উইনারদের সঙ্গেই থাকবি। 'কেবল দর্শকের সংখ্যা আর আগ্রহ বৃদ্ধি', তোর এই কথাটা এমন হল যে, দর্শকের নাম্বারের আগ্রহটা কোনো ম্যাটর করে না। কিন্তু মজার ব্যাপার, ওটাই আসল। ক্রিকেটে জেতে বলে ওটাকেই সমর্থন করবি, আর ফুটবলে হারে বলে সেই টিমটা কি উগান্ডার হয়ে গেল রে পাগলা? বীরভূমের মাটির ফুটবলারও রিজার্ভড বেঞ্চে বসে থাকলেও থাকতেই পারে। তবুও বলবো খেলার স্তরও বেড়েছিল। কারণ অন্য ক্রিকেট কান্ট্রিগুলোর ইন্ডিয়ার প্রতি সম্মান বেড়েছিল, ভারতীয় ক্রিকেটারদের কনফিডেন্স বেড়েছিল। যেটা কিনা তোরা ফুটবলারদের ক্ষেত্রে একদিন দেখবি, এই আশাটুকুও রাখতে পারিস না!
(মমি প্রসঙ্গে, লালকে) জানি এটা স্টুডেন্ট পড়ানোর সাইড এফেক্ট। আমারও হয়। মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে এসে একটা বড়সড় সার্কাস্টিক ওয়ে তে একজ্যাম্পেল দেওয়া।
যে দেশের প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু, সেই চাইনা কিন্তু ম্যাক্সিমাম ক্ষেত্রে অন্য দেশের প্রোডাক্ট, সফটওয়্যার ইউস করতে দেয় না। ইন্ডিয়ান গভর্নমেন্ট অনেক লিবারেল। চাইনিজ প্রোডাক্টকে ব্যান করেনি। তাই এইসব আলোচনা করতে পারছি। চায়নার ফরম্যাট ফলো করলে অনেক দিন আগেই বিদেশি বেশ কিছু আইটেম বন্ধ হয়ে যেত।
ডেপুটি: একেই বলে স্বদেশি।
চিবিক্ত: হ্যাঁ, আমি জাতীয়তাবাদের পক্ষে। থিয়েটারে ন্যাশানাল অ্যান্থেমে দাঁড়ানো থেকে পাকিস্তানের ফ্ল্যাগধারীদের নিরস্ত্র করা, এসবে আমার পূর্ণ সমর্থন আছে। করোনার জন্য বাড়ি থেকে বেরোতে আমরা ভয় পায়, বর্ডারে গিয়ে বন্ধুক ধরে তো আর দেশভক্তি শো করতে পারবো না।
লাল: গ্যালারি ভর্তি দর্শক-প্যাশন-উন্মাদনা এসব ক্রিকেটে আদিখ্যেতা, আবার এসব ছাড়া ফুটবল ফিকে। হ্যাঁ, টাকা রোজগার করতে হবে, ক্রিকেট খেলোয়াড়দেরও তো ঘর সংসার আছে, তাই এই মাতামাতি মাখামাখি ব্যাপার। শূন্য গ্যালারিতেও ক্রিকেট ইতিহাসে গড়েছে, এখন ইডেনে টেস্ট হলেও কটা লোক আসে দেখতে? আসলে ২০০ বছরের গোলামির দায় আছে ক্রিকেটে, যেখানে ফুটবল প্রেমটা গা বাঁচানো, লোক দেখানো - নইলে জাতীয় অধিনায়ককে হাত জোড় করে আবেদন করতে হয় মাঠে আসার জন্য!
(যে দেশের প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু প্রসঙ্গে) কারণ চীনের আমাজনের জবাবে আলিবাবা আছে, গুগলের জবাবে বাইদু...আর ভারত, ফ্লিপকার্টকেও বিক্রি করে দিয়েছে আমেরিকাকে। তাই ভারত সরকারের মুরোদ নেই, চীনের নীতি অনুসরণ করার...মজার কথা কৃষিতে আমরা এখনও মধ্যযুগে, শিল্পে প্রস্তরযুগ, একমাত্র যেটিতে সম্ভাবনা ছিল 'জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসন' নেওয়ার (এবং যেটি ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড) সেই তথ্যপ্রযুক্তিতেও ভারতের অবদান - নামিদামি কোম্পানিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত খুঁজে বেরোনো। ওই সত্য নাদেল্লা ভারতীয় বংশোদ্ভূত, ওই সুন্দর পিচাই ভারতীয় বংশোদ্ভূত...বলে রাখি অভিজিৎ ব্যানার্জীও ভারতীয় বংশোদ্ভূত কিন্তু তার স্ত্রী এখনও ফরাসি।
(চিবিক্তকে বিশেষকরে) অ্যালবার্ট আইনস্টাইন একসময় বলেছিলেন, জাতীয়তাবাদ একটা শিশুসুলভ ব্যারাম, মনুষ্যজাতির হামরোগের মত।
ইতিমধ্যে রাত বারোটা তেত্রিশ। আজকের মতো সংলাপ এখানেই শেষ হয়। কেবল মিমের মধ্যেই আজ সীমাবদ্ধ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মাননীয় নরেন্দ্র মোদীজি। কাল থাকবেন না।
(চলবে)
No comments:
Post a Comment