Wednesday, 22 May 2024

২২শে মে ২০২৪, বুধবার, প্রথম প্রহর

দ্য টেলিগ্রাফে গত শনিবারের প্রবন্ধে (Nehru's Patel) ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ কিভাবে পূর্বেকার দুই কমরেড ও সহকর্মী - জওহরলাল নেহরু এবং সর্দার বল্লভভাই পটেল - বর্তমান কালে দুই প্রতিপক্ষ ও বিরোধী হিসেবে জনসমক্ষে প্রদর্শিত হচ্ছেন, তার সংক্ষিপ্ত কিন্তু যথার্থ কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। কেবল নেহরুই নন, সমগ্র কংগ্রেস পার্টি থেকে পটেলকে বিচ্ছিন্ন করে, তাঁকে নরেন্দ্র মোদীর তথা বিজেপির আদর্শগত নতুন আইকন হিসেবে বারংবার প্রচার করার সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির পেছনে প্রাথমিকভাবে ও প্রধানত দায়ী হচ্ছে জওহরলাল নেহরুর খোদ নিজের পরিবার - গান্ধী পরিবার। দেশের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর অকালমৃত্যুর (১৯৬৬) পর কংগ্রেস পার্টি নেহরুর একমাত্র সন্তান ইন্দিরা গান্ধীকে শাস্ত্রীর উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচন করে। ঘটনার সূত্রপাত হয় সেখানেই। ইন্দিরাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে ভেবেই কংগ্রেসের প্রধানরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু হিতে বিপরীত হয়। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত করে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের সাথে সাথে কংগ্রেস পার্টিরও সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন এবং পার্টিকে একটা 'পারিবারিক ফার্মে' পরিনত করেন। শুরু হয় তাঁর পিতৃপ্রচার। ছোট বড় যাবতীয় সরকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাবার নাম জুড়ে দিতে শুরু করেন। তিনি যে পটেলের অবদানের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল ছিলেন না, তা নয় - জাতীয় পুলিশ একাডেমী পটেলের নামে প্রতিষ্ঠা করা হয় - কিন্তু তাঁর সরকারের সিংহভাগ প্রচারে ঠাই পান একমাত্র নেহরু। মায়ের (মৃত্যুর) পর বড় ছেলে রাজীব সে কাজে সিদ্ধহস্ত হন। মা ছেলে মিলে কংগ্রেস পার্টির ইতিহাসকে কেবলমাত্র একটি পরিবারের ইতিহাসে পর্যবসিত করেন। অব্যবস্থা চরমে ওঠে যখন রাজীব গান্ধীর স্ত্রী সোনিয়া কংগ্রেসের সভাপতি (১৯৯৮) হন। তাঁর বিবেচনায় কংগ্রেসের ইতিহাসে পটেলের কোন স্থান ছিল না। ছিল না মৌলানা আজাদ, সরোজিনী নাইডু বা কে কামরাজের কোন ভূমিকা। মাঝে মধ্যে মহাত্মা গান্ধীর নাম উল্লেখ হতো বইকি, কিন্তু প্রায় বাকি প্রচারটার পুরোটাই ছিল একটি মাত্র পরিবারের। এমনকি নেহরু বা ইন্দিরাকে ছাপিয়ে রাজীব গান্ধী কংগ্রেস তথা তৎকালীন সরকারের মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০০৪ থেকে ২০১৪-র মাঝে (কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএর শাসনে) প্রচুর সরকারী প্রকল্প রাজীব গান্ধীর নামে রাখা হয়। তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে অবিবেচকের মতো সরকারী অর্থ ব্যয় করা হয়।

সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে এগিয়ে আসেন নরেন্দ্র মোদী এবং পরবর্তীকালে তাঁর নেতৃত্বে বিজেপি। যদিও তিনি আগাগোড়া থেকে আরএসএসের কিংবদন্তী কে বি হেডগেওয়ার এবং এম এস গোলওয়ালকরের আদর্শে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। কর্মজীবনের অনেক পরে তিনি পটেলকে স্তুতি গাইতে শুরু করেন। ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে অংশগ্রহণ কালে নরেন্দ্র মোদীর পটেলভক্তি উচ্ছ্বসিত বেগ পায়। মোদীর সাথে সাথে বিজেপি পার্টিও পটেলের গুণকীর্তনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে। তার মহত্তম পরিণতি হিসেবে আমরা দেখতে পাই পটেলের স্মৃতিসৌধ স্ট্যাচু অফ ইউনিটি।

রামচন্দ্র গুহ লিখছেন, "কংগ্রেসের ইতিহাসকে কেবলমাত্র একটি পরিবারের ইতিহাসে রূপান্তরিত করার সোনিয়া গান্ধীর প্রচেষ্টাকে সর্দার পটেল হয়তো একান্ত কৌতুকের চোখেই দেখতেন; কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর, তাঁর নাম ও অবদানের অনিষ্টকর অপব্যবহার করে বিজেপি পার্টির দেশগঠনের নেপথ্যে ক্রিয়াশীল এক নিরন্তর যুগলবন্দীকে ভাঙার অপচেষ্টা দেখে ক্রোধ সংবরণ করতে পারতেন না।"

স্বাধীনতা পরবর্তী দেশগঠন কালে সর্দার বল্লভভাই পটেল এবং জওহরলাল নেহরুর অনবদ্য জুড়ি কেবল আধুনিক ভারতবর্ষের ইতিহাসেই নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও বিরল। তাঁদের জুড়ি কেবল আদর্শগত উৎকৃষ্টতার পরিচায়কই ছিল না, দেশের জন্য অত্যাবশ্যকও ছিল।

No comments:

Post a Comment