বোম্বাই থেকে প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানবিরোধী সংবাদপত্র 'দ্য বোম্বাই ক্রনিক্যালের' সম্পাদক বেঞ্জামিন গাই হরনিম্যানকে ১৯১৯ সালের জুলাই মাসে সরকারি নির্দেশে এবং বোম্বাইয়ের গভর্নরের বিশেষ উদ্যোগে ভারতবর্ষ থেকে নির্বাসিত করা হয়। অভিযোগের তালিকা ছিল দীর্ঘ - সরকারবিরোধী কার্যকলাপ, সরকারের অবমাননা ও বিদ্বেষ প্রচার, নিষিদ্ধ ইস্তেহার প্রচারে সমর্থন, জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপে যোগদান ইত্যাদি। 'ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট ১৯১৫'-য়ের ভিত্তিতে তাঁর নির্বাসনের ব্যবস্থা হয়। প্রকৃতপক্ষে, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের (১৩ই এপ্রিল, ১৯১৯) প্রতিবাদ আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং কুখ্যাত 'রাওলাট অ্যাক্ট'কে 'ব্ল্যাক বিল' বলে প্রচারের কারণে আগাগোড়া থেকেই সরকারের বিরাগভাজন হরনিম্যানের প্রতি সরকারের ধৈর্যের শেষ বাঁধটি ভেঙে যায়। তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে প্রায় জোর করে তাঁকে ইংল্যান্ডগামী জাহাজে তুলে দেওয়া হয়।
দীর্ঘ ছয় বছরেরও বেশি সময় ইংল্যান্ডে কাটানোর পর ১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাস নাগাদ তিনি পুনরায় ভারতে ফিরে আসেন। কিন্তু মাঝের এই নির্বাসনকাল তাঁর কাছে নিছক বৈচিত্র্যহীন ছিল না। হেন কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি দপ্তর নেই যেখানে তিনি ভারতে ফেরার নিবেদন পেশ করেননি। ইন্ডিয়া অফিসে বারংবার গিয়েছেন পাসপোর্টের দরখাস্ত নিয়ে। রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক যাবতীয় সভা-সমিতি থেকে শুরু করে বন্ধুস্থানীয় লেবার এম পিদের মধ্যস্থতায় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট পর্যন্ত তাঁর নির্বাসন রদের ব্যাপারে চর্চা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থতা ও হতাশার সম্মুখীন হতে হয়েছে হরনিম্যানকে। এদিকে ভারতবর্ষেও জাতীয়তাবাদী নেতারা তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট উঠেপড়ে লাগেন। উদ্যোগের পুরোভাগে ছিলেন স্বয়ং গান্ধীজি। ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে হরনিম্যানের অবদানের কথা স্মরণ করে এবং তাঁর বেআইনি নির্বাসনের প্রতিবাদ জানিয়ে ইয়ং ইন্ডিয়াতে গান্ধীজি নিয়মিত নিবন্ধ লিখতেন। (যদিও জনৈক বন্ধুকে লেখা এক ব্যক্তিগত চিঠিতে গান্ধীজির বিরুদ্ধে তাঁকে ভারতে ফিরিয়ে আনার জন্য 'যথেষ্ট চেষ্টা না করার' অভিযোগ আনেন তিনি; পরে চিঠিটি প্রকাশ্য হলে গান্ধীজির কাছে ক্ষমাও চেয়ে নেন) এমনকি হরনিম্যানকে দেশে ফিরিয়ে আনার আবেদনে বোম্বাই বিধানপরিষদে আর্জি পেশ করেন কংগ্রেস নেতা ও বিখ্যাত আইনজীবী কে এফ নরিম্যান। আবেদনের পক্ষে-বিপক্ষে ভোটপ্রদানের আয়োজনও করা হয়। বলাই বাহুল্য, সেটিও ব্যর্থ হয়।
ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট বাতিল হয়ে যাওয়া সত্বেও যখন তাঁকে ইংল্যান্ডে আটক করে রাখা হয় তখনই হরনিম্যান বুঝে যান যে সোজা পথে তিনি কোনো দিনই ভারতে ফিরে যেতে পারবেন না। আইনের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলে নাছোড়বান্দা ভারত সরকারকে ন্যুব্জ করা অসম্ভব হবে। তাই তিনি আইনের ফাঁকফোকর খুঁজতে সচেষ্ট হলেন। মোক্ষম পেয়েও গেলেন।
ভারতে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট তিনি পাবেন না, কিন্তু অন্য দেশে (খাস করে ইউরোপীয় দেশগুলিতে) যাওয়ার জন্য তো পেতে পারেন। তাই অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ফ্রান্স কিংবা ইতালিতে ছুটি কাটানোর উদ্দেশ্যে ইন্ডিয়া অফিসে পাসপোর্টের আবেদনপত্র জমা করলেন ভারতে ফিরতে মরিয়া হরনিম্যান। সৌভাগ্যক্রমে এই একটিবার ব্রিটিশ সরকার তাঁর প্রতি সদয় হন এবং দুর্ভাগ্যক্রমে (ব্রিটিশ সরকারের) এই একটিবারের সুযোগটির ষোলোআনা সদ্ব্যবহার করে ফেলেন তিনি। আগে থেকেই পরিকল্পনার ছক কষে ফেলেছিলেন হরনিম্যান। প্রথমে তিনি পৌঁছন ফ্রান্স। সেখান থেকে জাহাজে করে সোজা পাড়ি দেন ব্রিটিশ সিলনের (সিংহল) উদ্দেশ্যে। তাঁর ফন্দিটি ছিল ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট অ্যাক্টকে ফাঁকি দেওয়ার। ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট অ্যাক্ট অনুসারে সমুদ্রপথে কিংবা আফগানিস্তান হয়ে স্থলপথে ভারতে প্রবেশকারী যেকোনো ব্যক্তিকে ভারত সরকার অবিলম্বে ভারত থেকে নিষ্কাশিত করতে পারে। কিন্তু খোদ অন্য ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে কি প্রকার পদক্ষেপ নেওয়া হবে তার কোনো উল্লেখ আইনটিতে ছিল না। হরনিম্যান তারই সুযোগ নিলেন। সিলনে পৌঁছনর অব্যবহিত পর পক প্রণালী অতিক্রম করে ভারতের মূল ভূখণ্ডস্থিত ছোট বন্দর শহর রামেশ্বরমে আসেন। সেখান থেকে যান মাদ্রাজ এবং মাদ্রাজ থেকে ট্রেন মারফৎ বোম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
____________________
হরনিম্যান ফ্রান্সে পৌঁছলে ইন্ডিয়া অফিসের আধিকারিকদের আশঙ্কা হয় যে তিনি সেখান থেকে ফরাসি পাসপোর্ট ব্যবহার করে উপমহাদেশের ফরাসি উপনিবেশ পন্ডিচেরিতে (কিংবা চন্দননগরে) চলে যেতে পারেন। যদিও সেটি তিনি করেননি।
হরনিম্যানের ভারত প্রত্যাবর্তনের খবর তৎকালীন ভাইসরয়ের কাছে আসামাত্রই তিনি যারপরনাই ক্ষুব্ধ হন এবং ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট অ্যাক্টকে অবিলম্বে সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও এটি উপলব্ধি করতে তিনি বেশি সময় নেননি, যে সংশোধিত কোনো আইনই অতীতের নিষ্পন্ন কোনো ঘটনাকে বর্তমানে কার্যকর আইনের পরিসরে কল্পনা করে ভূতাপেক্ষভাবে কাউকেই অভিযুক্ত করতে পারে না।
No comments:
Post a Comment