Thursday, 1 September 2016

ডাইরি থেকে, সেপ্টেম্বর ২০২৩

প্রায় সাত বছর পর প্লাবনীদের বাড়ি এলাম। তবে এবার একেবারে অন্য ভূমিকায়। সজলদা মাঝরাতে ফোন করে বলছে, আর্জেন্ট কেস। প্রেগন্যান্ট একজনকে নিয়ে ইমিডিয়েট নার্সিংহোমে অ্যাডমিট করতে হবে। অগত্যা রাজি হতে হল। কারণ এখন এই আমার পেট চালানোর উপায়। চার বছর ধরে গাড়ি ভাড়া খাটিয়েই দিন গুজরান হচ্ছে।

ঠিকানাটা যখন শুনলাম
- আরে টিউলিপ প্রেস। চন্দ্রানীর সামনে জয় বাংলা দোকানটা আছে না, তারই মেয়ে। আমেরিকায় থাকে...
- থাক থাক আমি চিনি।
- বেশ ভালো কথা, দেরি করিস না। চল, চটপট বেরিয়ে পর।

আমার বাড়ি থেকে প্লাবনীদের বাড়ি ঢিল ছোড়া দূরে। তাই পৌছতে বেশি সময় লাগবে না। মা এখন 
জানতে চায় না, কোথায় যাচ্ছি। জানে ছেলে রোজগার করতেই যাচ্ছে।

প্লাবনীদের বাড়ির সামনের গলির মুখে গাড়ি দাঁড় করালাম। ওর ভাই বাপ্পা ছুটতে ছুটতে এসে বলল, চলো দিদিকে ধরে নিয়ে আসতে হবে। কি স্বাভাবিক ব্যবহার। ততক্ষণে দেখি প্লাবনীর বাবা-মা তাকে কাঁধে করে দরজার সামনে নিয়ে এসেছে। আমি এগিয়ে যেতে খপ করে আমার হাতখানা চেপে ধরল প্লাবনী। এই চরম যন্ত্রণাদায়ক মুহূর্তেও কত সূক্ষ্ম অভিনয় দেখাল সে। বুঝিয়ে দিল, আর পাঁচটা গাড়ির ড্রাইভারের সাথে একজন প্রেগন্যান্ট মহিলা যেমন ব্যবহার করে, সেও সেই স্বাভাবিক ব্যবহারই করল। চরম কষ্ট পাচ্ছে সে। আমরা কোনওমতে তাকে গাড়ির পিছনের সীটে নিয়ে এসে বসালাম। তার দুই পাশে বসলো তার বাবা-মা। বাপ্পাকে সঙ্গে নিয়ে আমি সামনে। পিছনে স্বামী-স্ত্রীর কথা কানে এল
- তন্ময় ফোন করে জানালো আর আধ ঘন্টার মধ্যেই ওর ফ্লাইট।
- ওকে বললে তো টেনশনের কোনও কারণ নেই?
- টেনশন তো করবেই, আমেরিকায় অত বড় বড় নার্সিংহোম থাকতে...
- থাক ওসব কথা। কই ড্রাইভার, জলদি! জলদি! জলদি!

আমার চার বছরের ড্রাইভার জীবনে কোনও পার্টিই আমাকে আজ পর্যন্ত ড্রাইভার বলে ডাকেনি। ডাকেও না কাওকে। যদিও বা ডাকে, কিন্তু ইনি কেন? ইনি কি আমাকে চেনেন না? ভুলে গিয়েছেন আমার মুখ? আমার পরিচয়? এই গাড়ির ভেতর চারজনের কেওই কি আমাকে চেনে না? মনে নেই আমাকে? মনে নেই এদের সাথেই আমি কত সময় কাটিয়ে এসেছি। প্লাবনীর গর্ভে যে সত্তাটি ঠাই করে নিয়েছে, সে বরঞ্চ আমার কাছে অচেনা, অপরিচিত। তার খাতিরেই কি সবাই অপরিচিত হয়ে গেল!

আকাশপাতাল ভাবা বন্ধ করে গাড়ি স্টার্ট দিলাম। পনেরো মিনিটের তো রাস্তা।

মানুষ আশা-আকাঙ্ক্ষাকে আঁকরে ধরে কাঙালের জীবনযাপন করছে। তা সে যে গোত্রের মানুষ হোক না কেন। অতীতে দেখে আসা, আর বর্তমানে দেখতে থাকা আশা-আকাঙ্ক্ষার স্বপ্নগুলো সত্যি করতে মানুষ ছুটে চলেছে। এই স্বপ্নগুলো এক একটা স্থির ছবি হয়ে মনের কোনে জমা হয়ে থাকে। সেগুলোকেই জীবন্ত করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে মানুষ। বেঁচে ওঠা স্বপ্নগুলোর ভাগীদার হয়ে যদি মুহূর্তের সুখ পাওয়া যায়, সেও অনেক।

আমিও স্বপ্ন দেখেছিলাম প্লাবনীকে কাছে পাওয়ার। স্ত্রী রূপে পাওয়ার। ওর গর্ভে আমারই সন্তান বেড়ে উঠবে - এই ছবিই নিজের মনে মনে কল্পনা করেছিলাম। তার সেই কল্পনাসুত্রে আমারই তো স্টেয়ারিং ধরে থাকার কথা - গাড়ির ড্রাইভার হিসেবে নয়, একজন স্বামী হিসেবে। যখন ওকে ধরে ওর মা-বাবা পিছনের সীটে বসে থাকবে আর ভাই থাকবে সামনের সীটে আমার পাশে, তখন আমারই তো গড়ি চালিয়ে নার্সিংহোম নিয়ে গিয়ে অ্যাডমিট করানোর কথা। সেই স্বপ্নে দেখা মুহূর্ত ঠিক বেঁচে উঠেছে আমার কাছে। এক হাতে, কবে কোন কালে করা কল্পনার ছবি আর অপর হাতে এই মুহূর্তসুখের ছবিখানা নিয়ে মিলিয়ে মিলিয়ে দেখছি। ছবির কোনও পটভুমি থাকে না, থাকে না কোনও ভূত ভবিষ্যৎ, না কোনও সম্পর্কের মারপ্যাঁচ। চরিত্রগুলো খালি অভিনয় করে - আর তাতেই ক্ষণিকের সুখ ভোগ করে। যা আমি আজ করলাম - গর্ভস্থ সন্তানের পিতার অভিনয়। আসল পিতা এখন ইকোনমি ক্লাসে বসে বুর‍্যিটো ঠুসছে।




No comments:

Post a Comment