১ কেজি বলতে কতটা বোঝায় ? গনেশ আটা বা ঢেঁকি ছাঁটা সত্যেন্দ্র ছাতুর প্যাকেটটা দেখিয়ে দিলে মোটামুটি আন্দাজ করা যায় ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন উঠবে এই পরিমাণটা এল কোথা থেকে ? তাছাড়া দুনিয়া জুড়ে যারা ১ কেজি = ১০০০ গ্রাম = ২.২০৪৬২ পাউন্ড = ০.০৬৮৫ স্লাগ (নেহাতই সখে, সেই প্রাচীন ইম্পিরিয়াল পদ্ধতিতে) ব্যবহার করে আসছেন, তারাই বা সিওর হবেন কি করে যে ঠিকঠাক পরিমাণটাই দাঁড়িপাল্লায় চাপাচ্ছেন ?
১৮৮৯ সালে প্যারিসের কাছে সেভ্রেস (যদিও ফরাসিরা বলে সেভ্) শহরে অনুষ্ঠিত জেনারেল কনফারেন্স অন ওয়েটস্ অ্যান্ড মেজারস্-এ বিশ খানেক বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা জমায়েত হন এবং বোঝাপড়ার মাধ্যমে ঠিক করেন, যে আজ থেকে বিশেষভাবে তৈরি নস্যির ডিবের মতো দেখতে একটা নিরেট চোঙাকৃতি ধাতব টুকরোর ভরকে এক কেজি ধরা হবে এবং সেই হিসেবে যাবতীয় মাপজোখ ও খরিদ্দারি চলবে । ৩৯ মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের সমান উচ্চতা ও ব্যাসের লম্ব-বৃত্তাকার চোঙাকৃতি, ৯০% প্লাটিনাম ও ১০% ইরিডিয়াম ধাতুর সংকরে তৈরি টুকরোটি প্যারিসের কাছে সেন্ট ক্লাউড নামক এলাকায় অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ব্যুরো অফ ওয়েটস্ অ্যান্ড মেজারস্-এর (সংক্ষেপে বিআইপিএম - কি করে ? আসলে, ফরাসি নাম ব্যুরো ইন্টারন্যাশনাল দেস পুয়া এট্ মেজারস্-এর সংক্ষেপটা ব্যবহার করা হয়) সংগ্রহশালা প্যাভিলিও দি ব্রেটুইয়ে কাঁচের কৌটোর মধ্যে রাখা আছে । যত্ন-আত্তির কোনোপ্রকার খামতি না থাকা সত্বেও, ধুলোবালি লাগার কারণে চোঙটির যেমন ওজন (মানে ভর - ভাষাটা বাংলা, কি আর করা যাবে !) বাড়ার সম্ভাবনা আছে, তেমনই নাড়াঘাঁটার কারণে ক্ষয়ে-টয়ে ওজনে কমতিরও চান্স থেকে যাচ্ছে । এই ঝামেলা দূর করতে গোটা বিশ্বের বৈজ্ঞানিকরা দু'দশক ধরে উঠেপড়ে লেগেছিল । কেজিকে কিভাবে অক্ষয় (দুনিয়া চুলোয় যাক, সেটি যেন যা-কার-তাই থাকে) কিছু একটা দিয়ে ধরেবেঁধে রাখা যায়, সে ভাবনার এতদিনে ইতি হয়েছে । সাধু !
বিনিময় প্রথার যখন চল ছিল তখন লেনদেনে না দরকার পড়তো ওজনের, না অর্থের । প্রথম প্রথম ওজনের ধারণাটাই এসেছিল বস্তাবন্দী শস্য থেকে । ফরাসি বিপ্লব এবং সাথে সাথে নবজাগরণের সময়টাতে মানুষ প্রথম (বললে, সায়েন্টিফিক্যালি) কিলোগ্রাম মার্কেটে আনলো (যদিও কিলোগ্রামের অরিজিনাল নাম ছিল 'গ্রেভ') । পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে লম্বা রেসের শাসকদের লিস্টে প্রথম (৭২ বছর ১১০ দিন ধরে গদিতে বসেছিলেন) ফরাসি সম্রাট মহান লুই (চতুর্দশ) প্রতিষ্ঠিত ফ্রেঞ্চ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস ১৭৯৩ সালে একটা কমিশন বসান । সেই কমিশন ঠিক করে যে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতায় (এই উষ্ণতায় জলের ঘনত্ব সর্বাধিক হয়) এক ঘনডেসিমি পরিষ্কার পাতিত জলের ওজনকে এক কিলোগ্রাম হিসেবে ধরা হবে । যেকোনো ল্যাবরেটরিতে ঠিকঠাক সাজ-সরঞ্জাম থাকলে এই স্ট্যান্ডার্ডে এক কেজি ওজন মেপে নিয়ে কাজকর্ম করা যায় । সেটুকু ঝামেলাও বাদ দিতে চাইলে সমপরিমাণ জলের ওজনের একটা পিতলের বাটখারা বানিয়ে নিলেই হল (এবং তাইই করা হয়েছিল) ।
কিন্তু তাতে একটি সমস্যা থেকে যাচ্ছে । এক রাশির পরিমাপ করতে গিয়ে আরেক রাশির দরকার পড়ে যাচ্ছে - (ডেসি) মিটারের । সে সময়ে মিটারের মাপজোখ আজকের মতো নিখুঁত ছিল না । উত্তরমেরু থেকে নিরক্ষরেখার ভৌগলিক দূরত্বের মোটামুটি এক কোটি ভাগের এক ভাগকে মিটার হিসেবে চালানো হতো । শুধু মিটার কেন, উষ্ণতাও আছে । তাদের মানে ভুলভ্রান্তি হলে ওজনের মানেও হবে । তো যেদিন জলের উষ্ণতা আর মিটার ঠিকঠাক পরিমাপ করা সম্ভব হল, সেদিন বিজ্ঞানীরা প্লাটিনামের তৈরি (যত কেমিক্যালি ইনঅ্যাকটিভ ও অবশ্যই শক্তপোক্ত হবে তত ভালো, তাই না ?) একটা বাটখারা বানিয়ে নিলেন ।
ইরিডিয়াম আবিষ্কারের পর ৯০ ভাগ প্লাটিনামে ১০ ভাগ ভেজাল দিয়ে শেষ যে বাটখারাটি বানানো হল সেটাই সেন্ট-ক্লাউডে রাখা আছে - একটা না, ছ'ছটা (পাছে যদি চুরি যায়) । বাটখারাটির একটা নাম দেওয়া হয়েছে - ইন্টারন্যাশানাল প্রোটোটাইপ কিলোগ্রাম (সংক্ষেপে আইপিকে) । প্লাটিনাম-ইরিডিয়াম সংকর নেওয়া হল কেন ? কারণ আর কিছুই না, সেই শক্তপোক্ত হবে, ক্ষয় হবে না আর অবশ্যই রাসায়নিকভাবে নিস্ক্রিয়, বিশেষ করে অক্সিজেনের সাথে ভুলেও বিক্রিয়া করবে না । এই আইপিকে কেবল সেন্ট-ক্লাউডেই রাখা হয়নি, বিভিন্ন দেশেও একটা করে পাঠানো হয়েছে, নইলে কি নানা দেশের বিজ্ঞানীরা বার বার ফ্রান্স ছুটে আসবে ওজন মাপতে !
আবার বলছি, হাজার সুরক্ষা সত্বেও, দেখা যাচ্ছে আইপিকের ওজন পাল্টাচ্ছে । তাই বিআইপিএম মার্কেটে ব্র্যান্ড নিউ কিলোগ্রাম ছাড়তে চলেছে । শুধু তাই নয়, তার সাথে অন্যান্য মৌলিক এককগুলোর মাপজোখও, যেগুলোকে আমরা এসআই একক নামে চিনি ।
আইডিয়াটা হচ্ছে ক্ষয়িষ্ণু জিনিস দিয়ে বাটখারা বানালে ওজনের হেরফের তো হবেই, তাই কৌটোতে রাখা বাটখারার বদলে প্রাকৃতিক কোনো ধ্রুবকের (অভাব নেই, আলোর বেগ, প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক, আভোগাদ্রোরও ইত্যাদি ইত্যাদি) সাপেক্ষে কেজির পরিমাপ ঠিক করলে কেমন হয় ? বাম্পার হয় । হলও তাই । কিন্তু এটুকু ভাবতে বিশ বছর লেগে গেল ? তা না । আসলে সময়টা লাগলো ধ্রুবকটার নিখুঁত মানটা পেতে । এতটাই নিখুঁত যে, পরিমাণে প্রতি ১০০০০০০০০০ ভাগে মাত্র ৩০ ভাগ ভুল থাকার সম্ভাবনা থাকবে (অর্থাৎ উল্টো দিক থেকে বললে প্রতি একক পরিমাপে ০.০০০০০০০৩ অংশ পর্যন্ত নিখুঁত মান পাওয়া যাবে) ।
ভেবে দেখলে, ব্যাপারটা নতুন কিছু না । আগেও বিজ্ঞানীরা সময় আর দৈর্ঘ্যের ক্ষেত্রে এই ধরনের কেরামতি দেখিয়ে এসেছে । নিজের অক্ষের চারিদিকে একটা সম্পূর্ণ পাক লাগাতে পৃথিবী যত সময় নেয়, তার ৮৬১৬৪ ভাগের এক ভাগ সময়কে এক সেকেন্ড বলা হতো । কিন্তু পৃথিবীর ঘূর্ণনের হেরফের বা সেই ধরনের কিছু হলে, সময়ের কোটাতেও গণ্ডগোল দেখা দিতে পারে (যেমন ২০০৪ সালের সুনামির ফলে পৃথিবীতে দিন ২.৬৮ মাইক্রোসেকেন্ড কম হয়ে যায়) । তাই সেকেন্ডের নতুন সংজ্ঞা দেওয়া হয় - " ০ কেলভিন উষ্ণতায় সিজিয়াম-১৩৩ মৌলের একটি পরমাণুর গ্রাউন্ড স্টেটের দুটি হাইপারফাইন স্তরে ট্রানজিশনের সময় যে শক্তি বিকিরণ হয় তার ৯১৯২৬৩১৭৭০টি কম্পন সম্পূর্ণ হতে যে সময় লাগে তাকে ১ সেকেন্ড বলে ।" এটা কখনই পাল্টাবে না, যেখানে খুশি,যখন খুশি মাপা হোক না কেন ।
একই ভাবে আরেকটি প্রাকৃতিক ধ্রুবককে কাজে লাগিয়ে মিটারটাও ফিক্সড্ করা হয়েছে । শুন্য মাধ্যমে আলোর বেগ প্রতি সেকেন্ডে ২৯৯৭৯২৪৫৮ মিটার - এটা বিজ্ঞানীরা হিসেবনিকেশ করে বের করেছেন । অতএব, ১/২৯৯৭৯২৪৫৮ সেকেন্ডে আলো যতটা পথ যায় ততটাই হল এক মিটার ।
এবার আসা যাক, ফাইনালি, কিলোগ্রামের মাপে । এখানে যে প্রাকৃতিক ধ্রুবকটি ব্যবহার করা হয়েছে সেটি হল প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক । মান ০.০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০৬৬২৬০৭০১৫ জুল-সেকেন্ড । আলোর কণা বা ফোটনের মোট শক্তি আর তার কম্পাঙ্কের অনুপাত নিয়ে প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবকের মান বের করা হয় ।
প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবকের জুল-সেকেন্ড (অনেক ক্ষেত্রে আর্গ-সেকেন্ড) এককটি বেশি প্রচলিত হলেও, এর আরেকটি একক আছে - কিলোগ্রাম-বর্গমিটার/সেকেন্ড । সেকেন্ড আর (বর্গ)মিটারের নিখুঁত হিসেব তো আগেই পেয়ে বসে আছি, এবার শুধু তাদের সাথে প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক ঠিকঠাক গুণ-ভাগ করে নিলেই কিলোগ্রামের ব্র্যান্ড নিউ নিখুঁত 'বাটখারা'টি পেয়ে যাব ।
আগেই বলা হয়েছে, প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক অ্যাকিউরেটলি মাপতে গিয়েই বিজ্ঞানীদের এতটা দেরি হয়েছে । তার জন্য তাদের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম যন্ত্রপাতিও তৈরি করতে হয়েছে । খেটেছে ভালোই । এত পরিশ্রম করেও বিতর্ক এড়াতে পারেননি । আঙুল উঠেছে, এভাবে কিলোগ্রাম ঠিক করার ফলে, কিলোগ্রামের সাথে অন্যান্য এসআই এককগুলির লিঙ্ক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে । যেমন - মোল, যা পদার্থে উপস্থিত মোট কণার সাপেক্ষে পদার্থের পরিমাণ বোঝাতে ব্যবহার করা হয় । ফলে কিছু কিছু বিজ্ঞানী আবার অন্য নতুন ধরনের ফলাফল পেশ করেছেন ।
সে যাই হোক, বিআইপিএম সহ পৃথিবীর অন্যান্য মাপজোখের সংস্থাগুলি ভোটাভুটির মাধ্যমে কিলোগ্রামের নতুন সংজ্ঞাটি মেনে নিয়েছেন । তার সাথে মোল, কেলভিন, অ্যাম্পিয়ার, ক্যান্ডেলা ইত্যাদি এসআই এককগুলোর সংজ্ঞাও শুধরে নেওয়া হয়েছে ।
এতকিছু তোলপাড় সত্বেও সাধারণ মানুষের রোজকার জীবনে স্পেশাল কিছু পাল্টাপাল্টি হবে বলে মনে হয় না । রেড লেবেলের এক কেজির প্যাকেট আগে যতটা ভারি লাগতো, পরেও ততটাই লাগবে । কিন্তু বিজ্ঞানীরা পরিবর্তনটা হাতেনাতে টের পাবেন । তাদের মাপামাপি সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হবে । আর সবচেয়ে বড়ো কথা '১ কিলোগ্রাম কতটা'-র উত্তর দিতে আর প্লাটিনাম-ইরিডিয়ামের চোঙের ওজন নিয়ে আর মাথা ঘামাতে হবে না ।
অনুবাদ : কেভিন পিম্বব্লেটের লেখা আর্টিকেল The Kilogram Is Being Redefined – a Physicist Explains (The Conversation-এ প্রকাশিত)
No comments:
Post a Comment