শ্রীশ্রী সম্বিত পাত্র মহাশয়,
আপনাকে চিঠি লেখার সুযোগ পেয়ে আমি যারপরনাই আনন্দ পেয়েছি । তবে আপনি আদৌ আমার চিঠিটি খুলে পড়বেন কি না জানি না । কারণ, হয় আপনি মোল্লা খেদাতে ব্যস্ত থাকবেন অথবা বাংলা বর্বরের ভাষা ভেবে চিঠিটা চুলোয় দেবেন । প্রথমটা আপনার ব্যক্তিগত রুচি, দ্বিতীয়টি, মাফ করবেন বাংলা আপনার ভাষা নয় । কথা উদ্ধার করতে রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ মহাশয়ের সাহায্য নিলেও নিতে পারেন । তবে উনি এখন বোধহয় উর্দু হরফে সংস্কৃত লেখা প্র্যাকটিস করছেন । ‘পা ভেঙে হাতে ক্র্যাচ ধরিয়ে’ যেন না দেন, সেই ভয়ে বাবুল সুপ্রিয় মহাশয়ের নাম নিচ্ছি না । যাই হোক ব্যবস্থা চাইলে আপনি ঠিকই করে নেবেন । ওএনজিসির ডিরেক্টরের পদটা যেভাবে ‘ব্যবস্থা’ করে নিয়েছেন ।
ওএনজিসি বলতে খেয়াল হলো, আপনাকে ডঃ সম্বিত পাত্র বলে সম্বোধন করিনি বলে অসন্তুষ্ট হননি তো ? আসলে আজকাল ওসব চলে না বুঝলেন । এই যেমন ‘কাঠ্পুতলী’ মনমোহন সিংকে কজনই বা ‘ডঃ’ সম্বোধন করেন ! আপনি করেন ? আরেকটি কথা, আপনি ছাড়া আরও আটজন ওএনজিসির ইন্ডিপেনডেন্ট ডিরেক্টর আছেন, জানেন নিশ্চয়ই । তাদের শংসাপত্রগুলির সাথে আপনার শংসাপত্রটি তুলনা করছিলাম । রাত নটার রিয়্যালিটি শো’গুলোতে (যেগুলোকে অনেকে প্রাইমটাইম ডিবেটও বলে) আপনার সামনে রাখা প্রশ্নগুলির সাথে আপনার উত্তরগুলির তুলনা করলে যেমনটি মনে হয় তেমনটি মনে হল ।
আচ্ছা আপনি কতদিন থেকে মোল্লা খেদাচ্ছেন ? হালে ‘বঙাল খেদাও’ চলছে (সেটিও আপনার কাছে একপ্রকার মোল্লা খেদাওই) – সে বিষয়ে আপনার কি মত ? ও মাফ করবেন, আপনার আবার মতামত আছে নাকি কিছু ! গুহ্যদ্বারে অব্জ গুঁজে মুখ দিয়ে বাতকর্মকারী নাচারদের ন্যায়সঙ্গত মতামত দেওয়ার অক্ষমতা, ডিমানিটাইজেশনের মতো হাজারো প্রকল্পের ব্যর্থতা স্বীকার করে জনসাধারণের কাছে ক্ষমা না চাওয়ার অনৈতিকতারই সমান । কিন্তু আপনি তো সেরকম নন । আপনাকে বললাম থোড়াই । আপনি তো মতামত দেন, তা সে যতই অপ্রাসঙ্গিক, অবান্তর, অসংলগ্ন হোক না কেন ! ব্যাখ্যা করে বোঝান, তা সে যতই একঘেয়ে, ভিত্তিহীন, অন্তঃসারশূন্য হোক না কেন ! তথ্যপূর্ণ কথা ছাড়া কথাই বলেন না – তা সে যতই ‘পোস্ট কার্ড বা অপ ইন্ডিয়ার ‘তৈরি খবর’ হোক না কেন ! নিন্দুকেরা এও বলে ‘হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়য়ের ফরোয়ার্ড’ ছাপিয়ে আপনি মোল্লা খেদাতে নামেন । আপনিই বলুন অমিত মালভ্যের মতো লোক থাকতে আপনার, শুধু আপনার কেন, বিজেপির সমস্ত মুখপাত্রমণ্ডলীর তথ্যের জন্য চিন্তার কিছু কারণ আছে । হ্যাঁ, মাঝেসাঝে অখিলেশ যাদব খোদ নিজের বাপকেই চড়থাপ্পড় মেরে বসেন ঠিকই তবে বত্রিশ লক্ষ্য (খালি উত্তরপ্রদেশেই) হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড কারখানার মধ্যে আর কয়টিকেই বা আপনি সামলে সামলে রাখবেন ! প্রধান সেবক তো টিকিট বুক করতেই ব্যস্ত । রাষ্ট্রপতি অমিত শাহ মহোদয় দেশশাসনে (ও, আরেকটা রাষ্ট্রপতি আছে তাই না ?) ব্যস্ত । নির্মলা সীতারামন দেবী বাকি মন্ত্রীদের প্রতিরক্ষা দিতে ব্যস্ত । অনিল জেটলি বাবু বই লিখছেন শুনছি ? দ্য ওয়েলথ অফ নেশনস পার্ট টু । বিজয় মাল্য ইতিমধ্যে ফরোয়ার্ড লিখে পাঠিয়ে দিয়েছেন ।
দেখুন তো । আপনার ব্যাপারে লিখবো ভাবলাম, বাপঠাকুরদায় গিয়ে ঠেকলাম । দোষ ধরবেন না, হালের ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’ নরেন্দ্র মোদী মহাশয় তো আপনার ‘বাপ’ই ! আপনিই বলেছেন, খেয়াল নেই ? কানহাইয়া কুমারকে (যদিও, পুরো দেশেরই ‘বাপ’ বানিয়ে দিয়েছিলেন । যাই হোক আপনিও তো এই দেশেরই সদস্য) । তবে আর নয় । আপনাতে আসা যাক ।
আচ্ছা আপনি আসেন ? রিপাবলিক টিভির স্টুডিওতে ? নাকি সেখানেই মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে রাতটা কাটিয়ে নেন ? আচ্ছা রিহার্সাল চলে কখন ? থাক, সে না হয় নাই বললেন ।
কিন্তু মোল্লা খেদানোর অনুপ্রেরণা কোথা থেকে, কার বা কাদের কাছ থেকে পেলেন বলতেই হবে ? আচ্ছা ১৯৯২-এর ৬ই ডিসেম্বর আপনি কোথায় ছিলেন ? কি করছিলেন ? সেদিনকি ভেবেছিলেন আপনিও একদিন বানরসেনা হবেন ? ‘মন্দির ওহি বনেগা মৌলানা’র শ্লোক সকালসন্ধ্যে জপ করবেন ? ‘বুক ঠুকে’ বলবেন, ‘মন্দির ভি বনেগা, স্মারক ভি বনেগা, মূর্তি ভি বনেগা, চবুতরা ভি বনেগা, রাম কথা গ্যালরি ভি বনেগা, অডিটোরিয়াম ভি বনেগা’ ? তবে আমার একটা অভিযোগ আছে । আপনি আপনার ‘আসল চেহারা’ বেশিরভাগ সময় চেপে রাখেন কেন ? পারতপক্ষে সেটি প্রশংসারই যোগ্য । প্রথমে ভদ্রলোক সেজে কড়াই পাতো, ফের তেল গরম হতেই পকোড়া ছাড়ো (প্রধান সেবকের ফেভারিট) । মানছি, রবীশ কুমারের সামনে ‘আসল চেহারা’ দেখালে আপনার পদ্মছাপ দোদমা ‘ফাইট্যা হাতে চইলা আমু’ । কিন্তু বাকিরা ? সুধীর, অজয়, অর্ণব, অঞ্জনাদের শোতেও আপনি মাঝে মাঝে এত ভদ্র হয়ে যান, যা দেখে, একমাত্র তখনই অটলবিহারী বাজপেয়ীর খেয়াল আসে । তবে ‘মৌলানা’র একবার আঁচ পেয়ে গেলে ভদ্রতার ভাঁওতাটি ছেড়ে আপনি কাদা ছেটাতে যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন, সাফাইকর্মীরাও নর্দমায় সেভাবে ঝাঁপ দিতে পারবে না (প্রধান সেবক পারবেন বোধ হয় । আইটি সেলের ফটোশপ ডিপার্টমেন্টের কাছে তো সে দু’মিনিটের খেল) । আচ্ছা, আপনি এযাবৎ কতজনকে ‘মৌলানা’ বানিয়েছেন (পীর দরবেশের দরের লোক হে আপনি) ? আর আপনার ট্র্যাভেল এজেন্সি কতজনের এযাবৎ পাকিস্তানের টিকিট কনফার্ম করেছে ? আর মৌখিক ধর্মান্তরের কারবারই বা কতদূর ? সত্যিই, ফিরোজ গান্ধীকে পার্সি থেকে যেভাবে মুসলিম বানিয়েছিলেন, তার স্বীকৃতিতে একটা হাততালি তো অবশ্যই পাওয়া উচিৎ আপনার (মোহন ভাগবত বা যোগী আদিত্যনাথ খানিক রুষ্ট হলেও হতে পারেন) ।
আর ২০০২-এ কোথায় ছিলেন বলুন ? শুনছি নাকি ২০০২-এর গুজরাট শান্তি সম্মেলনের জন্য আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবছর শান্তিতে নোবেল পাচ্ছেন ? শুধু শান্তিতেই নয় অর্থনীতিতেও পাচ্ছেন ? একই বছরে জোড়া নোবেলের বিশ্ব রেকর্ড ! কি বলেন ? আমি তো আশা করেছিলাম ‘বাল নরেন্দ্র’-এর জন্য সাহিত্যেও না হয় দাওটা মারবেন... দেখছেন তো, আবার সেই প্রধানমন্ত্রীতে চলে এলাম । অবসেশন বুঝলেন, অবসেশন । আপনার যেমন, অমূলক উটকো তর্ক করতে অবসেশন । পেরে উঠতে না পারলে, ‘চুপ হো যা মৌলানা, চুপ হো যা’ বলে চেঁচাতে অবসেশন । যাকে খুশি তাকে দেশদ্রোহী, পাকিস্তানের চর, মোল্লা তকমা দিতে অবসেশন । চাটতে অবসেশন । চোখ পিটপিট করতে করতে ভিতরে ভিতরে ‘মোদীজি খুশ হোনগে, মোদীজি খুশ হোনগে’ ভাবতে ভাবতে ভারত মাতার সেবায় নিজেকে উজার করে দেওয়ার যে রোমাঞ্চ এবং গর্ব আপনি দিনরাত অনুভব করে আসছেন, সে নিয়ে একটা বই লিখে ফেলুন না মশাই । আরও একটি মা আছে, তাই না ? তাঁর বিষ্ঠা নাকি কোহিনূরের চেয়েও দামি ? তাঁর প্রস্রাব কি তবে পেট্রোলিয়ামের চেয়েও মূল্যবান ? দেখছি আপনাকে ঘুঁটের মুকুট পড়াতে হবে মশাই । রাগ করবেন না । বদনাম করছি কই ? আপনাকে ঘুঁটের মুকুটে (আর আরএসএসের চাড্ডিতে) দেখে ইংল্যান্ডের রানীও সমীহ করবে, দেখবেন ।
আর কি বলি ? আপনার নামের মানে জানেন ? বাংলা অভিধানে সম্বিৎ বলে একটি শব্দ আছে, যার অর্থ যেটি আপনি আপনার নামকরনের সময়েই হারিয়েছিলেন, আর ফিরে পাননি । আদৌ কোনোদিন পাবেন কি না জানি না । সরকার পাল্টালে যদি...
আর কিছু মনে পড়ছে না । তবে একটা ছড়া শোনাতে খুব ইচ্ছে করছে । ছড়াটা হচ্ছে আবু মুহাম্মদ মুসলিহ আল দীন বিন আবদাল্লাহ শিরাজি বলে একজন কবির লেখা । না না, নাম দেখেই পাকিস্তান বা বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবেন না, যেমনটি দানিশ আলিকে পাঠিয়েছিলেন । আপনার দেশেও অনেক মুহাম্মদ আছে, সরকারে বা পার্টিতে থাকলো না তো কি হল (আরএসএসে পর্যন্ত আছে) । যদিও ইনি পারস্যের লোক ছিলেন । আর বাংলায় যিনি ছড়াটিকে বিখ্যাত করেছিলেন তিনি হলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত । আর বলে রাখি, ছড়াটি কিন্তু আপনার জন্য মোটেই নয় । আপনাকে দেওয়া হচ্ছে, এবার থেকে যাদের সাথে প্রাইমটাইমে ডিবেটে নামবেন তাদেরকে ছড়াটা ধরিয়ে দেবেন আর অনুরোধ করবেন, আপনি আপনার ‘আসলি চেহারা’য় চলে এলে তারা যেন ছড়াটা জোরে জোরে আওড়ায় । দেখবেন আপনার জনম শুধরে যাবে । ছড়াটি হল –
কুকুর আসিয়া এমন কামড়
দিল পথিকের পায়
কামড়ের চোটে বিষদাঁত ফুটে
বিষ লেগে গেল তাই।
ঘরে ফিরে এসে রাত্রে বেচারা
বিষম ব্যথায় জাগে,
মেয়েটি তাহার তারি সাথে হায়
জাগে শিয়রের আগে।
বাপেরে সে বলে র্ভৎসনা ছলে
কপালে রাখিয়া হাত,
তুমি কেন বাবা, ছেড়ে দিলে তারে
তোমার কি নাই দাতঁ?
কষ্টে হাসিয়া আর্ত কহিল
“তুই রে হাসালি মোরে,
দাঁত আছে বলে কুকুরের পায়ে
দংশি কেমন করে?”
কুকুরের কাজ কুকুর করেছে
কামড় দিয়েছে পায়,
তা বলে কুকুরে কামড়ানো কিরে
মানুষের শোভা পায় ?
জয় শ্রী রাম
পুনশ্চ : ভুত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি গান রাম লক্ষ্মণ সাথে আছে করবে বল কি ?
No comments:
Post a Comment