Monday, 19 November 2018

ঝুলনের জন্য ৬

মধ্যযুগে সামন্ততান্ত্রিক জাপানের সামরিক বর্গের লোকেদের বুশি বলা হতো । তাদের মাথায় থাকতো চোঙমাগে ঝুঁটি । গায়ে ছিল কিমোনো পোশাক, সাথে হাউরি, হাকামা, তাবি, পায়ে গীতা (একধরনের খড়ম জাতীয় জাপানি চপ্পল)। কাতানা, ওয়াকিজাসি, তাচি, তান্তো ইত্যাদি হাতিয়ার ছিল তাদের সবসময়ের সঙ্গী । এই বুশিরা গোটা বিশ্বের কাছে সামুরাই নামেই বেশি পরিচিত । আত্মসম্মানে ভরপুর লড়াকু সামুরাইরা শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণের চেয়ে স্বেচ্ছায় মৃত্যুগ্রহণকে অধিক সম্মানের মনে করতো । তাই শত্রুর হাতে পড়ার আগে তান্তো ছুরি দিয়ে নিজের পেট কেটে আত্মহত্যা করাটাই ছিল তাদের অন্তিম প্রবিধান । একে বলা হয় হারাকিরি । হারাকিরি জাপানি প্রথা হলেও এই ধরনের 'অনার সুইসাইড' নানা যুগে নানা দেশে নানা ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে । ১৯৩১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এলাহাবাদের আলফ্রেড পার্কে ব্রিটিশ পুলিশের সাথে লড়াইয়ে চন্দ্রশেখর আজাদ যখন জখম হয়ে পড়েন এবং বুঝতে পারেন পুলিশের ঘেরাও থেকে পালানোর আর কোনো উপায় নেই তখন নিজের কোল্ট পিস্তল দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন । ৬৭ খ্রিষ্টাব্দে মধ্য এশিয়ার কোনো এক শহরের সীমানায় অবস্থিত একটি গুহায় ৪১ জন ইহুদি মিলে ঠিক একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় । কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুজন বেঁচে যায় । কিভাবে ? কারণ তাদের মধ্যে একজন গুনতে জানতো । আর তাদের মধ্যে একজন জোচ্চোর কাপুরুষও ছিল ।

যে সময়ের কথা বলছি সে সময়ে রোমান সাম্রাজ্য পশ্চিমে ব্রিটেন থেকে পূর্বে ইরান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল । তারই অন্তর্গত পূর্ব এশিয়ার ইহুদি অধ্যুষিত একটি রাজ্যের নাম জুডিয়া (যেখানে ৩০ থেকে ৩৩ খ্রিষ্টাব্দের মাঝে কোনো এক সময়ে সেখানকার শাসক পন্টিয়াস পিলাটের আদেশে এক জনপ্রিয় ইহুদি ধর্মপ্রচারককে ক্রুশকাঠে বিদ্ধ করে হত্যা করা হয়) । বিখ্যাত রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের (জুলিয়াস সিজারের দত্তকপুত্র অগাস্টাস সিজারের সৎছেলে) দত্তকপুত্র নিরো ছিলেন তখনকার রোমান সম্রাট । তার কাছে খবর আসে জুডিয়ার ইহুদিরা রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে । বিদ্রোহ দমন করতে সৈন্য পাঠানো হয় । সৈন্যদলের নেতৃত্বে ছিলেন রোমান সেনাপতি ভেস্‌পেসিয়ান, যিনি পরবর্তীকালে রোমের সম্রাটও হন । শুরু হয় ইহুদি-রোমান যুদ্ধ । ৭০ বছর ধরে যুদ্ধ চললেও, যুদ্ধশেষে জুডিয়াতে রোমান সাম্রাজ্যের শাসন পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয় । ভেস্‌পেসিয়ানের অভিযানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি হল ইয়োদফাট অবরোধ । জুডিয়ার উত্তরে অবস্থিত গ্যালিলি অঞ্চলে মাত্র ১২ একর জমির ওপর তিনদিকে পাহাড় আর একদিকে পাঁচিল ঘেরা ছোট্ট শহর ইয়োদফাট । ছোট্ট হলেও ইয়োদফাটের বাসিন্দারা ভেস্‌পাসিয়ানের আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে । উভয়পক্ষের প্রচুর সৈন্য হতাহতের পর (ভেস্‌পাসিয়ানও একবার আহত হন) অদম্য এবং অফুরন্ত রোমানবাহিনী ইয়োদফাটের প্রতিরক্ষা পাঁচিল ধ্বংস করে শহরে প্রবেশ করে । অপরাজেয় রোমান সৈন্যদলের ৪৭ দিন সময় লেগেছিল ইয়োদফাট অবরোধ করতে । যার পরিচালনায় ইয়োদফাটের ইহুদিরা ৪৭ দিন ধরে রোমান সৈন্যদের দোরগোড়ায় ঠেকিয়ে রেখেছিল তার নাম হল ইয়োসেফ বেন মাতিতেয়াহু । 

জেরুসালেমে জন্মগ্রহণকারী মাতিতেয়াহু পারতপক্ষে ছিলেন পণ্ডিত, ঐতিহাসিক এবং হ্যাগিওগ্রাফার (মুনিঋষিদের জীবনবৃত্তান্ত লেখে যারা) । প্রশাসনিক এবং কূটনৈতিক ব্যাপারেও তার আগ্রহের অভাব ছিল না (কুড়ি কি বাইশ বছর বয়সে স্বয়ং সম্রাট নিরোর সাথে দেখা করে আসেন) । ইহুদি-রোমান যুদ্ধের প্রাক্কালে তাকে গ্যালিলির গভর্নর পদে নিযুক্ত করা হয় । সে কাজে বিশেষ সাফল্য না পেলেও, ভেস্‌পেসিয়ানের সেনাকে ছয় সপ্তাহ ধরে ইয়োদফাটের দোরে ঠেকিয়ে রেখে যথেষ্ট বীরত্ব এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেন ।

যদিও শেষ রক্ষা হল না । ভেস্‌পেসিয়ানের সেনার হাতে ৪০,০০০ জন ইহুদির প্রাণ গেল । হাজারের ওপর স্ত্রী ও শিশুকে দাসত্ব গ্রহণ করতে হল । আর মাতিতেয়াহুর কি হল ?

রোমান সৈন্য যখন পাঁচিল ভেঙ্গে শহরে ঢুকে পড়ে তখন ৪০ জন সঙ্গী নিয়ে মাতিতেয়াহু কাছের কোন এক পাহাড়ের গুহায় পালিয়ে গা ঢাকা দেয় । কিন্তু রোমান সৈন্যর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া অসম্ভব । তার ওপর মাতিতেয়াহুর মতো দুঁদে লোককে কোনোমতেই ছেড়ে দেবে না তারা । তাহলে উপায় ? হারাকিরি ! কিন্তু প্রকৃত হারাকিরির উপায় তো তাদের জানা ছিল না । তাই একে অপরকে হত্যা করার পরিকল্পনা করলো তারা । বাধ সাধলেন মাতিতেয়াহু । ৪০ জন একে অপরকে কাটাকাটি শুরু করলে বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড হবে । আবার, তাছাড়া উপায়ও নেই । সুষ্ঠুভাবে ও শান্তিতে যাতে কার্যসিদ্ধি হয় তার জন্য মাতিতেয়াহু নিজেই বুদ্ধিখাটিয়ে এক অভিনব উপায় বের করলেন । উপায়টি হল, তিনি সকলকে একটি বৃত্তাকার সজ্জায় পাশাপাশি দাঁড়াতে নির্দেশ দিলেন । তাদের মধ্যে নিজেও দাঁড়ালেন । এবার একজনকে বললেন, তার ঠিক পাশের জনকে (বাম দিকের জনকে) তরোয়াল দিয়ে হত্যা করতে । যে নিহত হল, তার পাশের জনের এবার পালা - নিজের পাশের জনকে হত্যা করার । এভাবে একে একে পাশের জনকে হত্যা করতে করতে ফের প্রথম জনে (বা তৃতীয় জনে) ফিরে এলে, সে তার জীবিত পাশের জনকে হত্যা করবে । অবশেষে এই মৃত্যুচক্রে মাত্র একজন অবশিষ্ট থাকবে । সেই প্রকৃতপক্ষে আত্মহত্যা করে কার্যসিদ্ধি করবে । 

এই ৪১ জনের হানাহানিতে সেই শেষজনটি ছিলেন ইয়োসেফ বেন মাতিতেয়াহু । মাতিতেয়াহু একাই বাঁচেননি, এমনকি শেষ যাকে হত্যা করার কথা, তাকেও তিনি নিস্তার দিলেন । অনন্যোপায় দুজনে অবশেষে ভেস্‌পেসিয়ানের কাছে আত্মসমর্পণ করলো ।

মাতিতেয়াহু আর তার এক সঙ্গীর বেঁচে যাওয়া নিছক ভাগ্যের ব্যাপার মনে হলেও, তা নয় । নির্বোধদের ভাগ্যের প্রয়োজন হয়, বুদ্ধিমানদের নয় । মাতিতেয়াহু কেবল বুদ্ধিমানই ছিলেন না, অঙ্কটাও বুঝতেন (ঠিকভাবে বলতে গেলে কম্বিনেটোরিকস্‌) । তিনি আগে থেকেই হিসেব কষে বের করে নিয়েছিলেন ৪১ জনের সজ্জায় ঠিক কোথায় দাঁড়ালে শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকা যাবে । উত্তরটি হল ১৬ । প্রথম যে পাশের জনকে হত্যা করতে শুরু করে, তার সাপেক্ষে ১৬-তম স্থানে দাঁড়ালে শেষ পর্যন্ত অক্ষত থাকা যাবে । মাতিতেয়াহু ১৬-তম স্থানটিকেই বেছে নিয়েছিলেন ।  বাকি আরেকজন ভাগ্যের জোরে বেঁচে গিয়েছিল বলা যেতে পারে । 

আন্দাজ করাই যায়, মাতিতেয়াহু মোটেই নিরুপায় হয়ে আত্মসমর্পণ করেননি । আত্মসমর্পণের ইচ্ছে না থাকলে কেউ কেন শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার সুযোগটি বেছে নেবে ? আসলে সবই ছিল তার পরিকল্পনা । অন্তত গুহায় প্রবেশের পর থেকে । নইলে বন্দি হওয়ার দুবছরের মধ্যেই কেউ কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে যায় কি করে ? শুধু তাই নয়, তারও কিছুদিনের মধ্যে রোমের নাগরিকত্ব লাভ করেন মাতিতেয়াহু । সাথে জুডিয়ায় আবাসন এবং মাসোহারা । পরবর্তী রোমান সম্রাটের দরবারে বিশিষ্ট পদও দখল করেছিলেন । সেই সম্রাটের বংশের নামে নিজের নাম পর্যন্ত পরিবর্তন করে দেন । নতুন নাম টিটাস ফ্লাভিয়াস জোসেফাস । এই নামেই ইতিহাসচর্চা চালিয়ে যান । জোসেফাসের পৃষ্ঠপোষক রোমান সম্রাটটি আর কেউ নন, তার এককালীন প্রতিদ্বন্দ্বী এবং প্রাক্তন রোমান সেনাপতি ভেস্‌পেসিয়ান ।

শুরুতেই একজন জোচ্চোর কাপুরুষের উল্লেখ করেছি ; বলে দিতে হবে না সে কে ।

তবে জোসেফাসকে ইতিহাস মনে রেখেছে তার জোচ্চুরি বুদ্ধি ব্যবহার করে মৃত্যুচক্রে সুরক্ষিত ব্যক্তির অবস্থান বের করার জন্য । বর্তমানে যা 'জোসেফাস প্রবলেম' (বা জোসেফাস বিন্যাস) নামে পরিচিত । বিভিন্ন সময় ধরে আলাদা আলাদা সংখ্যক লোকের জন্য জোসেফাস প্রবলেম সমাধান করার চেষ্টা করা হয়েছে । যেকোনো সংখ্যক (n) লোকের ক্ষেত্রে সমাধান বের করার চেষ্টাও চালানো হয়েছে । জার্মানির জুরিখ শহরে অবস্থিত সুইস ফেডেরাল ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজির (সংক্ষেপে ইটিএইচ জুরিখ) গবেষক লরেঞ্জ হালবেজেন এবং জার্মানিরই ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নরবার্ট হাঙ্গেরভুহ্‌লের তাদের এক গবেষণাপত্রে যেকোনো সংখ্যার (n) জন্য জোসেফাস নম্বর বের করার সূত্র বের করেন । জোসেফাসের নাম থাকলেও এতে তার বিন্দুমাত্র অবদান নেই ।

রোমান নাগরিকত্ব পাওয়ার পর জোসেফাস বই লিখতে শুরু করেন । তার বিখ্যাত বইগুলির মধ্যে 'অ্যান্টিকুইটি অফ দি জিউস', 'দ্য জিউইস ওয়ার', 'এগেন্সট এপিওন' ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য । 'দ্য লাইফ অফ ফ্লাভিয়াস জোসেফাস' নামে তার একটি আত্মজীবনীও আছে । তবে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হল, ইয়োদফাট অবরোধ, জোসেফাসের নেতৃত্বে ইহুদিদের বিক্রম, গুহায় মৃত্যুচক্রের খেলা আর শেষে আত্মসমর্পণ - এই সমস্ত বৃত্তান্তের একমাত্র ঐতিহাসিক দলিল আর কিছু না খোদ জোসেফাসেরই লেখা বই 'দ্য জিউইস ওয়ার' । 

***************

পুনশ্চ: ইহুদি-রোমান যুদ্ধের পর জুডিয়ায় ফের রোমের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে গ্যালিলি অঞ্চলের কিছু স্থানীয় অধিবাসী ঘরবাড়ি ছেড়ে রোমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে এবং বর্তমান ইতালির টাস্কানি প্রদেশে এসে পৌছায় । এই বংশের একজন উত্তরপুরুষ ছিলেন গ্যালিলিও বোনাইউটি । আদি বাসস্থান গ্যালিলির নাম অনুসারে তার গ্যালিলিও নাম রাখা হয় । তিনি টাস্কানির রাজধানি ফ্লোরেন্সের একজন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক ছিলেন । চিকিৎসার সাথে সাথে তিনি শিক্ষকতা এবং রাজনীতিতে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে প্রচুর খ্যাতি অর্জন করেন । তার সম্মান ও স্মৃতিতে পরবর্তী বংশধরেরা নিজেদের বোনাইউটি পদবি পাল্টিয়ে, তার নামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে গ্যালিলেই পদবি ধারণ করেন । গ্যালিলিও বোনাইউটির এক বংশধর ভিনসেনজো গ্যালিলেই তার জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম তাদের এই বিখ্যাত পূর্বপুরুষের নামে রাখেন । ভিনসেনজো গ্যালিলেইয়ের জ্যেষ্ঠপুত্রের নাম হয় গ্যালিলিও গ্যালিলেই । সেও পরবর্তীকালে কিছুটা বিখ্যাত হয়েছিল, আর কি !

No comments:

Post a Comment