Thursday, 10 January 2019

ঝুলনের জন্য ৭

এ বি সি...


ইংরেজি বর্ণমালার প্রথম তিনটি বর্ণ, a, b এবং c, পাশাপাশি বসিয়ে দিলেই হয়ে যায় abc। কোনো বিষয়ের প্রাথমিক বা মৌলিক ধারণা বোঝাতে abc শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ইংরেজ ম্যাথামেটিশিয়ান বারট্রান্ড রাসেলের লেখা The ABC of Relativity বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে (1925 সাল নাগাদ) জনসাধারণের কাছে খায় না মাথায় দেয় রিলেটিভিটি কিছুটা হলেও (কানা থেকে) ঝাপসা হয়। এমনকি তার বছর দুয়েক আগে প্রকাশিত The ABC of Atoms বইতে তিনি একইভাবে সহজ ভাষায় পর্যায় সুত্র, এক্স-রশ্মি, কোয়ান্টাম তত্ত্ব, তেজস্ক্রিয়তা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। কেবমাত্র সরলীকরণ নয়, বরঞ্চ উল্টো, অর্থাৎ বিস্তৃত বর্ণনার জন্যও abc কথাটি ব্যবহৃত হয়। আমেরিকার রাটগার বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডোলজির (মৃত্তিকা বিজ্ঞান) অধ্যাপক জেকব জোফির লেখা The ABC of Soils বইটি মাটি সংক্রান্ত এক বিশদ বিবরণের দলিল। এসবের বাইরে abc আরও নানা ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা স্তরে প্রচলিত Initial Sound Table-র একান্ত পরিচিত A for Apple, B for Ball, C for Cat...ইত্যাদির মতো, কোনো বিষয়ের অন্তর্গত বিশেষ বিশেষ শব্দ নিয়ে সেই সব বিষয়ের নিজস্ব initial table (আনুষ্ঠানিক বা ঘরোয়া) তৈরি করা হয়। যেমন - ABC of Journalism বলতে বোঝায় A for Accuracy, B for Brevity, C for Clarity...ইত্যাদি। যদিও abc এর ব্যাপক প্রয়োগ দেখা যায় অ্যাক্রোনিম (নামের সংক্ষিপ্তকরণ) তৈরিতে। আমেরিকার জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম - American Broadcasting Company, সংক্ষেপে  ABC, থেকে চীনের কৃষিব্যাঙ্ক - Agricultural Bank of China, সংক্ষেপে, এটিও, অবশ্যই ABC - সহ নানা সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, দল ইত্যাদি তাদের নামের সংক্ষিপ্তকরণ হিসেবে ABC ব্যবহার করে আসছে। আরও আছে। ক্যারিবিয়ান সাগরে উপস্থিত আরুবা, বোনাইরে এবং কুরাকাও দ্বীপ তিনটিকে একত্রে বলা হয় ABC Islands। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞানে HIV/AIDS সম্পর্কে সাধারণকে সচেতন করতে (যৌন শিক্ষার মাধ্যমে) ABC কর্মপন্থার (Abstinence, Be faithful, use a Condom) প্রচার করা হয়। তাসের একটি বিখ্যাত খেলা হচ্ছে পোকার। পোকার খেলার এক বিশেষ স্টাইলকে বলা হয় Abc। আরও আছে। মনোবিজ্ঞানে (Psychology) প্রচলিত নানা মনস্তাত্ত্বিক থেরাপির মধ্যে অবসাদ দূর করার একটি নামকরা থেরাপি হল সিবিটি (Cognitive Behavioral Therapy)। আমেরিকান মনস্তত্ত্ববিদ অ্যালবার্ট এলিস সিবিটি প্রয়োগের এক কার্যকরী মডেল পেশ করেন, নাম রাখেন ABC Model। আরও আছে। আরেক ইংরেজ লেখক চার্লস লুডউইগ ডজসনের (যদিও তিনি তার ছদ্মনাম লুই ক্যারল নামেই বেশি পরিচিত) লেখা বিখ্যাত উপন্যাস Alice's Adventure in Wonderland-এর দ্বিতীয় পর্ব (ইংরেজিতে যাকে sequel বলে এবং আর হাজারটা শব্দের মতো বাংলাতে এরও কোনো উপযুক্ত প্রতিশব্দ নেই) Through the Looking-Glass, and What Alice Found There উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ে একটি লম্বা কবিতা আছে (A boat, beneath a sunny sky/ Lingering onward dreamily/ In an evening of July...ক্রমশ)। কবিতাটির প্রতি লাইনের প্রথম বর্ণ পাশাপাশি বসালে (সাথে প্রয়োজনীয় শূন্যস্থান) একটি মেয়ের নাম পাই - (লুই ক্যারলের পরিচিত এই মেয়েটি ছিল তার ফটোগ্রাফির মডেল এবং পরবর্তীকালে মেয়েটির নাম ধার করে তিনি তার অমর সৃষ্টি অ্যালিসের নাম রাখেন) অ্যালিস প্লেজেন্স লিডেল। যাই হোক, এই ধরণের কবিতাকে ইংরেজিতে বলা হয় অ্যাক্রোস্টিক (acrostic) (বলে রাখি, একজন খ্রিস্টান কবি তার বন্ধু গৌরদাস বসাকের নাম নিয়ে বাংলা ভাষাতেও এই ধরণের একটি কবিতা লিখেছেন)। অ্যাক্রোস্টিক কবিতারও আবার নানা ধরণ আছে, তাদের মধ্যে একটি হল এবিসেডেরিয়াস (abecedarius), যেটি একটি ল্যাটিন শব্দ এবং যার ইংরেজিতে তর্জমা করলে মানে দাঁড়ায় ABC Primer। মোদ্দা কথা এখানেও একটি abc ঢুকে আছে। এভাবে খুঁজতে থাকলে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠের অনেক কিছুই পাওয়া যাবে যেখানে abc ব্যবহার করা হয়েছে। (এমনকি ইংরেজ প্রভুদের অনুকরণে বাংলাতেও অআকখ নাম ব্যবহারের চল গড়ে উঠেছে। কবিতা থেকে ফুটবল টিম পর্যন্ত কিছুই বাকি থাকেনি।)

তাহলে অঙ্কে কেন নয়?

আছে তো। অবশ্যই আছে। এবং সেটি হল একটি কনজেকচার (conjecture)। অর্থাৎ, সেই সমস্ত অঙ্কের প্রতিজ্ঞা (মা কালির দিব্যি জাতীয় কিছু ভেবে বসার দরকার নেই। ইংরেজিতে যাকে বলে proposition, তারই বাংলা করা হয়েছে প্রতিজ্ঞা) যারা এখনও উপপাদ্যের সম্মান পায়নি। আদৌ পাবে কি না, সেও অনিশ্চিত। কেও যদি এই ধরে সেই ধরে প্রমাণ করে দেয় যে কনজেকচারটি আগাপাছতলা সত্য তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তার উপপাদ্যের (বা fact) সম্মান জুটে যাবে; আবার কেও যদি দেখিয়ে দেয় (counter example দিয়ে) সকল স্থানে খাটছে না তাহলে নামের আগে লেগে যাবে মিথ্যের তকমা (false conjecture)।

আমরা এখানে জানতে চলেছি ABC Conjecture। তার আগে বলি নিকোলা বুরবাকির কথা।

নিকোলা বুরবাকি কোনো লোকের নাম নয়, ছদ্মনাম (ইংরেজিতে যাকে বলে pseudonym, যার অনেক মানের একটি মানে হচ্ছে ছদ্মনাম। যদিও এখানে stage name বা pen name জাতীয় বিষয় বোঝানো হচ্ছে)। তাও আবার কোনো মানুষের নয়, একটি দলের। গত শতকের ত্রিশের দশকে একদল ফরাসি ম্যাথামেটিশিয়ান (বেশিরভাগ প্যারিস শহরে অবস্থিত নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান École normale supérieure, সংক্ষেপে ইকোলের ছাত্র) মিলে একত্রিত হয়ে এই দলটি তৈরি করেন। ফুটবল খেলতে কিংবা রাজনীতি করতে নয়, অঙ্ক করতে। বুরবাকির সদস্যদের প্রথমদিকে পরিকল্পনা ছিল ম্যাথামেটিক্যাল অ্যানালিসিসের ওপর রাশভারী একখানা বই লেখার। যদিও পরবর্তীকালে বীজগণিত থেকে টোপোলজি সব ধরনের বিষয় নিয়েই চর্চা করতেন তারা। 1939 সাল নাগাদ তাদের প্রথম বই Éléments de mathématique প্রকাশিত হয়। লেখকের নাম নিকোলো বুরবাকি। শেষ প্রকাশিত বইটি হল Topologie algébrique (2016)। এরও লেখক নিকোলো বুরবাকি। অঙ্কের ফাঁকে ফাঁকে কৌতুক তামাশা করতেও তাদের জুড়ি ছিল না। সময়ের সাথে সাথে বুরবাকির জনপ্রিয়তা এবং অঙ্ক সমাজে তার প্রভাব দিন দিন বাড়তে থাকে। তাদের প্রয়োজন পড়ে এক সম্মেলনের, যেখানে সবাই অন্তত বছরের একটা দিন মিলিত হয়ে ভাবের আদানপ্রদান করবে। 1948 সালে প্যারিস শহরে বুরবাকি প্রথম সেমিনারের আয়োজন করে, নাম হয় Séminaire Nicolas Bourbaki। তবে থেকে আজও বার্ষিক নিকোলো বুরবাকি সেমিনার আয়োজিত হয়ে আসছে। (বুরবাকি কতটা জনপ্রিয় ছিল, তা এই তথ্য থেকে আন্দাজ করা যায় যে, 2001 সালে ফরাসি পদার্থবিদ হেনরি পয়েনকেয়ার বুরবাকি সেমিনারের অনুপ্রেরণায় পদার্থবিদ্যার ওপর একই ধরণের পয়েনকেয়ার সেমিনারের প্রচলন করেন; যা অনেকের কাছে 'বুরবাফি' নামে পরিচিত)।

বুরবাকি সেমিনারে দলের সদস্যরা তাদের নতুন নতুন গবেষণা প্রদর্শন করেন। এমনকি পুরনো কোনো তত্ত্ব বা উপপাদ্য প্রমানে নতুন কোনো উপায় পেশ করার অধিকারও ম্যাথামেটিশিয়ানরা পান। অঙ্কের খুঁটিনাটি আলোচনা থেকে তর্ক, বক্তৃতা ইত্যাদি নানা কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা হচ্ছে বুরবাকির বিশেষত্ব। সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া-ফুর্তি তো আছেই।

1987-88 সালে আয়োজিত 30তম বুরবাকি সেমিনারে জোসেফ ওয়েস্টার্লি নামে একজন ফরাসি যুবক ম্যাথামেটিশিয়ান এক আকর্ষণীয় গবেষণাপত্র পেশ করেন। গবেষণাপত্রটির নাম শুনলেই (Nouvelles approches du théorème de Fermat, ইংরেজি তর্জমা New Approaches to Fermat's Theorem) আকর্ষণের কারণ আন্দাজ করা যায় ঠিকই, কিন্তু পত্রের খাঁজে যে আরেকটি আকর্ষণীয় কনজেকচার লুকিয়ে আছে, তার আন্দাজ খোদ ওয়েস্টার্লিও করতে পেরেছিলেন কি না সন্দেহ!

এই আকর্ষণীয় কনজেকচারটিই হচ্ছে অঙ্কের ABC Conjecture

কনজেকচারটি কি, জানার আগে ইতিহাসের রাস্তা ধরে কিছুটা পেছন থেকে ঘুরে আসি, মাত্র সতেরশো সাল পেছনে, বীজগণিত যখন জন্ম নিচ্ছে। 'বীজগণিতের জনক' গ্রীক ম্যাথামেটিশিয়ান ডায়োফ্যান্টাস একধরণের সমীকরণ গঠন করেন, পরবর্তীকালে যা ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণ নামে খ্যাত হয়। দুই বা তার বেশি চলরাশির বুহুপদী সমীকরণ (polynomial equation) বা সমীকরণসমূহ, যার বা যাদের সমাধান কেবলমাত্র পূর্ণসংখ্যা হবে, তাকে বা তাদেরকে ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণ (বা সমীকরণসমূহ) বলে। সাধারণত, ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণের সংখ্যা উপস্থিত চলরাশির সংখ্যার চেয়ে কম হয়। রৈখিক ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণের উদাহরণ হল । উচ্চতর ঘাতের ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণের জনপ্রিয় রূপটি হল  (যেটি আসলে ফার্মার 'শেষ উপপাদ্যে' ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেই উপপাদ্যটি হল -  এর মান ২ এর বেশি হলে সমীকরণের কোনো সমাধান থাকবে না। বলার অপেক্ষা রাখে না,  এর মান ২ হলে সমীকরণের অসংখ্য সমাধান পাওয়া যায় যাদের পিথাগোরাসের ত্রয়ী বলা হয় )। ডায়োফ্যান্টাইন সমীকরণের হাজার হাজার প্রকারভেদ আছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে সরলতম সমীকরণটি হচ্ছে (চলরাশি -এর পরিবর্তে  ধরে)  এবং এখান থেকেই শুরু হচ্ছে ABC Conjecture

আবার ফিরে আসি 1988 সালে। জোসেফ ওয়েস্টার্লি বুরবাকি সেমিনারের জন্য তার গবেষণাপত্র সাজানোর সময়  সমীকরণটির আজব এক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলেন। বৈশিষ্ট্যটি কি জানার আগে জানতে হবে রেডিক্যাল কি?

একটি ধনাত্মক পূর্ণ সংখ্যার রেডিক্যাল বলতে বোঝায় সংখ্যাটির পৃথক পৃথক মৌলিক গুণনীয়কগুলির গুণফল। যেমন - 504 সংখ্যাটির মৌলিক পৃথক গুণনীয়কগুলি হল 2, 3 ও 7। এদের গুণফল, 42 হচ্ছে 504-এর রেডিক্যাল। সহজেই বোঝা যায়, মৌলিক সংখ্যার রেডিক্যাল সে নিজেই।

ওয়েস্টার্লি দেখলেন  সমীকরণ বিশেষ এক ক্ষেত্রে অর্থাৎ যখন  পরস্পর মৌলিক হচ্ছে, তখন সংখ্যা তিনটির গুণফলের রেডিক্যাল বেশিরভাগ সময় -এর চেয়ে বড়ো (যথেষ্ট বড়ো) সংখ্যা হচ্ছে। উদাহরণ দেওয়া যাক।  আকারের কয়েকটি সমীকরণ হল 8+9=17, 5+16=21 অথবা 6+9=15। শেষ সমীকরণটিতে কিন্তু ওয়েস্টার্লির পর্যবেক্ষণ কার্যকরী হবে না, কারণ 6, 9, 15-এর সাধারণ গুণনীয়ক 3 থাকার দরুন তারা পরস্পর মৌলিক নয়। 5+16=21 সমীকরণটিকে ধরা যাক। 5, 16, 21এর গুণফলের () রেডিক্যাল হল ()  210। স্পষ্টতই 210, 21এর চেয়ে অনেক বড়ো সংখ্যা। আরেকটি উদাহরণ নেওয়া যাক। সমীকরণটি হল 5+27=32। একইভাবে রেডিক্যাল পায় 30, যা 32এর চেয়ে ছোটো। ওয়েস্টার্লি দেখলেন এই দ্বিতীয় ধরণের পর্যবেক্ষণ খুবই বিরল। সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে, 1 থেকে 100 এর মধ্যে সংখ্যা নিয়ে মোট 3044টি বিভিন্ন প্রকার  ধরণের সমীকরণ গঠন করা যায়। এখন এই 3044টি সমীকরণের মধ্যে দেখা যাচ্ছে মাত্র 7টি সমীকরণে রেডিক্যালের মান -এর মানের চেয়ে বেশি। এই দেখে ওয়েস্টার্লি বক্তব্য রাখলেন, 1 থেকে 100এর গণ্ডির বাইরেও যেকোনো সংখ্যার জন্য যদি যাচাই করা হয় তাহলেও দেখা যাবে খুব কম রেডিক্যালই -এর চেয়ে ছোটো হচ্ছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বড়ো রেডিক্যাল পাওয়া যাচ্ছে।

আর যাই কোথায়, এটিকে পেশ করে দিলেন একটি কনজেকচার হিসেবে। কারণ, তিনি সেই মুহূর্তে তার কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি, অথচ তার মনে হয়েছে বক্তব্যটি সঠিক। এখানে মজার বিষয় হল, খোদ কনজেকচারের দাবিটাই রীতিমতো শিথিল - যা অঙ্কের লোকেদের কাছে মোটেই স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয় নয়। অঙ্কের মানুষজন টটোলজিতে (যা প্রত্যক ক্ষেত্রেই সত্য) বিশ্বাস করে। একটু পা ফস্কালেই (counter example পেলে) বক্তব্য গ্রাহ্যের বাইরে চলে যায়। কিন্তু ওয়েস্টার্লি 'বেশিরভাগ ক্ষেত্রে' বা 'বিরল' এই জাতীয় শব্দ ব্যবহার করে তামাম অঙ্কের লোকজনদের ধন্দে ফেলে দেন। তাই একটা দুটো counter example দিয়ে এই কনজেকচারকে ব্যর্থ করা যাবে না। গোদা বাংলায় counter example এর লাইন লাগিয়ে দিতে হবে। আরেকটি উপায় আছে কনজেকচারটি সম্বন্ধে স্থির সিদ্ধান্তে আসার - কনজেকচারটি প্রমাণ করতে হবে।

কিন্তু চাইলেই তো হল না। প্রায় বিশ দশক অপেক্ষা করার পর একজন ফরাসি ম্যাথামেটিশিয়ান ABC Conjecture এর প্রমাণ পেশ করেন (2007 সালে)। ম্যাথামেটিশিয়ানটির নাম ছিল লুসিয়েন জিপিরো। দুম করে এখানে নামটি এলেও, অঙ্ক জগতের লোকজন বিশেষ অবাক হননি যখন তারা জানতে পারেন, জিপিরো ABC Conjecture প্রমাণ করে দিয়েছে। কারণ, ওয়েস্টার্লির অনেক আগেই জিপিরো নিজের নামে একটি জটিল সংখ্যাতত্ত্বের কনজেকচার পেশ করেছিলেন। কোথায়? বুরবাকি সেমিনারে! কারণ তিনিও ছিলেন একজন বুরবাকির সদস্য। জিপিরোর কনজেকচারকে ABC Conjectureএর সমতুল্য কনজেকচার বলে মনে করা হয়। তাই নিজের কনজেকচার প্রমাণ করতে গিয়ে ABC Conjecture প্রমাণ করে ফেলার সম্ভাবনা থেকেই যায় (প্রলোভন বললেও ভুল হবে না)। এবং প্রমাণ করলেনও! দুঃখের বিষয় ABC Conjecture প্রমাণের খ্যাতি তার বেশিদিন জোটেনি। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই তার প্রমাণের ত্রুটি বেরিয়ে আসে এবং যথারীতি প্রমাণ খারিজ হয়ে যায়।

আরও বছর পাঁচেক অপেক্ষার পর 2012 সালে সুদূর জাপান থেকে ABC Conjecture এর প্রমাণ ভেসে আসে। প্রমাণটি দেন জাপানের কিয়োটো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিন্‌ইচি মোচিজুকি। প্রমাণটি করতে গিয়ে মোচিজুকিকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। এই প্রমাণ করতে গিয়ে চার চারটি আগাম গবেষণাপত্র বের করতে হয়েছে তাকে (ইংরেজিতে যাকে বলে preprint)। শুধু তাই নয় ABC Conjecture প্রমাণের ঠেলায় নতুন এক গাণিতিক তত্ত্বই আবিষ্কার করে ফেলেন, নাম - Inter-universal Teichmüller theory সংক্ষেপে IUT। মজার কথা IUT ব্যবহার করে ABC Conjecture প্রমাণ করার আগে, মোচিজুকি এদিক সেদিক ছড়িয়ে থাকা খুচরো কিছু অমীমাংসিত কনজেকচার প্রমাণ করে অন্যান্য ম্যাথামেটিশিয়ানদের খাটনি কিছুটা হলেও কমিয়ে দিয়ে যান। দুর্ভাগ্যের বিষয় এই খুচরো কিছু কনজেকচারের মধ্যে জিপিরোর সাধের কনজেকচারটি ছিল অন্যতম। এতকিছু যাগযজ্ঞের বর্ণনা কে কয়েক পাতায় এঁটে যাবে, ভাবাটাই বোকামো। আরেকটু হলে গুটেনবার্গের বাইবেলকেও হার মানিয়ে দিচ্ছিল মোচিজুকির প্রমাণ। 500 পাতা লম্বা অঙ্কের প্রমাণ দিয়েই মোচিজুকি ক্ষান্ত থাকেননি। প্রমাণের সমর্থনেও বাড়তি পাতার পর পাতা যুক্তি দিয়ে গেছেন। এই পাহাড়প্রমাণ প্রমাণ পড়ে বুঝতে পারাটাই রীতিমতো চ্যালেঞ্জ। তাহলে প্রমাণ করাটা কতটা পরিশ্রমের আন্দাজ করাই যায়। তার ওপর শেষে রইল এই প্রমাণের সত্যতা যাচাই করা, যা সাধারণের কাছে এককথায় অসম্ভব কাজ বলেই মনে হবে।

সাধারণের কাছে, কিন্তু সকলের কাছে নয়।

সিন্‌ইচি মোচিজুকি যখন তার ABC Conjectureএর প্রমাণ পেশ করেন তখন পিটার স্কোলজের বয়স ছিল মাত্র 24। জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র স্কোলজ মোচিজুকির প্রমাণ হাতে পাওয়া মাত্র গল্পের বইয়ের মতো পড়ে ফেলেন। প্রমাণে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। মনস্থির করেছিলেন খোদ মোচিজুকির কাছে গিয়েই প্রমাণের যথাসর্বস্ব বুঝে আসবেন। পড়াশোনা শেষ করে 2018 সালে তিনি জার্মানির গ্যেটে ফ্রঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেকব স্টিক্সের সাথে কিয়োটো সফরে যান এবং মোচিজুকির সাথে দেখা করেন। তাদের মোলাকাত সফল হয়নি। স্কোলজ আর স্টিক্স দুজনেই মোচিজুকির প্রমাণে বড়ো এক অসঙ্গতির সন্ধান পান ('a hole at the heart of a proof') এবং যথারীতি মোচিজুকিকে জানান। মোচিজুকি ফের তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন কিন্তু ব্যর্থ হন। প্রত্যেকেই বড়ো ম্যাথামেটিশিয়ান, তাই একে অপরের বক্তব্য সহজে উড়িয়ে দিতে পারেননি। তবুও বিরোধ অনিবার্য। একদিকে দুই যুবক ম্যাথামেটিশিয়ান প্রমাণ মানতে নারাজ, অন্যদিকে মধ্যবয়স্ক মোচিজুকির স্বাভাবিক দাবি - স্কোলজ বা স্টিক্স কেউই তার প্রমাণ ঠিকঠাক বুঝতে পারেননি। এখনও পর্যন্ত যে 12 থেকে 18 জন ম্যাথামেটিশিয়ান মোচিজুকির প্রমাণটা সম্পূর্ণ পড়ে বুঝতে পেরেছেন (অন্তত বোঝার দাবি করেছেন) তার সকলেই এককথায় মেনে নিয়েছে প্রমাণটি বিলকুল ঠিক। ঝামেলা পাকাচ্ছে এই দুজন যুবক। স্কোলজ তো সাহস দেখিয়ে ঘোষণাই করে দিয়েছে ABC Conjecture এখনও সকলের সামনে খোলা আছে, যে কেও চাইলেই তাকে প্রমাণের চেষ্টা চালাতে পারে এবং অবশ্যই ভুল প্রমাণের)। কিন্তু কে কোমর বেঁধে গাইতি হাতে পাহাড় কাটতে নামবে সেইটিই দেখার। কারণ অঙ্ক সমাজ স্কোলজের কথাকে সহজে উড়িয়ে দিতে পারে না। অঙ্কের সর্বোচ্চ সম্মান ফিল্ডস্‌ মেডেল জয়ীদের তালিকায় অন্যতম কনিষ্ঠ ম্যাথামেটিশিয়ানের কথায় কিছুটা হলেও দম থাকবে সে আশা করাই যায়।

পুনশ্চ: সংখ্যার পরিবর্তে একাধিক বর্ণ নিয়ে সুদোকুর ধরণের একপ্রকার খেলা বা ধাঁধাঁ খুবই জনপ্রিয়। যদিও নামটা ততটাই বিচ্ছিরি - বুজটাবে(ন)সালাট (Buchstabensalat একটি জার্মান শব্দ)। ধাঁধাঁটি খেলার ইচ্ছে হলেও নামের চোটে বিরক্তি লাগবে ঠিকই, তাই ধাঁধাঁটিকে একটি সোজা ডাকনাম দেওয়া হয়েছে। সেটি হল Easy as ABC

No comments:

Post a Comment