বুফো মেলানোস্টিকটাস
রোজ সন্ধ্যায় ভিক্টোরিয়ায় ফর্সা মার্বেলের গায়ে রংবেরঙয়ের লাইট মেরে কলকাতার সেকাল-একালের ব্রিফ ফিরিস্তির উপর হিন্দিভাষী এক বঙ্গালী বাবুর গলায় রেকর্ড করা লাইট এন্ড সাউন্ডের একটা শো দেখানো হয়। বাম্পার বটে, মানতে হবে। সেটা দেখেই ফিরছিলাম। ট্যাক্সিতে করে (নিম্ন মধ্যবিত্তের স্ট্যাটাস ফ্লেক্সিং)। সঙ্গে ছিল স্ত্রী আর মাসতুতো দাদা-বউদি-ভাইজি। গরমের ছুটিতে মামার বাড়ি গিয়েছিলাম। সেই উপলক্ষেই ঘোরাঘুরি। ওদের স্ট্যাটাস কিন্তু উচ্চ মধ্যবিত্ত। কথাবার্তাও সেরকম। সস্ত্রীক চুপটি মেরেই ছিলাম, অবশিষ্ট দম্পতির মধ্যে কথা হচ্ছিল বুফে নিয়ে। কলকাতায় হালে একটা নতুন চল শুরু হয়েছে - বুফে। প্রচলিত থেকে নামীদামী সবরকমের রেস্টুরেন্টেই এখন চালু হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় আনলিমিটেড বুফে - মাত্র ৯৯৯ টাকায়। নানান স্বাদের নানান রাজ্যের নানান জাতের (আপার কাস্ট মেইনলি) (তবে একটা মাত্র ক্লাসেরই) খাবার বাটি-গামলা-কড়াইয়ে সাজানো থাকবে, আপনি হাতে প্লেট তুলে নেবেন আর নিজের ইচ্ছে মতো বাটি-গামলা-কড়াইয়ের সামনে গিয়ে যত খুশি পছন্দের খাবারা তুলে নেবেন। অবশ্যই বসার জায়গা থাকবে। আর যদি আরও দরকার পড়ে, তাহলে কষ্ট করে উঠে আবার বাটি-গামলা-কড়াইয়ের সামনে হাজির হবেন। চিন্তা নেই কেউই হ্যাংলা ভাববে না। ওখানে উপস্থিত সকলেই হ্যাংলা। হা-ভাতে। যেন নুভা-রিচদের লঙ্গরখানা।
আমাদেরকেও নেমন্তন্ন করা হল। অমুক জায়গায় (সত্যি একটা জায়গার নামও মনে নেই) মাত্র ৪৯৯ টাকায় বারো রকমের মাছের আইটেম। তমুক জায়গায় আইসক্রিম স্পেশাল। উইকেন্ডে ভালোই কাটে নাগরিক জীবন।
আজ স্ত্রীর বন্ধুর দাদার বিয়ের বৌভাতে (রিসেপসন বুঝলেন, রিসেপসন) খেতে এসে আমার সেই বুফের কথাই মনে পড়ে গেল। কারন এখন কড়া কম্পিটিশন - সিট দখলের লড়াই। স্ত্রীর হাত ধরে গভীরে ঢুকে গেছি, কিন্তু যাকেই জিজ্ঞেস করি উত্তর আসে, "অধিকৃত!" তাই বলাবলি করছিলাম বুফে সিস্টেম হলে ভালোই হতো।
শহর মফঃস্বলের বাঙালি বিয়েতে উপর তলার পর থেকে নীচে কোথাওই বুফের তেমন প্রচলন হয়নি। তবে ইভল্যুশনের পথে আছে। বুফের আদলে স্টল বসে। কফি, জিলিপি থেকে শুরু করে কাবাব, পকোড়ার স্ন্যাক্স সাজিয়ে ঘুমটি কাস্টমার টানে। পেট ঠুসে পোলাও বিরিয়ানি চিকেন মটন গেলার আগের বাম্পার এগুলো। মেয়ের বাপের (ছেলের বাপের খরচ তো মেয়ের বাপই দেয়) যাতে খরচ বাঁচে। আমরাও অলরেডি সাটিয়ে দিয়েছি। চিকেন পকোড়া। তবে লম্বা লাইন ছিল। স্বাভাবিক। শহর-মফঃস্বলের সাধারণের কাছে এগুলোই স্পেশাল। কলকাতার মতো টাকা ঢেলে আমাদের বুফে জোটে না। তবে আত্মীয় বন্ধুর বিয়েতে গিফটের খরচ করে সেজেগুজে বসে খাওয়ার ব্যবস্থাটা হয়ে যায়। সঙ্গে ফাও এই স্টল নামের মিনি বুফে। বেশি খেলে কিন্তু আসল পাতে মার পড়ে যাবে। তাছাড়া বেশি জুটবেও না। সবাই চায় চিকেন কাবাবে দাঁত বসাতে। তাই সংগ্রাম করতে হয়। লাইনে বচসা হাতাহাতিও লেগে যেতে পারে। ঠিক যেন শহুরে লঙ্গরখানা।
No comments:
Post a Comment